নির্বাক বসন্ত [মোট ২৫ পর্ব], পর্ব-১৫

Filed under: উপন্যাস |

পরদিন সকালে সাড়ে আটটার দিকে রুম সার্ভিস ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল, হ্যাঁ গুড মর্নিং।

ওপাশ থেকে স্টেনলির কণ্ঠে গুড মর্নিং ভেসে এলো। নিশাত, কি খবর তোমাদের, কেমন আছ?

হ্যাঁ ভালো আছি সেদিন সিনেমা দেখলাম এদিক ওদিক বেড়ালাম ভালোই কাটছে।

বেশ ভালো করেছ, জায়গা চিনে নিয়েছ। আচ্ছা শোন তোমাদের জাহাজ চলে এসেছে আজ দুপুর দুইটায় তোমরা রেডি হয়ে থেক এন্ড্রু গিয়ে তোমাদের জাহাজে পৌঁছে দিয়ে আসবে, মনে থাকবে?

হ্যাঁ মনে থাকবে না কেন?

তা হলে এখন রাখি, সময় মত রেডি হয়ে থেক।

ঠিক কাটায় কাটায় দুপুর আড়াইটায় সে দিনের সেই ড্রাইভার এসে হোটেলের গেটে গাড়ি রেখে ভিতরে ওদের দেখে বলল,

, তোমরা রেডি হয়ে বসে আছ, বেশ! চল গাড়িতে ওঠ।

সবাই যার যার ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে উঠার পর গাড়ি ছেড়ে দিল। টেমস নদীর পাড় ঘেঁসে যে রাস্তা গেছে ওই রাস্তায় মিনিট পাঁচেকের মধ্যে জেটির পাড়ে একটা ছোট অফিসের মত ঘরের পাশে গাড়ি রেখে ওদের সিডিসি গুলি চেয়ে নিয়ে বলল আমার সাথে মালামাল নিয়ে আস।

ভিতরে গিয়ে দেখে এটা ইমিগ্রেশন অফিস। এন্ড্রু ইমিগ্রেশন অফিসারকে দিয়ে সই স্বাক্ষর করিয়ে পাশের ছোট জেটিতে ভিড়ে থাকা একটা ছোট স্পিড বোটের কাছে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বোটের চালককে ডাকল। একটু পরে ভিতর থেকে বোটের ড্রাইভার বের হয়ে এসেই কি কি যেন বলল। এন্ড্রু ওদের দেখিয়ে আবার  কি বলল। ড্রাইভার ওদের নামার পথ দেখিয়ে দিল। এন্ড্রু গুডবাই বলে আবার দেখা হবার আশ্বাস দিয়ে চলে গেল।

বোট ছেড়ে দিল। প্রচণ্ড বাতাস বইছে, মাথার চুল এলো মেলো উড়ছে, ভীষণ ঠাণ্ডা গায়ের জ্যাকেটে বাতাস ফর ফর শব্দ তুলছে। বেশ ঠাণ্ডা বাতাস। ওরা আধ খোলা বোটের বাইরে থেকে ভিতরে গিয়ে ড্রাইভারের পিছনে বেঞ্চে বসল। আর ড্রাইভার দূরের একটা জাহাজ দেখিয়ে বলল ওই যে তোমাদের জাহাজ। প্রায় চল্লিশ মিনিটের মধ্যে ওই জাহাজের পাশে এসে ভিড়ল। একটু দূরে থেকে দেখতে পেয়েছিল জাহাজের পাশে যেখানে বোট ভিড়বে সেখানে একটা সিঁড়ি নামিয়ে রেখেছে। পাশে কয়েক জন জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বোট ভিড়ার পর ওরা এক এক করে সিঁড়ি বেয়ে জাহাজে উঠে গেল। নিশাত কোন দিন এমন সিঁড়ি বেয়ে উঠেনি বলে ভয় পাচ্ছিল। তাই দেখে উপর থেকে কে এক জন একটু আগেই হাত বাড়িয়ে নিশাতের কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে ওকে ধরে উঠাল। জাহাজে উঠে দেখে ওর স্কুলে নিশাতের সিনিয়র মুকিত ভাই সবার সাথে দাঁড়িয়ে আছে। সেও অবাক হয়ে ওর দিকে এগিয়ে এসে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরল,

আরে নিশাত তুমি! আমি তো ভাবতেই পারছি না! কাকে দেখছি!

