সকাল রয়

রুদ্রকিরন

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

এক

রুদ্রর সাথে ওটাই ছিলো আমার শেষ দেখা।
এরপর পুনরায় দেখা হবার উপায় হয়তো একটা থাকতো, কিন্তু সেই পথটা ও নিজেই বন্ধ করে দিয়েছিলো। সেই একবার আবছা-আবছা দেখা হয়েছিল, এরপর আর কোনদিন ও আমার সামনেই পড়েনি।
আমারও যে তখনকার দিনগুলিতে ওকে খুব একটা বেশি দেখতে ইচ্ছে করতো তা নয়, তবে অনেকদিন কেটে গেলে হঠাৎ-হঠাৎ ওকে খুব দেখতে ইচ্ছে করতো, কিন্তু ? এই চোখ সে আশা ধরে রেখে রেখে এখন ক্লান্ত হয়ে গেছে।
আনন্দের পানি দিয়ে সব ধুয়ে মুছে দিলেই কি, দুঃখের পথ পরিষ্কার হয়ে যায় ? হয়তো কিছুটা হয় পুরোটা কখনোই হয়না, কিছু অতৃপ্ততা খুব করে তৃষ্ণা জাগায় জ্বীবের ডগায়, আর আফসোসের সুর তোলায়।
এমনি আফসোস আজকাল খুব জাগে- আহা! এই বর্ষায় রুদ্রকে যদি একটিবার দেখতে পেতাম?

বর্ষা গুলো হ্যাংলাটে ছেলের মতো আসে আবার চলেও যায় কিন্তু রুদ্র আর আসেনা !
আমরা ভালো বন্ধু ছিলাম, খুব কাছের যে বন্ধু তাও নয়, আবার খুব দুরের যে বন্ধু তাও নয়- ঠিক দু’য়ের মাঝামাঝি। আমাদের মাঝে কোন সূচীপত্র ছিলোনা যে, বেছে বেছে অধ্যায়ন করবো। আমাদের মাঝে মিলের চেয়ে অমিল ছিলো বেশি অনেকটা আকাশের নক্ষত্রের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে
আমি ওকে ভালোবাসতাম! এটা লোক দেখানো কিংবা তাজমহল নির্মান করবার মতো ভালোবাসা নয়, এটা সিনেমার কোন রোমাঞ্চকর দৃশ্য কিংবা অতি বিরহ কোন ভবঘুরের প্রেমের মতো নয়, এই ভালোবাসা অনেকটা অদৃশ্য ভালোবাসার মতো।
মেডিটেশন অবস্থায় ওকে কখনো ভাবিনি, হিমালয় পেয়ে গেছি, কিংবা ওকে ছাড়া এই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে! আমার এমনটা কখনো মনে হয়নি। রোদ্দুর দেখে কি মেঘের হিংসে হয়? তার কি অভিমান জাগে? আমি জানতাম জমে থাকা কষ্টটা ভুলতে পারবো ও পাশে থাকলে; যখন ওর কথার তরীতে নিয়ে আমাকে ভাসাবে তখন আমি ভুলে যাবে ফেলে আসা কষ্ট গুলোকে। ওকে ভালোলাগা থেকে মুছে ফেলা হয়ে উঠেনি হয়তো উঠবেও না তবুও বলা যায়না এটা গতানুগতিক ভালোবাসা। অদৃশ্য কিংবা -বাস্ লে বাস, না বাসলে গলায় দে গিয়ে ফাঁস! এমন ভালোবাসাও নয়, এটা ছিল “আমি অন্তর রেখেছি ধরে সেখানে স্বপ্ন দিবি ভরে” এই স্বপ্ন বেঁচে থাকার স্বপ্ন, সিঁড়ি বেড়ে উঠার স্বপ্ন এই স্বপ্ন কাঁদবার জন্য নয়, এই স্বপ্ন ওকে যেন কখনো দেবদাশ করে না তোলে আমি শুধু তাই চাইতাম।
ওর কোন কিছুতে আসক্তি নেই; না পেলে কখনো হতাশা পাখায় বাতাস করতো না, তবে কষ্ট দেয়ালের সবকিছুতেই একটা অভিমান ওর থাকতো, কিন্তু সেটা খুব যতনে লুকিয়ে রাখতো; পাছে কেউ ওকে ভুল বুঝে সেটাতেই ছিলো ওর ভয়, আর সেই ভয় থেকেই হয়তো শেষের দিকে সিঁটিয়ে গিয়েছিলো।

