স্বতন্ত্র ভাবনায় জননীতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী

বিষয়: : নির্বাচিত শৈলী,প্রবন্ধ |

University of Gloucestershireআমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শ্রেণি বিভক্ত সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে; সমাজের মধ্যে মানুষের যেরকম বিভিন্ন শ্রেণি রয়েছে, যেমন – ধনী, মধ্যবিত্ত, গরিব, ইত্যাদি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝেও বিভিন্ন অলিখিত কিন্তু স্বপ্রকাশিত শ্রেণি বিদ্যমান, যেমন – পড়ুয়া, সাংস্কৃতিক-কর্মী, রাজনৈতিক-কর্মী, আড্ডাবাজ, ইত্যাদি। সমাজে বিদ্যমান শ্রেণিসমূহের মাঝে যেরকম দূরত্ব থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝেও সেরকম দূরত্ব প্রতিভাত হয়; শ্রেণি সম্পর্কের বৈরিতা ও মেরুকরণ শিক্ষার্থীদের উদ্দীপ্ত করে তাদের মাঝে একই ধরণের শ্রেণি সম্পর্ক গড়ে তুলতে (এটি-ই যে একমাত্র ও প্রধান কারণ, তা কিন্তু নয়, আরো অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারণ বিদ্যমান থাকতে পারে; তবে আমার মতে, এটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে)। ফলে প্রতিষ্ঠান ও বিভাগ একই থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা বিভক্ত ভিন্ন ভিন্ন ধারায়, আদর্শে ও পন্থায়। ভিন্নতা সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এবং এটি সমাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রভূত শক্তি প্রদান করে – এই মত হার্বাট স্পেন্সারসহ অনেক সমাজবিজ্ঞানীর; আমি এই মতকে বাস্তব-গ্রহণযোগ্য মনে করি, কিন্তু আমাদের শিক্ষার্থী সমাজ পারস্পারিক-সম্পর্কহীনভাবে ভিন্ন হয়ে যান, আর এইখানেই বাঁধে বিপত্তি, ফলে তারা একজন অন্যজনের ভর্ত্সনার শিকার হন, এবং সামাজিক সম্পর্ক সমাপ্তির দিকে চলে যায়।

 

বিভক্ত শ্রেণিসমূহের শিক্ষার্থীসমাজ নিজস্ব শ্রেণিতে অবস্থান পাকাপোক্ত করতে মরিয়া থাকেন, এবং স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিচরণশীল থাকায় তারা মন-মননে হয়ে যান রক্ষণশীল ও কার্যে একমাত্রিক; ফলে, তারা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয় ও কর্মে অমনোযোগী থাকেন। যারা পড়াশোনায় বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত তারা মনে করেন, যেহেতু রাজনীতি তারা করেন না, সেহেতু তা নিয়ে মাথা না ঘামানোই উচিত; রাজনীতি নিয়ে শুধু তারাই কথা বলবে, যারা রাজনীতিবিদ বা যারা রাজনীতি করে। তাই, তাদের মধ্যে অধিকাংশই দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কোনো সমস্যা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবেন না, এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার নিমিত্তে যেকোনো ইতিবাচক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করেন। তারা শুধু তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চান, এবং সেই নিজস্ব ক্ষেত্রে সফলতা-ব্যর্থতার হিসাব-নিকাশ করেন; ফলে, তারা সচেতন বা অবেচতনভাবেই ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণি তৈরি করে ফেলেন, এবং পরস্পরের মধ্যে কৃত্রিম দূরত্ব তৈরি করেন, মানুষ হিসাবে স্বার্থপর হয়ে উঠেন, এবং একমুখী জীবনযাপন ও কর্মে অভ্যস্ত হয়ে যান। তাদের জীবন ও কর্মের এহেন দৃষ্টিভঙ্গি থাকার ফলেই তারা স্বজ্ঞানে বা অজ্ঞানে সামাজিক জীবন থেকে বিছিন্ন হয়ে যান; এবং এই বিছিন্নতা-ই সমাজ-অগ্রগতিতে বিরাট প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে, সমাজে দমন-পীড়ন চালানোর জন্য এই বিছিন্ন জীবন-পদ্ধতি-ই একদল মানুষকে অনেক বড় সুযোগ করে দেয়।

 

‘রাজনীতি’ এ শব্দটিকে আমি অনুপযুক্ত মনে করি; কেননা ‘রাজনীতি’ মানে ‘রাজার নীতি’, আর এই নীতি আমাদের এখন প্রয়োজন নেই, আমাদের ‘জনগণের নীতি’, অর্থাৎ ‘জননীতি’ প্রয়োজন। ফলে, আমার দর্শনে ‘জননীতি’ শব্দটি ‘রাজনীতি’ শব্দের চেয়ে সংগত; কিন্তু সহজে বোঝার সুবিধার্থে, আমি এখানে ‘জননীতির’ পরিবর্তে ‘রাজনীতি’ শব্দটি ব্যবহার করছি।

