স্মৃতিরোমন্থন: যদ্যপি আমার গুরু

148099_1752903382318_2825553_n

আমার গুরু হুমায়ূন আহমেদ বললেন, কেউ কবুতরটি সরিয়ে দাও। এই কাট কাট বলে জুয়েল রানা চেঁচিয়ে উঠলো। ‘উড়ে যায় বক পক্ষী’র শুটিং চলছে। দৃশ্যে শাওন রান্না বসিয়েছে, কিছু কবুতর ও মুরগি ঘুরঘুর করছে উনুনের আশপাশে। খুবই সাধারণ গ্রাম বাংলার রান্নার দৃশ্য। তার মাঝে একটা কবুতর বারবার উনুনের একেবারে কাছে চলে যাচ্ছে। আগুনের প্রতি কবুতরটির মনে হয় আগ্রহ আছে। গুরু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি আমার দর্শকদের টেনশন দিতে চাইনা। এই কবুতরের জন্যে কেউ অভিনেত্রীর অভিনয় দেখবে না। সবার মনোযোগ থাকবে কখন কবুতরটি চুলার ভেতরে পরে যায় তার দিকে। প্রোডাকশনের কয়েকজন কবুতর ধরতে দৌড় লাগালো। পাখা বেঁধে দেয়ায় উড়তে পারছে না কবুতরগুলো তারপরও ধরতে বেশ বেগ পেতে হলো। কেউ একজন কবুতরের পাখা কেটে দেয়ার কথা বলতেই গুরু ধমক দিলেন, খবরদার পাখা কাটতে যাবে না। পাখির পাখা কেটে দেয়া মানে তার হাত পা কেটে দেয়া। এই অমানবিক কাজ কেউ করবে না। পাখির পাখার চেয়ে আমার শুটিং বেশি ইম্পর্টেন্ট না।

আমি জীবনের প্রথম শুটিং দেখছি। নুহাশ পল্লীতে শুটিং চলছে। শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে গুরু আমার সঙ্গে কথা বলছেন। কেন ট্রলি ব্যবহার হয় সেটা বুঝিয়ে দিলেন। গুরু আরো বললেন, তবে আমি মনে করি ক্যামেরা হলো দর্শক। নাটক সিনেমায় দর্শককে যত কম নড়ানো যায় ততো ভালো। বেশির ভাগ পরিচালক আমার সঙ্গে একমত না। আমি আসলে একজন লেখক শখের বসে নাটক-সিনেমা বানাই। স্যার আমি আপনার সঙ্গে এই কাজে ইনভলব হতে চাই। অভিনয় করবে? না স্যার। পেছনে কাজ করবো। সুইডেনে কি ফিল্ম স্কুল আছে? জ্বি স্যার আছে। নাটক ফিল্ম এমন একটা শিল্প যেটা দাঁড়িয়ে থাকে চিত্রনাট্য নামক আরেকটা শিল্পের উপরে। দেখো চিত্রনাট্যটা ভালো ভাবে শিখতে পারো কিনা। আমাদের এখানে ভালো স্ক্রিপ্ট রাইটারের খুবই অভাব। অনেক ভালো মেকার আছে কিন্তু ভালো চিত্রনাট্যকার নেই।

ma

হুমায়ূন আহমেদ ও মাসুদ আখন্দ

সেদিনের পর আরো চারটি বছর পেরিয়ে গেলো। আমি স্টকহোম ফিল্ম স্কুল ও এসএই ইনস্টিটিউট থেকে চলচ্চিত্র নির্মানের উপর একটি ডিপ্লোমা ও একটি স্নাতক ডিগ্রী নিলাম। গুরু এর মাঝে ফ্যামিলি সহ দু’বার ঘুরে গেলেন স্টকহোম। প্রথম যেবার তিনি শাওন (আমি ডাকি গুরুপত্নি) ও ছয় মাসের নিষাদকে নিয়ে এলেন সেবার আমরা সারা ইউরোপ ট্যুরে বেরুলাম। প্লেনে করে স্টকহোম থেকে প্যারিস সেখান থেকে ট্রেনে করে সারা ইউরোপ জুড়ে চক্কর। প্রতিটি শহরে দু-তিন রাত করে থাকলাম। আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় ভ্রমন ছিলো সেটি। প্যারিসে সারাদিন ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে ম্যাকডোনাল্ডস-এ বসে লাঞ্চ করলাম। নিষাদের দুধ গরম করতে দেয়া হয়েছে আমি আর গুরু বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছি। এক ফরাসী তরুণী আমার কাছে এসে বললো, আপনার কাছে কি দেয়ার মতো অতিরিক্ত একটা সিগারেট হবে? হবে কিন্তু তোমার বয়স কত? আঠারো বছর। আইডি কার্ড আছে? জ্বি আছে। মেয়েটি আইডি কার্ড বের করে দেখালো।  দেখলাম ঠিক আছে, মেয়েটির বয়স আঠারোর বেশি তাই আমি সিগারেট বের করে দিলাম। মেয়েটি ধন্যবাদ দিয়ে চলে গেলো। ইউরোপের অতি সাধারণ একটি ঘটনা কিন্তু গুরু খুবই মজা পেলেন এবং তাৎক্ষণিক একটা গল্প বানিয়ে ফেললেন। সিগারেট শেষ করে যখন আবার ম্যাকডোনাল্ডসের ভেতরে ঢুকেছি তখন তিনি সবাইকে বললেন, মাসুদের তো একটা ফরাসী মেয়ের সঙ্গে প্রেম হয়ে গেছে। সিগারেট ভাগাভাগি করে খেয়েছে, ফোন নাম্বারও লেনদেন হয়ে গেছে। আমি যার পর নাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। আমার কাছে গুরুর চরিত্রের সবচেয়ে মজার দিক ছিলো এটি। মজা করার জন্য মুহুর্তে মুহুর্তে গল্প বানাতেন। তিনি আশপাশে থাকলে দুঃখ বলে কোন ব্যাপার আমাকে কখনই স্পর্শ করতে পারতো না। প্রতিটি মুহুর্তেই হাসি আর আনন্দ যদিও তাঁর ব্যক্তিগত অনেক দুঃখ ছিলো। সেই দুঃখ তিনি কখনই কাউকে বুঝতে দিতেন না। দুঃখের কথাও অনেক মজা করে বলতেন যেনো দুঃখ পাওয়াটাও একটা আনন্দের ব্যাপার। গুরুর কাছে থেকেই শিখেছি জীবন সৃষ্টিকর্তার দেয়া উপহার একে সুন্দর ভাবে যাপন করাই মানুষের একমাত্র কর্ম।

