সাগর সেচা প্রাণ

Filed under: জানা অজানা |


গতকালের দেয়া সেইলিং অর্ডার অনুযায়ি আজ বিকেলে মাস্কাটে তেল আনলোড করে হিসেব নিকেশ বুঝিয়ে দিয়ে জাহাজে খাবার পানি এবং টুকিটাকি যা কিছু প্রয়োজন ছিল তা নেয়া হয়েছে। ব্যালাস্ট ট্যাঙ্ক ফুল লোডিং চলছে, বাকিটা চলতি পথেই দুই তিন ঘন্টার মধ্যে নেয়া হয়ে যাবে। সাগরের অবস্থা বেশ শান্ত। কোন অসুবিধা হবার সম্ভাবনা নেই। কাস্টম, ওমান ইমিগ্রেশন এবং মাস্কাট পোর্ট কন্ট্রোলের ছাড় পত্র নিয়ে সন্ধ্যার একটু আগে প্রায় সাড়ে ছয়টায় জাহাজ ইরানের আবাদান বন্দরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিয়েছি। হারবার এলাকা থেকে বেড় হয়ে আরব্য উপসাগর দিয়ে ফুল এহেডে চলছে। একটু পরে নেভিগেশন লাইট জ্বালিয়ে দিলাম। সামনে আশে পাশে দুই একটা জাহাজ আসছে যাচ্ছে তাদের নেভিগেশন বাতি দেখা যাচ্ছে। রাডারে দেখা যাচ্ছে কেউ কেউ আবার আরো কিছু উত্তর দিয়ে আরব সাগরের দিকে যাচ্ছে।

ব্রীজের পিছন দিকে চার্ট টেবিলের পাশে ইলেকট্রিক কেটলিতে দুই কাপ কাল কফি বানিয়ে স্টিয়ারিং করছিল ডেভিড ওকে এক কাপ দিয়ে আমার চিরাচরিত অভ্যাস মত ব্রীজের বাইরে সাইড লাইটের উপরে বসে রাতের নীল সাগরের বুকে খোলা আকাশের নীচে দিয়ে তরতর করে এগিয়ে চলছি। এই অভ্যাস এক দিনের নয়। যত দিন থেকে নাবিক জীবন চলছে বলতে গেলে সেই থেকে এক ভাবে চলছে। এক কাপ কাল কফি না হলে যেন ব্রীজে ডিউটি করা যায় না!
রাত বারোটায় চীফ অফিসার লুইস এর ডিউটি। নিয়ম অনুযায়ী ঠিক পাঁচ মিনিট আগে লুইস ব্রীজে এলো। ওকে সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে চলে গেলাম ঘুমের ঘরে। এর পরে আবার সকাল আটটা থেকে ডিউটি। সকালের ডিউটিও নিয়ম মত দুপুর বারোটায় শেষ করে কেবিনে ফিরে এসেছি। গোসল করে দুপুরের লাঞ্চ করে একটু গড়িয়ে নেবার ইছে হলো। আরব দেশের জুন মাসের এই প্রচন্ড গরমে আমাদের দেশের আম কাঁঠাল পাকার গরমের কথা মনে এলো। কিন্তু মনে এলেই কি আর গাছের আম পেড়ে খাওয়া যায়? মনে মনে ভাবতে ভাবতে এয়ারকন্ডিশন রুমে কম্বল গায়ে শুয়ে পরেছিলাম, কখন যেন একটু ঝিমানি ভাব এসেছিল। স্বপ্নে দেখছিলাম গ্রামের বাড়িতে আম বাগানের ছায়ায় বসে আছি আর ছোট ভাই বোনেরা আধাপাকা আম পেড়ে এনে দিচ্ছে। মুখে দিতে যাব এমন সময় কাছেই কার চিৎকারের শব্দ কানে এলো। চিৎকার শুনে চাচাত বোন নীলাকে কার কি হলো দেখতে বললাম। হাতের আম হাতেই ধরা রয়েছে এখনও মুখে দেইনি। সঙ্গে সঙ্গে নীলা চ্যাচিয়ে বলল দাদা পারুল গাছ থেকে পরে গেছে! কি? বলার সাথে সাথেই ঘুম ভেঙ্গে দেখি জাহাজের কেবিনে শুয়ে আছি। এটা নিজের গ্রামের বাড়ির আম বাগান নয় আরব্য উপসাগরের উপর দিয়ে আমার জাহাজ ইরানের আবাদান বন্দরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
সেই কবে দেশ ছেড়ে এসেছি আবার কবেই যে যাব?মনটা খারাপ হয়ে গেল। একটু শুয়ে রইলাম। হঠাৎ করে কেন যেন মুখে কোথা থেকে এক রাশ থু থু জমে গেল। ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। উঠতে ইচ্ছে হচ্ছিল না কিন্তু মুখে থু থু নিয়েই বা শুয়ে থাকি কি করে? তাই বাধ্য হয়েই উঠে পোর্ট হোল (জাহাজের কেবিনের এক রকম গোল জানালা) খুলে মাথাটা বের করে থু থু ফেলছি হঠাৎ জাহাজের পিছন দিকে চোখ যেতেই নীল সাগরের বুকে কি যেন কাল একটা ফুট বলের মত দেখলাম। একটু চমকে উঠলাম! কি ব্যাপার, এখানে এটা কি? গতকাল মাস্কাট বন্দর ছেড়ে আসার পর প্রায় দুই শত নটিক্যাল মাইল চলে এসেছি এখানে এই সাগরের মাঝে এটা কি?একটু অস্বাভাবিক মনে হলো। নিতান্ত কৌতুহল নিয়ে দেখার জন্য কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে জাহাজের পিছনে এসে দেখি কে একজন মানুষ। নিশ্চয় কেউ পরে গেছে! কে পরেছে?জাহাজ প্রায় বার নটিক্যাল মাইল বেগে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আশে পাশে দুই শত মাইলের মধ্যে কোন কূল কিনারা নেই।