 

গণতন্ত্রের সূতিকাগার প্রাচীন গ্রিসে ‘রাজনীতি’ ও ‘সমাজ’ দু’য়ের মাঝে কোনো তফাৎ ছিল না; তারা ‘রাজনীতি’ ও ‘সমাজ’কে একই অর্থে গ্রহণ করতো। রাজনীতির বাইরে আলাদা সমাজজীবন থাকতে পারে – এরকম কোনো ধারণা তারা কখনো কল্পনাও করেনি; তাই, তারা রাজনীতিকে একটি আর্ট হিসাবে নিতো, এবং “উত্তম জীবনধারণের জন্য রাজনীতি’’ – এই নীতি বিশ্বাস ও চর্চা করতো। আর এখন আমাদের শিক্ষার্থীসমাজ, শিল্পীসমাজ, লেখকসমাজ – ইত্যাদি বিভিন্ন গোষ্ঠী তারা রাজনীতি বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে থাকতে চান। তারা মনে করেন, “রাজনীতি করবে একদল লোক, ঐ একদল লোক ছাড়া রাজনৈতিক জীবন ও কর্মকাণ্ড নিয়ে আর কেউ আগ্রহ প্রকাশ করবে না”। যেখানে আড়াই হাজার বছর আগের গ্রিকরা রাজনীতিকে জীবনের সাথে সম্পৃক্ত মনে করতো, সেখানে স্বঘোষিত আধুনিক সময়ের আমরা রাজনীতিকে জীবনের সাথে অসম্পৃক্ত মনে করি; আমদের এই বদ্ধমূল ধারণাকে আমরা মানসিক-সাংস্কৃতিক উন্নতি না অবনতি বলতে পারি – সেটা দেখার বিষয়। সমাজে যদি অন্যায়, অত্যাচার, ব্যভিচার বিদ্যমান থাকে; একদল মানুষ অফুরন্ত সম্পদের মালিক, আরেকদল নিঃস্ব; ক্ষমতা যদি একদল মানুষের হাতে কুক্ষিগত থাকে; তাহলে সেই সমাজের শিক্ষক, লেখক বা শিল্পী হয়ে লাভ কী? যেখানে অধিকাংশ মানুষের মানবিক চাহিদাগুলো একদল মানুষ ভোগ করছে, সেখানে কার জন্য ক্লাসে লেকচার দেয়া, কার জন্য ধ্রুপদী সাহিত্য রচনা করা? মানুষ মারা যাচ্ছে, সমাজে অন্যায় ও বিশৃঙ্খলা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, আর ঐ দিকে একদল লোক শিক্ষা, সাহিত্য, ও সংস্কৃতি চর্চায় অবিরত ব্রত! যে মানুষের জন্য এসব রচনা, সে মানুষ যদি বেঁচে না থাকে, মানবিক জীবনবোধ যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে এসব বাহুল্যের কি কোনো প্রয়োজন আছে?

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব জীবন নিয়ে খুব ব্যস্ত; কেউ ফার্স্ট ক্লাস চাকুরীর স্বপ্ন দেখছেন, কেউ স্কলারশিপের জন্য আইইএলটিএস, জিআরই এর জন্য মাথা ঘামাচ্ছেন, কেউ দক্ষ সংগঠক হওয়ার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন; কিন্তু কেউ স্বপ্ন দেখছেন না দক্ষ রাজনীতিবিদ হওয়ার, দেশে দুর্নীতির অবসান ঘটাতে, এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে কেউ কাজ করছেন না। সবাই নিজ নিজ স্বার্থের জন্য লড়ছেন; কিন্তু সমাজ ও দেশের স্বার্থের ব্যাপারে তারা নির্লিপ্ত থেকে যাচ্ছেন – এর চেয়ে বড় প্রতারণা হতে পারে না। তাই, শিক্ষিত হয়ে আমরা অনেক বড় প্রতারক হয়ে উঠছি, এবং আত্মকেন্দ্রিক জীবনযাপনে নিজেদেরকে আবদ্ধ করে ফেলছি।

 

