মা! মা!!

Filed under: গল্প,প্রবাস কথা |

বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে,  ভিতরের হৃৎপিন্ডটা বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে। একটা আস্ত বটগাছ উপড়ে ফেলার অবস্থা। যে অদৃশ্য বন্ধন এতদিন একেবারে কাছে ধরে রেখেছিল, তা একটা প্রচণ্ড টানে যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে।

সুমনের প্লেন ঢাকার আকাশ ছেদ করে যত উপরে উঠছে, ওর তত ভীষণ খারাপ লাগছে। কি যেন একটা থেকে সে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছে না। কি, কি হতে পারে? এত খারাপ লাগছে কেন। কানে এর মধ্যে তালা লেগে গেছে। চোখের সামনের সব কিছু ঝাপসা লাগছে। চোখটা বন্ধ করতেই মানসপটে  ভেসে উঠল একটা মুখ। একটা নারীর মুখ। কিন্তু, প্রেয়সী, তার জীবনের অস্তিত্ত্ব, স্পন্দন তো তার পাশেই বসে আছে। হাত বাড়ালেই তাকে ছোঁয়া যায়।

সুমন, রঞ্জনা ক্যানাডা যাচ্ছে ইমিগ্রেশান নিয়ে। বড় স্বপ্ন, বড় আশা। তাদের বিয়ের বয়স দুই বছর হতে চললো । মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই বিয়ে পর্ব সারা। প্রথমে কিছু জটিলতা থাকলেও, পরে সুমনের বাবা-মা বিয়েটাকে মেনে নিয়েছে। বেশ কিছু লোকজন ডেকে একটা বিয়ের মত অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। রঞ্জনার একেবারে বেগ পেতে হয় নি শ্বশুর, শ্বাশুরীর মন জয় করে নিতে।

একটা প্রাইভেট ব্যাঙ্কে চাকরি করছিল সুমন। মোটামুটি বেতন। বাড়ি ভাড়া যেহেতু দিতে হয় না, বেতনের টাকা দিয়ে ভালই চলে যায়। সিনেমা, নাটক, চাইনিজ খাবার, এখানে সেখান বেড়াতে যাওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া বেশ চলে। রঞ্জনার মনে হয়, জীবনের মানে এত সুন্দর! হয় সারাদিন ভালবাসার মানুষের পাশে থাকা কিংবা তার জন্যে অপেক্ষা করা। কোনটা যে বেশী মিষ্টি, তা বের করা কঠিন। এইভাবে যদি পুরোটা জীবন চলে যায়, তা হলে মরার পরেও কোন ক্ষোভ থাকে না।

সুমন ছোট বেলা থেকেই উচ্চকাংখী। বুয়েটে ভর্তি হতে না পেরে, ঠিক করলো বিদেশে চলে যাবে। একটাই জীবন। আকাশটা ছুঁয়ে দেখতে দোষ কোথায়। ইমিগ্রেশা্নের চেষ্টা করতে থাকলো। সেই বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নের সিঁড়ি অবশেষে আসলো। এর মধ্যে পাঁচটা বছর কেটে গেছে। একা মানুষ দোকা হয়েছে।

সুমন, সুমনা ভাই বোন। সুমনা দুই বছরের ছোট। মায়ের দু চোখের দু মণি। মা জাহানারা বেগম ছেলে মেয়েদের একেবারে নিজের হাতে মানুষ করেছেন। ঘুম পাড়ানো, গোসল করানো, খাওয়ানো কোনটা কাজের লোকের হাতে ছেড়ে দেন নি। বাচ্চা মানুষ করার প্রতিটা কাজই তার কাছে মহা তৃপ্তিকর। কোন ক্লান্তি নেই, কোন বিরক্তি নেই। অবশ্য মাঝে মাঝে অভিযোগ আসতো স্বামী শরিফ তালুকদার থেকে। বলতেন “ তুমি একটু বেশী বেশী কর। পৃথিবীতে মনে হয় আর কারোর বাচ্চাকাচ্চা হয় না। কিছু কাজ তো কাজের লোকদের দিয়ে করালেও পারো।“ বেচারা স্বামী মহাশয়ের বা কি দোষ। তার আর জাহানারাকে সময় মত পাওয়া হয় না। প্রয়োজন অপূর্ণ থেকে যায়। নরম, কোমল কিছু একটা শক্ত হয়ে পাথর হতে থাকে।

