রিপন কুমার দে

মা

মা
Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

[বি:দ্র: পোস্টটি ২০০৯ সালের “মা” দিবসে প্রথম প্রকাশিত]

[আজ মায়ের সাথে অকারনে রাগ করলাম। অনেকটা ইচ্ছে করেই। আমার মা আমার থেকে হাজার মাইল দুরে। প্রতিদিন আমার ফোনের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকেন মা। না দিলে ধৈর্য্যহারা হয়ে নিজেই করে বসেন। মা, এত ভালবাসা কেন তোমার? এত কষ্ট দেই, তারপরও ভালবাসা ফুরায় না কেন তোমার? রাগারাগির পর খুব খারাপ লাগছিল আমার। সেটা কমাতেই এই আবেগী কবিতা। কবিতা হয়তো হয়নি, কিন্তু মায়েদের ভালবাসা এমন যে, তাদেরকে উপজিব্য করা কোন আবেগের বহিপ্রকাশ কোন ব্যর্থতাকে স্পর্শ করতে পারে না। সকল অপরিপক্কতা ছাপিয়ে ঠিকই উজ্জ্বল দ্বীপ্তিময় হয়ে উঠে সেই সত্তা তার নিজস্ব ভঙ্গিমায়। এটা লিখার সময় মাকে খুব অনুভব করেছিলাম, সেই ভাল লাগার অনুভুতিই প্রকাশ করলাম। প্লিজ খারাপ লাগলে গালি দিয়েন না, অন্তত]

মা,
সেই ছোট্টবেলায় প্রথম যেদিন
মিতালীপাড়ার স্কুলের আঙ্গিনার
পদধুলি দেবার কথা আমার,
তুমি মাথায় সিঁথি তুলে আশীষ দিয়েছিলে,
“বড় হও, বাবা, অনেক বড়,
মানুষ হিসেবে পূর্ন হয়”।
তোমার চোখে ছিল আমার জন্য আকাশছোঁয়া স্বপ্ন, মা।
আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম
তোমার দিকে নিরিবিলি,
আমার দেখা সবচেয়ে পরিপূর্ণ মানুষটির দিকে।

মা,
মেঘেদের যুদ্ধে ছিল বৃষ্টিদের বিজয়ের দিন সেদিন।
তুমি ছাতা দিয়ে বলেছিলে, “সাথে রাখিস বাবা”
আমি নেইনি সেদিন, তোমার দেয়া।
হয়তো ভেবেছিলাম, তোমার মত এত বড়
ছাতা থাকতে কোন ঝড়ের ভয় মা?
কোন ঝড়ের ভয়?

ঠিকই অঝোড় ধারায় বৃষ্টি হয়েছিল সেদিন
নুড়িপাড়ার সাধনবাবুর দোকানে আটকা পড়েছিলাম,
অনেকক্ষন।
তুমি নিজে ভিজে চলে এসেছিলে আমাকে
অভেজা নিয়ে যেতে, মেঘেদের আড়াল করে।
খালি পায়ে।
আমার কয়েক ভেজা চুল তোমার আঁচল দিয়ে
মুছে দিতে দিতে মায়াভরা গলায় শাসন করেছিলে,
“আর কোনদিন ভিজবি না বৃষ্টিতে, ঠিক আছে?”
তোমার উষ্ঞ আচঁল দিয়ে আগলে ধরে রাখছিলে তুমি
আমায় কিছুক্ষন, গভীর মমতায়,
তোমার সিক্ত আশ্রয়ে।

মা,
পৌষের সংক্রান্তি ছিল ওইদিন।
ভোরের স্নান সেরে সোজা চুলার পাশে আমি।
তুমি পিঠা বানাচ্ছিলে,
কপালে তোমার বিন্দু বিন্দু ঘাম।
বসে রইলাম তোমার দিকে চেয়ে মুগ্ধ নয়নে।
তুমি পাঠিসাপটা বানিয়ে দিতে লাগলে, অনবরত।
খাওয়া শেষে কম পড়েছিল বলে, তুমি
নিজে খাওনি সেদিন, বলেছিলে,
“তোরা খা, এতেই আমার তৃপ্তি”

মা,
জৌষ্ঠের নবান্নৎসবের ছুটি তখন,
দক্ষিনপাড়ার নবনীবাবুর কুয়োর ধার দিয়ে,
আসার সময়,
পড়ে জখম হয়েছিল খুব।
নিমপাতার রস লাগিয়ে দিয়েছিলে সেদিন,
উপরে কলাপাতার পট্টি, পরম যতনে।
তবু ক্ষতের নিস্তার নেই,
পায়ের জখম বিদ্রোহ করেছিল সেদিন রাত।
প্রবল জ্বরে কেঁপে কেঁপে উঠেছিলাম,
নকশীকাঁথায় ঢেকেও স্বস্তি নেই তোমার,
আমার মাথায় হাত বুলিয়ে ঢেলে দিতে লাগলে
তোমার শরীরের ওম।
সারা রাত জেগে নির্ঘুম তুমি
মাখতে লাগলে জ্বল পট্টি, আমার তপ্ত কপালে,
পরম আদরে।
টলমল করছিল সেদিন
তোমার স্নেহঝড়ানো উদ্বিগ্নতার জ্বল।

