মুরাদুল ইসলাম

একজন এথিস্ট

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

পাকা মেঝেতে এলুমিনিয়ামের জিনিস টেনে নিলে যে ক্যাচক্যাচ শব্দ হয় তা আমার কানের মধ্য দিয়ে ঢুকে সোজা মগজে গিয়ে আঘাত করে ।মনে হয় ক্যাচক্যাচানি শব্দ বায়ুকনায় স্পন্দিত হয়ে অসীম আক্রোশে পূর্বজন্মের আজন্ম লালিত কোন প্রতিশোধ নেবার জন্য মস্তিষ্কে ঢুকতে চাইছে।তেড়েফোঁড়ে আসছে মাথার মধ্যে ঢুকে মস্তিষ্ককে আচঁড়ে আচঁড়ে ছিঁড়ে খাবার জন্য।
সালাম সাহেবের কথাটাও আমার কাছে ঠিক তেমন লাগল।
আমি একজন এথিস্ট।
-আপনি এথিস্টের বাঙ্গলা জানেন?
-জানব না কেন? এই ধরেন গিয়ে নাস্তিক।আমি একজন নাস্তিক।
আমি অবাক হয়ে সালাম সাহেবের দিকে তাকালাম।তার চোখে কৌতুকের লেশমাত্র নেই।মুখের মধ্যে বিন্দু বিন্দু ঘাম,লোমকূপের আড়াল থেকে মুক্তি পেয়ে ছোট ছোট পানিকনার আকার ধারন করেছে।সালাম সাহেবের চোখেমুখে এক ধরনের অদ্ভুত সারল্য কিন্তু উত্তেজনার ছাপ স্পষ্ট।তিনি যেন বন্দি ছিলেন,কথাটি বলে মুক্তি পেয়েছেন এরকম হাবভাব।
আমি দৃষ্টি কঠিন করে বললাম,এসব কথা অফিসে না বলাই ভাল।আপনি আপনার কাজ করেন।
সালাম সাহেব আমার চোখে চোখ রেখে বললেন,আপনি জানেন মাদার তেরেসাও শেষ বয়সে বলেছিলেন i feel that terrible pain of loss,of God not wanting me,of god not being god,of god not really existing?এক নিশ্বাসে কথাগুলো বললেন।লক্ষ করলাম উত্তেজনায় সালাম সাহেবের নাক কাঁপছে।
আমি কিছুটা বিরক্ত হলাম।সালাম সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।আমি বললাম, ভাই এসব কথা রাখেন।বস শুনলে ভাববেন আপনার মাথা বিগড়ে গেছে।যান ঠান্ডা মাথায় গিয়ে কাজ করেন।
এরপর সালাম সাহেব আর কোন কথা বললেন না।ঠান্ডা চোখে আমার দিকে চেয়ে উঠে গেলেন।তার চলে যাওয়া দেখে আমার একবার মনে হল হঠাত কি এমন হল যে সালাম সাহেব এমন কথা বলছেন।আমি যতদূর জানি তিনি একলা মানুষ ।একাই একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন।দুনিয়ার সর্বপ্রকার ঝামেলা এড়িয়ে চলেন।কাজের প্রচন্ড চাপের মধ্যে এমন ভাবনা একবার আমার মাথায় এল।তবে তা ক্ষনিকের জন্য।খানিকক্ষন পর তা মিলিয়েও গেল।

