একজন সাধারণের দৃষ্টিতে পুঁজিবাদ

বিষয়: : অর্থনীতি,আলোচনা |
পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কিংবা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা – এই দুই ব্যবস্থা নিয়ে অনেক রকম কথাই শুনি, পড়ি। আমি ব্যাপারগুলো খুব একটা বুঝি না কারন ওটা আমার বিষয় নয়। স্কুল পর্যায়ের পড়াশোনা কিংবা পরে পত্র-পত্রিকা পড়ে আমার জ্ঞান। কথা হলো তাহলে এ বিষয় নিয়ে লেখা কেন? দেশের নেতা-নেত্রী নির্বাচনে এ ব্যাপারটি গুরুত্বপুর্ন এবং এ বিষয়ে আমার ভাবনা সাধারন একজন মানুষের মতই। তবে কিছু কিছু বিষয় জলের মতই পরিষ্কার – যা সাধারন একজন মানুষের দৃষ্টি এড়ায় না,  আর ঠিক এ বিষয়গুলোর উপরই আমি আলোকপাত করতে চাই। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা যে আজ বিলুপ্তপ্রায়- এটা আমাকে আর নুতন করে বলতে হবে না, এটা যেকোন সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন। তাহলে আমাদের আলোচনা থেকে সমাজতন্ত্র প্রথমেই বাদ পড়ে গেল।

পুঁজ়িবাদ ব্যবস্থা বইতে পড়ে নয়, আমি এখানে আমেরিকায় যেমন দেখি বা ভিনদেশী বন্ধু-বান্ধবের সাথে আলোচনা করে যেটুকু জানি সেটাই বলব। যেমন বন্ধু কেনেথ বলল, সরকারের কাজ হলো সবার জন্য ফাঁকা একটা মাঠ তৈরী করা যেখানে অবকাঠামোগত সবধরনের সুবিধা থাকবে যাতে যে কেউ ইচ্ছা করলে নিজ় যোগ্যতায় নিজের লক্ষ্যে পৌছুতে পারে। এখানে উত্তরাধিকার সুত্রে কারো সম্পদ থাকার দরকার নাই, বা থাকলেও কোন সমস্যা নাই। কারো মস্তিষ্কে যদি নুতন আইডিয়া থাকে, উদ্যেক্তা গুন থাকে তাহলে অবকাঠামো যাতে তার আইডিয়া বাস্তবায়নে অন্তরায়  না হয়ে দাঁড়ায়। ্যেমন ধরুন ব্যবসায় স্থাপনে নিয়মনীতি বিষয়ক জটিলতা। ট্রেড লাইসেন্স, বিভিন্ন অনুমতি (permit), ট্যাক্স সংক্রান্ত ব্যাপার, ইউটিলিটি (বিদ্যুৎ, পানি, টেলিফোন) ইত্যাদি ব্যাপারগুলো যাতে খুব সহজেই সম্পন্ন করা যায় সরকার সে ব্যাবস্থা করে রাখবে। কিন্ত আমাদের দেশে কী হচ্ছে ? বেশ কিছুদিন আগে, জনাব জাকারিয়া স্বপনের রচনায় “একটু” নাটকটি দেখলেই বোঝা যায়, আমাদের দেশে সরকার আসলে কী করছে ? সেখানে নায়ক বিদেশের চমৎকার জীবন ব্যাবস্থা জলাঞ্জলী দিয়ে দেশের টানে দেশে ফিরে গেল একটা “আইএসপি”  প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য এবং নিজের পয়সায়। ব্যবসায় শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় কাজগুলি করার জন্য যে পরিমান জটিলতা বা ঘুষের বা অনিয়মের সম্মুখীন তাকে হতে হয়েছে, তাতে যেকেউ খুব সহজেই নিরুৎসাহিত হয়ে আবার বিদেশে ফেরত যাবে।পুজিবাদী অর্থনীতি আমাদের দেশে শুধুমাত্র নামে মাত্র আছে। আবার ধরুন, কারো মাথায় চমৎকার আইডিয়া আছে কিন্ত সেটা শুরু করার জন্য পর্যাপ্ত মুলধন নাই। ব্যাংকগুলো এমন হবে যাতে  আইডিয়া চমৎকার হলে খুব সহজেই ঋন দেয়। ব্যাংকগুলোর ঋন দেবার শর্ত হবে, প্রজেক্ট খতিয়ে দেখা, বা ঋনগ্রহীতার ঋন বিষয়ক রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখা – ঋন গ্রহীতা আগে কখনো ঋন নিয়েছে কিনা, নিয়ে থাকলে ঠিক সময়ে ঋন পরিশোধ করেছে কিনা, এসব ঠিক থাকলে কোন রকম জামানত অর্থ বা সম্পদ ছাড়াই ঋন দিবে কারন চমৎকার একটি প্রজেক্ট এবং ঋনগ্রহীতার সততাই এখানে জামানত হবার জন্য যথেষ্ঠ। বাড়তি জামানতের প্রয়োজন নাই। আমদের দেশে সরকার এমন একটি ফাঁকা মাঠ কি তৈরী করে দিচ্ছে? আমাদের দেশে জামানত ছাড়া ঋন পাওয়া যায় না। আর কিছু লোক তো ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে জামানতের কয়েকগুন বেশী ঋন নিয়ে ইচ্ছে করে প্রজেক্ট ফেইল করছে। সরকারের কাজ হলো এসব পর্যেবেক্ষনে রাখা যাতে সবার জন্য চমৎকার একটি মাঠ থাকে। আমাদের সংসদে দলীয় নেতা ও অন্যান্য সাংসদগন এসব নিয়ে আলোচনা/বাদানুবাদ করেন না। কার বাসায় কেমন সম্পদ পাওয়া গেল – এটা তাদের আলোচ্য বিষয় এবং এসব আলোচনা করতে গিয়ে নিজেদের অতীত রেকর্ডও বের হয়ে আসে।এখানে একটি বিষয় না উল্লেখ করলেই নয়, বিশ্বের সর্বোচ্চ ধনীলোকের তালিকায় যতজন আমেরিকান আছেন তাদের অধিকাংশই (আমার জানামতে সবাই) নিজ যোগ্যতায় ধনী, উত্তরাধিকার সুত্রে নয় !