আমার আরও একটা প্রাণপ্রিয় বন্ধু ছিলো সে হলো কিরন;
প্রাণ প্রিয় বলার একটা কারণ দাড় করানো যেতে পারে, আমি যখন প্রথম মন খারাপের দিন গুলোর উপস্থিতি টের পেতে শুরু করি সেদিন থেকেই আমি ওকে সাথে পেয়েছিলাম, কলেজে ওই ছিলো আমার সহপাঠি প্লাস বন্ধু আমি ওর উপর নির্ভরতার খাতা খুলে দিতে পেরেছিলাম, শেয়ার করবো যে কথা সেটা পেটে রাখা আমার জন্য দায় হয়ে দাড়াতে আমি তাই ওর কাছে শেয়ার করতাম তাই হয়তো আমার এই নির্ভরতায় কেউ কেউ বলে ফেলতো আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধু কিরণ।
কানাইখালি মার্কেটে আমি কখনোই যেতাম না ওখানে আমার যাওয়া পড়তো না কিন্তু তার ঠিক পাশেই নিচা বাজার সেই পথ ধরেই আমার ছিলো পথচলা আমার ঘুম চোখা সেই অবস্থায় যেতাম প্রতিটি সকালেই জিয়া স্যারের পড়া খতম করতে। আমার ঘুম চোখ কিরণের কখনোই এড়াতো না
-কালরাতে ঘুমাসনি, জেগে তারা গুনেছিলি বুঝি?
– হতচ্ছাড়ার সাথে কাল আবার এক পশলা ঝগড়া করেছে; সেই ঝগড়া দিয়েই তো রাত কাবার
-কেন রে? তুই না বলেছিলি ও,তোর অ্যানপারালেল্ড ফ্রেন্ড
ও সত্যিই আমার অন্যরকম একটা বন্ধু ছিলো। পথচলতি সময়ে পথ ফেরিতে লোকের তো অভাব নেই আমাদেও পথ আলোচনা দেখে লোকের চোখ তো হেডলাইট হয়ে যেতো তখন, জ্বলছে তো জ্বলছেই আমরা তখন ইংরেজির কেচ্ছা খতম করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু করেছে মাত্র।

দুই

আমি খুব বন্ধু পাগল ছিলাম। এক সকালে হতচ্ছাড়া আমায় প্রণিপাত করে বললো কথা বলতে পারি মনস্বিনী? হতবাক হবার রেশ লাগলো মনে বলে কি? আমি নাকি স্থিরচিত্তা কখনো থেকেছি বলে তো মনে হয়না। আমার অভিমানের ঝুলি তো অনেক বড় ‘ছোট ঢেউ গুলো হয়তো আলতো শিহরন দেয় কিন্তু বড় ঢেউগুলো সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়’ অভিমানের ঢেউ কখনো কখনো কষ্টের কারন হয়ে দাড়ায়?
এ জীবনে কত হাজার বার যে অভিমান হয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না, কিন্তু এক্ষেত্রে ও ছিলো ঠিক উল্টোটি- শীতল পাটি, মনে হয় এক ঘড়া পানি ঢেলে দিলেও এক ছটাক রাগ ওর মাথায় উঠবে না।
তবে একটা বিষয় ভাবায় ওর বন্ধুরা বলতো ওর রাগ পারভেসিভ রাগ, ওর কোন্ বন্ধুর পেটে নাকি একবার ছুড়ি ঢুকিয়ে দিয়েছিলো।
ও প্রায়ই বলতো আমার স্বপ্নগুলো জারমিন্টে হওয়ার আগেই তুই পরিনীতা হয়ে যাবি আমাকে তখন তোর পোষ্টার মনে হবে; ভিজে যাওয়া কিংবা রং উঠা একটা পোষ্টার শ্যাওলাপড়া দেয়ালে যেমন ঝুলে থাকে। আমার জীবনে ওর প্রবেশ হবার পর থেকেই হয়তো আমি একটু বদলে ছিলাম কিন্তু কতভাগ ভালোর প্রভাব পড়েছিলো আমার উপর কিংবা কতখানি সমস্যাগ্রস্থ হয়েছিলাম আমি সে কথার আলোকপাত নাইবা করলাম, ও তো আমার বন্ধু ছিলো যদিও ও দেখাতো ওর বারদরিয়া শূন্য কিন্তু আমি তো জানতাম ভেতর বাহিরের পুরোস্থান জুড়েই আছে অসামান্য ধারণ ক্ষমতা।

