মাহাবুবুল হাসান নীরু নীরু

বিজয়ের গল্প: নতুন স্বপ্ন শুরু

বিজয়ের গল্প: নতুন স্বপ্ন শুরু
Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

পুরো নয়া দিল্লী যেনো একটা তপ্ত তাওয়ায় পরিণত হয়েছে। ইন্ডিয়ান টাইমস লিখেছে, দিল্লীর তাপমাত্রা আজ ৪৬ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড ছাড়িয়ে যেতে পারে। গেস্ট হাউজ থেকে বেরুবার আগে নিউজটা দেখেছে লিপিকা। খুব একটা প্রয়োজন না পড়লে জুন-জুলাই সময়টাতে দিল্লীর বাইরের লোকজন দিল্লী মাড়ায় না। আর লিপিকা ও তরুলির তো দিল্লীতে আসার প্রশ্নই ওঠে না। অফিস পাঠিয়েছে ওদের। উদ্দেশ্য, দিল্লীর লেটেষ্ট ডিজাইনের পোশাক কালেকশন। ঢাকার শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন হাউজ মান্ত্রা’র ফ্যাশন ডিজাইনার ওরা। তরুলি দিল্লীতে এই প্রথমবার এলেও লিপিকা এর আগে দু’বার এসেছিলো। শেষবার যখন সে দিল্লী এসেছিলো সেটা ছিলো শীতের সময়। মধ্য জানুয়ারি। তাপমাত্রা নেমে সেবার ১১ ছুঁয়েছিলো। সেকী ঠাণ্ডা! দিল্লীর এই একটা সমস্যা, গরমের সময় প্রচণ্ড গরম, আর ঠাণ্ডার সময় ভীষণ ঠাণ্ডা। তবে অবশ্যই গরমের চাইতে শীতের সময়টাতে সুন্দরী দিল্লীকে অনেক বেশী উপভোগ করা যায়।

জোড়বাগ গেস্ট হাউজ থেকে বেরিয়ে লিপিকা ও তরুলী লোধী রোড ধরে হাঁটতে থাকে। চোখ রাস্তার ওপর। একটা ট্যাক্সি কিংবা অটো পাওয়া যায় কি না। অসহ্য গরমে এরই মধ্যে দু’জনেই ঘেমে-নেয়ে একাকার। দু’জনের পরনেই জিন্সের প্যান্ট আর লিনেনের ফতুয়া। লিপিকা পরেছে কালো জিন্সের প্যান্ট ও খয়েরি ফতুয়া আর তরুলি নীল জিন্সের প্যান্ট ও চুমকির কাজ করা কালো ফতুয়া।
হাঁটতে হাঁটতে বিরক্তিভরা কন্ঠে লিপিকা বলে, উহু, এতো গরম! অসহ্য!

লিপিকা আর তরুলি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গোড়া থেকেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। চাকরিও করছে একই হাউজে। লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে ফ্যাশন ডিজাইনের ওপর ডিগ্রী নিয়ে ওরা যখন চাকরি খুঁজতে শুরু করলো তখন একদিন লিপিকা বললো, শোন তরুলি, তুই আমার জানে-দোস্ত, তোকে কাছ ছাড়া করে কখনোই আমি থাকতে পারবো না।
তার মানে?
তরুলির প্রশ্নের উত্তরে লিপিকা বলেছে, মানে হচ্ছে, যে প্রতিষ্ঠান আমাদের দু’জনকে একই সঙ্গে চাকরি দেবে আমরা সেখানেই চাকরি করবো।
দারুণ বলেছিস; যাকে বলে এক্সিলেন্ট! বুড়ো আঙ্গুলের ডগায় তর্জণির মাথা ঠেকিয়ে বলেছে তরুলি। এরপর সে মুচকি হেসে বলেছে, তবে একটি কথা…
কি?
চাকরির ক্ষেত্রে তোর প্রস্তাবটা মেনে নিলেও হাজবেন্ডের বেলায় কিন্তু এমন কোনো ঘাটিয়া প্রস্তাব আমি মেনে নেবো না।
কি বলতে চাস তুই?
বলছিলাম, তোর তো আবার লাজ-লজ্জা কম, দেখা যাবে একদিন বলে বসলি, আয় দু’জন মিলে একজন পুরুষের গলায় মালা পরাই…
ফিক করে হেসে তরুলি বলেছে, ঐ একটা ক্ষেত্রে মেয়েরা কাউকে ভাগ দিতে চায় না। আমিও তার ব্যতিক্রম নই।
লিপিকার রসিকতায় সেদিন খুব হেসেছিলো তরুলি।
এরপর একদিন পত্রিকায় মান্ত্রা ফ্যাশন হাউজের বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করলো। ইন্টারভিউ দিলো। দু’জনেরই চাকরি হয়ে গেলো সেখানে।

