নীল নক্ষত্র

নক্ষত্রের গোধূলি-৫

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

বাসায় এসে সারা দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে মনিরার সাথে আলাপ করলেন।
মনিরা বললো তা হলে ওদের সাথে যেয়ে দেখে আস, কাল রফিক ভাইকে জানিয়ে দাও।
পর দিন কিছু কাপড় চোপড় আর কয়েকদিন থাকতে হলে যা যা প্রয়োজন তা একটা ব্যাগে গুছিয়ে মনিরা রাশেদ সাহেবের হাতে দিয়ে বললেন দেখ কি হয় যতদুর সম্ভব সহ্য করার মত মন মানসিকতা নিয়ে দেখে আস যদি কিছু হয়।
রাশেদ সাহেব মনির হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে নারায়নগঞ্জের শীতলক্ষ্যার পাড়ে একটা তেলের ডিপোতে ভেড়ান রফিকদের তেল বাহী কোস্টার জাহাজে এসে উঠলেন।

মহিউদ্দিন জাহাজে ছিল। রাশেদ সাহেবকে আসতে দেখে নেমে এসে হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে তার এক স্টাফের কাছে দিয়ে বললো ইনি আমার সিনিয়ার ভাই ইনার ব্যাগটা আমার পাশের যে রুমটা ঠিক করেছ সেখানে রেখে এসো। রফিক তাদের ডিসচার্জ করা তেলের হিসেব নিকেশ করার জন্য অফিসে গেছে, ও ফিরে এলেই জাহাজ ছেড়ে দিবে। অনেক দিন পর এই পথে চিটাগাং যাবার জন্য এসেছেন, মনের মধ্যে একটা কেমন যেন তোল পার করা ভাব এসে উদয় হলো। আবার সেই পথে! যে পথ ছেড়ে দিয়েছি প্রায় আটাশ বছর আগে। মানুষের নিয়তি কখন কোথায় নিয়ে যায় কে জানে।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই রফিক ফিরে এলো।

মহিউদ্দিন উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি হলো?
আর বলো না, আজ ছয় দিন যাবত পানির নিচে জাহাজের ট্যাঙ্কে থেকে তেলের টেম্পারেচার দুই ডিগ্রী কমেছে বলে তেলের ভলিউম কমবে না?তা ডিপো ম্যানেজার কিছুতেই মানবে না। উনি চিটাগাং থেকে লোড করার পর যে টেম্পারেচার ছিল সেই টেম্পারেচার ধরেই হিসেব করছে, স্বাভাবিক ভাবেই সাত আট শ লিটার ঘাটতি দেখাচ্ছে। বারবার তাকে বোঝাচ্ছি ডিসচার্জ করার সময় যে টেম্পারেচার পেয়েছেন সেই হিসাব করুন, না তিনি তা মানবেন না। আধা ঘন্টা ধরে এই ঝামেলা। আজকের টেম্পারেচার দিয়ে হিসেব করে দেখালাম তাতে ওই পরিমান গেইন হয় কিন্তু হলে হবে কি, সে কিছুতেই তা মানতে রাজী না। দেখলেন রাশেদ ভাই, শেষ পর্যন্ত তার হিসেবেই মেনে নিয়ে আসলাম। কি করবো মেনে নিলাম, না হলে হয়ত দেখা যাবে সামনের এক মাসেও কোন ট্রিপ দিবে না। আর একটা ট্রিপ যদি মিস করি তাহলে কোম্পানির কত লস হবে বুঝতে পারছেন। এই হচ্ছে এখনকার অবস্থা।

তাহলে তোমরা এর কোন প্রতিবাদ কর না কেন?সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিকে ডাকতে, তারা এসে দেখত বাস্তবে কি পরিমান লস বা গেইন হয়েছে।
বলছি কি, বুঝতে পারছেন না? কোম্পানির খোদ এমডি এলেও তো ফলাফল একই দাঁড়াবে। আগামী এক মাসেও একটা ট্রিপ দিবে না। কোম্পানি এটা জানে আর জানে বলেই আমাদের কিছু বলে না। এর আগে আপনি যখন ছিলেন তখন সুইপিং ছিল ৫% আর এখন কত জানেন?মাত্র ২%, তার পরেও এই অবস্থা।
তাহলে এরা এটা দিয়ে করে কি?
কি আর করবে,  বিক্রি করে দালান বানায়, ব্যবসা করে।