জাহানারা বুঝে, তার আগের মত আর স্বামীর কাছে যাওয়া হয় না। কখনো ইচ্ছা হলেও, হয়ে উঠে না। সারাদিন দুই বাচ্চা আর সংসারের অন্যান্য সব কাজ করতে করতে দিন শেষ। রাতে যখন শুতে আসে তখন শরীর আর চোখে দুনিয়ার সব ক্লান্তি, ঘুম। পরের দিন আবার উঠতে হয় ফজরের নামাজের ওয়াক্তে।

কাওকে না বললেও, ছেলে মেয়ে দুটোকে নিয়ে জাহানারার গর্বের অন্ত নাই। তারা তার মতই সৎ আর খোলা মনের। মায়ের সাথে শেয়ার করে না, এমন কোন বিষয় তাদের নাই। জাহানারা আরেকটা জিনিস ঠিক বুঝে না। ছেলে, মেয়ের মুখ দেখলেই কিভাবে যেন  তার জানা হয়ে যায়, তাদের ভিতরের সব কথা।  এই জিনিষটা কি সব মায়েদেরই থাকে?

সুমনার অল্প বয়েসেই বিয়ে হয়ে যায়। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা পরপরই। ছেলে পক্ষ চেপে ধরল। দাদা শ্বশুরের খুব শখ নাত বউ দেখে যাবার। গত তিন মাস ধরে তিনি হাসপাতালে। জাহানারা আর শরিফ তালুকদার মত দিল এই শর্তে, যে সুমনাকে পড়ালেখা শেষ করতে দিতে হবে। সুমনা গত তিন বছর ধরে লন্ডনে থাকে স্বামী আর তিন কন্যা নিয়ে।

সুমনা শ্বশুর বাড়ী থেকে চলে যাবার পর থেকে, মা জাহানারা আরো বেশী করে ঝুঁকে পড়েন ছেলে সুমনের দিকে। সুমনের প্রতিটা ব্যাপারে তার থাকা চাই। সুমনের কোন সমস্যা  বা অভিযোগ নাই এই ব্যপারটা নিয়ে। বরং তার ভালোই লাগত, এই ভেবে, মাতৃ স্নেহ পাবার দিক সে পৃথিবীতে সব চাইতে এগিয়ে। তার মা শুধু মা ‘ ই না, একেবারে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মার থেকে বেশী তাকে কেও বুঝতে পারে না।

রহিমের সাথে সব ব্যাপারে সুমনের প্রতিযোগিতা। পড়ালেখায় রহিম সব সময় এগিয়ে। কিন্তু খেলাধুলায় সুমন। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সুমন কমপক্ষে তিনটা প্রথম পুরষ্কার পায়ই। এইটা চলে আসছে কয়েক বছর ধরে। রহিম দু একটায় সেকেন্ড, থার্ড হয়। ক্লাশ এইটে যখন পড়ে, রহিম ক্রীড়া প্রতিযোগিতার  তিন মাস আগেই ঘোষণা দিল, এইবার সে সুমন থেকে বেশী পদক পাবে। আর সেই হিসাবে প্র্যাকটিস আরম্ভ করে দিল।

সুমনের কানে কথাটা গেল। আমলেই আনল না। গাপ্পাগোপ্পা রহিম তার থেকে খেলাধুলায় ভালো করবে। হা হা! প্রশ্নই উঠে না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে, রহিম তিনটা প্রথম পুরস্কার পেল, আর সুমন শুধু একটা। সুমন কাওকে কিছু বলল না। জীবনে পরাজয়ের একটা শক্ত স্বাদ পেল।

বাসায়  ঢুকার সময় এক ঝলক মায়ের সাথে দেখা হল। সুমন সরাসরি নিজের কামরায় যেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। রাত আড়াইটার দিকে যখন ঘূম ভাঙল, দেখল মা পাশের চেয়ারে বসে আছে। সুমন চোখ খুলতেই, মা বলল,” যাও মুখ ধুয়ে আসো। আমি তোমার ভাত আনছি। “

মা জাহানারা নিজের হাতে খাইয়ে দিলন সুমনকে। একটা কথাই বললেন ছেলেকে, “এই প্রথম তুমি আমাকে গুড নাইট না বলে ঘুমাতে গেলে।“ মায়ের চোখের কোনায় পানি। মা হয়তো কিছু একটা শুনতে পেল; মা-ছেলের দুরত্ব সৃষ্টির বাজনার প্রথম সুর।

পরের দিন স্কুল বন্ধ ছিল। মা ছেলের বেশ লম্বা কথোপকথন হল। মা  সুমনকে সুন্দর ভাবে বুঝালেন, জীবনে হারজিৎ থাকবে। জেতাটা মধুর। কিন্তু তার থেকে আরো বেশী মধুর আর গর্বের হল, পরাজয়ের পরে প্রতিযোগিতায় ফিরে আসা। কতবার পরাজিত হয়েছ, তার থেকে বেশী জরুরী নিজেকে পরের প্রতিযোগিতার জন্যে প্রস্তুত করা।

এক পর্যায়ে মাকে জড়িয়ে ধরে সুমন অঝর ধারায় কাঁদতে থাকল।“ মা, মা তুমি কেমন করে আমার ভিতরে ঢুকে পড়ো? আমি হেরে গেলে কি করে  তোমার কাছে মুখ দেখাব? তুমি এত কষ্ট করে আমাদের বড় করছো।“ মা বললেন,” সন্তানের জন্যে মায়ের ভালবাসা কখনো কমে না। তুমি জীবনের যেই পর্যায়ে যেভাবেই থাক না কেন, আমি তোমার সাথে আছি প্রতিটা ক্ষণ। তোমাকে সাহায্য করতে না পারলেও, আমার দোয়া তোমার সব সময়ের সঙ্গী।“

রঞ্জনার সাথে পরিচয় হওয়াটা বেশ নাটকীয়। একটা বিয়ে বাড়িতে দেখা। সুমনের চোখ আরো পাঁচ জনের মত বারে বারে রঞ্জনাতে যেয়ে থেমে যাচ্ছিল। লম্বা, ফর্সা, বড় বড় চোখ। আটলান্টিক সাগর থেকেও বেশী গভীর, ওখানেই ডুবে যেতে ইচ্ছে করে।  যে কোন ছেলের হৃৎপিণ্ডের গতিবেগ বাড়িয়ে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট। অন্য কেও যে কাজটা করতে পারে নি, সুমন সেই কাজটা করলো। রঞ্জনাকে যেয়ে বলল, “আপনাকে কোথায় যেন দেখেছি………।“ সেই সুত্র ধরে প্রথম কথা বলা, পরিচয়।

পরিচয় থেকে ভালোলাগা। তার থেকে ভালোবাসা। খুব অল্প সময়ের মধ্যে হয়ে গেল। সুমন রঞ্জনার চোখ দুটোর মধ্যে কি যেন একটা খুঁজে পেল। কি শান্তি, কি ভালোলাগা, কি আত্মবিশ্বাস। মনে হয় একেবারে নিশ্চিন্তে জীবনটা এর মধ্যে কাটিয়ে দেওয়া  যায়।

সুমন বুঝল, তার একজন সঙ্গিনী দরকার, যার মধ্যে তার ভবিষ্যৎ। তার সব মনের আর শরীরের প্রয়োজনের একমাএ ঠিকানা। যাকে নিয়ে ঘর বাধাঁ যাবে। মনের সব কথা বলা যাবে। এক জন আরেকজনের পরিপূরক হবে। প্রকৃতির নিয়ম রক্ষা হবে। কিন্তু তার মধ্যে কি মা কে খুঁজে পাওয়া যাবে? প্রতিটা জয়ে কি রঞ্জনা আন্দোলিত হবে মায়ের মত? প্রতিটা পরাজয়ে কি সেও কি সাথে থাকবে, সাহস দেবে?

মা জাহানারা এই প্রথম, একটা ব্যাপার সুমনের চেহারা দেখে বুঝলেন না। না কি হয়তো, বুঝেও জানতে চাইলেন না। সুমনের অবাক হওয়ার সীমা, পরিসীমা থাকল না। মা কি করে এত বড় একটা বিশাল ব্যাপার ধরতে পারলো না। কারো সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে কিনা, ক্লাসের টিচারের প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছে কিনা, মাথা ব্যাথা করছে কিনা, ইত্যাদি ইত্যাদি সব মা চেহারা দেখেই বুঝে ফেলে। পরে এক এক করে, মা সে গুলো জানতে চায়। কখনো দেয় বাহবা, কখনো সাজেশান দেয়  কি করলে ভাল হত।