আমি সবসময়ই নিয়মতান্ত্রিক ভাবে চলতাম আর ও ছিলো নিয়ম ভাঙ্গাদের দলে। রিলাই না থাকলে আকড়ে ধরে থাকা যায় না।
অনিয়ম ভাবে কি কাউকে ভালোবাসা বা আঘাত করা যায়? অন্তত আমার অভিধানে এটা ছিলোনা। আমি বেছে বেছে স্বপ্ন দেখতে পারতাম না ষ্টাডি করে টুইন-টাওয়ারের মতো দাড়িয়ে যাবো সেই ছিলো আশা, আর ওর এ জাতীয় চিন্তা ভাবনার খাতায় শুন্য আকাঁ থাকতো।
ক্যালকুলেশন করে জীবন চালানো যায় না, কিন্তু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গেলে এদিক-সেদিক হবেই।
স্ত্রৈন হবে এমন কোন পুরুষ আমার জীবনে কখনো আসুক তা কখনোই চাইনি, আর যাই হোক, যার যার আকাশে যার যার নিজস্ব গতিপথ থাকবে, আমার উপর রুদ্র-কিরণের রোদ বৃষ্টির মতো দুরন্ত অভিমান হোক সেটা কখনোই চাইতাম না। ফেলে আসা সে দিনগুলো স্বপ্নের মতো কাটছিলো না, অনেকটা উৎকণ্ঠায় কাটছিল !! কিরণ এক বিকেলে ভনিতা নিয়ে বললো আমার সাথে প্রেম করবি? আমি বললাম প্রেম কি বলে- কয়ে হয় নাকি ওটা এসে যায়,- বাসা বেধেঁ যায়, চিত্রনাট্যের প্রেমে মিলন হয় আশি পার্সেন্ট আর বাস্তবে ষাট পার্সেন্ট।
আমি কিরণের কথায় সায় দিলাম না। অতিরিক্ত প্রসাধনীতে যেমন র‌্যশ হবার সম্ভবনা থাকে তেমনি অতিরিক্ত মাখামাখি সম্পর্ক গুলো বন্ধ হয়ে যায় লজ্জাবতী পাতার মতো।
রুদ্রর এক কথা, ‘ভালো বন্ধু জীবন সঙ্গী হলে সেখানে সেক্রিফাইস থাকে বেশি’ তবে মানুষের মন তো পরিবর্তন আমি ভয়টা পাই সেখানে রেডিমেট ভালবাসার র‌্যাপচারটা বেশিদিন থাকেনা।

নিজের কথাই যদি বলি- যদি দিনপঞ্জি খুলি, দেখবো সতৃষ্ণ পুরুষ আছে চর্তুদিকময়। ভালবাসার উপসংহার করতে যাবো সেখানে আমার দিনপঞ্জির পাতায় আছে বেশক’টা আহবান; আর আমার প্রত্যাখ্যানও আছে বেশকটি।
রুদ্র কথার বেড়াজালে আমাকে মাঝে মাঝে খুব কষ্ট দিতো আমি খুব কষ্ট পেতাম যখন ও নিজেকে ইনইফিশেন্ট ভাবতো; ও আমার বন্ধু কেন নিজেকে এমন ভাববে? রুদ্র মাঝে-সাঝে বলতো আহা! আমার যদি একটা আকাশ থাকতো সেখানে কত,না ছবি আঁকতাম, “তুই আমার আকাশ হবি”
– আমি আকাশ হলে তোর খুব লস্ হবে?
– কেন?
– তুই আঁকবি। আমার মন চটে গেলে বর্ষন দিয়ে সব মুছে ফেলবো।
দিন গেছে। সেইসব দিন আর ফিরবে না। আমাদের কোন সোনা-কিংবা রুপোর খাঁচা নেই যে দিনগুলোকে তুলে রাখবো। আমি নিউ জেনারেশন নিয়ে ভাবতাম আর হতচ্ছাড়ার ভাবনায় তখনও সত্তুর দশক। যখন একুশ শতক নিয়ে মাতোয়ারা হবো তখন ও পড়ে আছে মান্দাতা আমল নিয়ে।
কোন উৎসব কিংবা কোন আয়োজনে আমরা যখন আনন্দ শেয়ার করতাম সবাই মিলে, সেখানে পরিবারের সদস্য, বন্ধুরা, পাড়াপড়শিরাও সবাই থাকতো কিন্তু রুদ্র থাকতো না গভীর গোপনে অজানা অভিমানে আড়ালেই থেকে যেতো বিষাদের ছায়া পড়তো আমাদের গায় মাঝে মাঝে তাই এড়িয়ে যেতে চাইতাম কিন্তু যখন দেখতাম হঠাৎ অভিমান শূন্য হয়ে দাড়াতো সামনে তখন ফেরাতে পারতাম না। কিরন আমার সাথে কথার রেশ ধরেই অভিমান করতো আবার মিশতে গিয়ে আপত্তি তুলতো আমি রাগের মাথায় ঝাড়তাম কিন্তু পরক্ষণেই আমি ডাকতাম।