বন্ধু রিচার্ড আবার আয়ের পুনর্বন্টনের (income resdistribution) ব্যাপারটি আলোচনায় নিয়ে এল। ব্যক্তিগত  আয়কর ফাইল বলে একটি ব্যাপার আছে যা আমেরিকাতে বছর শেষে  সবাইকে করতে হয়। ব্যাপারটি খুবই সহজ।সরকার প্রত্যেকের আয়ের উপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট হারে বেতন থেকে কর কেটে নয়। ব্যাপারটিকে বলা হয় উৎসস্থলে করকর্তন। তারপর বছর শেষে আয়কর ফাইল করতে হয় যা এতটাই সহজ যে সাধারন মানের ট্যাক্সফাইল কোন পেশাধারীর কাছে না গিয়ে নিজেই করা যায়। এক্ষেত্রে হিসেব করে দেখা হয়, আপনার আয়ের উপর ভিত্তি করে আপনার জন্য সারাবছরে যে পরিমান কর ধার্য্য করা হয়েছে তা আপনি দিয়েছেন কিনা। যদি না দিয়ে থাকেন, কিংবা যদি কম দিয়ে থাকেন তাহলে যে পরিমান কম দিয়েছেন তা আয়কর বিভাগকে দিতে হবে। আর যদি বেশী দিয়ে থাকেন তাহলে যে পরিমান বেশী দিয়েছেন তা আয়কর বিভাগ ফেরত দিবে। খুবই সুন্দর ব্যাবস্থা। আবার আয়কর বিভাগে আছে অডিট বিভাগ যারা আপনার ফাইলকৃত কর পরীক্ষা করে দেখবে আপনি কোনরকম ভুল করেছেন বা ফাঁকি দিয়েছেন কিনা। আবার কেউ যদি ট্যাক্স ফাইল করার পর আয়কর বিভাগের পাওনা না দেন, তাহলে আয়কর বিভাগ এতটাই শক্তিশালী যে, তারা আপনার ব্যাংক থেকে তাদের পাওনা কেটে নিতে পারবে। যাই হোক আয়ের পুনর্বন্টনের ব্যাপারে ফিরে আসি। এখানে আয়কর হার এমনভাবে নির্ধারন করা হয় যে, যার আয় যত বেশী, তাকে করও তত বেশী দিতে হবে- এটা সাধারন একটা হিসাব, এখানে অন্যান্য ব্যাপারও বিবেচনা করা হয় যেমন আপানার পারিবারিক  অবস্থা , আপনার অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ, ইত্যাদি। ধরা যাক, কোন একজনের বাৎসরিক আয় ৩৫,০০০ ডলার, কিন্ত তার দুটি সন্তান আছে। তার জন্য কর হার হবে খুব কম কারন পরিবারে ব্যক্তির সংখ্যার তুলনায় তার আয় কম। তাছাড়া যেহেতু তার আয় কম কিন্ত দুটি সন্তান আছে , তাকে সরকার কিছু অর্থ ট্যাক্স ক্রেডিট হিসেবেও ট্যাক্স ফাইল করার পর দিবে। আবার যার বাৎসরিক আয় ২৫০,০০০ ডলার তার কাছ থেকে অনেক বেশী পরিমানে কর কাটা হবে কারন পারিবারে ব্যক্তির (আগের মতই দুটি সন্তান) সংখ্যার তুলনায় তার আয় অনেক বেশী। বাস্তবিক যেটা হচ্ছে সেটা হলো, যার আয় বেশী তার কাছ থেকে অর্থ নিয়ে যার আয় কম তাকে দেওয়া হচ্ছে। আয়ের চমৎকার পুনর্বন্টন ব্যাবস্থা। এখানে একটা ব্যাপার মনে রাখা দরকার, যার আয় বেশী তার কাছ থেকে বেশী কর নেওয়া হয় ঠিকই  কিন্ত কখনোই আবার এত বেশী কর নেওয়া হয় না যাতে করে তার যোগ্যতার উপর অবিচার করা হয় কারন সে তার যোগ্যতাবলেই বেশী আয় করছে। সরকার যেমন আয়ের পুনর্বন্টনের ব্যবস্থা রেখেছে, ঠিক তেমনিভাবে ব্যক্তির যোগ্যতার মুল্যায়নের কথাও ভুলে যান না। আমি খুবই সংক্ষেপে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলাম, এখানে আরো অনেক ব্যাপার আছে। আমাদের দেশেও আয়কর ফাইলের  ব্যাপারটি আছে। কিন্ত ব্যাপারটার বাস্তবায়ন মোটেই নেই। বেশীর ভাগ লোক আয়কর ব্যাপারটা বোঝেই না। একজন শিক্ষাহীন দিনমজুরের এটা বোঝার প্রশ্নই আসে না, বাকী লোকের বেশীর ভাগই আয়কর ফাইল করেন না বা করলেও চমৎকারভাবে কর ফাঁকি দিয়ে যান। আমাদের দেশে পুজিবাদী ব্যাবস্থা আছে কিন্ত বাস্তবায়ন নাই। আমাদের বুদ্ধিজীবিগন প্রায়ই পুজিঁবাদের মুন্ডুপাত করেন। তারা করতেই পারেন কারন এ বিষয়ে তাদের জ্ঞান আমার চেয়ে অনেক বেশী। এটা নিঃসন্দেহে সত্যি যে, পুজিঁবাদ অত্যন্ত জটিল একটি ব্যাপার এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বা অর্থনীতিবিদগন এটা ভালো বোঝেন কিন্ত আমি আমাদের দেশে সাধারনভাবে দৃশ্যমান এ ব্যাপারগুলিরও বাস্তবায়ন কখনোই দেখি নাই।  আমার সন্দেহ, আমাদের দেশের যারা নিয়ন্ত্রক তারা নিজ়েরা তাদের আয়কর ফাইল করেন তো?