কার কাছে বিক্রি করে?
কি যে বলেন রাশেদ ভাই আপনি এত দিন বিদেশে থেকে আর সরকারি চাকরী করে দেশের এই সব নোংরামির খবর রাখতে পারেননি। যাক এ নিয়ে আর মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। চল মহিউদ্দিন জাহাজ ছেড়ে দাও নয়তো আবার সারা পথ স্রোত ঠেলে যেতে গিয়ে জ্বালানী খরচ বেড়ে যাবে।
এতক্ষণ জাহাজ স্ট্যান্ডবাই করা ছিল, যে কোন সময় বন্দর ছেড়ে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিল।
চলেন ব্রিজে যাই।
চল।

ব্রিজে এসে জাহাজ ছেড়ে দিল। ঘন্টা খানেকের মধ্যে শীতলক্ষ্যা নদীর কূল বেয়ে নারায়নগঞ্জ শহর ছাড়িয়ে খোলা জায়গায় আসতেই মহিউদ্দিন কলিং বেল টিপে তার স্টুয়ার্ড কে ডেকে চা নাস্তা দেবার জন্য বলে দিল।
বর্তমান চাকরীর এই সব আরো ঘটনা নিয়ে, রাশেদ সাহেবের পরিণতি নিয়ে আলাপ হলো। রফিক, মহিউদ্দিন এবং রাশেদ সাহেব সবাই সবার কথা মন দিয়ে শুনলেন।

মহিউদ্দিন বললো রাশেদ ভাই, আপনি কি পারবেন এই অবিচার মেনে নিতে?ট্রেনিং সেন্টারে আমরা যে আপনাকে কি ভয় পেতাম তা আমাদের ব্যাচের প্রতিটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন। শুধু ভয় না ঠিক তার সাথে আপনাকে সব সিনিয়রের চেয়ে বেশি সমীহ করে চলতাম। আপনার নীতি বোধ, ব্যক্তিত্ব সব কিছু আমরা ফলো করার চেষ্টা করতাম। আপনি জানেন না, আপনার অবর্তমানে ইকবাল আর সেলিম আপনার ভয়েস নকল করে আপনার মত হেটে অভিনয় করে দেখাত। আর আজ সেই আপনাকে এই সামান্য চাকরী খুঁজে বেড়াতে হচ্ছে। এটা কি ধরনের পরিহাস ঠিক বুঝতে পারছি না।

রফিক সাথে সাথে বলল আমি কিছুতেই এই অংক মিলাতে পারছি না। আপনি সেদিন যাবার পর থেকেই আমি ভাবছি কিন্তু কোন কুল কিনারা পাচ্ছি না। আচ্ছা ভাই এ দেশে কিছু খোঁজার চেয়ে ইংল্যান্ডে চলে যান। আপনার সব ভয়েজ তো বৃটিশ কোম্পানিতে আর গত বার না আপনি ওখানে গিয়েছিলেন, কাজেই আমার মনে হয় আপনার ভিসা পেতে কোন সমস্যা হবে না।
মহিউদ্দিনও বললো হ্যা ভাই আমারও তাই মনে হচ্ছে এটাই ভাল হবে।

তোমরা ঠিক বলেছ, তবে নিজ দেশ ছেড়ে কে বিদেশে যেতে চায় বল?তোমরা বা আমি সবাই তো বিদেশে থেকে এসেছি তাই না? কাজেই বিদেশের কি সুখ তা যেমন আমি জানি তেমনি তোমরাও জান। আমাদের এই দেশের মত আর কোথায় এতো সুখ এতো শান্তি আছে বলতে পারবে?হ্যা মানি যে চাকচিক্য বা জৌলুশ আছে চোখ ধাঁধানো রঙের বাহার আছে, প্রাচুর্য আছে কিন্তু শান্তি আছে?দেখি শেষ পর্যন্ত হয়ত তাই যেতে হবে।