তিন

পুটিয়া কিংবা মহারাজার রাজপ্রাসাদ গুলোতে আমি অনেক বেড়িয়েছি; শহুরে হয়েও গ্রামের পথ কম মাড়াইনি সবুজ বনভূমি নিয়ে চোখের মাঝে কিংবা ফুরফুরে হাওয়া গায়ে মেখে গ্রামের বাড়ি যাবার সময়টাকে খুব এনজয় করতাম কেননা সে পথটা যেতে হতো রেলগাড়িতে, আমি তখন একাই চলে যেতাম রুদ্র বলতো এক দুপুরে তুই আমার সাথে রেলগাড়িতে চাপবি দু-জন মিলে সারা পথ কথা বলতে বলতে পথ পাড়ি দেব। ওর সেই ইচ্ছে গুলো ইচ্ছেই থেকে গেছে পূর্নতা পায়নি।
কিরণ আমায় নিয়ে কখনোবা আশপাশটায় সব সৌন্দর্যের পুকুর গুলোতে মাঝে-সাঝেই ডুব দিতো কিন্তু রুদ্র তার কানাকড়িও পায়নি হয়তো পেতো কিন্তু আমিই তখন অগোছালো ছিলাম তাই…………….

একবার ও আমার খুব কাছে চলে এলো রানী ভবানীর সদর দরজায়। আমি ভাবলাম চোখের তৃষ্ণা একটু মিটুক কখনোই তো প্রাণপূর্ণ ভাবে দেখিনি, এ চোখ শুধু ওকে নিরস পটেই দেখেছে। আমি সেদিন সামান্য প্রসাধনী নিলাম মুখে, হয়তোবা এক-আধটু কাজল, একটা একরঙা জামা। রুদ্র কালো আর আকাশি কালার লাইক করতো। সব প্রস্তুতি শেষ করে বেরুতে যাবো অমনি মা, এসে বাগড়া দিলো
দেখা হয়নি; দূর্বা গুলো ওকে নিয়ে দাড়িয়ে ছিলো দুপুর থেকে সন্ধ্যে অবদি আমার পা ওই দূর্বাতে পড়েনি। আমি খুব অস্থিরতা নিয়েছিলাম বুকে, আমার বাঁধভাঙ্গা কান্না সেদিন শাওয়ারের পানিতে মিশে গিয়েছিলো।
ওর প্রথম বেলাকার কথা -আমি আপনার বন্ধু হতে চাই, জানিনা ভালো বন্ধু হতে পারবো কি-না তবে আপনার ফেলে দেয়া কথাগুলোকে ঘুড়ি করে আকাশে উড়াতে পারবো।

