ধর্ম, সংবিধান এবং জাতীয়তাবোধ

১.

বেশ কদিন আগের কথা। আমি গভীর ঘুমে। খুব ভোরে আমেরিকার মিসিসিপি অঙ্গরাজ্য থেকে আমার এক পরিচিত-এর ফোন। গলায় একই সাথে তীব্র উচ্ছ্বাস এবং চাপা ক্ষোভ!

-ভাই, খবর শুনেছেন?

– কি খবর?

-আমাদের তো শুয়াইয়া ফেলছে!

-কোথায় শুয়াইছে?

– সংবিধানে!

-কিভাবে শুয়াইছে?

-সংবিধান পরিবর্তন করে দিয়েছে!

– সেটা তো ৮৮ সাল থেকেই শুয়ানো।

-এখন আরও পাকাপোক্ত করে শুয়াইয়া দিছে, ঘুমের ট্যাবলেট খাইয়ে শুইয়া দিছে!

-এখন আমার কি করনীয়?

-আপনি ব্লগে-ট্লগে কিছু লিখেন।

-আমার লিখায় কি যায় আসে? ঘুম কি ভাঙ্গবে?

-না ভাঙ্গুক, তাও লিখেন। আমি মেইলে ডিটেল দিচ্ছি!

আমার এই পরিচিতের ঘুম ভাঙ্গাভাঙ্গির ব্যাপারে আমি কিছু করতে না পারলেও যে সে অসময়ে ফোন দিয়ে আমার সকালের আরামের ঘুমটা ভাঙ্গিয়ে দিয়েছিল সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত, এবং কিঞ্চিত ক্ষুব্ধ। এই ফোনের দরুণ, আমার পুরো সকালটাই নষ্ট!

সেই নষ্ট সকালে আমার সদা সজাগ ল্যাপটপে উনার দুষ্ট মেইলটা পেলাম। মেইলে একটি খবরের কাগজে লিংক দেওয়া [১]। খবরটা পড়ে যা বুঝলাম, সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম “ইসলাম”, “বিসমিল্লাহ” এবং জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এ ছাড়াও নাগরিক হিসেবে “বাংলাদেশী” এবং জাতি হিসেবে “বাঙালি” জাতীয়তাবাদ অক্ষুন্ন রাখার বিষয়েও অভিন্ন মত দিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত ইচ্ছাতেই মোটামুটি এটা হয়েছে বলে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবর্তিত সংবিধান মোতাবেক ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলেও বিশেষ কমিটির সুপারিশে সকল ধর্মেরই সমান অধিকার থাকবে। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মসহ অন্য সকল ধর্মই সমুন্নত রাখা হবে। এ বিষয়ে কমিটির সবাই প্রায় অভিন্ন মত দিয়েছেন।

২.

এখন প্রশ্ন হল, বাংলাদেশের “রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম” হলে কি বাংলাদেশ ইসলামী রাষ্ট্র হয়ে যাবে??? নাকি “ধর্ম নিরপেক্ষতা” হওয়া ততোধিক যুক্তিযুক্ত হবে? নাকি সংবিধান-এ এ বিষয়গুলো থাকাই থাকাই উচিত না? অনেকে এই তিনটা বিষয়কে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করবেন। ফেইসবুকেও আমাদের সংবিধানের মূল নীতিতে রাষ্ট্রধর্ম ”ইসলাম” থাকবে না ”ধর্ম নিরপেক্ষতা” থাকবে এ বিষয়ে অনেকেই বিভিন্ন স্ট্যাটাস দিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেছেন।

একথা সর্বজনবিদিত যে, ধর্ম নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটা বিষয়। কিন্তু যখন এই বিষয়টি রাষ্ট্রের সার্থ্যের সাথে মিশে যায়, জাতীয়তাবোধের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে যায়, তখন দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সবার মত আমারও এ বিষয়ে অভিযোগ, মতামত অথবা সুপারিশ করার অধিকার আছে।

