ছোটগল্প: গহ্বরতীর্থের কুশীলব (পর্ব ১)

Filed under: ছোটগল্প,১৮+ |

খাজুরাহো মন্দিরের দেয়াল থেকে মাটিতে লাফাবার সময়, ঘুরঘুরে পোকার মুখে পাঠানো আদেশ তামিল করার জন্যে, বাতাসের মাঝপথে, নিজেকে পাষাণ মূর্তি থেকে রক্তমাংসের মানুষে পালটে নিয়েছিল কুশাশ্ব দেবনাথ নামে স্বাস্হ্যবান যুবকটি, যে কিনা হাজার বছরেরও বেশি চাণ্ডেলাবাড়ির একজন গতরি, ভারি-পাছা, ঢাউসবুক উলঙ্গ দাসীর ঠোঁটে ঠোঁট, যোনিতে লিঙ্গ, আর স্তনে মুঠো দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়েছিল ।

এতকাল কত রোদ রোদিয়েছে, কত মেঘ মেঘিয়েছে, কত শীত শীতিয়েছে, কত বৃষ্টি বৃষ্টিয়েছে, কত ঝড় ঝড়িয়েছে, কত ধুলো ধুলিয়েছে, তার গোনাগুনতি নেই।

—-অ্যাই, তোকে তফতরে ডেকে পাঠিয়েছে। অমাবস্যার রাতে কানের ওপর এসে, হুকুম শোনাবার মতন হেঁড়ে গলায়, বলেছিল কেঁদো কালো ঘুরঘুরে পোকাটা।

হাজার বছরেরও বেশি অমন পোজ দিয়ে থাকার দরুণ শরীর আড়ষ্ট হয়ে থাকলেও, গায়ে কিন্তু একদম ব্যাথা নেই কুশাশ্ব দেবনাথের। আড়ষ্টতা কাটাবার জন্যে একটু ওঠবোস লাফালাফি ছুটোছুটি করে নিল। পাথর হয়ে সঙ্গমরত থাকলেও, ‘দফতর’ শুনে ছাঁৎ করে উঠেছিল নিরেট বুক। মাটিতে দাঁড়িয়ে, রক্তমাংসের দেহে, যদিও উলঠ্গ, ছাঁৎ-ছাঁতানিটা কাটতে সময় লাগল।

—-এভাবে যাওয়া অ্যালাউড? জিগ্যেস করল কুশাশ্ব।

—-নিজেকে নগন্য করে নে, তিন-চার সেন্টিমিটারের মতন, তাহলে প্রবলেম হবে না। মাপ না বাড়লে লোক-লজ্জার ভয় নেই। কন্ঠস্বরে আদেশ মিশিয়ে বলল ঘুরঘুরে পোকাটা, যার ঠাকুমা আদর করে ওর নাম রেখেছিলেন পচা; আর এখন তো পচাঞ্জন সরদার নামে পুরো গোভারতে বিখ্যাত। এক দুর্গন্ধে সবাই চেনে।

—-যাব কী করে? শরীরের পেশিগুলো ম্যাসাজ করতে-করতে, যাতে একটু ঢিলে-ঢালা হয়, জানতে চাইল কুশাশ্ব।

—-তোর সেই জলফড়িং বন্ধুটা কোথায়? তার তো বেশ হাওয়াইজাহাজের মতন বডি, চার ডানার ইনজিন, চাদ্দিকে দেখার মত ডুমো-ডুমো চোখ। ওটার ওপর বসে চলে যা।

মনে পড়ল কুশাশ্বর। পতঙ্গিনী ধরিত্রীকন্যা নামে এক জলফড়িং এসে প্রতিদিন নাকের ডগার ওপর বসে ডানা ঝাপটানির আদর দিচ্ছে মাসখানেক যাবত। পতঙ্গিনীও বলছিল, মন্দিরের গা থেকে নেমে, জলজ্যান্ত মানুষ হয়ে দেশঅদেশ দেখতে, ভালমন্দ খেতে, রক্তমাংসের মেয়ের আহ্লাদ নিতে। পতঙ্গিনীর পরিবার নাকি কয়লাযুগের সময় থেকে রয়েছে। তখন ওরা অনেক অবস্হাপন্ন ছিল। এত অবস্হাপন্ন যে ওর পূর্বপুরুষদের বলা হত দৈত্যফড়িং, আর সময়টাকে লোকে বলত রেনেসঁস।

