নীল নক্ষত্র

নক্ষত্রের গোধূলি-৪

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

রাশেদ সাহেব আর মনিরা কল্যাণপুর থেকে রাতের খাবার খেয়ে রাত প্রায় দশটায় ফিরলেন। ওদের দেখে আপা মুরগির মাংশ আর খিচুড়ি রান্না করলেন।
রাশেদ সাহেব মনিকে ডেকে আড়ালে নিয়ে বললেন কেন, তুমি নিষেধ করলে না কেন?
নিজের পকেটের স্বাস্থ্য ভাল না থাকলে কারো বাড়িতে খেতে মন চায় না তা মনি জানে কিন্তু আপার খিচুড়ি রাশেদ সাহেবের খুব প্রিয় বলে আর অমত করেনি।
রাতে শোবার পর বললেন
আচ্ছা মনি বলত এভাবে আর কত দিন চলতে পারে?এভাবে তো জীবন চলে না। মেয়েদের লেখা পড়া কি বন্ধ হয়ে যাবে?
তুমি যে রিজাইন করেছ ওখানে একটু খোজ নিয়ে দেখ।
মনি তার স্বামীর আত্মসম্মান বোধ সম্পর্কে ভালো করেই জানে। তবুও বলল,
জানি তুমি রাজী হবে না তবে আমার মনে হয় তোমার সাবেক বসরা তো তোমাকে আসতে নিষেধ করেছিলো, দেখনা একবার একটু জিজ্ঞেস করে। না হলে বল আমিই ফোন করে বলি।

না মনি তা হয় না। এই বেকারের দেশে অমন চাকরী কি আর এতো দিন খালি পরে রয়েছে?শুধু শুধু ফোন করে খারাপ কিছু শোনার চেয়ে না করাই ভালো। আমি যতটা শুনে এসেছিলাম তাতে মনে হয় ওখানে হাসান সাহেবকে প্রমোশন দেবার কথা ছিল।
কোন হাসান সাহেব?
তুমি চেন না, ওই জাকিরদের সাথে ছিল।
তুমি একটু বলেই দেখনা।
আচ্ছা ঠিক আছে কাল মনে করে দিও।
পরদিন সকালে ফোন করলেন তার বসের কাছে,
আরে রাশেদ সাহেব আমি তো আপনাকে কতবার নিষেধ করেছিলাম তবুও আপনি চলে গেলেন। আমি তো জানি এদেশের ব্যবসার কি অবস্থা তখন তো আপনি আমার কথা শুনলেন না। আমরা তো এই মাত্র মাস দুয়েক আগে হাসানকে প্রমোশন দিয়ে ওখানে নিয়ে নিয়েছি। আর দুইটা মাস আগে খোজ  নিলে অবশ্যই আপনাকে নিয়ে নিতাম।

তাহলে তোমার তো জাহাজে চাকরী করার সার্টিফিকেট আছে, সেখানে একটু দেখবে?
হ্যা এটা করা যায় দেখি রফিকের কাছে একটু আলাপ করে দেখি এখানে কি অবস্থা। কিন্তু ওর তো কোন ঠিকানা বা ফোন নম্বর জানি না তবে নারায়ণগঞ্জে থাকে এই জানি। আমাকে একবার ওখানে যেয়ে খুজে বের করতে হবে।
তাহলে যাও দেখ পাও কি না।
পাব ওখানে গেলে অবশ্যই খুজে পাব হঠাৎ একটা কথা মনে হোল, তোমার শরীফ স্যারের কথা মনে আছে?
হ্যা।
উনি এখন ওখানে নেই, ঢাকায়ই আছে এখানে অন্য একটা অফিসের হেড তার সাথে একবার দেখা করে আসি।
তাই যাও উনি তো তোমাকে খুব পছন্দ করতেন।
তাহলে এখনই যাই।
অফিস খুঁজে পেতে কোন অসুবিধা হোল না, কারওয়ান বাজারে একটা বিল্ডিং এর চার তলায় উঠে অফিসে ঢুকেই দেখলেন তার পুরনো সহকর্মী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মাকসুদ সাহেব এক টেবিলে বসে ড্রইং দেখছে। পায়ের শব্দ পেয়ে তাকিয়েই আরে রাশেদ সাহেব আপনি এখানে?কি ব্যাপার?বসেন।
বসে রাশেদ সাহেবও অবাক তাহলে আপনি রিজাইন করে এখানে এসেছেন?
হ্যা। ও আচ্ছা শরীফ স্যার এখানে না?
হ্যা এখানেই, দেখা করবেন? তাহলে যান স্যার রুমেই আছে। আসেন পরে চা খাই।
হ্যা তাই।

