গল্প: কাঁটার মুকূট

Filed under: ইতিহাস,গল্প,মুক্তিযুদ্ধ |

“আপু, আপু এতো শব্দ কেন? কিসের শব্দ? এতো জোরে কেন?”

ছোট বোন নুমার হৈ চৈ আর ধাক্কা ধাক্কিতে রুমার ঘুম ভেঙ্গে গেল।

রুমার ঘুম ছোট বেলা থেকেই কিছুটা গাঢ়। মায়ের কথায়, আমাদের রুমার গায়ের উপর দিয়ে ট্রেন চলে গেলেও ওর ঘুম ভাংবে না।

নুমা অনেক কষ্টে রুমার ঘুম ভাঙ্গাল। চারিদিকে শুধু গোলা গুলির শব্দ আর বারুদের গন্ধ। প্রথমে ভাবল ডাকাত পড়েছে। কিন্তু হলের গেট তো বন্ধ। তা ছাড়া দারোয়ান মামু তো আছেই। ভয়ের কিছু নাই।

কিন্তু মনটা শান্ত হল না। গোলাগুলির শব্দ বাড়তে লাগলো। মনে হল সাথে সাথে দূর থেকে শোনা যাচ্ছে মানুষের আর্তনাদ। জগন্নাথ হলের দিক থেকে শব্দটা বেশী করে আসছে। একেবারেই বুঝতে পারছে না, ব্যাপারটা কি হতে পারে। কিছুক্ষণ পরেই গেটে ধাক্কা মারার প্রচণ্ড শব্দ।

দু বোন একজন আরেকজনকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলো।

রোকেয়া হলের সামনে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর লোকজন।

চিৎকার করে বলছে, আভি গেট খোল দো।

দারোয়ান মামু বলল, নেই কাভি নেই।

সাথে সাথে এক ঝাঁক গুলি ছুড়ল হানাদাররা।

সে দিন রাতটা ছিল একেবারে কুচকুচে কাল।

কাল রাত। কুচকুচে কাল রাত।

রাত তো কালই হয়। তা হলে কাল রাত বলার কি দরকার?

গভীর রাতে যদি নিরস্ত্র ঘুমন্ত মানুষের উপর অত্যাধুনিক অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে আক্রমন করে একটা জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়, চারিদিকে যদি গোলা বারুদ আর কামানের শব্দ হয়, আর তার সাথে সাথে যদি বিস্মিত মানুষের হাহাকার শোনা যায়, তবে তাকে কাল রাত ছাড়া কি আর বলা যায়!

কথা হচ্ছে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের  রাতকে নিয়ে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম লজ্জাকর ঘটনার উদাহরন খুব একটা মিলে না। গুলি চালাচ্ছে সশস্ত্র সেনাবাহিনী, ঘুমন্ত মানুষের উপর। তারা শুধু মানুষই মারছে না, পাল্টিয়ে দিতে চাচ্ছে বাংলার সহজ সরল মানুষগুলোর জীবন। তাদের হাসি, কান্না আর আশা। কেড়ে নিতে চাইছে তাদের ঠিকানা।

সেই কাল রাতের ছোবল থেকে থেকে রেহাই পেল না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  মেয়েদের হোস্টেল রোকেয়া হল।

পাক বাহিনীর বর্বর সেনা গুলো এখন রোকেয়া হলে ঢুকবে।

চিৎকার কর সবাই, বল, না। এ হতে পারে না।

উত্তর বঙ্গের একটা ছোট শহর গাইবান্ধা। সেখানকার এক প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল মেয়ে রুমা। পড়ালেখায় খুব ভাল। খেলাধুলা, বই পড়া, গল্প করা, সবই তার ভাল লাগে। কিন্তু সব চেয়ে বেশী ভালবাসে ঘুমাতে। সুযোগ পেলে ঘুমাতে হবেই। বাবা বলে, আমার বিড়াল মেয়ে। মা কি বলে, তা তো আগেই বলা হল।

দেখতে শুনতে ভাল। বিয়ের প্রস্তাব আসা আরম্ভ হল ক্লাস এইটে কখন পড়ে তখন থেকে। তার পরে যে কত প্রস্তাব আসলো, তার আর হিসাব রাখা হয় নি। বাবার পরিস্কার কথা, আমার মেয়েরা পড়ালেখায় ভাল। ওরা পড়ালেখা করবে। ঢাকায় যাবে। মেয়েদের, মানুষদের জ্ঞানের আলো দেখাবে। ওরা একেকজন বেগম রোকেয়া হবে।

রুমা অনেক চিন্তা ভাবনা করে ঠিক করলো, সে দর্শন পড়বে। মানুষকে নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতে হলে, পথ দেখাতে হলে এর থেকে বড় আর কি বিষয় হতে পারে। চারিদিকে শুধু আন্দোলন আর আন্দোলন। তার মধ্যে রুমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে পড়তে আসলো। রোকেয়া হলে থাকার জায়গা হয়ে গেল। ডঃ গুহঠাকুরতা থেকে আরম্ভ করে, কত না নামজাদা মানুষের সংস্পর্শে আসলো। তাদের মত হতে ইচ্ছা হল। এই অন্ধকার পৃথিবীতে শিক্ষার আলোর প্রদীপ জ্বেলে আলোকিত করার শপথ নিল।

