ফয়সল-অভি

গদ্য “আমি আমার মাকে দেখতে চাই”

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

আমি আমার মাকে দেখতে চাই
ফয়সল অভি
চট্টগ্রাম
২৩-০৮-১০

শৈশবে জেনেছিলাম; মাটি দিয়ে গড়া মাটি’র মানুষ । মাটিতেই জন্ম তারপর তার বুকে হেঁটে হেঁটে বড় হওয়া, বড় হলে মাটি’র খাজনা চাষ দিয়ে স্বপ্নের পিঠে ডানা গজিয়ে দেশকে সবুজ রাখা । সবুজ গাঢ় হতে হতে সবুজ হয়ে গিয়ে মাটিতে মিশে যাওয়া । এমনটাই তো কথা ছিলো?

যে কথা দিয়ে পৃথিবীতে এনেছিল জন্মদাতা সেই কথার ভাঙ্গনে চর হলো -তাতেই বুঝে গেলাম সময়ের হাত, পা ও মাথা আছে আর সুযোগে ধারালো অস্ত্রও আছে । কথাটা মৃত হলে এখানে কারো দায় নেই শুধুই অন্তর থেকে পৃষ্ঠা খুলে কথা পড়া ।

আমি তো এমনটা চাইনি । আমিও কবিতা লিখতে চেয়েছি-পাতা আর ফুলে মৌমাছির সাইকেল চালানোয় । নদী পাড় আর পিচ রাস্তায় আমার পাও ভিজবে-আমাদের অনুভবের গভীর নিমগ্নতায় । সভ্যতা পরিবর্তনের মাঝমাঝি দাঁড়িয়ে সত্তার দ্বিখণ্ডিত রূপ বড় তীরবিদ্ধ রক্ত ক্ষরণ-প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয় । নগরে আমি নাগরিক হয়েছি-আমাকে দিয়েছে অধিকার নামে কিছু লোম-যেগুলো শিহরণে দাঁড়িয়ে থেকে জানিয়ে দেয় আমি নাগরিক-দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে দেয়ালকে কাঁধে নিয়েই পিছু হেঁটেছি-পায়ের অনুগত্য আর ভোর হয়েছে বৈরাগী । নগর শুধু নাগরিক প্রসব করেছে-মানুষের মাঝে কোন প্রাণ দেয়নি ।

এখানে ভীষণ ভীড় যেন পিঁপড়ের লাইনচ্যুত সমাজ । কাতর হলেও কাঁদা
যায় না, কান্নার জন্য প্রয়োজন বৃষ্টির আড়াল । সে আড়াল এখন আর পৌছে না নাগরিক দ্বারে, কি অদ্ভুত আমার কোন দাওয়া নেই । যেখানে থৈ থৈ কাঁদায় পায়ের কলঙ্ক এঁকে দিবো চৈত্রে বর্ষার সাক্ষী ।

সবকিছু দূরে সরে গেছে । ঋতুর আগমন ছাদে গিয়ে ঠেকে, কংক্রিট পার করে দেয়ালে ঝুলন্ত ক্যানভাসে চোখ রেখে বলি:- “এক সময় বৃষ্টিতে ভীষণ
ভিজতাম আর ঠাণ্ডা আমাকে ধরলে মা বকতো, কচুর চোখ বন্ধ হলে আমাদের উনুনে দাউ দাউ ধোঁয়া হতো” । শ্রাবণের ধারা আজ কোথাও নেই । না বুকে-না আকাশে সর্বত্র ক্ষরণ, এক নিদারুণ ক্ষরণ ।

এই নগরে বৃষ্টি হয় না-হয় আকাশের ধৌতকরণ । যে জল কর্পোরেট ছাতা গলে বাইলে পড়ে-প্রমাণ দিয়ে যায় এখন উন্নয়নের সময় রাস্তায়, বিদুতের ট্রান্সফরমারে, তিন পায়ের রিকশায়, সচিবালয়ের মেইন গেটে আর মাটির দম আটকে জলাবদ্ধতায় ।

বদলে বদলও বদলায় । কেউ শব্দ কিনে নিলেও রূপ কিনে না-বৃষ্টির রূপও বিকিয়েছে প্রাইম টাইমের কর্পোরেট নাটকে । মাটির কি দোষ?? আগে শুষে নিতো জল এখন নগরের পাপ নিতে চায় না । বুড়িগঙ্গাও বলি হতে হতে এখন ধর্ম হয়ে গিয়েছে-আমি তাতে ইমান এসেছি তবে তাতে কোন লেভেল লাগেনি তাই আজও তাকে ঘিরে আন্দোলন হয় । বৃষ্টির কি দোষ?? বৃষ্টিরও শেষ আছে বুড়িগঙ্গায় মিশতে মিশতে বৃষ্টি হারিয়েছে ইমান তাই খাল খেটে প্রকল্প আনে । বলো বৃষ্টির কি দোষ ।

আগামীর দোষ । আগামীর যত ক্ষয় । আগামী যেন এক জন্মান্ধ-সকল কিছু দৃশ্যত দৃশ্যায়িত কল্পনা । সবুজ থেকে নদীর বেহুলা বাঁশি কিংবা ষড়ঋতুর যত লাললিক মন-সব হবে শব্দে, ইথারে আর নারীর বুকে কান পেতে । নারী সামগ্র্যই প্রকৃতির দ্বিতীয় রূপ । তবে কি নারীতেই থেকে যাবে অনুভূতির বন্ধ্যাত্ব?

