নীল নক্ষত্র

নক্ষত্রের গোধূলি, পর্ব -৪৫ (চতুর্থ অধ্যায়)

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

(পূর্ব প্রকাশের পর)
বাসায় ফিরে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরোজ বেরিয়ে গেল। যাবার সময় বলে গেল তোমার ভাবিকে বলেছি তুমি কখন বের হবে। তোমার পথে খাবার জন্যে কিছু নাস্তা বানিয়ে দিবে নিয়ে যেও। সারা রাতের পথ, ক্ষুধা লাগবে, এক বোতল পানিও নিও নয়তো রাস্তায় অনেক দাম দিয়ে কিনতে হবে।
হ্যাঁ, সে প্রমাণ এর মধ্যে পেয়েছি। তখন হাফ লিটার পানি কিনেছি এক পাউন্ড দশ পেনি দিয়ে।
ফিরোজ বেরিয়ে যাবার পর রাশেদ সাহেব ফিরোজের কথা মত লাগেজ সংক্ষেপ করার কাজে লেগে গেলেন।
ভাবি, একটু চা হলে ভালো হত
হ্যাঁ ভাই দিচ্ছি, আর কিছু দিব সাথে?
না না তখন যা খেয়েছি এখনো তার কিছু হয়নি।
ভাবি চা দিয়ে গেলেন। চায়ের সাথে লাগেজ গুটানো শেষ, সুটকেসটা রেখে ব্যাগ নিয়ে যাবে।
ভাবি, এই যে এটা রেখে যাব।
আপনার যা দরকার সব নিয়েছেন?
মনেতো হয় নিয়েছি। তবে ওখানে যাবার পর বুঝবো কি কি ভুল করলাম। দেখা যাক, কিছু দরকার হলে কিনে নিব।
ওখানে কিন্তু শীত বেশি, শীতের কাপর সব নিয়েছেন?
হ্যাঁ, যা আছে সবই নিয়েছি
তাহলে ওগুলো ওই ওপাশে রেখে দেন আমি পরে সরিয়ে রাখবো।
ভাবি একটা বড় ডাইরির মত বই এনে বললেন
ভাই আপনি যেখানে যাচ্ছেন সে ঠিকানা আর ফোন নম্বর রেখে যান।
ভাবি ভালো কথা মনে করেছেন, দেন এখনি লিখছি।
রাস্তায় কি নিবেন ভাই?
আপনার ভাণ্ডারে কি আছে, যা আছে আপনার সুবিধা মত তাই দেন।
পরটা আর সাথে ডিম ভেজে দেই?
হ্যাঁ যথেষ্ট হবে।
কি বললেন?
কোনটা?
ওই যথা–,
ও আচ্ছা, আপনিতো আবার বাঙ্গালি নন, সরি ভাবি। যথেষ্ট হোল এনাফ, বুঝলেন এবার?
হ্যাঁ, এখন বুঝেছি, সবার কথা বুঝি কিন্তু আপনিতো মাঝে মাঝে খাস বাংলা বলেন এই তখন একটু আটকে যাই।
না ভাবি আপনি খুব ভালো বাংলা বুঝেন এবং বলেন। কথায় কথায় ইংরেজি বলেন না এমনকি আমার সন্দেহ হয় ফিরোজের বাংলা মনে আছে কিনা, আমার সাথে কথা যা বলে তার অর্ধেক ইংরেজি বলে।
ঠিক বলেছেন আমারও তাই মনে হয় কারণ ওকে কখনো বাংলা কিছু পড়তে দেখিনা, ওর আলসেমির জন্যেই ছেলেমেয়েরা বাংলা শিখল না।
কই ওরা তো শুনি বাংলাই বলে আমিও ওদের সাথে বাংলা বলি
না এই পর্যন্তই, পড়তে লিখতে পারেনা।
হ্যাঁ ,ওর উচিত ছিল এটা শেখানো, ভুল করেছে। আর যাই হোক এই জন্যে ওরা নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
সেদিন সময় মত কোচ স্টেশনে আসতে পারলেন। গ্লাসগোর কোচ পেলেন, ডবল ডেকার। ড্রাইভার টিকেট দেখে ব্যাগটা লাগেজ ডেকে রেখে দিল। নাস্তা আর পানির বোতল সহ ছোট ব্যাগ সাথে রাখলেন। কোথায় বসবেন কিছুক্ষণ ভেবে নিচেই এক জায়গায় বসে পরলেন। মাঝ খানে টেবিলের মত, দুপাশে চারটা সিট। গাড়ি ছেড়ে দিল ঘড়ির কাটা ধরে। এক জন মহিলা ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে আর একজন পাশের বিশেষ একটা সীটে বসে আছে। মনে হয় দুইজনে ভাগ করে চালাবে। এতো লম্বা পথ সেও আবার রাতের বেলা। একজন কি করে এতো দুর ড্রাইভ করে? অন্য কোন হেলপার বা সুপারভাইজার নেই বলে একটু অবাক হলেন। এতো দুরের পথ মাত্র দুইজন ড্রাইভার! আর কেউ নেই? টার্মিনাল থেকে বের হয়ে এসে ড্রাইভার মাইকে ভদ্র মহিলা ও ভদ্র মহোদয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রথমে ন্যাশনাল এক্সপ্রেসে ভ্রমণ করার জন্যে ধন্যবাদ জানিয়ে শুরু করলেন।
আমি জেনি এবং আমার সহকর্মী পিটার আপনাদের নিয়ে গ্লাসগো বুচানান কোচ স্টেশনের পথে যাত্রা শুরু করেছি। সকাল আনুমানিক পাঁচটায় সেখানে পৌঁছবো। রাত প্রায় একটায় কোন একটা সার্ভিস স্টেশনে আধা ঘণ্টার জন্যে থামব সেখানে আপনারা রিফ্রেশ হতে পারবেন। সেখান থেকে আমার সহকর্মী গাড়ি চালাবে। প্রতি সীটের হ্যান্ডেলের সাথে হেড ফোন রয়েছে, এতে চারটি চ্যানেল পাবেন আপনাদের ইচ্ছেমত যে কোন চ্যেনেল উপভোগ করবেন। গাড়ির পিছনে নিচের ডেকে টয়লেট রয়েছে প্রয়োজনে ব্যাবহার করবেন। সীট বেল্ট বেধে নিবেন। যেহেতু রাতের বেলা তাই আপনার সহযাত্রীকে বিরক্ত না করে মোবাইল ফোন সতর্কতার সাথে ব্যবহার করবেন। গাড়ির বাইরে তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রী কিন্তু আমি গাড়ির ভিতরের তাপমাত্রা আপনার জন্য আরামদায়ক অবস্থানে রাখতে চেষ্টা করব। আপনার যাত্রা আনন্দময় হোক, আবার ধন্যবাদ।
কোচ বাকিংহাম প্যালেস রোড ধরে এগিয়ে চলেছে। সারা বিশ্বের শতকরা নব্বই জন মানুষের স্বপ্নের মহানগরী লন্ডনের বুকের উপর দিয়ে রাশেদ সাহেব তার ভেঙ্গে যাওয়া স্বপ্ন জোড়া তালি দিয়ে তার পরিবারকে বাঁচাবার একটা  ঝাপসা সুপ্ত আশা নিয়ে অজানার পথে এগিয়ে চললেন।
মানুষের বুকের ভিতরে একটা সাগর থাকে তাকে মহা সাগরও বলা যায়। সেই সাগরে অনেকগুলি আশা বা স্বপ্ন তরী ভেসে বেড়ায় যা মানুষকে বাঁচতে প্রেরণা যোগায়, মনে শক্তি যোগায়, বেচে থাকার আনন্দ দেয়। রাশেদ সাহেবের সেই স্বপ্ন তরী গুলি একটা একটা করে প্রায় সবই ডুবে গেছে। দুই একটা এখনো প্রায় ডুবি ডুবি অবস্থায় রয়েছে তার মধ্যে থেকে যদি কিছু রক্ষা করতে পারে সেই চেষ্টা। সে এখনো জানে না কতটা সফল হতে পারবে।