মা,
আমার টিউশনির টাকা
একটু একটু করে জমিয়ে,
তোমাকে একটি নীল শাড়ি কিনে দিয়েছিলাম,
তোমার সেই শাড়ি গায়ে দিতে না তুমি
আলমারিতে যত্নে রাখ, সবসময়।
নষ্ট হয়ে যাবে বলে।

দেশের পড়া শেষে,
স্কলারশীপ নিয়ে হাজার মাইল দুরে আসার সময়,
আবেগি তুমি, কান্না থামিয়ে রাখতে পারছিলে না।
আচঁল দিয়ে চোখ লুকিয়ে রাখলে।
আসার বেলায়,
কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলে,
“ভাল থাকিস, বাবা”।
ডুকরে কেঁদে উঠেছিলাম আমি।

সেই তুমি আজ অনেকটাই জীর্ন।
রান্নাঘর থেকে সিংহদার,
এটুকুনই তোমার সকল ভাবনায়।
খুঁজে বেড়াও আমাদের, প্রতিটি মুহুর্ত।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমার একটি ফোনের জন্য
অপেক্ষা করে বসে থাকো রিক্ত তুমি,
চাতকপাকির মত।
একদিন কথা না বললে
অস্থির হয়ে রাগ করে বসে থাকো,
অবোধ শিশুটির মত।

মা,
আচ্ছা আমি কি পারব, তোমার স্বপ্নটি পুরন করতে?
অনেক বড় হতে কথনও?
অথবা,
মানুষের পুর্নতা নিতে?
ভয় হয়, মা।
আমার।
একটু মাথায় তোমার আশীষের হাতটি বুলিয়ে দিবে, মা, ঠিক আগেটির মত।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


18 Responses to মা

  1. imrul.kaes@ovi.com'
    শৈবাল আগস্ট 22, 2010 at 6:07 অপরাহ্ন

    আজকের মত শৈলী থেকে বের হবো ,ঠিক এই সময়েই চোখে পড়ল "মা " , … শেষ বেলায় চোখে জল আনলেন

  2. mahirmahir3@gmail.com'
    আহমেদ মাহির আগস্ট 22, 2010 at 7:56 অপরাহ্ন

    শেষটায় কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গেলো লেখাগুলো ; ঠিক লেখাগুলো না – ঝাপসা হয়ে গেলো আমার চোখ ।
    ভাই , অপুর্ব লিখেছেন ! আমি মুগ্ধ ।

  3. প্রদীপ আগস্ট 23, 2010 at 2:41 অপরাহ্ন

    অপুর্ব

  4. রাজন্য রুহানি মে 8, 2011 at 4:24 পূর্বাহ্ন

    মেঘেদের যুদ্ধে ছিল বৃষ্টিদের বিজয়ের দিন সেদিন।
    তুমি ছাতা দিয়ে বলেছিলে, “সাথে রাখিস বাবা”
    আমি নেইনি সেদিন, তোমার দেয়া।
    হয়তো ভেবেছিলাম, তোমার মত এত বড়
    ছাতা থাকতে কোন ঝড়ের ভয় মা?
    কোন ঝড়ের ভয়?

    :rose: :rose: :rose:
    মা নিয়ে কথকতার শেষ হবে না কোনোদিন;
    সবকিছুই বিবর্ণ হয়
    প্রেমেরও আছে লয়-ক্ষয়,
    শুধু মা’র স্নেহপ্রেম চির অক্ষত অমলিন।

    • রিপন কুমার দে মে 8, 2011 at 2:13 অপরাহ্ন

      মা তো মাই! যাদের তুলনা তারাই। এটাই মনে হয় একমাত্র সম্পর্ক যেখানে কখনই কোন স্বার্থ কাজ করে না।

  5. mannan200125@hotmail.com'
    চারুমান্নান মে 8, 2011 at 7:50 পূর্বাহ্ন

    মা’র জন্য আমার স্বশ্রদ্ধ ভালোবাসা,

  6. obibachok@hotmail.com'
    অবিবেচক দেবনাথ মে 8, 2011 at 8:02 পূর্বাহ্ন

    দাদা মা শব্দটার আর তাঁর ভালোবাসার বিন্যাস রচনা যে কত কঠিন তা আমি চার বৎসর ধরে বহিয়েও বুঝতেছিনা। আমার মা আমার সাথে রাগ করে তাঁর সুখের স্বর্গে আমায় ভাসিয়ে তাঁরাদের আড়ালে লুকিয়ে আমায় দেখছে। আমি আর সইতে পারছিনা এই স্বর্গসুখ তাই অন্ধকারে মায়ের ভালোবাসার অপূর্নতা বয়ে চলি।

