নির্বাক বসন্ত [মোট ২৫ পর্ব] পর্ব-২৪

Filed under: উপন্যাস |

222সেই নিরু এবার এমএসসি ফাইনাল দিচ্ছে, সামনেই পরীক্ষা, কবে শুরু হবে এখনও জানে না। এদিকে নিশাতও ক্যাডেট থেকে চিফ মেট হয়েছে এবং বুঝে নিয়েছে তার অনুমান ভুল নয়। সারা পৃথিবী ঘুরে জাহাজের জটিল এবং ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ জীবন যাপন করে এসে এই প্রশান্ত চোখ যার তার বুকে একটু আশ্রয় পাবে। নিশাত ভেবেছিল আর কিছুদিন পরে চিফ  অফিসার হয়ে নিরুকে নিয়ে আসবে। এমনিতে যেমন আছে তেমনি চলছে কিন্তু বিয়ের পর কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারবে না। কত কি মনে পড়ছে! নিশাত সালোয়ার কামিজ পরা পছন্দ করে না বলে নিরু ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার পরে থেকে শাড়ি পড়ছে। নিশাতের গান শুনতে ভাল লাগে বলে নিরু গান শিখেছে, ছায়ানটে সেকেন্ড হয়েছিল। গাড়িতে পাশাপাশি বসে যাবার সময় বাতাসে নিরুর এলো চুল উড়ে এসে নিশাতের চোখে মুখে লাগবে আর হাতে সরিয়ে দিতে দিতে আরও কাছে আসবে তাই মাথায় তেল দেয়া চুল বাতাসে উড়বে না বলে নিশাতের ভাল লাগার জন্য  শ্যাম্পু করা চুলেই অভ্যাস করে নিয়েছে। মোটামুটি নিরু নিশাতের জন্য নিজেকে সর্বতোভাবে প্রস্তুত করেছে। ওই বুকেই তার জন্য সঞ্চিত আছে উত্তাল সাগরের মত সীমাহীন সুখ আর নিরাপত্তা, ওই হাত ধরেই এগিয়ে যাবে অনেক দূর! আবার নিশাতকেও অনেক অভ্যাস পরিবর্তন করতে হয়েছে। আগে নিশাত বেশ ড্রিঙ্ক করত কিন্তু নিরুর কাছে প্রতিজ্ঞা করে সে অভ্যাস বাদ দিয়েছে তবে নানা দেশে যাদের চলাচল তাদের বিদেশিদের সাথে চলা ফেরা করতে হয়, তাদের সাথে নানান পার্টিতে যেতে হয় শুধু  পার্টির সময় হালকা কিছু পান করার অনুমতি নিয়ে নিয়েছে এবং তার পরদিন কতটা কি ড্রিঙ্ক করেছে তা বিস্তারিত নিরুকে জানাবার প্রতিজ্ঞা করেছে। নিরু আকাশী রঙ পছন্দ করে তাই নিশাতের অন্তত শার্ট আর টি শার্ট মিলে গোটা ছয়েক আকাশী রঙের জামা আছে। এই অবস্থায় কে কাকে ছাড়া বাঁচবে? নিশাতের আলমারি ভরা নিরুর জন্য মুম্বাই থেকে কেনা শাড়ি, ব্রিটেন জার্মানির কসমেটিকস শ্যাম্পু, ফ্রান্সের পারফিউম কত কি।  কিন্তু নিরু এখনই এসবের কিছুই নিবে না। ওই এক কথা সবাই জিজ্ঞেস করলে কি বলব? বিশ্ববিদ্যালয়ে যেদিন ভর্তি হলো সেদিন নিশাতই সঙ্গে গিয়েছিল। নীলা এখনও জিজ্ঞেস করে ওই যে প্রথম যেদিন তোর সাথে দেখলাম সেই কি তোর সৌভাগ্যবান? নিরু আস্তে করে এড়িয়ে যায় কাউকে কিছু বলে না, বলতে পারে না অত্যন্ত চাপা মেয়ে।

