মামুন ম. আজিজ

আরও একটা …

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

আজকাল কেবলই খবর শোনা যায় এখানে সেখানে বিল্ডিং হেলে পড়ছে কিংবা যাচ্ছে    ধ্বসে……………………………………………………………………….সে কারনে এই অনুগল্পটা লিখেছিলাম গতবছর (২০১০)

আরও একটা …
দাড়োয়ানের ধাক্কাটা সামলে নিতে রুবেল খয়েরের বাহু আকঁড়ে ধরে । হাতের বাঁকা লাঠিটা পাকা রাস্তার উপর   পড়ে যায় আর তাই  ঠক্ ঠক্ শব্দে সন্ধ্যার নিরাবতা মরে যায় ক্ষনিকের জন্য ।  খয়ের লাঠিটা উঠাতে উঠাতেই গেটের বাইরে বের হয়ে আসে দু’জন। পেছনে ফেলে আসা বিশাল লোহার  গেটটার গা বেঁয়ে  দুজোড়া কিশোর চোখ উপরে উঠতে উঠতে ছয় তলায় গিয়ে থমকে যায়। দুটি ভিক্ষুক ছেলে, নিকৃষ্ট জাতির অন্তর্ভূক্ত হলেও তাদের ভাগ্য বিড়ম্বনায় আজন্মের নিচু মাথাটা এই মুহূর্তে  উঁচু  হয়ে আছে। এই তো সামান্য সময়ের জন্য মাথা উঁচু হয় তাদের। ঐ উঁচু তলার উচুঁ গোত্রের বিত্তবান তথাকথিত সভ্য মানুষ গুলো এখন অনেক উঁচুতে বলেই তো সেটা সম্ভব। উঁচুতে বসে তারা যতই মাথা নিচু করুক তবুও তা উঁচুতেই আর ভিখারি কিশোর দুজন উঁচু করলেই কি, সেই উঁচু তো আসলে নিচুতেই।
রুবেলের মুখটা বিষন্ন, জানালাগুলোর আবছা আলোয় সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে । কষ্টের ক্লীষ্ট ছাপ সেখানে। পাঁচ তলা পর্যন্ত বিভিন্ন বাসা হতে একশ দশ  টাকা পাবার পর আরও উপরে উঠার লোভ ছাড়তে পারেনি। দুদিন পরে ঈদ। খয়ের বলল, ‘চল নাইম্যা যাইগা। দাড়োয়ান দেইখল্যে প্যাদানি দিবোনে দেহিস।’
রুবেলের হাতের লাঠিতে তখন শক্তি ভর করেছে। উপরে উঠেই গেলো দুজনই। এই ক’টা সিড়ি তো কেবল। ছয়তলার ডান পাশের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে একজন মহিলা বের হয়ে এল । উপের ওঠার চরম পুরষ্কার তারা পেয়ে গেলো সে মহিলার কর্কশ কণ্ঠ নিসৃত ধ্বনিতে। গালির পর গালি। খোড়া পায়ের জন্য নিকৃষ্ট উপহাসের শব্দ এসে বিধঁল গায়। ‘শালার বাইনচোদ পোলাপান, পা নাই, ছয়তলা উঠে গেছে, এক্ষুনি নাম…’ বলেই একটা ধাক্কা । খয়ের ধরে উঠাতে যাচ্ছিল। আবার শুরু হলো , ‘ চুরির মতলব, ভাবছোস আমরা কিছু বুঝিনা। ঐ হারামী দাড়োয়ান, ঐ ঘুমাস নাকি, এই ফকীরনির পুতেরা উঠে কেমনে? দেখোস না?  সব চুরি কইরা নিলে তুই ফেরত দিবি? ভাগ হারামীর দল।’
রুবেল কে টেনে উঠাতেই চোখে পড়ে ঘরের ভেতর এক ভদ্রলোক হাফপ্যান্টের ফিতা লাগাতে লাগাতে এগিয়ে আসে। ‘কি হয়েছে ডার্লিং?’ লোকটার মিষ্টি কণ্ঠে খয়েরের সাহস জাগে পুনরায়, ‘স্যার স্যার, ফেতরার টাহা দিবেন, কাইলক্যার দিন বাদে  ঈদ, ছোট ভাইবোনডিরে একটু মিষ্টি কিইনা খাওয়ামু…
‘হারাম জাদার দল এখনও গেলি না,’ কথার সাথে সাথে নতুন ধাক্কাটা এল খয়ের গায়ের উপর। মহিলার সে ধাক্কায় খয়ের না পড়লেও রুবেল পড়ল আবারও । ততক্ষণে দাড়োয়ানও এসে পৌঁছেসে। বেচারা হাপাচ্ছে। ছয় তলা থেকেই ঘাড় ধরে পাড়লে নিচে নিয়ে আসে টানতে টানতে দুজনকে দাড়োয়ান একাই। ব্যাটার গায়ে শক্তিও আছে। রুবেলর কষ্ট হয়েছে বেশি। লঠির ভরে আর কত দ্রুতই বা নামা যায়। পা হেঁচড়ে যায় সাথে লাঠিও।
ছয় তলার দিকে তাকিয়ে ক্রোধটা ক্রমে ক্রমে বেড়েই ওঠে। এ ক্রোধ তো উঁচু নিচু জাতের উচ্চতা তফাতের আজন্ম আক্রোশেরই এক ক্ষনিক প্রকাশ। এ যে চিরন্তন কিন্তু ফলহীন। নিষ্ফল আক্রোশ তাই মুখে খিস্তি খাউর আর রাগ ছাড়া কিইবা বয়ে আনে। উঁচু তলার সভ্য নারীর কণ্ঠে যদি ওমন গালি উঠতে পারে এই তারাতো নিচু থেকে নিচুতর। পথের ভিখিড়ি। মহূর্তে এক ঝাঁক গালির অনর্গল বান ছুড়ে মাড়ে দুই কিশোর। এতো তাদের শিশুবেলার নিত্যনৈমত্তিক পরিবেশগত শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ।
রুবেলের পায়ে ব্যাথা বেড়েছে। চোখে তার পানি। সেটা হয়তো ব্যাথার অথবাা প্রকৃতির অসাম্য খেলার নিচু অংশের খেলোয়াড় হবার দুঃখময় পরিণতিতে। খয়ের রেগে যায় আজন্ম সঙ্গীটির ব্যাথার কষ্ট বুঝতে পের- ‘শালার বড়লোকের পুত, চু..মারানী… দালান তোগোর ধ্বইসা পড়বো। ’
দু’জন হাঁটতে থাকে রামপুরা বড় রাস্তার দিকে। বিল্ডিংয়ের ফাঁক গোলে খালের পানির উপর নৌকার জল সরানোর শব্দ ভেেেস আসে। চোখ যায়। পানির উপরে সন্ধ্যা পরের আঁধার মিশে পানির কালো রঙের কলংক ঢেকে দিয়েছে।
তারপর বিকট শব্দ। পেছনে দুজোড়া ভিখিড়ির চোখ এক সাথে যায়। মুহূর্তে খয়ের  খোড়া বন্ধুর হাত  ধরে টান দেয় । লাঠিটা পড়ে যায় । সেদিকে খেয়াল দেবার সময় তো এটা মোটেও নয়। চারদিকে লোকজনের দৌড়াদৌড়ি আর ছোটাছূটি । হৈচৈ। খালের কাছে পৌঁছানাের আগে থামা যাবে না। তবুও চোখ যাবেই। মানুষ তো। পাশ দিয়ে এক লোক ছুটে যেতে যেতে বলে ওঠে, ‘আরও একটা বিল্ডিং পড়ল!’
সাত তলা বিল্ডিংটার উপরের তিনটি তলাই ধ্বসে গেছে এক সাথে। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে রুবেল আর খয়ের। বাঁচাও! বাঁচাও! চিৎকার বিল্ডিংয়ের ওদিক থেকে। রুবেলের মুখে ভেসে ওঠে দজ্জাল মহিলার মুখ । এখনও কি বেঁচে আছে?
‘রুবেল, কি ভয়ংকর! বুছতাছোস। তুই এইহানে খাড়া। আমি যাই , সবার লগে উদ্ধার কাজে নাইমা পড়ি।’
‘হ! যা যা।  তাড়াতাড়ি যা। উঁচু তলার লোক নিচে পইড়া গেছে, বাইচাঁ থাকলে তাগোরে তো আমাগোই বাঁচাইতো হইবো। যা যা…’

/

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


4 Responses to আরও একটা …

  1. sumhani@gmail.com'
    সুমাইয়া হানি ফেব্রুয়ারী 19, 2011 at 3:06 পূর্বাহ্ন

    ‘হ! যা যা। তাড়াতাড়ি যা। উঁচু তলার লোক নিচে পইড়া গেছে, বাইচাঁ থাকলে তাগোরে তো আমাগোই বাঁচাইতো হইবো। যা যা…’
    গরীবদের শত কষ্টের পরেও এই সেন্সটা প্রবল, মানবতাও যেন একটু বেশি।

  2. rabeyarobbani@yahoo.com'
    রাবেয়া রব্বানি ফেব্রুয়ারী 20, 2011 at 7:56 পূর্বাহ্ন

    আপনার লেখাটা ভাল লেগেছে ,বর্ণনাও।শুভেচ্ছা রইল শৈলীতে সুন্দর ব্লগিং এর।
    কিন্তু সুমাইয়ার কথার টানে বলি,
    মাফ করবেন গরিবের মানবতা বেশি কথাটা আমার সর্বক্ষেত্রে সত্যি মনে হয় না।
    দেখেছি তারা অনেকাংশে নির্দয় ও।মানুষের বৈশিষ্ঠ গরীব ধনী সবার মধ্যেই থাকবে এবং থাকে।

    • mamunma@gmail.com'
      মামুন ম. আজিজ ফেব্রুয়ারী 21, 2011 at 12:30 অপরাহ্ন

      সেটা আমিও মানি।
      বরং গরীবেরই মানবতা কম থাকাই তাত্ত্বিকভাবে স্বাভাবিক।
      কিন্তু পৃথীবির সবকিছু তত্ত্ব আর দৃশ্যমান দিয়ে বিচার হয় না।

      সে কারনেই তো গল্পকার গল্প লেখেন , যেখানে কখনো গরীবই মানবতার মূর্ত প্রতীক আবার কখনো সেই কোন গল্পে হয়ে উঠবে দশ টাকার বিনিময়ে একজন খুনীও।

      ধন্যবাদ। আশা করি আপনাদের সাথে থাকতে পারব অনেকদিন ভার্চুয়ালে এবং হযতো বাস্তবতার মাঝেও কোন দিন সুযোগ হলে, পেলে আমন্ত্রন।

You must be logged in to post a comment Login