অশিক্ষিতদের বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয়: : আলোচনা,মাতৃভূমি,রাজনীতি |

[আমার লেখা দ্বারা আমি কাউকে বা কোন কিছুকে ছোট , অবমাননা বা হেয় করতে চাই না । আমি কোন ধর্মীয় মতাদর্শ বা অন্য কোন মতাদর্শের মানুষকে আঘাত দেবার জন্য লিখি না । আমি সব ধর্মের , মতের ও পথের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল , সহনশীল ও সহানুভূতিশীল । যাঁদের  আমার লেখা বা মতামত পছন্দ না , তাঁরা দয়া করে আমার লেখা এড়িয়ে যাবেন বা ডিলিট করবেন ; এই আশা-ই করি । আমি যা প্রকাশ করি তা একান্তই আমার নিজস্ব মত । ধন্যবাদ সবাইকে ।]

আমার লেখার শিরোনাম পড়ে অনেকেই আঁতকে উঠতে পারেন ! কেউ কেউ মনে মনে ভাবতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয় আবার অশিক্ষিতদের হয় কীভাবে ? বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়েন ও পড়ান তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত , মানে সর্বনিম্ন উচ্চ মাধ্যমিক পাশ । তাছাড়া , যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী হন , তাঁরা সবাই খুব প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতির মাধমে নির্বাচিত হন ; তাহলে , তাঁরা কেন অশিক্ষিত হবেন ? খুব সাদামাটাভাবে মূল্যায়ন করলে আপনার ধারণা সঠিক ; কিন্তু আপনি যদি একটু গভীরভাবে মূল্যায়ন করেন , তাহলে , আলোচ্য বিষয়টি আপনার কাছে ততটা সরল মনে হবে না যতটা সরল আপনি সাদামাটা চোখে মনে করেছিলেন । চলুন এই বিষয়টি আমরা একটু গভীরভাবে মুল্যায়ন করার চেষ্টা করি –

 

আমরা সবাই জানি যে , বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান । তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে করা হয় যে , এখানে যারা পড়বেন ও পড়াবেন তারা হবেন শিক্ষা-দীক্ষায় সর্বশ্রেষ্ঠ মানের । তাঁরা জ্ঞান , বিজ্ঞান , প্রগতি , সৃজনশিলতা ও মননশিলতার চর্চা ও লালন–পালন করবেন , বিভিন্ন সুস্থ সাংস্কৃতিক ও মানবিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবেন । কিন্তু তাঁরা এগুলো করেন কি ? একটু গভীরভাবে খোঁজখবর নিলেই আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন । না । বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এসব করেন না । তারা জ্ঞান , বিজ্ঞানের চর্চা করেন না , করেন না প্রগতিশীল ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা , সৃজনশীল ও মননশীল বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সাথে তাঁরা অসম্পৃক্ত । তাহলে , এই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা কী করেন , কিসের সাথে তাঁরা সম্পৃক্ত ? তারা অবশ্যই কিছু একটা করেন । এখানে , অধিকাংশ শিক্ষক চান পদ , আর শিক্ষারথীরা চায় অর্থ ও সনদপত্র । এগুলো পাবার জন্য যা প্রয়োজন তারা তা-ই করেন । দলাদলি , চাটুকারী , তোষামোদি , খুনাখুনি , হানাহানি , মারামারি , কাটাকাটি , পলিটিক্যাল লবিং , ইত্যাদি তারা করেন । তারা তাঁদের স্বার্থ হাসিলের জন্য সব করতে পারেন , এমন কিছু নেই যে তারা তা করতে পারেন না । তারা পারেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবন নষ্ট করতে , সময় নষ্ট করতে , দেশের সম্পদ ভাংচুর , নষ্ট ও অপচয় করতে ; তারা পারেন দেশের কৃষক , শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত উপার্জনে তৈরি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অচল করে দিতে – তাদের (কৃষক , শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ ) সম্মতি না নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বন্ধ ও ধ্বংস করে দিতে । এসব করতে তাদের প্রয়োজন নেই অনুমতির । তাদের বুক কাঁপে না , মনে চিন্তা জাগে না , অপরাধবোধ কাজ করে না । আসলে , তারা মানুষ ; তবে নৈতিকতাহীন । কবীর চৌধুরী একটা কথা আছে । কথাটা হল – নৈতিকতা বিবর্জিত মানুষের চরিত্র বলতে কিছুই থাকে না । এখানে , আসলে তাদের চরিত্র নেই কথাটা বললে ভুল হবে , তাদের চরিত্র আছে ; সেই চরিত্র কীরকম – অন্ধ , লোভী , স্বার্থপর , হিংস্র ও পশুসুলভ । পশু যেমন নিজের জন্য সবকিছু করে তারাও তেমনি তাদের স্বার্থের জন্য সব করে ; তাতে কার কী সুবিধা ও অসুবিধা হলো , তা তারা পরোয়া করে না । তাদের দেখে আমার সেনেকার কথাটা মনে পড়ে – নৈতিকতা বর্জিত একজন মুক্ত মানুষের চেয়ে নৈতিকতাসম্পন্ন একজন ক্রীতদাসও অনেক শ্রেষ্ঠ । আসলেই , তারা ক্রীতদাসের চেয়েও অদম ; কারণ ক্রীতদাস কারো ক্ষতি করত না , আর তারা সবার ক্ষতি করে । যেখানে পরিশ্রম নেই , সেখানে সাফল্যও নেই – কথাটা উইলিয়াম ল্যাংলেডের । আমাদের অধিকাংশ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা কত পরিশ্রমী ! গোণ্ডামী , পাণ্ডামী , দলাদলি ও তোষামোদির জন্য তারা দিনরাত পরিশ্রম করে , আর এই কারণে তাদের সফলতাও অনেক । দেখেন না ছাত্ররা বন্ধুক উঁচিয়ে , গোলাগুলি করে ক্যাম্পাসে কি বাহাদুরি দেখায় ! কি তাদের নেশানা ! কি সুন্দর করে একেক জনকে গুলি করে । কারো মাথার খুলি উড়ে যায় , কারো হাত , কারো পা , কারো পেটের নাড়িভুঁড়ি , আবার কাউকে পাঠিয়ে দেয় অনন্তকালের যাত্রায় ।