সঞ্চয় রহমান, আলেক্সান্দ্রিয়া, ভার্জিনিয়া।

sonchoy@gmail.com'
আমার প্রিয় নানাভাইয়ের আমাকে দেওয়া উপদেশ, “উপকার করার দরকার নাই, অপকার না করলেই চলবে; পাপও নাই, পূণ্যও নাই, সবকিছুই কর্ম, শুধুমাত্র সময় পাস্‌।” ……হ্যাঁ, আমি শুধু এই পৃথিবী, এই বিশ্বে সীমাবদ্ধ নই, কে জানে আরো একটি, অনেক মাল্টিভার্সে, আরেকটি ডাইমেনশনে হয়তবা আমার আরও একটি অস্তিত্ব আছে কারণ, প্রতিটা ম্যাটারের অ্যান্টিম্যাটারও আছে।
শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

3 টি মন্তব্য : একজন সাধারণের দৃষ্টিতে পুঁজিবাদ

  1. আপনার অত্যন্ত সাবলীলভাবে ব্যাপারটি তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ। প্রকৃত অর্থে সাম্যবাদী, পুজিবাদী, সমাজবাদী র মধ্যে পুজিবাদী সমাজব্যবস্থা এখন পর্যন্ত পরিক্ষীত ভালো মাধ্যম হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে। তা সত্ত্বেও আমাদের দেশে বিভিন্ন কারনে তার যথাযথ বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না, হবার সম্ভাবনাও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কিন্তু আমাদের দেশের মত দরিদ্র দেশের জন্য এই সমাজব্যবন্থা কি আদেৌ ফলদায়ক হবে যতটুকু আমরা পশ্চিমা দেশগুলোতে দেখতে পাই?

    রিপন কুমার দে
    ফেব্রুয়ারী 28, 2011 , 1:01 পূর্বাহ্ন

  2. অত্যন্ত সুন্দর ভাবে বিষয়টির ব্যাখ্যা পড়ে ভালো লাগল।

    khalid2008@gmail.com'

    শাহেন শাহ
    ফেব্রুয়ারী 28, 2011 , 1:03 পূর্বাহ্ন

  3. ধন্যবাদ রিপন এবং শাহেন শাহ। আমি চেষ্টা করেছি সহজ ভাবে ব্যাখ্যা করতে। আমি চাইনা আমাদের দেশটি ফেইল্ড কান্ট্রি লিস্টে তালিকাবদ্ধ হোক্‌, তাহলে গল্প-উপন্যাস-কবিতা কোনটাই টিকে থাকবে না। আমাদের প্রিয় দেশটিকে বাচাঁতে হবে।

    sonchoy@gmail.com'

    সঞ্চয় রহমান
    মার্চ 2, 2011 , 4:33 পূর্বাহ্ন

মন্তব্য করার জন্য আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে। Login