ভবিষ্যৎ কর্ণধারগণের বর্তমানঃ আক্রমনাত্নক তরুণ প্রজন্ম

Filed under: সংস্কার |

অন্যরকম কিছু লেখার ইচ্ছে ছিল, সচরাচর যা আমি লিখি না তেমন কিছু, গল্প-রূপকল্প-কবিতা-গণিত-রসিকতা-তথ্য-শিক্ষা এই বিষয়গুলোর বাইরে আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সেটা সম্ভব হলো না আর। বিধাতা সম্ভবত আমার লেখার ক্ষমতাকে এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ করেছেন, চাইলেও এর বাইরে আমি কিছু লিখতে পারিনা। এত গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে পোস্ট দিতে চাইনি অন্তত এবার, কিন্তু কোনভাবেই মন বসাতে পারছি না আজ কিছুতে, বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে প্রচন্ড, ভেতরে যেটুকু কথা যন্ত্রণা দিচ্ছে, সেটুকুকে বলে ফেলতে ইচ্ছে করছে অনেক বেশি। তাই অনেকদিন ধরে চেপে রাখা বিষয়টা লিখতে বসেছি, বিতর্কিত বিষয়, তবু বলতে চাই, কারণ, এটার ব্যাপারে একটা সমীক্ষা চালানো জরুরি হয়ে পড়েছে আমার জন্য।

একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা সবাই লক্ষ্য করেছি কি না জানি না, কিন্তু আমি নিজে এই প্রজন্মের একজন, তাই বোধহয় আমার চোখে এটা ধরা দিয়েছে অনেক বেশি- তরুণ প্রজন্ম অনেক বেশি আক্রমনাত্নক হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক সময়ে। প্রায়ই এখন খবরের কাগজের উপ-প্রধান শিরোনাম হচ্ছে নিম্নলিখিত খবরগুলোঃ

১। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজ ছাত্রের/ছাত্রীর আত্নহত্যা।
২। প্রেমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ার এসিডদগ্ধ/খুন হলো স্কুল/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী অমুক।
৩। সমুদ্রসৈকতে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের উন্মত্ততা, নেশার প্রভাব।
৪। সামান্য কথা কাটাকাটির জেরঃ বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজ ছাত্রদের দোকান ভাংচুর।

এইগুলো হচ্ছে জনসম্মুখে আসা খবর, জনসম্মুখে না আসার মতো খবরও অনেক আছে, সেগুলো বলার আগে একটা কথা বলে নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময় একজন মানুষ প্রায় প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যায় বলতে পারি। গড়ে একজন সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হওয়া ছাত্রের বয়স ১৮ হবে, ধরে নিতে পারি। সেটা মুখ্য বিষয় নয়। মুখ্য বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশের ভর্তি প্রক্রিয়া বেশ কঠিন একটি প্রক্রিয়া, এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যারা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোতে ভর্তি হয়, তারা নিশ্চিতভাবেই সবচেয়ে মেধাবী তরুণ সমাজ। এই মেধার প্রতিযোগীতায় যারা টিকে থাকে, তারা সামান্য আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্নহত্যা করে ফেলবে, এটা ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়। বুঝতে পারি, খবরের অন্তরালে আছে আরও অনেক কথা, যা প্রকাশ করা যায় না অনেক সামাজিক কারণেই। এসিড ছুঁড়ে মারতে পারে যে কেউই প্রেমে ব্যর্থ হয়ে, এটা আরেকজনের জীবনকে ধ্বংস করা, নিজের জীবনকে নয়, কাজেই এটাকে মানসিক অসুস্থতা বলতে পারি, শাস্তি দাবি করতে পারি অপরাধীর, ধিক্কার দিতে পারি তাকে; কিন্তু সে নিজের জীবনের উপর হামলা চালায়নি(অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া সাপেক্ষে, হলে মৃত্যুদন্ডও হতে পারে), চালিয়েছে অন্য কারও উপর, অন্তত ঠিক রেখেছে নিজের জীবনের প্রতি ভালবাসা, নিজেকে শেষ করে দেয়ার মতো বোকমী সে করতে যায় নি। আমি এসিড নিক্ষেপকারীদের সমর্থন করছি না মোটেও, কিন্তু এই কথাটা আমার বক্তব্য পরিস্কার করার জন্য প্রয়োজন, একটু পরেই ব্যাখ্যা করছি।

ভাংচুর বা নেশা করা এখন একটা ফ্যাশন হয়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ প্রজন্মের কাছে, ভয়াবহ আতঙ্ক নিয়ে আমি ব্যাপারটি লক্ষ্য করে যাচ্ছি। তবুও মেনে নিতে পারি এইগুলো, কারণ, নিজের জীবনের প্রতি হামলা সেগুলো নয়। নেশা করলে মৃত্যুকে ডেকে আনা হলেও সেটা প্রত্যক্ষভাবে নয়, অনেকেই সেটা বুঝে না, তবু বলতে পারি নিজের জীবনের উপর হামলা নয় সেটা; অন্তত প্রত্যক্ষভাবে। কিন্তু আত্নহত্যা করাটা সত্যি রহস্যজনক। যখন সিংহভাগ ছাত্র-ছাত্রীই নিজের জীবনে প্রত্যক্ষ হামলা করে না, তখন সামান্য প্রেমে ব্যর্থ হয়ে প্রায় তাদেরই সমপর্যায়ের যুক্তিসম্পন্ন একজন নিজের জীবনে সরাসরি হামলা কেন চালাবে? কী আছে সেইসব আত্নহত্যার পিছনে যা একটি ছেলে/মেয়েকে বাধ্য করছে আত্নহত্যা করতে? কী এমন সে/তারা করে ফেলেছে যে সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার কোন প্রতিষ্ঠানেই তারা আশ্রয় খুঁজে পায়নি?

প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার আগে খবরের শিরোনাম হিসেবে না আসা অনেক খবর এর কথা মনে করা যাক, যেগুলো আমরা সবাই, সত্যি সত্যি সবাই, প্রতিনিয়ত শুনছি, বন্ধুদের কাছে, ব্লগে, ফোরামে, আড্ডায়, চায়ের কাপে, সব জায়গায়ই শুনছি, পাত্তা দিচ্ছি না কেউ একেবারেই, কেউ আফসোস করছি, কেউ রেগে যাচ্ছি; কিন্তু কেউ খেয়াল করছি না, ভাবছি না কেউ, সবগুলো খবরই কেন শুধু তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে? কেন এতটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে এই প্রজন্মটি, কী তাদের সমস্যা?

বিশ্বায়ন পৃথিবীকে অনেক ছোট করে দিয়েছে সত্যি, কিন্তু এর খারাপ প্রভাবগুলো থেকে উন্নত এশিয়ান দেশগুলো তাদের কিছুটা বাঁচিয়ে রাখতে পারলেও পারছি না আমরা, আমাদের দেশে সত্যিকার অর্থে বিশ্বায়নের অর্থবহ কোন প্রভাব পৌঁছায়নি, পৌঁছেছে কুপ্রভাবগুলো। আমি আমাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জুনিয়র ব্যাচগুলোর মাঝে একটা অস্থিরতা লক্ষ্য করি সবসময়ই, যেন অনেক বেশি আক্রমনাত্নক হয়ে উঠেছে এই প্রজন্মগুলো, প্রেমিক/প্রেমিকার সাথে সেক্স করা, সেটার ভিডিওচিত্র ধারণ করা, হলে ফিরে এসে বন্ধুদের সাথে সেটা দেখা, খুব ভয়াবহ কিছু ক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফিক সাইটগুলোতে সেই ভিডিওচিত্র বিক্রি করা, অথবা ফেসবুকের মতো উন্মুক্ত একটি সাইটে সেগুলো শেয়ার করা- ওরা যেন কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করছে না। মানছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া একটি ছেলে বা একটি মেয়ের স্বাধীনতা রয়েছে তার নিজের জীবনের ব্যাপারে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার, কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি, প্রায় শতভাগ লোকের মেনে চলা প্রচলিত ধর্মসমূহ, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট এই কাজগুলোকে সমর্থন করে না এখনও, জীবন এখানে তার উৎকর্ষ এতটা হারিয়ে এখনও ফেলেনি; কী করে মেনে নিতে পারি এইসব? ওপেন সেক্স পশ্চিমা বিশ্বেও একটি সহনীয় কিন্তু বিতর্কিত টার্ম, কিন্তু আমাদের দেশে সমাজ ব্যবস্থা সমর্থন না করলেও হয়ে চলেছে এরই চর্চ্চা, সুশীল হয়ে থাকতে সবাই মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছি, এই প্রসঙ্গ নিয়ে মুক্ত আলোচনা করতে চাচ্ছি না, যেইসব তরুণ/তরুণীরা এইসব উন্মত্ততায় অংশ নিচ্ছে, সম্ভ্রম বাঁচাতে মুখ খুলছে না তাদের পরিবারগুলোও; এদিকে নীরবে, সবার সামনে, তবুও অগোচরে, ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে একটি প্রজন্ম। দোষটা কি একতরফা ওদের?