রেনেসঁসের সময়ে ছিলেন ফোরোরাকোস, টিরানোসরাস, ডিপলোডোকাস, ইগুয়ানাডন, ট্রাইসেরাটপাস, মাস্টোডোনসরাস, স্টেগোসরাস, রয়ামোফোরিনকাস, টেরানোডন, ব্লনটোসরাস, আরকিওপটেরিক্স, ট্রাকোডোন, মোসোসৌর প্রমুখ মহান ব্যক্তিত্ব; একদিন বিকেলবেলায় বলেছিল পতঙ্গিনী, যখন বিকেলেরচ সোনারঙআ হাওয়া ওর স্বচ্ছ চারটে ডানাকে ফরফরিয়ে হাওয়াতে চাইছিল। কয়লা-উৎপাদী বনজঙ্গল যখন ফেলে-ছড়িয়ে চারপাশ জংলাচ্ছে, তখন জলে অভিভূত জলায়-জলায় ডানাবাজনার প্রবচন শুনিয়ে সংস্কারের কাজ করতেন ওর তিন ফিট লম্বা পূর্বপুরুষরা।

আর এখন? পতঙ্গিনী ধরিত্রীকন্যা বলে, এখন সবই খুদে-খুদে। ছয়ফুটকি কাঁচপোকা, গোবরঠেলা গুবরে, ডোরাকাটা তেলাপোকা, কালীঝিঁঝি, গন্ধকীট, কেঁচো, কির্মি, মঃকুন, বল্মীক, কিটিভ, জালিক, উচ্চিঙ্গে, ডেঁয়ো, পুতিকা, লুমবিষ, শলভ, শুঙ্গা, কেঁদরাই, জলৌকা, ঘুণ আর চুলচেরারা সমাজ চালায়।

অচেনাসুলভ অচেনাদের একটা জমঘত আছে যাকে খুদেরা বলে দফতর। যারা ইনজিরি ভাষা জানে তারা বলে পার্টি- ঘর। ওই দফতরে হাজির হতে বলেছে ঘুরঘুরে। আদেশ দিয়ে, গায়ের ঢাকনা তুলে, গোপন ডানা বের করে, মুখের সামনে কালাশনিকভ উঁচিয়ে চলে গেল স্পেশাল রিজার্ভ ফোর্সের ঘুরঘুরে কমান্ডার।

পতঙ্গিনী বলেছিল, কাঁচপাখনার খুনসুটিমার্কা কাঁপন তুলে, দফতরের অছিসিংহাসনের মালকিনির সামনের দিকটা সুয়োরানি আর পেছনদিকটা দুয়োরানি; কিন্তু তুমি টেরটি পাবে না কোনটি সুয়ো আর কোনটি দুয়ো।

—-সে কি? আমাদের মন্দিরের গায়ে যে উলঙ্গ যুবতীরা অমর হয়ে রয়েছে তাদের তো সামনে দিক আর পেছনদিক একেবারে আলাদা, অথচ সুয়ো-দুয়োর ব্যাপার নেই।

—-তোমার মন্দিরে যা আছে তা হল স্হপতি আর ভাস্করের কল্পনা। আমি রূঢ় বাস্তবের কথা বলছি ভায়া। কখনও যদি দফতর শহরে যাও, নিজের চোখে দেখতে পাবে।

—-শুধু চোখ কেন আমি তো সব অঙ্গ দিয়েই দেখব। চোখ দিয়ে সবকটা ডাইমেনশান ধরা যায় না। তাছাড়া তোমার মতন চোখ তো আমার নেই।

দফতরের ডাকে সে-কারণেই সাড়া দিল কুশাশ্ব দেবনাথ।

এদিকে অমাবস্যার অমিয় অন্ধকার, তারায় তেরিয়ে আকাশ, শীতে শীতোচ্ছে ঝোপঝাড়, বাঁশিয়ে রয়েছে বাঁশবন, হিমে হিমোচ্ছে হালকা হাওয়া; কখন দুজোড়া ডানার কপাট খুলে পতঙ্গিনীর ঘুম ভাঙবে কে জানে।