মাথার ওপর আগুনে সূর্যটাকে বয়ে ওরা হাঁটতে হাঁটতে জোড়বাগ বাসস্টান্ডে চলে এলো। কোনো ট্যাক্সি বা অটো পেলো না।
চল বাসে চেপেই চলে যাই। পয়সাও বাঁচবে। বললো তরুলি।
ঠিক বলেছিস। লিপিকা বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষমান যাত্রীর কাছে জানতে চাইলো, কুতুব মিনারে যাবো ক’নম্বর বাসে চাপতে হবে?
পাঁচ অথবা নয় নম্বর। দুটোই কুতুব মিনারে যায়। উত্তর দিলেন ভদ্রলোক।
ঠিক এ সময় একটা খালি অটোকে আসতে দেখে তরুলি হাত তুলে সেটাকে দাঁড়াতে ইশারা করলো।
বয়স্ক অটো ড্রাইভার মুখ বাড়িয়ে জানতে চাইলো, কাঁহা যায়েগা মাইজি?
কুতুব মিনার। উত্তর দেয় লিপিকা।
আইয়ে। রাজী হলো অটো ড্রাইভার।

ওরা উঠে বসলো অটোতে। অটো ছুটতে শুরু করলো কুতুব মিনারের উদ্দেশে।
মাস খানেক হলো মার্কেটে এসেছে এমন পোশাক কালেকশনের কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। গত দু’দিনে চাঁদিন চক, দিল্লী হাট, লাজপাত সেন্ট্রাল মার্কেট, পালিকা বাজারসহ বেশ কয়েকটি মার্কেট চষে বেরিয়েছে ওরা।
সকালে উঠে তরুলি বললো, আজ আর মার্কেটে নয়; চল কুতুব মিনারে যাই। দিল্লীতে এলাম অথচ কুতুব মিনার দেখলাম না এটা তো আর হতে পারে না। কাল শেষবারের মতো গোটা দুই মার্কেটে গোত্তা মারলেই চলবে।
তরুলির প্রস্তাবে রাজি হলো লিপিকা।
লোধি রোড ধরে সফদর জং এয়ারপোর্টকে পেছনে ফেলে ফ্লাইওভার পার হয়ে বাঁয়ে ইনা মার্কেট আর ডানে অত্যাধুনিক শপিংসেন্টার দিল্রী হাটকে রেখে অটো এগিয়ে চললো ঐতিহ্য বুকে ধরে আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কুতুব মিনারের লক্ষ্যে। লিপিকার কাছে কুতুব মিনার নতুন নয়। এর আগে পরিবারের সাথে যেবার এসেছিলো সেবার কুতুব মিনার, যন্তর-মন্তর, রেডফোর্ড দেখেছে। তরুলির কাছে কুতুব মিনার নতুন আর সে কারণেই কুতুব মিনারকে ঘিরে ওর মনে বইছে উত্তেজনার ঝড়। এতোদিন যে কুতুব মিনারের নাম শুধুই শুনেছে, বইয়ের পাতায় যে কুতুব মিনারকে পড়েছে আজ সেই কুতুব মিনারকে একবারে সামনে থেকে দেখবে! তরুলি অধীর সেই ক্ষণটির জন্য।

কুতুব মিনারের সামনে অটো থেকে নেমে ওরা যখন টিকিট কাউন্টারের দিকে এগুচ্ছিলো ঠিক তখন ওদের সামনে এসে দাঁড়ালো বছর ছাব্বিশ বয়সের এক তরুণ। ইংরেজিতে সে লিপিকাকে বললো, আমি কি আপনাদের কোনো সাহায্য করতে পারি? আই মিন গাইড হিসেবে।
এর জন্য আপনাকে কতো দিতে হবে? সরাসরি প্রশ্ন করে লিপিকা।
সে আপনাদের মর্জি। উত্তর দেয় তরুণ।