আপনি ভালোবাসেন আপনার মনের মানুষটিকে। নতুন স্বপ্ন বাসা বাঁধতেই পারে প্রথম সারির কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলে। ইচ্ছের ঘুড়িটা তখন অনেক উঁচুতে উড়ে, যদিও বাস্তবতা এতটা সহজ নয়। কিন্তু অনেক পরিশ্রমের পর পছন্দের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলে আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সেটা অনেক বেশি কিছু মনে হয়। তখন, সেই রঙিন দিনের শুরুতে, ভালোবাসার মানুষের সাথে কাটাতে ইচ্ছে হতে পারে কিছু রঙিন মূহুর্ত, এতদিনের পার্কে-চাইনিজে দেখা করা আর ভালো নাই লাগতে পারে, যেতে চাইতে পারেন কোন হোটেলের বদ্ধ কেবিনে, প্রাপ্ত বয়স্ক হিসেবে সে অধিকার আপনার আছে, কিন্তু তারপর আর কী চাইতে পারেন? দেহ? ঠিক আছে, আপত্তি তোলার কিছু নেই, আপনার স্বাধীনতা। আমি বলার কেউ নই।

কিন্তু যখন এমন করে আমাদের প্রজন্মগুলো ঢুকছে হোটেলের কেবিনগুলোতে, হয়তো অন্য একটা অনুভূতি থাকছে তাদের, সেটা দোষের নয়, এই বয়সটাই হয়তো এমন, কিন্তু যখন বের হচ্ছে? তখন কিন্তু তারা ধ্বংস করে বের হচ্ছে নিজেদের সম্পূর্ণ, কারণ, ওরা নিজেরাও জানে, কী ঘটে গেছে ভেতরের ঘন্টা-দুয়েকে, নিঃশেষ হয়ে গেছে ওরা পুরোপুরি। এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় মেয়েটি, হয় তার পর্নো ভিডিও পাওয়া যায় দুদিন বাদে ইন্টারনেটে, নয়তো ঘটে অন্য কোন ভয়াবহ দুশ্চিন্তার কারণ, আত্নহত্যা নিয়তি হয়ে উঠে ওদের, এবং আমরা খবরের কাগজে একনজর ব্যস্ত চোখ বুলাই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইনসেটে থাকে ওদের ভর্তি হওয়ার সময়কার তোলা পাসপোর্ট সাইজ ফটোগ্রাফ, যখন সেটা তোলা হয়েছিল, তখনও ওদের স্বপ্ন ছিল, কিন্তু যখন সেটা পেপারে ছাপা হয়, তখন চারদিকে ওদের আদিগন্ত বিস্তৃত নিঃশব্দতা।

হায় বিশ্বায়ন, শুধু শারীরিক-মানসিক সম্পর্কেরই পরিবর্তন ঘটালে আমাদের দেশে? শুধু এসব ব্যাপারেই আমূল বদলে দিলে আমাদের তরুণ সমাজটার ধারণা? আর কিছুই করতে পারলে না?

