সকাল রয়

গল্প : চোখের আঙ্গিনায় চোখ পড়ে রয় শেষ পর্ব

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page



প্রথম পর্বের পর………………

(পাঁচ)

গারো বাজারের অন্ধ গলির পাশেই একটা বাঈজীখানা যে আছে তা আমি জানতাম; কিন্তু কখনো সেখানে যাইনি। প্রয়োজনও পড়েনি; নীল লেকের প্রজেক্ট শেষ হবার আগের দিন সুশি আমায় বললো আপনি কখনো নর্তকীর উদোম নৃত্য দেখেছেন ? আমি বললাম না তো;
-তাহলে গনিকাবৃত্তির উপর অমন একটা লেখা কি করে লিখলেন ?
-কোথায় পেলেন লেখাটা !!
-যেখানে ছাপাতে দিয়েছিলেন; সেখানেই।
-আসলে আন্দাজে লিখেছি;
-মিথ্যে বলতে ভয় করে আপনার। আমি জানি পুরুষরা একটু-আধটু ওই রকম যে হয়;
-অনেক পুরুষ নিয়ে গবেষনা করেছেন মনে হচ্ছে !
-অনেক না হোক আপনাকে নিয়ে কিছুটা করতে গিয়ে বুঝতে পারছি ;
আমি আকাশ থেকে পড়বার ভাব ধরলাম না; কিন্তু চোখ বড় করে বলালাম; হঠাৎ আমাকে নিয়ে !!
-হ্যা।
-গল্পে তো লিখি বিষ খেয়ে মরে যাচ্ছি; কিন্তু তা লিখতে গিয়ে আমাকে বিষ খেতে হয়;
-বুঝলাম কিন্তু বিষের স্বাদ যে কেমন; সেটা না জানলে কি লিখতে পারতেন ?
-তা পারতাম না; তবে গনিকা বৃত্তির ব্যাপারটা আন্দাজে লোকমুখে শুনে লিখেছি।
-তাই !!
-হ্যা

আমি নতুন প্রজেক্ট নেবার আগে সিডিউল দেখতে গিয়ে বারবার করে দেখছিলাম; সুশি কি আমাদের প্রজেক্টে অর্ন্তভুক্ত হয় কিনা। সুশির জন্য কেমন একটা টান যেন আমার মনে অনুভব করতে পারলাম। সুশি কাজে না এলে আজকাল ছবি তোলার কোন মুডই আমার মাঝে থাকে না। কদ্দিন নিউমারলজি নিয়ে ঘাটাঘাটি করে দেখলাম আমার লাইফে কি কোন প্রেম-ট্রেম আছে কিনা।
সুশিও মাঝে মাঝে আমায় সময় দিতো; রাস্তায় আসবার কিংবা যাবার পথে কিন্তু কোন পার্ক কিংবা রেস্তোরাঁয় নয়; আমি কিছুটা বুঝতে পেরেছিলাম সুশি আমাকে একটু একটু করে চিনে নিচ্ছে; কিন্তু সেটা ও বুঝতে দিতে চায়না।
নতুন প্রজেক্টে সুশি আর আমি দুজনেই থাকলাম কিন্তু প্রজেক্টটা একটু প্রত্যন্ত অঞ্চলে পড়ে গেল। যাবার কিংবা আসবার সমস্য না থাকলেও ওখান থেকে কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরতে গেলে রাত অর্ধেক হয়ে যাবার সম্ভবনা আছে তাই কতৃপক্ষ ওখানের একটা গ্রামে আমাদের থাকার ব্যাবস্থা করে দিলেন। শুরু হলো আমাদের নতুন প্রজেক্ট।

(ছয়)

