কোয়ান্টাম কম্পিউটার

ডেস্কটপ্‌, ল্যাপটপ্‌, নোটবুক, নেটবুক, পামটপ এবং বর্তমান যুগের আইপ্যাডসহ অনেক রকম কম্পিউটারের নামই আমরা শুনেছি, আর এখনতো ট্যাবলয়েডের যুগ। এমনকি বর্তমানের স্মার্টফোনগুলিতেও কম্পিউটারের প্রায় সব ফাংশনালিটিই আছে। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটার? কোয়ান্টাম শব্দটিই অনিশ্চিত শব্দটির সাথে সম্পর্কিত। তাহলে এই অবিশ্বাস্য কম্পিউটারটি কি বাস্তবে সম্ভব?  চলুন দেখা যাক কেমন হবে আমাদের আগামী যুগের কোয়ান্টাম কম্পিউটার?
কোয়ান্টাম মেকানিক্স থেকেই  কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ধারনাটি এসেছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো কম্পিউটারকে অবিশ্বাস্য ক্ষমতা দেওয়া।  আমাদের দৃশ্যমান এই জগতে সবকিছুই নিয়ম-শৃঙ্খলা অনুযায়ী চমৎকারভাবে চললেও কোয়ান্টাম বিশ্বে ব্যাপারটি ঠিক উলটো। এখানে সবকিছু বিশৃঙ্খল, ইংরেজীতে যাকে বলা হয় chaos। আরেকটু সহজভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, আমরা আমাদের বিশ্বে দেখছি যে গাড়ি/এয়ারপ্লেন  ঠিকমত চলছে,  আপনার বাসার টেলিভিশন, ফ্রিজ, ডিশওয়াশার, ওয়াশিং মেশিন সবকিছুই চমৎকার ভাবে চলছে। কিন্তু এসব জিনিসপত্র এমনকি আমি/আপনি পর্যন্ত কার্বন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, আয়রন ইত্যাদি পদার্থের যে ক্ষুদ্র অনু এবং আরো একটু মাইক্রোপর্যায়ে পরমানু দিয়ে তৈরী, সেখানে কী ঘটছে? সেখানে কিন্তু এমন চমৎকার শৃঙ্খলা নেই। এখানে বিজ্ঞান যাদের বিষয় নয়, তাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, সবকিছু আবার কেমনভাবে কার্বন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন দিয়ে তৈরী। আমি এখানে একটি সহজ উদাহরন দেই যা হয়তবা আমাদের অনেকেরই  জানা। আমরা যে পানি পান করছি, এই পানি আসলে দুটি হাইড্রোজেন ও একটি অক্সিজেন ছাড়া আর কিছুই নয়। যাই হোক্‌, পদার্থের পরমানু পর্যায়ে ইলেকট্রন, নিউক্লিয়াসের (যা নাকি প্রোটন ও নিউট্রনের সমন্বয়ে তৈরী) চারিদিকে ঘুরে যেমনভাবে সূর্যের চারিদিকে গ্রহগুলো ঘূর্ণায়মান। আর সমস্যাটা ঠিক এখানেই ।  ঘূর্ণায়মান এই কণার (ইলেক্ট্রন) একই সাথে momentum এবং position জানা যায় না এবং একটি ইলেকট্রন একই সাথে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান করতে পারে।একটু জটিল হয়ে গেল।সহজভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, হয় আমরা বলতে পারি একটি কণা কোথায় অবস্থান করছে, অথবা একটি কণা কোথায় যেতে পারে। কিন্তু কখনোই দুটি একসাথে পরিমাপ করতে পারব না। আর এখান থেকেই এসেছে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তার সূত্র এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্স। প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে চমৎকারভাবে গাড়ি, এয়ারপ্লেন চলছে কীভাবে? কোয়ান্টাম মেকানিক্সের গভীর আলোচনায় যাওয়া আমার লেখাটির উদ্দেশ্য নয়,  কোয়ান্টাম কম্পিউটার বুঝতে গেলে আমাদের কোয়ান্টাম মেকানিক্স সম্পর্কে কিছুটা ধারণা থাকা দরকার তাই আমি কিছুটা ধারনা দিলাম। তবে এখানে এটা জানা থাকলেই চলবে যে,  কণাপর্যায়ে (sub-atomic) কোনকিছু পূর্বে গণনা না (predict) করা গেলেও আমাদের দৃশ্যমান জগতে আমরা প্রতিটি পদার্থের অণুকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাস্তব বিশ্বে ব্যবহার-উপোযোগী জিনিসপত্র বানাতে পারি। এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, আমাদের এই  সাব-এটমিক পার্টিকেল্‌ ইলেকট্রন সবসময়েই  দ্বৈত-রূপে অর্থাৎ তরঙ্গ-কণা (wave-particle duaity) রূপে অবস্থান করে এবং মজার বিষয় হল বহুরূপী এই ইলেকট্রন কখনোই তার দ্বৈতরূপটি ধরা দেয় না। যখনই কোন পরিদর্শক রাখা হবে, ইলেকট্রন শুধুমাত্র তার কণা রূপটি আমাদের দেখাবে । যাই হোক, জটিল কোয়ান্টাম মেকানিক্স এপর্যন্তই থাক।

