কুলদা রায়

নির্বাসন শিখিনি, মৃত্যু কবজ

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

–বল,পাতা।
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল পূর্বা।
বললাম, বল, পাতা।
এবার গন্ধরাজের পাতাটিকে দেখল। হাত বাড়িয়ে দিল। ধরল। এই পাতাটি ছুঁয়ে দেখার জন্য প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে কান্নাকাটি শুরু করে পূর্বা। বারান্দায় ছেড়া পাতায় ভরে থাকে। কিছুটা মুখে দেয়। মেরী বলে, কি সব আজে বাজে জিনিস শেখাচ্ছ।
একদিন গন্ধরাজ ফুল ফুটল রাতে। জানালা দিয়ে ভুর ভুর করে গন্ধ ভেসে আসছে। অনেক দূরে বাজছে সেতার। রবি শঙ্কর। পূর্বা জানালার রড ধরে বলতে লাগল, পা আ তা আ। পা আ তা আ। ঝুঁকে ঝুঁকে বলতে লাগল। ওর মা রান্না রেখে ছুটে এল। বলল, কি হয়েছে? পূর্বা মায়ের দিকে ফিরে শোনাতে লাগল, পা আ তা আ। পা আ তা আ।
মেরী একটি ফুল ছিড়ে বলল, ফুল। ফুউল।
পূর্বা বলল, পা আ তা আ। পা আ তা আ।

যেদিন ফুল ফোঁটা শেষ হয়ে গেল, সেদিন পূর্বা হাউ মাউ করে কান্নাকাটি করল। বলল, ফুউল। ফুউল।
এদিন থেকে আমার বাগানে বারমাসী ফুলের চাষ করে দিলাম। আর আমার সহকর্মী ফারুখ আহমদ একবাক্স মৌমাছি এনে দিল। বারান্দায় গ্রীলের ভেতর দিয়ে মৌমাছি আসে আর যায়। মেরী খেপে অস্থির। মেয়েকে বারান্দায় আসতে দেয় না। দরোজা বন্ধ করে রাখে। বলল, মেয়েকে কামড় না খাওয়ালেই কি নয়?

আমি প্রতিদিন মৌমাছির বাক্স খুলি। বাচ্চা মৌমাছিগুলোকে একটু হাওয়া খাওয়াই। বাক্সটা পরিস্কার করি। মাঝে মাঝে মধু তুলি। পূর্বা চেটে পুটে খায়। বলে মিত্তি। মিত্তি দাও। কিন্তু বাক্সর কাছে যেতে পারে না। জানালা দিয়ে দ্যাখে, মৌমাছি বাক্স থেকে উড়ে যাচ্ছে। আবার ফিরে আসছে। উড়ে যাচ্ছে। ফিরে যাচ্ছে। একদিন শুনি পূর্বা জানালা দিয়ে বলছে, মৌমাতি, মিত্তি দ্যাও। মৌমাতি মিত্তি দ্যাও।
মেরী ওকে মধু দেয়। আর পূর্বা খেতে খেতে বলে, মৌমাতি মিত্তি দ্যাও।
বর্ষার দিনে মৌমাছি বাইরে যেতে পারে না। বাগানে ফুলের গাছ এলামেলো হয়ে পড়ে। আগাছায় ঢেকে যায়। বাক্স থেকে বেশি বেশি মরা মৌমাছি বের করি। মুখে দুশ্চিন্তা বাড়ে।

একদিন শ্রাবণের বৃষ্টির দিন পূর্বা আমার ঘুম ভাঙাল। বলল, বাবা তলো। বালান্দায় তলো।
ওর মা ঘুমিয়ে আছে। আমরা দুজন বারান্দায় এসে পড়েছি। মৌমাছির বাক্সের সামনে অনেক মৌমাছি পড়ে আছে। আর ভিতরে কোনো শব্দ নেই। পূর্বা বাক্সর গায়ে হাত বুলিয়ে দেখল। কান পেতে শুনল। তারপর আমার হাত ধরে ঘরে টেনে আনল। বলল, বাবা মিত্তি দ্যাও।
ফ্রিজ থেকে রসগোল্লা বের করে দিলাম। ও মাথা নেড়ে বলল, না। না। অই মিত্তি না।
মধুর বোতল দেখিয়ে দিল। একটি বাটিতে মধু দিলাম। ও দৌঁড়ে বারান্দায় চলে এল। মৌমাছির বাক্সের সামনে মধুর বাটিটা রাখল। বাক্সের কাছে মুখ রেখে বলল, খাও। মিত্তি খাও। মৌমাতি, মিত্তি খাও।

সুড় সুড় করে মৌমাছি বের হল। মধু খেতে শুরু করল। পূর্বা নাচতে নাচতে বলল, বাবা, মৌমাতি খাতথে। মৌমাতি খাতথে।

