আল মামুন খান

অ্যানালগ রূপবান ও ডিজিটাল রোমিও – ২

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

দুই

টেবিলটা অনেক গোছানো। টেবিলের উপর একটা ডায়েরি। সেখানে ওর নিজস্ব কিছু কথা লিখা আছে। তবে এটা একান্তই ওর নিজের। প্রথম পাতায় লেখা – “মোহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম নীরব, দশম শ্রেণী, কলেজিয়েট স্কুল এন্ড কলেজ, চট্টগ্রাম।” বেশীরভাগ স্কুল পড়ুয়া ছেলের পড়ার টেবিল এলোমেলো থাকে। টেবিলের পিছনে বলিউডের না হলে হলিউডের যে কোন তারকার পোস্টার থেকে। ওর দেয়ালে সেটা নেই। তবে একটা জলরঙের সহজবোধ্য গ্রামের দৃশ্য রয়েছে। সেখানে রঙের তেমন আধিক্য নেই। নেই মাত্রাতিরিক্ত উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারও। একজন সহজ মানুষের সহজ মনের প্রতিচ্ছবি যেন এই পেইন্টিংটি। সাইফুল ইসলাম নীরব যে এমনই একজন সহজ মানুষ! ওকে মানুষ না বলে ছেলে বললেই বোধহয় ভাল শোনাবে। টেবিলে একটা খাতা আর একটা বলপেন রেখে নীরব আয়নার দিকে তাকালো ।. সবারই আয়নাতে নিজেকে দেখতে ভাল লাগে। নীরবের ও লাগে। তবে একটানা নিজেকে দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া না। চোরা চোখে মেয়েদের দেখার মতো ওর আয়নায় নিজেকে দেখতে ভাল লাগে। তবে আজ দীর্ঘক্ষণ ধরে নিজেকে দেখছে। বলিষ্ঠ পেটা শরীর। ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি একটু অনেক বেশীই আজকাল। এই উচ্চতা সে তার বাবার কাছে থেকে পেয়েছে। আর সব থেকে অদ্ভুত ওর চোখদুটো। জোড়া ভ্ররুর নীচে নীল চোখ আজকাল খুবই রেয়ার। সবাইকে মানায়ও না। তবে যারা নীরবকে দেখেছে, এই চোখের জন্যই ওকে বেশী আকর্ষনীয় মনে করেছে। নিঊ টেনের একজন ছেলের মত ওকে লাগে না। মনে হয় যেন সে ভার্সিটির স্টুডেন্ট। তবে ওর ব্যায়ামপুষ্ট শরীর স্কুলের সকল মেয়েদেরকেই ঢোক গিলতে বাধ্য করায়। আর ওদের চোখে সে কামনার আগুনও দেখতে পায়। কামনা! হ্যা, সে নিজেও এই অনুভুতির সাথে পরিচিত হয়েছে বেশীদিন হয় নাই। নীরব গোসল সেরে এসেছে এইমাত্র। টাওয়েল দিয়ে মাথা মুছে ফেলার ফাঁকে নিজের বুকের দিকে চোখ পড়ল। লোমশ কিন্তু ভালুকের মতো সারা শরীরে ভর্তি নয়। নিজেকে দেখে নিজেই সামান্য লজ্জা পেল সে। বেশ খানিকটা সুখী অহঙ্কা্রও বোধ করলো । হঠাৎ খেয়াল হল দেরী হয়ে যাচ্ছে। আজ বাটালী হিলে যাবার কথা আছে। মুকুলের সাথে সেই দশটায় দেখা করার কথা। নাস্তার টেবিলের দিকে দ্রুতো এগিয়ে গেল…