একজন স্নেহময়ী মা কখনই তার নিজ সন্তানদের মধ্যে ভাগাভাগি করতে পারেন না, সকল সন্তানই মায়ের কাছে সমান, সকল ছেলে-মেয়েই সমপরিমাণ স্নেহের দাবীদার। কোন মা তার একটি সন্তানের নামে বিশেষ সুবিধা, একটি সন্তানের নামে বেশি সুবিধা প্রদান করতে পারেন না। আমার দেশ আমার কাছে দেশমাতা। আমার দেশমাতা আজ তার সন্তানদের আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরায় বিভেদ করে দিচ্ছে অথবা তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেখানে আবার হাস্যকরভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মসহ অন্য সকল ধর্মই সমুন্নত রাখার কথা বলা থাকবে। যে সংবিধান সবার মত আমারও পড়ার অধিকার আছে, আমি যখন আমার দেশের সেই সংবিধানটি পড়া শুরু করব তা “বিসমিল্লাহ” দিয়েই পড়া শুরু করতে হবে! পড়ার শুরুতেই আমাকে বুঝে নিতে হবে, এর রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, আমি এ ধর্মের না, আমি এর অনুসারী না! আমি নিজেকে মাইনরিটি হিসেবে বুঝে নিতে হবে!! সেখানে আমাকে জাতীয়নীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা করে ফেলা হয়েছে!! একদল মেজরিটি আরেকদল মাইনরিটি বলে ভাগ করে ফেলা হয়েছে!! আর যেখানে সংবিধানের শুরুতেই একটি বিশেষ ধর্মকেই প্রাধান্য দিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে সকল ধর্মকেই সমুন্নত রাখার কথা কিভাবে বলা হচ্ছে? আজ আমি উচ্চ শিক্ষার্থে দেশের বাইরে অবস্থান করছি। দেশের ক্ষীন উপকারে হলেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তিলে তিলে গড়ে তুলতেছি। যোগ্য নাগরিক হয়ে নিজেকে তৈরি করে দেশে গিয়ে তার প্রতিদান করার কথা ভাবছি, একটু হলেও দেশের অগ্রগতিতে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখার জন্য স্বপ্ন দেখছি। সেখানে আমার দেশমাতা সংবিধানে আমাদেরকে উপেক্ষা করে কি আমাদেরকে আলাদা করে দিচ্ছে না? আমাদেরকে সমাজের অগ্রগতিতে অসাম্প্রদায়িক শক্তি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ার পথ রুদ্ধ (বা অনুৎসাহিত) করে দিচ্ছে না? কই, দেশের মানুষ যখন মুক্তিযোদ্ধের অসম চেতনা নিয়ে জীবন বাজি রেখে ধর্ম-মত নির্বিশেষে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন তো কোন ধর্মচিন্তা মাথায় রাখে নি! বর্তমান ভিন্ন ধর্মালম্বী সন্তানদের আত্মীয়-স্বজন যখন অনভ্যস্ত, কম্পিত হাতে বেয়নেটে গুলি ভরে সম দেশপ্রেম নিয়ে শত্রুদের মোকাবেলা করতে গিয়ে নিজের জীবন বিকিয়ে দিল, তখন তো এ ভুমিতে ৮৫% মুসলমান না ১৫% হিন্দু, এরকম সংখ্যাগত বিবেচনা আমলে/বিবেচনায় নেয়নি [২]! আর যদি কোন ধর্মচিন্তা থেকেই থাকে তখন, সেই ধর্মের নাম ছিল “মুক্তি”, মুক্তি ধর্ম নিয়েই সবাই ঝাপিয়ে পড়েছিল, একযোগে, মুক্তিযুদ্ধের অপ্রতিরুদ্ধ সমান চেতনা নিয়ে। আমি যখন এদেশের হয়ে কাজ করব, দেশের প্রতিনিধিত্ব করব, তখন তো আমি ধর্ম চেতনাকে মাথায় নিয়ে করব না, করব একজন বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে। তাহলে কেন, একটা দেশের সবচেযে বড় কেতাব- সংবিধানে একটা নির্দিস্ট ধর্মকে প্রাধান্য দেওয়া হবে আর অন্যান্য ধর্মকে সমুন্তত রাখার শিশুশুলভ বুঝ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উপেক্ষা করা হবে?  একটু রাষ্ট্র কেন তাদের নিজের সবচেযে বড় অংশ জনগনকে নিজেই ভাগ করে দিবে? একটা রাষ্ট্রের একটা বিশেষ ধর্মের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা মানে ওই ধর্মালম্বালীদের হাতে ৫১/৪৯ (আদতে পুরোটাই) ক্ষমতা তুলে দেওয়া। বংশপরিচয় দেখে যেমন চরিত্র আন্দাজ করা না, প্রতুলতা দেখে যেমনি শক্তিমত্ত্বা নির্ধারণ করা যায় না, তেমনি কোন ধর্ম সংখ্যাগরিষ্ট এটা দেখেও ধর্মের মাপকাঠি নিরূপণ করা যায় না।

