এলোমেলো স্মৃতিকথা-১: রেলগাড়ী ঝমঝম

Filed under: স্মৃতিরোমন্থন |

(আমার এই সিরিজের লেখাগুলো প্রচলিত অর্থে কোন আত্নজীবনী নয়। এর কোন ধারাবাহিকতাও নেই। জীবনের বিভিন্ন সময়ের কিছু কিছু ঘটনা যা আমাকে আজও কোনও না কোনও ভাবে নাড়া দেয় এসব তারই বর্ণনা মাত্র।)

আর কদিন পরেই বাড়ী যাব। প্রত্যেক বছর ডিসেম্বর মাসের এই সময়টাতে আমাদের সব ভাইবোনের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়। তারপর লম্বা ছুটি। তাই এটাই উৎকৃষ্ট সময়। বাড়ী যাওয়ার সবচেযে সস্তা মাধ্যম রেলগাড়ী। গন্তব্য উত্তর বাংলার বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দী থানা। সময়টা ১৯৮৪-৮৫ সালের। তখন বগুড়া যেতে সময় লাগত ১৫/১৬ ঘন্টা। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল ভয়ংকর রকম খারাপ।

আমার বয়স তখন ছয় কি সাত। বাড়ী যাওয়া মানে তখন আমাদের কাছে তৃতীয় ঈদ! স্বাধীনতা কি জিনিষ তা পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করতাম। যমুনায় ঝাপাঝাপি, রাখালের সাথে গরু চড়ানো, কলাগাছের ভেলা নিয়ে বিলের মধ্যে ঘুরাফিরা, গাছে চড়া, বিকাল বেলা হাটে যাওয়া, নানার বাড়ীতে রাতের বেলায় হারিকেনের টিমটিমে আলোয় নানার দরাজ কন্ঠের পুঁথি শোনা- আরও কত কি! যদিও আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকায় কিন্তু যমুনাপাড়ের এই মানুষগুলোর প্রভাব আমার জীবনে অত্যন্ত প্রবল।

আমাদের পরিবার সম্পর্কে একটু ধারনা দেয়া দরকার। আমরা চার ভাই-বোন, বাবা, মা এবং আমাদের দাদী-এই সাতজন মিলে আমাদের পরিবার। বাবা সরকারী পোষ্টাল ডিপার্টমেন্টের খুব সাধারণ একজন কর্মচারী। মা গৃহবধূ। আমাদের মধ্যে বোন সবার বড় এবং ভয়ংকর রকম জেদী। তারপর আমার বড় ভাই। মানুষ হিসেবে খুবই দায়িত্বশীল। তারপর আমি। মানুষ হিসেবে খুবই দুষ্ট। তারপর আমার ছোট ভাই- মস্ত বড় গাধা।

বাড়ী যাওয়ার কদিন আগে থেকেই চলত প্রস্তুতি। ওসব প্রস্তুতিতে আমি খুব একটা মাথা ঘামাতাম না। আমার লক্ষ্য ট্রেনের জানালার ধারের আসন। তখন দেশে কোন আন্ত:নগর ট্রেন ছিল না। সবই লোকাল ট্রেন। আমাদের সাতজন মানুষের জন্য ছয়টি টিকেট কাটা হতো। এরমধ্যে দুটি সীট থাকতো জানালার সাথে। এর একটি বারাবরই আমার বড়ো বোনের দখলে। ওটা অন্য কারও পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। দ্বিতীয়টি আমার বড়ো ভাইয়ের। আমার নজর সেটার দিকে। কিন্তু সে আমাকে ডেকে আগেই ঘোষনা করে রাখত -খবরদার এটা নিয়ে কোনও কথা আমাকে বলবিনা। আমিতো প্রচন্ড হতাশ- জানালার ধারের সীট না পেলে বাড়ী যাওয়ার আনন্দটাই বৃথা।

আমি মনমরা হয়ে থাকতাম কয়েকদিন আর ফন্দি আঁটতাম কিভাবে ওই সীটটা পাওয়া যায়! কোনও ঘুষ দিলে কেমন হয়? তখন আমার কাছে এক দেড় টাকা জমানো পয়সা থাকতো। পরেরদিন ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলাম -”ভাইয়া আইসক্রীম খাবি”? সে উত্তর দেয়-”আচ্ছা নিয়ে আয়”! আমি তো খুশিতে ডগমগ-এবার কাজ হবে! আট আনা দিয়ে ভাইয়াকে আইসক্রীম কিনে দিলাম সে খেয়ে দেয়ে বলল ”আইসক্রীমটা স্বাদ লাগলো না”। আমি আবারও হতাশ। ”অন্য কিছু কিনে দেই”? সে বলতো -”না”। আমি মোটামুটি নিশ্চত হতাম জানালার ধারের সীট আমার কপালে নেই!