আমি প্রজেক্টের কাজে যতটুকু মনোযোগী হলাম; তারচেয়ে কম মনযোগী হলাম সুশি’র প্রেমে পড়ার দিকে। কেননা আমি দেখতে চাইছিলাম সুশি কি আমাকে পছন্দ করে কি না; কি জানি জীবন নাট্যের রাজপুত্রকে আগেই পেয়ে গেছে কিনা কে জানে।
ওর কাজ থাকতো সন্ধ্যের পর তাই সন্ধ্যের পর আমি যখন মুক্ত বিহঙ্গ তখন ওর কাজে নিজেকে খানিকটা সময় ওর কাছাকাছি রাখতাম।
ও ব্যাঙ্গ করা হাসি হেসে বলতো; থাক আমাকে উপকারের শোধ দিতে হবেনা।
মেঘালয়ের পাহাড় ভেদ করে চাঁদ উঠতো চারপাশে; তার ঘোলাটে আবরণে পুরো পাহাড় জুড়ে রহস্যময়তা বিরাজ করতো; আমরা সবাই চারপাশে গোল হয়ে আড্ডা দিতাম অনেক রাত অবদি; এ তল্লাটে আইসক্রিম বা কফি পাওয়া যেত খুব কম; আমার তৃষ্ণার্ত মন তাই মাঝে মাঝে সুশির খোলা গলায় গাওয়া গানের নদীতে ডুব দিতো;
সুশি ভালো গান গাইতে পারতো; জানিনা কেন যে জীবনের লক্ষ্যে গানটাকে সঙ্গি না করে এই ঘুড়ে বেড়ানো আর শিশুদের নিয়ে মহা গ্যাঞ্জাম মূলক কাজের পিছু ছুটছে।
প্রজেক্টের মাঝামাঝি পাতাঝরা দিন যাচ্ছিল তখন; সেই সব দিনগুলিতে কাজের ফাকে ফাকে ভাবনার নদীতে খেয়া বাইতাম; আমি বুঝে উঠতে পারলাম না আসলে আমিই কি ভালোবেসে ফেললাম সুশিকে না সুশিই ভালোবেসে ফেললো আমাকে।
দিন শেষে, কাজ শেষে প্রতিদিন আড্ডা বসতো। সেই প্রতিদিনকার আড্ডাটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠলো দিনের পর দিন। তিন মাসের প্রজেক্ট; এর মাঝে কারো বাড়ি যাওয়া হবেনা।
সুশি এসেছে ঢাকা থেকে আমি এসেছি শিলিগুড়ি থেকে; দুজনার দুই দেশ হলেও কথা আর আচরণে পার্থক্য করা যায়না। আমাদের মধ্যে সেক্রিফাইস আছে সমান-সমান।
আমরা মাঝ রাতে তারা গোনা কিংবা কানামাছি খেলার আয়োজন করাতাম। আমাদের মাঝে রবীন্দ্র,ভলেটেয়ার কিংবা সত্যজিৎ ও শার্লক-হোমস নিয়ে জোর তর্ক হতো।
রোজকার খবর; দূর পাহাড়ের গায়ে সকালে বৃষ্টি হবে কিংবা নিচে পানি নেই; দুপুরে খাওয়া মিলবে না। এই সব খবর সুশি প্রতিদিন কাজে যাবার আগে লিখে আমার দরজার সামনে রেখে যেত।
ভুলেও যেন কাউন্টার থেকে হুইস্কির বোতল কিনতে না যাই; কিংবা আমার লাইসেন্স নেই এই জাতীয় কথা নিয়ে রোজ শাসাতে আমায়;
টিম লিডার পারুল আপা; কিংবা প্রজেক্ট ম্যানেজার বিভাস বাবু আমার কাজের প্রশংসা করলে সুশি ক্ষেপে গিয়ে বলতো ছবি তোলার জন্য চাই সফট হাত; এই রকম কঠিণ হাতে ভালো ছবি হয়না; ছবি তোলার জন্য চাই প্রকৃতির মতো মন; যেখানে দুঃখরাও করবে স্বপ্ন বুনন…………………………………………….।