রিকশা থেকে ইস্পাহানির মোড়ে হাইওয়ে প্লাজার সামনে নামলেন কণা । রিকসাওয়ালা কিছু বাড়তি চাইলো । কেন যেন রিকশাওয়ালারা প্রায়ই এমন করে । কোন কথা ছাড়া টাকাটা দিয়ে পাহাড়ের পাকা রাস্তা ধরে চুপচাপ হাঁটতে থাকলেন তিনি ।’ বেশি উপরে যাওয়ার ইচ্ছা নাই। লোকজনের চোখের সামনে শব্দের নাগালের বাইরে কোথাও বসতে হবে । দেখে শুনে একটা সিঁড়ি বেছে নিলেন। বসলেন। ছোট্ট ব্যাগটার ফিতা কাঁধেই রইলো , ব্যাগটা কোলে রাখলেন । হাতের জিনিস ফেলে চলে যাওয়ার বদ অভ্যাস আছে । ব্যাগের উপর ডায়রিটা রাখলেন। কলমটা হাতে ছিলো । খাপ খুলে কলমের পিছনে আটকে দিলেন । খুব বেশি হারায় এই জিনিসটা । আরাম করে বসার পর ডায়রির মাঝামাঝি একটা পাতা খুললেন । কিছু রেফারেন্স আছে । সেদিন লাইব্রেরি থেকে আনা কিছু নোট । দু একটা মন্তব্য । কিছু চিহ্ন , কিছু আভাস … শুরুটা ভাবতে লাগলেন তিনি । সামনের কলোনিটা থেকে শুরু করা যায় ? অথবা রাস্তাটা থেকে ? আকাশের নীল থেকে শুরু করলে কেমন হয় ? নিজের ছোটবেলার একটা রাত মনে পড়লো । একটা অস্বস্তিকর রাত । সেই রাতে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে শুনে ফেলা দুই একটা কথা …আধ পরিচিতা সেই মহিলার আক্ষেপ… কি কষ্ট যে তার স্বরে ছিলো ! , ‘ তোমরা শুধু শরীরটাই চাও আর কিছু চাও না …’ তার উত্তরে মহিলার দেবর সম্পর্কের ওই লোকটার নিঃশব্দে মহিলার ছায়ার ওপর দখল নেয়া … প্রতিবাদে খাটটার চাপা আর্ত চিৎকার … ‘আহ্ !’ বুকটা জ্বলে যায় কণার… কেন সেদিন কণা উঠে ওই লোকটাকে দরজার পাশের মোটা কাঠটার এক বাড়িতে মেরে ফেললো না ! কেন একটা প্রচণ্ড চড়ে… !’

” এক্সকিউজ মি …” আপাদ মস্তক চমকে উঠলেন কণা । চোখের সামনের ছবিটা স্পষ্ট হবার পর দেখলেন দুজন অল্প বয়সী ছেলে সিঁড়ির শুরুতে দাঁড়ানো । কখন , কোথা থেকে আসলো ! দুজনের মধ্যে ছোটখাটো ছেলেটা আগে কথা বললো , ‘ আপনি আগে এক সময় এখানে প্রতিদিন ভোরে হাঁটতে আসতেন না?” কণার মুখ হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো । চোখে কিছু অবাক ভাব আর খুশি ঝিকমিক করে উঠলো । ” হ্যাঁ ” ” আমি কি তোমাকে চিনতাম ?” হেসে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি । ছেলেটা হেসে উঠলো , ” না , আমি আপনাকে প্রত্যেকদিন ভোরে দেখতাম । আমরা তিন বন্ধু ভোরে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময় আপনাকে পাহাড় থেকে নামতে দেখতাম । কথা হয় নাই । এইটের শুরুতে … অনেকদিন এইদিকে আসেন নাই । এইখানে আগে থাকতেন বোধ হয় । এখন থাকেন না । না? ” মৃদু হাসিমুখে কণা তাকিয়ে থাকলেন ছেলেটার দিকে । ” না , এখন একটু দূরে থাকি , আসা হয় না । ” ছেলেটা তার নাম জানালো , ” আমি মুকুল ।” পাশের ছেলেটার দিকে ইশারা করে বললো , “ও নীরব ।” “আমরা বন্ধু ” … হাসলো মুকুল । সামান্য হেসে নীরবের দিকে পুরোপুরি না তাকিয়েই চোখ সরালেন কণা । মনের ভিতর কোথাও একটু জ্বলে উঠলো হয়তো । একটু চেনা লাগলো বোধ হয় । চেনা কাউকে আজকাল ভালো লাগে না । ছেলেটা একটু বেশি সুন্দর । কণা অস্বস্তি গোপন করলেন । বেশ ভারী আওয়াজে এবার নীরব কথা বললো । ” কয়েকদিন আগে আপনি পাবলিক লাইব্রেরীতে গেছিলেন ?” কণা একটু অবাক হয়ে নীরবের চোখের দিকে তাকালেন । খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনেক কিছু যেন একসাথে হয়ে গেলো । নীরবের চেহারার সৌন্দর্য কণার মনে যে মুগ্ধতা আর অস্বস্তিতে পরিপূর্ণ করেছিলো তা মুহূর্তের জন্য কোথায় উধাও হয়ে গেলো তার ভাষা শুনে । ভরাট গলার আওয়াজটা সেই শূন্যতাকে নিমেষে ভরিয়ে দিলো । কি করে যেন হঠাৎ পরিবেশটা সহজ হয়ে গেলো । তিনি ঠিক মনে করতে পারলেন না নীরবকে পাবলিক লাইব্রেরীতে ঠিক কখন দেখেছেন । বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো । হাসিখুশি দুটো ছেলে । মুকুল যেচে নিজের সেল নাম্বারটা দিলো , ‘ কোনদিন লাগলে ডাকবেন । এই এলাকায় আমাকে সবাই চিনে , পছন্দ করে।

…… ‘ ওরা বিদায় নেবার পরেও মাথায় ঘুরতে লাগলো ব্যাপারটা । তিন জনের কথাগুলি । ছেলে দুটোর ভঙ্গি , চেহারা । লেখা হলো না । তবু মনটা হাল্কা লাগছিলো । লেখাটাকে আর খুব জরুরি মনে হচ্ছিলো না। মৃদু হাসিমুখে তিনি ঘরে ফিরলেন । ঘরের টুকিটাকি কাজের ফাঁকে ফাঁকে ভাবতে লাগলেন , ‘ প্রথম পরিচয়ে কেন এতো চেনা লাগে কিছু মানুষকে ! নিজের ষোল বছর বয়সটা মনে পড়লো । নানা রঙের দিনগুলি … !