তরুলি লিপিকাকে বললো, নিয়ে নে ওকে। আমার আবার শুধু চোখের ক্ষুধা মিটলেই চলবে না, এর সাথে মনের ক্ষুধাটাও মেটাতে চাই। কুতুব মিনারকে ঘিরে আমার মনে অনেক প্রশ্ন আছে, দেখতে দেখতে ওর কাছ থেকে জেনে নেয়া যাবে সেসবের উত্তর। নিলোই না হয় ক’টা টাকা।
ঠিক আছে তুই যখন বলছিস…। এরপর লিপিকা তরুণকে প্রশ্ন করে, আপনার নাম কি?
কুলদিপ কৌর।
বাড়ি?
পাঞ্জাব।
ঠিক আছে আমাদের সাথে চলুন পাঞ্জাবী ভাই, দেখি গাইড হিসেবে আপনি কতোটা দক্ষ।
কুলদিপ যেনো লিপিকার কথায় লজ্জা পেলো।

জনপ্রতি দশ রুপি হিসেবে টিকিট কেটে ওরা কুতুব মিনার কম্পাউন্ডে প্রবেশ করলো। সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত নয়নাভিরাম উদ্যানকে দু’পাশে রেখে কিছুটা পথ এগুতেই চোখে পড়লো গৌরবোজ্জ্বল অহঙ্কারে উদ্ভাসিত কুতুব মিনারের দেহাবয়ব। তরুলির চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস ঝরে পড়লো। অনেকটা শিশুর মতোই সে ছুটে গেলো কুতুব মিনারের পাদ দেশে। বিমুগ্ধ অনুসন্ধানী চোখে তাকালো সে চূড়ার দিকে।

তরুলির ছেলেমিপনা দেখে বেশ মজা পায় লিপিকা। সে জানে ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি সব সময় তরুলি একটা প্রবল টান অনুভব করে। পুরনো স্থাপত্য তরুলির চিত্তকে নাড়া দেয় দারুণভাবে।

গাইড কুলদিপ তার দায়িত্ত্ব পালনপর্ব শুরু করে দিলো। সে বলতে শুরু করলো, কুতুব মিনার মুলত একটি বিজয়স্তম্ভ। ২৩৪ ফুট উচুঁ এই বিজয়স্তম্ভটি কুতুবউদ্দিন আইবক-এর ভারত বিজয়ের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শোনা যায়, অতীতের পৃথ্বীরাজের দূর্গ রায় পিথোরাতেই গড়ে উঠেছে এই মিনার।
লিপিকা ও তরুলি ঘুরে ফিরে দেখতে থাকে মিনারটি। ওদের সাথে তাল মিলিয়ে বলে চলে কুলদিপ, কুতুবউদ্দিন এই মিনারটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন ১২০০ সালে। এর ৩৬ বছর পর অর্থাৎ ১২৩৬ সালে তার জামাতা ইলতুৎমিস এটির কাজ শেষ করেন। তবে এ ব্যাপারে দ্বিমতও আছে।
তরুলির চোখ কুতুব মিনারের দেহে নিবদ্ধ থাকলেও পাশাপাশি বেশ মনোযোগের সাথে সে কুলদিপের কথাগুলোও শুনছে।
বলে চলে কুলদিপ, ১৪শ’ এবং ১৫শ’ শতকে মিনারটি সংস্কর হয়েছে। মিনারটির ভেতোরে রয়েছে ৩৬৭ ধাপের ঘোড়ানো সিঁড়ি।
ভেতোরে ঢুকে ঐ সিঁড়ি দেখা কিংবা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠা যায় না? কুলদিপকে প্রশ্ন করে তরুলি।
উত্তরে কুলদিপ বলে, আগে সিঁড়িটা দর্শণার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিলো। দর্শনার্থীরা মিনারের ভিতরে প্রবেশ করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে প্রথম তলা পর্যন্ত উঠতে পারতো। কিন্তু একবার সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে একটি কিশোরের মৃত্যু হলে মিনারের ভেতোরে ঢোকা বা সিঁড়ি ব্যবহার জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ করে দেন ভারত সরকার।
ডিজিটাল ক্যামেরাটা কুলদিপের হাতে ধরিয়ে দিয়ে লিপিকা ও তরুলি মিনারের সামনে দাঁড়ালো। লিপিকা রসিকতা করে কুলদিপকে বললো, ছবি টবি তুলতে পারেন তো?
গাইডদের এ কাজটি না পারলে কি চলে? উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে হাসে কুলদিপ।
তরুলি মুচকি হেসে বলে, রেডি হবার আগেই আবার যেনো শার্টার টিপে দিয়েন না।
চেষ্টা করবো আপনার কথাটা মনে রাখতে। কুলদিপের কন্ঠে রসিকতা।
বিভিন্ন এ্যাঙ্গেলে ওদের বেশ কিছু ছবি তুললো কুলদিপ। ছবি তোলা শেষ হলে ক্যামেরাটা লিপিকার হাতে তুলে দিয়ে সে আবার ফিরে গেলো তার বর্ণনায়, ভারতের অনন্য উচ্চতম স্থাপত্য এই কুতুব মিনারটিতে রয়েছে পাঁচটি তলা। প্রথম তিনটি তলা লাল বেলে পাথরে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম তলা নির্মিত হয়েছে মার্বেল ও বেলে পাথরে। প্রথম তলাটি কুতুবউদ্দিনের হাতে নির্মিত হলেও বাকি তলাগুলো তৈরী হয় জামাতা ইলতুৎমিসের হাতে। তবে ১৩৫১ থেকে ১৩৮৮ সালের মধ্যে সংস্কারের সময় মিনারের শিরে গম্বুজ গড়েন ফিরোজ শাহ কোটলা। একটু থেমে কুলদিপ বলে, ১৮০৩ সালে ভূমিকম্পের সময় গম্বুজটি বিধ্বস্থ হয়। এরপর বৃটিশ সরকার ১৮২৯ সালে গড়ে তোলে নতুন গম্বুজ। অবশ্য এর অনেক পরে সেটিকে মিনার থেকে নামিয়ে পাশে বাগানে রাখা হয়। এরপর কুলদিপ লিপিকা ও তরুলির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো, একটু লক্ষ্য করে দেখুন, কুতুব মিনারটি কিন্তু সামান্য হেলে আছে।
বলেন কী! আঁতকে ওঠে তরুলি, তার মানে ভেঙ্গে পড়তে পারে কুতুব মিনার?