সুমন একেবারে দৃঢ় ধারনা ছিল মা তার সাথে প্রতিটা ব্যাপারে সাথে থাকবে। তার প্রতিটা আনন্দে দুলে উঠবে।  কিন্তু মা কি করে বুঝতে পারছে না, রঞ্জনাকে পেয়ে সে মহা খুশী। শুধু খুশী বললে কম হয়। একেবারে প্রচণ্ড পুলকিত। সে ইচ্ছে করলেই, একটা মেয়েকে স্পর্শ করতে পারে।

মার কথাগুলো কোন প্রসঙ্গ ছাড়া আসতো না। একদিন মা বললেন, “বাবা সুমন একটা ছেলে যখন বড় হয়ে পুরুষ হয়, তখন তার ভালবাসা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেয়াটাই কৃতিত্বের। একটা কেন্দ্রের মধ্যে পরে থাকলে ভুগতে হয় বেশী।  সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখলে, সব হারানোর সম্ভবনা থাকে।“ কথাটা সে সময় সুমনের কাছে পরিষ্কার হয় নি।

এই নাও আমার হাতটা ধরো।

কি অদ্ভুত সুমনের তো তাই ইচ্ছে করছে। রঞ্জনা জানলো কি করে। সুমন ভাবল, মেয়েরা কি সবার ভিতরের কথা পড়ে ফেলতে। সব মেয়েই কি তার মায়ের মতন। তাই বা  হয় কি করে?

রঞ্জনা আরেকবার বলল, তুমি চাও কালকে আমি লাল শাড়ী আর কপালে বড় একটা টিপ দেই। আসলেও এটা মিলে গেল। কালকে সুমনের জন্মদিন। মনের বাসনা তার সেইটাই। সুমনের প্রচণ্ড ইচ্ছা, জন্মদিনের দিনটা সারাটা দিন রঞ্জনার দু চোখ আর কপালের টিপ দেখে কাটিয়ে ডেবে।

সিরাজ মামা হঠাৎ হার্ট এ্যাটাকে মারা গেল। খুব প্রিয় মামা। দাবী, আবদার মেটানোর সর্বশেষ অবলম্বন। সুমনের খুব কাঁদতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু কাঁদতে পারলো না। রঞ্জনা সুমনকে দেখেই নিয়ে গেল পার্কের এক নিভৃত জায়গায়। সুমনের মুখটা বুকের মধ্যে নিয়ে বলল, “তুমি এখন কাঁদতে পারো। ছেলে হলে যে কাঁদতে পারবে না, এমন কোন কথা নাই।“ সুমন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না, অঝোর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলল, “আমি বুঝলাম না, আমার সব চেয়ে প্রিয় মামাকে কেন এতো তাড়াতাড়ি চলে যেতে হল।“ উত্তরে রঞ্জনা বলল,” তোমার কাঁদতে ইচ্ছে করলেই আমার বুকে চলে এসো। “

এরকম আরো কতো সব ঘটনা, রঞ্জনা মুখ দেখেই বলে দিয়েছে। তার পরে তার প্রতিকারের ব্যাবস্থা করেছে। কখনো হাত ধরা,  কখনো বুকে নেয়া, কখনো হয়তো আরো কিছু বেশী। রঞ্জনাও সুমনের মুখ দেখে পড়ে ফেলতে পারত তার ভিতরে কি আছে, অনেকটাই যেন মায়ের মতই।

সুমনের বয়স তখন ৪-৫ হবে। বাবা শরিফ তালুকদারের খুব জ্বর আসলো। বাবা একটা ছোট বাচ্চার মতো চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। মা, মাগো খুব কষ্ট হচ্ছে। ছোট সুমন বুঝতে পারলো না, বাবা কি করে কাঁদতে পারে।

সুমন যখন ক্লাশ টেনে পড়ে তখন বাবার চাকরি চলে যায়। অফিসের কিছু প্রভাবশালী মানুষ ষড়যন্ত্রের কারণে। বাবা একেবারে মরিয়া হয়ে গেল একটা চাকরির জন্যে।  কিন্তু প্রায় ছয় মাস হয়ে গেল; বাবার চাকরি হল না। সুমন একদিন রাতে দেখল, বাবা বারান্দায় বসে কাঁদছে। একটু পরেই শুনল, বাবা চাপা গলায় যেন কার সাথে কথা বলছে আর কাঁদছে। সুমন শোনার চেষ্টা করলো বাবা কি বলে। মা, মাগো তুমিই বলে দাও, আমি এখন কি করি। কি করে বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দেই?