এই থেকে পূর্বা অতন্দ্রিলার সঙ্গে মৌমাছির খুব ভাব। এরপর ধীরে ধীরে টুনটুন পাখির সঙ্গে ভাব হল। আমাদের বেগুন গাছে বাসাও বানাল। কোত্থেকে একটি গরু এসে আমাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। জানালার দিকে ফিরে বলে, হাম্বা।
পূর্বা হাসতে হাসতে বলে, গলু। গলু।

হামিদ খান লাঠি ঠুক টুক করে একদিন আমার বাসায় এল। বললাম, কী খান সাহেব, ধানক্ষেতে কোনো সমস্যা?
হেসে বলল, না।
–তাহলে?
–আমার নাতিটারে দ্যাখতে আইলাম।
পূর্বা ততক্ষণে ভেতর থেকে সাড়া পেয়ে চলে এসেছে। হামিদ খানকে নিয়ে বারান্দায় চলে গেছে। বলছে, মৌমাতি। মৌমাতি মিত্তি খায়।
হামিদ খান ফোকলা দাঁত বের হাসে। দুজনে কলা খায়। আর মৌমাছিদের সঙ্গে গল্প করে। মুড়ি খায়। পেয়ারা খায়। কাউ ফল খেতে থেকে বলে, নাতিলো, আমালে মিত্তি দেবা না?
–তুমি কি মৌমাতি?
–মৌমাতির দাদু।

বলেশ্বরের পাড়ে লাহুড়ী গ্রাম। আমবাগান-বনবাগান- কলাবাগান। মাফলারের মত গোপাট। তারপর মাঠ। মাঠের মধ্যে ধান- সাক্করকোরা। বুড়ি পাগলী। মন্তেশ্বর। এরপর ছোট বাড়ি। দেখে বলি, অবনী- বাড়ি আছ?
পূর্বা বলে, ও বাবা, অবনীর বাড়িটা ভাল। দৌড়ে ভিতরে চলে গেল।
মিলাদ পড়ানো শেষ। নতুন ঘরে হুড়মুড় করে লোকজন ঢুকতে গেল। হামিদ খান দরোজা আগলে দাঁড়িয়ে আছে। বললে, না।
–কেন না?
–আমার নাতনী আগে যাইবে।
— আপনের নাতনী? নাতনী পাইলেন কৈ? মাইয়া আছে নি!
হামিদ খান বিড়বিড় করে কি সব বলতে লাগল। কেউ শুনতে পায় না। মুখটা ঘেমে উঠেছে। সবাই হাসে। ইমাম সাবের নামাজপুরে সালাম সিকদারের বাড়ি দাওয়াত। খামোখা দেরী। পুলিন সা লক্ষ্মীদিয়া থেকে আসতে দেরী করেছে। হাতে একছড়া শবরী মালতী ধান। বরল, হামিদরে- এইডা তর নতুন দর্জায় ঝুলাইয়া দে। দুগ্গা দুগ্গা।

কৈতরবানু ঝপাঝপ কয়েক খোলা চিতই পিঠা নামাল। ছোট্ট থালায় দিয়েছে গুড় মুড়ি। পূর্বা আঙুল দিয়ে লেপটে নিয়ে মুখে দিয়েছে। হাসিতে ভরে গেছে মুখ। কৈতর বানু বলে, মিডা লাগে?
-হুম।
একটা পিঠা ধরতে গিয়ে ছ্যাতা লেগেছে হাতে। লাফিয়ে উঠেছে। বলছে, গরম। গরম। কৈতরবানুর পিঠা পুড়ে গেল। তাড়াতাড়ি ফু দিয়ে ঠাণ্ডা করতে করতে বলল, মাইয়ার তর সয় না। একদম মায়ের লাহান।
পূর্বা পিঠা খায় গুড় মাখিয়ে মাখিয়ে। পিড়িতে বসে বসে আরও গুড় চায়। কৈতরবানু পিঠা বানায়।
বড়পোলা আবু রইস দৌড়ে এল। বলল, আব্বায় চেইতা গ্যাছে। অরে আটকাইয়া রাকসেন ক্যান?
–ত্যাক্ত করিস না রইস। যা তুই। অরে খাইতে দে।

আবু রইস কোলে তুলে নিল। দিল ছুট। লোকজন ঠেলে খান সাবের হাতে দিল। পূর্বা হাতপা ছুড়ছে। আর বলছে, আমার পিঠা। আমার পিঠা।
দরোজা খুলে দেয়া হল। অন্ধকার। ভিতরে টিমটিম করে একটি মাটির প্রদীপ জ্বলছে। তেলের গন্ধ। পূর্বা তার ছোট্ট পাটি রাখল চৌকাঠের ওপারে। একটি পুরনো হাওয়া এসে নিবিয়ে দিল দীপশিখাটি। ছোট মেয়েটি আঁতকে উঠল, বাবা- ও বাবা।
ঘুলঘুলি দিয়ে আলো এসে পড়েছে। একটু একটু করে স্পষ্ট হচ্ছে সব কিছু। ঘরের মধ্যে একটি ছোট খাট। খাটের উপরে একটি বাবু পরি বসে আছে। তার চোখ দুটি ঢলো ঢলো। নাকে নোলক। পূর্বা বলল- তোমার নাম কি?
–পরীবানু।
–কি করো?
–ঢেকি পাহার দেই।
খুট খট। খুট খুট। ঢেকিতে পাহার পড়ে। ধানের নাম মৌলতা। চিড়ামুড়ি হবে।
বাপো খাবে মায়ে খাবে
খাবে সোনার চান,
এই না চানের লাইগা আমি
না করিব মান।