তরুলির প্রশ্নের উত্তরে কুলদিপ বলে, সে শঙ্কা একেবারে হেসে উড়িয়ে দেয়া যায় না। অবশ্য এ নিয়ে নানা গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
কুতুব মিনার দেখার পর মিনারের ঢালুতে ওরা মসজিদ দেখলো। এরপর দেখলো চতুর্থ দশকের লৌহ মিনার। কুলদিপ জানালো, এই লৌহ মিনারটির উচ্চতা ২৪ ফুট। এটি যিনি তৈরি করেছেন তার নাম চন্দ্র ভার্মা। কুলদিপ ওদের নখে ইশারা করে বললো, দেখুন না, এর গায়ের সংস্কৃত উদ্ধৃতিটি আজও কতো স্পষ্ট!
লিপিকা ও তরুলি দেখলো, সত্যি শত শত বছর পরও লেখাগুলো বেশ পরিস্কার।
তরুলি বললো, সংস্কৃত ভাষা পড়তে পারলে পাঠ্যোদ্ধার সম্ভব হতো।
লিপিকা তরুলির কথা শুনে হেসে বললো, আগামীতে এখানে আসার আগে সংস্কৃত ভাষাটা ভালো করে শিখে আসবি, বুঝলি।
লিপিকা ও তরুলি যে ভাষায় কথা বলছে সেটা যে বাংলা তা জানে কুলদিপ। তবে সে বোঝে না ভাষাটা। ও জানে বাংলাদেশ ছাড়াও কলকাতার মানুষ এ ভাষাতেই কথা বলে। সেটা ভেবেই কুলদিপ লিপিকাকে প্রশ্ন করে, আপনারা কি কলকাতা থেকে এসেছেন, নাকি বাংলাদেশ?
আপনি বাংলাদেশকে জানেন? উল্টো প্রশ্ন করে লিপিকা।
জানি। কুলদিপ বলে, বাবার মুখে দেশটির অনেক কথা শুনেছি।
আপনার বাবা বাংলাদেশকে জানেন কিভাবে? জানতে চায় তরুলি।
কুলদিপ হেসে বলে, শুধু জানেন বললে ভুল বলা হবে; তিনি বাংলাদেশে গিয়েছিলেনও। এরপর কুলদিপ বলে, আমার বাবা ইন্ডিয়ান আর্মীতে ছিলেন। একাত্তর সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষভাগে তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন যৌথ বাহিনীর সদস্য হয়ে। তোমাদের দেশের মহান পুরুষ শেখ মুজিবুর রহমানের কথা বাবা প্রায়ই বলেন। বাবা বলেন. বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে মুজিব যে কতো বড় জায়গা করে নিয়েছিলেন সে কথা ভাবলে অবাক হতে হয়। তাঁর একটি মাত্র নির্দেশে সে দেশের কোটি কোটি মানুষ দেশটিকে শত্রুমুক্ত করার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। পৃথিবীতে এ এক বিরল ঘটনা। তবে বাবার দুঃখ, তিনি শেখ মুজিবকে চোখে দেখেননি। কেননা তখন শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। একটু থেমে কুলদিপ বলে, বাবা আরো বলেন, বাংলাদেশ নাকি খুব সুন্দর একটি দেশ।
কুলদিপের কথাগুলো লিপিকা ও তরুলির কানে যেনো মধু বর্ষণ করে। দেশের বাইরে এসে কোনো বিদেশীর মুখে নিজের দেশের প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে।
তরুলি বললো, সত্যিই আমাদের দেশটা খুব সুন্দর। একেবারে ছবির মতো।
কুলদিপ তরুলির কথা কানে না তুলে বেদনাভরা কন্ঠে বলে, তবে একটা কথা কি জানেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে বাবার সেই আগের ফিলিংসটা এখন আর নেই।
কেনো? জানতে চায় লিপিকা।
লিপিকার প্রশ্নের উত্তরে কুলদিপ বেশ ভারি কন্ঠে বলে, স্বাধীনতার মাত্র বছর চারেকের মাথায় মহান নেতা শেখ মুজিবকে হত্যার খবরে বাবা খুব কষ্ট পেয়েছেন। তাঁর এ কষ্ট যেনো অমোচনীয়। বাবা আজও এই ভেবে বিস্মিত হন, যে মানুষটি একটি জাতিকে শৃঙ্খলমুক্ত করলেন, স্বাধীনতা এনে দিলেন, তাঁকেই কি না স্বাধীন দেশের মাটিতে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করা হলো! সেও স্বাধীনতা লাভের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে! একটু থেমে কুলদিপ বলে, বাবা বলেন, জাতির পিতাকে হত্যা করে বাংলাদেশ অভিশপ্ত হয়েছে, এর মূল্য তাদেরকে কঠিনভাবে দিতে হবে।- কথাগুলো বলতে বলতে কুলদিপ নিজেই যেনো আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলো। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে সে বিনয়ের সাথে বলে উঠলো, প্লিজ, কিছু মনে করবেন না, কথাগুলো আমার বাবার আহত হৃদয়ের উচ্চারণ কিনা তাই…..