শরিফ তালুকদারের জন্মের  সময় তার মা মারা গিয়েছিল। সারা জীবন তার মানসলোকে ছিল মায়ের একটা ছবি, যাকে  সে কখনো দেখে নি। কিন্তু, প্রতিটা কষ্টে, প্রতিটা প্রয়োজনে মা মা করে ডেকেছে। বাবার বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার মার প্রয়োজন বাড়তে লাগল। দিনের অনেক বারই শোনা যেতো, শরিফ তালুকদার মা মা করে ডাকছে।

উচ্চাকাংখি সুমনের ক্যানাডার জীবন প্ল্যান মোতাবেক হয় নি।  চাকরি হারাতে হয়েছে কয়েকবার। কয়েকবার ব্যবসার চেষ্টা করেও সফল হয় নি। পরিণামে সংসার জীবন হয়েছে  দুঃসহনীয়। সুমন- রঞ্জনার হয়েছে বিরোধ।

ক্যানাডার আসার এক বছর পরেই  অন্জনার জন্ম। রঞ্জনা ব্যাস্ত হয়ে পরে কন্যাকে নিয়ে। তার পরে আবার একটা চাকরিও নেয়। সুমন আর রঞ্জনাকে পায় না। রঞ্জনা সুমনের মুখ দেখে বলে না, আসো আমার বুকে মুখ দিয়ে একটু কেঁদে যাও। সুমন খুঁজতে থাকে আশ্রয়। নারীর আশ্রয়। মায়ের আশ্রয়।

সুমন নিজের অজান্তেই কি ভাবে যেন বাবার মত, মা মা বলে ডাকার অভ্যাস পেয়ে যায়। একদিন সুমনের একটা আশ্রয়ের দরকার। রঞ্জনাকে পেল না। সে তো হারিয়ে গেছে সেই কবে। তার পরে বাসায় নেই। শোবার ঘরে যেয়ে একা একা, মা মা বলে ডাকতে থাকলো।

পাশের কামরায় খেলছিল  অন্জনা। ছূটে আসলো। বাবাকে কাঁদতে দেখে বলল, “চোখ মুছো বাবা, এই যে আমি, তোমার মা। আমাকে বলো তোমার কি হয়েছে।“ সুমন নিজের মেয়েকে জড়িয়ে ধরলো। মনে পড়ল সেই ছোট বেলায়, মাকে জড়িয়ে কান্নার কথা।  ছোট অন্জনার মাঝে নিজের মাকে স্পষ্ট দেখতে পেল।

১০

সুমন দেশ আর মাকে ছেড়ে এসেছে প্রায় বিশ বছর। মায়ের সাথে কমপক্ষে সপ্তাহে একবার হলেও ফোনে কথা হয়। সুমন মাকে তার জীবন সংগ্রাম, ভোগান্তির কথা বলে না। শুধু বলে, মা দোয়া করো। মা ওইদিক থেকে কি বুঝে তা বলা মুশকিল। শুধু বলে,” বাপ আমার, আমি তোমার সাথে আছি সব সময়। “

প্রথম বার যখন চাকরি হারিয়ে বিপর্যস্ত, মা টেলিগ্রাম পাঠায়। “বাবা কালকে স্বপ্ন দেখলাম, তোমার খুব কষ্ট। ভেবো না, ঠিক হয়ে যাবে।“ এক সপ্তাহের মধ্যেই নতুন একটা চাকরি হয়ে গেল।  অন্জনার বয়স যখন পনের, তখন একটা  গাড়ি এক্সিডেন্টে পড়ল। চার দিন জ্ঞান ছিল না। প্রথম দিনই বাংলাদেশ থেকে ফোন আসলো। “ বাবা আমার খুব অস্থির লাগছে। তোমরা কি ঠিক আছো? “

এই ভাবে মা জাহানারার জীবন চলতে থাকে। মাঝে মাকে কয়েকবার হাসপাতালে যেয়ে থেকে আসতে হয়েছে। বয়স হলে যা হয়। কত রকমের অসুখ মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। কয়েক মাস আগে, দেশের থেকে খবর আসে মায়ের স্ট্রোক করেছে। কাওকে চিনতে পারছে না।  কথাটা শুনেই মাকে ফোন করে সুমন। মা চিনতে পারে না সুমনকে, তার নিজের ছেলেকে। জানতে চায়। ‘আপনি কে বলছেন?”

১১

“বাবা আজকে তোমাকে খুব খুশী খুশী লাগছে, কি ব্যাপার?”

‘আজকে কম কথা বলছ কেন, কি হয়েছে তোমার?”

