সেই দিনের প্রতিক্ষায়………………………………………. আছি আমি এবং হয়ত আপনিও।

Filed under: এলোমেলো |

২৫ শে মে,১৯৭১।মঙ্গলবার। সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে।এমন সময় শোনা গেল বাজারে পাকিস্তানি মিলিটারি এসেছে। চারিদিকে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। স্থানীয় চেয়ারম্যান ইজ্জত আলী সবাইকে জানিয়ে দিলেন ভয় পাওয়ার কিছু নাই।পাকিস্তানিরা ভাল উদ্দেশ্যে এসেছে।ওদের মনে কোন খারাপ উদ্দেশ্য নেই।
ঘটনাটা ঘটল সিলেটের ওসমানীনগরের বুরুঙ্গায়। ওইদিন বিকেল চারটার দিকে ইজ্জত আলী জানিয়ে দিলেন আগামীকাল বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ে শান্তি কমিটির মিটিং হবে।সবাই যেন উপস্থিত থাকে। শান্তি কার্ড দেয়া হবে।প্রতিটা গ্রামে জানিয়ে দেয়া হল এ ঘোষনা।

পরদিন সকাল ৮ টা।বুরুঙ্গা স্কুল মাঠে সহস্রাধীক মানুষ বুকে মৃত্যুভয় নিয়ে ছোটে এসেছেন।ক্যাপ্টেন নুর উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল পাকিস্তানি সেনা আসে সকাল ৯ টার দিকে।তালিকা দেখে সবার উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।তারপর ১০ টার দিকে পাক সেনারা মিটিংযের কথা বলে হিন্দু মুসলমানদের আলাদা করে।মুসলমান প্রত্যেককে চার কালেমা পড়ে মুসলমানির প্রমান দিতে হয়।তারপর তাদের দক্ষিন দিকের একটা ক্লাস রুমে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। আর হিন্দুদের নিয়ে যাওয়া হয় অফিস কক্ষে।

কিছুক্ষন পর ১০-১২ জন মুসলমানকে রেখে বাকীদের বলা হয় “নারায়ে তকবির,আল্লাহু আকবার, পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলতে বলতে মাঠ ছেড়ে চলে যেতে।তারপর মুসলমান ১০-১২ জনকে বলা হয় ৪ জন করে হিন্দুদের আলাদা করে বাধঁতে। তখন গ্রামের প্রাক্তন চেয়ারম্যান বাদশা মিয়া বলেনঃ এটাতো ইসলামের বিধান না।হিন্দুদের এখানে দাওয়াত দিয়ে আনা হয়েছে।দাওয়াত দিয়ে এনে রশি দিয়ে বাধা কি ঠীক?
উত্তরে গর্জে উঠে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন নুর উদ্দিন। চুপ হয়ে যান বাদশা মিয়া।

তারপরের ঘটনা অতি সংক্ষিপ্ত।।তখন অত্যন্ত সাহসের একটি কাজ করেন নিবাস চক্রবর্তী নামে একজন স্কুল শিক্ষক।তিনি যে ঘরে হিন্দুদের বন্দি করে রাখা হয়েছিল ঐ ঘরের জানালা খুলে দেন।তাতে কোনক্রমে প্রীতি রঞ্জন চৌধরী ও রানু মলাকার নামের দুইজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। হিংস্র নুর উদ্দিন রাগে উন্মত্ত হয়ে সবাইকে লাইনে দাড় করায়।সামনের দিকে তিনটা এলএমজি তাক করা।হঠাত হাত দিয়ে ইশারা করে নুর উদ্দিন।গর্জে উঠে এলএমজি গুলো। ঝরে যায় কতগুলো তাজা প্রান। রক্তে লাল হয়ে যায় বুরুঙ্গা স্কুল মাঠ প্রাঙ্গন। গুলি করে পাক সেনারা চলে যাচ্ছিল। এমন সময় লাইনে দাঁড়ানো বেচেঁ যাওয়া কয়েকজন, ‘হরি হরি,রাম রাম’ বলে প্রান বাচানোর জন্য সৃষ্টিকর্তাকে হয়ত ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন। কিন্তু এই রাম নামই কাল হয়ে উঠে তাদের জন্য।পাক সেনারা ফিরে এসে বাজার থেকে ২টিন কেরোসিন এনে জ্বালিয়ে দেয় ৭১ টি দেহ।
এতক্ষন ধরে সিলেটের জজ কোর্টের প্রভাবশালী উকিল রাম রঞ্জন চৌধরীকে চেয়ারের সাথে বেধেঁ রাখা হয়েছিল।চোখের সামনে পরিচিত জনদের নির্মম নিষ্টুর মৃত্যূ দেখে তিনি আতকে উঠেছিলেন ভয়ে। অবধারিত মৃত্যু ভয় আচ্ছন্ন করে রেখেছিল তার সমস্ত সত্তাকে। নুর উদ্দিন তাকে এসে বলে আপনি বাসায় চলে যান।