তরুলি ও লিপিকা অবাক হয়ে যায় ওদের জাতির পিতার প্রতি এক পাঞ্জাবী সৈনিকের অগাধ ভক্তি-শ্রদ্ধার কথা শুনে। কী প্রগাঢ় ভালোবাসা!
এ সময় ঝট করে কুলদিপ প্রশ্ন করে বসে, একটা কথা সত্যি করে বলুন তো, বাংলাদেশ কি আজ ভালো আছে? বাংলাদেশের জনগণ কি এখন সুখে আছে? আমাদের দেশের পত্রিকায় মাঝে মাঝে বাংলাদেশের যেসব খবর ছাপা হয় তা পড়ে মনে হয় না যে বাংলাদেশে আজ শান্তি আছে। একটু ভেবে কুলদিপ বলে, আমার ধারণা আপনাদের দেশে দিনে দিনে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি মাখা চাড়া দিয়ে উঠছে।
কুলদিপের কথা শুনে তরুলি ও লিপিকা অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কুলদিপ বলে, কিছু মনে করবেন না; অনেক কথা বলে ফেললাম। জানি না এভাবে বলাটা কতোটুকু ঠিক হলো। আসলে বাবার মুখে শুনে শুনেই বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার মনে একটা আলাদা আগ্রহ তৈরী হয়েছে।
রাজনীতি নিয়ে লিপিকা বা তরুলির কোনো আগ্রহ কখনোই ছিলো না। মুক্তিযুদ্ধই শুধু নয়, জাতির পিতা শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডেরও পাঁচ সাত বছর পর ওদের জন্ম। আর জন্মের পর থেকেই বলতে গেলে বেড়ে উঠেছে রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে। যার কারণে এড়িয়ে চলেছে রাজনীতিকে। তবে বাবা-মা, বা মুরুব্বীদের মুখে ওরা মুক্তিযুদ্ধের অনেক কথা, অনেক কাহিনী শুনেছে। তরুলি ওর বাবার মুখে শুনেছে বাংলাদেশের জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মত্যাগের অনেক কাহিনী। তবে আজকের বাস্তবতা ভীন্ন। অতীতে যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, স্বাধীনতার সেইসব শত্রু এবং তাদের দোসররা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেই শুধু থেমে থাকেনি, পাশাপাশি তারা এই মহান নেতাকে বিতর্কে টেনে এনে দিনে দিনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখন রাজাকার আর স্বৈরাচারীদের সুদিন, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ অবহেলিত আর মুক্তিযোদ্ধরা উপেক্ষিত। তরুলি নিজেও একজন মুক্তিযোদ্ধা বাবার সন্তান। মুক্তিযুদ্ধ করেছে বলে ওর বাবার যেমন আছে অহঙ্কার, তেমনি আছে আক্ষেপ আর ক্ষোভ। তরুলির মনে পড়ে, একদিন ওর বাবা ফিরোজ আহমেদ কষ্টে, ক্ষোভে বলছিলেন, ‘দেশের স্বাধীনতা এনেছি আমরা মুক্তযোদ্ধারা কঠিন সংগ্রাম করে; জীবন বাজি রেখে অথচ এই স্বাধীন দেশে রাজাকাররা পায় মন্ত্রিত্বের স্বাদ! মরে যেতে ইচ্ছে হয়।’
বাবার কষ্টটা মর্মে মর্মে অনুভব করলেও এই কষ্ট লাগঘের সাধ্য তরুলির নেই। আর তাই সব দেখে শুনেও নীরব থাকতো ও। কিন্তু আজ বিদেশের মাটিতে এক পাঞ্জাবী তরুণের মুখে তার বাবার উচ্চারণ ওর মনকে দারুণভাবে নাড়া দেয়। অন্যদিকে লিপিকার ক্ষেত্রেও তেমনটিই ঘটলো। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আজ নতুন করে নিবিড়ভাবে অনুভব করে লিপিকা ও তরুলি।