হয়ত………………………..জানি না । সভ্যতার অনিকেত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে বোধগুলো শব্দে প্রসব করছি । কেউ হয়ত জানে না সত্তার বিখণ্ডকরণে এক মানবিক যন্ত্রনায়-শ্রাবণও রূপ নেয় নতুন কোন রূপের গঠনশৈলীতে । শ্রাবণের সত্ত্ব কিনে নেয়নি বাংলাদেশ তাই উন্নত বিশ্বের অহরহ চলাচলে ও উন্নতে-বিক্ষত হয়েছে আমাদের আকাশ । সেখানে আমার আকাশ ছিল ছোট্ট-মাকে নিয়ে । সেটাও গেলো দূষণের থাবার আয়ু যেন সবার সাথে গোসসা করেছে । এই নগরে শ্রাবণকে কেউ চেনে না । উন্নয়ন কতৃপক্ষের এক ব্যস্ত সময়ই আজ এর নামকরণ । কদমগুলো মাছের বিনোদন যে শপিংমল ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বড় বড় মাছদের অভিবাদন জানায় । এখন সর্বত্র সংবিধিবদ্ধ সর্তকীকরণ, “সহবাস হবে শুধু ফ্ল্যাটে, কর্পোরেট ফ্ল্যাটে শরীর হবে সিঁড়ি, পেশা ধাবিত হয়েছে সিঁড়িতে” । তাই কবিরা আর মহৎ কবিতা লিখতে পারে না-সমাজও বিপ্লবে রুখে দাঁড়ায় না । শ্রাবণের ভেতরে পাপ-অসচ্ছ জল কখনও আয়না হয় না । আবারও নবীর প্রয়োজন-একজন মহা পুরুষ । আরেকটা কুরআন চাই আমার বাংলাদেশের জন্য-যেখানের লালের কোন বিভক্তি নেই-ক্ষুধার জন্য সত্তার কর্পোরেট বানিজ্য নেই-আমার মা শুধুই মা হয়ে থাকে শাড়িতে, ঘোমটায়-সকল আশ্রম হবে থিয়েটার-আশ্রমবাসী চলে যাবে যেখানে তাদের অধিকার । মানুষ বদলাক আলোতে-আঁধার গাঢ় হলে পরিবর্তন নয় । সকল বদল হোক বুকের বা’পাশে-যেটা মুখোমুখি থাকে নিজের সাথে নিজে ।

পৃথিবীতে আবার শ্রাবণ হোক আকাশে-মানুষের বুকে বুকে । কাঁদতে কাঁদতে বাংলাদেশীরা জানুক-অনুভূতি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ । রক্তের খাদ্য নিয়ে নিঃশ্বাস নিতে নিতে কোষগুলো শুধু বেড়ে যায়-মানুষ হয় না । আমাদের মানুষ হতে হবে সকল মানবিকতায় তাই বৃষ্টি হোক, ঝরে পড়ুক সকল অন্যায় চক্র । ভেসে যাক-বয়ে যাক যে নীল নিয়ে নাগরিক । নগরের রঙ হোক শুভ্র-আমি আমার মায়ের হাসি দেখতে চাই যে মা আমার গর্ভধারিণীকে প্রসব করেছে ।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


7 Responses to গদ্য “আমি আমার মাকে দেখতে চাই”

  1. imrul.kaes@ovi.com'
    শৈবাল ডিসেম্বর 4, 2010 at 1:37 অপরাহ্ন

    আপনার বেশ কিছু লেখা আগেও পড়েছি , বলার সুযোগ পাইনি ; আমার চোখ অনেকদিকে গেলেও মুখটা শুধু শৈলীইতে খুলতে পারি । প্রথমে ভাল লাগাটা বলি আপনার প্রায় লেখায় দেশমাতৃকার কথা থাকে , আপনার এই ধ্যানে , প্রণাম জানাই । আরেকটা কথা বলি কিছু শব্দ খুব বেশি ধ্বনিত হয় আপনার লেখায় ,যেমন শুনি “কর্পোরেট “, এটা কেন ?

    • faysal.ovi@gmail.com'
      ফয়সল-অভি ডিসেম্বর 4, 2010 at 3:07 অপরাহ্ন

      নগর, কর্পোরেট ও মা এবং জমিন এই চারটা শব্দের প্রতি আমার একটা হৃদয়গত টান আছে কারণ এই চারটা শব্দের আঘাতে নিয়তই জর্জরিত হই । আপনি ধৈর্য্য ধরে লেখাটা পড়েছেন তাই অন্তরিক ধন্যবাদ রইল ।

  2. sohelshahed2008@gmail.com'
    এস. এম. তাহমিদুর রহমান ডিসেম্বর 4, 2010 at 1:43 অপরাহ্ন

    শুভেচ্ছা অভিদা।

  3. faysal.ovi@gmail.com'
    ফয়সল-অভি ডিসেম্বর 5, 2010 at 6:55 পূর্বাহ্ন

    অন্তরিক ধন্যবাদ রইল

  4. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী ডিসেম্বর 8, 2010 at 8:51 অপরাহ্ন

    খুব ভালো লিখেছেন। কিন্তু আবার নবি কেন? আমরাই তো একেকজন বনি ইস্রাইলের নবিদের সমতুল্য মর্যাদাবান। আর সে কারনেই নবি মানসিকতার নবিতুল্য মানুষের দাপাদাপিতে নাব্যতা হারিয়েছে মানবতা। তাই সবাই সিঁড়িতেই অবস্থান করতে চায়, পুরোনো সিঁড়ি ছেড়ে নতুন সিঁড়ির অন্বেষায় চুটছে দিগ্বিদিক!

You must be logged in to post a comment Login