রাজনীতি করতে হলে মার খেতে হবে, প্রতিবাদ করতে গেলে পুলিশের বা প্রশাসনের নির্যাতন সহ্য করতে হবে, এই ভয়ে যারা রাজনীতি করছেন না, তারা কি মনে করেন, তারা নিরাপদ? রাজনীতি করছেন না বলে তারা কোনো দিন নির্যাতন বা অন্যায়ের শিকার হবেন না? তারা যদি এরকম ধারণা পোষণ করে থাকেন, তাহলে নিঃসন্দেহ বলা যায়, তারা বাস্তবতা বহির্ভূত জীবনযাপন করছেন; কারণ তারা রাজনীতি করছেন না বিধায় একদল অসৎ, নীতিহীন, ধান্ধাবাজ মানুষ বিরাট সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে, হাতের কাছে ক্ষমতা পেয়ে তারা হয়ে উঠছে অনেক বড় জুলুমকারী। গুম, হত্যা, অত্যাচার, চাঁদাবাজি, জালিয়াতি – এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যা তারা করছে না, বা করতে পারে না। একটি বিষয় খুব লক্ষ্য করার মতো – আমরা অনেক সময় দেখি, একজন মানুষ, যেমন – পলান সরকার সমাজের জন্য অনেক ভাল কাজ করে যাচ্ছেন; কিন্তু দেখা যায় যে, তথাকথিত ক্ষমতাধর দলগুলোর রাজনীতিবিদরা সবাই একসাথে মিলেও কোনো একটি ভাল কাজ করেন না, তবে শয়তানী ও বদমাশি কর্মকাণ্ডে তাদের সরব-সক্রিয়-উপস্থিতি পাবেন। পত্রপত্রিকা পড়ে যখন আমি তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত হই, তখন এ বিষয়টি চিন্তা করে হতবিহবল হয়ে যাই। তবে এটি ধ্রুব সত্য যে নীতিহীন, দূর্নীতিপরায়ণ, ক্ষমতা ও সম্পদলোভী মানুষদের দ্বারা সমাজ ও জনকল্যাণমূলক কোনো কাজ-ই করা সম্ভব নয়; তারা অসৎ উপায়ে নিজেদের কল্যাণ করতে সদা সচেষ্ট, জনগণ ও সমাজের কথা ভাবার মতো বোধ তাদের নেই। ফলে, আজ যারা পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটবে ও জীবনের ঝুঁকি থাকার কারণে রাজনীতি করছেন না, একদিন তারা দেখবেন যে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও স্বজন-প্রীতির কারণে তাদেরকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না, চাকুরীর পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গেছে; সংগঠকরা দেখবেন যে চাঁদাবাজি ও হুমকি-ধমকির কারণে সংগঠন চালাতে পারছেন না। সারাজীবন সৎ ও নিরাপদ থাকতে চাইলেন, কিন্তু সে সময় আপনি সবচেয়ে অনিরাপদ ও অসহায়ত্ববোধ করবেন; তখন আপনাকে অন্যায় মেনে নিয়ে আপোষ করতে হবে, আপনি বঞ্চিত হবেন আপনার ন্যায্য পাওনা থেকে; তখন মনে হবে, সারাজীবন এরকম নির্লিপ্ত ও প্রতিবাদহীন জীবনযাপন করে কী লাভ হলো? এ জীবনযাপন কার জন্য করলেন?

 

অন্য কারো জন্য নয়, নিজেদের বাঁচার জন্য ও ন্যায্য অধিকার পাবার লক্ষ্যে ছাত্রছাত্রীদেরকে অবশ্যই রাজনীতি করতে হবে; এছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। শুধু রাজনীতি করলেই হবে না; রাজনীতির সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও দর্শন থাকতে হবে, আর সেটি যদি না থাকে তাহলে রাজনীতির করার কোনো তাৎপর্য-ই থাকে না। কার জন্য রাজনীতি, কে লাভবান হবে, কে ক্ষতিগ্রস্ত হবে? – এসব বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা না থাকলে রাজনীতি হয়ে যাবে অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ ও ক্ষমতা-নীতি; আর এধরণের রাজনীতি জনগণের কল্যাণের চাইতে অকল্যাণ-ই বেশি করে। আমরা দেখি, অনেক বড় বড় দলের অগণিত রাজনৈতিক কর্মীরা কীভাবে গুণ্ডামি, মার্ডার, চাঁদাবাজি, জালিয়াতি করে; তাদের এরকম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড জনগণকে আরো ভীত, সন্ত্রস্ত, ও নিঃস্ব করে দেয়; ফলে, জনগণ তাদের উপর প্রীত থাকার চেয়ে রুষ্ট-ই থাকে। ভালোর চেয়ে মন্দ নিয়ে আসার কারণে এরকম রাজনীতি হচ্ছে ভাইরাস; মারাত্মক ও ভয়াবহ রকমের ভাইরাস। এই ভাইরাস যাতে ছড়িয়ে না যায় এবং এটিকে যাতে উপড়ে ফেলা যায় – এরকম রাজনীতির (জননীতির) চর্চা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবশ্যই শুরু করতে হবে; কেননা এটি ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প আমাদের সামনে নেই।

 

সৈয়দ মাহী আহমদ, শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশবিদ্যালয়, সিলেট।

syedmahiahmed618@gmail.com'
শিক্ষার্থী , সমাজবিজ্ঞান বিভাগ , শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় , সিলেট ।
শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করার জন্য আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে। Login