এখন কুলদিপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে ওদের ভীষণ লজ্জা হচ্ছে। কুলদিপের চোখ দুটো যেনো ওদের প্রশ্ন করছে, তোমরা কী করে মেনে নিচ্ছো তোমাদের স্বাধীনতার শত্রুদের অশুভ দাপট? তোমাদের শক্তি-সাহস কি লুপ্ত হয়েছে?
ওদের ভাবনার জাল ছিন্ন করে দিয়ে কুলদিপ বলে ওঠে, চলুন এবার আলাই মিনার-এ যাওয়া যাক।
কুতুব মিনার থেকে আলাই মিনারের দূরত্ব বেশী নয়। আলাই মিনারের পাশে দাঁড়িয়ে কুলদিপ বললো, সম্রাট আলাউদ্দিনের স্বপ্ন ছিলো কুতুব মিনারের চাইতে দ্বিগুণ উচ্চতার আর একটি মিনার নির্মাণ করবেন তিনি। কাজও শুরু করেছিলেন সে লক্ষ্যে। কিন্তু মাত্র ২৭ মিটার গড়ে তোলার পর সম্রাট আলাউদ্দিনের মৃত্যু হলে আলাই মিনারের নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে যোগ্য উত্তরসূরীর অভাবে প্রয়াত সম্রাটের স্বপ্নের আলাই মিনার অসমাপ্তই থেকে যায়।
তরুলি আর লিপিকা ঘুরে ঘুরে আলাই মিনার দেখতে থাকে। তরুলির মন জুড়ে নানা প্রশ্নের ঝড়। এক সময় হঠাৎ করেই সে লিপিকার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে, সম্রাট আলাউদ্দিনের এই আলাই মিনারের সাথে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের বাংলাদেশের একটা মিল খুঁজে পেলাম।
কেমন? প্রশ্ন করে লিপিকা।
তরুলি বলে, সম্রাট আলাউদ্দিনের স্বপ্নের আলাই মিনার ২৭ মিটারেই থেমে গেছে যোগ্য উত্তরসূরীর অভাবে; আর জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ থমকে গেছে স্বাধীনতা লাভের চার বছরের মাথায় তাঁকে হত্যার পর….
তরুলির কথা শেষ হতে না হতেই লিপিকা বলে ওঠে, তুই একেবারে ঠিক বলেছিস। এরপর লিপিকা কঠিন দৃঢ় কন্ঠে বলে, আচ্ছা তরুলি, আমরা কি পারি না জাতির পিতার যোগ্য উত্তরসূরী হয়ে তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্নকে সফল করতে? আমরা কি পারি না আমাদের প্রজন্ম একে অপরের হাত ধরে স্বাধীনতার শত্রু রাজাকার, আলবদর ও তাদের দোসরদের সমুচিত শিক্ষা দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার মিনারটাকে আকাশ ছোঁয়াতে?
লিপিকার কথায় তরুলির মুখটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। সে কঠিন হাতে লিপিকার হাত চেপে ধরে।
ওদের চোখে-মুখে এখন গড়ে তোলার স্বপ্ন।
কুলদিপ বললো, এবার চলুন কুয়াৎ-উল ইসলাম মসজিদ দেখা যাক। কুতুবউদ্দিন আইবক ১১৯৩ সালে এই মসজিদ হিন্দু মন্দিরের ওপর গড়ে তোলেন……..।