জীবনে সুখ দুঃখের হিসাব ফাইনাল হয় না। একই ঘটনা নতুন ঘটনার পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন নতুন অর্থ নিয়ে আসে । নতুন নতুন সুখ দুঃখ নিয়ে আসে । কখনো ঘটনাগুলির এপাশ দেখি , কখনো ওপাশ। আজকের সকালটা কণার জীবনের উজ্জ্বল মুহূর্ত গুলি মনে করিয়ে দিলো । ঘরের চেনা দেয়ালটা অদৃশ্য হয়ে তাতে স্কুলের আগে , স্কুল , কলেজ , ভার্সিটিতে পড়ার একেক সময়ের একেক প্রিয় মুখ ছায়াছবির স্মৃতি থেকে এসে ভেসে গেলো চোখের ওপর দিয়ে । সে খুব মন দিয়ে আগের দিন গুলির মধ্যে খুঁজতে লাগলো নীরবের স্বর , কথার সুর , আওয়াজ আর নীরবতার মধ্যেকার দুরত্বের মাপ কোথায় কার ছিলো … ভ্রু গুলিও চেনা … ভাষাটা আরও অনেকের মতো , তবু কী যেন আলাদা …

এক সময় এমনই আলাদা কেউ মনে হতো রেজাকেও ।

মাত্র কয়েকটা বছর আগে ।

কত সুখী হয়েছিলো তারা একে অন্যকে পেয়ে ।

সংসার নামের বন্ধুর পথটাকে এতটুকু ভয়ের মনে হয়নি ।

পথ হারানোর দুশ্চিন্তা হয়নি ।

দুরত্বের আশংকা ছিল না।

কী গভীর বিশ্বাস নিয়ে তাদের বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিলো ।

কত দামী ছিল সেই সম্পর্ক । কখনো আর কেউ এই সম্পর্কের মাঝখানে এসে দাঁড়াতে পারে কখনো কি মনে হয়েছিলো ?

অথচ কত সহজে সব বদলে গেলো ।

কার্ল মার্ক্সের শ্রেণী সঙ্ঘাত মনে পড়তে ভিতরটা তেতো লাগতে শুরু করলো । টিকে থাকার অবিরাম সংগ্রাম … দখল প্রতিষ্ঠার জন্য মুহুর্মুহু সংঘাত … অসহনীয় সম্পর্কের বাঁধন … অসহ্য !

হতাশ কণার বুক ফুঁড়ে দীর্ঘশ্বাস ছিটকে বেরিয়ে এলো লাভার মতো। ‘ কেন এমন হয় ? কী করবে সে এখন ? জীবন্মৃতের এই জীবন সে কি করে বইবে ?

আতঙ্কিত হয়ে ভাবতে লাগলো , ‘ আরও অনেক বছর যদি বাঁচতে হয় !! … ‘

‘ পুরুষ ! ! শরীরের দায়ে না পড়লে নারী কখনো পুরুষকে কি সইতো , বইতো ? ‘ বিস্মৃতির অপর পাশে ভালোবাসার অলৌকিক সুখের মুহূর্ত গুলিকে রেখে এপাশে ছলকে ছলকে উঠতে লাগলো ঘৃণা … প্রত্যাখ্যাত প্রেম তীব্র রোষে ফুঁসতে লাগলো …

বারান্দার কোণে রাখা চেয়ারটা থেকে ছিটকে উঠে ডাইনিং রুমের ভিতর দিয়ে সোজা নিজের রুমের দিকে হেঁটে গেলেন । কিছু একটা করতে হবে । মাথায় , শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে ।

বিয়ের আগে এমন যন্ত্রণা হলে ঘর কাঁপিয়ে গান শুনতেন । এখন দ্রুত ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন । রাস্তায় কিছুক্ষণ হাঁটতে হবে …

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


2 Responses to অ্যানালগ রূপবান ও ডিজিটাল রোমিও – ২

  1. সালেহীন নির্ভয় ডিসেম্বর 6, 2014 at 2:33 অপরাহ্ন

    পুরুষ ! ! শরীরের দায়ে না পড়লে নারী কখনো পুরুষকে কি সইতো , বইতো ?

You must be logged in to post a comment Login