 

এ তো গেল ছাত্রদের কথা । শিক্ষকরাও আবার অনেক পরিশ্রমী ! সারা দিনরাত নেতানেত্রীদের তোষামোদি , চামচামি ও তেল মালিশ করা , নেতানেত্রীদের বাড়িতে গিয়ে গিয়ে সব সময় ধরণা দেয়া , গোলামি করা । আর তারা এতো পরিশ্রম করেন বলেই ফল পান , হই হই করে একেকজন হয়ে যান অধ্যাপক , বিভাগীয় প্রধান , ডিন ইত্যাদি , যোগ্যতা না থাক সত্ত্বেও । পোস্ট পেয়ে তারা নিজেদের , নেতার , ও দলের স্বার্থ দেখেন , তাদের কথামত কাজ করেন । আর কাজ তো কথামত অবশ্যই করতে হবে , কারণ – গোলামের উপর মুনিবই তো ভরসা করে । কাগজেকলমে শুধু পাওয়ার তাদের কাছে , আসল পাওয়ার তো নেতা–নেত্রী ও দলের কাছে ; একথা তারা মনে হয় ভালো করেই জানেন , আর এই কারণে , সর্বদা ইয়েস স্যার , ইয়েস ম্যাম করেন । আর তাদের কাছে পাওয়ার থাকবেই বা কী করে ? কারণ আমরা জানি যে , Knowledge is power ; আর তাদের তো সেই নলেজেই নাই , কাজেই পাওয়ার আসবে কই থেকে ? খেয়াল রাখবেন , তারা কিন্তু দুষ্ট প্রকৃতির মানুষ না । তারা সাচ্ছা ভালো মানুষ , কারণ তারা তাদের নেতানেত্রী ও দলের কাছে কৃতজ্ঞ মানুষ । দুষ্ট প্রকৃতির লোকেরা সবসময়ই অকৃতজ্ঞ – কার্ভেনটিস । তারা সুষ্ঠু প্রকৃতির লোক বিধায়ই তারা কৃতজ্ঞ এবং তারা অনেকক্ষেত্রে মানুষ থেকেও শ্রেষ্ঠ !কারণ শেখ সাদি বলেছেন – কৃতজ্ঞ কুকুর অকৃতজ্ঞ মানুষের চেয়েও শ্রেয় । তাই , তারা শ্রেষ্ঠ নয় কি ? যদি এই প্রমাণগুলো অপ্রতুল হয় , তাহলে , আরো প্রমাণ আছে ; নীতিগল্পের জনক এশপের কথা স্মতর্ব্য – Gratitude is the sign of noble souls . এবার তো দেখলেন , তারা কি নোবেল মাইন্ডের মানুষ !