স্যারের রুমে ঢুকতে যাবার আগে কে যেন পিছন থেকে ‘স্যার বলে ডেকে সালাম দিল, পিছনে ঘুরে দেখে তাদের অফিসের এক পিওন। বারেক মিয়া তুমি এখানে?
হ্যা স্যার আমি একা না ওই তো বাশার সাহেব সহ আরো কয়েক জন চলে এসেছিলাম। স্যারের পিএ বাসার সাহেবের রুমে উকি দিলেন। বাশার সাহেব উঠে সালাম দিয়ে বলল স্যার আপনি?
এইতো আপনাদের দেখতে এলাম, আমি জানতাম কেউ কেউ এখানে এসেছেন তবে কে কে এসেছেন তা জানতাম না। যাক কেমন আছেন সবাই?
হ্যা স্যার ভালই আছি। স্যারের সাথে দেখা করবেন?
হ্যা আসলাম যখন একটু দেখেই যাই।
যান স্যার আছেন।
পর্দা সরিয়ে উকি দিতেই স্যার হাসি মুখে লাফ দিয়ে উঠলেন আরে রাশেদ! এসো এসো বস। তারপর বল কি খবর, কি করছ, কেমন আছ সব বল।
রাশেদ সাহেব কোথা থেকে শুরু করবেন ঠিক বুঝতে পারছিলেন না। এদিকে চুপ করে কতক্ষণই থাকা যায়, যা বলতে এসেছেন তা যে তাকে বলতে হবে। ভাবছেন।

এমন সময় স্যার নিজেই প্রশ্ন করলেন তুমি ব্যাবসা করবে বলে রিজাইন দিয়ে এসেছিলে না?হ্যা স্যার। তা কি অবস্থা?
না স্যার সুবিধা করতে পারলাম না, বলে এবার আস্তে আস্তে সব কিছু গুছিয়ে বলে সর্ব শেষে তার আসল কথাটা বললেন। এখন কি করি, আপনার এখানে কোন ব্যবস্থা করে দেন স্যার, আর কিছু করার দেখছি না।
হু বুঝলাম, কিন্তু তুমি এমন সময় এসেছ তোমাকে আমি এখন কোথায় প্রোভাইড করি, আমি নিজেই আর মাত্র দেড় মাস আছি এর পরেই এল পি আর এ চলে যাচ্ছি। এই সময়ের মধ্যে কিছু করতে পারব বলে মনে হয় না।
এর পর আর কিছুক্ষণ থেকে টুকিটাকি কিছু কথা বার্তা বলে বেরিয়ে এলেন।

ওখান থেকে সোজা নারায়নগঞ্জ চলে এলেন। এখানে যাদের চিনতেন তাদের খুঁজে বের করলেন।
আরে রাশেদ, কি ব্যাপার? হঠাত্ দেখলাম তোমাকে!
হ্যা এইতো তোমাদের দেখতে এলাম।
কিছু আবোল তাবোল বলে শেষ পর্যায়ে জিজ্ঞেস করলেন আচ্ছা রফিক কোথায় জান?
হ্যা জানি। কেন কোন কাজ আছে?
না, তেমন কিছু না, এখানে এলাম যখন একটু দেখা করে যাই। ওঃ আচ্ছা, ঠিকানা তো বলতে পারবো না তবে ও চাষাড়ায় থাকে, এমনি বাসা চিনি। তুমি ওর ফোন নম্বর আছে ফোন করে জেনে নাও বলে নম্বরটা দিয়ে দিল।
তাহলে আজ উঠি কি বল?
আচ্ছা আবার এসো।
আরো কয়েক জনের সাথে দেখা হলো যাদের কাছে বলতে পারে এমন দুই এক জনের সাথে আলাপ করলো। সবারই এক কথা। না রাশেদ, তুমি এই এতো দিন সরকারী চাকরী করে এখন আর এই সব চাকরী করতে পারবে না। আগের সে পরিবেশ আর নেই অনেক বদলে গেছে, এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়েই রফিকের কাছে ফোন করলেন।
ও প্রান্ত থেকে রফিকের কণ্ঠ ভেসে এলো।
ও, রাশেদ ভাই?আপনি কোথা থেকে, কেমন আছেন?
বলছি, তুমি এখন কোথায়? বাসায়! আচ্ছা তাহলে আমি আসছি।
আমার ঠিকানা জানেন?
না বল।