জাহাজ থেকে মানুষ পরে গেলে যার নজরে আসে তাকে “ম্যান ওভার বোর্ড” বলে চিৎকার করতে হয়, এটাই নিয়ম। সেই অনুযায়ী চিৎকার করছি কিন্তু বুঝতে পারলাম আমার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। আতঙ্কে ভয়ে আমি দিশাহারা। কি করব? কি করব?দৌড়ে ব্রীজে চলে গেলাম। আমার ওই উদ্ভ্রান্তের মত চেহারা দেখে ব্রীজে যারা ছিল তারা জিজ্ঞেস করছে, কি হয়েছে? কথা বলছ না কেন? আমি কিছুই বলতে পারছি না, আমার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। তবে কি করতে হবে তা ভুলিনি। তারাতারি ইঞ্জিন রুম টেলিগ্রাম টেনে জাহাজের গতি থামিয়ে দিলাম এবং উইলিয়াম স্টিয়ারিং করছিল তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে নিজের হাতে স্টিয়ারিং নিয়ে জাহাজটা সম্পূর্ণ ডান দিকে ঘুড়িয়ে দিয়ে ওকে টেনে ব্রীজের বাইরে এনে হাতের ইশারায় পিছনে যে মাথাটা দেখেছিলাম সেটা দেখিয়ে দিলাম। পিছনে সেকেন্ড অফিসার ম্যাক্স এসে দাড়িয়েছে। ম্যাক্স জিজ্ঞেস করল “হু ইজ দ্যাট”? বললাম চিনতে পারিনি।