কিরণের সাথে প্রথম যেদিন কথা হয়ে ছিলো তখন ভাবতেই পারিনি ও একদিন আমার এতো ভালো বন্ধু হয়ে যাবে। আসলে ভাবতে না পারা বিষয়গুলো মাঝে মাঝে কারো কারো প্রিয় হয়ে উঠে আর সেটাই হয়তো আমার হয়ে ছিলো।
রুদ্র’র কথায় হয়তো আমার সেদিন মিশ্র অনুভূতি হয়েছিলো, আমি কেন-যেন সেদিন কিছু না ভেবেই মেনে নিলাম আর যাই হোক একসময় ওকে আমি আমার অনুভূতিতে যে মিশিয়ে ফেলবো সেটা বুঝতে পারিনি। রুদ্র বলতো আমরা হবো রাতভর তারাদের সঙ্গি, ঝি ঝি কিংবা জোনাকির সাথে আমরা অনুভূতি ভাগ করবো ভাবনাগুলো ফোরসফুল ছিলো কিন্তু সেটার বিবর্তনটা ছিলো ভয়াবহ।
ও আমাকে কষ্ট দিয়েছে। আমি কখনোই ধৃতমতী ছিলাম না। তাই ওর সামান্য কাব্যময় কথা গুলোকে নিজের উপর এপ্লাই করতাম আর কষ্ট পেতাম।
রুদ্র’র এক কথা আমরা বন্ধু-আমরা হলাম একটি মুদ্রার এপিট-ওপিট যাই ঘটুক না কেন আমরা দুজনেই সমান ভাবে তা অনুভব করবো। হয়তো তাই হয়েছে আমি এখন অনুভব করি। রুদ্র’র মাঝে অদ্ভুত কিছূ একটা ছিলো, যেমন আমি ওকে মনে করতে গেছি ঠিক তখনই ওর ফোন! আমি কেন সমস্যায় পড়ে গেছি সমাধানে কাছের বন্ধুরা কিংবা ফ্যামেলীর লোকেরাই এনাফ কিন্তু আমার টেনশন বাড়বে সেই জন্য ওকে বলতেই আমাকে ভরসা দিতো রাশি রাশি। আমি ভাবতাম কাজ হবেনা কিন্তু কাকতালীয় ভাবে সেটাই হয়ে যেত… সবার ভীড়ে সরল স্বীকারোক্তি দিয়েই সবার মাঝখান থেকে ও যেমন উঠে এসেছিলো তেমনি আঁধারের মতো রাত ফুরাবার আগেই ও হারিয়ে গেলো।

আমরা সবকটা ঠিক দাড়িয়ে গেছি পাহাড় চূড়ার মতো একেকজন হোমরা-চোমরা ব্যাক্তি হয়ে গেছি-সংসারের ভরা আঙ্গিনায় আমাদের সাফল্য আজকাল অনেককেই ঈর্ষান্বিত করে, কিন্তু রুদ্র? এই প্রশ্নটা তাড়িয়ে নিয়ে গেছে আমাকে দিনের পর দিন; ও কি দাড়াতে পেরেছে? আমার সাথে ওর কি কখনো ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিলো? পুড়ে যাওয়া কাঠ কয়লাকে কতবার পোড়ানো যায়? তার শেষ চিহ্ন পর্যন্ত হয়তো!! হয়তো বুকের মাঝে গভীর সমুদ্র নিয়ে নদীর ধারে বাসা বেধেঁ ছিলো; হয়তো ভেবে ছিলো ঝরনা হয়ে পাহাড় থেকে একবার যখন নেমে পড়েছে তখনতো আর পাহাড়ে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবেনা তাই থেকে গিয়েছিলো আমাদের মাঝে। এমনও হতে পারে আমাদের মাঝে খুজে পেয়ে ছিলো ওর সমস্ত চাওয়া; হতে পারে আমরাই ছিলাম ওর অনুভূতি শেয়ার করার একমাত্র জানালা।
জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় মাঝে মাঝে সবকিছু ফেলে দিয়ে ভাবতে বসে যাই ওর শেষ কথা গুলো। খুব মনে পড়ে। সেই দিনগুলো আজকাল ডায়েরির পাতায় বন্দি হয়ে আছে আর সেই সাথে ওর স্মৃতি কলমের কালিতে মিশে আছে। বন্ধুরা প্রায় সবাই এখনও চারপাশেই আছে কিন্তু সেই উদাস বন্ধু রুদ্র নেই!!
কোথায় আছে রুদ্র? কেমন আছে রুদ্র?

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


26 Responses to রুদ্রকিরন

  1. rabeyarobbani@yahoo.com'
    রাবেয়া রব্বানি মে 19, 2011 at 4:28 অপরাহ্ন

    আনন্দের পানি দিয়ে সব ধুয়ে মুছে দিলেই কি, দুঃখের পথ পরিষ্কার হয়ে যায় ? হয়তো কিছুটা হয় পুরোটা কখনোই হয়না, কিছু অতৃপ্ততা খুব করে তৃষ্ণা জাগায় জ্বীবের ডগায়, আর আফসোসের সুর তোলায়।
    এমনি আফসোস আজকাল খুব জাগে- আহা! এই বর্ষায় রুদ্রকে যদি একটিবার দেখতে পেতাম?

    অসাধারণ!!!!!