ঢাকা শহর বল বা এই আমার নিজ দেশ বল এখানে আমার জায়গা নেই। হিসেব করে দেখ কত দিন আমি এদেশে থাকতে পেরেছি?তোমাদের সাথে তো আজকের সম্পর্ক নয়, গত প্রায় ত্রিশটা বত্সর যাবত আমাকে দেখে আসছ, মাঝখানে একটু দেখা সাক্ষাত না হলেও আমরা প্রত্যেকেই কিন্তু সবার খোজ খবর জানতাম। সত্যিই এ দেশ আমার জন্য নয়। এদেশের মাটিতে আমার মত হত ভাগার ঠাঁই নেই। দেশকে আমি যত ভালোবাসি, এ দেশের আকাশ, বাতাস, মাটি, পানি সবই আমার কত প্রিয়। দেশের মায়ায় বিদেশে থেকে যাবার মত কোন চিন্তা ভাবনা করিনি, চেষ্টা তো দূরের কথা। তোমরা জান না, মিজান জানে, আবুধাবীতে এডনক রিফাইনারিতে ভালো একটা চাকরী পেয়েছিলাম। পুরো ফ্যামিলি নিয়ে ওখানে থাকতে পারতাম। ক্যাপটেন বারকি কত বলেছে চল আমাদের ইউকেতে চল, আমি তোমাকে নিয়ে যাব, গেলে হয় তো এতো দিনে বৃটিশ নাগরিক হয়ে যেতাম, তবুও যাইনি শুধু দেশের মায়ায়। আর দেশ বারবার নানা ছল ছুতা ধরে আমাকে দেশের বাইরে পাঠাবেই। আমার ভাগ্য যদি এমনই হয় তাহলে যেতে হবে। এখানে যখন আমার একটু খানি জায়গা হবে না তাহলে আর কি করবো  চলেই যাই।
এ পর্যন্ত বলে রাশেদ সাহেব হেসে ফেললেন।
তার মনে পরে গেল লিটনের বাবার কথা। রাশেদ সাহেব যখন চাকরী করতেন তখন সেখানকার এক গানের শিল্পী তার সাথে অপরূপা তিলোত্তমা ঢাকা শহর দেখার জন্য বেড়াতে এসেছিল। তাদের এক প্রতিবেশি ছিলেন যিনি রেডিও বাংলাদেশে একজন পদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। রাশেদ সাহেবের অতিথি গান গায় জেনে তার গান শোনার জন্য ডেকে পাঠালেন। গান শুনে আলাপের সময় বললেন এতো বড় ঢাকা শহরে আমাদের রাশেদের একটু জায়গা হোল না।

রফিককে কথাটা বলেই রাশেদ সাহেব আরো জোড়ে হাসতে লাগলেন। এই হাসির আড়ালে যে কত কষ্ট লুকিয়ে ছিল তা এক মাত্র রফিক আর মহিউদ্দিন ছাড়া আর কেউ জানতে পারেনি।
হাসি থামার পর বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা, কারো মুখে কোন কথা নেই। এমন সময় স্টুয়ার্ড এসে নীরবতা ভেঙ্গে দিল,
স্যার ডিনার টেবিল কি রেডি করব?
মহিউদ্দিন হাতের ঘড়ি দেখে রাশেদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, রেডি করতে বলি?
বল। (চলবে)

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


5 Responses to নক্ষত্রের গোধূলি-৫

  1. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী সেপ্টেম্বর 29, 2010 at 10:25 পূর্বাহ্ন

    :rose: :rose: :rose:

  2. নাসিম মুসা সেপ্টেম্বর 29, 2010 at 10:32 অপরাহ্ন

    সুদর্শনা উপন্যাস!

  3. নীল নক্ষত্র অক্টোবর 1, 2010 at 12:32 অপরাহ্ন

    ধন্যবাদ।

You must be logged in to post a comment Login