পরদিন অফিসের কাজে চিটাগাং গিয়ে তিনদিন থাকতে হয়।তিনদিন পর ফিরে এসে প্রথম সংবাদটা পাই।সালাম সাহেব হাসপাতালে আছেন।তিনি মারাত্বক রকমের অসুস্থ।যখন তখন অবস্থা।অফিসে পৌছেই তাই হাসপাতালের দিকে ছুটতে হল।সালাম সাহেব আমার দীর্ঘদিনের কলিগ।প্রায় ৮ বছর তো হবেই।তবে বয়সে আমার চেয়ে কয়েকবছরের বড়ই হবেন।চামড়ায় ভাজ পড়েছিল।কিন্তু তা সত্ত্বেও ভদ্রলোককে দেখতে শক্তসমর্থই মনে হত।
প্রায় ৪৫ মিনিট রাস্তায় কাটানোর পর হাসইপাতালে পৌছলাম।ফিনাইলের গন্ধ আমি কোনদিনই সহ্য করতে পারি না।হাসপাতালে ঢুকতেই গন্ধটা নাকে এসে ধাক্কা দিল।আমি যখন সালাম সাহেবের ওয়ার্ড রুমে পৌছলাম দেখি তিনি সাদা বেডে শুয়ে আছেন।সমস্ত মুখ অসম্ভব রকম ফ্যাকাসে হয়ে আছে।
ডাক্তারের কাছ থেকে শুনলাম সালাম সাহেব লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত।অবস্থা সত্যিই খুব খারাপ।আজকের দিন ঠিকবে কিনা বোঝা যাচ্ছে না।
আমি গিয়ে সালাম সাহেবের পাশে বসলাম।আমাকে দেখেই তিনি মুখ খুললেন।কি যেন বলতে চেষ্টা করলেন।তার মুখে জড়তা চলে এসেছিল তাই কিছুই বুঝতে পারলাম না।তার চোখ দিয়ে আস্তে আস্তে অশ্রুর ধারা নামছে দেখতে পেলাম।আমার চোখ ও ভিজে উঠছিল।ডাক্তাররা আমাকে সরিয়ে কি সব পরীক্ষা করতে লেগে গেলেন।
এর প্রায় মিনিট বিশেক পর সালাম সাহেব মারা গেলেন।
আমি হাসপাতালের বারান্দায় একটা বেঞ্চে বসে পড়লাম।সালাম সাহেবের মৃত্যু আরো কয়েকটা অতীতে দেখা মৃত্যুর স্মৃতিকে সামনে নিয়ে এসেছিল।মনের অজান্তেই এসব নিয়ে ভাবছিলাম।তখন ডাক্তার এসে বললেন, রোগী মৃত্যুর আগে তার কিডনী সুলেমান নামের একজনকে দান করে গেছেন।যখন একটু সুস্থ ছিলেন তখন বলেছিলেন আপনি যদি তার মৃত্যুর পর আসেন তবে বলতে।
সালাম সাহেবের মৃত্যুতে আমার ভিতরে তোলপাড় হচ্ছিল।তাই সুলেমান নামটা প্রথমে চিনতে একটু সময় লাগল।আমাদের অফিসের আয়ার একমাত্র ছেলে।ক্লাস টেনে পড়ার সময় হটাত ধরা পড়ল দুটা কিডনিই নষ্ট।পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে একবার আমরা টাকা উঠানোর চেষ্টা করেছিলাম।সেখানে সালাম সাহেব ও ছিলেন।
আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম।সালাম সাহেব তার রোগের কথা কাউকে বলেন নি।আজ মৃত্যুর পর আরেকটা জীবনকে বাচিঁয়ে গেলেন।সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে এসেছে।আমি রাস্তায় নেমে এসেছি।ট্রাফিকের হুইসেল, গাড়ির হর্নের শব্দে ব্যস্ততম সড়ক।তার মধ্যে শান্ত আমি।আজ কোন ব্যস্ততা আমাকে স্পর্শ করতে পারল না।আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম নীল আকাশে সাদা মেঘ ভাসছে।অবচেতন মনেই হঠাৎ বলে উঠলাম, আল্লাহ তুমি লোকটাকে তার প্রাপ্য দিও।
“ভাইজান আমারে কিছু জিগান নেহি?” রাস্তার পাশের চা বিক্রেতার এই প্রশ্নে আমার ঘোর ভাঙ্গে।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


9 Responses to একজন এথিস্ট

  1. sumhani@gmail.com'
    সুমাইয়া হানি ডিসেম্বর 25, 2010 at 5:55 পূর্বাহ্ন

    ভালো লাগলো।

  2. rabeyarobbani@yahoo.com'
    রাবেয়া রব্বানি ডিসেম্বর 25, 2010 at 7:37 পূর্বাহ্ন

    সাবলিল গতি আর খানিক কথা শৈলীতে গল্পটাতে প্রান এসেছে । শৈলীতে স্বাগতম ।

  3. imrul.kaes@ovi.com'
    শৈবাল ডিসেম্বর 25, 2010 at 12:51 অপরাহ্ন

    সহজেই মনে কঠোর ভাবে ধরলো সরল সুন্দর গল্পটা , শুভেচ্ছা এবং স্বাগতম !

  4. muradt20@gmail.com'
    মুরাদুল ইসলাম ডিসেম্বর 25, 2010 at 4:26 অপরাহ্ন

    হুম।
    মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ ।

  5. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী ডিসেম্বর 26, 2010 at 6:08 অপরাহ্ন

    আরো কিছু গল্প ছাড়েন তো দেখি। তারপর না হয় ভাব নিয়ে কিছু বলা যাবে।

You must be logged in to post a comment Login

hi header add 5
hi header add 6
hi header add 7