বাবুল হোসেইন

মেয়েটি অথবা আলোরফাঁদে ঝলসে যাওয়া পঙ্গপালের গল্প

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

মেয়েটি একটি ফার্মে জব করে। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে বিবিএ করা মেয়েটি দেখতে শুনতে মোটামুটি সুন্দর তবে চলনে বেশ স্মার্ট আর ইংরেজীতে বেশ ভালো রকম দক্ষ, যেহেতু ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া। শারীরিক সৌন্দর্যের চেয়ে স্মার্টনেস এবং চলনবলন বেশ চটপটে এবং বন্ধুভাবাপন্ন এবং সব কিছু মিলে ব্যক্তিত্বময়ী বলা যায় মেয়েটিকে, অফিসের কলিগরা অন্তত তাই বলে।

ইউনিভার্সিটিতে মেয়েটি প্রেমে পড়েছিলো সদ্য পাশ করা এক লেকচারারের। বলা চলে লেকচারারই তাকে অফার করেছিলো এবং বড়লোক লেকচারারকে পাত্তা না দেয়ার মত কোন কারণ ছিলো না এবং পাত্তা দিতে গিয়ে চরম একটা ধরা খেতে হয়েছিলো। লেকচারারের দামী গাড়িতে সামনের সিটে বসে মেয়েটি স্বপ্ন দেখেছিলো স্বামী হিসাবে লেকচারার কেমন হবে, কিন্তু লেকচারারের তখন এক ডজন গার্লফ্রেন্ড। মেয়েটি জাস্ট এক বেলার আহারের মত ছিলো, ফলত যা হয় স্মার্ট পুরুষ দুয়েকবার নিয়েছিলো শয্যায় এবং জলকেলীও সেরেছিলো হয়তো, তারপর লাপাত্তা। মেয়েটিও কম ছিলো না। তারও তখন একটা বয়ফ্রেন্ড একই সেশনে পড়ে এবং মেয়েটিকে লেকচারারের সাথে দেখে ছেলেটি হিংসায় জ্বলেছিলো বারবার। আর নিজের অসহায়ত্বকে দেখাতে গিয়ে নিজেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে ফেলছিলো, মেয়েটি তখন ফিরেছিলো ব্যর্থ মনোরথে। ফলত তাদের প্রেমটা আরো গাঢ় হয়েছিলো অর্থাৎ মানসিক প্রেমটা শারীরিক জলস্রোতে ভেসে গিয়েছিলো এক নিমিষেই এবং কামুক নারীপুরুষের মত তারা আজন্ম কাঙাল আর লোলুপ হয়ে উঠেছিলো ক্রমশ এবং যথারিতি তারা প্রেমের চেয়ে কামে মগ্ন হলো বেশি এবং এরকম সম্পর্কের ক্ষেত্রে যা হয় একদিন দুজনেই বিচ্ছিন্ন হলো এবং এই বিচ্ছিন্নতা মূলত আরো বেশী বহুগামিতার কারণেই। দুজনেই খেপাটে আর বন্য জীবনে মজেছিলো, শরীরের ভরা যৌবনকে কানায় কানায় ভাসিয়েছিলো আনন্দে, উল্লাসে আর কামে।

মেয়েটি এরপর বহু পুরুষের সঙ্গী হয়েছে, কাউকে ভালোবেসে, কাউকে ভালো না বেসেই, কিছুটা তৃপ্তি অনেকটাই স্বার্থ আদায়ের জন্য কিংবা স্রেফ বন্ধুত্বকে টিকাতে। এবং এটা বেশ সহজে, বেশ স্মার্টলি আয়ত্তে এনেছিলো মেয়েটি যেহেতু আধুনিক মেয়ে এবং সেই টিনএজড বয়স থেকেই খোলামেলা জীবনে অভ্যস্ত।