নগণ্য হবার আগে একবার জঘন্য হয়ে দেখা যাক, ভাবল কুশাশ্ব। বলা তো আর যায় না। যদি দফতর শহরের কাজে লাগে। যদি অছি-সিংহাসনের কাজে লাগে। যদি মালকিনির সুয়ো দ৮ইকের কাজে লাগে। যদি মালকিনির দুয়ো দিকের কাজে লাগে।

যামন ভাবা তেমনি কাজ।

সারা গায়ে চুল আর শুঁড়োলো মুখ দিয়ে দাঁত বেরোনো শাকাহারী ম্যমথ হয়ে গেল কুশাশ্ব। গাছে-গাছে গেছো পাখিদের চেঁচামেচিতে লজ্জা পেয়ে আবার ফিরে এলো নিজের চেহারায়। ট্রায়ালটা দিয়ে অবশ্য ফুরফুরে প্রাণে ফুরসত এলো।

সকালে, পতঙ্গিনী এসে যখন রক্তমাংসের কুশাশ্বকে দেখল, ওর তো হেসে-হেসে ডানা ব্যথা হবার যোগাড়। সব শুনে বলল, নগণ্য-জঘন্য বা ধন্যধন্য যা-ই হও, অত দূরে ফ্লাই করার প্রযুক্তি আমার নেই ভায়া। অত এভিয়েশান ফুয়েলও ক্যারি করতে পারি না।

—-তাহলে কী হবে? কেমন করে যাব?

তুমি নগণ্য হয়ে আমার পিঠে দুপাশে পা ঝুলিয়ে বসো, আমো কোনো শঙ্খচিলের পিঠে বসিয়ে দেবো তোমায়। ওরা কেউ-কেউ দফতর-শহরের দিকে যায়।

নগণ্য হয়ে, উঠে বসার সময়ে পিছলে যাচ্ছিল কুশাশ্ব। ভোর-ভোর পরাগ মাখাবার ডিউটিতে বেরিয়েছিল পতঙ্গিনী, যাতে বেশি-বেশি হাইব্রিড জন্মায়।

—-হাইব্রিড? জানতে চাইল কুশাশ্ব। অচেনাসুলভ অচেনা?

হ্যাঁ, হাল আমলে আমরা ফড়িংরা অনেক ধরনের হাইব্রিড তৈরিতে সফল হয়েছি।

—-তাই বুঝি?

—-হ্যাঁ তো! গান্ধির পরাগের সঙ্গে মার্কসের পরাগ, গান্ধির পারাগের সঙ্গে রজনিশের, মাও-এর সঙ্গে মোরারজির, মার্কিনের সঙ্গে চিনা, জেহাদের সঙ্গে সাম্যবাদ, লাউ-এর সঙ্গে লঙ্কার, রবারের টুপির সঙ্গে চামড়ার টুপি; সে-সব হাইব্রিড তুমি দফতর শহরে গেলেই দেখতে পাবে।

—-হাফ-চেনার সঙ্গে উড়ুক্কু হাফ-চেনা মিশিয়ে পুরো একখানা অচেনাসুলভ অচেনা? পিঠের ওপর যুৎ করে বসে বলল কুশাশ্ব। এভাবেই ঘোড়ায় চাপত হাজার বছর আগে।

ঝিলের ঝিলমিলে কিনারায় যে শঙ্খচিলটা বসেছিল তাকে, জলে পোঁতা কঞ্চিতে বসে জিগ্যেস করল পতঙ্গিনী, একজনকে দফতর-শহরে নিয়ে যাবেন? ওর ডাক পড়েছে, খুব জরুরি।

ঠোঁটে শুকনো ঘাসের নুটি নিয়ে পেতলের একটা ছোট মূর্তি ঘষেমেজে ফর্সা করছিল শঙ্খচিল, এক মনে, মাথা নিচু করে। বলল, গোপালের এই তো সবে ঘুম ভাঙল। দাঁত মাজিয়ে, চান করিয়ে, ব্রেকফাস্ট করিয়ে, তারপর ওকে নিয়ে একটু বেরোব।