নিচের ডেকে যাত্রী রয়েছে মাত্র বার জন। এর মধ্যেই কেউ চোখ বন্ধ করে ফেলেছে, কেউ আবার রিডিং লাইট জ্বালিয়ে পড়ছে, আবার কেউ খুলে বসেছে বিয়ারের ক্যান। তার সাথে পড়ার মত কিছু নেই কি করবেন? জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে দেখছেন। লাল নীল সবুজ হলুদ নানা রঙ্গের আলো ঝলমল ব্যস্ত নগরী, না না মহা নগরী। লন্ডন মহা নগরী কখনো ঘুমায় না। লোক জনের ব্যস্ত চলাচল, ঝড়ের মত ছুটে চলা নানা রকমের গাড়ি, রাস্তার দুপারে দালান কোঠা দোকানপাট। আবার কবে আসবেন এই লন্ডনে তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। আবার এলেও ঘুরে ফিরে দেখার মত ইচ্ছাও নেই। তার মনিকে নিয়ে যা দেখেছে ওই পর্যন্তই। মনি যতক্ষণ পাশে ছিল মনে আশা ছিল, সাধ ছিল, স্বপ্ন ছিল সবই ছিল। এখন মনি নেই কাজেই ওসবের কোন বালাই নেই। মনি যেদিন আবার আসবে সেদিন তাকে সাথে নিয়ে দেখবে। ইংল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ড মিলে গ্রেট ব্রিটেন। তিনি ইংল্যান্ড ছেড়ে চলেছেন স্কটল্যান্ডে। না ভুল হল তার ভাগ্য তাকে নিয়ে চলেছে। সে তো তার নিজের ইচ্ছায় এখানে আসেনি। তাকে নিয়ে বেড়াচ্ছে তার ভাগ্য নামের রিমোট কনট্রোল। সে যেখানে নিয়ে যাবে রাশেদ সাহেবকে সেখানেই যেতে হবে। অনেকক্ষণ পর যখন নগরীর সীমা ছেড়ে গাড়ি মটর ওয়ে দিয়ে চলছিল তখন আর কিছু দেখার নেই। মটর ওয়ের দুপাশে সোডিয়াম বাতি আর ছুটে চলা গাড়ি। বিশাল বিশাল মাল বোঝাই লড়ি, কোন কোন লড়ি নিয়ে চলেছে দশ বারোটা করে কার। এসব আর কতক্ষণ দেখা যায়? চোখ বন্ধ করে সীটের পিছনে হেলান দিয়ে বসলেন। সাড়া দিন বেশ ধকল গেছে। একটু বিশ্রাম প্রয়োজন, যদি চোখটা একটু লেগে আসে ভালোই হবে।

কবে যেন বাড়ি ছেড়ে বেড় হয়েছিল মনে পারছে না। হ্যাঁ ওই তো, দেশ স্বাধীন হবার পর যখন জিনিষ পত্রের দাম ক্রমে বেড়েই চলেছে কিন্তু একমাত্র বাবার আয়ে সংসার চলতে চাইছে না। গ্রামেও বাবার তেমন জমিজমা নেই যেখান থেকে কিছু এনে জোড়া তালি দেয়া যায়, তখন। তারা পাঁচ ভাইবোন, বাবা মা সহ মোট সাত জনের সংসার। ছোট দুই জন এখনো স্কুলে যায়না। অন্যদের লেখা পড়া, বই খাতা কলম কালি, যাতায়াত, পোশাক ইত্যাদি। মায়ের পরনের কাপড়ে সেলাই পরতে থাকে, বাবা ময়লা কাপড় পরেই অফিসে যান। আশেপাশে থেকে শাক কুড়িয়ে এনে রান্না করা, খাবারের জন্য ছোট দুই ভাই এর কান্না। ওদের ক্রমে বেরিয়ে আসা বুকের হাড়, পরনের নোংরা কাপড়, সব মিলিয়ে একা বাবা কত কুলবেন? সংসারটাকে মনে হত একটা বিশাল সাগর। কিভাবে এটা পাড়ি দেয়া যায়? ভাইবোনদের দিকে তাকালে কষ্ট হয়, বুকটা চিড়ে যেতে চায়। সবাইকে খাওয়ানো হলে শেষে মায়ের অন্য বাড়ি থেকে আনা টিউবওয়েলের পানি খেয়ে শুয়ে পরার দৃশ্য কয়দিন দেখা যায়? কয়দিন সে নিজে ইচ্ছা করেই খেতে বসেনি। সবার খাওয়া হলে তখন এসেছে। মা খাবার বেড়ে দেয়ার পর সে জিজ্ঞেস করেছে
আপনার জন্য কি আছে দেখি।
আছে তুই খা
কি আছে একটু দেখি না।
দেখাবেন কোথা থেকে?
কিছু থাকলে তো দেখাবে।
চালাকি করার কি এমন দরকার মা?

তার জন্যে মা যা রেখেছিলেন তাই মায়ের সাথে মিলে খেয়েছে। প্রতিদিনের ভাতের ফ্যান একটা মূল্যবান ডিশ হয়েছিল। এভাবে কয়দিন সহ্য করা যায়? বাবা সকালে কোন রকম নাস্তা খেয়ে বেরিয়ে যাবার সময় মা দুটা শুকনো রুটি, সাথে কোন দিন একটু আলু ভর্তা, কোন দিন পিয়াজ কাঁচামরিচ লবণ ডলে মেখে দিয়ে দিতেন, তাই নিয়ে বাবা যেতেন অফিসে। ছুটির পর প্রায়ই হেটে আসতেন মতিঝিল থেকে মিরপুরের বাসা নামক পাখির নীড়ে। যেখানে একটু বৃষ্টি হলে বিছানা পত্র গুটিয়ে সারা রাত বসে থাকতে হয়। সে বিছানাই বা কেমন? ময়লা কাঁথা, ছেড়া কম্বল যা পানির অভাবে কতদিন ধোয়া হয়নি। একদিন অফিসে কি একটা অনুষ্ঠানে প্যাকেটে করে স্ন্যাক্স দিয়েছিল কিন্তু বাবা সেটা না খেয়ে লুকিয়ে পকেটে করে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন। মা আবার সেই ছোট্ট প্যাকেটে যা ছিল তাই সমান পাঁচ ভাগ করে তাদের পাঁচ ভাই বোনকে দিয়েছিলেন। বাড়িতে থাকতে ইচ্ছা করেনা কিন্তু দিনের এক সময় তো বাড়িতে ফিরতে হয়। যাবে কোথায়? এই ভাবে কয়দিন পালিয়ে থাকা যায়?সে কি করতে পারে কি করবে কিছু ভেবে পায়না। লেখা পড়ায় মন বসে না। আর বসবেই বা কিভাবে? কলেজের নতুন সাবজেক্টের কিছুই বুঝতে পারেনা। এই অবস্থায় টিউটর? অসম্ভব, কল্পনাই করা যায়না। কল্যাণপুরের জাকিরের সাথে কলেজে পরিচয়। আসা যাওয়া অবসরে তার সাথে মেলামেশা থেকে বন্ধুত্ব। তার সাথে যখনই দেখা হয় এই নিয়েই আলাপ।
কি করি জাকির, কি করলে আমি এই সমস্যা থেকে রেহাই পাবো? আচ্ছা মনে কর আমি যদি এখন কোন কাজ করি মানে চাকরি বাকরি করি তাহলে?
তোর পড়াশুনা! কাজ করলে পড়বি কিভাবে?
কেন, মনে কর আমার পড়ালেখা এই পর্যন্তই। কি করি দেখ ছোট সব ভাইএরই ভাল ব্রেন, আমি যদি ব্রেক দিয়ে ওদের পিকয়াপ করি? হচ্ছেনা এরকম?সবাই মিলে রসাতলে যাওয়ার চেয়ে একজন যদি ত্যাগ করি অর্থাৎ একজনের বিনিময়ে অন্য সবাই উঠে এলো। এরকম না হলে কি হবে ভেবে দেখেছিস?ঐযে দেখ ঐযে, ওই পাড়ার হামিদ ভাই আমাদের কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করে রিকশা চালাচ্ছে। ভাবতে কেমন লাগে না? আমি দূর থেকে যখন দেখি হামিদ ভাই রিকশা নিয়ে আসছে তখন অন্য দিকে চলে যাই। আমারও যে এমন হবেনা তা কে বলবে। হামিদ ভাই তো ওই পর্যন্ত যেতে পেরেছে আমি তো তাও পারব না। আমার মনে হয় আমি হয়তো কোন গ্যারেজে ম্যাকানিকের কাজ করবো। বাকি তিন জনের কেউ কোন দোকানে কর্মচারী হবে, কেউ রাজ মিস্ত্রির হেল্পার হবে, কেউ হবে ছিনতাইকারী নয়তো পকেটমার নয়তো ফেরিওয়ালা। কি এমন হতে পারেনা?
তুই এক কাজ করতে পারবি?
কি?
ঐযে আমাদের ক্লাসের বাদল, ওরা খুব ধনি এবং গাবতলির প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে, তো তুই তাকে বল তোর এই অবস্থা, ও হেল্প করতে পারবে।
কি করবে?
দেখ ও আর আমি এক স্কুলে পড়েছি ওকে অনেক আগে থেকেই চিনি ওরা বড়লোক, প্রভাবশালী, ওরা কোন না কোন কিছু করতে পারবে। আচ্ছা বাদ দে তোকে বলতে হবেনা আমিই বলবো।
দ্যাখ বলে দেখ যদি কিছু উপায় বের করতে পারে।

দুদিন পরে ক্লাসের পর রুম থেকে বেরিয়ে আসছিল পিছন থেকে বাদলের ডাকে থেমে ফিরে তাকাল
কি ব্যাপার বাদল?
শোন, তোকে আমি খুঁজছি।
কেন?
তোর নাম রাশেদ না?
হ্যাঁ, কেন কি হয়েছে?
কি আবার হবে? সেদিন জাকির তোর কথা বলল। আচ্ছা তুই গরুর হাসিল লিখতে পারবি? হাসিল বুঝতে পারলি, গরু বিক্রির রসীদ।
হাসিল, মানে কোথায়?
কেন গাবতলির হাটে, শুধু শনিবারে হাটের দিন। কি হবে একদিন ক্লাস না করলে? কিছু হবেনা, প্রতি হাসিলের জন্যে পাবি দুই টাকা। সকাল নয়টায় যাবি সাড়া দিনে যদি পঞ্চাশটা হাসিল লিখতে পারিস তাহলে একশ টাকা নগদ নিয়ে সন্ধ্যায় চলে আসবি।
হ্যাঁ পারবো।
আচ্ছা তাহলে আমি দাদাকে বলে তোর একটা ব্যবস্থা করতে পারবো। করবিতো নাকি পরে আবার ব্যাক গিয়ারে যাবি?
নারে বাদল আমার বাড়ির অবস্থা তোর জানা নেই জানলে আর এভাবে বলতি না, জাকির জানে।
হ্যাঁ, ও ইতো বলল আমাকে। আচ্ছা তোরা যেখানে থাকিস সেটা কি তোদের নিজেদের বাড়ি?
কি বলবো তোকে, বাড়ি বলতে যা বুঝিস তোরা সেরকম না, কোন রকম ‘ভেন্না পাতার ছানি’ পড়েছিস না? সেইরকম। তবে হ্যাঁ নিজেদের। আয় না একদিন দেখবি, কাছেইতো।
জিল্লুরদের বাড়ির কোন দিকে?
ওদের বাড়ি ছেড়ে তিন চার মিনিট এগিয়ে যেতে হয়।
ও আচ্ছা যাবো একদিন, তোর মা বাবা আছে?
হ্যাঁ সবাই আছে, মা বাবা ভাই বোন সবাই।
যাক, বেঁচেছিস অন্তত মাসের শেষে ভাড়া দিতে হয়না। আচ্ছা তুই চিন্তা করিস না, আমি যেভাবেই হোক একটা ব্যবস্থা করবো চল এখন কাঁঠাল তলায় যাই বসি একটু।
চল।
সেদিন এর পরে আর ক্লাস হয়নি বাসায় চলে এসেছিল। হেটে আসতে সারাটা পথে মনে একটা হালকা ভাব বোধ হয়েছিল। পা গুলো যেন আপনা আপনি এগিয়ে যাচ্ছিল, গায়ে বাতাসের ছোঁয়া বেশ স্নিগ্ধ মনে হচ্ছিল, নিঃশ্বাসের বাতাস যেন আগের চেয়ে হালকা মনে হচ্ছিল। আজও পরিষ্কার মনে পরছে সেই দিনের সেই রকম আশার আলো যে কেমন হয়। জীবনের প্রথম আশার আলো। এখনো ভুলেনি, স্মৃতির পাতায় অনেক যত্ন করে রেখে দিয়েছে। যেখানে সামান্য ধুলো জমতে দেয়নি। মাঝে মাঝে কারণে অকারণে পাতা উল্টাতে হয়েছে তাই সেখানে ধুলো জমার সুযোগ পায়নি। বর্ষায় পদ্মা নদীর বুকে মাল বোঝাই তলায় ফুটো হয়ে যাওয়া নৌকা ধীরে ধীরে তলিয়ে যেতে দেখেও নিরুপায় মাঝি যেমন কুলের দিকে তাকিয়ে থাকে ঠিক সেরকম করে যে নিজের এবং পুরো পরিবারের অতলে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। সেই মানুষকে কত খানি বদলে দিতে পারে নির্ভরযোগ্য কারো কাছ থেকে পাওয়া সামান্য একটু আশ্বাস। এ কথা একমাত্র ভুক্ত ভুগি ছাড়া আর কে বুঝতে পারে? হ্যাঁ বাদল কিছু করতে পারে। ওর সাথে তেমন আলাপ ছিল না শুধু জাকিরের কাছ থেকে শুনে যে নিজেই এগিয়ে এসে বলেছে সে কিছু পারুক বা না পারুক অন্তত চেষ্টা করবে। জাকির সত্যিই বলেছে। একে তো বড়লোকের ছেলে যে কখনো অভাব দেখেনি তার উপরে পুরোন ঢাকার প্রভাবশালী পরিবার, এধরনের ছেলেরা সাধারণত যেমন হয় বাদল সেরকম না। কাছে না গেলেও দূরে থেকে তো দেখেছে। মাকে কথাটা বলবে। নাহ আজ না, আগে হোক পরে বলা যাবে। সেদিন বাড়িতে ফিরে কোনরকম কিছু খেয়ে মাকে জাকিরদের বাড়ি যাবার কথা বলে বেরিয়ে গিয়েছিলো। পথে দুর থেকে দেখতে পেল ধীর পায়ে মেঝ ভাই স্কুল থেকে ফিরছে। সেই মোহাম্মদপুর থেকে হেঁটে আসছে। কাছে আসতে দেখল শুকনো মুখ, মনে হয় আজ মা টিফিন দিতে পারেনি। রাগ, কষ্ট, দুখঃ, লজ্জা অভিমানে মুখ দিয়ে কথা বের হল না। দাঁড়িয়ে থেকে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ও চলে গেলে বুক থেকে যন্ত্রণায় পোড়া তপ্ত একটা ভারি দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল। বুকের সব যন্ত্রণা যদি এইভাবে বের করে দেয়া যেত তাহলে?আমি কি ভাবে পারবো এই সব যন্ত্রণা দূর করে দিতে? কি লাভ এই স্কুলে যাতায়াতে? শেষ পর্যন্ত হতে হবে রাজ মিস্ত্রির নয়তো কাঠ মিস্ত্রির হেলপার, নয়তো গ্যারেজের মেকানিক নয়তো কাগজের ফেরিওয়ালা। এখন বাড়িতে গিয়ে কি খাবে? ঘরের পাশে করা ছোট্ট বাগানের ঢেঁড়স আর পুঁই শাক ভাজি করেছে মা। ওকে যা দিয়েছিলো তার থেকে একটু তুলে ও স্কুল থেকে ফিরছে বলে ওকে দেয়ার জন্য রেখে এসেছে। মা বলেছিলেন তুই খেয়ে নে ওর জন্যে আছে। থাকুক ঐ অত টুক দিয়ে খাবে কি ভাবে? এখান থেকে একটু রেখে দেন আমার এত লাগবে না। এইতো, আর পানির চেয়েও পাতলা একটু ডাল। কি পড়াশুনা করবে, সে শক্তি আছে শরীরে? খাবার পর অবসাদে ক্লান্তিতে শরীর ঝিমিয়ে পরবে, চোখ আপনা আপনি বন্ধ হয়ে আসবে, কি পড়বে? শুধু ভাণ করা। বাবা কেন বলছে না আমি আর পারছি না তোমরা কিছু কর, বন্ধ করে দাও এই সব লোক দেখানো স্কুল কলেজে যাতায়াত। কি লাভ হবে এতে? মা কেন বলছে না আমার শিক্ষা দীক্ষার দরকার নেই তোমরা যে যেদিকে পার যাও ঘরে চাল নিয়ে এস, ডাল নিয়ে এস, ঘরের ফুটো টিন গুলি বদলে দাও। এগুলি কি এতোই কঠিন কথা?কেন পারছেনা এই সহজ কথা গুলি বলতে?কেন বলছে না?কিসের ভয়?কাকে ভয়?কখন যে রাস্তার সাথেই জাকিরের ঘরে নক করেছে লক্ষ করেনি। জাকিরের বোন নীলিমা, কিন্তু জাকির নীলা বলে ডাকে, দরজায় দাঁড়িয়ে হাসছে।