এক সময় মেয়েটির নেশা ধরে ক্যামেরার সোনালি ফ্রেমে আটকে থাকবে তার মুখ, “লোকে পথ চলতে চলতে বলবে দেখেছো কি সেক্সি মেয়েটি”। এক কলিগের ফ্রেন্ডের ফ্রেন্ড একটা এড-ফার্মে স্ক্রিপ্ট রাইটারের কাজ করে, ক্যামেরাওয়ালা অনেক ফ্রেন্ড আছে চেনাজানা এবং বেশ খাতিরও আছে তাদের সাথে। মেয়েটি কিছুটা হাত ধরাধরি, কিছুটা হৃদয় ছোঁয়াছুঁয়ি করে কিছুদিন কাটায় বিভিন্ন প্রজেক্টে ঘুরে ঘুরে, আর ততদিনে বেশ নামকরা এক পরিচালকের সাথে পরিচিত হয়ে যায়। মেয়েটি তাকে নিয়ে এখানে ওখানে ঘুরে ঘুরে একদিন বলে তার আসল কাজের কথা। মূলত সে একজন মডেল হতে চায় এবং এর জন্য সে এখানে দৌড়াদৌড়ি করে প্রতিদিন। ছেলেটি তাকে আশ্বাস দেয় এই বলে যে, আমি তোমাকে মডেল বানিয়েই ছাড়বো। আমার হাতে কত মডেলের জন্ম হলো। তারপর কিছুদিন শরীর বিনিময় ফটোসেশনের উছিলায়, কিছুদিন হাওয়া খাওয়া লোকেশনের নানা বাহানায়। স্ক্রিনটেস্ট আর এটা ওটা নিয়ে সারাদিনই দৌড়াদৌড়ি মেয়েটি আর ছেলেটি মিলে আর মনে মনে স্বপ্ন বুনে যাওয়া, কবে সে একজন মডেল হবে—
“ কবে আমার মুখ ঝলসে উঠবে ক্যামেরার সোনালি আলোয়, লোকের বাহবা নিতে নিতে পথ চলা”।

ততদিনে মিডিয়াতে কিছুটা জানাশুনা মেয়েটি প্রেমিক পাল্টাতে থাক কাজের স্বার্থে। এক জাঁদরেল পরিচালকের সাথে পরিচিত হয় মেয়েটি এবং সে স্বপ্ন দেখায় মেয়েটিকে এবার আর তার মডেল না হয়ে উপায়ই নেই। তারপর নানা কাজের বাহানায় আউটডোরে ইনডোরে নানা কাজে মেয়েটিকে নিয়ে শ্যুটিংয়ের বাহানায় মজে থাকে। মেয়েটির শরীর দিতে আপত্তি নেই, এ পর্যন্ত সে বহু ছেলের সঙ্গে মিশেছে, তাতে তার কোন সমস্যা নেই, কিন্তু তার কাজ চাই। তার স্বপ্ন পূরণ হওয়া চাই বিনিময়ে যা চাই তাই দিতে রাজি মেয়েটি। স্বপ্নের পালে হাওয়া লাগছে মনে করে মেয়েটি ফুরফুর মেজাজে থাকে আর ভাবে কিছুদিন পরেই তার মুখও বিলবোর্ডের বড় পর্দায় ঝুলবে। লোকে হাঁ করে তাকে দেখবে।

মেয়েটিকে বেশ জব্দ করে ফেলে পরিচালকটি। কিছু টাকা এডভান্সড করে মেয়েটিকে নাটকের একটা অগুরুত্বপূর্ণ রুলে কাস্টিং করে ফেলে এই বলে যে পরবর্তী প্রোডাক্টে মেয়েটি মডেল হবেই। মেয়েটি বাড়ী ফিরে বেশ তৃপ্তি নিয়ে। এবং আশ্চর্য রকম অবাক হয়ে যায় যখন দেখে পরিচালক তাকে ফোনে জানাচ্ছে যে কাজটি তাকে দিয়ে করানো যাবে না। কারণ? মিডিয়াতে তোমার অনেক বাজে ইমেজ তৈরি করে ফেলেছো। কিভাবে? তুমি অনেক আজেবাজে ছেলেদের সঙ্গে মিশেছো এবং ফলত তারা ব্লাকমেইল করেছে, তোমার প্রতিটি শোয়ার ভিডিওচিত্র তারা ধারণ করে রেখেছে এবং তারা আমাকে থ্রেট করেছে তোমাকে নিয়ে কাজ করলে আমাকে বাদ দিয়ে দেবে। সো; আমি সরি, আমি তোমার জন্য কিছুই করতে পারবো না।

ফোনের ওপাড়ে মেয়েটি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে…যেনো সোনালি ফ্রেমে আটকে থাকা কোন নামকরা মডেলের স্থিরচিত্র এক!