লোকটা এতক্ষণে বেশ পিছনে পরে গেছে। শান্ত সাগর বলে এখনও দেখা যাচ্ছে। একটু অশান্ত হলে আর দেখা যেত না। এবার উইলিয়াম এবং ম্যাক্সকে নিয়ে ব্রীজ থেকে নেমে মেইন ডেকে এলাম। এই খোলা সাগরে মাঝপথে হঠাৎ জাহাজ থেমে গেল কেন জানার জন্য প্রায় সবাই বাইরে চলে এসেছে। সবার মুখে প্রশ্নের ছায়া, কি হয়েছে? গত পরশু সকালে মাস্কাট আউটার এঙ্কারেজে ছিলাম তখন আমাদের রাবারের ডিঙ্গি বোট নিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার জন্য পাশে নোঙ্গর করা ‘প্যাসিফিক ম্যারিনারে’ গিয়েছিলাম। ফিরে এসে সেই ডিঙ্গি ক্রেন দিয়ে তুলে সুন্দর করে গুছিয়ে রেখে দিয়েছিলাম। তাতে পেট্রোল সহ সব কিছুই রেডি ছিল।
এর মধ্যে জাহাজ ঘুড়ে থেমে গেছে। ওরা সহ ক্রেন দিয়ে ডিঙ্গিটা নামিয়ে আমি, ম্যাক্স আর উইলি এই তিন জন ডিঙ্গিতে নেমে এক টানে ডিঙ্গির ইঞ্জিন স্টার্ট করে ফুল স্পিডে এগিয়ে গেলাম। প্রায় সমুদ্র সমতলে নেমে এসেছি বলে আর ওই মাথা দেখা যাচ্ছে না। জাহাজের উপরে পিছন দিকের কোয়র্টার ডেকে যারা ছিল ওরা দেখিয়ে দিল ওই দিকে যাও।
এগিয়ে গেলাম। অল্প একটু পরেই ওই লোককে দেখা গেল। তারাতারি আরো তারাতারি যেতে হবে। দ্রুত গতিতে শ্বাস বইছে, বুক ঢিব ঢিব করছে, জিহবা শুকিয়ে গেছে। কেউ কোন কথা বলতে পারছে না, সবাই চিন্তিত। ডিঙ্গির হ্যান্ডেলের থ্রটল ঘুড়িয়ে স্পীড বাড়াতে চাচ্ছি কিন্তু এর চেয়ে বেশি স্পীড নেই। কাছে চলে এসেছি। এইতো আর একটু। আর একটু। হ্যা আরো কাছে চলে এসেছি প্রায় ধরা যায়। ভেসে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এই এতক্ষণে চিনতে পারলাম। আমাদের জাহাজের টোপাস (ক্লিনার) ভারতের বিহার এলাকার অর্জুন।