অন্যদিকে, রাষ্ট্র আবার ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিপক্ষে। যেখানে সংবিধানই ধর্মপুষ্ট, সেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি থাকতে দোষটা কোথায়? সংবিধান তো ধর্মের পক্ষে। তাছাড়া বাংলাদেশ তো গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র, ইসলামী প্রজাতন্ত্র নয়! তাহলে কেন গণতন্ত্র অর্থাৎ সমান অধিকার, সমান পৃষ্টপোষকতা নির্ধারণ করা হবেনা। অনেকে বলছেন, ৮৫% মুসলমান বলেই মুষলমান রাষ্ট্র স্বীকৃতি দেওয়া দরকার। কিন্তু, সংবিধান তো শুধু ৮৫% এর না, এটা পুরো ১০০% এর, সেই ১৫% বাদ যাবে কেন? তাহলে সমান মূল্যাযণ অর্থাৎ গণতন্ত্র কিভাবে নিশ্চিত হল?

কেউ কেউ বলছেন, এতদিন তো রাষ্ট্রধর্ম ইসলামই ছিল, কই এতদিন তো কেউ কোন কথা বলেনি? অথবা এতদিন তো কারো কোন সমস্যা হয়নি! তাদের উদ্দেশ্যে বলব, আমরা অতীত থেকে অবশ্যই শিক্ষা নেবো। কিন্তু তার মানে এই নয় যে অতীতকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকতে হবে! “ঘরের খেয়ে বনের” আর “দুনিয়ার খেয়ে আখিরাতের” মোষ তাড়ানো — দুটোই অর্থহীন। অতীত থেকে শিক্ষা নিই কোনো ভুলকে ওমিট করতে, তাকে আকড়ে ধরতে নয়।

৩.

সকল রাজনৈতিক দলই নিজেদের জনসমর্থন বৃদ্ধি করতে ধর্মকে ব্যবহার করে আসছে। জিয়াউর রহমান সফল ভাবে সংবিধানের মুল ৪ নীতির [৩] পরিবর্তন করে গেছেন। এরশাদ জিয়ার সেই পদাঙ্ক অনুসরন করে “রাস্ট্র ধর্ম” এনেছেন। তাদের উদ্দেশ্য একটাই ছিল, সহজে সংখ্যায় সর্ববৃহৎ ধর্মভীরু মধ্যবিত্ত সমাজের আস্থা অর্জন!  সম্প্রতি হাইকোর্ট সামরিক আইনে ৮৮ এর সংবিধান পরিবর্তন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তনকে অবৈধ ঘোষনা করেছে [৪]। সে সূত্রেই ৭২ এর সংবিধান পুর্নবহাল থাকবে। একথা সবাই জানেন, ৭২ এর সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম বলে কিছু ছিল না। সেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল। তাহলে এরশাদের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রবর্তন অবৈধ! আর তাই অবৈধ একটা রাষ্ট্রীয় নীতি কেন বহাল থাকবে? আমাদের অস্থির রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বেশিরভাগ সময়ই জনমত সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠা পায়না। এটাও তখন পায়নি। এখন সুযোগ এসেছে বলেই কথাগুলো তুলে ধরা হচ্ছে। এরশাদ অসাংবিধানিক ভাবে এ কাজটি করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভুলুন্ঠিত করেছে। এখন সুযোগ এসছে বলেই এখন আবার ফিরিয়ে আনা উচিত। আবার কেউ কেউ বলছেন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকা সত্ত্বেও তো কোন সমস্যা হচ্ছে না, তাদের উদ্দেশ্যে বলব, একজন বাবা যখন নিজের সন্তানের সাথে একজন পালক সন্তানও পালেন, তখন আর্থিকভাবে সমান সহযোগিতা করলেও প্রয়োজনের সময় অথবা বিশেষ মুহূর্তে দুটি সন্তানের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে বলা হলে ঠিকই নিজের সন্তানকে বেছে নিবেন। এখানে প্রশ্ন হল আনুষ্ঠানিকতার, বৈধ স্বীকৃতির। বিশেষ কোন রাজনৈতিক দুর্যোগের সময় ঠিকই বাংলাদেশ সরকার কনস্টিটিউশনে উল্লেখিত ধর্মের প্রতি বায়াস বা দূবলতা প্রকাশ করতে দায়বদ্ধ থাকবে। যেসব প্রসঙ্গে “একটি” ধর্ম বেছে নেওয়ার প্রশ্ন আসবে রাষ্ট্র তখন ঠিকই সংবিধান সংবলিত ধর্মকেই বেছে নিতে বদ্ধপরিকর থাকবে। আজ ভারতে ৮৬% হিন্দু থাকা সত্ত্বেও ভারত সেকুলারিজম সংবিধিত (Sovereign socrialist secular democratic republic country) [৫]। তাদের কোন সমস্যা হচ্ছে না। [প্রসঙ্গত: ভারত সেকুলার দেশ হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানদেকে ঠিকই মাইনরিটি হিসেবে পরিগণিত করা হয়, যা অবশ্যই গণতন্ত্রের পরিপন্থি! যা আমি ব্যক্তিগতভাবে কখনই সাপোর্ট করিনা] তাছাড়া রাষ্ট্র যেহেতু নামাজ, রোজা, হজ্জ, কিছুই পালন করেনা, আবার পুজাও করে না, আবার রাষ্ট্রকে যাকাত দিতেও দেখিনি, আবার অঞ্জলী নিতেও দেখি না। তাহলে রাষ্ট্রের আবার ধর্ম কি?? রাষ্ট্রের মানুষগুলোর হাজারটা ধর্ম থাকতে পারে কিন্তু রাষ্ট্রের কেন?? ধর্ম থাকবে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের! “সৃষ্টিকর্তার সিদ্ধিলাভ” -এর জন্য বিভিন্ন মাধ্যম আছে, বিভিন্ন ওয়ে আছে। বিভিন্ন ধর্মই এখানে বিভিন্ন মাধ্যম। যে কেউ তার ইচ্ছেমত মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার সিদ্ধিলাভের চেষ্টা করার অধিকার আছে। পদ্ধতীটা সঠিক এবং ওই ধর্মীয় নিয়ম মেনে হলেই হল। এখানে কারো হস্তক্ষেপ করা তার প্রাইভেসী লংঘন করার মধ্যে পড়ে, ব্যক্তি স্বাধীনতা খর্ব করার মধ্যে পড়ে। মানুষ জন্মসূত্রেই সাধারণত