কত স্বপ্ন। চিফ মেট হলে নিরুকে সাথে নিয়ে যেতে পারবে তখন দুইজনে একসাথে থাকবে। জাহাজের সাথে সাথে নিরুকে নিয়ে পৃথিবী ঘুরে বেড়াবে। লন্ডনের কথাই বারবার মনে আসে। বিয়ের পর দুই মাসের ছুটি নিয়ে লন্ডন আসবে। নিরুর হাত ধরে পিকাডেলি সার্কাস দেখবে, বাকিংহাম প্যালেস দেখবে, বিগবেন, মার্বেল আর্চ, লিভারপুল স্ট্রিট, অক্সফোর্ড সার্কাসে কেনাকাটা করবে, সন্ধ্যায় টেমসের পাড়ে নিরুর হাত ধরে দাঁড়িয়ে টেমসের বয়ে যাওয়া দেখবে। টিউব রেলে করে হোয়াইট সিটিতে গিয়ে বিবিসি বিশ্ব দেখবে, ব্রিটিশ মিউজিয়াম, মাদাম তোশো কত কি দেখবে! ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ার, বার্লিন আর প্রেমের তীর্থ ইটালির ভেনিসে না গেলে কি হয়? প্রেম নগরী ভেনিসে নৌকায় করে ঘুরবে। শীতের দেশে নাইট নেভিগেশনের সময় নিরু ব্রিজে থাকবে আর দুজনের হাতে থাকবে কাল কফির মগ। সারা দিনে কঠিন ডিউটি করে রাতে নিরুর বুকে আশ্রয় নিয়ে নিশ্চিন্তে পরম শান্তিতে ঘুমাবে! যখন ভাবনার সাগরে ডুবে গেছে তখনই বেরসিক বিমানবালার কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল, বিমানের বাঙালি বিমান বালা বলছে, ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয় গন আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে ঢাকা বিমান বন্দরে……………………………..।

ভোরে ঢাকায় নেমে প্রথমে বাবার মতিঝিলের বাসায় যেতে হবে। মা বাবা কেউ জানে না যে নিশাত আসছে। তারা হঠাৎ করে নিশাতকে দেখে অবাক হয়ে যাবে। হিসাব অনুযায়ী আরও প্রায় এক মাস পরে ওর আসার কথা, কাজেই এমন সময় দেখলে অনেকগুলো মিথ্যা বলতে হবে। ওদিকে নিরু এখন কোথায়? হলে নাকি বাড়িতে! ওকে পেতে হলে আগে যেতে হবে বীণা আপার বাড়িতে। ক্লাস না থাকলে ও হলে থাকে না এখানেই চলে আসে। ভোর পাঁচটায় ঢাকা নেমে মতিঝিলের বাসায় আসতে আসতে সকাল আটটা বেজে গেল। মা দেখেই হা করে তাকিয়ে রইল, কি ব্যাপার তুই কোথা থেকে কেমন করে? ভাগ্য ভাল বাবা অফিসে চলে গেছে। বলছি বলছি সবই বলছি। চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে মার সাথে নাস্তার টেবিলে বসে আলাপ হলো। জাহাজ আমস্টারডাম যাবার আগে হঠাৎ করে রিলিভার চলে এলো বলে এসেই পরলাম আগামী মাসের শেষ দিকে আবার চলে যাব। ও আচ্ছা, ভাল হয়েছে। ওদিকে তোর বাবা রায়হান ভাইকে বলে রেখেছে সামনের মাসে তুই আসবি। রায়হান চাচাকে আমার আসার কথা জানাবার এমন কি প্রয়োজন?
বারে! তাকে জানাব না তো কাকে জানাব? কি বলছিস তুই? এবারে তুই আসার পরই কাজলকে নিয়ে আসার কথা ভাবছি আমরা সবাই আর তুই কি বলছিস?
কেন কাজল কি কখনও এ বাসায় আসেনি?
সে আসা এ আসা কি এক হলো?
দুই হলো কি করে? মা তোমরা যা ভাবছ তা হবার নয়!
কেন কি হয়েছে? হবে না কেন?
সে অনেক কথা কাজেই এমন করে এখনই কিছু ভাববে না এবং চাচার সাথেও এ ব্যাপারে কিছু আলাপ করবে না। মনে থাকে যেন! আমি এখন একটু বাইরে যাচ্ছি, ফিরতে দেরি হবে।
কোথায় যাবি?
এইতো কাছেই!
তাড়াতাড়ি ফিরবি।
আচ্ছা চেষ্টা করব!
বাসা থেকে বের হয়ে একটা স্কুটার নিয়ে সোজা সোবহান বাগ বাস স্ট্যান্ডের পাশে বীণা আপার বাড়িতে। এখানেও দুলাভাই বাড়ি নেই। এই সময়ে পুরুষ মানুষ কেইবা বাড়ি থাকে!