ট্রেনের নাম উত্তরবঙ্গ মেইল। ছাড়বে রাত ১১:৩০ মিনিটে। আমরা ষ্টেশনে উপস্থিত হতাম রাত ১০ টার মধ্যে। আমাদের সবার প্রশ্ন এত আগে গিয়ে কি লাভ? বাবার এক কথা- ”কখনও কোথাও গেলে লেট করে যেতে নেই। আগে গেলে কোনও ক্ষতি নেই এবং তাড়াহুড়া করে কোনও কাজ করতে নেই”। আমরা বিরক্ত হতাম। কিন্তু কথাগুলো অনেক বড় সত্য। আমার বাবা তার চাকরী জীবনে কোনওদিন দেরী করে অফিসে যান নি। এবং নির্ধারিত সময়ের এক মিনিট আগেও অফিস থেকে বের হতেন না।

ট্রেন ছাড়ল। আমার মন খারাপ। বড় ভাই বোন দুজনের দখলে দুই সীট। তারা মনের আনন্দে বাইরের দৃশ্য দেখছে আর সেগুলো নিয়ে আলোচনা করছে। আমি মাঝে মাঝে সীট থেকে একটু উঠে গলা লম্বা করে কিছুটা দেখার চেষ্টা করি। আমার বড়ো ভাই আমাকে সরিয়ে দেয়। আমার মন এতে আরও খারাপ হতে থাকে। আধাঘন্টা যাওয়ার পর আমার মন যখন চূড়ান্তরকম খারাপ তখন হঠাৎ ভাইয়া বলে উঠে ”এবার তুই বস এখানে”-এই বলে সে মাথার উপড়ে ঘুমানোর জন্য নির্ধারিত জায়গায় চলে যায় (আগেকার দিনে প্রত্যেক ট্রেনে ঘুমানোর ব্যবস্থা ছিল)। আমার আনন্দ দেখে কে! ট্রেন যাত্রার বাকীটা সময় সে কখনই তার জায়গা ফেরত চাইত না।

আমার বড় ভাইটা প্রত্যেক বছরই এই কাজ করত। আমার মন চূড়ান্ত রকম খারাপ করে দিয়ে হঠাৎ আমাকে চমকে দিত! তারপরও প্রত্যেক বছরই আমার মনে ভয় থাকতো-এবার যদি না দেয়! সে ছিলো সত্যিকার অর্থেই দায়িত্বশীল এবং বরাবরই আমার জন্য ত্যাগ স্বীকার করত। তখন বুঝতাম না।

কালের স্রোতে যমুনায় অনেক জল গড়িয়েছে। কত ট্রেন কত কত ষ্টেশন ছাড়িয়ে কত দিকে ছুটে গেল- তার হিসাব কে রাখে! আধুনিক সব বিলাশ বহুল বাসের ভীড়ে ট্রেনে চড়া হয় না আজকাল! যাত্রাকাল কমে দাঁড়িয়েছে চার ভাগের একভাগে। যাত্রপথও হয়ে গেছে ভিন্ন।

সেই মানুষগুলোও আজ কে কোথায় চলে গেছে! কেউ ভীন দেশে, কেউবা না ফেরার দেশে! দাদী, বাবা, বড় ভাই তারা আজ আর কেউ নেই। নামহীন কোনও এক রেলগাড়ীতে চড়ে তারা যে কোথায় চলে গেল-কোন অচীন দেশের নাম না জানা ইষ্টিশনের দিকে! আর ফিরে আসেনি। বড় বোনটা সেই কবে লাল শাড়ী পড়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেছে নতুন স্বপ্নের দিকে। সে এখন স্বামীর সাথে দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের গাধা ভাইটা প্রকৌশলী হয়ে উড়াল দিলো সাদা চামড়াদের দেশে। তাও অনেক বছর হয়ে গেলো। বাসায় শুধু আমি আর মা। আমাদের স্বপ্নের রেলগাড়ীতে এখন আমরা দুইজন মাত্র যাত্রী।

এখনও রেলগাড়ীতে চড়লে কিংবা ঘুম না হওয়া কোন মধ্যরাতে যদি দূর থেকে কানে ভেসে আসে রেলগাড়ী ছুটে চলার শব্দ তখন স্মতির মাঝে ডুব সাঁতার দিয়ে খুঁজে ফিরি কমলাপুর রেল ষ্টেশন, টিং টিং ঘন্টা বাজার শব্দ, ধীরাশ্রম, গফরগাঁও, জামালপুর, মেলান্দহ, বাহাদুরাবাদ ঘাট, লাল পোশাকের কুলি, ষ্টীমার, বোনারপাড়া জংশন……….।

আহা! আর একটিবারের জন্য যদি সেই সাতজনসহ স্বপ্নের ট্রেন যাত্রাটা ফিরে পেতাম!