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


11 Responses to মেয়েটি অথবা আলোরফাঁদে ঝলসে যাওয়া পঙ্গপালের গল্প

  1. রিপন কুমার দে জানুয়ারী 15, 2011 at 2:36 অপরাহ্ন

    গল্পটিতে যথেষ্ট উটানামা আছে সন্দেহ নাই, একটা গল্পের জন্য যা বেশি গুরুত্ত্বপূর্ণ। তবে শব্দের আভিজাত্য কম।

    • imrul.kaes@ovi.com'
      শৈবাল জানুয়ারী 15, 2011 at 5:50 অপরাহ্ন

      আমারও তেমনটাই মনে হলো ! গল্পের প্রথম দিকটা কেন যেন সংবাদ পত্রের রিপোর্ট মনে হচ্ছিল , কিন্তু শেষটায় কথার ভাবটা ভাবালু ছিল ঠিকই ।

      • bbl_bu@yahoo.com'
        বাবুল হোসেইন জানুয়ারী 16, 2011 at 2:50 অপরাহ্ন

        আসলে গল্পের বাইরে কিছু বলার দরকার ছিলো। যেটা হয়তো রিপোর্টিং বা এজাতীয় কিছুর, আর আমি প্রথাগত কাঠামোতে বিশ্বাস করি না। গল্পের শরীর বেয়ে যে গল্পই বেড়ে উঠবেই, এমনটি আমিও চাইনি।

        সুন্দর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। ভালো থাকুন নিরন্তর। শুভ কামনা।

    • bbl_bu@yahoo.com'
      বাবুল হোসেইন জানুয়ারী 16, 2011 at 2:47 অপরাহ্ন

      তবে শব্দের আভিজাত্য কম।

      নত মস্তকে গ্রহন হলো বস।

      তবে টিপিক্যাল গল্প থেকে কতটুকু আলাদা হয়েছে জানি না। আমি চাই টিপিক্যালের বাইরে কিছু।

      শব্দের আভিজাত্য দরকার, একটা শব্দ দিয়ে কুপোকাত করা যায় পুরো গল্পের বুনন-নীতি আর কাঠামোকে। সেটার চেষ্টা করা আসলেই দরকার।

      সতত ভালো থাকুন। সুন্দর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  2. mannan200125@hotmail.com'
    চারুমান্নান জানুয়ারী 16, 2011 at 6:57 পূর্বাহ্ন

    ফোনের ওপাড়ে মেয়েটি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে…যেনো সোনালি ফ্রেমে আটকে থাকা কোন নামকরা মডেলের স্থিরচিত্র এক! :-bd

  3. bbl_bu@yahoo.com'
    বাবুল হোসেইন জানুয়ারী 16, 2011 at 2:51 অপরাহ্ন

    হ্যা।

    ধন্যবাদ। ভালো থাকুন।

  4. bbl_bu@yahoo.com'
    বাবুল হোসেইন জানুয়ারী 16, 2011 at 2:52 অপরাহ্ন

    :rose: :rose:

  5. bbl_bu@yahoo.com'
    বাবুল হোসেইন জানুয়ারী 16, 2011 at 2:52 অপরাহ্ন

    ধন্যবাদ ভাইয়া, ভালো থাকুন।

  6. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী জানুয়ারী 16, 2011 at 6:35 অপরাহ্ন

    গল্পটি পড়া হইলো এবং মন্তব্য

    আসলে লেখক যে কোনোভাবেই একটি গল্প শুরু বা শেষ করতে পারেন। তা ছাড়া এসব লেখালেখির প্রচলিত ব্যাপারগুলো অনেকেই মানতে চাইছেন না।
    :rose:

    • রাজন্য রুহানি জানুয়ারী 21, 2011 at 9:09 পূর্বাহ্ন

      হ্যাঁ, বৃত্তের ব্যাসার্ধ ভাঙার আয়োজন। এক হিসেবে প্রচলিত ধারণা পাল্টে যে প্লাটফর্ম তৈরি হচ্ছে তা বাংলা সাহিত্যের জন্য ধণাত্বক বলে আমি মনে করি। তবে নিজের স্বকীয়তা বজায় রেখেই তা করা উচিৎ। তাতে আলাদা এক মেজাজী ঘ্রাণ থাকে।

You must be logged in to post a comment Login