কলেজবিশ্ববিদ্যালয়ে মারমারি , কাটাকাটি , গোলাগুলি , নেতানেত্রীদের বাসায় দোড়ঝাপ , গোলামি , চামচামি , তোষামোদি করা , এই যে এতো অনুশীলন , পরিশ্রম , ত্যাগ–তিতিক্ষা , ধৈর্যধারণ , এসব কী জন্য ? নিশ্চয়ই তার একটা ফল , লাভ বা সফলতা আছে ? হ্যাঁ , অবশ্যই আছে । তাহলে তাদের ( অধিকাংশ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ) ফল বা লাভটা কী ? এই যে নিরস্ত্রভাবে কিছু না করে সস্ত্রভাবে কিছু করা , চাঁদাবাজি–টেন্ডারবাজি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া , গাড়ি – বাড়ি কেনা , সম্পদের পাহাড় গড়া , উপরি পাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি । আসলে রাজনীতিটাজনীতি এসব কিছু না , লোভ , ক্ষমতা , টাকা-ই সবকিছু । মুখে শুধু আদর্শের বুলি , আর অন্তরে শুধু ক্ষমতা আর টাকা । এদের অবস্থা অনেকটা পতিতার মত । পতিতারা দেহ দেখিয়ে টাকা ইনকাম করে , আর এরা আদর্শ দেখিয়ে টাকা ইনকাম করে ; ফারাকটা শুধু এইটুকুই , মূল একই , আর তা হচ্ছে টাকা । এখন খুব খুব কম লোকই পাওয়া যাবে , যারা রাজনীতি লোভ , ক্ষমতা বা টাকার জন্য করেন না ; তারা রাজনীতি করেন মানুষের , সমাজের ও দেশের জন্য । তারা যেমন বাহিরে আদর্শ দেখান , তেমনি ভিতরে তার চর্চাও করেন । তবে তাদের সংখ্যা খুবই খুবই অল্প । কারণ একজন ভালো মানুষ আরেকজন ভালো মানুষের সাথে সম্পর্ক রাখেন , একজন ভালো মানুষ কখনোই একজন চোরের সাথে সম্পর্ক রাখবেন না । রাজনীতিতেও তাই ঘটে । এতোসব অনাদর্শিক রাজনীতিবিদদের ভিড়ে আদর্শিক রাজনীতিবিদরা হারিয়ে যান , তাঁদেরকে খুঁজেই পাওয়া যায় না ।

 

