অনিমেষ এর চিঠিঃ ২য় খন্ড

সময়কালঃ২০০৬
আনিমেশ,
তোমার মতন সাহিত্যে পারদর্শি আমি নই। তোমাকে কতবার বলেছি,একটু বুঝার চেষ্টা করো। পাছে,যখন চলে যাবো- নিজেকে সান্তনা দেবার ভাষাটাও খুজে পাবে না তুমি।
তবে হ্যা, একটা কথা না বলে পারছিনে। তোমার শাওন বান্ধবী আসলে কি মতলবে আমার মোবাইল থেকে তোমাকে মিসকল দিয়েছিলো-তা অজানা। তবু,জানা অংশ থেকে লিখছি, ওই দিন যদি তুমি মিসকল ব্যাক করে অমন ঝগড়াটি না করলে আমি এই দেবীই থেকে যেতাম; অনিমেষ এর চোখে আর দেবীরানী হতাম না।
দুপুরে হলের রুমে একা লাগছিলো। ওই সময়টাতে আয়নার সামনে দাড়ালাম। এতকাল কেউ তো আর ভালোবাসেনি- তাই হয়তো নিজেকে ওভাবে আয়নায় আর দেখা হয়নি। উদ্দেশ্য ছিলো তোমার চোখে আমি কেন এত বিশেষনে বিশেষিত তাই খুজবো। বিশ্বাস করো-কিছুই খুজে পাইনি।

ভুল বললাম কিছুটা। পেয়েছিলাম যা-সেটা তুমি আমার মুখে শুনলে কষ্টই পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে আর আমি সেই নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে আরো কষ্ট পেতাম।

আনিমেশ, তুমি জানো- আমি কি বলতে চেয়েছি। তোমাকে বার বার দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছি, পারিনি। বিশ্বাস করো আমার কষ্ট আমার কাছে কিছুই না।কিন্তু আমার মা? আমার বাবাকে কে দেখবে বলো? দাদার কথা নাহয় বাদই দিলাম।

আনিমেষ,তুমি যে সমাজে বড় হয়েছ,আমি সে সমাজের নই। আমার বাবা যত জুয়াই খেলুক আর রাতে টালমাটাল হয়ে বাড়ি ফিরুক, আমার মা ঠিকই আমাদের দুই ভাই বোনকে আগলে রেখেছিলেন। সংসার ভাঙ্গেননি আমাদের কথা চিন্তা করে। কারখানার ষ্টোরকিপার বাবার সব টাকাই তো জলে যেত! কবে যে ওই লোকটা আমাদের ভিটেবাড়ি জ্যাঠুর কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলো, মা টের পায়নি। এরপর?

এরপর মায়ের সংগ্রাম। বড়দা বাবুন তখন সবে ৩ বত্সর। আমি মাত্রই হয়েছি- দু’সপ্তাহের শিশু। আমাকে মামীর বাসায় রেখে মা সিলেট (শ্রীহট্ট) টিচার্স ট্রেনিং কলেজে চলে গেলো চাকুরির জন্যে। ভাবতে পারো, দুই সপ্তাহের একটা বাচ্চা! মা সবই তো করলে আমাদের জন্য। ওই সময় মায়ের ক্লাস এইট পাশের বিদ্যেটা কাজে লেগেছিলো বৈকি! প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা-অন্তত দুবেলা আহার তো জুটলো!

সে যাত্রায় আমরা বেচে যাই।

আমার কিছু মনে নাই, শুনেছি- জন্মেছিলাম বলে আশির্বাদে বড় জ্যাঠু রুপার লকেট দিয়েছিলো। বাবা তাও আমার গলা থেকে খুলে বিক্রি করেছিলো। এই জন্মের আশির্বাদ কি আমার কাছে অভিশাপ নয়?

এতকিছুর পর ও মা আমার নিষ্ঠুর বাবাকে ছেড়ে যায়নি। কেন জানো? আমার আর বাবুন এর ভবিষ্যত চিন্তা করে। সেই ভবিষ্যতে তোমায় স্থান দেবার মতন অবস্থা যে কিছুতেই আমাদের নেই!

আজ কি এই সমাজ-সংসার এর মায়া ত্যাগ করে আমি তোমার কাছে সুখপ্রাপ্তির আশায় চলে আসবো? বর্তমান প্রেক্ষাপটে আপাতদৃষ্টিতে সচ্ছল এই দেবী একদিন তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে আসবে দু হাত জোড় করে। তুমি মহান, আমি জানি। কিন্তু আমাকে কি তুমি ক্ষমা করতে পারবে?

অনিমেশ, জগতের চিরায়িত রীতি অনুযায়ী মানুষের সুখের সময়কাল অতি ক্ষুদ্র আর কষ্টের ক্ষন আনেক দীর্ঘ। তাই হয়তো চিঠিটা লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে অনেক লিখলাম।

বাদ দাওনা এসব। কিছু সুন্দর কথা বলি।

না, পারছি না কিছুই। আমি তো আর তোমার মতন সাহিত্যবোধ সম্পন্ন মেয়ে নই।

আজ আর কিছু না লিখি। কি লাভ লিখে রেখে এইসব!

আত্মমঃ দ্বিধা

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন