মুহাম্মদ সাঈদ আরমান

মিতুর শখ

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

এক

মিতুর মন খারাপ। বাবা তাকে জাগাতে আসে নি। অন্য দিন মাথায় হাত বুলিয়ে জাগিয়ে তুলতো। মিতু ইচ্ছাকৃত ভাবেই ঘুমের ভান ধরে থাকতো। মিতুর মনে আজ প্রচণ্ড অভিমান । মা ফিরে আসার পর থেকে বাবা যেন কেমন হয়ে গেছে। আগের মত মিতুর সাথে গল্প করে না। গত দুই বছর বাবাকে মিতু বেশী আপন করে পেয়েছিল। বাবা আসছে না দেখে নিজেই জেগে ওঠে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে আজ বাবার সাথে কথা বলবে না।
মিতু নিত্য দিনের মত ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। ব্যালকনির গা ছুঁইয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি কৃঞ্চচূড়া গাছ। চড়ুই পাখির আড্ডা বসে এই গাছে। ওদের দেখতে মিতুর খুব ভালো লাগে। গত কাল দুইটি শালিকও দেখেছে মিতু। ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে আজ। মিতু ভাবছে পাখি গুলো এখন কোথায়? আজ সবাই মিলে গাজীপুর যাবার কথা । এত বৃষ্টিতে কি যাওয়া যাবে?

ঘরে সুনসান নিরবতা। কাজের মেয়ে লায়লা ছাড়া কেউ নেই। লায়লা ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছে। কথা গুলো শুনতে পাচ্ছে মিতু। মা-বাবার অনুমতি ছাড়া লায়লার ফোন ধরা নিষেধ।
ফোনে লায়লা বলছে; ‘জেগেছে, খাই নাই, টিভি রুম বন্ধ রাখুম? আইচ্ছা’ মিতুর বুঝতে কষ্ট হয় না। অপর প্রান্তের প্রশ্ন গুলো তাকে নিয়েই করা হয়েছে।
: আপা টেবিলে নাস্তা দিছি।
মিতু জানতে চায়;
: বাবা কোথায়? মা এখনো জাগে নি?
লায়লা জবাব দেয় না। লায়লাকে মা-বাবা যা বারণ করে তা কখনো মিতুকে বলে না। লায়লার মৌনতাই বলছে কিছু একটা বলতে বারণ আছে। লায়লা জানায়;
: খালাম্মাকে নানু হাসপাতালে নিয়েছে। খালুকে আমি সকালে দেখি নাই।
: মার কী হয়েছে?
: আমি কিছুই জানি না (লায়লার উত্তর)
মিতু আর কথা বাড়ায় না। বার্থরুমে গিয়ে ব্রাশ করে হাত-মুখ ধুয়ে নেয়। নাস্তার টেবিলে গিয়ে নাস্তা করে নেয়। পাশে লায়লা দাঁড়িয়ে। মুখে কথা নেই। লায়লার মুখে যেন এক ভীতির চাপ।

রাজধানীর একটা ভালো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে গ্রেড ফোরে পড়ে মিতু। বাবা রাহাত খান ইঞ্জিনিয়ার। নিজের ফার্ম আছে। মা রোকেয়া খান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। গত দুই বছর থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা করছে। মাকে মিতু তেমন কাছে পায় নি। মা বিদেশে পড়তে যাচ্ছে শুনে মিতু জানতে চেয়েছিল;
: মা, তোমার এখনো পড়া শেষ হয় নি? তুমি না ইউনিভার্সিটিতে পড়াও?
: পড়ার কী শেষ আছে মা?
: কী পড়বে?
: ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন নিয়ে পড়বো।
: এইটা পড়লে কী হয় মা?
মা সে দিন যা বলেছিল;
দেশের সাথে দেশের কীভাবে সু-সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়, কী ভাবে সম্পর্ক ঠিক রাখতে হয়, সে বিষয়ে পড়বো। আমাদের সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকতে হলে যেমন মানুষে-মানুষে সু-সম্পর্ক দরকার। তেমনি এক দেশের সাথে অন্য দেশের সু-সম্পর্ক থাকা দরকার।
মিতু জানতে চেয়েছিল;
: তাহলে আর যুদ্ধ হবে না বুঝি?
মা সেদিন আর কিছু বলে নি।

আজ তিন দিন মা হাসপাতালে। কি হয়েছে তাও জানে না মিতু। বাবা ঘরে নেই। নানীর কাছে জানতে চেয়েছিল ‘বাবা কোথায়’? বলেছে ‘গ্রামের বাড়িতে গেছে’ নানী আর লায়লা সর্বক্ষণ মিতুর পিছে-পিছে থাকে। ব্যাপারটা মিতুর মোটেই ভালো লাগছে না। টিভিও দেখতে দিচ্ছে না। কৌতুহল বেড়ে যায় মিতুর মনে।

দুই

রাত ১১টা। লায়লা আর নানী ঘুমিয়ে পড়েছে। মিতুর ঘুম আসছে না। লায়লার কাছে টিভি রুমের চাবি। মিতু লায়লার আঁচল থেকে চাবি খুলে নিয়ে টিভি রুমে যায়। টিভি অন করে একটার পর একটা চ্যানেল পরিবর্তন করতে থাকে। স্থির করতে পারে না কি দেখবে। এখন মিতুর কার্টুন ভালো লাগে না।
হঠাৎ নজর পড়ে ব্রেকিং নিউজ স্ক্রলিং এ। ‘রোকেয়ার স্বামী রাহাত খানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ’। স্ক্রলিং ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকে মিতু। প্লেয়ারে ইচ্ছেমত আগে পিছে যাওয়া যায়। টিভিতে এটা করা যায় না। বিরক্তকর মনে হয় মিতুর। মিতুর মনে হতে থাকে বাক্যটা ফিরে আসতে অনেক্ষণ সময় নিচ্ছে । বাংলা প্রত্যেকটা চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজে ‘রাহাত খানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ’ স্ক্রলিং এ ঘুরছে। মিতু খবর ভাল লাগে না। নানু দেখার সময় পাশে বসে থাকতো।

