নীলসাধু

নিশিকন্যা

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page
কদিন ধরে কাজে যেতে পারছে না সুমি ।
এমন শীত। উফ ! বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না সন্ধ্যার পর। কদিন এমন শীত থাক কে জানে। তার উপর শরীর খারাপ করেছে। মাসের এ কয়েকটা দিন খুব খারাপ কাটে সুমি’র। একটা অসস্তি ঘিরে রাখে। শীত আর শরীর খারাপ কোনোটার উপর তার নিজের কোন হাত না থাকলেও এখন সে দুইটার উপর বিরক্ত। বেশ বিরক্ত বলা চলে। নিজের শরীর আর মরার শীতের উপরে রাগে ফুসে উঠছে সে । গরীবের সুখ নেই। মনে মনে গজগজ করতে থাকে সুমি। ঘরে চাল নেই। মুদি দোকানে বাকি জমে গেছে। সেও আর বাকী দেবে বলে মনে হয়না। বস্তিতে ধার পাওয়া যায় না। সুদে টাকা ছাড়া এক টাকা ও কেউ কাউকে দেয়না। কে দেবে? সবার এক অবস্থা। খেয় না খেয়ে পরে আছে। বাচ্চা দুইটা কই কই ঘুরছে কে জানে । সকালেও কিছু খায়নি। দুপুরেও খাবার নেই । রাতে না খেলে ঘুম আসেনা। পেটে ক্ষুধা নিয়ে ঘুম হয়? নাহ ! আজ বের হতেই হবে। দেখাযাক কপালে কি আছে। যদি ভাগ্য ভাল থাকে তাহলে কিছু জুটে যেতেও পারে।

সাতপাচ ভেবে সুমি ঘর থেকে বের হয়। কদম ভাইয়ের খোজ করতে হবে। সুমি বাইরে গেলে সাধারনতঃ কদম ভাইকে নিয়ে যায়। কদম ভাই লোকটা ভালো । পুলিশের সঙ্গে ভালো খাতির। আর সুমির সঙ্গে খারাপ কিছু করে না। বিপদে ভরসা রাখা যায় । এমন এক কাজ করে সে যে পারে সেই সুযোগ নিতে চায়। গায়ে হাত দিতে চায়। যেন জগতে সে এসেছে শুধু অন্যের জন্য মজা আর আনন্দ বিলাতে। কপাল আরে কাকে বলে। দুইটা বাচ্চার কথা ভাবে সে। নাহলে কবে রেলের নীচে ঝাপ দিতো । জীবন জুড়াতো, পাপ কম হত, শান্তিও পেত। তা আর হল কই? নষ্ট জীবন বয়ে বেড়াতে হচ্ছে । সামনের গ্যারেজে কদম ভাইকে পেয়ে বলে এলো । সন্ধ্যায় বের হবে। কদম রাজী হতে চায়নি। এই দিনে নাকি খদ্দের পাওয়া যাবে না। সুমি জোর করে বলেছে। ঘরের অবস্থা শুনে কদম ভাই বলেছে, চল । যদি পাস তাহলেতো ভালোই।

সংসদ ভবনের রাস্তায় রিকশা নিয়ে এপাশ ওপাশ করছে। লোকজন তেমন নেই। একটু আগে হাইকোর্টের মাজার থেকে এসেছে। সেখানে সুন সান নীরবতা। এই শীতের সন্ধ্যায় কে আর কাজ ছাড়া বের হয়। পেটে ক্ষুধা, বাচ্চা দুইটাকে দোকান থেকে ৫ টাকার মুড়ি কিনে দিয়ে এসেছে। বলে সেছে কিছুক্ষন পর এসে ভাত রেধে খাওয়াবে। খুশীতে চকচক চোখ মুখ নিয়ে দুজন মুড়ি খেতে বসেছে। আহারে! মায়ায় আদ্র মন নিয়ে পাপের উদেশ্যে ঘর ছেড়েছে সুমি। অনেক ক্ষন হয়ে গেলো । কোন খদ্দের মিলেনি। কি করে রাতের খাওয়া জুটবে, কদম ভাইয়ের আধ বেলার টাকা দেবে এসব ভাবতে ভাবতে মনে মনে অস্থির সুমি।

