শেষ হলো কি হ্যারি পটার অধ্যায়!

সব মানুষেরই কিছু না কিছু ব্যাপারে নাক উঁচু হয়৷ সেই উঁচু নাকের অহংকারে অনেক সময় অনেক ভালো জিনিসও সে হারিয়ে ফেলে৷ আমি যেমন খুব জনপ্রিয় কিছু চট করে গ্রহণ করতে পারি না৷ খুব জনপ্রিয় জিনিস অনেক সময়েই ভালো হয় না, তাই অনেক সময় জনপ্রিয় জিনিসগুলো এড়িয়ে যাই৷ আর এভাবেই এড়িয়ে গিয়েছিলাম হ্যারি পটার৷

হ্যারি পটার সম্পর্কে আমার এলার্জি ছিলো৷ প্রথম যখন হ্যারি পটার সম্পর্কে জানতে পারি, তখন সেটা খুব বিখ্যাত৷ হ্যারি পটার নিয়ে হলিউডে ততোদিনে অনেক মুভি তৈরি হয়ে গেছে৷ সেটার জনপ্রিয়তা দেখে আমার ধারণা হলো, নিশ্চয় আরেকটা সস্তা কিছু তৈরি হয়েছে৷ হলিউডের স্বভাবমতো একই প্যাটার্নের উদ্ভট কাহিনী হবে নিশ্চয় হ্যারি পটার (ঠিক যেমন এখনকার জনপ্রিয় সিনেমা টুইলাইট, ভ্যাম্পায়ার নিয়ে কি উদ্ভট গল্প ফেঁদেছে)৷

মনে পড়ে, ২০০৫ সালের এক সকালে, নাস্তার টেবিলে বসে পত্রিকায় দেখি হ্যারি পটার সিরিজের ষষ্ঠ বই “হ্যারি পটার এণ্ড দি হাফ ব্লাড প্রিন্স” বই এর প্রকাশনার খবর৷ প্রথম পাতায় বইটা সহ জেকে রাউলিংয়ের হাস্যজ্জ্বল ছবি৷

“হু, হাফ ব্লাড প্রিন্স! ঢংয়ের আর জায়গা পায় না৷ নিশ্চয় গাজাখুরি নিয়ে কিছু ফেদেছে, আর তাই নিয়ে কিছু পাগল মেতে উঠেছে৷” আমি মনে মনে গজ গজ করলাম৷ আমার বিরক্তির কারণ ছিলো একই জিনিস নিয়ে হলিউডের ক্রমাগত ত্যানা পেচিয়ে যাওয়া৷ যেমন ডাইনোসর নিয়ে ওরা একইরকম অনেক ছবি তৈরি করে, আর প্রায় তার সবই জনপ্রিয় হয়৷

যাকগে, এরপর অনেকদিন চলে গেলো৷ ২০০৬ সালে একদিন ডিভিডির দোকানে ডিভিডি দেখতে গিয়ে কি মনে করে হ্যারি পটারের একটা ডিভিডি নিয়ে এলাম৷ ডিভিডিতে হ্যারি পটার সিরিজের প্রথ্ম চারটা সিনেমা ছিলো৷ প্রথম ছবিটা দেখেই মনে হলো- আরে, এতো অন্য ছবির মতো না! এর মধ্যে ডাইনোসর টাইপ কিছু নিয়ে ত্যানা প্যাচানো নাই, লর্ড অব দা রিং টাইপ সিনেমার মতো আজিব ধরণের কুৎসিত সব ক্রিয়েচার তৈরি করে মারামারি নাই৷ আর কি আশ্চর্য, ছোটবেলায় আমরা যে পড়তাম ডাইনিরা ঝাড়ুতে করে উড়ে যায়, এর মধ্যে তো সেগুলাই৷ আমাদের রূপকথার সবকিছু জীবন্ত হয়ে উঠেছে এখানে এসে! আমি মুগ্ধ হয়ে দেখলাম  ব্রুমস্টিকে করে হ্যারিদের কুইডিস খেলা৷

কিন্তু ছবি ভালো লাগলেও ছবির কাহিনী ভালো বুঝলাম না, বুঝলাম আধাখেচরা করে৷ পরিচিত একজনকে জিজ্ঞেস করলাম সে হ্যারি পটার সম্পর্কে জানে কি না৷ দেখা গেলো সে ভালোই জানে৷ সে আমাকে কিছু জ্ঞান দান করলো৷ কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারলাম না৷ নীলক্ষেতে গিয়ে কিনে আনলাম “হ্যারি পটার এণ্ড দি অর্ডার অব দি ফিনিক্স”৷ সেটা ছিলো সিরিজের পাঁচ নম্বর বই৷ পাঁচ নম্বরটা কেনার পিছনে আমার যুক্তি ছিলো অন্য চারটার সিনেমা ভার্সন তো আছে, কাজেই যেটার এখনো সিনেমা হয়নি সেটা আগে পড়ে দেখি, ভালো লাগলে অন্যগুলা কেনা যাবে৷