যাক, সাঁতার জানত বলে এই এতক্ষণ ভেসে থাকতে পেরেছে। আমি হলে কি করতাম? আমি তো সাঁতার জানি না! এ কথা মনে হতেই আর এক দফা আতঙ্ক এসে ভর করল। তবুও কাঁপা কাঁপা হাতে ডিঙ্গির স্পীড কমিয়ে আস্তে আস্তে কাছে এসে ওকে ধরা মাত্রই হাত পা ছেড়ে দিয়ে একেবারে সেন্সলেস। সমস্ত শরীর নোনা পানিতে ঠান্ডা বরফের মত হয়ে গেছে। সবাই মিলে টেনে ডিঙ্গিতে উঠিয়ে শুইয়ে দিলাম। এবার ডিঙ্গি ঘুড়িয়ে জাহাজে ফিরে এসে অর্জুনকে ওই ডিঙ্গিতে রেখেই ডিঙ্গি সহ আমাদের সবাইকে ক্রেন দিয়ে তুলে নিল। জাহাজে উঠে দেখি ক্যাপ্টেন, চীফ ইঞ্জিনিয়ার, চীফ অফিসার সহ সবাই ডেকে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
ক্যাপটেন বলল ওর কাপড় বদলে তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছিয়ে দিয়ে তারাতারি চিকিত্সা রুমে নিয়ে গরম কম্বল গায়ে দিয়ে দাও আমি আসছি। একটু পরে ক্যাপ্টেন এসে হিটার চালাতে বলল। রুমটা গরম হবার পর অর্জুন একটু মিট মিট করে তাকাল। পাশে থাকা সবাই যেন হাতে চাঁদ পেলাম। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু কোন কথা নেই। যেমন ছিল আবার তেমনি আসার দেহে পরে রইল। প্রায় আধা ঘন্টা পরে আবার মিট মিট করে তাকাল। বির বির করে প্রথম কথাটা বলল- ম্যায় মার গিয়া কিয়া (আমি কি মরে গেছি)? আরে না অর্জুন তুমি মরনি। এইতো আমরা সবাই তোমার পাশে। তুম লোগ কিয়া অবতার হ্যায়? না না, আমরা সবাই তোমার কলিগ। এবার নরে চরে উঠে বসল। ওকে উঠতে দেখে গ্যালি (কিচেন) থেকে ব্রান্ডি মেশানো গরম কাল কফি এনে দিলাম। তবুও ও বিশ্বাস করতে চাইছে না যে ও এখনো এই ধরনীর বুকে বেঁচে আছে। ক্যাপটেনের নির্দেশ মত আস্তে আস্তে ওকে বোঝাতে চাইলাম যে তুমি জাহাজ থেকে পরে যাবার পরই আমরা দেখতে পেয়ে সাথে সাথে ডিঙ্গি নিয়ে তোমাকে তুলে এনেছি, তুমি মরনি। সাগর সেচে আমরা তোমার প্রান ফিরে পেয়েছি। অর্জুন কাঁদবে না হাসবে না কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে সবার মুখের দিকে দেখছে। এবার ওর মুখে কফির কাপটা তুলে বললাম একটু একটু খেয়ে নাও।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

14 Responses to সাগর সেচা প্রাণ

  1. বাহ! এক নিঃশ্বাসে পড়ে গেলাম। দুরুদুরু করছিল বুক। এ রকম বাস্তব ও সত্য কাহিনীর মতো গল্প পড়তে বেশ লাগে।
    :-bd

    bonhishikha2r@yahoo.com'

    বহ্নিশিখা
    এপ্রিল 27, 2011 at 4:56 পূর্বাহ্ন

  2. ভালো লাগলো আমারও। ভালোবাসা পাঠালাম, আলমিরাতে রেখে দিবেন। :D

    রাজন্য রুহানি
    এপ্রিল 27, 2011 at 6:38 পূর্বাহ্ন

  3. মহূর্তে পড়ে ফেলার মত গল্প।
    সুদূর বিস্তৃত ভাবনা।

  4. নীলুদা ফিরা আইছে !
    নীলুদা ফিরা আইছে !
    গল্পটা আগেই পড়েছি ।কমেন্টস করা হয় নি । আপনার লেখাগুলির মধ্যে এই টাঈপটা বেশ স্বচ্ছ আর আধুনিক । বেশ !
    শুভকামনা

    rabeyarobbani@yahoo.com'

    রাবেয়া রব্বানি
    মে 6, 2011 at 8:34 পূর্বাহ্ন

    • কি করি! কয় দিন আগে একটু ঝড় হইছিল সেই ঝড়ে আমার রকেটের তার তুর ছিড়া গেছিল বইলা আইতে পারি নাই।
      আর বু জান, এই গুলা গল্প না এক্কেবারে জীবন থেকে নেয়া, তাই হয়ত ভাল লাগে তবে প্রায় ত্রিশ বছর আগের কাহিনী। যাক ভাল লাগলেই হইল।

  5. এ তো দারুন অভিজ্ঞতা, ভাবতেও অবাক লাগছে।

    rshazzad242@gmail.com'

    সাজ্জাদ
    মে 6, 2011 at 11:47 পূর্বাহ্ন

You must be logged in to post a comment Login