ছোট বোন নুমার কলেজ শেষ হবে আগামী বছর। তার খুব ইচ্ছে বড়  বোনের মত ঢাকায় এসে পড়ালেখা করার। সে ও, বোনের থেকে গল্প শুনতে শুনতে, নিজেও স্বপ্নের বিশাল বড় একটা জাল বুনতে লেগে গেছে।  একাত্তরের ২২ শে মার্চ ঢাকায় আসলো; পাশের বাসার রহমত চাচার সাথে। মা অনেক করে বলেছিল, চারিদিকে এতো আন্দোলন। তোর এখন যাবার দরকার নাই। উত্তরে  নুমা বলল, মা কলেজে তেমন একটা ক্লাস হচ্ছে না। আপুর সাথে একটু থেকে আসি। তা ছাড়া এক বছর  পরে, আমিও আপুর মত ঢাকায় থেকে পড়ালেখা করবো। মা একে বারে ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও মত দিল।

পাকিস্তানের এক নাম জাদা পত্রিকা ডন। ২০০২ সালের মার্চ ২২, সেখানে এক লেখা বের হয়। তাতে বলা হয়, ইয়াহিয়া খান নিজে হুকুম দিয়েছিল, পূর্ব পাকিস্তানের (এখন বাংলাদেশ) জনগণের উপর সামরিক অভিযান চালাতে। লেখাটাতে আরও বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যশোরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বাঙ্গালীদের দিকে আঙ্গুল তুলে জানিয়েছিল, আগে এদের মুসলমান বানাও।

পাকিস্তানী নেতা আর সামরিক বাহিনীর বদ্ধমূল ধারণা ছিল, বাঙ্গালীরা মুসলমান না। তার পরে, শীর্ষ নেতার নির্দেশে।  পাক হানাদার বাহিনী নয় মাসে ত্রিশ লাখ বাঙ্গালী খুন করলো, আর কত যে আহত করলো তার কোন ইয়ত্তা নাই। এত কম সময়ে এত বেশী মানুষ মারার দিক থেকে, এটা পৃথিবীর রেকর্ড।

পাক দস্যু হানাদাররা বাঙ্গালীদের মুসলমান বানানোর কাজে আরও ভয়ঙ্কর, জঘন্য একটা কাজ করলো। দু লাখ বাঙ্গালী নারী তারা ধর্ষণ করলো। এটা পাশবিক সুখ মেটান, না কি মুসলমান বানানোর কাজ ছিল, তার উত্তর একমাত্র তারাই দিতে পারবে।

ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ছোট একটা কামরায়  ছয় জন মেয়েকে আটকে রাখা হল। এদের মধ্যে রুমা, নুমা আছে। এক জন, এক জন করে ধরে অন্য ঘরে নিয়ে যাওয়া হত। প্রথমবার কাঁদতে কাঁদতে গেলেও, ফিরত তারা চোয়াল শক্ত করে। মুখে কথা নেই, কিন্তু চোখে আগুন। প্রতিশোধ;প্রতিশোধ নিতে হবে! এ পশুদের এ দেশ থেকে তাড়াতে হবেই।

হানাদাররা, মেয়ে উঠানোর সময়ে ভাগ করে নিত কোনটা কার ভাগের। শিক্ষিত, সুন্দরীরা পড়তো অফিসারদের ভাগে, অন্যরা পাক্কু জোয়ানদের জন্যে। রুমা, নুমা দু জনকে আটকিয়ে রাখা হল অফিসারদের খোরাক হিসাবে। বন্দী জীবনের  প্রথম রাতেই ডাক পড়ল রুমার।

এক প্রহরী এসে টানতে টানতে  রুমাকে বের করতে লাগলো। রুমা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, না না আমি যাব না। জানোয়াররা আমাকে ছেড়ে দে। তার পরে গলার সব শক্তি এক জায়গায় জড় করে বলল, কে আছ? আমাকে বাঁচাও।  না কেও আসলো না বাঁচাতে। নুমা যেয়ে তার আপুকে জড়িয়ে ধরল। না, না,  তোমরা আপুকে কোথাও নিতে পারবে না। প্রহরী এক ঝটকায় নুমাকে এক কোণায় ছুড়ে ফেলে দিল। অন্য মেয়েরা চোখ বন্ধ করে, দোয়া দরূদ পড়তে লাগল। ইয়া আল্লাহ তুমি বাঁচাও।

গাইবান্ধায় খবরটা পৌঁছাতে সপ্তাহ দু য়েক লাগলো। এর মধ্যে ভাসা ভাসা খবর আসলো, ঢাকা শহর আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্বংসযঞের কথা। শুনল মিলিটারিরা অনেক ছাত্র গুলি করে মেরেছে। খবর শুনে রুমা-নুমাদের মার পাগল হয়ে যাওয়ার অবস্থা।  বাবা অনেক কষ্টে মাকে সামাল দিল। তোমাকে বাঁচতেই হবে। আমাদের আরেক সন্তান আছে। ওদের ছোট ভাই রতন স্বাধীন বাংলাদেশে বড় হবে। বুক ফুলিয়ে বলবে, ওর দুই বোন দেশ স্বাধীন করতে প্রান দিয়েছে।

মারা যাওয়ার থেকে আরও ভয়ঙ্কর খবর আসলো মাস দু য়েক পরে। রুমা- নুমা মরে নি। পাক শয়তানগুলো ওদেরকে আটকে রেখে ফুর্তি  করতে ব্যাবহার করছে। সাথে আরো অনেক মেয়ে আটকে রেখেছে। শুধু ঢাকা না, সারা দেশ জুড়ে একই ঘটনা চলছে। বাঙালী মারার  সাথে সাথে, দেশের মেয়েদের তারা ব্যাবহার করছে। বাবা খবর জানার পরে, পুরো এক দিন ঘরের দরজা বন্ধ করে চিন্তা করতে লাগল কি করা যায়। সারা দিন কিছু খেল না; কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলল না।

বাবা ঘর থেকে বের হয়ে মা কে বলল, তুমি রতনকে নিয়ে রহিমপুর চলে যাও। ওখানে   রুমা- নুমার নানার বাড়ী। বেশ ভিতরের দিকে। সেখানে হানাদারদের যেয়ে পৌঁছানোর সম্ভবনা কম। তার পরে বাবা, মাকে মেয়েদের খবরটা জানালো। বলল, আমি যুদ্ধে চললাম। যতদিন পর্যন্ত ঐ জানোয়ারদের শেষ না করতে না পারি, আমি ফিরবো না। মা মুখ প্রচণ্ড শক্ত করে, স্পষ্ট উচ্চারণে বলল, হানাদারদের শেষ না হওয়া পর্যন্ত তুমি আমার সামনে আসবে না। ততদিন আমি তোমার মুখ দেখতে চাই না।

প্রহরী ধাক্কা দিয়ে রুমাকে ব্রিগেডিয়ার সরফরাজ খানের কামরায় ফেলে দরজা বন্ধ করে দিল। ব্রিগেডিয়ার চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে বলল, how pretty ! That’s what my dream was. তার পরে উর্দুতে জানতে চাইলো, তুমি শেখ মুজিব সম্পর্কে কি জান। রুমি মাথা নীচু করে কাঁদতে থাকলো।

ব্রিগেডিয়ার সরফরাজ খান ধীরে সুস্থে একটা সিগারেট ধরাল। বলতে লাগলো, বোল তুম কেয়া জানতা? আবার নিজেই উত্তর দিল, তুম বাঙ্গালী আওরাত হো……তোমার তো কিছু জানার কথাও না। বলে হো হো করে উচ্চস্বরে হাসতে লাগলো।  তার পরে অদ্ভুত একটা কাজ করলো। জ্বলন্ত সিগারেটটা নিয়ে রুমার গলার নীচে ঠেসে ধরল। সাথে সাথে রুমার সেই জায়গাটা পুড়ে গেল। রুমা চিৎকার করে উঠলো, মা………………। কিন্তু আর্ত চিৎকার, চার দেয়ালের মধ্যেই কাঁদতে থাকলো। শব্দ শুনে কেও আসলো না, মা আসলো না।

এর পরের ঘটনা লজ্জা, দুঃখ, ক্ষোভ, অপমান আর প্রতিবাদের। বাংলার মাটিতে বাংলার এক নিষ্পাপ মেয়ে ধর্ষিত হল পাক হানাদার বিদেশির কাছে।  তার কান্না শুনে একটা মানুষ পর্যন্ত এগিয়ে আসলো না। রুমাকে টেনে হিঁচড়ে কাপড় ছিড়ে বিবস্ত্র করলো। পৃথিবীর সব চেয়ে সু-সুজ্জিত বাহিনীর এক ব্রিগেডিয়ার তার পাশবিক ক্ষুধা মেটাল গাইবান্ধা থেকে আসা রুমা নামের মেয়েটার উপর। যার স্বপ্ন ছিল বেগম রোকেয়া হওয়ার।

ছোট মেয়ে নুমা  পর্যন্ত এ অত্যাচার থেকে রক্ষা পেল না।  এক বুড়ো জেনারেলের চোখে পড়ে গেল। সাথে সাথে ফরমাস জারি হল, তার এই মেয়েকে চাই। একটা কুমারী মেয়ের সতীত্ব নষ্ট করে, বুড়ো বদমাশের কি বিভিৎস হাসি। সাথে চালাল অনেক ধরনের শারীরিক নিপীড়ন। প্রতি উত্তরে নুমা মুখের সবগুলো থু থু এক জায়গায় জড় করে ছুড়ে মারল জেনারেলের মুখে। বলল, পাষণ্ড এর যোগ্য জবাব তোদের পেতে হবেই। আল্লাহ উপর থেকে সব দেখছে। তোদের নরকের কীটরা খেতেও ঘেন্না করবে।

নুমা যখন ফিরে আসলো, তখন সেও অন্যদের মত নীরব, চোয়াল দৃঢ় শক্ত। ওই কামরার অন্য সবার এর মধ্যে একই অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে।

পাশবিক ঘটনায় কামরার সবাই বাকরুদ্ধ। পৃথিবী যদি দু ভাগ হত, তা হলে  ওখানে যেয়ে আশ্রয় নিত।

সাত সাগর আর তের নদীর পার হয়ে একটা দেশ আছে, তার নাম ক্যানাডা। আয়তনে বিশাল, ঠাণ্ডা পড়ে অনেক। কিছু জায়গায় মানুষ পর্যন্ত থাকতে পারে না। সেখানকার এক জন, ব্রায়েন এডামস। এক জন বিখ্যাত গানের শিল্পীর সাথে তার নাম মিলে যাওয়াতে বন্ধুরা তাকে নিয়ে রসিকতা করতো।

বেশ অল্প বয়স থেকেই ব্রায়েন বুঝতে পেরেছিল, অন্য দশটা ছেলেদের থেকে সে কোথায় যেন আলাদা। তার গায়ের রঙ আর কারোর সাথে মিলে না। এমন কি তার বাবা মা’র সাথেও না। এক দিন ক্লাসের বন্ধুরা তাকে ক্ষেপাল, সে না কি কালো।

বাবার নাম জন এডামস। তার কাছে এসে স্কুল থেকে এসে জানতে চাইলো, how come কেমন করে সে দেখতে বাবা  মা’র মত না। ছোট ব্রায়েন জানতে চাইলো, সে দেখতে কেন কাল। বাবা বলল, তুমি কাল না, তুমি ব্রাউন। প্রথমে ব্রায়েন বুঝতে পারলো না, মানুষ আবার ব্রাউন হয় না-কি? ওদের ছোট শহরে, সে তো সাদা আর কাল ছাড়া অন্য কোন ধরনের মানুষ  দেখে নি।

ব্রায়েন  আরও কিছু যখন বড় হল, সে তখন ধরেই নিল, তার আগের পুরুষরা হয়তো  কেও ডার্ক স্কিনের ছিল। অন্যরা যখন ক্ষেপাত, ভাবত ওদের আসলে ঈর্ষা হয়। কত মেয়ে ই তার সাথে প্রেম করতে চায়। মেয়েরা ব্রায়েন বলত পাগল। সবার থেকে দেখতে সে অন্য রকম।  হয়তো কারণ সেটাই।

১০

পাক হানাদারদের যুদ্ধের কিছু দিনের মধ্যেই গাইনী ডাক্তারদের প্রয়োজন হল। সামরিক ডাক্তাররা এ কাজ সামাল দিয়ে শেষ করতে পারল না। কিছু গর্ভবতী মেয়েকে মুক্ত করে দেয়া হল। পাক হোমরা চোমরা তাদের লজ্জা লুকাতে বেসামরিক গাইনী ডাক্তারদের  পর্যন্ত স্মরনাপন্ন হল।

নুমা গর্ভবতী হল।  লজ্জায়, দুঃখে এ খবর দু বোন কাওকে জানালো না। পাক্কুরা যখন বুঝতে পারল, তখন গর্ভের বাচ্চার বয়স, মাস দেড়েকের উপরে। বমি করা দেখে ওদের সন্দেহ হল। তার পরে, একদিন সকালে নুমাকে টেনে হিঁচড়ে এক গাড়িতে নিয়ে তুলল। সবাই দোয়া পড়তে লাগলো। ওরা ভাবতে লাগলো, হয়তো নুমাকে গুলি করে মেরে ফেলবে।

কিন্তু বাকি পাঁচ জন অবাক করে দিয়ে নুমাকে তিন দিন পরে ফেরত রেখে গেল। কারোর বুঝতে বাকি থাকলো না, কি করা হয়েছে।

নুমা, রুমাকে বলল, আপু আমি আমার বাচ্চাকে মেরে ফেলতে চাই নি। ওরা আমার হাত, পা, মুখ বেঁধে কাজটা করলো। বদমায়েশ জানোয়ারগুলো জানে না, ওরা আরেকটা খুন করলো। আমি আল্লাহ’র কাছে এর বিচার চাইব।

১১

ব্রায়েনের বয়স আঠার। সে এখন একা থাকা আরম্ভ করবে। মায়ের সাথে আর থাকবে না। এই দেশের এই নিয়ম। মাকে একা রেখে যেতে ইচ্ছা করছিল না। তার এক বন্ধুর বাবা, তার জন্যে মন্ট্রিয়লে চাকরির ব্যবস্থা করেছে। সে টা ওদের এই ছোট শহর থেকে অনেক দূরে। মাকে ইচ্ছা করলেই সে দেখতে পারবে না। মা কেলি এডামস  বলল, don’t worry.  আমরা ফোনে প্রতিদিন কথা বলবো। তা ছাড়া বড় শহরে গেলে,  you will have a better life. May be  ওখানে তুমি বড় ডিগ্রি নিতে পারবে। অনেক টাকার চাকরিও পাবে।

ব্রায়েনের দশ বছর বয়সে বাবা মায়ের ছাড়া ছাড়ি হয়ে গেল। মায়ের কাছে কারণ জানতে চাইলে বলেছিল, পুরুষ মানুষতো এক জায়গায় বেশী দিন ভাল লাগে না।  তার পরে মায়ের জীবনে কিছু পুরুষ আসলেও, কেও বেশী দিন স্থায়ী হয় নি।

শুধু বাবা জন এডামসের একটা কথা তার পরিষ্কার মনে আছে। মা বলছিল, make sure তুমি চাইল্ড সাপোর্টের খরচ ঠিকমত পাঠিয়ে দিচ্ছ। বাবা অবাক করে উত্তর দিল, ও কি আমার ছেলে যে আমাকে খরচ দিতে হবে। মা চিৎকার করে বলল, this was your idea.  তোমার কথামত কাজটা করা হয়েছিল। উত্তরে বাবা হুঙ্কার দিয়ে বলল, because তোমার পক্ষে আমাকে বাচ্চা দেয়া সম্ভব ছিল না।

বিদায়ের সময় মা একটা প্যাকেট বের করলো, এর মধ্যে তোমার কিছু প্রাইভেট জিনিস আছে……from your real mom. ব্রায়েন অবেক হয়ে মা য়ের দিকে তাকাল। কি বলে, your real mom। সেই তো তার মা। তার নাম তো কেলি। মা কেলি এডামসের বিষয়টা চোখে পড়ল। সে বলল, from your biological mother.

১২

বাংলাদেশ স্বাধীন হল ১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১।  তার পরের দিন-ই নুমা মুক্তি পেল। বড় বোন রুমা কোথায়, নুমা তা জানে না। নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে নুমা কিছুক্ষণ কাঁদল, তার পরে অনেকক্ষণ হাসল। কত দিন ওরা কাঁদে নি, কত দিন হাসে নি। তারা তো যুদ্ধে ছিল! যুদ্ধে কি হাসি-কান্নার সুযোগ থাকে?

পুরো নয় মাস তারাও যুদ্ধ করলো। মুক্তিযোদ্ধাদের শত্রু পাক হানাদাররা আত্মসমর্পণ করলো। কিন্তু এই মেয়েদের যুদ্ধ শেষ হল না। কোথায় যাবে, কি করবে, কি খাবে, তা নিয়ে আরম্ভ হল চরম অনিশ্চয়তা। বেশীর ভাগ মেয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারলো না। বাবা-মাকে কি করে মুখ দেখাবে? তাদের মেয়েদের পাক হানাদাররা আটকিয়ে রেখেছিল। বাবা-মা সে-টা ভুলতে পারলেও, বাঙ্গালী সমাজ তা ভুলার জন্যে প্রস্তুত ছিল না।

যুদ্ধ শেষ। পঁচিশ হাজার বাঙ্গালী মেয়ের গর্ভে সন্তান। সমাজ কি, রাষ্ট্র পর্যন্ত জানে না কি করা যায়। মাদার টেরেসা থেকে আরম্ভ করে অনেক সংঘঠন এগিয়ে আসলো। প্রফেসর নীলিমা ইব্রাহিম অস্থির হয়ে পড়লেন, এদেরকে নিয়ে কি করা যায়। তার ধারনা ছিল, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের জেল থেকে দেশে ফিরে আসলে, এর একটা প্রতিকার হবে। এই মা আর শিশুদের জন্যে আইন হতে পারে। এরা অবশ্যই সম্মানের দাবীদার।

বঙ্গবন্ধু বললেন, এই সব মেয়েরা বীরঙ্গনা। তিনি বললেন, এরা সবাই আমার মেয়ে। কিন্তু বাচ্চাদের ব্যাপারে পরিস্কার জানিয়ে দিলেন, এই সব জারজদের (bustards) শরীরে পাকিস্তানী রক্ত। এদেরকে এ দেশ থেকে পাঠিয়ে দিতে হবে। ক্যানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, আর ইওরোপের কিছু দেশ রাজী হল বাচ্চাগুলোকে নিতে।

অনেক মা’ ই তার বাচ্চাদের দিয়ে দিতে রাজী ছিল না।  তাদের বিরুদ্ধে জোর খাটানোর হয়েছিল বলে কিছু অভিযোগ পাওয়া যায়। আবার এমন কিছু ঘটনা শোনা যায়, মাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে ছোট শিশুকে সরিয়ে নেওয়ার।

১৩

ব্রায়েন এডামস বুঝতে চেষ্টা করলো, মানুষ কেন ধর্ষণ করে আর এইটা কি একটা যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে ব্যাবহার হতে পারে। সে খোঁজা আরম্ভ করলো তার মত আরও ভুক্তভুগিদের। বেশ কিছু ছেলে মেয়ের খবর পেল। এর মধ্যে কেও কেও আত্মহত্যা করেছে, যখন তারা জেনেছে তাদের জন্ম ধর্ষণ থেকে আর তাদেরকে নিজের মাতৃভূমি, জন্মভূমি তাদের রাখতে চায় নি।  যদিওবা, এখন তাদের নাগরিকত্ব ক্যানাডার আর অন্যান্য দেশের আছে। আবার কিছু  ছেলেমেয়ে ড্রাগের জগতে হারিয়ে তাদের অস্তিত্ব ভুলতে চেয়েছে। তবে ব্রায়েন এটাও  জানলো, এদের একটা বড় অংশ সমাজের মূল ধারার সাথে মিলে বেশ আছে।

ব্রায়েনের ইচ্ছা করলো বাংলদেশের যুদ্ধ শিশুদের নামের একটা তালিকা নিয়ে, জাতিসংঘের কাছে বিচার দাবী করতে। ধর্ষণ যাতে যুদ্ধে অস্ত্র হিসাবে কখন আর ব্যাবহৃত না হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এ রকম বাচ্চাদের তালিকা নিজেই দফায় দফায় নষ্ট করে ফেলেছে। এখন বিশ্ববাসীকে দেখানোর মত আর কিছু নাই। ব্রায়েন ভাবল, পাকিস্তান সরকারের কাছে এ রকম কোন তালিকা আছে কি-না। তার জন্যে আরও  অবাক হওয়া  বাকি ছিল। পাকিস্থান বলে এ রকম কোন ঘটনাই হয় নি। সব মিথ্যা, ভাওতা। তাই যদি ঠিক হয়, তা হলে সে জন্ম নিল কি করে?

১৪

১৯৭২ সালের ১৪ এপ্রিল। রুমার ঘুম বেশ দেরী করেই ভাঙল। এ রকম করে তো অনেক দিন রুমা ঘুমায় নি। সেই হানাদাররা যুদ্ধ আরম্ভ করলো, তখন থেকেই তার সে-ই সাধের ঘুমের মৃত্যু হয়েছে। এখন বিছানায় শুয়ে থাকলে, তন্দ্রার বেশী কিছু হয় না। তাকে ঘুম বলা যায় না। একটা আতংক কাজ করে সারাক্ষণ।

জানালা দিয়ে সূর্যের আলো দেখা যাচ্ছে।  মনে হচ্ছে দূর থেকে অনেক মানুষের এক সাথে গান গাওয়ার শব্দ ভেসে আসছে। এসো হে বৈশাখ, এসো এসো। কি অবাক কাণ্ড। সারা রাত ঘুম ভাঙ্গে নি। ছোট জয় এতক্ষণ না খেয়ে আছে। নিজের উপর খুব রাগ হতে লাগলো।

রাতে জয়কে নিয়ে শুয়েছিল। ওকে বিছানায় দেখা যাচ্ছে না কেন? ও তো বিছানার ডান দিকে শুয়েছিল। তা হলে কি গড়িয়ে বিছানা থেকে পড়ে গেল। এতটুকু বাচ্চা, গড়াতেই পারে না। সেইটা কি করে সম্ভব? রুনা ছুটে গেল, বিছানার অন্য দিকে। না ওখানেও নাই। বিছানার নীচ; সব জায়গা দেখল। এত টুকু বাচ্চা হাটতে পারে না। হেঁটে বের হয়ে যাবার কোন সম্ভবনা নাই। অজানা এক চিন্তায় মায়ের মন কেঁপে উঠলো। তবে কি জয়কে ওরা লুকিয়ে নিয়ে গেছে।

১৫

ব্রায়েন তার বায়োলজিকাল মায়ের দেয়া প্যাকেটটা খুলল। একটা ব্যাগের মধ্যে দুটো জিনিষ। একটা চিঠি আর একটা সোনার লকেট, চিঠিটা ইংলিশে লেখা। বেশ গোটা গোটা অক্ষরে। বাবা জয়, আমি তোমার মা। আমার নাম রুমা। তোমার দত্তক বাবা-মাকে বলতে বলেছিলাম, তুমি যত দিন বুঝতে না শেখ; তত দিন এই চিঠিটা তোমাকে না দিতে। বাবা, তোমাকে আমি একাই মানুষ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওরা আমাকে সে টা করতে দিল না। আমাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে, ওরা তোমাকে চুরি করে নিয়ে গেল। আমার পাশে এসে কেও দাঁড়াল  না। না সমাজ; না রাষ্ট্র; না কেও। দেশকে স্বাধীন করতে আমরাও যুদ্ধ করেছি। জানিনা তার প্রতিদান এমন হল কেন…………এই সোনার লকেটটা আমার গলার থেকে খুলে দিলাম। তুমি বিয়ে করলে বউকে দিও…………শুধু একটা জিনিষ মনে রেখ। যীশু খ্রীষ্টেরর কোন বাবা ছিল না। সে যেমন পবিত্র ছিল; তুমিও তেমন পবিত্র। তুমি আমার রক্ত মাংসে গড়া। তোমাকে আমি তিল তিল করে আমার পেটে মধ্যে বড় করেছি……………… যদি পার এই চরম অবিচারের জন্য বিচার চেও। ওই পাক হানাদার পশুদের বিচার চেও।

ব্রায়েন ছুটে গেল বাংলাদেশে, মাকে  খুঁজতে। পেল না তাকে, অনেক কষ্টে খুঁজে পেল খালা নুমাকে। অনেক কথা হল তার সাথে। তার থেকেই শুনল মায়ের ঘুম প্রীতির কথা। খালা বলল, তোমাকে ক্যানাডা নিয়ে যাবার পরে, তোমার মা ঘুমান ছেড়ে দিল। সারাদিন উদাস হয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতো। কারোর সাথে কোন কথাই বলত না। আমরা ওকে পাবনার মানসিক হাসপাতালে দিয়ে আসলাম। মাস ছয়েক পরে ওখানেই সে মারা যায়। শেষের মাস খানেক সে কিছুই খেত না, একেবারেই ঘুমাত না। ডাক্তার, নার্সরা  জোর করে তার শরীরে খাবার ঢুকিয়ে শেষের কয়টা দিন বাঁচিয়ে রেখে ছিল।

১৬

রুমার বুঝতে বেশী ক্ষণ লাগলো না, ব্যাপারটা কি হয়েছে। তার বাচ্চাকে বিদেশ পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। সে আর জয়ের মুখ কখন দেখবে পারবে না। ঘণ্টা দুয়েক কান্নার পরে,  প্রফেসর  নীলিমা ইব্রাহিমকে যেয়ে একটা অনুরোধ করলো। তার একটা ছোট প্যাকেট যাতে ছেলের সাথে যায়। আর সেটা ছেলে প্রাপ্ত বয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত তাকে না দেয়া হয়। সে জানে আজকে সন্ধায় জয়কে বাংলাদেশ থেকে বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হবে।

যুদ্ধের শেষের দিকে পাক হানাদাররা বেশ কিছু মেয়ে যারা অন্তঃসত্বা ছিল, তাদের শহরে নিয়ে ছেড়ে দেয়। তাদের মধ্যে রুমাও ছিল। ঢাকায় যারা আত্মীয় স্বজন ছিল, তারা কেও রুমাকে বাসায় থাকতে দিতে রাজী হল না। বাধ্য হয়ে এখানে সেখানে রাত কাটালো। যুদ্ধ শেষ হলে, ওদের মত মেয়েদের জন্য কিছু পূর্ণনাসন কেন্দ্র খোলা হয়। রুমা সেখানকার একটাতে যেয়ে উঠে।

বিশেষ ব্যাবস্থায় যারা গর্ভপাত করাতে চায়, তাদের পেটের শিশু নষ্ট করা হল। কিছু মেয়ে, এতে কোন ভাবেই রাজী হল না। রুমা তাদের একজন। এর মধ্যে নুমাও মুক্তি পেয়েছে। এক আত্মীয় যে রুমাকে বাসায় রাখে নি, সেখানে নুমাকে আশ্রয় দিল।  অবশ্য এর মধ্যে পাক হানাদাররা পরাজিত হয়েছে। নুমা আপার সাথে দেখা করতে এসে বলল, আপা পাপের চিহ্ন মুছে ফেল। তার পরে চল, গাইবান্ধায় ফিরে যাই। আবার সব কিছু নতুন করে আরম্ভ করি। কিন্তু না কোন ভাবেই কেও রুমাকে এ ব্যাপারটায় রাজী করাতে পারলো না।

১৭

বাংলাদেশের যত বয়স, ব্রায়েন এডামসের মোটামুটি তত বয়স। একটা জিজ্ঞাসা নিয়ে সে জীবনের বেশীর ভাগ সময় কাটিয়ে দিয়েছে। মানুষ যুদ্ধে কিংবা কোন আক্রোশ মেটাতে বন্দুক নলের সাথে সাথে চামড়ার নল কেন ব্যাবহার করে। এইটা কি বিধাতার দেয়া কোন পবিত্র ক্ষমতা না? এটা না বংশ প্রজননের জন্য? যার না পুরো দায়িত্ব একজন পুরুষকে নিতে হয়।

আরেকটা প্রশ্ন তার মাথায় ইদানীং কাজ করে, বাংলাদেশের সরকার পাক হানাদার বাহিনীর সহযোগী বাঙ্গালীদের বিচার করার পায়তারা করছে। কিন্তু যারা হত্যা আর ধর্ষণের মূল ভুমিকা পালন করলো, তাদের বিরুদ্ধে কেও কিছু বলে না। বিচার করা তো দূরের কথা। কমপক্ষে বাংলাদেশ তো দাবীটা করতে পারে, পাকিস্তান সরকার যাতে ১৯৭১ সালে তাদের করা অপকর্মের জন্যে আনুষ্ঠানিক ভাবে ক্ষমা চায়।  বাংলাদেশের যুদ্ধ শিশুদেরকে ক্ষতিপুরন দেয়।

ব্রায়েন হিসেব করে, এখন ২০১১ সাল শেষ হয়ে যাচ্ছে। এই তো মাত্র কয়েকদিন আগে গাদ্দাফি বাহিনী বিরোধী দলের মেয়েদের উপর ধর্ষণ চালিয়েছে বলে অভিযোগ এসেছে। এ যেন একই ইতিহাসের  পুনরাবৃত্তি বারে বারে ঘটছে। ইদানিংকালের, রোয়ান্ডার গৃহ যুদ্ধে টুটসি মেয়েদের প্রকাশ্যে ধর্ষণ করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কা আর বসনিয়ার যুদ্ধগুলোয় একই ঘটনা হাজারে হাজারে হয়েছে।

ব্রায়েন নিজের মায়ের চিঠিটা পড়ার পর থেকে নিজের পরিচয় দেয়, আমার নাম ব্রায়েন ‘জয়’  এডামস। তার পরে বলে, জয় মানে victory।   গর্ব করে বলতে থাকে, আমার মা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্ত করার জন্য যুদ্ধ করেছিল । তার থেকে আমার নাম হয়েছে জয়। কথাগুলো বলতে তার গর্বে আনন্দে চোখ পানিতে ভরে উঠে।

তার পরেও কি একটা কাঁটার খোঁচা তার হৃদয়কে ক্রমাগত রক্তাক্ত করতে থাকে প্রতিটা মুহূর্তে।

ডিসেম্বার ১০, ২০১১

www.lekhalekhi.net

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

12 Responses to গল্প: কাঁটার মুকূট

  1. অস্বাদারণ গল্প কাজী ভাই, পড়তে-পড়তে মনটা উদাস হয়ে যায় আর থু-থু ছিটাতে ইচ্ছে করে নরপশুদের সারাশরীরে। অসংখ্য ধন্যবাদ, গল্পটির জন্য।

  2. ধন্যবাদ ভাই। আরও পাঁচ জনকে গল্পটা পড়তে বলবেন।

    quazih@yahoo.com'

    কাজী হাসান
    ডিসেম্বর 14, 2011 at 1:16 পূর্বাহ্ন

  3. অসাধারণ গল্প। চোখে পানি এসে গেল। সত্যি আমরা খুব অকৃজ্ঞ, সামান্য সম্মান টুকুও দিতে পারলাম না সেই সব বীর নারীদের!

    israt_ij@yahoo.com'

    কাচ সমুদ্র
    ডিসেম্বর 14, 2011 at 4:21 পূর্বাহ্ন

    • বাবা, আপনি দেখি বেশ কঠিন উপাধি নিয়েছেনঃ কাচ সমুদ্র।
      আপনার মন্তব্যের জন্যে অনেক ধন্যবাদ। আসলে এই লেখায় যুদ্ধ শিশুদের কথাও এনেছি। তাদের প্রতি আমাদের অবশ্যই সম্মান দেখান উচিৎ। আমার মতে, তাদের সবাইকে বাংলাদেশের সম্মানসুচক নাগরিক করতে হবে। আপনারা কি বলেন?
      আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

      quazih@yahoo.com'

      কাজী হাসান
      ডিসেম্বর 15, 2011 at 1:50 পূর্বাহ্ন

  4. শৈলী সৃজনটিকে “এক্সক্লুসিভ” মর্যাদা প্রদান করল। আপনাকে অভিনন্দন।

    শৈলী
    ডিসেম্বর 14, 2011 at 7:13 পূর্বাহ্ন

  5. পুরো এক জীবন্ত ইতিহাস

    mamunma@gmail.com'

    মামুন ম. আজিজ
    ডিসেম্বর 15, 2011 at 7:00 পূর্বাহ্ন

  6. গল্পটা ইতিহাসের মতই শোনালো।অভিনন্দন এটা এক্সক্লুসিভ হওয়ারই যোগ্য একটি লেখা।তবে এই যুদ্ধ কি আর অন্যটাই কি, আপনি গাদ্দাফীর আর টুটসি মেয়েদের বেলায় যা বললেন তাই তো হয়ে থাকে। পশুধর্ম অনুযায়ী সবল দুর্বলকে এভাবেই অত্যাচার করে।মানুষ কি তাহলে পশুর সমকক্ষ!খুব ভালো একটি লেখা।শুভ কামনা।

    rabeyarobbani@yahoo.com'

    রাবেয়া রব্বানি
    ডিসেম্বর 15, 2011 at 8:26 পূর্বাহ্ন

  7. এক জন পাঠক গল্পটা পড়ে নীচের কবিতাটা লিখে পাঠিয়েছেঃ

    আমি ‘৭১এর বীরাঙ্গনার সন্তান
    – মারুনা রাহী

    আমার জাতীয় সঙ্গীত হবার কথা ছিল,
    “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি…।।“
    আমার কণ্ঠে ধ্বনিত হবার কথা ছিল,
    রবীন্দ্রনাথ, নজরুল আর জীবনানন্দ।
    আমার মুখ মুছিয়ে দেবার কথা ছিল,
    একটি নরম শারীর আঁচল।
    আমার শৈশব কৈশোরের মাথাকে আদরে টেনেছিল যে বুক,
    রাঙা আউশের গরম ভাতের গন্ধ তাতে ছিলনা ।
    আমি একাত্তরের বীরাঙ্গনার সন্তান।
    আমাকে এসব কিছু থেকে বঞ্চিত করে,
    আমার মূল থেকে ছিনিয়ে
    রোপণ করা হয়েছিল বিভূঁয়ের অন্য কোন মাটিতে।
    আমি বেড়ে উঠেছি কিছু সাদা মানুষের
    প্রশ্নবোধক চাউনির মাঝে।
    প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ জিজ্ঞাসায়
    ‘ তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ?
    তোমার রঙ বাদামী কেন?’
    কে দেবে উত্তর?
    পরিচয়হীনতার সুতিক্ষ্ন বর্শা
    প্রতিনিয়ত আমাকে খুঁচিয়ে করেছে রক্তাক্ত ।
    গভীর হতাশার মাঝে এভাবেই
    পদার্পণ করেছি যৌবনে ।
    ছুটে গেছি আমার শেকড়ের খোঁজে ।
    সত্যের রুদ্ধ দুয়ার অতিক্রম করে আমি জেনেছি-
    আমি একাত্তরের বীরাঙ্গনার সন্তান ।
    হে জাতির জনক,
    তোমার হৃদয় নিংড়ানো ঘৃণা আর লজ্জা
    আমাকে করেছে মাতৃ কোল থেকে বিচ্যুত,
    স্বদেশের মাটি থেকে বিতারিত,
    শেকড়বিহীন, হতাশা নিমজ্জিত অন্ধকার মানুষ।
    (৭১ এর যুদ্ধ সন্তান যাদেরকে মাতৃ কোল থেকে ছিনিয়ে, পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল পশ্চিমা দেশগুলোতে তাদেরকে উৎসর্গ )

    quazih@yahoo.com'

    কাজী হাসান
    ডিসেম্বর 16, 2011 at 1:56 পূর্বাহ্ন

  8. কিচ্ছু বলবো না, কাজী ভাই। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুধু স্যালুট জানালাম।
    যোগ্য লেখাকে এক্সক্লুসিভ করায় শৈলী কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
    প্রিয়তে রেখে দিলাম।

    রাজন্য রুহানি
    ডিসেম্বর 23, 2011 at 4:23 অপরাহ্ন

মন্তব্য করুন