কৈতরবানু জানালা খুলে দিয়েছে। আলোর ঝাপটানি ঘরটি ভাসিয়ে দিল। পরীবানু নেই। ছোট একটি কাঁথা পড়ে আছে খাটের উপরে। আর একটি খেলনা কাঠের ঢেকি। কিছুটা মলিন। ধাই ধাই জ্বর।

ইমাম সাব ঘরে ঘুরে দেখলেন ঘর দোর। বারান্দা। সিঁড়ি দিয়ে উপরেও উঠলেন। পুলিন সা এদিক চায়। ওদিক চায়। হাঁফাতে হাঁফাতে বলে, কী বানাইছসরে হামিদ। হ্যাতে দেহে ধানক্ষেতও দেহন যায়। অই যে তালগাছ। বলশ্বর। ঘাটে নাও বাঁধা।
এই ঘাটে কৈতরবানু একদিন ভোরবেলা দাঁড়িয়ে ছিল। কোলে জ্বরে নেতিয়ে পড়েছে পরীবানু। হামিদ খান চারিদিকে চায়। ছুটে বেড়ায়। তার নৌকা নেই। নৌকাটি কে নিল?

সেদিন পুড়ে গেল লক্ষ্মীদিয়া। পাখির মত নদীর পাড়ের মানুষগুলো বউয়ারী ধানের ক্ষেতে। দুধকলম শীষের ফাঁকে। শুয়ে আছে। যোগা গোন। জল এসে ভাসিয়ে নিয়েছে সব।
সালাম সিকদার উঠোনে পাড়া দিয়ে বলছে, ইমাম সাব, দেরী হৈয়া যায়।
কৈতরবানু খামছে ধরেছে সালাম সিকদারের হাত। নখ বসে গেছে। সিকদার যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে, চাচী, করেন কি? করেন কি?
কৈতরবানু ফ্যাস ফ্যাসে গলায় বলে, ক ত ছালাম, হেইদিন নাওডা লৈছিলি ক্যান? লৈছিলি ক্যান নাওডা?
ছালাম সিকদার পিছু হটতে হটতে বলে- সেই কথা কি মনে আছে? দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে বলে, মনে রাখার দরকার আছে আছে নি এদ্দিন পরে?

কিন্তু পুলিন সা’র মনে আছে। তার বাহুমূলে দগদগে গুলির ক্ষতটির মনে আছে। হাবিব সর্দারের মনে আছে। তার হাটুর উপরে বেয়নেটের খোঁচাটির মনে আছে। বউয়ারী ধানক্ষেতের মনে আছে। জোয়ারের জলের মনে আছে।

নৌকাটি ঘাটে এল। ততক্ষণে শিউলি গাছের নিচে পরীবানুকে শোয়ানো হয়েছে। নৌকার পাটাতনে বেশ কিছু গুলির খোসা। গান পাউডারের শেলের পাছা। কৈতরবানুর হাতে শূন্য কাঁথা। খেলনা ঢেকি। কিছু মলিন। এখনো জ্বর লেগে আছে।
পূর্বা পিঠা খেতে খেতে বলে, অ নানী, এই ফুলের নাম কি?
–শিউলী। শিউলী ফুল।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


5 Responses to নির্বাসন শিখিনি, মৃত্যু কবজ

  1. নীল নক্ষত্র সেপ্টেম্বর 9, 2010 at 3:42 অপরাহ্ন

    বেশ ভাল লাগল। :rose: :rose:

  2. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী সেপ্টেম্বর 9, 2010 at 7:07 অপরাহ্ন

    ঠিক। গল্পের অন্তর্গত ব্যাপ্তী পুরো যুদ্ধকাল।

  3. mahirmahir3@gmail.com'
    আহমেদ মাহির সেপ্টেম্বর 9, 2010 at 8:01 অপরাহ্ন

    সিদ্দিকী ভাই ও দিদির সাথে সহমত পোষন করে বলছি , গল্প ও এর গতিশীলতা আমার ভালো লেগেছে । :yes:

  4. অজ্ঞাতনামা কেউ একজন সেপ্টেম্বর 10, 2010 at 1:56 অপরাহ্ন

    কোন মন্তব্য নাই গো দাদা !

  5. রাজন্য রুহানি সেপ্টেম্বর 16, 2010 at 8:14 পূর্বাহ্ন

    পরে এস পড়েও ভালো লাগলো ঢের।

You must be logged in to post a comment Login