সম্রাট আলাউদ্দিনের স্বপ্নের আলাই মিনার ২৭ মিটারেই থেমে গেছে যোগ্য উত্তরসূরীর অভাবে; আর জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ থমকে গেছে স্বাধীনতা লাভের চার বছরের মাথায় তাঁকে হত্যার পর….

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


7 Responses to বিজয়ের গল্প: নতুন স্বপ্ন শুরু

  1. snmhoque@yahoo.com'
    আজিজুল সেপ্টেম্বর 18, 2010 at 2:47 পূর্বাহ্ন

    বেশ ভালো লাগলো। খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ছিলাম। আমার অভ্যাসে যা নেই-তা করলাম একবার-তাহোল- সম্পূন' বন'নায়(গল্প বলবো না) একটা লাইনে অস্নগতি-

    "তোমাদের দেশের মহান পুরুষ শেখ মুজিবুর রহমানের কথা বাবা প্রায়ই বলেন"
    সম্ভবত এখানে তোমাদের জায়গায় 'আপনাদের' হবে।
    যাহোক, ভিন্ন প্রেক্ষিতে দেশপ্রেম ফুটিয়ে তুলেছেন বেশ।
    আবারো শুভেচ্ছা। :rose:

  2. অজ্ঞাতনামা কেউ একজন সেপ্টেম্বর 18, 2010 at 4:40 পূর্বাহ্ন

    অসম্ভব ভালো লিখেছেন ভাইয়া। এরকম লেখা আরো চাই :yes: :yes: :yes: :yes:

  3. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী সেপ্টেম্বর 18, 2010 at 5:12 অপরাহ্ন

    শৈলীতে স্বাগতম। :rose: :rose:

  4. bonhishikha2r@yahoo.com'
    বহ্নিশিখা সেপ্টেম্বর 20, 2010 at 6:15 পূর্বাহ্ন

    পড়লাম। ভালো লাগলো।

  5. রাজন্য রুহানি এপ্রিল 20, 2011 at 5:25 পূর্বাহ্ন

    এক্সক্লুসিভ শুভেচ্ছা।
    :rose:

  6. mamunma@gmail.com'
    মামুন ম. আজিজ এপ্রিল 20, 2011 at 11:24 পূর্বাহ্ন

    আমাকে দিল্লীতে গাইড বলেছিল, কুতব মিনার থেকে এক মেয়ে আত্মহত্যা করেছিল বলে এখন ওঠা মানা।

  7. নীল নক্ষত্র এপ্রিল 20, 2011 at 2:59 অপরাহ্ন

    গল্পের ছলে বেশ সুন্দর পরিপাটি করে দেশ প্রেম এসেছে। ভাল লাগবেই। তবে একটা আফসোস করার সময় এসে গেছে মনে হয়।
    যে গল্প ১৮৪৭ বার পড়া হয়েছে বা অন্তত ক্লিক করা হয়েছে তাতে মাত্র ৬টি মন্তব্য!!! এ নিয়ে কি গবেষণার প্রয়োজন আছে বলে মনে করা যেতে পারে??????

You must be logged in to post a comment Login