হ্যাঁ মুকিত ভাই আমিও দূর থেকে আপনাকে দেখে ভাবছিলাম চেনা চেনা লাগছে কে হতে পারে? যাক ভালোই হয়েছে আপনাকে পেয়ে।

চল ভিতরে যাই

বোট ড্রাইভার ওদের নামিয়ে দিয়ে ওরা যাদের জায়গায় এসেছে তাদের নিয়ে ফিরে গেল। মুকিত ইউনিফর্ম পরা ছিল কিন্তু নিশাত এই ইউনিফর্মের মানে কি জানে না। এর আগে কখন জাহাজে উঠেনি। জাহাজে উঠেনি বলতে এক বার যখন ক্লাস এইটে পড়ে তখন ওর বন্ধুর সাথে করাচীর মনওয়ারাতে নেভীর সাব মেরিন দেখতে গিয়েছিল। ব্যাস এই পর্যন্তই ওর জাহাজ সম্পর্কে ধারনা। মুকিত ভাই সবাইকে নিয়ে ভিতরে গিয়ে সবার থাকার কেবিন দেখিয়ে দিয়ে যার যার ব্যাগ রেখে নিয়ে গেল ক্যাপ্টেনের রুমে। ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন ওদের দেখে এগিয়ে এসে ওয়েল কাম জানিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। সবার সাথে হ্যান্ডশেক করে সৌজন্য মূলক কিছু কথা বার্তা বলে যার যার সিডিসি চেয়ে নিয়ে খুলে সবার চেহারা মিলিয়ে দেখল। এবার ভিতরে দেখছে কে কোথায় কোন কোন জাহাজে কাজ করেছে। সব দেখে নিশাতকে বলল ও তুমি একে বারে নতুন। বেশ, মুকিত তুমি ওকে ভালো করে সব কিছু বুঝিয়ে দিবে। এর পর অন্যান্য যারা ছিল তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। এনামুলকে ওর কাজের জায়গা গ্যালিতে নিয়ে চীফ কুক অরবিন্দ সিনহার কাছে বুঝিয়ে দিল। সালেককে সারেং এর কাছে বুঝিয়ে দিয়ে নিশাতকে নিয়ে চীফ অফিসার অরুণ এর কাছে নিয়ে গেল। এখানে এসে কথায় কথায় বুঝল মুকিত ভাই সেকেন্ড অফিসার। জাহাজে ডেক অফিসার এবং ডেক ক্রু সবাই বাংলাদেশি তবে চীফ কুক সিনহা কোলকাতার। ক্যাপ্টেন ব্রিটিশ, চিফ ইঞ্জিনিয়ার গ্রীক এবং অন্য ইঞ্জিনিয়ার ও ইঞ্জিন ক্রু সবাই ফিলিপাইনের।

মুকিত ভাই স্টোর থেকে ওদের বিছানার চাদর বিছানা পত্র গোছলের সাবান, কাপড় ধোয়ার ডিটার্জেন্ট পাউডার আর যা যা লাগে সব বের করে দিয়ে সব গুছিয়ে ব্রিজে যাবার কথা বলে আবার চীফ অফিসারের কাছে গেল।

নিশাত তার জন্য সুন্দর পরিপাটি করে সাজান কেবিন দেখে অবাক হলো। এই টুক ঘরের মধ্যে বিছানা, মাথার পাশে একটা রিডিং লাইট, পাশের দেয়ালে জাহাজের লে আউট নক্সা, বিছানার নিচে জুতা রাখার বক্স, হাবি জাবি এটা সেটা রাখার ড্রয়ার, কাপড় চোপড় রাখার জন্য পাশে ছোট্ট একটা আলমারি, আলমারির এ পাশে তোয়ালে ঝুলিয়ে রাখার একটা হ্যাঙ্গার, একটা ছোট টেবিল, চেয়ার, টেবিলের উপরে সেলফের মত তাতে সেভিং ক্রিম টুথ ব্রাশ এই জাতিয় জিনিস রাখা যায়, তার উপরে একটা বেশ বড় আয়না, আবার ছোট্ট একটু খানি গোল একটা সিঙকে ঠাণ্ডা গরম পানির ব্যবস্থা, এর উপরেও শেভ হবার জন্য একটা আয়না আবার আয়নার উপরে একটা লাইট। জানালায় মোটা ভারি পর্দা। ফ্লোরে কার্পেট বিছানো, পুরো জাহাজটাই এয়ারকন্ডিশন্ড, গরম বাতাস বের হচ্ছে। এতো কিছু, এতো আয়োজন দেখে নিশাতের বেশ ভালো লাগল। বাহ! কি সুন্দর পরিবেশ। এমন চাকরি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এতো আরামের ব্যবস্থা। এই সব ভাবছে আর বিছানা গোছাচ্ছে, ব্যাগ থেকে বের করে যেখানে যা রাখার সেগুলি গুছিয়ে রাখছে। নিশাত বরাবরই গুছিয়ে ছিম ছাম ভাবে থাকা পছন্দ করে। তার কাছে এমন পরিবেশ ভালো লাগার কথা। এই গুছিয়ে রাখছে আর ভাবছে এমন সময় মুকিত ভাই এসে জানাল নিশাত তোমার ডিউটি কিন্তু সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত আবার সকালে ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত।  এখন তোমার ব্রিজে না গেলেও চলবে তবে দেখতে চাইলে যেতে পার এখন আমার ডিউটি চলছে। তুমি অরুণ দাদার সাথে ডিউটি করবে। আমরা এখন মিডল ইস্টে চলে যাব। আচ্ছা ভালো কথা কিছু খাবে, ক্ষুধা লেগেছে?

না মুকিত ভাই হোটেল থেকে খেয়েই বের হয়েছি।

আচ্ছা তা হলে তুমি এগুলি সেরে উপরে এসো আমি যাই, নোঙ্গর তুলতে হবে।

মুকিত ভাই চলে গেল নিশাত একটু পরে সব সেরে ব্রিজে গেল। দেখে জাহাজ চলছে।

কত দিন লাগবে মুকিত ভাই?

কিসের?

না এই যে আমরা মিডল ইস্টে যাচ্ছি সেখানে যেতে

দশ/বার দিন লেগে যাবে যদি সুয়েজে ট্রাফিক না থাকে, এবার যাব সউদি আরবের রাস্তানুরাহ পোর্টে।

কিন্তু আমি যে জাহাজের কিছুই জানি না চিনি না।

তাতে কি, যারা নতুন আসে তারা কেউ কিছু জানে না, সব দেখিয়ে চিনিয়ে দিবো তুমি কিচ্ছু চিন্তা করোনা, আমার সাথে তোমার ডিউটি হলে ভালো হত তবে অরুণ দাদা খুব ভালো মানুষ দেখবে সে তোমাকে সব শিখিয়ে দিবে। আচ্ছা এবার দেশের কথা বল, কি অবস্থা?

বলেই একটু ভেবে বলল

না থাক পরে শুনব এখন ইমিগ্রেশন হবে জেটিতে জাহাজ ভিড়িয়ে নেই, অরুণ দাদাও শুনবে, চা কফি সবই আছে কি খাবে?

কিচেনে যেতে হবে?