ঠিকানা নিয়ে বললো আমি এখন নারায়ণগঞ্জে আছি, তুমি আছ তো বাসায়?
হ্যা আছি আপনি আসেন।
একটা রিকশা নিয়ে চাষাড়া চলে এলেন। বাসা খুঁজে পেতে কোন অসুবিধা হলো না, রফিক দোতলা বাসা ছেড়ে নিচে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। রফিক রাশেদ সাহেবের জুনিয়র হলেও অনেক দিন আগে একই জাহাজে এক সাথে প্রায় দুই বত্সর কাজ করেছে। রাশেদ সাহেবকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করে, মাঝে কয়েকবার খুলনা গিয়েছিল তখন দেখা করে এসেছে। উপরে যেতে যেতে রফিক বললো মহিউদ্দিনকে ফোন করি ও আসুক।
ও কোথায়?
ওই তো ওই বিল্ডিংয়ে থাকে।
ডাক তাহলে দেখি অনেক দিন যাবত দেখি না।
একটু পরেই মহিউদ্দিন এলো।
কেমন আছেন রাশেদ ভাই?
ভালো, তুমি কেমন আছ?তোমাকে তো চিনতেই পারতাম না যদি রফিক আগে না বলতো।

চিনবেন কি ভাবে আজ কতদিন পরে দেখা, প্রায় বিশ বছর তাই না? আ, হ্যা তা হবে।
চা নাস্তার সাথে নানান ধরনের কথা বার্তা হলো। এর মধ্যে রফিকের স্ত্রী এসে সালাম করে গেল। রফিকের স্ত্রীকে এই প্রথম দেখা। রফিকের ছেলে মেয়েরাও স্কুল থেকে এলো। ওদিকে রফিকের স্ত্রী রান্না বান্নার বিশাল আয়োজন সেরে ডাকল খেয়ে আসার জন্য। রাশেদ সাহেব টেবিলে এসে দেখে অবাক।
এসব কি করেছ?এতো কিছু, কেন
ভাই, আপনি আমাদের বাসায় এই প্রথম এলেন তাই, আপনার কথা ওর কাছে অনেক শুনেছি, শুনতে শুনতে আমারও মনে হতো আমিও যেন আপনাকে খুব চিনি।
তাই বলে এই অসময়ে এতো ঝামেলা করতে হবে? যাক যা করেছ বেশ করেছ।

খাবার পর আবার এক দফা চা। এই বার রাশেদ সাহেব তার এখানে আসার আসল কথা খুলে বললেন। রফিক এবং মহিউদ্দিন বেশ মনযোগ দিয়েই তার সব কথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল।
রাশেদ ভাই আপনি এ কি বলছেন! আপনি আবার জাহাজে চাকরী করবেন?
বাচতে তো হবে, না কি?
আপনাকে কি ভাবে বলবো বুঝতে পারছি না, না রাশেদ ভাই এখন আপনার দারা এ কাজ করা আর সম্ভব নয়। আমি আর রফিক তো এক জাহাজে আছি আপনি একদিন চলেন, আমাদের সাথে। জাহাজে করে চিটাগাং যাই, এতে আপনার একটু বেড়ানোও হবে আর সেই সাথে নিজ চোখে বাস্তব অবস্থাটাও দেখে আসতে পারবেন। আপনি কি পরশু যেতে পারবেন?আমরা পরশু সন্ধ্যায় সেইল করবো।
এখন বলতে পারছি না, বাসায় গিয়ে তোমার ভাবীর সাথে আলাপ করে দেখি, যদি যেতে পারি কাল বিকেলের মধ্যে ফোন করে জানাবো। তাহলে আজ উঠি?(চলবে)

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


11 Responses to নক্ষত্রের গোধূলি-৪

  1. khalid2008@gmail.com'
    শাহেন শাহ সেপ্টেম্বর 28, 2010 at 2:17 পূর্বাহ্ন

    ভালো লাগল আপনার কাহিনী বিন্যাস।

  2. রাজন্য রুহানি সেপ্টেম্বর 28, 2010 at 5:46 পূর্বাহ্ন

    অলঙ্করণটা মার্জিত করলে আরো সুন্দর লাগতো। মনে হতো মলাটবন্দি কোনো উপন্যাস পড়ছি।

    বানান, যতিচিহ্ন’র দিকে একটু নজর দেবেন প্লিজ।

    মঙ্গল কামনা।

    • নীল নক্ষত্র সেপ্টেম্বর 29, 2010 at 5:12 পূর্বাহ্ন

      অলঙ্করণ বলতে সঠিক কি বোঝাতে চেয়েছেন একটু খুলে বললে সুবিধা হতো। আসলে আমি নিজেই অত্যান্ত কাচা হাতে অতি সাধারন ভাবে word এ এই প্রচ্ছদের ছবিটি করেছিলাম, গ্রাফিক্স ডিজাইনের উপর আমার কোন ধারনা নেই বলে এর চেয়ে সুন্দর কিছু করার ইচ্ছা থাকলেও তা আমার ক্ষমতার বাইরে।
      ব্লগে লেখা শুরু করার আগে আমি কখনো বাংলায় টাইপ করিনি। আমি অভ্র দিয়ে টাইপ করি, অনেক সময় কী বোর্ডের সাথে আঙ্গুল সঞ্চালনের হের ফের এর কারনে বানান ইত্যাদি ভুল হয়ে যায়। তবুও চেষ্টা করি পোস্ট দেয়ার আগে ফায়ার ফক্সের বাংলা স্পেলার দিয়ে সংশোধন করে নিতে। এর পরেও বুঝতে পারি কিছু ভুল থেকে যায়।
      কোথায় ভুল আছে একটু দেখিয়ে দিলে তা অবশ্যই সংশোধন করে নিতে পারব।
      শুনে খুশি হবেন, যদি কোনদিন এই উপন্যাসটি মুদ্রণের সুযোগ পাই তা হলে এটার কট্টর সমালোচনা করবেন আমার একান্ত হিতাকাঙ্ক্ষী ভারতের তিনসুকিয়া কলেজের বাংলার শিক্ষক জনাব সুশান্ত কর, প্রুফ দেখবেন বাংলাদেশের এক কলেজের বাংলার শিক্ষক জনাব সুশান্ত বর্মন এবং তারই পরামর্শ অনুযায়ী এর প্রচ্ছদ আঁকবে আমার ছোট মেয়ে। এরা উভয়েই নিজ নিজ শিক্ষা মুলক ব্লগ পরিচালন করছেন এবং তারা উভয়েই স্বেচ্ছায় এই ইচ্ছা ব্যাক্ত করেছেন
      আপনার সুপরামর্শ এবং গঠন মুলক মন্তব্যের জন্য ঋণী হয়ে রইলাম। আশা করি সর্ব ক্ষণ এই ভাবে পাশে থাকবেন।
      ধন্যবাদ। :rose:

  3. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী সেপ্টেম্বর 28, 2010 at 12:41 অপরাহ্ন

    চলুক :rose:

  4. নীল নক্ষত্র সেপ্টেম্বর 29, 2010 at 4:13 পূর্বাহ্ন

    তুমি যে রিজাইন করেছ ওখানে একটু খোজ নিয়ে দেখ।
    মনি তার স্বামীর আত্মসম্মান বোধ সম্পর্কে ভালো করেই জানে। তবুও বলল,
    জানি তুমি রাজী হবে না তবে আমার মনে হয় তোমার সাবেক বসরা তো তোমাকে আসতে নিষেধ করেছিলো, দেখনা একবার একটু জিজ্ঞেস করে। না হলে বল আমিই ফোন করে বলি।

    আমার মনে হয় এখানেই এর বিবরন হয়ে গেছে। এটা মনির উক্তি, মনি তার স্বামীকে বলছে যে সে ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে যেখান থেকে চাকরী ছেড়ে এসেছে সেখানে আবার চেষ্টা করে দেখতে।
    আশা করি বোঝাতে পেরেছি।
    আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  5. নীল নক্ষত্র সেপ্টেম্বর 29, 2010 at 4:14 পূর্বাহ্ন

    + এর আরো এক দফা ধন্যবাদ।

  6. নীল নক্ষত্র সেপ্টেম্বর 29, 2010 at 4:15 পূর্বাহ্ন

    আরে, ভাই যে কয়!! পাশ নিয়া টানাটানি তার মধ্যে আবার লেটার!!! :rose:

  7. নীল নক্ষত্র সেপ্টেম্বর 29, 2010 at 4:17 পূর্বাহ্ন

    দুঃখিত, এর জবাব পরবর্তী পর্বে আসছে। আশা কর সাথে থাকবেন।

  8. নীল নক্ষত্র সেপ্টেম্বর 29, 2010 at 4:18 পূর্বাহ্ন

    :-j

You must be logged in to post a comment Login