বাবা-মার ধর্মের অনুসারী হয়। কিন্তু তার মানে তাই না যে, তার ধর্ম পরিবর্তন করা অধিকার নাই? সবাই সবার সিদ্ধান্ত মোতাবেক মাধ্যম বেছে নিতে পারে, অন্তত সেই অধিকার তার আছে! সেটা যার যার নিজস্ব অধিকার। জন্মসূত্রে হিন্দু হওয়ায় হিন্দু ধর্ম নিয়ে তো লাফালাফি করার মানে নাই! মুসলমান ঘরে জন্ম নিলে মুসলমান হতামকিন্তু তখনও আমার পাদুখানা বাংলার মাটিতে থাকত, তখনও তো আমি বাংলাদেশীই থাকতাম! একটি রাষ্ট্র্রের তার রাষ্ট্রপরিচালনা নীতিতে সেই ব্যক্তিগত বিষয় (“ধর্ম”) কে বেধে দিবে কেন? রাষ্ট্রের মূলনীতিকে বিবেচ্য হবে “জাতীয়তাবোধ”, “দেশপ্রেম”। সেখানে ধর্মবোধকে সংযুক্ত করা কি অপ্রাসঙ্গিক নয়? আমি আগেই বলেছি “ধর্ম বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাব-মা (জন্মসূত্রে) -সূত্রে প্রাপ্ত [যদিও বীর্যের মধ্যে ধর্ম লিখা থাকে না], আর জাতীয়তা দেশ-সূত্রে অর্জিত। সেখানে দেশের পরিচালনা-নীতিতে বাবা-মা থেকে প্রাপ্ত বিষয়টিকে নিয়ে না আসাটাই কি যুক্তিযুক্ত নয়? একথা অনস্বীকার্য যে, সবাই যে যে ধর্মের অনুসারী তার প্রতিই বায়াস থাকবে। আমিও একটি বিশেষ ধর্মের বলে সেই ধর্ম নিয়ে কথা বলছি এটা এখানে ভাবার কোন কারন নেই। আমি কোন বিশেষ ধর্ম নিয়ে কথা বলছি না, বলছি রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা নিয়ে, রাষ্ট্রের “ধর্ম বিষয়কে” উপেক্ষা করা নিয়ে। আমি নিজে সঠিকভাবে ধর্ম পালন করি বলে মনে করিনা। আমরা যারা এই ব্যাপারটা নিয়া বাড়াবাড়ি করছি তারাও সবাই ঠিকমত নিজেদের ধর্ম পালন করে বলে মনে করি না। আমরা যেখানে নিজেদের ধর্মপালনে মনোযোগী নই, সেখানে একটি বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্র পরিচালনা নীতিতে সংযোজিত করা কতটা সমীচিন? দেশের একজন ভিন্ন ধর্মালম্বীর রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম!!!! আজকের এই বাংলাদেশে যদি অন্য ধর্মালম্বীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হত এবং সংবিধানের শুরুতে যদি সবাইকে তাদের ধর্মের মন্ত্র পড়ানো হত তখনও আমি এর তীব্র বিরোধীতা করতাম। একজন নির্দিষ্ট ধর্মের নাগরিক যখন চায় যে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম থাকুক তার ধর্ম, তার এটা ও মনে রাখতে হবে, একজন অন্য ধর্মালম্বীরও  তার মত অধিকার আছে রাষ্ট্রধর্ম তার ধর্ম চাওয়ার। এখন সবার মতামতকে রাখতে হলে প্রত্যেক দলের জন্য আলাদা সংবিধানের ভার্সন করতে হবে। সেটা কি সমীচিন হবে? সবোর্পরী বলব ধর্ম একটা ব্যক্তিগত ইস্যু, এটাকে কনস্টিটিউটে না আনাটাই উচিত। যখন দেশের কথা আসে তখন আর তা শুধু একটি বিষয়ের উপর বা কারো ব্যাক্তিগত ব্যাপার থাকে না। এখানে সবার সমান প্রাধান্য থাকে, একটা “সমমনা এজেন্ডা” থাকে, বলা হয় ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে একই লক্ষ্য এগিয়ে যাওয়া। ব্যক্তিগত ব্যাপার গুলো ব্যাক্তি পর্যায়েই থাকা উচিত। আর ব্যাক্তিগত ব্যাপারগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র সকল ধর্মালম্বীদের।  রাস্ট্র কখনোই কোন ধর্মের লোকজনদের ধর্ম পালনে কোন নির্দেশনা দিতে পারেনা। রাষ্ট্রের জন্য তো ধর্ম নয়, মানুষের জন্য ধর্ম, সুন্দর আর শান্তির জন্য ধর্ম।  একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবসময় মত, দল, ধর্ম নির্বিশেষে সবকিচুর উর্দ্ধ্বে উঠে নীতিমালা প্রণয়ণ করা উচিত। “ধর্ম ব্যক্তিগত আর রাষ্ট্র সামগ্রিক”

৪.

আমার এক মুসলমান বন্ধুর কাছ থেকে শুনেছি, প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ (PUBH) মদিনার সনদে ধর্মঘনিষ্ট কোন শব্দ ব্যবহার করেননি, কারন সেখানে অন্যান্য ধর্মমতের অনুসারীরাও ছিলেন বলে। একটা দেশ কখনও ধর্ম দিয়ে চেনা উচিত না, চেনা উচিত তার জাতি দিয়া। আর জাতি গঠিত হতে পারে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষ নিয়া। তাই শুধু সংখ্যাগরিষ্ট হওয়ার কারনে কোন ধর্মকে রাষ্ট্রীয় করা উচিত না। একজন ব্যক্তি ধর্ম নিরপেক্ষ না হইলে বড় জোর পরিচিত দুই একজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু একটা রাষ্ট্র যখন বলে বসে, আমার ধর্ম ইসলাম, সেই মুহুর্ত থেকে ঐ দেশের বাকি সকল ধর্মের মানুষ “দ্বিতীয় শেণ্রীর নাগরিক” এ গণ্য করা হয়। একটা জাতি বা রাষ্ট্র তখনই সৃষ্টি হয়, যখন কিছু মানুষ একটা “common” বা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ধারনা/বিশ্বাস নিয়ে গড়ে উঠে। “বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান- সবোর্পরী আমরা সবাই বাঙ্গালী”-এটাই আমাদের কমন এজেন্ডা, সমমনা চেতনা। গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের মুল দায়িত্ব তার সকল নাগরিককে সমান গুরুত্ব সহকারে পরিচালনা করা। কিন্তু রাস্ট্র যদি নিজেই জনগণকে পৃথক “আমি মুসলিম” বলে পৃথক করে দেয়, তাহলে সমতা রইল কোথায়? আমরা তো কোন বিশেষ পরিচয়ে মুক্তিযুদ্ধ করিনি। “হরে কৃষ্ঞ” বলে বা “আমরা ইসলামী” দিয়ে তো নয়। আমাদের এক কমন জাতিসত্ত্বা দিয়ে, সমমনা দেশপ্রেম দিয়ে, আমাদের জাতিগত চেতনাবোধ- মূলত “বাঙ্গালীত্ব” কে ধারণ করে। “আমদের আগে জাতীয়তাবোধ, তারপরে ধর্ম” রাষ্ট্রের সংবিধান রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসের লিখিত রুপ। সংবিধান রাস্ট্র পরিচলনার মুলমন্ত্র। সেই লেখাতে বাংগালী পরিচয়ই মুখ্য, ধর্ম নয়। “সেক্যুলারিজম” এখানে এই জন্যই গুরুত্বপূর্ন। এর মাধ্যমে আমি আমার কমন দৃস্টিভঙ্গি “বাংগালীত্ব”নিশ্চিত করি এবং সেই সাথে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকদের সমঅধিকার প্রাপ্য বলে সবাইকে স্বীকৃতি দেই। সবোর্পরী যদি সত্যিই আমাদের দেশকে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, সবার জন্য সমান অধিকার বাংলাদেশের মুল লক্ষ্য হয়, তাহলে রাষ্ট্রধর্ম নির্ধারণ করা কখনই নিরপেক্ষ নয়, সেটা অবশ্যই পক্ষপাতদুষ্ট। “ধর্ম হবে যার যার, রাষ্ট্র সবার”

৫.

ধর্মনিরপেক্ষতা কিন্তু ধর্মহীনতা নয়! তাছাড়া অনেকে বলেন সেক্যুলারিজম ( Part of capitalism ideology) আর নিরপেক্ষতা একই জিনিস। সত্যিকারার্থে “সেক্যুলারিজম” “’Neutralization regards of any religion” নয়! সেক্যুলারিজম হল: “The belief that religion should not be involved in the organization of society , education etc” [6]; অথবা, “Encarta dictionary: exclusion of religion from public affairs” [7]. এই ধর্মনিরপেক্ষতাটাকে “ধর্মহীনতা” বলে দেশের বৃহৎ অশিক্ষিত/অর্ধশিক্ষিত জনগোষ্ঠিকে উস্কানি দেয়ার তাই কোন মানে হয়না। রাষ্ট্র মানুষের ধর্ম পরিচয় দেখবে না, রাজনৈতিক কারনে ধর্মের অপব্যবহার করা যাবে না, এবং ধর্মের কারনে কাউকে বঞ্চিত করা হবে না কোনো নাগরিক অধিকার থেকে। এই বিষয়গুলোকে এক ভাষায় ধর্মনিরপেক্ষতা বলে, যেখানে রাষ্ট্র ধর্মবিশ্বাসের পরিচয় না খুঁজে মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিবে এবং তার নাগরিক অধিকারকে শ্রদ্ধা করবে। প্রকৃতপক্ষে, হিন্দু, ইসলাম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান হল “ব্যক্তিগত”, সেক্যুলারিজম হল “সমাজগত”!

“রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম” আর “ইসলামী রাষ্ট্র” এক কথা নয়। “ইসলামী রাষ্ট্র” মানে যে রাষ্ট্রে ইসলামী শরিয়া মোতাবেক শাসন ব্যবস্থা চালু আছে। সেখানেও অন্য ধর্মের মানুষ বসবাস করার অধিকার অর্জন করলেও তাদেরকে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা নীতি মোতাবেকই চলতে বাধ্য করা হবে! “ডেমোক্রাসী এডমিনিস্ট্রিসন সিস্টেমে” যা কখনই পড়ে না!! আর “রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম” মানে ওফিসিয়ালী জাতিকে বলে দেওয়া যে, রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারী অথবা কখনও কখনও পৃস্ঠপোষক। আর “সেক্যুলারিজম রাষ্ট্র” হালো রাস্ট্র তার নাগরিকের ধর্ম বিশ্বাসের উপর হাস্তক্ষেপ করবেনা, এই নীতির একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মের পৃষ্টপোষক হলে এই হস্তক্ষেপের সুযোগটা থেকেই যায়!! একটি গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্তায় এই সুযোগ দেয়াটা কতোটুকু যুক্তিযুক্ত? আমাদের দেশে “রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম” থাকলে হয়তো “ইসলামী রাষ্ট্র” হয়ে যাবে না ঠিকই, কিন্তু এই সুযোগের দ্বারটা খুলে দেয়াটা কি সমীচিন? দুজন ভিন্নধর্মালম্বী মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের প্রার্থনার একান্ত সময়টুকু বাদ দিলে, জীবন সংগ্রামে আর কোন পার্থক্য পাওয়া যায় কি? বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই এতোদিনে ধর্মচিন্তা বাদ দিয়েছে, এশিয়াতেও আশাকরি মানুষ বুঝবে জীবনে আসলে পার্থক্য আনার চেয়ে ভালবাসা আনা বেশি জরুরী। সংবিধানে ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন যাই রাখা হোক না কেন তাতে বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক অবস্থা পরিবর্তনে কি আসবে আর যাবে।

৬.

আওয়ামালীগ এতে সম্মতি দিচ্ছে নিশ্চিতভাবেই নিজেদের আখের গোচাতেই! আমার জানামতে আওয়ামিলীগের গঠনতন্ত্রেও রাষ্ট্রধর্মের কোন উল্লেখ নেই। নির্বাচন এলে আওয়ামীলীগ তো অবশ্যই, পারলে কমিউনিষ্ট পার্টিও ধর্ম বেচে ভোট পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করবে না। এত সহজে ভোটের ধানভরা জমিন দখলে নেওযার সুযোগ আর কিসে পাওয়া যেতে পারে? ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী তো এর উপর ভর করেই জীবিত! বাংলাদেশের মেজরিটিই গ্রামবাসী, দারিদ্রসীমার নিচে। আমি নিজে যখন বন্ধুদের নিয়ে গ্রামে যাই, তখন দেখি আমার শিক্ষিত বন্ধুরা গ্রামের সহজ-সরল লোকদের খুব সহজেই প্রভাবিত করে ফেলতে পারে। যাই বলে, তারা তাই বিশ্বাস করে নেয়, সেখানে সরলতা তাদেরকে বিট্রে করে। আমাদের রাজনীতিবিদরা এই সুযোগকে কাজে লাগায়। ধর্মকে পুঁজি করে ব্যবসা করাটা খুব সহজ হয়ে যায় তখন! বাংলাদেশে কারন প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্যই ধর্ম একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এর সঠিক ব্যবহার তারা করবেই। ভোটের আগে দুই নেত্রী পাল্লা করে মাথায় কাপড় দেয়া শুরু করে – ধর্ম বলতে সম্ভবত আমাদের নেতারা এবং একটা বিশাল অংশ শুধু এটুকুই বুঝি। মৌলবাদীরাতো তো এ সুযোগের উপরই নির্ভরশীল।

যদি রাষ্ট্রই ধর্মনিরপেক্ষ না হয় তাহলে কিভাবে ভিন্ন ধর্মালম্বী দুটি বন্ধু ধর্মনিরপেক্ষভাবে কাজ করবে?? এভাবে দেশকে কতটুকু সহায়কভাবে সাম্প্রদায়িকহীন পদ্ধতিতে এগিয়ে নেয়া সম্ভব? সম্ভব তো হবে কেবল একই চক্রে বারবার পাক খাওয়া। সর্বশেষে এটাই বলব, রাষ্ট্রকে ধর্মমুক্ত রাখা হোক, অর্থাৎ ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে যত দূরে পাঠানো হবে ততই তো মঙ্গল, সেটা হওয়া উচিত সময়ের দাবী। শুভত্ব আর শুদ্ধতা দিয়েই ঋদ্ধ হোক সকলের জাতীয়তাবোধ।

৭.

আরেকটি কথা, নতুন সংবিধানে, নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশী’ ঠিক থাকবে। তবে জাতীয়তাবাদ ‘বাঙালি’ হবে। আবার জাতির পিতা হিসেবে শেখ মুজিবের নাম বহাল থাকবে। জাতীয়তাবাদ বাঙালি মানে তো সকল বাঙালি, সেখানে পশ্চিমবঙ্গ, পূর্ববঙ্গ সবাই ইনক্লুডেড। বাঙ্গালি জাতির ইতিহাস তো ৪০ বছরের নয়, সেটা হাজার বছরের। এই হাজার বছরের ইতিহাসে অনেক সুযোগ্য ব্যক্তিত্ব আছেন, সকলকে কি বিবেচ্য করা হযেছে? নাকি শুধূ ১৯৭১ পরবরর্তী সময়কালীন বাঙ্গালীদেরই সম্পৃর্ক্ত করা হয়েছে?? ব্যক্তিগতভাবে তো, আমি জাতীয়তা “বাংলাদেশী” থাকার পক্ষে!

পরিশেষে কবিগুরুর গীতালী কাব্যগ্রন্থের [8] কয়েকটি চরণ দিয়েই শেষ করছি:

মোর মরণে তোমার হবে জয় ।
মোর জীবনে তোমার পরিচয় ।
মোর দুঃখ যে রাঙা শতদল
আজি ঘিরিল তোমার পদতল,
মোর আনন্দ সে যে মণিহার
মুকুটে তোমার বাঁধা রয় ।
মোর ত্যাগে যে তোমার হবে জয় ।
মোর প্রেমে যে তোমার পরিচয় ।
মোর ধৈর্য তোমার রাজপথ
সে যে লঙ্ঘিবে বনপর্বত,
মোর বীর্য তোমার জয়রথ
তোমারি পতাকা শিরে বয় ।।

[গীতালী, ১৯১৪]

–এই পতাকা শিরে থাকুক সকল বাংলাদেশীর, আর সেটা হোক সমান জাতীয়তাবোধে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, সকলের শুভকামনায়!

তথ্যসূত্র:

1. Manabjomin, 16 Feb, 2011 [http://www.mzamin.com/index.php?option=com_content&view=article&id=2964:2011-02-15-16-43-05&catid=48:2010-08-31-09-43-22&Itemid=82].

2. Bangladesh statistical info system, Bangladesh statistical board.

3.Bangladesh Constitution and its context, Khijir Khan.

4.Prothom Alo, June, 2010

5. Wikipedia, “India”

6. Oxford dictionary

7. Encarta dictionary

8. Gitali, Rabindranath Tagore, 1914.

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

You must be logged in to post a comment Login