অন্জনা এখন তার বাবাকে বেশ পড়তে পারে। কখন কি করতে হবে তাও বলে দেয়। বয়স যখন ছয় তখন সুমনকে এসে বলে,” বাবা আসো, আমার ম্যাজিক কার্পেটে এসে বস। আমি তোমাকে দাদীর কাছে নিয়ে যাবো। “

ছোট অন্জনা আরব্য উপন্যাসের একটা কার্টুন ছবিতে দেখেছে। সেখানে আলাদ্দিনের একটা ম্যাজিক কার্পেট আছে। সে কার্পেটে চড়ে যে কোন জায়গায় উড়ে চলে যাওয়া যায়। সে বাবার  জন্যে ওরকম কল্পনার একটা কার্পেট বানিয়েছে। সে বাবার মুখে স্পষ্ট দেখেছে, দাদীকে দেখতে যাবার ইচ্ছা।

বয়স বারার সাথে সাথে অন্জনার বিভিন্ন কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে। এখন সে আর বাবাকে পড়ার সময় পায় না কিংবা চেষ্টা করে না। তার পরেও সুমনের ভালো  লাগতো, তার মেয়ে তাকে পড়তে পারে। এইটা হয়তো বিধাতা মেয়েদের দিয়ে দেন। তারা যখন কাওকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসে, তখন তারা তাদের ভিতরটাও দেখতে পায়। শব্দহীন কথাগুলোর ভাষা তারা বুঝতে পারে।

অন্জনা জানাল, সে লন্ডন যাবে। সেখানকার এক নামজাদা বিশ্ববিদ্ব্যালয়ে তার এডমিশন হয়েছে। ভাল ছাত্রী। তাই সব খরচ তারাই দেবে। বাবা হিসাবে এর থেকে ভাল খবর হতে পারে না। মেয়ে এত ভাল করেছে। গর্বে বুকটা ভরে আসলো। কিন্তু, লন্ডন তো বহু দূর।

সুমনের ভাবতেই খারাপ লাগতে লাগল। মনে আসলো তার নিজের মাকে ছেড়ে আসার কথা। সেই প্রথম বার প্লেন উঠে ক্যানাডা আসার সময় যেমন হয়েছিল। মনে হল, বুকের হৃৎপিন্ডটা বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে, নিঃশ্বাসের কেমন একটা কষ্ট।চোখের সামনে সব কিছু ঝাপসা হয়ে গেল। অঞ্জনাকেও আর পাওয়া যাবে না। তাকে পড়তে পারে, এমন মানুষ তার কাছে কেও থাকল না।

মায়ের আরেকটা কথা মনে পড়লো। পুরুষদের ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে হয়। তার যদি আরও কিছু ভালবাসা থাকতো, তা হলে হয়তো জীবনটা এতো বিচ্ছিন্ন হতো না।  আরেকজন কেও যদি থাকত তাকে পড়তে পারতো! সে যদি পাশে থাকত !! কিংবা, তার জীবনে যদি আরও কিছু বিষয় থাকত, যা তাকে ভুলিয়ে রাখতে পারতো তার মানসলোকের নির্ভরতা থেকে।

১২

সুমনের বুকে খুব ব্যাথা। বিছানায় এ পাশ ও পাশ করেও লাভ হল না। নিজেই চলে গেল হাসপাতালে। সাথে সাথে ভর্তি করে নিল। বলল, ম্যাসিভ হার্ট এ্যাটাক। হাসপাতালে আসতে একটু দেরী হলে, সুমনকে বাঁচানো সম্ভব হত না।

ভোর হতে না হতেই মায়ের ফোন কল, বাংলাদেশে থেকে। বলল, “বাপ আমার কিছু বুঝতে পারছি না, মনটা যেন কেন বলছে তুমি খুব অসুস্থ। চিন্তা করো না। তুমি কালকেই ভালো হয়ে যাবে। আমার দোয়া সব সময়ই তোমাকে ছুঁয়ে আছে বাপ।“

উৎসর্গঃ তোমার মা, আমার মা, আমাদের সবার মা

মাতৃ দিবস

মে ০৮, ২০১১

WWW.LEKHALEKHI.NET

লেখাটা আপনার ভাল লাগলে আর আমার নতুন লেখার খবর পেতে, এই লিঙ্কে যান, LIKE BUTTON এ ক্লিক করুনঃ www.facebook.com/lekhaleki

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

You must be logged in to post a comment Login