আদর্শ বনাম আদর্শহীন রাজনীতিবিদ নিয়ে অন্য একদিন লিখব ; আপাতত যে বিষয়টার জন্য লিখছি সেদিকে মনোযোগ দেয়া যাক । সমাজের মুরব্বিরা একটা কথা প্রায় সময়ই বলেন যে , বড়দের দেখে ছোটরা শেখে । কথাটা আসলেই ঠিক । বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ছাত্রছাত্রীরা দেখছে যে , তাদের দলের নেতা-নেত্রীরা পড়াশোনা না করে গোণ্ডামি , মারামারি , কাটাকাটি , লুটপাট করে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন , ক্ষমতার গদিতে বসে তারা যা ইচ্ছা করছেন ; খুন , ঘুম , ঘোষ খাওয়া , হত্যা করা অরাজকতা সৃষ্টি করা , তাদের যা ইচ্ছা সবকিছু করছেন । ছাত্রছাত্রীরা দেখছে যে , তাদের অধিকাংশ নেতানেত্রীদের না আছে সঠিক শিক্ষা-দীক্ষা , না তারা রুচিবান ও সংস্কৃতিমনা  , না আছে তাদের মধ্যে মানবতাবোধ ; তাহলে তাদের কি আছে ? তাদের আছে শুধু টাকা আর ক্ষমতা । তাই , ছোটদের মানে ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখায় মন নেই , তারা সৎ , সংস্কৃতিমনা , রুচিবান ও মানবিকবোধ সম্পন্ন মানুষ হতে চায় না ; তাদের মধ্যে সেই ইচ্ছাও নেই , লক্ষ্যও নেই , নেই আকাঙ্ক্ষাও । তাহলে তারা কি হতে বা পেতে চায় ? তারা তাদের নেতানেত্রীদের মত হতে চায় । তারা চায় টাকা আর ক্ষমতা – কারণ এ দুটো জিনিস থাকলে বস্তুজগতের সবকিছুই পাওয়া যায় । আর তাই , তারা তাদের নেতানেত্রীদের দেখানো পথ অনুসরণ করে । তারা গোণ্ডামি , চাঁদাবাজি , মারামারি , কাটাকাটি , খুন , ঘুম ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছু করে যা তাদের নেতানেত্রীরা করে থাকেন । ফলে তাদের কেউ আর হতে চায় না আরজ আলী মাতুব্বর , কবীর চৌধুরী , আহমদ শরীফ , হুমায়ুন আজাদ , জামাল নজরুল ইসলাম , সত্যেন বোষ কিংবা সরদার ফজলুল করিমের মত মানুষ ; এখনকার শিক্ষকরাও তাঁদের মত মানুষ হতে চান না , আর শিক্ষার্থীদের কথা বাদ-ই দিলাম , তারা হতে চায় তাদের অধিকাংশ নেতানেত্রীদের মত খারাপ ও অসৎ মানুষ  । কারণ , ক্ষমতা মানুষকে খারাপ করে , চূড়ান্ত ক্ষমতা চূড়ান্তভাবেই খারাপ করে – আবুল মনসুর আহমদ ; কে কত সৎ অসৎ তার মনুষ্যত্ব কতটুকু সব কিছুই বোঝায় টাকার ব্যাপারে – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । তারা আর আব্দুল্লাহ আবূ সায়ীদ স্যারের কথা মত , শিক্ষার মাধ্যমে আলোকিত মানুষ হতে চায় না । কারণ – তাদের কাছে সায়ীদ স্যারের কথার দাম নাই । তারা টাকার প্রাচুর্যে ও ক্ষমতার প্রকাশে আলোকিত মানুষ হতে চায় – তাদের নেতানেত্রীদের কথা ও দর্শন মতো । অর্থ-ই অনর্থ ঘটায় – বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কথাটা ঠিক ; আর সে কারণেই  অর্থলোভী তারাও অনর্থক ও অশিষ্ট অমানুষে পরিণত হয়ে যায় নিজেদের অগোচরেই ।

 