—-আপনি যতটা যাবেন অন্তত ততদূর পৌঁছে দেবেন নাহয়। তারপর কোনো যানবাহনে চাপিয়ে পাঠিয়ে দেবেন। প্রস্তাব দিল পতঙ্গিনী।

—-ঠিকি আছে, আগে গোপালের সেবাটা করে নিই। এক হাতে গোপালকে, অন্য হাতে তোমার অতিথিকে ধরে নিয়ে যাবো।

শঙ্খচিলের পায়ের কাছে কুশাশ্বকে নামিয়ে, টা-টা করে চলে গেল পতঙ্গিনী। কুশাশ্ব দেখল গোপাল একটা পুতুল, হাতে নাড়ু নিয়ে বসে আছে। ও নিজে ছিল পাথরের আর নাড়ুগোপাল নিরেট পেতলের।

শঙ্খচিলের পরামর্শ মেনে, যে-হাতে গোপালকে আঁকড়ে ধরল পাখিটা, সেই হাতটা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল কুশাশ্ব। একটা হাত আমার খালি থাকা দরকার, নয়তো নামার সময়ে অসুবিধা হবে, বলেছিল শঙ্খচিল।

দু-তিনবার পাক খেয়েই আকাশের চেয়ে উঁচু আকাশে উঠে পড়ে শঙ্খচিল যখন ফুল স্পিড নিয়েছে, ধাতব হাসি হেসে পেতলের মূর্তিটা ফিসফিস করে কুশাশ্বকে বলল, এত নিচু স্বরে যাতে শঙ্খচিল শুনতে না পায়, এই নিন, নাড়ু খান, আপনার তো মনে হচ্ছে সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি।

সত্যিই বেশ জোরে খিদে পেয়ে গিয়েছিল। বাঁ-হাতে নাড়ুটা নিয়ে খেয়ে নিল কুশাশ্ব। এমন খিদে পেয়েছিল যে প্রশ্ন করার মানে হয় না, গোপাল ছোকরাটার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় না হওয়া সত্বেও।

খেয়ে নিলে, গোপাল বলল, আরো নিচু স্বরে, দফতর থেকে আমারও ডাক পড়েছে, কিন্তু আমার সেবাইত তো ছাড়তেই চায় না, সব সময়ে সঙ্গে থাকে, এমনকি রাত্তিরে ঘন্টা বাজিয়ে মশারি টাঙিয়ে, আমাকে ঘুম পাড়ায় আর নিজে আমার সামনে মাটিতে শুয়ে মশার কামড় খায়।

এরকম উজাড় করে সেবা করছে লোকটা, অথচ আপনি দফতরের ডাকে সাড়া দিতে চাইছেন? কুশাশ্ব বিস্মিত। গলায় নাড়ুর চুরো আটকে আরেকটু হলেই জোরে কেশে ফেলত। সূর্য উঠে গিয়ে থাকলে কী হবে, আকাশ ব্যাপারটাই একেবারে ঠান্ডা, পাথরিনী চান্ডেলা দাসীর চেয়েও। তার ওপর খুচরো মেয়েলি মেঘগুলো মাঝে-মধ্যে সুড়সুড়ি দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে।

বন্দী জীবন কাটাচ্ছি, বুঝলেন, চব্বিশ ঘন্টা নজরে-নজরে, একেবারে একপাখিতন্ত্রী যাপন। বলল গোপাল। তারপর যোগ করল, একটু পরেই আমার সেবাইত ছোঁ মেরে নাড়ু তোলার জন্যে একজায়গায় নামবে, তখন কিছুক্ষণের জন্যে অন্যমনস্ক হয়ে যাবে। বাঁ হাতটা তাই ফাঁকা রেখেছে। মাটির কাছাকাছি যেই নামবে, আপনি ওর হাতের বগলে কাতুকুতু দিয়ে মাটিতে ঝাঁপ দেবেন, আমিও দেবো সেই সঙ্গে।

কিন্তু পতঙ্গিনী তো বলেছিল ও-ই দফতরে যাবার গাড়িতে তুলে দেবে।

প্রশ্ন করবেন না। সেবাইতদের বলা যায় না। কিছু না পেলে আপনাকেই টুক করে খেয়ে ফেলতে পারে। আমি তো পেতলের, আমায় খেতে পারে না। হয়ত আমি ধাতুর বলেই আমার সেবাইত হয়ে রয়েছে।