বিশ্বায়নের প্রভাবে সহজলভ্য হয়েছে পশ্চিমা সংস্কৃতি, সেখানে শিখছি একটা দুই ঘন্টার মুভিতে অন্তত পঞ্চাশবার “ফাক ইউ’ ধরণের কথা, আর সেগুলো আমরা প্রয়োগ করছি আমাদের ক্লাসরুমগুলোতে, ছেলে থাক মেয়ে থাক, কী যায় আসে? পশ্চিমারা ওভাবে বলতে পারলে আমরাও পারব, যদিও বুঝতে পারছি না ওদের প্রকাশিত অর্থ আর আমাদের দেশে এই কথার প্রচলিত অর্থ এক নয়। পশ্চিমারা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে পর্নো মুভি তৈরী করছে, ঠিক আছে, আমাদের এত টাকা নেই, ইন্ডাস্ট্রি করতে পারব না, কিন্তু পর্নো মুভি তৈরীতে সমস্যা কোথায়? বয়ফ্রেন্ড আছে, গার্লফ্রেন্ড আছে, চাই কি গ্রুপসেক্সের মুভিও তৈরী করে দিতে পারি, কারণ, এখন পর্নো ছবির সাইটগুলো এইডসের ভয়াবহতার কারণে আগের মতো আর এত মুভি তৈরী করতে পারছে না, ওদের কাছে তো আমরা আমাদের হোম-মেড মুভি গুলো বিক্রি করতে পারি! হাজার হোক, প্রথম বাংলাদেশি পর্নো তারকা হিসেবে আমাকেই চিনবে বিশ্ব, বলা যায় না, পশ্চিমাদের পর্নো ছবি তৈরীর অ্যাওয়ার্ডও পেয়ে যেতে পারি কোনদিন! হায় রে আমাদের প্রজন্ম, আমরা কি এমন প্রজন্মের প্রতিনিধি হতে চেয়েছিলাম?

ভয়াবহ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে এইসব অসুস্থ চিন্তা আজকের তরুণ প্রজন্মের মাঝে, সবাই চুপ করে আছে, সমাজবিজ্ঞানীগণ মনোবিজ্ঞানীগণ সাপ্তাহিকগুলোতে কিছু বাছাই করা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে মহাপন্ডিত সাধু সাজছেন, অথচ তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রজন্মটা। ফিরে তাকাচ্ছে না কেউ, আমরা নিজেরাও সচেতন হচ্ছি না, ভয়াবহভাবে বেড়ে যাচ্ছে এই বয়সটাতে মৃত্যু হার, নেশাগ্রস্তের হার, জীবনে সোনালী স্বপ্ন দেখার সময়ে ব্যর্থ হয়ে যাবার হার। আমি তবুও খুব আশা নিয়ে আছি, এই দুঃস্বপ্ন থেকে আমাদের প্রজন্ম বেরিয়ে আসবে। কারণ, সুস্থতা এমন একটা ব্যাপার, যা সমাজ থেকে পুরোপুরি কখনও হারিয়ে যায় না।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

3 Responses to ভবিষ্যৎ কর্ণধারগণের বর্তমানঃ আক্রমনাত্নক তরুণ প্রজন্ম

  1. :-??

    রিপন কুমার দে
    মার্চ 5, 2011 at 2:32 অপরাহ্ন

  2. সুস্থতা এমন একটা ব্যাপার, যা সমাজ থেকে পুরোপুরি কখনও হারিয়ে যায় না।

    আমিও আশাবাদী।
    :-bd

    sumhani@gmail.com'

    সুমাইয়া হানি
    মার্চ 6, 2011 at 7:32 পূর্বাহ্ন

  3. খুব ভালো একটি পোস্ট। লেখকের প্রতি বিনীত সাধুবাদ।
    :rose:

    রাজন্য রুহানি
    নভেম্বর 21, 2011 at 7:14 পূর্বাহ্ন

মন্তব্য করুন