”বেলা যায় আনমনে বেলা যায়
পথে পথে কথা নূড়ি ফেলে যায়
ঢেউয়ে ঢেউয়ে বেহুলার ভেলা যায়
বেলা যায় আনমনে বেলা যায়” (সংকলিত)

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

4 Responses to এলোমেলো স্মৃতিকথা-১: রেলগাড়ী ঝমঝম

  1. এই লেখাটি আমাকে আবেগঘন করে তুলল্ মনে পড়ছে সেই ছোটবেলা ট্রেন চড়তাম। অন্যরকম এক অনুবুতি হত তখন। সেই সব দিনে যদি আবার ফিরে যাওয়া যেত!

    মনসুর আহমেদ
    জানুয়ারী 8, 2011 at 7:42 অপরাহ্ন

  2. মনে মনে এমন ছোটবেলার স্বৃতিকথা প্রায়ই লিখি । কাগজে লিখা হয়নি ।ধন্যবাদ আপনার সুন্দর লেখনী উত্‍সাহিত করল ।

    rabeyarobbani@yahoo.com'

    রাবেয়া রব্বানি
    জানুয়ারী 9, 2011 at 4:23 অপরাহ্ন

  3. হরিপদ`দা এই লেখাটা আপনার যতগুলো লেখা পড়েছি তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়ে গেলো !তুমুল আলোড়ন হুসেল দিয়ে ছেড়ে যাওয়া রেলের মতো কু ঝিকঝিক ঝিকঝিক … প্লাটফর্ম কাঁপিয়ে গেল । যখন পারিবারিক ভ্রমণে অভ্যস্ত ছিলাম বছরের ঠিক এই সময়ে ট্টেনে করে তার কথা মনে পড়ে … আমার বোনটাও ঠিক আপনার বোনের মতো ট্টেনে উঠেই দৌঁড়ে জানলাটা ধরে রাখতো আর ছাড়তো না পুরো চার পাঁচ ঘন্টা এইভাবেই থাকতো ।আমার আগ্রহ ছিল ভিতরের যাত্রীদের দিকে একেকজন পৃথক মানুষ খুব অদ্ভুত মনে হতো , ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে থাকতাম বিচক্ষণ ভাবে , ঘুম আসলেও তেড়ে উঠতাম তারপরেও আস্তে ঘুমিয়ে পড়তাম জেগে ওঠতেই হুলুস্থুল আগ্রহ নিয়ে খুঁজতাম অদ্ভুত পুরোন মুখগুলো কিছু হারিয়ে যেতো কিছু নতুন মুখে নতুন করে আগ্রহ ধরিয়ে দিতো ।

    এখন একলাই চলি হোস্টেল থেকে বাড়ি ফিরার সময় যদি জানলার পাশে সিটটা পাই খুব ভাল লাগে … বড় বোনটার বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর হলো ট্টেনের জানলাগুলো তার কথা মনে করিয়ে দেয় , কতকিছুর পরিবর্তন ট্টেনটার পরিবর্তন ভাড়ায় পরিবর্তন আগ্রহের পরিবর্তন চলার পরিবর্তন কিন্তু ট্টেনের ছড়া ছন্দের কোন পরিবর্তন এলো না সেই তাল সেই মাত্রা কু ঝিকঝিক ঝিকঝিক ঝিকঝিক …

    imrul.kaes@ovi.com'

    শৈবাল
    জানুয়ারী 9, 2011 at 4:41 অপরাহ্ন

  4. ট্রেন সত্যিই একটি মজার বাহন। মাঝে মাঝে ট্রেনে ময়মনসিং যেতাম বন্ধুর বাড়ি। স্টেশনে কয়েকবার পুরো রাত পার করেছি ট্রেনের অপেক্ষায়।

    juliansiddiqi@gmail.com'

    জুলিয়ান সিদ্দিকী
    জানুয়ারী 9, 2011 at 9:16 অপরাহ্ন

You must be logged in to post a comment Login