বিশ্ববিদ্যালয় অর্জিত জ্ঞানের গুদাম মাত্র নয় । এটি একটি প্রতিষ্ঠান যাকে জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাতাদের জতুগৃহ বলা যায় । –  বিচারপতি হামিদুর রহমান ; যে উৎস থেকে সমৃদ্ধি চিন্তা কালান্তরী আবিষ্কার দক্ষকুশলী জন্ম নিয়ে মানবিক সমস্যা সমাধানকল্পে মিশে যাবে বৃহত্তর জাতীয় জীবনের সেই উৎস মুখে রূপায়িত আকাঙ্ক্ষাই বিশ্ববিদ্যালয়ের চিরন্তন লক্ষ্য । – অধ্যাপক জেঙ্কিনস ; বিশ্ববিদ্যালয়গুলি হল জ্ঞান সাধনার পাদপীঠ , এখানে মানুষের চিন্তা নিয়ন্ত্রণক্ষম তিনটি দার্শনিক বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয় । এই বিষয়টি হল : –  বিশ্বজনীন মূল্যবোধ , প্রয়োজনীয় জ্ঞান এবং ভবিষ্যৎ সমাজ । – অধ্যাপক আবদুল মতিন চৌধুরী ; বিশ্ববিদ্যালয় মুক্ত বুদ্ধি ও স্বাধীন চিন্তার কেন্দ্রস্থল । এখান থেকে বুদ্ধির মুক্তি ও চিন্তা স্বাধীনতা সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে । – বিচারপতি আবু সায়ীদ চৌধুরী ; দেশের জ্ঞানসৌধের শীর্যদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান । জাতির বুদ্ধি বৃত্তির সাধন এবং মানবীয় ক্ষমতার পূর্ণতর রূপায়ন এই প্রতিষ্ঠানের চিরায়ত লক্ষ্য । জ্ঞানসৌধের ভিত্তিটাকে সুঠাম ও সবল করেন , ইস্পিত বিস্তার এবং শক্তিদান করেই শুধুমাত্র এই অভীষ্ট সিদ্ধ হতে পারে । – অধ্যাপক ওসমান গণি ; বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জানেন জীবনের প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনে ছাত্রকে সহায়তা দান করাই তার প্রধান কর্তব্য । – অধ্যাপক মাহমুদ হোসেন ; বিশ্ববিদ্যা অন্বেষণে নিযুক্ত শিক্ষক , গবেষক ও শিক্ষার্থীগণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রসারিত করেন স্বদেশের মেধাশক্তি , উন্নয়নের জ্ঞানসূত্র , মানবসমাজ পরিচালনা প্রক্রিয়া , নেতৃত্ব বিকাশের সংগ্রাম , সৃজন তৎপরতার বহুব্যাপ্ত শৃঙ্খলা , বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় মেধাবিকাশের মস্তিষ্কস্বরূপ । – রতনতনু ঘোষ ( বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা বইয়ের ভূমিকা ) ; জাতীয় জীবনের জন্য মানবসম্পদ সৃষ্টি আর জ্ঞানবিকাশের লক্ষ্যেই সৃষ্টি হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় । – সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ হুমায়ুন কবির ; এইসব রাজনীতির প্রভাব ও কার্যপরম্পরার কথা বাদ দিয়া আমি ধরিয়া লইব যে , বিশ্ববিদ্যালয় দুটি উদ্দেশ্য সাধনের জন্য রহিয়াছে ; প্রথম , কতকগুলি বৃত্তি বা পেশার জন্য পুরুষ ও নারীদিগকে শিক্ষা দিয়া প্রস্তুত করা ; দ্বিতীয় , আশু কোনও কিছু লাভের সম্ভাবনা সম্মুখে না রাখিয়াও উচ্চস্তরের জ্ঞান অর্জনের ও গবেষণার সুযোগ দান । – বি . রাসেল ( শিক্ষা প্রসঙ্গ ) ; বিশ্ববিদ্যালয় একটি বিশেষ সাধনার ক্ষেত্র । সাধারণভাবে বলা চলে , সে সাধনা বিদ্যার সাধনা । কিন্তু তা বললে কথাটা সুনির্দিষ্ট হয় না ………… – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।

 