আমাদের বেশি কষ্ট হতো নিচে পানি আনতে যেতে;
আমার স্নান করা নিয়ে ওর আপত্তি ছিলো; ঝরনার জলে স্নান করলে ঠান্ডা লেগে যাবে; আমার আপত্তি ছিল ওর চুল বাধায়; খোলা চুলে তোমাকে ভুতনি’র মতো দেখায়;
-তুমি এত ফরসা হইলা ক্যান এই কথা বলে সুশি’কে রোজ ক্ষেপাতো বাবুর্চি মিরাস আলী;
একদিন সুশি; হাতে করে পায়েস নিয়ে হাজির বললো নিজে রেঁধেছে; খেতে গিয়ে মিষ্টি হীন। পায়েস নিয়ে সে,কি হাসা-হাসি; গানের পাগল ছিলাম বলে কান থেকে এম.পি.থ্রি প্লেয়ার ছুড়ে একদিন নিচে ফেলেছিল । বসন্তের প্রথম দিন ও একটা কবিতা আবৃত্তি করছিলো। খুব সম্ভবত প্রেমের কবিতা; আমি মিস করেছি সেদিন কানে এম.পি.থ্রি প্লেয়ার ছিলো; সেদিন থেকে একটা আফসোস আমার মনে জায়গা করে নিয়েছিল; আমি ওই কবিতা শত চেষ্টা করেও ওর মুখ থেকে আর শুনতে পাইনি; পড়ে জেনেছিলাম ওটা ওর লেখা কবিতা;
হলি খেলার দিন ও এসে বললো কান্ত আজ তো তোমার ছুটি; স্যার বলেছে তুমি আজ আমাদের সাথে ঘুড়তে যাবে; আমি বললাম আজ আমি তোমার সাথে একা ঘুড়বো; যাবে আমার সাথে;
-লোকে দেখলে বলবে কি
– কিছুই বলবে না। আমরা দু-জন কলিগ। তাছাড়া তোমার-আমার ব্যাপারটা সবাই জানে; জানলেই কি এটা তো সিনেমার পর্দা না; এটা গ্রাম বাংলার গেয়ো মাঠ-ঘাট এখানে এসব কেউ দেখতে চায়না।
সুশি একা যাবেনা আমি জানতাম; তাই বিকেলে ওকে বললাম এসো হলি খেলি;
এভাবেই শেষ হয়ে গেল আমাদের প্রজেক্ট।

(সাত)

আজকেই প্রজেক্টের শেষ দিন। বিকেল এই গ্রাম আর সবুজ পাহাড় ছেড়ে বাড়ি ফিরবো।
ব্যাগ গুছিয়ে সবুজ রঙ্গা একটা পাঞ্জাবী পড়ে আমি ঘর থেকে বের হলাম। বিভাষ বাবু আমাকে পেমেন্ট দেবার চেক দেবে বলে সেই সকাল থেকে ডাকছেন।
সবচেয়ে উচু পাহাড়টায় আজ আমাদের প্রজেক্টের শেষ কাজ হবে। আমি চেক নিয়ে ঘরে আর ফিরলাম না। পারুল আপা আমার ক্যামেরা নিয়ে গেছে সেই ভোর বেলা তার খোঁজে সামনে এগিয়ে গেলাম।
মেঘ নেই আজ; রোদও নেই। উচু পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে সুশি ক্যামেরা হাতে দাড়িয়ে;
কাছে যেতেই ও বলে উঠলো কান্ত তুমি আমাকে একটা আকাশ কিনে দেবে ; আমি সেখানে তোমার তোলা সমস্ত ছবি দিয়ে একটা গ্যালারী বানাবো। আমি হেসে বললাম দেব।
আমরা পুরো টিমের অর্ধেক এই পাহাড়ের গায়ে দাড়িয়ে আছি; হঠাৎ গুলির শব্দে সবাই সচকিত হলাম; বর্ডার থেকে গুলি আসছে; বর্ডার একশো গজেরও কম দুরত্বে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম গুলির আওয়াজ ক্রমশই বাড়ছে আমরা নিচে নামবার জন্য পা বাড়ালাম। পাহাড়ের চারপাশে আজ নীরবতা নেই বললেই চলে; আমরা সবাই পা চালিয়ে নিচে নামতে লাগলাম; অচেনা জংলী ফুল আমাদের পা ছুয়ে যাচ্ছিল; সবার মাঝে একটা উত্তেজনা শুরু হয়ে যাচ্ছে; আমরা সবাই সেই উত্তেজনা নিয়ে গতি বাড়াচ্ছি ক্রমশই।
ঠিক এই মুহুর্তেই একদল লোক হাতে অস্ত্র উচিয়ে ধেয়ে আসতে লাগলো; দেখে মনে হলো ওরা চোরা-কারবারি বর্ডার ক্রস করবার সময় হয়তো ধরা খেয়ে গেছে; আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম;
আমি সুশির হাত ধরে দৌড়ে দিলাম; আচমকা পেছন থেকে ক’জন ঝাপিয়ে পড়লো আমাদের উপর; আমি তাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ে গেলাম বুনো গাছের উপর। পিছু ফিরে দেখি সুশি নেই;
নেই !!
কোথাও নেই র!!
চোখ যতদূর যায়।
ওর আর্তচিৎকার শুনলাম; এগিয়ে গিয়ে দেখি;প্রায় দুশো গজ পাহাড়ের নিচে পড়ে আছে সুশি।

(আট)