কি ভাই কার সাথে কথা বলছেন?
কি বললে?
আমি সেই কখন দরজা খুলে দেখি আপনি ওই দিকে তাকিয়ে কি যেন বির বির করছেন কার সাথে কথা বলছিলেন? না কারো সাথে না একা একাই ভাবছিলাম।
একটু সরে দাঁড়িয়ে বলল
আসেন ভিতরে আসেন, ভাইয়া তো বাড়িতে নেই।
কোথায় গেছে জান?
না কিছু বলে যায়নি।
তাহলে আমি দেখি ও কোথায় গেছে।
আমার মনে হয় জসীম ভাইয়ের ওখানে যেতে পারে।
হ্যাঁ আমারও তাই মনে হচ্ছে, দেখি কোথায় গেল।
ঘুরে দু পা এগুতেই পিছনে নীলা ডেকে বলল
ভাইয়া আব্বা ডাকছে আপনাকে।
ও চল।
আপনি বসেন আব্বা আসছে।
সালামালেকুম চাচা, কেমন আছেন?
হ্যাঁ বাবা আছি ভালোই, বস দাঁড়িয়ে রইলে কেন?
তোমরা বাসায় কে কেমন আছ?
ভালোই, চলছে কোন রকম।
তোমাদের পড়াশুনার কি অবস্থা?
পড়াশুনার অবস্থা আর কি বলবো চাচা, আমার অবস্থা খুবই খারাপ তবে জাকির মনে হয় মোটামুটি চালিয়ে যেতে পারছে।
খারাপ কেন, তোমার কি সমস্যা?
সে চাচা অনেক কথা।
কি ব্যাপার বলা যাবে আমাকে?
চাচা আমি কিছু একটা চাকরী বাকরির কথা ভাবছি।
কেন?
আমার বাবার খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে অন্তত এই সময় আমি যদি তাকে একটু সাহায্য করতে পারি তাহলে আমার মনে হয় আমার ছোট ভাইবোনদের পড়ালেখা সম্ভব হবে নয়তো সব তছনছ হয়ে যেতে পারে।
বল কি?
হ্যাঁ চাচা।
ও বুঝেছি, তুমি তো আমাকে আগে কিছু বলনি জাকিরও কিছু বলেনি, তোমার রেজাল্টতো শুনেছি ভালো ছিল, জাকিরও বলেছে তোমার চাচার কাছেও শুনেছি। তুমি এরকম করে ভাবছ কেন এটা কি করে হয়? তুমি এক কাজ কর আমিও যা করেছিলাম, তুমি দুই একটা টিউশনি কর। পারবেনা?
হ্যাঁ খুঁজেছি কিন্তু পাচ্ছি না, আমাদের ওদিকে তো লোকজন কম।
আচ্ছা আমি দেখছি, আমাদের এদিকে আসতে পারবে?
হ্যাঁ আমিতো এদিকেই থাকি, জাকির, জসীম, মামুন এদের সাথে।
তাহলে ওসব চিন্তা আর মাথায় জায়গা দিও না আমি দেখছি কি করা যায়।
রাশেদ ভাই চা খাবেন?
ভিতরের দরজায় দাঁড়িয়ে নীলা জিজ্ঞেস করল।
খাবে না কেন, খাবে।  যা নিয়ে আয়। (চলবে)

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


One Response to নক্ষত্রের গোধূলি, পর্ব -৪৫ (চতুর্থ অধ্যায়)

  1. রাজন্য রুহানি নভেম্বর 13, 2011 at 10:54 পূর্বাহ্ন

    চলুক…।
    শ্রদ্ধা ও শুভ কামনা রইল।

You must be logged in to post a comment Login