হঠাত করে কদম ভাইয়ের কথায় সম্বিত ফেরে।
: কিরে আর কতক্ষন ঘুরবি?
: কি করুম কদম ভাই, ঘরে এক দানা চাল নাই। মুদি দোকানে বাকী। আর চাওন যায়না। পোলা দুইটা না খাইয়া আছে। আসনের সময় কইয়া আইছি, আইসা ভাত রান্ধুম। এহন কেমনে যাই। তুমার টেহা দিমু কেমনে? কিচ্ছু বুজতাসি না কদম ভাই।
: আমার টেহার কথা বাদ দে। নিজের কথা ভাব। নিস্পৃহ ভাবে বললো কদম ভাই।
: কদম ভাই, চল চন্দ্রিমা উদ্যানে যাই। ঐহানে পাওয়া যাইতে পারে।
: চল। বলে কদম রিকশা ঘুরালো চন্দ্রিমা উদ্যানের দিকে ।

খামার বাড়ীর মোড়ে সুমির রিকশার সামনে থামলো দামী একটি গাড়ি। সুমির চোখ চক চক করে উঠলো । আস্তে করে কদম ভাইকে থামতে বললো।
: দেখ-তো কদম ভাই। ওদের লাগবো নাকি? মনে লয় আল্লাহ কাম একটা দিসে । সুমির গলায় খুশীর সুর।
: তুই বয় রিকশায়। আমি দেহি। বলে কদম নেমে এগিয়ে গেলো গাড়ীর কাছে ।

সুমি রিকশায় বসে দেখলো কদম ভাই মুখ বাড়িয়ে কথা বলছে। গাড়ীতে কে আছে বোঝা যাচ্ছে না। অনেক্ষন পর ফিরে এলো কদম ভাই।
: যাইবি সুমি? সারা রাত থাকতে হইবো । ৫০০ দিবো। রাজী থাকলে ক?
: আচ্ছা যাইমু, তুমি কিছু টেহা লইয়া যাওগা। হাসুনির মারে কইডা চাইল দিয়া ভাত রাইন্ধা দিতে কইবা? পুলা দুইটা খাইয়া ঘুমাইতে পারবো।
আমি বিয়ান বেলা আমুনে।
: আইচ্ছা । কমুনে।
একটু থেমে কদম ভাই বললো, হুন সুমি, যাইবি, তুই? পুলা দুইটা ছোড ছোড, কার পুলা কে জানে, বাসায় কেউ নাই মনে হয়, এই আকাম করতে বাইর হইসে।
: ইতা চিন্তা কইরা লাভ নাই কদম ভাই, আমরার পেটে ভাত নাই।

কদম আর কথা বাড়ালো না। গাড়ীর কাছে ফিরে গিয়ে টাকা নিল । সুমিরে তারাতারি গাড়ীতে তুলে দিয়ে রিক্সা ঘুরালো বস্তির দিকে ।
সুমি গাড়ীতে বসেই, টের পেলো । কদম ভাই এর কথা ঠিক । কত আর বয়স হবে পুলা দুইটার । হের নিজের পুলার থেইকা কয়েক বছরের বড় । মনটা কেমন করে উঠলো । পাপ করলেও মনের অন্দরে পাপীও কিছু বিশ্বাস লালন করে। সেই মন থেকে একটা নিষেধ টের পেল।
কিচ্ছুক্ষনের মধ্যেই সুমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো তার বুকে চাপ বাড়ছে, তাকে অষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বুক খামচে ধরেছে তারই সন্তানের বয়সী আজকের খদ্দের।