দোটানায় পড়ল কুশাশ্ব।শঙ্কচিল গোঁতা মেরে নামা আরম্ভ করেছিল নিচে। ভাবার আর সময় ছিল না। হালুইকরের বাড়ির ছাদে নাড়ুর থালার কাছাকাছি হতেই কাতুকুতু দিয়ে লাফ মারল কুশাশ্ব। গোপাল নাড়ু মাখার পাত্রের মধ্যে পড়ল। তুলে নেবার জন্যে শঙ্খচিল পেছনে বাঁক নিয়ে নেমে এসেছিল বটে, হালুইকরের মা একটা লাঠি নিয়ে ‘এই পালা এই পালা’ চেঁচিয়ে তাড়াল পাখিটাকে। না পালিয়ে ওপরে চক্কোর মারছে দেখে হালুইকরের মা লোকজন ডেকে নাড়ুর থাল, যার ফাঁকে কুশাশ্ব লুকিয়ে, আর নাড়ু মাখার বিরাট পাত্রটা, যার মধ্যে গোপাল লুকিয়ে, মাথায় তুলে নিচের তলার ভাঁড়ার ঘরে গিয়ে রাখল।

কর্মীরা বাইরে বেরিয়ে গেলে, কুশাশ্ব স্তম্ভিত হয়ে দেখল, গোপাল প্রমাণমাপের মানুষের চেহারা নিয়ে ফেলেছে।

—-করছ কী? করছ কী? ধরা পড়ে গেলে ভীষণ কেলেংকারি হবে। আমার মতন খুদে হয়ে যাও না। পরে সুযোগ পেলে কেটে পড়ব। আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল কুশাশ্ব।

গোপাল বলল, আমি নগণ্য হতে পারি না। সে-ক্ষমতা আমার নেই। আমি যে ঈশ্বর। আমি কেবল বড়, আরও বড়, তার থেকেও বড় হতে পারি। বা ধাতু, কাঠ, মাটি, পাথরের।

মনে হল এ-ঘরে কেউ আসছে। পায়ের শব্দ শোনা গেল। দ্রুত শুয়ে থাকা পেতলে রূপান্তরিত হল গোপাল। উত্তেজনায় কুশাশ্ব নিজের ছয়ফিট দীর্ঘ প্রকৃত চেহারা নিয়ে ফেলল। হাতে, বাহুতে, পায়ে, গলায় স্বর্ণালঙ্কার সুদ্ধ। কিন্তু দেহে যে পোষাক নেই। খাজুরাহো মন্দিরের দেয়ালে ওভাবে পোশাকহীনই ছিল হাজার বছর।

যে যুবতী-বধু ঘরে ঢুকেছিল, সে তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করে দিল ভেতর থেকে, আর ঝাঁপিয়ে পড়ল কুশাশ্বর ওপর। টাল সামলাতে না পেরে, ডািঁ-করা মিষ্টির পাহাড়ের ওপর পড়ল দুজনে। তাই আওয়াজ গেল না বাইরে।

সকাল থেকে আমার বিশেষ কিছু খাওয়া হয়নি । সম্বিত ফিরে না পেলেও বলল কুশাশ্ব।

বাঁ হাত দিয়ে কুশাশ্বর মুখে চোখে নাকে মিষ্টি গুঁজে দিতে লাগল যুবতী, আর দান হাতে খুলতে লাগল নিজের পোশাক। মিষ্টির নানা রকম ঢিবির ওপর চলল ওদের দুজনের স্বয়ংক্রিয় সৃজন-কম্মের হুটোপাটি । মিষ্টির বিছানায় ওদের খেলা স্তিমিত হয়ে এলে, কুশাশ্ব বলল, দফতর শহরে যাবার জন্যে ওকে সাহাজ্য করতে। গোপালের কথাটা চেপে গেল, কেননা এরাও যদি গোপালকে বন্দী করে ফ্যালে তাহলে মুশকিল। বলা যায় না; হয়ত ক্যাশ-বাক্সের ওপর রেখে এরাও গোপালের সেবাইত হতে চাইবে।

মেয়েটি কুশাশ্বর জন্যে একটা থলে, ফুলপ্যান্ট, শার্ট, জুতো আর সোনার এক হাজার সরকারি মুদ্রা এনে দিতে, কুশাশ্ব নিজের সবকটা অলঙ্কার দিয়ে দিল খুলে, স্মৃতিচিহ্ণ হিসাবে। যুবতী যখন দেখতে গেল খিড়কি দরজার দিক ফাঁকা আছে কিনা, গোপালকে তুলে ঝোলায় পুরে নিল কুশাশ্ব।

পেছনের খিড়কি দরজা দিয়ে বেরিয়ে ওপরে তাকিয়ে দেখল, তখনও আকাশে চক্কোর দিচ্ছে শঙ্খচিল। ঝোলা থেকে গোপালকে বের করলে ও-ও প্রমাণ মাপের মানুষের চেহারা নিল , আর মাথা থেকে ময়ূরের পালকটা খুলে ফেলে দিল ছুঁড়ে।

ঈশ্বর হয়েও আপনি নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি? আমার নগণতার সুযোগ নিতে হল? গাড়ি-ঘোড়ার খোঁজে হাঁটতে-হাঁটতে গোপালের দিকে প্রশ্ন দুটো ছুঁড়ে দিল কুশাশ্ব।

ঈশ্বরদের অনেক হ্যাপা, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল গোপাল। ঈশ্বররা পাওয়ার শেয়ারিঙে বিশ্বাস করে না, আকাশে উড়ন্ত শঙ্খচিলের দিকে তাকিয়ে বলল গোপাল। তারপর যোগ করল, ঈশ্বররা ভক্তদের দিয়ে অপরাধ করাতে বাধ্য হয়, কেননা তারা নিজেরা নিজেদের হাতে অপরাধ তুলে নিলে ঈশ্বরগিরি হারাবে। গোপিকাদের নিয়ে লীলে খেলায় আমি তো অনেক বেশি অভিঞ্জ। এমন কি যতই যাই করি কৌমার্য অটুট থাকে। তবু ওই যুবতীকে সন্মোহনে ডেকে পাঠালুম যাতে ওর বাঁজা বরের বদনাম ঘোচাবার অপরাধটা আপনি করেন, আর সেই সঙ্গে যুবতীটি আমাদের পালাবার সুযোগ করে দ্যান।

—-ঈশ্বর হওয়া দেখছি বেশ ঝকমারি!

হ্যাঁ, যে ঈশ্বরই হোন না কেন, যে সম্প্রদায়ের বা যে দেশেরই হোন না কেন, এই বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি নেই। নিরাকার হয়েও পার পাওয়া যায় না।

—-তার চেয়ে তো না হওয়াই ভাল।

—-সেই জন্যেই তো পচাঞ্জন সরদারের কথামতন দফতর শহরে যাচ্ছি।

—-পচাঞ্জন কি আপনার সঙ্গেও তুইতোকারি করেছে?

—-হ্যাঁ, কেন বলুন তো? গায়ের রঙ কালো, উস্কোখুস্কো চুল আর হাটুরে ধুতি দেখে ওনারা তো এমনিতেই তুইতোকারি করেন। কেনই বা আমায় বিশেষ ছাড় দেয়া হবে?

অসহায় গোপালের দিকে তাকাল কুশাশ্ব। পথে, রেডিমেড জামাকাপড়ের প্রথম দোকানটা থেকে দুজনের জন্যে এক সেট করে ট্রাউজার, টি শার্ট আর ট্যাংক জাঙিয়া কিনল। গাময় মিষ্টির রস লেগে চটচটে, স্নান করে পোশাক পালটাতে হবে। নাড়ুঅলার খিড়কি দরজা ছাড়ার সময় থেকে একদল কীর্টনীয়া মাছি ডানার খঞ্জনি বাজিয়ে একঘেয়ে গেয়ে যাচ্ছিল, ‘জামাটা খোল না রে রসিক নাগর, দেহসুধা পান করি…’।