    • রিপন কুমার দে মে 8, 2011 at 2:17 অপরাহ্ন

      অনেক কস্ট দিল আপনার কথাগুলো। আপনার মা যেখানেই থাকুন সুখে থাকুন, শান্তিতে থাকুন। আর আপনি আপনার মায়ের সকল স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন, এটাই আমার কামনা। সুখে থাকুন।

  7. obibachok@hotmail.com'
    অবিবেচক দেবনাথ মে 8, 2011 at 8:05 পূর্বাহ্ন

    ধন্যবাদ কবিতার জন্য, অনেক অতৃপ্ত অনুচ্ছেদে ভালোলাগা প্রহর
    :rose: :rose:

  8. rabeyarobbani@yahoo.com'
    রাবেয়া রব্বানি মে 8, 2011 at 8:37 পূর্বাহ্ন

    হুম ।সন্তানের প্রতি ভালোবাসার বিচারে পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময় মা ।নিজে মা হওয়ার পর এটা আরো বেশি বুঝি ।এই ভালোবাসা স্বার্থের দুনিয়ায় অপার্থিবই লাগে ।দিবসগুলোতে কেতাবী শুভেচ্ছা দেয়া হয়ে থাকে এই পোষ্টটায় ঢুকার আগে ভেবেছিলাম সেরকম কিছু হবে ।কিন্তু দেখি আবেগমাখা চিঠি ।চিঠিটাকে সালাম ।
    মঙল হোক

    • রিপন কুমার দে মে 8, 2011 at 2:31 অপরাহ্ন

      আপনি যেহেতু নিজেও একজন মা, আপনার প্রতিও সশ্রদ্ধ সালাম আর শুভেচ্ছা।

      আমি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করি না কারণ আমি প্রতিদিন আমার মাকে চোখের সামনে পাই না। মনে হয় আমি নেই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে। আগের মত মাঝে মাঝে মায়ের গা ছুঁয়ে বসার সুযোগ পাই না , ভাবি মারা গেলে তো আর স্বর্গ পাব না, দুনিয়ায় যখন সৃষ্টিকর্তা স্বর্গ রেখে দিয়েছেন সেই স্বর্গের ছায়াতলেই থাকিনা কিছুক্ষণ। কিন্তু সেই সুযোগ পাই না।

      “মা”’ একটি আশ্রয় একটি সাহস যোগানিয়া শব্দ। “মা” শুধু একটা শব্দ নয়, “মা” একটা দেশ, “মা” একটা পৃথিবী। “মা” শব্দটাই এমন, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শব্দ, সবচেয়ে সুমধুর শব্দ এখানে কোন খারাপের স্থান নেই, কোন খারাপ কিছু মায়ের মধ্যে থাকতে পারে না। সুতরাং মা মা-ই।

      আপনি এবং আপনার সন্তান সুখী এ সুন্দর জীবন কাটান এটাই কামনা।

      • রাজন্য রুহানি মে 8, 2011 at 3:29 অপরাহ্ন

        “মা”’ একটি আশ্রয় একটি সাহস যোগানিয়া শব্দ। “মা” শুধু একটা শব্দ নয়, “মা” একটা দেশ, “মা” একটা পৃথিবী। “মা” শব্দটাই এমন, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শব্দ, সবচেয়ে সুমধুর শব্দ এখানে কোন খারাপের স্থান নেই, কোন খারাপ কিছু মায়ের মধ্যে থাকতে পারে না। সুতরাং মা মা-ই।

        :-bd :rose: >:D<

  9. rabeyarobbani@yahoo.com'
    রাবেয়া রব্বানি মে 8, 2011 at 3:03 অপরাহ্ন

    মনে হয় আমি নেই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে। আগের মত মাঝে মাঝে মায়ের গা ছুঁয়ে বসার সুযোগ পাই না , ভাবি মারা গেলে তো আর স্বর্গ পাব না, দুনিয়ায় যখন সৃষ্টিকর্তা স্বর্গ রেখে দিয়েছেন সেই স্বর্গের ছায়াতলেই থাকিনা কিছুক্ষণ। কিন্তু সেই সুযোগ পাই না।

    সংসার জীবনে আমাকেও মা ছাড়া থাকতে হয়।আমি মোটামুটি শক্ত মেয়ে।এই লাইনগুলো এলোমেলো করে দিল।একি কথাই মনে বাজে।
    আবারো সালাম।মাতৃপ্রেমী সন্তানটিকে।
    ভালো থাকুন সবসময়।

  10. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী মে 9, 2011 at 7:59 অপরাহ্ন

    মা তো মা। আহারে মা! আপনে মিয়া সত্যিই কঠিন হিয়া। মায়ের সঙ্গে রাগ কইরা কথা না কওয়ার অভিজ্ঞতা আমার নাই।

You must be logged in to post a comment Login