নিশিকন্যা

কদিন ধরে কাজে যেতে পারছে না সুমি ।
এমন শীত। উফ ! বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না সন্ধ্যার পর। কদিন এমন শীত থাক কে জানে। তার উপর শরীর খারাপ করেছে। মাসের এ কয়েকটা দিন খুব খারাপ কাটে সুমি’র। একটা অসস্তি ঘিরে রাখে। শীত আর শরীর খারাপ কোনোটার উপর তার নিজের কোন হাত না থাকলেও এখন সে দুইটার উপর বিরক্ত। বেশ বিরক্ত বলা চলে। নিজের শরীর আর মরার শীতের উপরে রাগে ফুসে উঠছে সে । গরীবের সুখ নেই। মনে মনে গজগজ করতে থাকে সুমি। ঘরে চাল নেই। মুদি দোকানে বাকি জমে গেছে। সেও আর বাকী দেবে বলে মনে হয়না। বস্তিতে ধার পাওয়া যায় না। সুদে টাকা ছাড়া এক টাকা ও কেউ কাউকে দেয়না। কে দেবে? সবার এক অবস্থা। খেয় না খেয়ে পরে আছে। বাচ্চা দুইটা কই কই ঘুরছে কে জানে । সকালেও কিছু খায়নি। দুপুরেও খাবার নেই । রাতে না খেলে ঘুম আসেনা। পেটে ক্ষুধা নিয়ে ঘুম হয়? নাহ ! আজ বের হতেই হবে। দেখাযাক কপালে কি আছে। যদি ভাগ্য ভাল থাকে তাহলে কিছু জুটে যেতেও পারে।

সাতপাচ ভেবে সুমি ঘর থেকে বের হয়। কদম ভাইয়ের খোজ করতে হবে। সুমি বাইরে গেলে সাধারনতঃ কদম ভাইকে নিয়ে যায়। কদম ভাই লোকটা ভালো । পুলিশের সঙ্গে ভালো খাতির। আর সুমির সঙ্গে খারাপ কিছু করে না। বিপদে ভরসা রাখা যায় । এমন এক কাজ করে সে যে পারে সেই সুযোগ নিতে চায়। গায়ে হাত দিতে চায়। যেন জগতে সে এসেছে শুধু অন্যের জন্য মজা আর আনন্দ বিলাতে। কপাল আরে কাকে বলে। দুইটা বাচ্চার কথা ভাবে সে। নাহলে কবে রেলের নীচে ঝাপ দিতো । জীবন জুড়াতো, পাপ কম হত, শান্তিও পেত। তা আর হল কই? নষ্ট জীবন বয়ে বেড়াতে হচ্ছে । সামনের গ্যারেজে কদম ভাইকে পেয়ে বলে এলো । সন্ধ্যায় বের হবে। কদম রাজী হতে চায়নি। এই দিনে নাকি খদ্দের পাওয়া যাবে না। সুমি জোর করে বলেছে। ঘরের অবস্থা শুনে কদম ভাই বলেছে, চল । যদি পাস তাহলেতো ভালোই।

সংসদ ভবনের রাস্তায় রিকশা নিয়ে এপাশ ওপাশ করছে। লোকজন তেমন নেই। একটু আগে হাইকোর্টের মাজার থেকে এসেছে। সেখানে সুন সান নীরবতা। এই শীতের সন্ধ্যায় কে আর কাজ ছাড়া বের হয়। পেটে ক্ষুধা, বাচ্চা দুইটাকে দোকান থেকে ৫ টাকার মুড়ি কিনে দিয়ে এসেছে। বলে সেছে কিছুক্ষন পর এসে ভাত রেধে খাওয়াবে। খুশীতে চকচক চোখ মুখ নিয়ে দুজন মুড়ি খেতে বসেছে। আহারে! মায়ায় আদ্র মন নিয়ে পাপের উদেশ্যে ঘর ছেড়েছে সুমি। অনেক ক্ষন হয়ে গেলো । কোন খদ্দের মিলেনি। কি করে রাতের খাওয়া জুটবে, কদম ভাইয়ের আধ বেলার টাকা দেবে এসব ভাবতে ভাবতে মনে মনে অস্থির সুমি।

হঠাত করে কদম ভাইয়ের কথায় সম্বিত ফেরে।
: কিরে আর কতক্ষন ঘুরবি?
: কি করুম কদম ভাই, ঘরে এক দানা চাল নাই। মুদি দোকানে বাকী। আর চাওন যায়না। পোলা দুইটা না খাইয়া আছে। আসনের সময় কইয়া আইছি, আইসা ভাত রান্ধুম। এহন কেমনে যাই। তুমার টেহা দিমু কেমনে? কিচ্ছু বুজতাসি না কদম ভাই।
: আমার টেহার কথা বাদ দে। নিজের কথা ভাব। নিস্পৃহ ভাবে বললো কদম ভাই।
: কদম ভাই, চল চন্দ্রিমা উদ্যানে যাই। ঐহানে পাওয়া যাইতে পারে।
: চল। বলে কদম রিকশা ঘুরালো চন্দ্রিমা উদ্যানের দিকে ।