বইটা পড়ে যেটা বুঝলাম, আসলে সিনেমা দেখে হ্যারি পটারের আসল স্বাদের দশ  ভাগের একভাগ পাওয়া যেতে পারে, পুরোটা পাওয়া সম্ভব না৷ বই এতো ভালো, এতো ডিটেল তার বর্ণনা যে আমি অদ্ভুত মজে  গেলাম৷ বই শেষ করেই আবার চলে গেলাম নীলক্ষেতে৷ তখন পর্যন্ত প্রকাশিত হ্যারি পটার সিরিজের বাকি পাঁচটা বই (হাফ ব্লাড প্রিন্স সহ!) কিনে আনলাম৷ তারপর নিলাম অফিস থেকে ছুটি৷

এখন ভাবলে অবাক লাগে সে সময়কার কাহিনী৷ অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিলাম আসলে শুধু হ্যারি পটার পড়ার জন্য না৷ খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, তাই কয়েকটা দিন কষে ঘুমাতে চেয়েছিলাম৷ ছুটি নেয়ার পর যেটা হলো, সারাদিন আমি হ্যারি পটার পড়ি, সন্ধ্যার দিকে একটু হাঁটতে বের হই৷ কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে এসে ভাবি আজ খুব তাড়াতাড়ি ঘুমাবো৷ সারারাত ভালো একটা ঘুম দিবো যাতে পরেরদিন চনমনে শরীর নিয়ে ঘুম থেকে উঠতে পারি৷ এটা ঠিক করার পর আমি হ্যারি পটার নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ি৷ তারপর একসময় টের পাই, ফজরের আজান দিচ্ছে৷

হ্যারি পটার আরো আগে না পড়ে একদিক দিয়ে আমি ভালো করেছিলাম৷ সিরিজের সাতটা বই লেখা হয়েছে দশ বছর ধরে৷ অথচ আমি ছয়টা বই পড়ার এক বছর পরেই পেয়ে গেলাম সিরিজের সপ্তম আর শেষ বই- হ্যারি পটার এ্যাণ্ড দি ডেথলি হ্যালোজ৷ আমার জানা মতে “হ্যারি পটার এ্যাণ্ড দি ডেথলি হ্যালোজ” হচ্ছে একমাত্র জিনিস যেটা যেদিন প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারে প্রকাশিত হয়েছে সেদিন একই সাথে বাংলাদেশেও প্রকাশিত হয়েছে৷

ডেথলি হ্যালোজ শেষ করার পর অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিলো৷ আর কখনো হ্যারি পটার সিরিজের নতুন আর কিছু পড়া হবে না, ভেবে আশ্চর্য লেগেছিলো৷ মনে হলো, কি যেনো হারিয়ে গেলো জীবন থেকে৷ বড় আশ্চর্য সে অনুভূতি৷ ভল্ডোমোর্টের মতো আশ্চর্য ক্ষমতাসম্পন্ন জাদুকরের ভয়ংকর জাদু সম্পর্কে আর জানা যাবে না, সেও মেনে নেয়ার মতো না৷

২০০৭ সালে ডেথলি হ্যালোজ বইটা বের হলেও, ওটার সিনেমা ভার্সনের শেষ অংশ মুক্তি পাবে ১৫ ই জুলাই ২০১১, মানে কালকে৷ সেই সাথে শেষ হবে হ্যারি পটার অধ্যায়৷ খারাপ লাগছে৷ খারাপ লাগছে নিজের জন্য৷ খারাপ লাগছে সেই সব শিশু কিশোরদের জন্য, যারা দীর্ঘ দশটা বছর হ্যারি পটারের হাত ধরে বেড়ে উঠেছে৷ ছোটবেলায় পড়া যে কোনো কিছু অনেক বেশি প্রিয় হয়৷ সে সব শিশু কিশোর সৌভাগ্যবান যারা হ্যারি পটারের সাথে বেড়ে উঠেছে৷

আর থ্যাঙ্কস টু জোয়ান ক্যাথলিক রাওলিং- হ্যারি পটারের জন্য৷

(একই  সাথে সামহোয়ার ইন ব্লগেও প্রকাশিত)

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

4 Responses to শেষ হলো কি হ্যারি পটার অধ্যায়!

  1. আমিও মিস করছি

    tanim.tech@yahoo.com'

    রেজওয়ান তানিম
    জুলাই 15, 2011 at 1:55 অপরাহ্ন

  2. সিনেমাটি থেকে বই পড়েই আমি বেশি আনন্দ পেয়েছি।

    রিপন কুমার দে
    জুলাই 17, 2011 at 2:57 পূর্বাহ্ন

  3. সিনেমা দেখেছি, বই পড়া হয় নি।

    রাজন্য রুহানি
    জুলাই 17, 2011 at 8:22 পূর্বাহ্ন

  4. প্রথম মুভিটি ভালো লাগলেও বাকীগুলো লাগেনি। তবে আপনার লেখা পেড়ে বই পড়তে ইচ্ছে করছে।

মন্তব্য করুন