এসব মিষ্টিখোর মাছিদের জানা আছে কুশাশ্বর। এরা ঘোড়া মাছি, এদের ড্যাবডেবে নেশা-করা চোখ দুটো এমন যে মাথা খুঁজে পাওয়া যায় না। মাদিগুলো রক্ত খায়। যখন পাথর হয়ে মন্দিরের গায়ে স্হায়ি সঙ্গমকারীর চাকরিতে ছিল, মরদগুলো লিঙ্গের ওপর বসে মধুরস খাবার তালে থাকত; মাদিগুলো এসে বসত পোঁদের ওপর। কিছু না পেয়ে, ভুল বুঝতে পেরে, কাঁচা খিস্তি দিতে-দিতে উড়ে যেত।

তিতকুটে-সবুজ বনবাদাড়ে ঘেরা একটা ঝলমলে-টলমলে সোমথ্থ ঝিলের কাছে পৌঁছলে, গোপাল বলল, আমি নিজেকে একটু লাঘব করে আসছি, আপনি ততক্ষণ স্নানটা সেরে ফেলুন।

হ্যাঁ, হয়ে আসুন, বলল কুশাশ্ব। তারপর খটকা লাগল, ঈশ্বররা কি হাগেন-মোতেন! কে জানে, হয়ত অমন অবিনশ্বর সমস্যার কারণেই ওনারা হয় নিরাকার হয়ে যান, বা পাথর-মাটি-ধাতু-বরফ কোনো আধারকে আশ্রয় করেন। এও কম ঝকমারি নয়। ও নিজেও যখন পাথর ছিল, তখন হাগা-মোতার সমস্যা ছিল না। পান-ভোজনের দরকার হত না তো মলের প্রশ্নই উঠত না।

জামা-প্যান্ট খুলে ঝিলকিনারায় রাখার পর, ওর পোশাক নিয়ে যখন কীর্তনীয়া মাছিরা ‘মিছা মায়া মধুরসে, বন্দী হয়্যা মায়াপাশে, হরিপদে না রহে ভকতি’ গাইতে-গাইতে কাড়াকাড়ি করছে নিজেদের মধ্যে, ওদিকে খেয়াল দিতে গিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়েছিল, ব্যাস, সেই ফাঁকে একটা চিকনচাম ঠান্ডাবদন ময়ালসাপ ওকে জড়িয়ে বলে উঠল, এইবার বাগে পেয়েছি তোমায়, আর কোথাও যেতে দেব না, তুমি আমায় শেখাবে কী ভাবে বহুক্ষণ নিজের ল্যাজের ডগায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

—-আঃ ছাড়ুন ছাড়ুন, কাতরে উঠল কুশাশ্ব, আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আপনার অশ্লীল আলিঙ্গনের চাপে।

—-ছাড়বই যদি তো এই সাড়ে তিন পাকে ধরেছি কেন? জিভ দিয়ে কুশাশ্বর গাল চাটনির মতন চেটে নিয়ে বলল দাগড়া পোশাকের রয়াল বেঙ্গল ময়াল, মুখ দিয়ে বোটকা গন্ধ বেরোচ্ছে পালকসুদ্ধ দেশি মুর্গি খাবার।
(চলবে)
-আগে অন্যত্র প্রকাশিত

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

3 Responses to ছোটগল্প: গহ্বরতীর্থের কুশীলব (পর্ব ১)

  1. আলাদা ঘ্রাণ, ঝাঁঝও ব্যতিক্রম।
    সাধুবাদ।

    রাজন্য রুহানি
    ফেব্রুয়ারী 5, 2011 at 2:02 অপরাহ্ন

  2. আপনার লেখাটি ভাল লাগল। আমি কি আপনার ফেসবুক বন্ধু হতে পারি? (ফেসবুক আইডি)
    http://www.facebook.com/#!/profile.php?id=100001866717299

  3. বাপরে ! দৃশ্য মিলাবো না তত্ত্ব … ঘোল পাঁকালো কোনটাই সহজে ছাড়ার নয় ! এমন কাহিনী কবিতায় দেখি , গল্পে কখনো শুনিনি , কখনোই পড়িনি এমন গল্প … আরো পড়তে চাই মলয়দা শুনতে পাচ্ছেন কী !

    imrul.kaes@ovi.com'

    শৈবাল
    জুলাই 29, 2011 at 3:56 পূর্বাহ্ন

মন্তব্য করুন