খামার বাড়ীর মোড়ে সুমির রিকশার সামনে থামলো দামী একটি গাড়ি। সুমির চোখ চক চক করে উঠলো । আস্তে করে কদম ভাইকে থামতে বললো।
: দেখ-তো কদম ভাই। ওদের লাগবো নাকি? মনে লয় আল্লাহ কাম একটা দিসে । সুমির গলায় খুশীর সুর।
: তুই বয় রিকশায়। আমি দেহি। বলে কদম নেমে এগিয়ে গেলো গাড়ীর কাছে ।

সুমি রিকশায় বসে দেখলো কদম ভাই মুখ বাড়িয়ে কথা বলছে। গাড়ীতে কে আছে বোঝা যাচ্ছে না। অনেক্ষন পর ফিরে এলো কদম ভাই।
: যাইবি সুমি? সারা রাত থাকতে হইবো । ৫০০ দিবো। রাজী থাকলে ক?
: আচ্ছা যাইমু, তুমি কিছু টেহা লইয়া যাওগা। হাসুনির মারে কইডা চাইল দিয়া ভাত রাইন্ধা দিতে কইবা? পুলা দুইটা খাইয়া ঘুমাইতে পারবো।
আমি বিয়ান বেলা আমুনে।
: আইচ্ছা । কমুনে।
একটু থেমে কদম ভাই বললো, হুন সুমি, যাইবি, তুই? পুলা দুইটা ছোড ছোড, কার পুলা কে জানে, বাসায় কেউ নাই মনে হয়, এই আকাম করতে বাইর হইসে।
: ইতা চিন্তা কইরা লাভ নাই কদম ভাই, আমরার পেটে ভাত নাই।

কদম আর কথা বাড়ালো না। গাড়ীর কাছে ফিরে গিয়ে টাকা নিল । সুমিরে তারাতারি গাড়ীতে তুলে দিয়ে রিক্সা ঘুরালো বস্তির দিকে ।

সুমি গাড়ীতে বসেই, টের পেলো । কদম ভাই এর কথা ঠিক । কত আর বয়স হবে পুলা দুইটার । হের নিজের পুলার থেইকা কয়েক বছরের বড় । মনটা কেমন করে উঠলো । পাপ করলেও মনের অন্দরে পাপীও কিছু বিশ্বাস লালন করে। সেই মন থেকে একটা নিষেধ টের পেল।

কিচ্ছুক্ষনের মধ্যেই সুমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো তার বুকে চাপ বাড়ছে, তাকে অষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বুক খামচে ধরেছে তারই সন্তানের বয়সী আজকের খদ্দের।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


3 Responses to নিশিকন্যা

  1. রাজন্য রুহানি ডিসেম্বর 24, 2010 at 4:14 অপরাহ্ন

    শিরোনাম দেখেই আঁচ করতে পেরেছিলাম গল্পের ধরন। ঘটনাপ্রবাহ ও বাক্যরীতির স্টাইল মনে ধরার মতো ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাচ্ছিল বেশ। কিন্তু শেষ দিকে এসে ক্ষুধা-বঞ্চনা-দারিদ্র্যতার যাঁতাকলে পিষ্ট সম্ভ্রম-বেঁচা-নারীর জেগে ওঠা বোধ আর অবক্ষয়ের সংমিশ্রণ শরীরকে সজোরে ঝাঁকুনি দিল যেন।

    সুবিনীত:
    এর আগের গল্পে রাবেয়া রব্বানি বলেছিলেন, গল্পে পার্সন ও লেখ্য-কথ্যের বিষয়। এখানেও তা পরিস্ফুট। এছাড়া সাধু-চলিতের বিষয়টাও নজরে আনা জরুরি।

  2. hafij2005@gmail.com'
    হরিপদ কেরানী ডিসেম্বর 26, 2010 at 12:30 অপরাহ্ন

    লেখাটা কিছুটা ভিন্নরকমের। ভালো লাগলো।

You must be logged in to post a comment Login