    অতিরিক্ত প্রসাধনীতে যেমন র‌্যশ হবার সম্ভবনা থাকে তেমনি অতিরিক্ত মাখামাখি সম্পর্ক গুলো বন্ধ হয়ে যায় লজ্জাবতী পাতার মতো।

    :-bd
    কথক বর্ণনায় গল্পটি আর আপনার কথাশৈলী বাহবার উপেক্ষা রাখে না।খুব সুন্দর আবেগ আর টান দেখতে পেলাম রুদ্রের জন্য গল্পের কথক চরিত্রটির।
    তবে,
    রুদ্র কালো আর আকাশি কালার লাইক করতো
    এই লাইনটি চোখে পড়ল।এখানে লাইনটি কোন কথোপকথন নয়।লেখকের ভাষ্য এখানে ইংরেজী শব্দ একেবারে বেমানান।চরিত্রের মুখে বা কারো কথায় ইংরেজী আসবেই কারন আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি আর মানুষ এভাবেই বলে।কিন্তু লেখক ধারা বর্ননায় এরকম শব্দ বাক্যটিকে হাল্কা করে দেয়।
    বেশি বলে ফেললে ক্ষমা করবেন।
    তবে একটা কথা না বললেই নয় আপনার লেখায় আবেগ জটিল, দারুন। (*) (*) (*) (*) (*)

    • sokal.roy@gmail.com'
      সকাল রয় মে 21, 2011 at 11:42 পূর্বাহ্ন

      যদি ভাবি আমি আকাশের চেয়ে অনেক নিচুতে
      আর চাদটা অনেক উচুতে; তাহলে সেটা উঁচুতেই থেকে যায়
      কিন্তু যদি ভাবি চাদটা আমার হাতের মুঠোয় তাহলে
      চাদটা মুঠোতেই এসে যায়………
      ——————————–এখানে সবাই লিখি আর সেখানে আবেগ থাকলে মনে একটু ধাক্কা খায়। মাঝে মাঝে কাউকে ধাক্কা দিতে ইচ্ছে করে :))

      আবারও ক্ষমা !!
      হুম যদি লেখা পড়ে সরলভাবে মতামত প্রকাশই না করেন তাহলে কিভাবে লিখবো বলুন তো?
      এখানে আমরা লিখি আমরা শিখি এখানে দেখিয়ে দেওয়া মানে দোষের কিছু নয়।

      তাই নো ক্ষমা-টমা ওক্কে
      ভালো থাকুন

  2. নীল নক্ষত্র মে 20, 2011 at 4:52 পূর্বাহ্ন

    কথা, ভাব, বিন্যাস, বাক্যে গঠন সব কিছু মিলে এক কথায় চমত্কার। আমি আবার বেশি বিশ্লেষণে যেতে পারি না, সময়ের ভীষণ খরা চলছে আজকাল। শুধু হাজিরা দেয়া।

  3. mamunma@gmail.com'
    মামুন ম. আজিজ মে 20, 2011 at 6:34 পূর্বাহ্ন

    উদাসী মানুষগুলো সমাজে ধীরে ধীরে অপাংতেয় হয় উঠছে। বেশ শৈলী যুক্ত লেখা। ভালো লেগেছে।

  4. রাজন্য রুহানি মে 21, 2011 at 5:01 অপরাহ্ন

    লেখা তো ভালো লাগলোই, সাথে মন্তব্যটাও। :rose:

    হুম যদি লেখা পড়ে সরলভাবে মতামত প্রকাশই না করেন তাহলে কিভাবে লিখবো বলুন তো?
    এখানে আমরা লিখি আমরা শিখি এখানে দেখিয়ে দেওয়া মানে দোষের কিছু নয়।

    তাই নো ক্ষমা-টমা ওক্কে

    \m/

  5. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী মে 23, 2011 at 7:32 অপরাহ্ন

    লেখাটি স্বতন্ত্র হলেও আমার মন নিচের লেখার বলয় থেকে মুক্ত হতে পারছে না।

    প্রিয় রুদ্র,
    প্রযত্নে, আকাশ
    তুমি আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখতে বলেছিলে। তুমি কি এখন আকাশ জুরে থাকো? তুমি আকাশে উড়ে বেড়াও? তুলোর মতো, পাখির মতো? তুমি এই জগত্সংসার ছেড়ে আকাশে চলে গেছো। তুমি আসলে বেঁচেই গেছো রুদ্র। আচ্ছা, তোমার কি পাখি হয়ে উড়ে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না? তোমার সেই ইন্দিরা রোডের বাড়িতে, আবার সেই নীলক্ষেত, শাহবাগ, পরীবাগ, লালবাগ চষে বেড়াতে? ইচ্ছে তোমার হয় না এ আমি বিশ্বাস করি না, ইচ্ছে ঠিকই হয়, পারো না। অথচ এক সময় যা ইচ্ছে হতো তোমার তাই করতে। ইচ্ছে যদি হতো সারারাত না ঘুমিয়ে গল্প করতে – করতে। ইচ্ছে যদি হতো সারাদিন পথে পথে হাটতে – হাটতে। কে তোমাকে বাধা দিতো? জীবন তোমার হাতের মুঠোয় ছিলো। এই জীবন নিয়ে যেমন ইচ্ছে খেলেছো। আমার ভেবে অবাক লাগে, জীবন এখন তোমার হাতের মুঠোয় নেই। ওরা তোমাকে ট্রাকে উঠিয়ে মিঠেখালি রেখে এলো, তুমি প্রতিবাদ করতে পারোনি।