বীণা আপাও মায়ের মত অবাক, কি ব্যাপার নিশাত কবে আসলি? তুই না বলে গেলি জানুয়ারিতে আসবি!
আজই সকালে আসলাম, হ্যাঁ বলেছিলাম আগামী মাসে আসব কিন্তু চলে আসলাম, কোম্পানির খরচে যাতায়াত কিনা
ও আচ্ছা!
কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর, আচ্ছা আপা নিরু কোথায়?
ওতো বাড়িতে! ক্লাস বন্ধ তাই। এইতো কয়েকদিন আগেই চলে গেল, এ কয়দিন এখানেই ছিল বাবা এসে নিয়ে গেছে!
কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। আজই মানিকগঞ্জে যেতে হবে। আমি তাহলে চলি আপা!
সে কি? এতদিন পরে আসলি কিছু খেয়ে যা!
না আপা আজই আসলাম তো একটু কাজ আছে, মতিঝিলে যেতে হবে।
বীণা আপা কি বুঝল কে জানে!
বাসায় ফিরে এসে একটা ব্যাগ গুছিয়ে সোজা গুলিস্তান বাস টার্মিনাল। ব্যাগ গোছাবার সময় মা জিজ্ঞেস করেছিল: কিরে কোথায় যাচ্ছিস? এইমাত্র এসেছিস এখনই আবার কোথায় যাবি?
একটু বাড়ি যাব মা
দুই একদিন পরে যা
না আজই যাই
মানিকগঞ্জের শুভ যাত্রা কোচ কোথায় থেকে ছাড়ে নিশাত ভাল করেই জানে। বিকেলের আগেই বাড়ি পৌঁছে গেল।

মইন চাচা দেখেই অবাক,
কিরে নিশাত তুই কবে এসেছিস?
এইতো কাকা আজই এসেছি। শিহাব কি বাড়িতে আছে?
আছে বাড়িতেই আছে, একটু আগে এখান থেকে গেল
চলনা চাচা একটু শিহাবের সাথে দেখা করে আসি
এত ব্যস্ত হবার কি আছে, মাত্র এসেছ বিশ্রাম নাও খাওয়া দাওয়া কর সন্ধ্যার আগে গেলেই হবে
না চাচা তুমি চল ওদের ওখানেই যা আছে খেয়ে নিব
বাড়িতে শিহাবের সাথে দেখা হলেই নিরুকে পাওয়া যাবে।
চল, বলেই হাটা শুরু করল।
শিহাব মইন চাচার ওখান থেকে এসে বাগানের কাজ শুরু করেছে, হাতে একটা প্রুনার। দূর থেকে মইন চাচা আর নিশাতকে দেখে প্রুনার হাতেই এগিয়ে গেল আরে নিশাত কবে এসেছিস? কেমন আছিস?
ভাল আছি! আজ সকালেই এসেছি, তোরা কেমন আছিস?
আমরাও ভাল গত কয়েক দিন একটু ব্যস্ত ছিলাম নিরুকে দেখতে এসেছিল তাই
কথাটা শুনেই নিশাতের বুকে ধক করে উঠল, কি বললি, কাকে দেখতে এসেছিল?
ওইতো নিরুকে
নিশাত এতক্ষণে বুঝতে পারে। সবকিছু স্পষ্ট হয়ে গেল। স্বপ্নে দেখা, চিঠি এবং ঢাকায় না থাকার সব কিছু এক এক করে নিশাতের চোখার সামনে ভেসে এলো। একই সূত্র। এখনই ওর সাথে দেখা করতে হবে।
আচ্ছা শোন, তুই ভিতরে চাচিদের বল আমার ক্ষুধা পেয়েছে কিছু খেতে দিতে বল।
নিশাত জানে এখন কোন চাচিই ওকে ভাত বেড়ে দিবে না, এখন একমাত্র নিরুই আসবে ওকে ভাত বেড়ে দেয়ার জন্য আর এটাই একমাত্র সুযোগ।
চাচিরা সবাই ব্যস্ত আমি নিরুকে বলছি
যা তাড়াতাড়ি কর
শিহাব বাড়ির ভিতরে গিয়ে সম্ভবত নিরুকে কিছু বলে আসল একটু পরে নিরু এসে শিহাবের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল আসুন ভিতরে আসুন।
নিশাত উঠে নিরুর সাথে খাবার ঘরে গেল
নিরু
সারা রাত জার্নি করে এই সময়ে এখানে আসার এমন কি জরুরী ছিল? কাল আসলে কি হতো?
