শৈলী প্রকাশনীর ই-গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত মন্ট্রিয়লে এক নতুন ইতিহাসের সূচনা

Filed under: শৈলী |

২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় প্রতিকুল আবহাওয়া ও বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে মন্ট্রিয়লের কোট দি নেইজ লাইব্রেরী ভবনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দর্শক-স্রোতা এই অনুষ্ঠানটি উপভোগ করার জন্য উপস্থিত হন। আগত দর্শকের মধ্যে কমিউনিটির শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে লেখকের জনপ্রিয়তা প্রতিভাত হয়েছে।

তিনদিনের মাথায় দৈনিক পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় ছাপা হলো শাহানার মৃতদেহের ছবি। যার নিচে হেডলাইন দেয়া হয়েছে, ‘লজ্জায়, ঘৃণায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন শাহানা’। ঘটনার বিবরণে বলা হয়েছে, মৃতার মুষ্ঠিতে প্রাপ্ত চিরকূট থেকে জানা যায়, তার নাম শাহানা। পড়েছিলো এক নারী পাচারকারী দলের খপ্পরে। নানা ফন্দি-ফিকির করে এক সময় পাচাকারীদের খপ্পর থেকে পালাতে সক্ষম হলেও নারী জীবনের সর্বস্ব হারানোর লজ্জায়, ঘৃণায় বেছে নিয়েছেন আত্মহত্যার পথ। চিরকূটের এক স্থানে লেখা ছিলো, ‘প্রিয় আরিফ, আমাকে ক্ষমা কোরো।’

পত্রিকায় সংবাদটা পড়ে পাগলের মতো হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলো আরিফ। ওর কানের কাছে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো শাহানার সেই কথাগুলো, ‘কেনো জানি এ শহরটাতে আমার একদম ভালো লাগছে না। আরিফ, চলো আমরা গ্রামে ফিরে যাই।’

গল্পটা শেষ করে লেখক যখন থামলেন তখন গোটা হল রুম জুড়ে থমথমে পরিবেশ। কারো মুখে কথা নেই। যেনো সকল স্রোতা কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছন। কারো কারো চোখ ছলছল করে উঠলো গল্পের নায়িকা শাহানার জন্য।

গত ২ ডিসেম্বর মন্ট্রিয়লের ৬৭৬৭ কোট দে নেইজ লাইব্রেরী ভবনের ৬০২ নম্বর হল রূমে সূচিত হয়েছে এক নতুন ইতিহাস। কানাডার অনলাইনভিত্তিক প্রকাশনী শৈলী কর্ত্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের স্বনামধন্য গল্পকার মাহাবুবুল হাসান নীরুর ই-গ্রন্থ ‘সেরা দশ গল্প’র প্রকাশনা উৎসবে উপস্থাপনার নান্দনিক ছোঁয়া দর্শক-স্রোতাদের হৃদয় স্পর্শ করে নিবিড়ভাবে। চমৎকার পরিবেশে অনুষ্ঠিত মন্ট্রিয়লের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান A1 টিউটোরিয়াল আয়োজিত এই প্রকাশনা উৎসব মন্ট্রিয়লের বাঙ্গালি কমিউনিটির ইতিহাসে এক অনন্য আয়োজন হিসেবে পরিগনিত হবে। একটি প্রকাশনা উৎসব যে কতো বর্ণাঢ্য, কতো হৃদয়গ্রাহী, কতো মনোমুগ্ধকর হতে পারে তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হিসেবে এই উৎসবটি থেকে যাবে। একটি বইয়ের প্রকা‍শনা উৎসবকে ঘিরে যে এতো আগ্রহ, আকর্ষণ থাকতে পারে সেটা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। বিশেষ করে গ্রন্থটি যখন ই-বুক। জানা মতে, নর্থ আমেরিকায় এটাই প্রথম ই-গল্পগ্রন্থ এবং সেই গ্রন্থকে ঘিরে এ ধরেণের আয়োজনও এটাই প্রথম। এটাও হয়ে থাকবে ইতিহাস।
২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় প্রতিকুল আবহাওয়া ও বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে মন্ট্রিয়লের কোট দি নেইজ লাইব্রেরী ভবনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দর্শক-স্রোতা এই অনুষ্ঠানটি উপভোগ করার জন্য উপস্থিত হন। আগত দর্শকের মধ্যে কমিউনিটির শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তি থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে লেখকের জনপ্রিয়তা প্রতিভাত হয়েছে।
ই-গ্রন্থটিতে প্রকাশিত লেখকের সেরা দশ গল্প’র ওপর আলোচনা করেন মন্ট্রিয়লের শীর্ষ পর্যায়ের শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিকরা। এদের মধ্যে ছিলেন, ড. ওয়াইজউদ্দিন আহমেদ- প্রফেসর, ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, কনকর্ডিয়া ইউনিভার্সিটি। ড. মহিউদ্দিন তালুকদার, ড. আবিদ বাহার-প্রফেসর, হিউম্যানিটিস ডিপার্টমেন্ট, ডাউসন কলেজ ও মনিকা রশিদ-শিল্পী ও সাহিত্যিক।