না, এখানেই ব্যবস্থা আছে,

হ্যাঁ চা খেতে পারি

তা হলে ওই দেখ ওই ইলেকট্রিক জগে পানি গরম দাও আর দেখ ওখানেই চা পাতা দুধ চিনি সব আছে বানিয়ে নাও, আমাকেও এক কাপ দিও।

নিশাত চা বানাচ্ছে আর মুকিত ভাইর কথা শুনছে,

আর শোন, জাহাজের কিছু ভাষা আলাদা যেমন এখানে কিচেনকে বলে গ্যালি, আমরা যেখানে বসি, টিভি দেখি ওটার নাম সেলুন এরকম আরও অনেক কিছু আছে সে আস্তে আস্তে সব জানবে। আমার কাছে কিছু বই আছে ওগুলি নিয়ে পড়বে। আমি আগামী ভয়েজ শেষ করে ইংল্যান্ডে যাব চীফ মেট পরীক্ষা দেবার জন্য।

মানে অরুণদা যা তাই?

হ্যাঁ, তুমিও পারবে কয়েক বৎসর গেলে সরাসরি সেকেন্ড মেট পরীক্ষা দিও, এর মধ্যে যদি ভালো ভাবে সব কিছু শিখে নিতে পার তা হলে দুই এক বৎসরের মধ্যেই ক্যাপ্টেন তোমাকে থার্ড অফিসারে প্রমোশন দিতে পারে। কাজেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটু বই গুলি দেখবে। সেলুনেও দেখবে কিছু বই আছে সেগুলিও পড়তে পার। অবসর সময়ে আজে বাজে চিন্তা ভাবনা না করে, সিনেমা না দেখে পড়াশুনা করতে হবে।

কি কি পড়তে হবে?

অনেক কিছু, নেভিগেশন, সিম্যানশিপ, কম্পাস, চার্ট ওয়ার্ক, রুল অফ দা রোড, সিগনালিং, ফার্স্ট এইড আমি বলে দিবো সব। তোমার ভাগ্য ভালো আমার কাছে এসে পৌঁছেছ। কোন চিন্তা করবে না। কাজে মন দিবে কে কখন কি করে সব কিছু মন দিয়ে লক্ষ্য করবে, দেখবে তুমিও পারবে।

হ্যাঁ ঢাকা থেকে আমার মামা বলেছে এখানে নাকি এ ভাবে ক্যাপ্টেন পর্যন্ত হওয়া যায়?

হ্যাঁ। আচ্ছা ঐযে দেখছ পাইলট লঞ্চ আসছে?

হ্যাঁ ওই যে উপরে একটা লাল সাদা ফ্ল্যাগ উড়ছে ওইটা?

হ্যাঁ, ওটায় পাইলট আসছে, ও আমাদের নিয়ে জেটিতে ভিড়িয়ে দিবে।

পাইলট তো শুনেছি প্লেন চালায়

হ্যাঁ আসলে পাইলট মানে পথ প্রদর্শক, কাজেই যে পথ দেখিয়ে নেয় সেই তো পাইলট তাই না?

ও হ্যাঁ তাই, কিন্তু আপনারা একা জেটিতে ভিড়তে পারেন না?

পারি কিন্তু এটা নিয়ম না, কারণ প্রত্যেক দেশের হারবারের নিজস্ব কিছু কিছু নিয়ম থাকে, হারবারে কোথায় কি আছে তা আমরা জানি না, ওগুলি এই পাইলটেরা জানে, এদেরও আমাদের মত সার্টিফিকেট আছে। এদের বিশেষ ভাবে এই হারবার এলাকার উপর ট্রেনিং দিয়ে পাইলট বানানো হয়। এটা আন্তর্জাতিক আইন।

কথা বলতে বলতে মুকিত ভাই জাহাজের স্পিড কমিয়ে এক সময় থামিয়ে দিল আর ওই পাইলট লঞ্চ এসে জাহাজের পাশে আগে থেকে নামানো সিঁড়ির কাছে ভিড়ল আর সিঁড়ি বেয়ে পাইলট উঠে এলো। পাইলটকে নামিয়ে দিয়ে লঞ্চ চলে গেল। জাহাজের স্পিড বাড়িয়ে দিল। পাইলট উপরে ব্রিজে উঠে এসে মুকিত ভাইর সাথে একটু কথা বলে যে স্টিয়ারিং করছিল তাকে কি সব অর্ডার দিচ্ছে আর সে সেই ভাবে স্টিয়ারিং করে করে এক সময় জাহাজ লন্ডন পোর্ট ইমিগ্রেশন অফিসের জেটিতে ভিড়িয়ে দিল। মুকিত ভাইকেও ইঞ্জিনের গতি সম্পর্কে বলছিল। জাহাজের সামনে পিছনে কোন রশি কখন বাধতে হবে পাইলট তাও বলে দিচ্ছিল। জাহাজ ভিড়ার পর কিছু কাগজ পত্রে ক্যাপ্টেনের সই নিয়ে পাইলট নেমে গেল। একটু পরে জেটির পাশে একটা পিক আপ এসে থামল।

ওটা দেখে জয়নুল বলল স্যার ওই তো ওরা এসে গেছে,

ইমিগ্রেশন অফিসার ও তার সহকারী এবং কাস্টম অফিসার জাহাজে উঠে এলো। মুকিত ভাই এবং পাইলট নিচে নেমে গেল। পাইলট এখান থেকে চলে গেল আর মুকিত ভাই অফিসারদের নিয়ে ক্যাপ্টেনের অফিসে ঢুকল। ওখানে জাহাজের সবার সিডিসি, ক্রু লিস্ট এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখে দেখে সই স্বাক্ষর দিয়ে চলে গেল। এবার এখান থেকে বের হয়ে ইংলিশ চ্যানেল, বে অফ ভিস্কি এবং জিব্রালটার প্রণালী হয়ে ভূমধ্য সাগর দিয়ে সুয়েজ খাল পাড় হয়ে আরব সাগর পাড়ি দিয়ে মিডল ইস্টে যেতে হবে। শুনে নিশাত খুব খুশি। একসাথে এত গুলা দেশ দেখতে দেখতে যাওয়া যাবে! এতদিন যে সব দেশের নাম শুধু ভূগোল বইতে পড়েছে আজ সেগুলি নিজ চোখে দেখতে পাবে! কি আনন্দ! 

জাহাজ চলছে। মুকিত ভাই একটু পরে বলল যাও তুমি রেস্ট নাও রাতে তোমার ডিউটি আছে। নিশাত এসে বিছানায় শুয়ে পরল কিন্তু বইতে পড়া এবং গল্পে শোনা ইংলিশ চ্যানেলের বুকে তার জাহাজ সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে এই আনন্দে নিশাতের ঘুম আসছে না সে উঠে কেবিনের জানালা দিয়ে বাইরে খোলা সাগরের দিকে তাকিয়ে রইল কিন্তু দেশ ছেড়ে আসার পর গত কয়েকদিনের উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা এবং ক্লান্তির জন্য কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ল। সন্ধ্যা সাতটার দিকে ঘুম ভেঙ্গে গেল। তাড়াতাড়ি ধরমর করে উঠে আশে পাশে সবকিছু নতুন এবং অচেনা দেখে বোঝার চেষ্টা করল আমি কোথায়? আস্তে আস্তে সব মনে পড়ল। আমি এখন জাহাজে। যে জাহাজে চাকরী করার জন্য দেশ ছেড়ে মা বাবা ভাই বোন ছেড়ে এত দূরে এসেছি গত কয়েকদিন ভরে। বিছানা ছেড়ে উঠে কেবিনের সিংকে মুখ ধুয়ে ব্রিজে চলে এলো। আরে নিশাত এসো এসো। এখনি এসে পড়েছ?

কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম

তাহলে আর আসার কি দরকার ছিল যাও তুমি রাতের খাবার খেয়ে ইউনিফর্ম পরে রেডি হয়ে এসো।

নিশাত ব্রিজ থেকে সরাসরি গ্যালিতে এসে দেখে এনামুল বসে আছে।

কি ব্যাপার নিশাত ভাই খেতে এসেছেন? জাহাজের নিয়ম কিন্তু এই ডিউটির সময়ের সাথে খাওয়া, এক দল ডিউটিতে যাবার আগে খেয়ে যায় আবার তার পরে আর এক দল ডিউটি শেষ করে খেয়ে ঘুমাতে যায়।

ঠিক আছে সে না হয় বুঝলাম কিন্তু এই এত তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেলে রাতে ক্ষুধা লাগবে না তখন কি হবে?

কেন এই যে দেখেন এখানে ব্রেড, বাটার, জ্যাম, ডিম, দুধ সব কিছু রয়েছে ব্রিজেও থাকে। ক্ষুধা লাগলে যা ইচ্ছা খেয়ে নিবেন, স্যান্ডউইচ বানিয়ে নিতে পারেন এই যে এই ফ্রিজে টমাটো, শসা, লেটুস সব কিছু আছে কোন নিষেধ নেই, কেউ কিচ্ছু বলবে না।

তাই নাকি?

হ্যাঁ, খাবার ব্যাপারে জাহাজে যথেষ্ট সাবধানতার সাথে খুব হিসেব করে মেনু তৈরি করে। চিটাগাঙে আর্টিক্যাল সই করেছেন তাতে দেখেননি এক জন মানুষের দৈনিক কি পরিমাণ এবং কোন ধরনের খাবার দিবে তা ওখানে লেখা আছে, দেখবেন এখানে এক খাবার পর পর দুই বার হবে না। প্রতি দিন ভিন্ন ভিন্ন মেনু থাকবে। এটার দায়িত্ব সেকেন্ড অফিসারের। মুকিত ভাই কিছু বলেনি?

না, বলার সময় পেল কোথায়, অন্যান্য কথায় সময় চলে গেল।

দেখবেন আরও অনেক নিয়ম আছে জাহাজে, নেন খেয়ে নেন আপনার আবার ডিউটির সময় হয়ে গেছে।

কি রান্না হয়েছে?

এখন সবজী, মুরগী আর ডাল

আচ্ছা ওই ফিলিপিনোরা কি খাবে? ওরাও কি এই খাবে? তারপর ক্যাপ্টেন চিফ ইঞ্জিনিয়ার ওরা?

হ্যাঁ ওরাও এই খাবে, এখানে এমন ভাবে রান্না হয় যা সবাই খেতে পারে তবে ক্যাপ্টেন ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য আলাদা রান্না হয়।

আচ্ছা বেশ ভালোই তো এই নিয়ম, দেন দেখি কি দিবেন, তবে এনাম ভাই আমার কাছে এই বিকেল বেলা রাতের খাবার খেতে একটু কেমন অবাক লাগছে।

তা প্রথম প্রথম একটু লাগবেই, পরে অভ্যাস হয়ে গেলে তখন আর অসুবিধা হবে না।

খাবার খেয়ে নিশাত কেবিনে গিয়ে চিটাগাং থেকে দেয়া ডিউটির পোশাক পড়ে ডেকে মুকিত ভাইর কাছে গেল। মুকিত ভাই ওকে দেখে বলল কি ব্যাপার এত তাড়াতাড়ি এলে?

তাড়াতাড়িই এলাম দেখি কি হচ্ছে।

বেশ ভালো কথা, হ্যাঁ সব সময় এই ভাবে পাঁচ সাত মিনিট আগে আসবে এতে অফিসাররা তোমাকে সুদৃষ্টিতে দেখবে।

ওদের কথা বলতে বলতে চীফ অফিসার অরুণ এসে হাজির।

কি ব্যাপার নিশাত, বল দেশের খবর কি, তখন একটু কাজ করছিলাম বলে কথা বলতে পারিনি, তোমার শরীরে বাংলাদেশের গন্ধ পাচ্ছি।

না, অরুণদা বাংলা দেশের গন্ধ দুবাইতে দামী হোটেলের দামী সাবান দিয়ে গোছল করে ধুয়ে ফেলেছি।

আরে ধুর কি বল! আমি এখনও গন্ধ পাচ্ছি, সাবান দিয়ে কি দেশের গন্ধ ধোয়া যায়? আমার মনে হচ্ছে বাংলাদেশটা বুঝি এসে পরেছে। তা বল দেখি কোন কোন ঘাট ধরে এসেছ?