তুমি এমন করে স্বপ্নে দেখা দিচ্ছ বারবার, চিঠিতে একই কথা লিখছ, আসব নাতো কি করব? সিঙ্গাপুর থেকে যে চিঠি পেয়েছি তাতে যা লিখেছ দুবাই যেয়ে যে চিঠি পেলাম তাতেও ওই একই কথা
আমি আপনার কে হই যে আমাকে এত স্বপ্নে দেখবেন?
না তুমি আমার কিচ্ছু হও না, খুশী হয়েছ এবার?
আমার খুশীতে কার কি আসে যায়?
তুমি জান না কার কি আসে যায়? তুমি সামনে পরীক্ষা রেখে এখানে এসেছ কেন, তাই বল
কেন আবার? এই জন্যেইতো বারবার লিখেছি দুলাভাইকে জানাতে। তাছাড়া আমিতো আসতে বলিনি, আমি বলেছি দুলাভাইয়ের সাথে আলাপ করতে, ফোনে আলাপ করে কথাটা বলে দিলেই হত না? নয়ত চিঠিতে লিখলেই হতো
কথা বলবে নাকি খেতে দিবে? ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে, এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় যেয়ে নাস্তা করেছি এর পরে আর কিছু খাইনি
দিচ্ছি, খেয়ে নেন
কি রান্না হয়েছিল?
করল্লা ভাজি, টেংরা মাছ আর ডাল আছে
করল্লা ভাজি!
হ্যাঁ, আমি রান্না করেছি
ও আচ্ছা তাহলে দাও
নিশাত সাধারণত করল্লা ভাজি খায় না কিন্তু নিরু ভাজি করলেই শুধু খেতে পারে। খেতে খেতে কথা হচ্ছিল।
বল দেখি কি ব্যাপার?
ব্যাপার আর কি, যা হবার তাই, ঘিওর থেকে এক ডাক্তারের বাবা লোকজন নিয়ে এসেছিল, ছেলে নাকি হোলি ফ্যামিলিতে ডাক্তারি করে। আগে থেকে দুলাভাইকে বলে রাখলে এসব ঝামেলা হতো? কতবার বলেছি তা আমার কথায় তিনি কানই দিলেন না
তারা কেন এসেছিল?
কেন এসেছিল তাও বলে দিতে হবে?
তুমি কিছু বলনি?
কি বলব? আমি আপনার ভাতিজা নিশাতকে ভালবাসি আর নিশাত আমার সাথে প্রেম করে বলে এ বিয়েতে মত দিতে পারছিনা, তাই বলব?
কি যা তা বলছ, এই শোনার জন্য আমি দুবাই থেকে এসেছি? এক ফাঁকে এদিক ওদিক দেখে নিরুর হাত ধরে
নিরু!
বলেন
ঘটনা জটিল বুঝতে পারছি, কিন্তু তুমি কি বলেছ সত্যি করে বল
আমি বলেছি, পরীক্ষার আগে কিছু ভাবা আমার পক্ষে সম্ভব নয়
বেশ করেছ, তাহলে এখন কি করতে হবে বল
মা বা চাচি কেউ এসে পরবে আপনি খেয়ে নেন পরে বলছি।
খাবার শেষ করে নিশাত শিহাবের ঘরে এসে বসল। শিহাব তখনও বাগানেই কাজ করছে চাচা পাশে বসে আছে। একটু পরে নিরু খাবার ঘরের সব কিছু গুছিয়ে রেখে এ ঘরে এসে সেই ছোট বেলার মত খুটিতে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।
নিশাত আস্তে করে বলল,
তুমি কালই আমার সাথে ঢাকা চলো।
ঢাকা যেয়ে কি হবে?
একটা পথে খুজে পেতে হবে না?
পথ খুজতে হবে না, শুধু দুলা ভাইকে বললেই হবে
তাতেওতো ঢাকা যেতে হবে
আচ্ছা মাকে বলে দেখি
[চলবে। এতক্ষণ নিশাতের সাথে নিরুর চায়ের নিমন্ত্রণের অপেক্ষায় থাকুন। ধন্যবাদ]

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন