নীল নক্ষত্র

নক্ষত্রের গোধূলি-৩

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page


রাশেদ সাহেব মনিরাকে না জানিয়ে ভাবছেন, অনেকেই তো নষ্ট হয়ে যাওয়া কিডনী বা চোখের কর্নিয়া সংগ্রহ করার জন্য খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেয় দেখি না তেমন কিছু পেলে একটা কিডনী বা একটা কর্নিয়া বিক্রি করে। এক কিডনী বা এক চোখ দিয়ে চলা যাবে। প্রতিদিন খবরের কাগজে এমন বিজ্ঞাপন খুঁজেন, তন্ন তন্ন করে খুঁজেন। যাওবা দুই একটা পাওয়া যায় তা তার রক্তের গ্রুপের সাথে মিলে না। অবশেষে এদিকেও যখন হতাশ হতে বসেছেন তখন এক দিন যেন একটু আশার আলো দেখতে পেলেন। জার্মানি থেকে এক ভদ্র লোক কিডনী চেয়ে একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছেন যাতে তার রক্তের গ্রুপের সাথে মিলে যায় কিন্তু যোগাযোগের জন্য স্থানিয় ফোন নম্বর না দিয়ে জার্মানির ফোন নম্বর দিয়েছেন। স্থানিয় কোন ফোন নম্বর বা ঠিকানা নেই, সমস্যায় পরলেন। বাড়ির ফোন থেকে ওভারসিজ কল করা যায়না। বাইরের ফোনের দোকান থেকে ফোন করতে হবে এবং এ জন্য তিন চারশ টাকার দরকার, কোথায় পাই এই টাকা? ভেবে না পেয়ে মনিরা কেই বললেন, কিছু টাকার যোগাড় করা যাবে?কি করবে টাকা দিয়ে? দেখনা একটু কাজ আছে। কি কাজ শুনি। আছে, তুমি দেখ। বলই না কি কাজ, কি আমাকে বলা যাবে না? না। তাহলে টাকাও যোগাড় করা যাবে না।ব্যাস ঐ পর্যন্তই, আর এগুতে পারেননি ওখানেই সমাপ্তি।

সেদিন দুপুরে খাবার পর এই সবই ভাবছিল।মনিরা ডাকল, একটু শুয়ে বিশ্রাম নাও, ওখানে বসে কি করছ?একটু চা দিতে পার?আচ্ছা দিচ্ছি। কিন্তু ঘরে চা পাতা বা দুধ নেই সে কথা মনিরা জানে, তবুও বললো দিচ্ছি। একটু পরে পরদিন মেয়েদের স্কুলে যাবার ভাড়া থেকে টাকা নিয়ে বাসার কাজের মেয়ে মমতাজকে পাশের দোকানে পাঠাল। রাশেদ সাহেব বুঝতে পারলেন মমতাজ কোথায় গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে মমতাজ চা পাতা আর গুড়া দুধের একটা ছোট প্যাকেট নিয়ে যখন এলো তা দেখে রাশেদ সাহেব মনিরাকে বললেন তাহলে আর কি দরকার ছিল? ঘরে যখন ছিল না তখন নাই দিতে। তুমি একটু চা চেয়েছ তা কি করে না দিই বল। টাকা কোথায় পেলে?সে থাক তোমার অত কিছু জানার দরকার নেই। একটু বস আমি চা নিয়ে আসছি। মমতাজকে দিয়ে চা বানিয়ে সে চা মনিরা তার স্বামীকে দিতে পারে না। নিজেই চা বানিয়ে এনে স্বামীর হাতে কাপটা দিয়ে আস্তে করে বললেন নাও। চায়ে এক চুমুক দিয়ে নামিয়ে রেখে পাশে দাঁড়ানো মনিরাকে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা রেখে বললেন তুমি এতো ভাল কেন মনি?এই অপদার্থ স্বামীকে তুমি এখনো এতো ভালবাস?যার কোন রোজগার নেই স্ত্রি সন্তানকে খাওয়াবার যোগ্যতা নেই তার জন্য এতো মায়া কোথায় লুকিয়ে রেখেছ?মনিরার চোখ বেয়ে দু ফোটা জল গড়িয়ে এলো, স্বামী দেখে ফেলে তাই তারা তারি আচল দিয়ে মুছে নিয়ে বলল কে বলেছে তুমি অপদার্থ, তুমি অপদার্থ বা অযোগ্য হবে কেন? তোমাকে কি আজ নতুন দেখছি? বুদ্ধি হবার পর থেকেই তো তোমাকে দেখে আসছি, তুমি কোন দিন অযোগ্য বা অলস ছিলেও না এখনো নেই। মানুষের জীবনেই এমন দুর্যোগ আসে আবার তা কেটেও যায়। তুমি এতো ভেঙ্গে পরো না একটু ধৈর্য ধর দেখবে সময় এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, আবার নতুন সুর্য উঠবে। মন খারাপ করো না, চা টা খেয়ে সেভ হও তারপর চল কোথাও থেকে একটু ঘুরে আসি। সেই সকাল থেকেই এই যে এক ভাবে কেমন মন মরা হয়ে বসে আছ।

এমন সময় ও পাশের ঘর থেকে সেঝ বৌ রেখা ডাকল ভাবি একটু এদিকে আসবেন। সঙ্গে সঙ্গে রাশেদ সাহেবকে ছাড়িয়ে ওদিকে চলে গেল। রাশেদ সাহেবের সামনে চায়ের কাপ হাতে ধরা কিন্তু আর চুমুক দিচ্ছেন না ভুলে গেছে। রান্না ঘরের জানালা দিয়ে ওই নারকেল গাছের মাথায় দুটা কাক বসে ছিল মনে হচ্ছিল যেন কাক দুটিকে দেখছে। বৃষ্টিতে ভেজা কাক। এক মনে ওই দিকেই তাকিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন। সব ছবি গুলি মনে হচ্ছে একে একে নারকেল গাছের মাথায় কোন স্ক্রিনে ভেসে ভেসে আসছে আর যাচ্ছে। ওই ভেজা কাক দুটি যেন প্রজেক্টর চালাচ্ছে। কতক্ষণ এ ছবি দেখছিলেন তা খেয়াল নেই। বেশ কিছুক্ষণ পর মনিরা এসে এই দৃশ্য দেখেই বললো কি ব্যাপার চা খাও নি? এ কি, চা তো ঠান্ডা হয়ে গেছে, কি ভাবছ এমন করে? রেখা কি যেন সেলাই করছিলো তাই দেখিয়ে দেবার জন্য বড় জা কে ডেকেছিল। মনিরার ডাকে রাশেদ সাহেবের সিনেমা দেখা থেমে গেল হঠাত্ চমকে উঠলেন। মনিরা জানে রাশেদ সাহেব ঠান্ডা চা খেতে পারে না। কাপটা নিয়ে রান্না ঘরে এলো।

এই ঠান্ডা চা আবার গরম করে স্বামীর জন্য নিয়ে যেতে পারবে না। তা কি করে হয়?সেই যে তার সব, সে ছাড়া আর কি আছে মনিরার? অগাধ ভালোবাসা, বলতে গেলে বাল্য বিবাহই তাদের, আজকাল এতো কম বয়সে সাধারনত বিয়ে হয় না। মনিরা মাত্র স্কুল ফাইনাল দেয়ার পরই এ বাড়িতে বড় বৌ হয়ে এসেছে। সেই ছোট বেলা থেকেই যাকে দেখে আসছে সে মানুষটাকে আজ পচিশটা বছর ধরে বুকে করে রেখেছে তাকে এই ঠান্ডা চা আবার গরম করে দেয়া যায়? আবার নতুন করে আর এক কাপ বানিয়ে এনে স্বামীর হাতে দিলেন আর পুরনো কাপের চা গরম করে নিজের জন্য নিয়ে এসে স্বামীর পাশে বসে কথা বলতে বলতে দুজনেই একসাথে চা খেলেন। এর মধ্যেই মনিরা প্ল্যান করে ফেলেছে, চল কল্যাণ পুর বড় আপার বাসায় যাই। তুমি ওঠ শেভ হয়ে নাও। আচ্ছা উঠছি, চল যাই একটু ঘুরেই আসি, কাছে আর কোথায় বা যাব। এই, চল না হেটে যাই। হেটে যাওয়া যেত কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে যে, থাক রিকশায় ই চল। রাশেদ সাহেব স্ত্রীর তাগিদে উঠে শেভ করে, ওজু করে নামাজ পরে কাপড় বদলে দেখে মনিরা রেডি হয়ে রেখাকে বলছে, তোর দাদাকে নিয়ে একটু ঘুরে আসি, খেয়াল রাখবি আর বড় মেয়ে এলে খেতে দিস।(চলবে)

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


3 Responses to নক্ষত্রের গোধূলি-৩

  1. নীল নক্ষত্র সেপ্টেম্বর 27, 2010 at 3:41 পূর্বাহ্ন

    সময় এলে হতেও পারে ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করুন। সবার জীবন সমান হয় না। কেউ মদ বিক্রি করে দুধ কিনে খায় আবার কেউ দুধ বিক্রি করে মদ কিনে খায়। আফসোস করার কিছু নেই।

  2. khalid2008@gmail.com'
    শাহেন শাহ সেপ্টেম্বর 28, 2010 at 2:18 পূর্বাহ্ন

    ১ম আর ২য় বাকি আছে। পড়ব।

  3. রাজন্য রুহানি সেপ্টেম্বর 28, 2010 at 7:59 পূর্বাহ্ন

    ভাব-ভাষা দারুণ। কিছু শব্দ-অসংগতি, বানান-প্রক্রিয়া এবং কয়েকটি সাধু-চলিতের মিশ্রণ না থাকলে শৈল্পিক-সৌন্দর্য বাড়ত বহুগুণে।

    লেখায় (+)।
    :rose:

You must be logged in to post a comment Login