আজ মিতুকে সংবাদ দেখতেই হবে। একটা চ্যানেলে সংবাদ চলছে। মিতু শুনতে থাকে। একটু পর মিতু কানে ভেসে আসে ‘রোকেয়ার স্বামী রাহাত খানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ’
টিভি স্ক্রিনে বাবাকে দেখতে পায় মিতু। পাশে অনেক পুলিশ। হাতকরা পরানো হয়েছে। গায়ে মলিন পোশাক। সংবাদের শব্দ গুলো এখন মিতুর কানে যাচ্ছে না। সে বাবার প্রতি তাকিয়ে আছে। একটু পর মাকেও দেখতে পায়। হাসপাতালের বেডে সাদা চাদর গায়ে শুইয়ে আছে। সংবাদে কি বলা হচ্ছে মিতু বুঝতে পারছে না। মা-বাবাকে দেখেই সে অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছে।

মিতু ক্ষুদ্র জ্ঞানে বুঝে নিয়েছে। বাবা-মাতে ঝগড়া হয়েছে। বাবাই কি মাকে মেরেছে? বাবা কে পুলিশ কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? মারবে না তো? মার কাছে আমাকে যেতে দিচ্ছে না কেন? বাবা-মা কখন ফিরবে ঘরে?
বাবাকে টিভিতে দেখার শখ মিতুর অনেক দিনের। একবার বলেছিল; ‘বাবা তুমি নাটকে অভিনয় করবে? আমি টিভিতে তোমাকে দেখবো’। বাবা-মা দুইজনকেই মিতু আজ টিভিতে দেখেছে। এ দেখা কি মিতুর শখের ?

২১/০৭/২০১১

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


11 Responses to মিতুর শখ

  1. abubakkar.siddiq004@gmail.com'
    এ.বি.ছিদ্দিক জুলাই 21, 2011 at 2:19 অপরাহ্ন

    বাহ খুব সুন্দর।

  2. imrul.kaes@ovi.com'
    শৈবাল জুলাই 21, 2011 at 2:41 অপরাহ্ন

    জানেন এইসব গল্পের জন্য আমি পত্রিকা পড়ি না , খবর শুনি না ৫বছর হলো । গত বেশ কিছু দিন হয় কানে আসছিল এই ধরণের , শুনার আগ্রহ ছিলো না ন্যূনতম … গল্পটা শুরু করতে মায়া লাগলো তাই পড়ে ফেললাম কিন্তু শেষটায় আপনি সেই খবরই শুনালেন ।

    আপনি খুব সুন্দর লিখেন , অভিনন্দন আর সাথে এই মুহূর্তের মন খারাপের দায়টা আপনাকে দিচ্ছি ।সব গল্পের জন্য আমি পত্রিকা পড়ি না , খবর শুনি না ৫বছর হলো । গত বেশ কিছু দিন হয় কানে আসছিল এই ধরণের , শুনার আগ্রহ ছিলো না ন্যূনতম … গল্পটা শুরু করতে মায়া লাগলো তাই পড়ে ফেললাম কিন্তু শেষটায় আপনি সেই খবরই শুনালেন ।

    আপনি খুব সুন্দর লিখেন , অভিনন্দন আর সাথে এই মুহূর্তের মন খারাপের দায়টা আপনাকে দিচ্ছি ।

    • saarman2001@yahoo.com'
      মরু বেদুইন জুলাই 26, 2011 at 7:29 অপরাহ্ন

      আমি গল্প লিখতে জানি না। টিভিতে দেখা ঘটনাটা নিজের মত করে লিখেছি।
      আপনি কষ্ট পেয়েছেন তাই আমি দুঃখিত আপনার মত কষ্ট পাওয়ার মন থাকলে সমাজটা এই ভাবে নষ্ট হতো না।
      দোয়া ও শুভকামনা আপনার জন্য

  3. mamunma@gmail.com'
    মামুন ম. আজিজ জুলাই 21, 2011 at 7:17 অপরাহ্ন

    বাস্তবিক, সমসমায়িক। সুন্দর

  4. রাজন্য রুহানি জুলাই 22, 2011 at 10:20 পূর্বাহ্ন

    দারুন। তবে শেষের দিকে এসে সত্যিই খারাপ হয়ে গেল মন।

  5. rabeyarobbani@yahoo.com'
    রাবেয়া রব্বানি জুলাই 24, 2011 at 10:08 পূর্বাহ্ন

    আপনার সব গল্পে একটা মেসেজ থাকে।বেশ ভালো ভাবুক আপনি।শুভ হোক।

    • saarman2001@yahoo.com'
      মরু বেদুইন জুলাই 26, 2011 at 7:31 অপরাহ্ন

      আমার লেখা কেউ পড়ে এতে কিছু পাবে সেটা নিজে ভাবতে অবাক লাগে। আপনি দেখছি মন দিয়ে পড়েন। মন্তব্য পড়ে ভালো লাগে।
      শুভকামনা অবিরত :rose:

You must be logged in to post a comment Login