উপর্যুক্ত কথাগুলোর প্রেক্ষিতে মনে একটা প্রশ্ন জাগে যে , বিশ্ববিদ্যালয় কি তাদের কাজ ঠিকঠাক মত করছে ? না , তারা তাদের কাজগুলো ঠিকমত করছে না ; আর করছে না বলেই সাংস্কৃতিক , রুচিবান , সৃজনশীল , মননশীল ও প্রগতিশীল মানুষ ও প্রতিষ্ঠান বেরুচ্ছে না , এর বদলে বেরুচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল মানুষ ও প্রতিষ্ঠান । বিশ্ববিদ্যালয়গুলি কেন তার কাজ করতে ব্যর্থ হচ্ছে ? কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশ গুরু ও শিষ্যরা জ্ঞানের সাথে অসংশ্লিষ্ট , তারা বিজ্ঞান ও গবেষণার চর্চা করেন না , করেন না সৃজনশিলতা ও প্রগতশিলতার চর্চাও । ফলে , এখান থেকে আর আলোকিত মানুষ বের হতে পারে না , যা বের হয় তা হচ্ছে প্রতিক্রিয়াশিলতা , কুসংস্কার , অন্ধবিশ্বাস , মূর্খতা , গোড়ামি , নোংরামি ইত্যাদি ইত্যাদি নেতিবাচক বিষয়গুলো ; ইতিবাচক কোনো কিছুই আর বের হয় না । এসব বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি  করতে পারবে  অর্থ ও ক্ষমতালোভী অমানুষ , এর চেয়ে বড় কিছু তৈরি করতে পারলে , পারবে স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা সম্পন্ন অমানুষ , এর চেয়ে বড় কিছু তৈরি করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় ; কারণ , একজন ঘুমন্ত ব্যক্তি আরেকজন ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগাতে পারে না – শেখ সাদী । দেশের মানুষগুলো অক্লান্ত পরিশ্রম করে টাকা দিচ্ছে , আর বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তাকর্তারা কোনো কাজ না করেই তা লুটেপুটে খাচ্ছে । তারা তাদের কাজকর্ম এক মুহূর্ত বন্ধ না করে টাকা দিচ্ছে , আর ওদিকে বিশ্ববিদ্যালয়কলেজগুলো মারামারি-কাটাকাটি করে বন্ধ থাকছে দিনের পর দিন , মাসের পর মাস । বিশ্ববিদ্যালয়কলেজগুলো বন্ধ থাকছে কার স্বার্থের জন্য ? দেশের মানুষের ? না , শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের স্বার্থের জন্য বন্ধ থাকছে না , বন্ধ থাকছে কিছু মানুষ , গোষ্ঠী বা দলের নিজস্ব স্বার্থের জন্য ; আর অপচয় হচ্ছে দেশের মানুষের টাকা ও সম্পদ , ক্ষতি হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের । তাদের ( কিছু মানুষ , গোষ্ঠী , দল ) কিন্তু ক্ষতি হচ্ছে না , বরঞ্চ তাদের লাভই হচ্ছে ।

 

আজ এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মারামারিকাটাকাটি তো কাল অন্য প্রতিষ্ঠানে মারামারিকাটাকাটি ; আজ এখানে খুন কাল অন্যখানে খুন ; আজ এখানে বিবাদ তো কাল আরেক জায়গায় বিবাদ , আজ এখানে ধর্মঘট তো কাল ওখানে ধর্মঘট । আর এভাবেই কলেজবিশ্ববিদ্যালয়গুলি বন্ধ থাকছে দিনের পর দিন , মাসের পর মাস । ফলে , জাতির ভবিষ্যত অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে , সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে , বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে , সৃজনশিলতাকে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে , প্রগতিশিলতাকে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে  । আর একারণেই এখনকার কলেজবিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে জ্ঞান নেই , বিজ্ঞান নেই , গবেষণা নেই , সৃজনশিলতা নেই ; আছে শুধু মূর্খতা , গোঁড়ামি , কুসংস্কার ও কুমতলব । তাই , এগুলো এখন অশিক্ষিত , অর্থ ও ক্ষমতালোভীদের আস্থাবল ।

 

শিক্ষার্থী , সমাজবিজ্ঞান বিভাগ , শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় , সিলেট ।

 

( চলবে )

 

রেফারেন্স –

১ ) শিক্ষা , সংস্কৃতি ও প্রগতি – আহমদ শরীফ – বিদ্যা প্রকাশ

২ ) শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ – ঐ – কথাপ্রকাশ

৩ ) ঐ – কবীর চৌধুরী – ঐ

৪ ) ঐ – আবুল কাসেম ফজলুল হক – ঐ

৫ ) ঐ – সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী – ঐ

৬ ) ঐ – হুমায়ুন কবির – কথাপ্রকাশ

৭ ) ঐ – যতীন সরকার – কথাপ্রকাশ

৮ ) বাণী চিরন্তনী – মৌ প্রকাশনী

৯ ) The oxford dictionary of quotation

১০ ) The cambridge dictionary of quotation

১১ ) শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ – সৈয়দ আবুল মকসুদ – কথাপ্রকাশ

১২ ) বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা – রতনতনু ঘোষ সম্পাদিত – অবসর প্রকাশনী ।

syedmahiahmed618@gmail.com'
শিক্ষার্থী , সমাজবিজ্ঞান বিভাগ , শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় , সিলেট ।
শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করার জন্য আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে। Login