কথাসাহিত্যিক মাহাবুবুল হাসান নীরুর সেরা দশ গল্পের প্রকাশনা উৎসব সংক্রান্ত সংবাদ ও ছবি কানাডার বাংলা পত্র-পত্রিকাগুলোতে বেশ গুরুত্বের সাথে ছাপা হয়েছে। এ জন্য শৈলী প্রকাশনীর পক্ষ থেকে পত্র-পত্রিকাগুলোকে জানানো হচ্ছে আন্তরিক ধন্যবাদ।

শৈলী প্রকাশনী কর্ত্তৃক প্রকাশিত স্বনামধন্য গল্পকার মাহাবুবুল হাসান নীরুর ই-গ্রন্থ সেরা দশ গল্পের প্রকাশনা উৎসবের চিত্র। চার আলোচক : ড. ওয়াইজউদ্দিন আহমেদ- প্রফেসর, ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, কনকর্ডিয়া ইউনিভার্সিটি, ড. মহিউদ্দিন তালুকদার, ড. আবিদ বাহার-প্রফেসর, হিউম্যানিটিস ডিপার্টমেন্ট, ডাউসন কলেজ ও মনিকা রশিদ-শিল্পী ও সাহিত্যিক। উপস্থাপক, অন্যান্য বক্তা ও অংশগ্রহণকারী আবৃত্তিকার ও শিল্পীরা।


পাঁচ পর্বের এই আয়োজনে প্রথম পর্ব ছিলো স্বাগত ও শুভেচ্ছা বক্তব্য। এর পর দ্বিতীয় পর্বে কম্পিউটারে গ্রন্থটির প্রচ্ছদ উন্মোচন করে নর্থ আমেরিকার ইতিহাসে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পথ ধরে এমন বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলা গল্প-সাহিত্যের একটি নতুন যুগের সূচনা করেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. ওয়াইজউদ্দিন আহমেদ। যে ইতিহাস এ অঞ্চলের বাঙ্গালিদের মাঝে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বিস্তৃত হবে।
তৃতীয় পর্বে শুরু হয় ই-গ্রন্থে প্রকাশিত লেখকের গল্পগুলোর ওপর আলোচনা। ইংরেজি সাহিত্যের ওপর কোলকাতা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে বর্তমানে কানাডায় বসবাসরত সাহিত্যিক ও শিল্পী মনিকা রশিদ লেখকের গল্পের ওপর তার বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তুলে ধরেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যে ছোট গল্পের ছোট্ট একটা ভূমিকা। তিনি বলেন, ‘মাহাবুবুল হাসান নীরুর সব গল্পই আমি পড়েছি। যে আগ্রহ নিয়ে তার গল্পগুলো পড়া শুরু করেছিলাম, গল্প পড়তে গিয়ে সে আগ্রহ অনেক বেড়ে গেছে। আমার ভীষণ ভালো লেগেছে তার গল্পগুলো। প্রত্যেকটি গল্প শুরু করে শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত কোথাও ধাক্কা খেতে হয়নি। থেমে যেতে হয়নি। এটাই একজন গল্পকারের সব চাইতে বড় গুণ যে, পাঠক বিরক্ত হচ্ছেন না, থেমে থাকছেন না। এনজয় করছেন; উপভোগ করছেন। হ্যাঁ, তার দ্বিমত থাকতে পারে। কিন্তু ঐ যে আকৃষ্ট কিংবা আকর্ষণ করে ধরে রাখার ক্ষমতা, সেটা তার প্রতিটি গল্পে আমি আমার নিজের অনুভূতি দিয়ে অনুভব করেছি। আমার হৃদয়কে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে গ্রন্থে প্রকাশিত তার দ্বিতীয় গল্প ‘চলো গ্রামে ফিরে যাই’। অসাধারণ একটি গল্প। এর মধ্যে আকর্ষণ হচ্ছে, নগর জীবনের গন্ডিবদ্ধ সময়ের বাইরে খোলা হাওয়া, উন্মুক্ত আকাশের আহ্বান। আমারা যারা গ্রামে জন্মেছি অথচ নগর জীবনে বসবাস করছি তাদের প্রবলভাবে আকর্ষণ করবে এই গল্পটি।’ মনিকা রশিদ বলেন, ‘লেখকের গল্পগুলো অতি উঁচু মাপের ও মানের, তার সাথে গল্পটির প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ খুব একটা সমৃদ্ধ কিংবা ততোটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর ফলে এই সুসমৃদ্ধ সাহিত্য কর্মটির ওজন কিছুটা কমেছে বলে অন্তত আমার কা‌ছে মনে হয়েছে। এটা একান্তই আমার নিজস্ব মত।’
মনিকা রশিদ বলেন, ‘মাহাবুবুল হাসান নীরুর গল্পে কিছু কিছু টুইস্ট আছে, যাকে আমরা ছোট গল্পের প্রাণ বলে থাকি। ঘটনা চলছে, চলছে, আমরা ধারণা করছি এমন কিছু একটা ঘটবে, কিন্তু পরে পাঠককে বিস্ময়ের মধ্যে ফেলে দিয়ে গল্পের শেষে ঘটে গেলো ভিন্ন একটা ঘটনা। বা আমরা একটা গল্পের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ করে সেই গল্পের মধ্যে এমন একটা কিছু প্রবেশ করলো যেটার জন্য আমরা প্রস্তত ছিলাম না। এর ফলে তাৎক্ষণিক ঘটনার মোড় ঘুরে গেলো। পাঠক অবাক, কখনো বিমূঢ়! এটা একজন লেখকের বড় গুণ। আমি এই গুণটি মাহাবুবুল হাসান নীরুর মাঝে লক্ষ্য করেছি।’
ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করা এই আলোচক বলেন, ‘মাহাবুবুল হাসান গল্পের মূল উপজীব্য হচ্ছে ‘মানুষ’। যে মানুষটি যেখান থেকেই, যে পরিবেশ থেকেই আসুক না কেনো। তিনি বলেন, বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ছোট গল্পগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ হলে আমরা বুঝতে পারতাম বিশ্ব সাহিত্যের সাথে আমাদের ছোট গল্পগুলোর মানগত পার্থক্যটা।’ তিনি বলেন, ‘এখন বইয়ের চাইতে অনলাইনের বই পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে আর তা প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধনের কারণেই। এ ক্ষেত্রে শৈলী প্রকাশনী বেশ একটা চমৎকার পদক্ষেপ নিয়েছে।’ পরিশেষে বলবো, বইটি এক কথায় খুবই সমৃদ্ধ একটি বই। লেখককে ধন্যবাদ হৃদয়কে নাড়া দেয়া গল্পগুলোর জন্য।’

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় আলোচক ছিলে ড. আবিদ বাহার, প্রফেসর, হিউম্যানিটিস ডিপার্টমেন্ট, ডাউসন কলেজ। যিনি একজন কবি এবং লেখক। রোহিঙ্গা ও ফারাক্কা বিষয়ক বহু লেখালেখি রয়েছে তার। তিনি বলেন, ‘গ্রন্থের সব গল্প আমি পড়তে পারিনি ব্যস্ততার কারণে। দু’একটা বাদ পড়েছে। গ্রন্থে প্রকাশিত প্রথম গল্প ‘অসময়’-এ আমি লক্ষ্য করেছি, এখানে লেখক কিছু ফিলোসফিক্যাল তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। গল্পটা শেষ করে আমার কাছে এমনটিই মনে হয়েছে, এখানে যেনো একটা স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছে। ‘চলো গ্রামে ফিরে যাই’ দ্বিতীয় গল্পে আমি আমরাই মনের কথার প্রতিফলন দেখতে পেয়েছি। গল্পটা পড়ে আমার মা, বাবা, ভাই-বোনের কথা মনে হয়েছে। ফিরে যেতে ইচ্ছে করেছে গ্রামে। তৃতীয় গল্প ‘অফিস পাড়ার সুন্দরী’ পড়ে মনে হয়েছে, যেনো বাংলাদেশের অফিসগুলোতে কাজ করা বিপজ্জনক হতে পারে। যারা গল্পটা পড়েছেন, তারা বোধকরি অনুভব করেছেন, নায়ক কতোটা টেনশনে ছিলেন। স্ত্রীর কথা ভাববেন, নাকি সামনে বসে থাকা সুন্দরীর কথা ভাববেন। নায়ক একজন খুবই ভালো লোক বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে। কিন্তু যেভাবে সমস্যাটা শুরু হয়েছে……আমার মনে হয় বাংলাদেশে এর প্রচলনও থাকতে পারে, আমি সিওর না। আমি কানাডা চলে এসেছি প্রায় তেত্রিশ বছর হয়ে গেলো। গল্পটা পড়ার সময় আমার যে টেনশন শুরু হয়েছিলো তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। টেনশনের ওপর টেনশন, কি ঘটতে যাচ্ছে!’

তিনি বলেন, ‘মাহাবুবুল হাসান নীরুর গল্প পড়লে আপনারা ভাববেন যেনো আপনার একেবারে চোখের সামনেই ঘটনাটা ঘটছে। এতো বাস্তবতাসমৃদ্ধ সুন্দর উপস্থানা চমৎকার, স্বাভাবিক, সাবলীল বর্ণনা। পাঠক সহজেই গল্পের সাথে মিশে যেতে পারে। আমি গল্পটা পড়ার সময় মনে হয়েছে, আমার ওয়াইফই না আবার আমাকে টেলিফোন করে বসলো। যেনো আমার সামনে বসে আছে এক সুন্দরী ঠিক গল্পটার মতোই।

তিনি বলেন, ‘আমি এবার তৃতীয় গল্পে যাচ্ছি, ‘প্রতিপক্ষ আগুন’, আহা, এই গল্পটি আমার অসম্ভব ভালো লেগেছে। এটা যেনো আমার মনের কথা। রিক্সাওয়ালার রিক্সাটা পুড়ে গেলো, না খেয়ে খেয়ে প্রিয় স্ত্রীর চেহারাটা মলিণ হয়ে যাচ্ছে, অথচ সে কিছুই করতে পারছে না। গল্পের শেষে স্বামীর দুরবস্থার কারণে স্ত্রীর অন্য পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হবার ঘটনা কষ্টকর। বেচারা নায়কের রিক্সাটাও পুড়ে গেলো, বউকেও হারানোর পথে…।’

আবিদ বাহার বলেন, লেখকের গল্পগুলোতে বাংলাদেশের নৈতিকতাকে নিয়ে প্রশ্নটাই বেশী উথ্থাপিত হয়েছে। সবগুলো গল্পতেই তিনি শুধু ফিলোসফিক্যাল প্রশ্ন করেননি, বাংলাদেশে নৈতিকতা যে নির্বাসিত হয়েছে সে দিকের ওপরও আলোকপাত করেছেন। মানুষের কথা, তার দুঃখ-কষ্টকে তিনি এঁকেছেন নিপুণভাবে। ‘হাজারকি’ শিরোনামের চতুর্থ গল্পটি অনেক বছর ধরে আমার মনে থাকবে। এই গল্পটা পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, আমি যেনো শরৎচন্দ্রর শ্রীকান্তের মতো কিছু পড়ছি। গ্রামের সেই হাজারকির খবর যেভাবে নীরু আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন এজন্য তাকে অনেক ধন্যবাদ। আমি আপনাদের ‘হাজারকি’ গল্পটা পড়ার জন্য বিশেষভাবে আহবান জানাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন, আমি ফারাক্কা মুভমেন্টের সাথে অনেকটা জড়িয়ে আছি। সে দৃষ্টিকোণ থেকে লেখকের পঞ্চম গল্প ‘মেঘগুলো আর পালিয়ে যাবে না একটি অনন্য সৃষ্টি। আমাদের সুজলা সুফলা রূপসি বাংলা যে দিনে দিনে তার সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলছে তার একটা ছবি উঠে এসেছে এ গল্পে।’ এরপর তিনি ছয় নম্বর গল্প ‘আমার বিবির বাহারি শখ’ সম্পর্কে বলেন, ‘আহা! এই গল্পটা পড়ে এটার কথা আমার স্ত্রীকে বলতে বলতে আমি যেনো নিজেই গল্পের ভেতোর ঠাঁই করে নিয়েছি। এই গল্পটা সাংঘাতিক! স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বুঝি এমনটি হয়, তবে ভেরী ফানি! আপনার পড়বেন গল্পটা। তিনি আট নম্বর গল্প ‘দলান্তিত’ সম্পর্কে মন্তব্য করেন, ‘ভেরী ইন্টারেষ্টিং একটা গল্প। এক্সিলেন্ট! এই গল্পটির জন্য আমি লেখককে এ-প্লাস দেবো।’ তিনি বলেন,’ সময় স্বল্পতা ও ব্যস্ততার কারণে গ্রন্থের বাকি দুটো গল্প আমার এখনো পড়া হয়নি। পরিশেষে তিনি বলেন, একশ’ ষাট মিলিয়ন লোকের বসতির দেশ বাংলাদেশ। দুঃখ-সুখের দেশ। অনেক বছর কানাডায় বসবাস করে দেশের অনেক কিছুই ভুলে গেছি। মাহাবুবুল হাসান নীরু তার এই দশটি গল্পে আমাকে অনেক কিছুই মনে করে দিয়েছেন যা অনেকদিন মনে থাকবে‌। তার গল্পে প্রতিবাদ আছে, নৈতিকতার অবক্ষয়ের কথা আছে, সুখ-দুখের কথা আছে। গ্রন্থের বেশিরবাগ গল্পই ইউনিক, এনজয় করেছি। রিপিটেশন পাইনি। আমি দেশে না গিয়ে, গ্রামে ফিরে না গিয়ে কানাডায় বসে এতোটুকু এনজয় করতে পেরেছি বলে লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ।

তৃতীয় আলোচক ছিলেন ড.মহিউদ্দিন তালুকদার। আলোচনার প্রারম্ভে লেখকের গল্পে ‘অসময়’-এর ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে তিনি অনেকটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। আবেগভরা কন্ঠে এ গল্পটির সাথে তাঁর জীবনের একটি ঘটনার অনেকটা মিলে যাবার আংশিক বিবরণ শেয়ার করেন তিনি দর্শক-স্রোতার সাথে। তিনি বলেন, ‘আমার পূর্ববর্তী বক্তা আবিদ ভাই বলে গেছেন মাহাবুবুল হাসান নীরুর একটি গল্প সারা জীবন তিনি মনে রাখবেন। সেটার তার নিজের কথা; কিন্তু এখন আমি বলবো আমার কথা। আমি গ্রন্থটির প্রথম গল্প ‘অসময়’ পড়তে গিয়ে দেখলাম অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আমার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের একটি মর্মান্তিক বিয়োগান্তক ঘটনা অনেকটাই মিলে গেছে। একশ’ভাগ না হলেও আশিভাগ মিল আছে। আমি সেটাই আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই। গল্পে নায়িকা সিনথিয়া হারিয়েছে তার স্বামী মিথুনকে আর আমি হারিয়েছি আমার মা এবং ভাইকে। এ গল্পটা আমার মনে এতোটাই দাগ কেটেছে যে, তা সারা জীবন আমার মনে থাকবে। গল্পটা পড়তে গিয়ে প্রতিটি মুহূর্তে আমি আমার মা ও ভাইকে হারানোর সেই ব্যথাভরা স্মৃতি স্মরণ করেছি। ধন্যবাদ জানাই এমন একটি অসাধারণ গল্পের জন্য লেখক মাহাবুবুল হাসান নীরুকে। লেখক তার মনের চোখ দিয়ে চারিদিকে ঘটে যাওয়া বাস্তবতাকে কতোটা গভীরভাবে উপলব্ধি করে থাকেন সেটা মাহাবুবুল হাসান নীরুর গল্প পড়লে পরিস্কার হয়ে যায়। অসাধারণ বর্ণনা, যেনো নিজেই দেখছি গল্পের ঘটনাটাকে। গ্রন্থের দশটি গল্পের মধ্যে আমি আটটি পড়েছি। প্রতিটি গল্পই আমার ভালো লেগেছে। আমি স্বীকার করে নিচ্ছি, গল্পের সাহিত্য মান নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করার যোগ্যতা আমার নেই, তবে একজন পাঠক হিসেবে বলবো, তার প্রতিটি গল্পই উঁচু মানের, ভীন্ন ভীন্ন মাত্রার। প্রতিটা গল্পের কাহিনী আমাকে আকৃষ্ট করেছে। থেমে যাইনি কোথাও। তার গল্পগুলো আমার এতোটাই ভালো লেগেছে যে, সেগুলো আমি পড়ে অনেকের সাথেই শেয়ার করেছি; এমনকি আমার স্ত্রীর সাথেও। তার গল্পগুলো আমি বেশ এনজয় করেছি, সেইসাথে জ্ঞাণার্জনও করেছি। আমি সকলকেই পরামর্শ দেবো তার গল্পগুলো পড়ার জন্য। বেশ উপভোগ করতে পারবেন ওনার লেখা।’
সর্বশেষ আলোচক হিসেবে গ্রন্থটির ওপর আলোচনা করেন ড. ওয়াইজউদ্দিন আহমেদ- প্রফেসর, ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট, কনকর্ডিয়া ইউনিভার্সিটি। আলোচনার শুরুতেই তিনি বলেন, ‘আমি সাহিত্যের লোক নই, তা সত্বেও আজকের এই অনুষ্টানে উপস্থিত হতে পেরে আনন্দিত।’ তিনি বলেন, ‘মাহাবুবুল হাসান নীরুর ই-গ্রন্থের সব গল্প আমার পড়া হয়ে ওঠেনি প্রবল ব্যস্ততার কারণে, তবে এ গ্রন্থের আটটি গল্প আমি পড়েছি। আমার পূর্ববর্তী বক্তাদের আলোচনা থেকে বুঝতে পারি, একেক গল্প একেক জনের মনে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে। তবে গ্রন্থটির সব গল্পই যে সুন্দর এবং তাৎপর্যপূর্ণ ও উপভোগ্য তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’ ড. ওয়াইজইদ্দিন আহমেদ মাহাবুবুল হাসান নীরুর ২০০৩ সালে প্রকাশিত ‘সেরা গল্পসমগ্র’ বইটির একটি কপি দর্শক স্রোতাদের উদ্দেশে তুলে ধরে বলেন, ‘এ গ্রন্থটি মন্ট্রিয়লের অন্যতম লাইব্রেরী পার্ক এক্সটেনশনে কবে স্থান পেয়েছে তা লেখক নিজেও জানেন না। মন্ট্রিয়লের স্থানীয় লাইব্রেরীতে নীরুর বই, এটা আমাদের জন্য আনন্দের সংবাদ। আপনারা গ্রন্থটি উক্ত লাইব্রেরী থেকে এনে পড়তে পারেন।’ তিনি বলেন, ‘গ্রন্থটিতে স্থান পাওয়া গল্পগুলোর মধ্যে প্রথম গল্প ‘অসময়’ অনেককে নাড়া দিয়েছে প্রবলভাবে। নায়ক মিথুনের মৃত্যু কাউকে কাউকে আহত করেছে। তবে সেটা আমার কাছে বড় ব্যাপার নয়, আমার কাছে গল্পের শেষ অংশটা ছিলো ইমপরটেন্ট। শেষাংশে আমরা দেখলাম যে, মানুষ কতো নিষ্ঠুর আর সেলফিস হতে পারে। গল্পটা পড়ার পরে আমার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো। ‘চলো গ্রামে ফিরে যাই’ গল্পটার বর্ণনা অসাধারণ। বাজারের একটি জায়গায় এসে মনে হয়েছে আমি যেনো সেখানে দাঁড়িয়ে আছি। গল্পটা আমার মনে ভীষণ দাগ কেটেছে। আপনারা গল্পটি পড়বেন। আমি লেখককে এমন একটি অসামান্য গল্পের জন্য স্পেশালি ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘গ্রন্থটির প্রচ্ছদ, ইলাস্ট্রেশন, সার্বিক উপস্থাপনা আমার খুব ভালো লেগেছে। তবে ক্যাপশন না থাকলে বোধকরি আরো ভালো হতো।

আলোচনা পর্বের একেবারে শেষভাগে লেখক মাহাবুবুল হাসান নীরু আয়োজক A1 টিউটোরিয়ালের স্বত্বাধিকারী, বাংলাদেশের এক সময়কার স্বনামধন্য সাংবাদিক ও বাংলা মেইলের নির্বাহী সম্পাদক কাজী আলম বাবু, ফোবানার ভাইস প্রেসিডেন্ট এজাজ আকতার তৌফিক, সাপ্তাহিক আজকাল পত্রিকার সহকারী সম্পাদক মকসুম তরফদার এবং ধুম এন্টারটেইন্টমেন্টের কর্ণধার সোহেল মিয়াকে ধন্যবাদ জানান। এমন চমৎকার একটি অনুষ্ঠানের নান্দনিক ও হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনার জন্য তিনি শামসাদ আরা রানাকে ধন্যবাদ এবং অভিনন্দন জানান। নীরু দল-মত নির্বেশেষে মন্ট্রিয়লের শীর্ষ পর্যায়ের নেতুবৃন্দ ও আগত দর্শক-স্রোতাদের বিশেষভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, ‘প্রতিকুল আবহাওয়া ও বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে আপনারা যারা আজ এখানে উপস্থিত হয়েছেন তারা মূলত আমাকে বাধিত করে রাখলেন।’ পরিবেশে লেখক তার গল্প ‘চলো গ্রামে ফিরে যাই’ আবৃত্তি করে শোনান। এ ছাড়া লেখকের তিনটি গল্প আবৃত্তি করেন, তাসলিমা তালুকদার, মীর মনজুর, মিয়া মাহমুদ আহমেদ ও সৈয়দা নীহার বানু। অনুষ্টানের শেষ অংশে সঙ্গীত পরিবেশন করেন মন্ট্রিয়লের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী শফিউল ইসলাম ও মনিকা রশিদ।

অনুষ্টানের স্বাগত বক্তব্য রাখেন ফোবানার ভাইস প্রেসিডেন্ট এজাজ আকতার তৌফিক এবং শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন, A1 টিউটোরিয়ালের স্বত্বাধিকারী, সাংবাদিক কাজী আলম বাবু, কানাডা বিএনপি সভাপতি ফয়সাল চৌধুরী, ক্যুইবেক আওয়ামী লীগ সভাপতি মুন্সি বশির, ফ্রেঞ্চ স্কুল বোর্ডের কমিশনার মনিরুজ্জামান খোকন, সাপ্তাহিক আজকাল পত্রিকার সহকারী সম্পাদক মকসুম তরফদার ও সাংবাদিক গোপেন দেব।
অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন শামসাদ আরা রানা।

সেরা গল্প লিংক: ক্লিক করুন

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

You must be logged in to post a comment Login