এই সাব-এটমিক পার্টিকেল এবং তাদের বৈশিষ্ট্য দিয়েই  তৈরী হবে আমাদের কোয়ান্টাম কম্পিউটার। সাব-এটমিক পার্টিকেলের কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্য থেকে কোয়ান্টাম ডাটা  তৈরী এবং এই  কোয়ান্টাম ডাটাকে  বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে (manipulate)  কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরীর প্রথম ধারনাটি আসে পদার্থবিদ Alan Turing-এর মাথায় ১৯৩৬ সালে যা নাকি কোয়ান্টাম টিউরিং মেশিন নামে পরিচিত। আমরা আমাদের বর্তমান কম্পিউটারগুলিতে যে বিশাল তথ্যভান্ডার সংরক্ষন করি, এই তথ্যের ক্ষুদ্রতম একককে বলা হয় বিট (bit)। বাইনারী পদ্ধতিতে প্রতিটি বিট শুধুমাত্র দুটি  অবস্থা সংরক্ষন করে ১ (এক) এবং ০ (শূন্য)। যেমন ডেসিমাল

যেমন ডেসিমাল ১৫ যার বাইনারী রূপান্তর হবে ১১১১ সংরক্ষণের জন্য আমাদের দরকার হবে সর্বনিম্ন ৪-বিটের একটি রেজিস্টার। কোয়ান্টাম কম্পিউটারে এই ক্ষুদ্রতম একককে বলা হবে কিউবিট (qbit). আমাদের এই কোয়ান্টাম কম্পিউটার কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সুপারপজিশন (superposition) নীতিকে ব্যবহার করে প্রতিটি কিউবিট একধিক অবস্থা সংরক্ষন করতে পারবে যা হতে পারে, ১ (এক), ০(শুন্য), এবং এদের মাঝামাঝি সবগুলো অবস্থা (সুপারপজিশন)।  আগেই বলেছিলাম

আগেই বলেছিলাম যে, কোয়ান্টাম মেকানিক্সে একটি ইলেকট্রন একই সময়ে তার অরবিটের বিভিন্ন  জায়াগায় অবস্থান করতে পারে। এখানে একটি সমীকরন আছে যার মাধ্যমে একটি কিউবিটের সুপারপজিশন ব্যাখ্যা করা যায় কিন্ত  তা লিখে লেখাটাকে জটিল করে তুলতে চাই না। তাহলে দেখা যাচ্ছে, যেখানে ক্লাসিক্যাল কম্পিউটারের প্রতিটি বিট শুধুমাত্র দুটি অবস্থা সংরক্ষন করতে পারে, সেক্ষেত্রে প্রতিটি কিউবিট অনেকগুলি অবস্থা সংরক্ষন করতে পারে যার মাধ্যমে প্রতিটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার ক্যালকুলেশন ও মেমরীর দিক দিয়ে হবে বিশাল ক্ষমতার অধিকারী ।  একটি অতি ক্ষুদ্র মাইক্রোচিপ বা কার্ড সংরক্ষন করতে পারবে লক্ষ-কোটি টেরাবাইট তথ্য কিংবা লক্ষ লক্ষ তথ্যের নির্ভুল গননা করা যাবে একইসাথে এবং অতিদ্রুত।

অনলাইন ব্যাংকিং, কেনাকাটা, বিল পরিশোধ সহ অধিকাংশ ব্যাপারগুলিই এখন অনলাইনে করা হয়। এক্ষেত্রে নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ন  বিষয়। বর্তমানে প্রচলিত পাবলিক কী ক্রীপটোগ্রাফিতে জটিল এলগরিদম (RSA, ECC ইত্যাদি) ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠিন করা হয়েছে ঠিকই কিন্তু পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কম্পিউটারের  গণনার সীমাবদ্ধতার জন্য যথেষ্ঠ পরিমান কঠিন কী (key) তৈরী করা সম্ভব  নয় কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটার দিয়ে এত কঠিন কী  (key) তৈরী করা সম্ভব যে কোন হ্যাকারের পক্ষে তা গণনা করে বের করা সম্ভব হবে না। তাছাড়া পাবলিক/প্রাইভেট কী (key) গণনায় কিংবা অন্যান্য প্রোগ্রামিংয়ে যে র‍্যান্ডম  নাম্বার (random number) ব্যবহৃত হয়, তা কখনোই True random number নয়। এখানে যা ব্যবহৃত হয় তা হচ্ছে pseudo-random number। কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মাধ্যমে  True randomness তৈরী করা যাবে।