বাধঁন খুলে দেয়া হয়।রাম রঞ্জন চৌধরী যন্ত্রের মত উঠে একটু যেতেই পিছন থেকে ছুটে আসে অসম্ভব শক্তিশালী বুলেট।নিস্তেজ হয়ে পড়ে যায় রাম রঞ্জন চৌধরীর প্রানহীন দেহ।

বাতাসে মৃতের গন্ধ,আকাশে যেন মাঠের লাল রক্ত প্রতিফলিত হচ্ছে।পুড়া গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।এমন সময় আট-দশজন রাজাকার সহ পাকিস্তানিরা ব্যস্ত লুটপাট আর নারী নির্যাতনে।তাদের বুটের শব্দ ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়েছিল সেদিন ঐ গ্রামে।আজো সেই শব্দ শোনা যাবে।কিন্তু শুনবে কে? কারো কি সময় আছে? বাংলার কত শত গ্রামে এরকম ঘটনা ঘটেছে,কত শত রাম রঞ্জন কে মিথ্যা আশা দেখিয়ে নিষ্টুরভাবে হত্যা করা হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।কিন্তু এসব এখন আর কেউ তা মনে করে না।তাই অবহেলা অযত্নে পড়ে পড়ে আছে বুরুঙ্গা গনকবর।চুন সুড়কি খসে পড়ছে।এগুলো দেখার কেউ নেই।

শিক্ষক নিবাস চক্রবর্তী( যিনি ভাগ্যগুনে বেচে গিয়েছিলেন গুলি খেয়েও) বলেন, “আজকাল আমরা অতীত ভুলে গেছি।গনকবর রক্ষায় কেউ আন্তরিক নয়।আমি দিপাবলির সময় প্রদিপ জ্বালাই”।

আমরা এখন আছি আওয়ামী লীগ বিএনপি আর জামাত নিয়ে।যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে
সাধারন মানুষ,প্রান দিয়েছে গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলো আর এখন বড় বড় কথা বলে রাজনৈতিক দলের নেতারা।পত্রিকায় দেখতে পাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আর মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি। আমার স্বাধীন দেশে কেন মুক্তি যুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি থাকবে? তাহলে কি আমরা এখন ও স্বাধীন না?

স্বাধীন দেশে এখন তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় এসেছে।তার যুদ্ধপরাধীদের বিচার নিয়ে শুরু করেছে নাটক।মানুষ তাদের স্বতস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে কারন সাধারন মানুষ ভূলে যায়নি রাজাকারদের হিংস্র বর্বরতার কথা।তারা যুদ্ধপরাধীদের বিচার চায়।তবে আদৌ এ বিচার হবে কি না তা মুক্তিযুদ্ধের তথাকথিত পক্ষের শক্তিও ঠিকমত কথা বলছে না।তাদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের গানের মত অবস্থা “এমন করে যায় যদি দিন যাকনা”।

পরের নির্বাচনে যদি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি(তথাকথিত) ক্ষমতায় আসে তখন তো বিচার হবার প্রশ্নই আসে না।তারপর আবার অপেক্ষার প্রহর গুনবে ত্রিশ লক্ষ বিদেহী আত্তা আর দুই লক্ষ নির্যাতিতা আর কিছু দেশপ্রেমিক জনতা।এই দেশে সবকিছু নিয়ে রাজনীতি হয়।ধর্ম,মুক্তিযুদ্ধ সব নিয়ে।তাতে লাভ হয় কার? মুষ্টিমেয় কিছু রাজনীতিবিদের আর তাদের চ্যালাপেলাদের। এখনো আমার দেশের শত শত মানুষ না খেয়ে রাত্রি যাপন করে। একদিন না খেয়ে ঘুমিয়ে দেখবেন ঘুম আসে না।তবে তারা ঘুমায় কি করে? এসব কি কেউ ভাবে? না।
পত্রিকা খুললে দেখা যায় রাজনৈতিক কলাম।বুদ্ধিজীবিদের আজব সব বুদ্ধির প্রদর্শনী।কোনটাতেই সাধারন মানুষদের কথা নেই।আছে কে প্ল্যানচ্যাট করে বঙ্গবন্ধুর আত্তাকে নামিয়ে ফেলেছে এসব নিয়ে আলোচনা।দঃখের সাথে তাই বলি “আমি ভাবি বসে আর হাসি উল্লাসে/নিত্যনতুন বুদ্ধীজীবির কোথা হতে এত বুদ্ধি আসে”।

স্বাধীন দেশ, আমার দেশ বাংলাদেশ কেন দূর্নিতীতে ৫ বার চ্যাম্পিয়ান হবে? এর উত্তর কেউ দিবে না।এমন প্রশ্নও কেউ করে না।উল্টা টি আইবির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে।

“বাঙ্গালী বিপ্লব করে সাধারনত ব্যর্থ হয় আর সফল হলে ভুলে যায় কেন বিপ্লব করেছিল” হুমায়ুন আজাদ এরকম একটা কথা বলেছিলেন।বর্তমান বাস্তবতায় তা সত্য মনে হচ্ছে।
আমরা দেশ কি এরকমই থাকবে?কেউ হাসিনা, কেউ খালেদা আর কিছু জামাত।জামাত সদর্পে রাজনীতি করে বেড়াবে আর যুদ্ধপরাধের ইস্যু আসলে জামাতের নেতা ফু দিয়ে বলবেন “এইসব বাতাসে উড়ে যাবে”?
আমাদের চাওয়া উচিত দেশে একদল জনগোষ্টি তৈরী হোক।যারা দেশের উন্নতি চায়।ভ্রান্ত রাজনৈতিক আদর্শ যাদের মোহগ্রস্থ করতে পারবে না কোনদিন। জাফর ইকবাল বলেছিলেন একটা বইয়ে “ একশ জন ভাল মানুষ একটা দেশ বদলে দিতে পারে”।এরকম মানুষ দরকার।এই দেশে সত্যিকার বুদ্ধিজীবি বা জ্ঞানী দরকার।আহমদ ছফার মত মানুষ দরকার।।এরকম মানুষ বাংলাদেশ চায়।আমাদের আছে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা। এটাই আমাদের সাহস জুগাবে,পথ দেখাবে। দেশের জন্য শহীদ হওয়া সেইসব বীর সন্তানেরা আর সম্ভ্রম হারানো বীরাঙ্গনারা সেই জনগোষ্টির আশায় পথ চেয়ে আছে।তাদের বিশ্বাস একদিন তাদের আশা পূর্ন হবেই।সেই দিনের প্রতিক্ষায়……………………………………………… আছি আমিও এবং হয়ত আপনিও।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

7 Responses to সেই দিনের প্রতিক্ষায়………………………………………. আছি আমি এবং হয়ত আপনিও।

  1. ১৯৭১ এখন অনেকের ব্যবসার প্রতীক। বানিজ্যের লক্ষ্মী। রাজনীতি কারা করে?
    সময় আমাকে শিখিয়েছে- যারা নীতিজ্ঞান বিবর্জিত!

    ______________________________
    তবে একদিন সূর্য উঠবেই। শত বছর পরে হলেও।

    juliansiddiqi@gmail.com'

    জুলিয়ান সিদ্দিকী
    ডিসেম্বর 30, 2010 at 6:04 অপরাহ্ন

    • একটা শিক্ষিত দেশের জন্য গণতন্ত্র ঠিক আছে।কিন্তু আমাদের মত অর্ধেক অশিক্ষিতদের দেশে গণতন্ত্র শুধু নাম মাত্র গণতন্ত্র।নির্বাচনের সময় ভুংভাং দিয়াই সাধারন পাবলিকের মাথা খাওয়া যায়।

      তবে আশা একদিন সূর্য উঠবেই।

      muradt20@gmail.com'

      মুরাদুল ইসলাম
      ডিসেম্বর 31, 2010 at 5:56 পূর্বাহ্ন

  2. সুন্দর হয়েছে লেখাটা ।

    rabeyarobbani@yahoo.com'

    রাবেয়া রব্বানি
    ডিসেম্বর 31, 2010 at 2:40 পূর্বাহ্ন

  3. “আমি ভাবি বসে আর হাসি উল্লাসে
    নিত্যনতুন বুদ্ধীজীবির কোথা হতে এত বুদ্ধি আসে”।

    —————————————————————————-
    হ্যাঁ, প্রতীক্ষায় আছি প্রতিক্ষণ, আলোকিত বাংলাদেশ যেন একবার দেখে যেতে পারে এই জীবন।
    ——————————————————————————
    ভালো পোস্টের জন্য প্রীতি। :rose:

    রাজন্য রুহানি
    ডিসেম্বর 31, 2010 at 3:31 পূর্বাহ্ন

  4. আপনার একটি লেখা মাসিক চন্দ্রবিন্দু পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে।
    ফেসবুকে জানতে পারেন bindu007bd@yahoo.com
    email- mail@chandrabindu.net

You must be logged in to post a comment Login