আমার চারপাশের জটলাগুলো ক্রমশই কমে যেতে লাগলো। সুশি’র লাশ নিয়ে ওরা চলে গেছে সেই কখন; কিন্তু আমি যেতে পারিনি; আমি থেমে গেছি; আটকে গেছি।
নোনা জলের তান্ডবে বার বার মনে হলো; আলো ছাড়বো; মায়া ছাড়বো পৃথীবি ছাড়বো; আর ফিরবো না কোনদিন এই পৃথিবীতে; এই পৃথিবী খুব খারাপ। তিনি উপর থেকে খেলা শুরু করবেন; তারপর ইচ্ছে মতো খেলবেন; আনন্দ পাবেন বেদনা উপহার দেবেন।
আমি জ্ঞান শূণ্য ছিলাম তিনদিন। চোখ মেলবার পর থেকে আমার মুখে কথা ফোটেনি বেশ ক’মাস।
আর কোনদিন কোন সবুজের বনে যাইনি; খুব দূরে দূরে থাকি; নিরব পথ পেলেই সুশি এসে দাড়ায়। আমি পথ চলতে পারিনা। আমি ঝরনার জলে স্নান করতে পারিনা; ওর শাসন আমাকে এখনো মনে করিয়ে দেয়।
হুইস্কির বোতলে ওর ইচ্ছে গুলো ক্রমাগত ঘোর পাক খায়; আমি তীব্র যন্ত্রনা নিয়েও আপন করে ভাবতে চাই সব বেদনা ঘেরা স্মৃতি গুলোকে।
ওর বিদায়ের পর থেকে আজকের এই দুপুর পর্যন্ত আমি পাথরে গড়া ভাস্কর্য হয়েই ছিলাম; খানিক আগে সেই কথার পুনরাবৃত্তি আমাকে নাড়া দিয়ে গেল; কিছুটা উন্মাদনা আমার মাঝে প্রকাশ পেল। আকাশ মাঝে ভেসে উঠলো সুশি’র কন্ঠ;
-দেখো আমি যদি কোথাও হারিয়ে যাই; তোমার ব্যর্থতা গোছাতে এমন একজনকে পাঠাবো; যে তোমাকে ভালোবাসবে আমারই মতো; শুধু তুমি তাকে চিনে নিও…………………………।

গ্যালারির একপাশে বসে ছিলাম এতক্ষণ।
আবার কেউ একজন ছবি কিনতে এসেছে। আমি সুশি’র জগৎ থেকে ফিরে এলাম।
দৌড়ে গেটে এলাম; রন্তু ওই মেয়েটি কোথায় ?
– দাদা চলে গেছে তো !!
আমি অসহায়ের মতো বললাম কি বলিস !! কোনদিকে গেছে
-তা তো বলতে পারবনা।
আমি পিছু ছুটলাম গেট পেড়িয়ে একদম বাইরে;
পথে নামলাম কাঠ রোদ্দুর আমার সারা গায়; ওকে খুজে পেতেই হবে; আমার চোখ আজ রোদের ছেলের গায়ে আঁক কষবে ব্যর্থতা তাড়াতে…………………

সমাপ্ত
_____________________________________________
:-)
জীবনের বাকে বাকে প্রতিদিন জমে হাজারো গল্প। এটাও তেমনি একটা গল্প;
সত্য গল্প গুলো জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকে; সেই স্মৃতিগুলো ক্রমশই ডালপালা মেলে আর সেই ডালপালা গুলো মাঝে মাঝে পথ আটকে দেয়।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


6 Responses to গল্প : চোখের আঙ্গিনায় চোখ পড়ে রয় শেষ পর্ব

  1. rabeyarobbani@yahoo.com'
    রাবেয়া রব্বানি ফেব্রুয়ারী 22, 2011 at 12:51 অপরাহ্ন

    গল্পের বর্ণনাটি বেশ বাস্তব মনে হয়েছে। মনে হচ্ছিল লেখক আর চরিত্র একই ব্যক্তি। বেশ সাবলীল আর ভাল লেগেছে।শুভ কামনা।

  2. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী ফেব্রুয়ারী 23, 2011 at 9:20 অপরাহ্ন

    আপনি দাড়ির বদলে সেমি-কোলন দিচ্ছেন যে?

    অভ্র দিয়ে লিখলে full stopই দাড়ি।

  3. রাজন্য রুহানি ফেব্রুয়ারী 24, 2011 at 10:37 পূর্বাহ্ন

    ভালো লাগলো।
    :rose:

You must be logged in to post a comment Login