নিশাত এক এক করে বলছে আর মুকিত, অরুণ ডেকের আর দুই জন শাহিন এবং জয়নুল এটা ওটা জিগ্যেস করছে।

একটু পরে কথা শেষ করে মুকিত বলল তাহলে অরুণদা আমি যাই? মুকিত ভাই চলে যাবার পর নিশাত অরুণ’দার সাথে ব্রিজে ঢুকল। অরুণদা প্রথমেই সব কিছুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, ব্রিজ দেখেই নিশাতের খুব ভালো লেগে গেল। মন দিয়ে সব শুনছে। প্রাথমিক ভাবে দেখে যা বোঝা যায় এক নজরে দেখে নিয়েছে। রাডার, স্টিয়ারিং হুইল, কম্পাস, জাইরো কম্পাস, হেল্মস ইন্ডিকেটর, ইঞ্জিন রুম টেলিগ্রাম, ব্যারো মিটার, হাইগ্রো মিটার, ট্রিমিং ইন্ডিকেটর, ইকো সাউন্ডার, স্যাটালাইট ন্যাভিগেটর, ডেকা ন্যাভিগেটর আরও কত কি!

অরুণ’দা ব্রিজের টেবিলের পাশে কফি বার থেকে কফি বানিয়ে কাপ হাতে নিয়ে এলো চার্ট টেবিলের কাছে। অরুণদা চার্ট  টেবিলে একটা ম্যাপের মত মেলে কি যেন করছে

ভূগোল, ম্যাপ কেমন বুঝ?

একে বারে খারাপ না, ভূগোল আমার প্রিয় সাবজেক্ট,

তাই নাকি! বেশ ভালো হয়েছে, তাহলে ম্যাপ বুঝতে তোমার সুবিধা হবে।

টেবিলের উপর একটা ম্যাপের মত বিছানো রয়েছে। তার পাশে কাটা কম্পাস, দুইটা বড় স্কেলের মত এক সাথে জোড়া লাগান রয়েছে এগুলি দেখিয়ে আবার বলল

দেখ তো এগুলি চিনতে পার কি না?

হ্যাঁ এটা একটা ম্যাপ বুঝতে পারছি এই যে এই হচ্ছে সাগর, আর এই যে আমরা যেখান থেকে এসেছি সেই এলাকা, এই হচ্ছে ল্যাটিচুড মার্ক আর এটা লঙ্গিচুড, আর এই পেন্সিলের লাইনটা মনে হচ্ছে আমাদের রাস্তা, তাই না?

বাহ বেশ!, তুমি তো অনেক জান দেখছি!

তবে এই স্কেলটা এমন কেন?

এটাকে প্যারালাল রোলার বলে, দেখ এটা দিয়ে কি করি

এবার চার্ট টেবিলের পাশে উপরে দেয়ালের সাথে লাগান ডেকা ন্যাভিগেটর কেমন যেন একটা ক্লিক ক্লিক শব্দ করছিল ওটায় কি রিডিং দেখে রোলার দিয়ে মেপে চার্টে একটা দাগ দিয়ে বলল

এই যে আমরা এখানে আছি এখন

ও বুঝেছি এর নাম নেভিগেশন?

হ্যাঁ।

[চলবে। এতক্ষণ নিশাতের সাথে নিরুর চায়ের নিমন্ত্রণের অপেক্ষায় থাকুন। ধন্যবাদ]

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন