জুলিয়ান সিদ্দিকী

ধারাবাহিক উপন্যাস: কালসাপ-১১

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

অন্ধকারেই হাসন আলির ম্লান টর্চের আলোয় ওরা পুড়ে যাওয়া বেতের জঙ্গলের শেষপ্রান্তে হরি ঘোষের লাশ দেখতে পায়। পিতার লাশ দেখতে পেয়ে ফের ঝাঁপিয়ে পড়ে হুহু কান্নায় ডুকরে ওঠে মমতা।

মৃত মানুষের পাশে কান্নারত মানুষের দৃশ্য আরো বেদনাদায়ক। চান্দভানু এগিয়ে গিয়ে মমতাকে টেনে তুলে বলে, এখন আমাগ হাতে সময় বেশি নাই। কান্দাকাটি কইরা সময় নষ্ট  কইরা কোনো ফল নাই। যত তাড়াতাড়ি পারা যায় আমরা এখান থাইক্যা যাইতেগা হইবো।

কিন্তু মমতার কান্না যেন আরো বেগবান হয়। কাঁদতে কাঁদতে সে বলে, আমার যে আর কেউ রইলো না!

আমরা আছি না? মারে, দুনিয়ার সবতেরেই যাইতে হইবো। আমরা যে বাইচ্যা আছি এইডাও এক রকম মরণের মতই। চাইরোদিগে কত মানুষ মরতাছে। আমরাও কোনসুম গুল্লি খাইয়া মইরা যাই তারও ঠিক নাই!

হিন্দু ধর্মের বিধান অনুযায়ী কাঠ দিয়ে চিতা সাজিয়ে হরি ঘোষের মৃতদেহ পোড়ানোর কথা। কিন্তু এখনকার এই প্রতিকূল পরিবেশে তা কিছুতেই সম্ভব নয়।

মমতার হাতে দিয়াশলাই দিয়ে হাসন আলি বললো, বাপের মুখে আগুন দিয়া সৎকার কর মমতা।

মমতা কাঁদতে কাঁদতে বললো, আমি বাবারে পোড়াইতে পারমু না!

মুখে আগুন ছোঁয়াইলেই হইবো!

হোসেন মৃধা বলে উঠলো, হিন্দুগ বাপের বড় পোলায় এই কাম করে দেখছি।

হরি কাকুর পোলা নাই বইল্যা কি তার সৎকার হইবো না?

মমতা তখনই দিয়াশলাই থেকে একটি কাঠি বের করে ফস করে আগুন ধারায়। তারপর মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে বসে শহিদ হরি ঘোষের মুখে আগুন ছুঁইয়ে দেয়।

হাসন আলি হরি ঘোষের মৃতদেহ কাঁধে তুললে চান্দভানু আর হোসেন মৃধা প্রায় একই সময় বলে উঠলো, লাশ লইয়া কই যাস?

হাসন আলি আলি এগোতে এগোতে বললো, মাটি চাপা না দিলে শিয়াল-কুত্তায় নষ্ট করতে পারে।

তাইলে আমরা যেহানে পলাইয়া আছিলাম ওহানেই নে! লম্বা মতন গর্ত একটা আছে। কোদালও আছে!

ওরা হরি ঘোষের মৃতদেহ মাটি চাপা দিয়ে নিশিন্দার জঙ্গলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

চলতে চলতে কিছুক্ষণ পর পরই চান্দভানু আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে তার পোড়া সংসারটার দিকে ফিরেফিরে তাকানোর ফলে বারবার থেমে যাচ্ছিলো তার চলার গতি। অন্ধকারে তেমন একটা দেখা না গেলেও বোঝা যায় আকাশে ঘরের পোড়া খুঁটির ছায়া।

হাসন আলি তার মায়ের দু’কাঁধ ধরে বললো, মা, বাইচ্যা থাকলে তোমার ঘর-সংসার তুমি ফিরা পাইবা। এহন আমাগ সামনে কোনোরকম বাইচ্যা থাকনটাই হইলো আসল কাজ!

নিজেদের বসত-বাড়ির এলাকা ছেড়ে তারা ভিন্ন আরেকটি জনশূন্য গ্রামের উপর দিয়ে চললো। প্রায় সব বাড়িই আগুনের ছোবলাক্রান্ত দেখা যায়। দু একটি বাড়িতে পোড়া টিনের নিচে মানুষের অস্তিত্ব মেলে তাদের কণ্ঠস্বরে। কে যায়?

সুরানন্দীর হোসেন মিরধা!

কিছুক্ষণ পরই তারা লোকালয় ছেড়ে অচষা ক্ষেতের উপর নামলে পাশেই এক রমণীকে দেখা যায় গাছে ঝুলানো কিছুতে ঝাড়ু অথবা তেমনি কিছু দিয়ে সপাটে মারতে মারতে বলছে, ক গোলামের পুত! আর রাজাকারি করবি?

চান্দভানু জুলেখা মমতা এমনকি হোসেন মৃধাও বিপদের কথা ভুলে গিয়ে এমন অদ্ভূত একটি দৃশ্য দেখতে পেয়ে থেমে গেল।

আহ হা, থামলা ক্যান? হাসন আলি অধৈর্য কণ্ঠে বলে ওঠে।

ওরা ফের চলতে আরম্ভ করলে, হাসন আলি জানায়, এই গাছে সামসু রাজাকাররে কাইল তার গ্যারামের মানুষরা মাইরা ঝুলাইয়া দিছে। তার আগেই পাইক্যারা যখন এই গ্যারামে আইয়া আগুন দিতাছিলো আর মাইয়া মানুষরে বেইজ্জতি করতাছিলো, তহনই খবর পাইয়া আমরা সবতেই দল বাইন্ধা আইছিলাম। সামসু রাজাকার পাইক্যাগরে খবর দিয়া আনছিলো। মাত্র দশজন আছিলো তারা। আমরা আওনের লগে লগেই শেষ কইরা দিছি! কিন্তু গ্যারামের মানুষ গুল্লি দিয়া সামসুরে মারতে দেয় নাই। তারে মারছে খেঁজুর আর মনকাঁটা দিয়া খোঁচাইয়া খোঁচাইয়া।

আর মাইয়া মানুষটা?

চলতে চলতেই প্রশ্ন করে চান্দ ভানু।

হাসন আলি তার সামনের মাটিতে একবার টর্চের ম্লান আলো ফেলে বললো, মাইয়া মানুষটার নাম আকলিমা। তার চোক্ষের সামনেই তার নয় মাসের মাইয়াটারে পাইক্যারা পারাইয়া মারছে। হেই কষ্টে অখন মাথা খারাপ হইয়া গেছে।

এর পর বেশ কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলে না। নিবিড় রাতের নৈশব্দে কেবল তাদের চলার শব্দই তাদের কানে প্রতিধ্বণিত হয়। মাঝেমাঝে দূর থেকে ভেসে আসে দু একটি বিচ্ছিন্ন গুলির শব্দ।

কিছুটা হাঁটার পরই বেশ শুকনো আর শক্ত মাটিতে চলতে লাগলো তারা। চান্দভানু বললো, এহানে পানি হয় নাই?

হাসন আলি চলতে চলতে জানায়, এহানকার পানি নামছে অনেক দিন!

পেছন থেকে জুলেখা অকস্মাৎ বলে উঠলো, শীতে আমার শইল কাঁপতাছে!

জ্বর আইলো নি? বলে, উদ্বিগ্ন চান্দভানু চলতে চলতেই জুলেখার কপালে হাত দিয়ে জ্বর অনুভব করতে চেষ্টা করে।

হাসন আলি বললো, ভিজা কাপড়ের লাইগ্যাই মনে কয় এমন!

তাও হইতে পারে!

আইচ্ছা আর কিছুডা কষ্ট কর, আর কিছুক্ষণের ভিতরেই আমরা পৈচ্ছা যামু!

ঘন গাছপালা বেত আর কাশের ঝোঁপের এভতর দিয়ে পথ চলতে গিয়ে পরনের কাপড়ে পা জড়িয়ে গিয়ে দুবার হোঁচট খায় চান্দ ভানু। সে বিরক্ত হয়ে বলে, মাইয়া মানষ্যেরে এত বড় কাপড় কে যে পিনতে কইছিলো! দশহাত কাপড় কোনো উপকারেই লাগে না!

মায়ের কথা শুনে অন্ধকারেই হাসন আলির মুখে হাসি ফুটে উঠলেও সে কিছু বলে না। তবে মনে মনে ভাবছিলো যে, খাকি প্যান্ট-সার্ট পরলে তার মা’কে কেমন দেখাবে?

আরো বেশ কিছুক্ষণ চলার পর অন্ধকার ঝোঁপ-ঝাড়ের আড়ালো মানুষ-জনের কথাবার্তা আর চলাচলের শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। তখনই হাসন আলি একবার পেছন ফিরে জানায়, আমরা আইস্যা পড়ছি। এহানেই আমাগো ঘাঁটি।

একটি ঝোঁপের আড়াল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আলিম বক্স তাদের দেখতে পেয়ে বললো, হাসন আলি আইলি?

হ। হাসন আলি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লে তার পেছনকার বাকি চারজনও দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর হাসন আলি ফের জানায়, বাপ-মা-বইন সবতেরে নিয়া আইলাম!

আলিম বক্স খানিকটা ইতস্তত করে বলেলা, এই জঙলা জাগায় তারা থাকবো কই? মাইয়া মানুষ নিয়া তো আরো বেশি সমস্যা!

হাসন আলি বললো, সেইটা পরে দেখমু! আগে কিছু শুকনা কাপড়ের ব্যবস্থা কর!

বিভ্রান্ত আলিম বলে উঠলো, মাইয়া মানুষের কাপড় পামু কই?

পাইক্যাগো খাকি পোষাক কতডি ধুইয়া রাখছিলাম না! ওইডি কি আছে?

ওইডি? আছে মনে কয়!

ব্যাগ্র কণ্ঠে হাসন আলি বলে ওঠে, তাইলে ওইডিই দে!

চান্দভানু নিচুকণ্ঠে বললো, আমরা ব্যাডা মানষ্যের কাপড় পিনমু? মানষ্যে কইবো কি?

হাসন আলি বললো, না পিনলে নাই। জ্বর-জারি হইলে দেখনের কেউ নাই। বাজারে কইলাম ওষুধও নাই!

জুলেখা বললো, আমি পিনমু!

হোসেন মৃধা বললো, অহন চাইরো দিগে পরাণে বাইচ্যা থাকন লইয়াই সবতে অস্থির।  মানষ্যের এত কিছু দেখনের সময় নাই!

আলিম বক্স সবগুলো প্যান্ট-সার্ট দু’হাতে জড়ো করে নিয়ে এলে মেয়েরা কাপড় নিয়ে অন্ধকারের আড়ালে চলে যায়।

আলিম তাদের উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো, বেশি আন্ধারে সাপ থাকতে পারে!

সাপ? তাও পাইক্যা আর রাজাকারগো থাইক্যা ভালা! অকস্মাৎ অন্ধকার থেকে বলে ওঠে জুলেখা।

(চলেব)

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


7 Responses to ধারাবাহিক উপন্যাস: কালসাপ-১১

  1. imrul.kaes@ovi.com'
    শৈবাল নভেম্বর 10, 2010 at 4:34 অপরাহ্ন

    গত পর্বগুলো বেশ রোমহর্ষক ছিল , এই পর্বে ভয় যেন একটু প্রশমিত হল । টাইপো একটা ভুল চোখে এল “… মাইয়া মানুষটায় নাম আকলিমা । তার চোক্ষের সামনেই তার নয় মাসের …? পাইক্যারা পারাইয়া মারছে ।”
    শব্দ বাদ পড়েছে ।

    শেষ লাইনটা সবচেয়ে বেশি ভাল লাগল ।

    • juliansiddiqi@gmail.com'
      জুলিয়ান সিদ্দিকী নভেম্বর 10, 2010 at 6:40 অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ শৈবাল। ঠিক করে দিলাম। :D

      একজন মনোযোগী পাঠক লেখকের জন্য অনেক বড় কিছু। ভালো থাকবেন। :rose:

  2. নীল নক্ষত্র নভেম্বর 11, 2010 at 11:37 পূর্বাহ্ন

    অনেক দিন পর চোখ মেলার সুযোগ পাইলাম। ই বই কেমনে করে ভাই জান?তারাতারি মেইল পাঠান।
    ভাল থেকে ভাল ভাল লেখা উপহার দিয়ে চলুন।

  3. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী নভেম্বর 11, 2010 at 9:18 অপরাহ্ন

    ঠিকই বলেছেন। তবে কারো চেহারার একটি আঁচিল তার সৌন্দর্যের হানি ঘটালেও তাকে অন্যদের থেকে বেশ খানিকটা আলাদাও করে। তাছাড়া একজন মানুষ কি সারাদিন নিজকে টানটান করে রাখতে পারে? কিংবা দিনের জৌলুস সারাক্ষণই বাজায় থাকা সম্ভব? অবশ্যই না। সারাদিন ধরে চেহারার টানটান অবস্থা বজায় রখতেই কিন্তু নানা পদের প্রসাধনের আবিবষ্কার। :-)

    গল্প, কাহিনীও এর ব্যতিক্রম নয়। লেখক ইচ্ছে করে যখন কাহিনীকে টানটান রাখতে যাবেন তখনই চরিত্রগুলো মেকি হয়ে উঠতে বাধ্য। তাদের আচরণও আরোপিত মনে হতে পারে। যেমন, ওইযে নারীটি

    গাছে ঝুলানো কিছুতে ঝাড়ু অথবা তেমনি কিছু দিয়ে সপাটে মারতে মারতে বলছে, ক গোলামের পুত! আর রাজাকারি করবি?

    , তার আচরণ কি আরোপিত মনে হচ্ছে? দৃশ্যটি আরো ফুটিয়ে তুলতে চাইলেই কিন্তু ভিন্ন রকম মনে হতো। অথচ এমন ঘটনা সেই সময়ের প্রেক্ষিতে কিন্তু একেবারেই অসম্ভব বা অবাস্তব নয়।

    ধন্যবাদ পূজা, মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্য। :rose:

  4. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী নভেম্বর 14, 2010 at 7:36 অপরাহ্ন

    এখানে নৈশব্দটা আগে। তারপর তাদের চলার কারণে সেই নৈশব্দ ভেঙে যাচ্ছে। ধন্যবাদ।

  5. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী নভেম্বর 14, 2010 at 7:38 অপরাহ্ন

    ওক্কে!

You must be logged in to post a comment Login