যদিও বিভিন্ন রকম জটিলতার (যেমন decoherence) কারনে  প্রকৃত কোয়ান্টাম কম্পিউটার এখনো তৈরী করা সম্ভব হয়নি,  কানাডিয়ান একটি কোম্পানী ডিওয়েভ দাবী করছে যে তারা ১৬ কিউবিটের কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরী করেছে যা নাকি sudoku puzzle সমাধান করতে সক্ষম। আমরা আমাদের এই আশ্চর্য কোয়ান্টাম কম্পিউটার দেখার অপেক্ষায় রইলাম ।

D-Wave's 16-qubit quantum computer

আমাদের রবীন্দ্রনাথ এই সুন্দর ভূবনটি ছেড়ে যেতে চান নাই, কিন্তু আমার এই সুন্দর ভূবনটিতে বেঁচে থাকার লোভ নয়, আমার আফসোস হয়, আমি নুতন নুতন টেকনোলজি দেখে যেতে পারব না, মানুষ হয়তবা, হয়তবা নয় অবশ্যই একদিন গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ঘুরে বেড়াবে, আমাদের জন্মরহস্যটি বের করে ফেলবে, মাল্টিপল ইউনিভার্স আবিষ্কার করে ফেলবে, কিন্তু আমি হয়তবা  সেইদিনটিতে বেঁচে থাকব না।

সঞ্চয় রহুমান , ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

4 Responses to কোয়ান্টাম কম্পিউটার

  1. আমাদের রবীন্দ্রনাথ এই সুন্দর ভূবনটি ছেড়ে যেতে চান নাই, কিন্তু আমার এই সুন্দর ভূবনটিতে বেঁচে থাকার লোভ নয়, আমার আফসোস হয়, আমি নুতন নুতন টেকনোলজি দেখে যেতে পারব না, মানুষ হয়তবা, হয়তবা নয় অবশ্যই একদিন গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে ঘুরে বেড়াবে, আমাদের জন্মরহস্যটি বের করে ফেলবে, মাল্টিপল ইউনিভার্স আবিষ্কার করে ফেলবে, কিন্তু আমি হয়তবা সেইদিনটিতে বেঁচে থাকব না।

    আমারও আফসোস হয়।

    রাজন্য রুহানি
    ফেব্রুয়ারী 25, 2011 at 4:50 পূর্বাহ্ন

    • ধন্যবাদ রাজন্য রুহানি। আমি আশা করি বিজ্ঞানের বদৌলতে শীঘ্রই মানুষের আয়ু বেড়ে যাবে।

      sonchoy@gmail.com'

      সঞ্চয় রহমান
      ফেব্রুয়ারী 26, 2011 at 1:50 অপরাহ্ন

  2. এতসব কঠিন বিষয় বুঝতে পারিনা। তবে লেখা ভাল বুঝতে পারলাম।

    sumayakter@gmail.com'

    বৈশাখী
    ফেব্রুয়ারী 26, 2011 at 10:09 পূর্বাহ্ন

    • ধন্যবাদ বৈশাখী। আমি চেষ্টা করেছি সহজ ভাষায় ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে। আমাদের বাংলা ভাষা বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে – তা ইদানিংকালের নাটক বা তরুণ-তরুণীদের কথোপকথন লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়। আবার অনেক ইংরেজী শব্দ বাংলায় ঢুকে পড়ছে বা ইংরেজীতে কথা বলার প্রচলনও বাড়ছে। ইংরেজীর অবশ্যই দরকার আছে কিন্তু এমন হতে থাকলে আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষাটি পৃথিবীর অনেক ভাষার মত একদিন হারিয়েও যেতে পারে। আমি মনে করি এই ভাষাটিকে রক্ষার জন্য শুধুমাত্র গল্প-উপন্যাস-কবিতা লিখলে চলবে না, চাই আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন আর এই অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের জন্য চাই বিজ্ঞান শিক্ষা। বিজ্ঞান শিক্ষাকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যেই আমার এইসব বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিষয়ক লেখা।

      sonchoy@gmail.com'

      সঞ্চয় রহমান
      ফেব্রুয়ারী 26, 2011 at 1:59 অপরাহ্ন

You must be logged in to post a comment Login