    আচ্ছা, তোমার লালবাগের সেই প্রেমিকাটির খবর কি, দীর্ঘ বছর প্রেম করেছিলে তোমার যে নেলী খালার সাথে? তার উদ্দেশ্যে তোমার দিস্তা দিস্তা প্রেমের কবিতা দেখে আমি কি ভীষণ কেঁদেছিলাম একদিন ! তুমি আর কারো সঙ্গে প্রেম করছো, এ আমার সইতো না। কি অবুঝ বালিকা ছিলাম ! তাই কি? যেন আমাকেই তোমার ভালোবাসতে হবে। যেন আমরা দু’জন জন্মেছি দু’জনের জন্য। যেদিন ট্রাকে করে তোমাকে নিয়ে গেলো বাড়ি থেকে, আমার খুব দম বন্ধ লাগছিলো। ঢাকা শহরটিকে এতো ফাঁকা আর কখনো লাগেনি। বুকের মধ্যে আমার এতো হাহাকারও আর কখনো জমেনি। আমি ঢাকা ছেড়ে সেদিন চলে গিয়েছিলাম ময়মনসিংহে। আমার ঘরে তোমার বাক্সভর্তি চিঠিগুলো হাতে নিয়ে জন্মের কান্না কেঁদেছিলাম। আমাদের বিচ্ছেদ ছিলো চার বছরের। এতো বছর পরও তুমি কী গভীর করে বুকের মধ্যে রয়ে গিয়েছিলে ! সেদিন আমি টের পেয়েছি।

    আমার বড়ো হাসি পায় দেখে, এখন তোমার শ’য়ে শ’য়ে বন্ধু বেরোচ্ছে। তারা তখন কোথায় ছিলো? যখন পয়সার অভাবে তুমি একটি সিঙ্গারা খেয়ে দুপুর কাটিয়েছো। আমি না হয় তোমার বন্ধু নই, তোমাকে ছেড়ে চলে এসেছিলাম বলে। এই যে এখন তোমার নামে মেলা হয়, তোমার চেনা এক আমিই বোধ হয় অনুপস্থিত থাকি মেলায়। যারা এখন রুদ্র রুদ্র বলে মাতম করে বুঝিনা তারা তখন কোথায় ছিলো?

    শেষদিকে তুমি শিমুল নামের এক মেয়েকে ভালোবাসতে। বিয়ের কথাও হচ্ছিলো। আমাকে শিমুলের সব গল্প একদিন করলে। শুনে … তুমি বোঝোনি আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো। এই ভেবে যে, তুমি কি অনায়াসে প্রেম করছো ! তার গল্প শোনাচ্ছো ! ঠিক এইরকম অনুভব একসময় আমার জন্য ছিলো তোমার ! আজ আরেকজনের জন্য তোমার অস্থিরতা। নির্ঘুম রাত কাটাবার গল্প শুনে আমার কান্না পায় না বলো? তুমি শিমুলকে নিয়ে কি কি কবিতা লিখলে তা দিব্যি বলে গেলে ! আমাকে আবার জিজ্ঞেসও করলে, কেমন হয়েছে। আমি বললাম, খুব ভালো। শিমুল মেয়েটিকে আমি কোনোদিন দেখিনি, তুমি তাকে ভালোবাসো, যখন নিজেই বললে, তখন আমার কষ্টটাকে বুঝতে দেইনি। তোমাকে ছেড়ে চলে গেছি ঠিকই কিন্তু আর কাউকে ভালোবাসতে পারিনি। ভালোবাসা যে যাকে তাকে বিলোবার জিনিস নয়।

    আকাশের সঙ্গে কতো কথা হয় রোজ ! কষ্টের কথা, সুখের কথা। একদিন আকাশভরা জোত্স্নায় গা ভেসে যাচ্ছিলো আমাদের। তুমি দু চারটি কষ্টের কথা বলে নিজের লেখা একটি গান শুনিয়েছিলে। “ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিও”। মংলায় বসে গানটি লিখেছিলে। মনে মনে তুমি কার চিঠি চেয়েছিলে? আমার? নেলী খালার? শিমুলের? অনেক দিন ইচ্ছে তোমাকে একটা চিঠি লিখি। একটা সময় ছিলো তোমাকে প্রতিদিন চিঠি লিখতাম। তুমিও লিখতে প্রতিদিন। সেবার আরমানিটোলার বাড়িতে বসে দিলে আকাশের ঠিকানা। তুমি পাবে তো এই চিঠি? জীবন এবং জগতের তৃষ্ণা তো মানুষের কখনো মেটে না, তবু মানুষ আর বাঁচে ক’দিন বলো? দিন তো ফুরোয়। আমার কি দিন ফুরোচ্ছে না? তুমি ভালো থেকো। আমি ভালো নেই।

    ইতি,
    সকাল

    পুনশ্চঃ আমাকে সকাল বলে ডাকতে তুমি। কতোকাল ঐ ডাক শুনি না। তুমি কি আকাশ থেকে সকাল, আমার সকাল বলে মাঝে মধ্যে ডাকো? নাকি আমি ভুল শুনি?

    • bonhishikha2r@yahoo.com'
      বহ্নিশিখা মে 24, 2011 at 8:01 পূর্বাহ্ন

      এই আবৃত্তিটা শুনতে আমার বেশ লাগে।

    • sokal.roy@gmail.com'
      সকাল রয় মে 24, 2011 at 1:44 অপরাহ্ন

      জুলিয়ান ভাই এই চিঠিটা অনেক দিন আগে একবার পড়েছিলাম। আমি ত.না কবির মতো করে লিখতে পারিনা ঠিক । কিন্তু আমার লেখায় নিজস্ব একটা স্বকীয়তা থাকে আমি সেই স্বকীয়তায় রুদ্রকে এই গল্পে সাজিয়েছি। আমার গল্পের রুদ্রের চারিত্রিক প্রতিফলনটা হয়তো অতটা গাঢ় হয়নি হয়তো ফুটে উঠেনি তবে চেষ্টা ছিলো।

      প্রেম একবার নয় বারবার মানুষের জীবনে আসে; আর ভালো বন্ধু জীবনে একবারই আসে
      হোক সেটা কঠিন পাথর সম তবুও প্রেমের মতো বিষাদময় নয়

      আপনার দেয়া ত.না কবির চিঠিটা আরেকবার পড়ে অনুপ্রাণিত হলাম। ভালো লাগলো খুব

      ভালো থাকুন

  6. obibachok@hotmail.com'
    অবিবেচক দেবনাথ মে 23, 2011 at 10:19 অপরাহ্ন

    দাদা আপনারা এত চমৎকার লেখেন মাঝে-মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলি অজানা অনুভূতিতে। ইচ্ছে করে নিজেকেও জড়িয়ে নেব অনুভূতির পরশে, কিন্তু মন সাড়া দেয় না। কিছু সময় পরেই অলস-ক্লান্ত বিমূর্ত মুচ্ছনায় নিস্তেজ হয়ে পড়ি। সত্যি দাদা অনুভূতির পূর্ন প্রকাশের ছৌঁয়া পেলাম। আরো লেখা চাই, চাই হারাতে দিক-বিদিক ঠিকানায়।
    :rose:

    • sokal.roy@gmail.com'
      সকাল রয় মে 24, 2011 at 6:40 পূর্বাহ্ন

      দেবনাথ দা তুমি হারিয়ে গেলে তো সমস্যায় পড়ে যাবো ……………আমরা ব্লগে আসি কাজের ফাকে তুমি প্রতিদিন সময় করে আসো ……………..হঠাৎ যদি তুমি হারিয়ে যাও তো সমস্যায় পড়ে যাবো তা কি বুঝতে পারছো না…………………..তুমি হারাবে না …………..

      অনুভূতি নিয়ে আরো লিখবো সামনের দিন গুলুতো থেকে কাছাকাছি

  7. rabeyarobbani@yahoo.com'
    রাবেয়া রব্বানি মে 24, 2011 at 7:49 পূর্বাহ্ন

    এটাতো ত. না. আপার লেখা ।:O
    হুম ।আমরার জুলিয়ান ভাই বিরাট বিচক্ষণ তো ।!

You must be logged in to post a comment Login