১৪ অক্টোবর ২০০৮। স্থান দখিনা হওয়া। জোছনা ও জননীর শুটিং চলছে। গুরু বললেন, মাসুদ রেডি হও তুমি অভিনয় করবে। স্যার আমি? হুম তুমি। আবেগপ্রবন মানুষরা অভিনয় ভালো করতে পারে। তুমি ভালো করবে। যাও বিহারী জোহর চরিত্রটি করার জন্য রেডি হও। আমি কখনই আমার গুরুকে কোন কিছুতেই না বলতে পারিনি। আমি রেডি হলাম। মেকআপ ম্যান আমাকে বিহারী বানাতে গিয়ে কিম্ভুত এক প্রাণী বানালো। আমি কিম্ভুত বিহারী সেজে গুরুর সামনে গেলাম। তিনি মেকআপ ম্যানকে আমার রূপসজ্জায় কিছূ পরিবর্তন করতে বললেন। জোহর সারাক্ষণ পান খায় তাই আমার জন্য ডজন খানেক পান আনা হলো। আমি শুটিং শুরুর আগেই পান খেয়ে জিহবার বারোটা বাজালাম। এখন মুখে পান দিলেই জ্বালা পোড়া করে কিন্তু তারপরও পান চিবিয়ে যাচ্ছি। তার উপর সিগারেট টানতে হচ্ছে একটার পর একটা। কি অভিনয় করেছিলাম কিছুই মনে নেই তবে অনেক বার করে টেক নিতে হচ্ছিলো সেটা মনে আছে আর মনে আছে তিনি সেদিন বলেছিলেন, যাও তোমাকে অভিনেতা বানিয়ে দিলাম।

 

গুরু আমাকে অভিনয় শিল্পী বানানোর অনেক অনেক বছর আগে মানুষ বানিয়েছিলেন। ‘প্রবলেম কিডস’ বলতে ইংরেজি ভাষায় যে শব্দটি আছে আমি ছিলাম সেই শব্দের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। লেখাপড়ার চেয়ে মারামারি করায় আমার আগ্রহ ছিলো অনেক বেশি। এমন কোনো দিন গিয়েছে কিনা সন্দেহ যে দিন আমি কোন ধরনের ঝামেলার সঙ্গে জড়ায়নি! ছোট খাটো একটা মাস্তান বলা চলে। একদিন আমার মা আমাকে হুমায়ূন আহমেদের ‘দ্বৈরথ’ পড়তে দিলেন। প্রথম বই পড়েই আমার পৃথিবী পাল্টে গেল তেমন কিন্তু না তবে বই পড়াও যে আনন্দের কাজ হতে পারে সেটা জেনে গেলাম। একের পর এক বই পড়ে গেলাম এবং একসময় বুঝলাম সত্যিকারের মাস্তানি হলো সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো। দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো। আমি তখন থেকেই তাঁকে আমার গুরু মানা শুরু করলাম। কিন্তু সত্যি কোন দিন গুরুর ব্যক্তিগত সংস্পর্শে আসতে পারবো সেটা ভাবিনি। মহান আল্লাহ আমাকে সেই সৌভাগ্য দিয়েছেন। আমার গুরু আমাকে শিষ্যপুত্র বলে মেনে নিয়ে ছিলেন। তিনি আমার কাছে একজন বাবা, একজন বন্ধু এবং একজন জীবন গুরু। আমার জীবন ধন্য। ২০০৪ সালে প্রথম তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার পরেই আমি বুঝলাম আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী! স্যারের ভাষায় বলি, আইটি ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ঘটর ঘটর করার জন্য আমার জন্ম হয়নি। আমার জন্ম হয়েছে মানুষের কথা বলার জন্য। আমি চলচ্চিত্র শিল্পকে বেছে নিলাম মানুষের কথা বলতে। ইদানিং লেখালেখি শুরু করেছি। লিখতেও যে এমন আনন্দ হয় সেটা জানা ছিল না কারন লেখালেখির সময় আমার গুরুকে আমার পাশেই অনুভব করি। সবার কাছে তিনি মৃত মানুষ কিন্তু আমার কাছে নয় আর সে কারণেই আমি কখনো তার কবর দেখতে যায়নি। কোন দিন যাবো বলে মনেও হয় না। কবরের পাশে গেলে যদি তাঁকে আর পাশে না পাই!

 

-মাসুদ আখন্দ, চলচ্চিত্র পরিচালক
১৭ জুলাই ২০১৩
স্টকহোম, সুইডেন

masudakond@yahoo.com'
-মাসুদ আখন্দ, চলচ্চিত্র পরিচালক
স্টকহোম, সুইডেন
শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করার জন্য আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে। Login