জুলিয়ান সিদ্দিকী

উপন্যাস: পুরুষ

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

বাসে উঠবার সঙ্গে সঙ্গেই আমার নাকের বাঁ পাশটা যেন বন্ধ হয়ে গেল। শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় টের পাচ্ছিলাম ডান পাশ দিয়ে বেশ জোরেশোরেই বাতাস আসা যাওয়া করছে। আর তার সঙ্গেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। মোটামুটি কৈশোর থেকেই ব্যাপারটা বুঝতে পারছিলাম যে, আমার নাকের বাঁ পাশটার ফুটো দিয়ে কম শ্বাস-প্রশ্বাস চললে কম বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ি। একবার এমন হওয়ার পরই প্রচণ্ড জ্বরের মুখে পড়েছিলাম। ঘন্টা খানেকের মধ্যে এমন হয়েছিলো যে, চলার শক্তি পাচ্ছিলাম না। তখন স্টেশনের বেঞ্চে শুয়ে পড়েছিলাম। তারপর নিজকে আবিষ্কার করেছিলাম জেল হাসপাতালে।

পরে জানতে পেরেছিলাম সেদিন কোন এক মন্ত্রী স্টেশনে আসার কথা ছিলো। তাই তার আগে আগে যত ভিখিরি আর ভবঘুরে আছে তাদের ধরে নিয়ে জেলে পুরেছিলো। আমার ভাগ্যটা তেমন একটা খারাপ না থাকায় হয়তো জ্বরের কারণে হাসপাতালের আরামের বেডে ঠাঁই পেয়েছিলাম। পেয়েছিলাম অন্যান্যদের তুলনায় খানিকটা ভালো খাবার। জ্বর পুরোপুরি না সারতেই আমাকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, জেলখানার গেটে আসতে আসতে আসতেই আমার জ্বর পুরো সেরে গিয়েছিলো।

এখনও বাঁ নাকের ছিদ্র দিয়ে কম শ্বাস-প্রশ্বাসের কারণে মনটা খুঁত খুঁত করছিলো। কি থেকে কি হয়ে যায় বলা মুশকিল। শরীর বেশি খারাপ হয়ে গেলে আমার ইন্টার্ভিউ ভালো হবে না। যদিও ইন্টার্ভিউ দিয়ে আজকাল কারো চাকরি হয় বলে শুনিনি। তবুও পরীক্ষা ভালো না হলে সবারই খারাপ লাগার কথা। আজ ইন্টার্ভিউ দিতে পারলে এটা হবে আমার শততম ইন্টার্ভিউ। আমি ঠিক করেছি যে এতে চাকরি না হলে রেল লাইনের পাশের কোনো বস্তিতে আশ্রয় নেবো। পেশা আর জীবন-যাপনের সঙ্গে সঙ্গে মিশে যাবো তাদের সঙ্গে। মুছে ফেলবো আমার বর্তমান ইতিহাস। আমার স্বজনদের সাথে ছিন্ন করবো যাবতীয় সম্পর্ক।

নাকের বাঁ পাশটা চাপতে চাপতেই বাসের মাঝামাঝি একটি আসনে জানালার পাশে বসে পড়ি। এ সময়টাতে লোকজন তেমন থাকে না। বেশির ভাগ চাকরিজীবী আর স্কুল কলেজ-গামী মানুষ আরো আগেই চলে যায় বলে এ সময়টা মোটামুটি ভিড় কম হয়। কিন্তু কিছুক্ষণের ভেতরই যাত্রী উঠতে উঠতে সবগুলো আসন পূর্ণ হয়ে গেল। আমার পাশে একটি কিশোর বসেছে। কোলের কাছে স্কুল-ব্যাগ। হয়তো ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কোথাও যাচ্ছে। নয়তো মর্নিং শিফটে ক্লাস শেষ করে ঘরে ফিরছে।

নাকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভীষণ সুড়সুড় করতে আরম্ভ করলো। হাতে নাক ডলেও কিছু হলো না। পরপর দুটো হাঁচি বেরিয়ে এলো। ঠিক তখনই বাসটি কলেজ-গেট এসে থামলে আরো কয়েকজন যাত্রী উঠতেই তারা ভেতরের দিকে আসতে লাগলো খালি আসনের আশায়। একটি মেয়ে ঠিক মেয়েও হয়তো বলা যাবে না, তরুণী বললেও বেশি হয়ে যাবে। মহিলা বলাই বোধকরি সঙ্গত হবে। আমার কাছে দেখতে যা মনে হচ্ছিলো তার বিয়ের বয়স আর বেশি দিন থাকবে না। আমার সরকারি  চাকরি পাওয়ার বয়স যেমন আর একুশ-দিন বাকি আছে, তারও হয়তো বিয়ের উপযুক্ত বয়স কিছুদিনের মাঝেই পেরিয়ে যাবে। আর বিয়ে যদি হয়েই থাকে তাহলে তো সমস্যাই নেই। আজকাল দেখে বোঝার উপায় নেই কার বিয়ে হয়েছে কার হয়নি। মানুষ আধুনিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবন-যাপনও বদলে যাচ্ছে। যে নারীর বিয়ে হচ্ছে সে মিসেস হয়ে যাচ্ছে। আবার যখন স্বামী-স্ত্রীতে ছাড়া ছাড়ি হয়ে যাচ্ছে বা বিধবা হয়ে যাচ্ছে তখনই নারীটি আবার মিস হয়ে যাচ্ছে।

আমার পাশের কিশোরটি উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আপা এখানে এসে বসেন।

মহিলা একবার আমার দিকে তাকিয়ে খানিকটা ইতস্তত করে কিশোরটিকে বললো, তুমি কি নেমে যাবা?

সে মাথা নাড়লো।

তাহলে তুমিই বসো না! আমি হয়তো সিট পেয়ে যাবো।

আপনি বসেন।

মহিলা আমার পাশে খানিকটা দূরত্ব রেখে বসে পড়লেও আবার কি মনে করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো।

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আপনি কি কষ্ট করে বাইরে আসবেন? আমি জানালার কাছে বসতে চাই।

আমি মহিলার মুখের দিকে তাকাতেই তার কানের ঝুমকা দু’টির ওপর চোখ পড়ে। চোখ পড়ে গলায় চিকচিক করতে থাকা চেনের ওপর। আজকাল সোনার অলঙ্কার পরে কি কেউ বের হয়? আর নিতান্তই যদি গয়নাগাটি পরে তাও নিজের নিরাপত্তার কথাটা আগে ভাবা উচিত। বললাম, জানালার কাছে বসাটা কি নিরাপদ হবে?

মহিলা কেমন করে যেন তাকায়। ভেতরে ভেতরে খানিকটা কুকরেও যাই। এখনই যদি হল্লা-চিল্লা আরম্ভ করে দেয় কিংবা অসভ্য ইতর কোথাকার তোর মা বোন নেই জুতো দিয়ে…ইত্যাদি ইত্যাদি বলতে থাকে তো পুরুষ যাত্রীরাও মওকা বুঝে এক চোট বলবে। অতি উৎসাহী কেউ কেউ দু একটা চড়-থাপ্পড় যে বাগিয়ে আসবে না তা ও নিশ্চিত বলা যায় না।

আমি বেরিয়ে তাকে বসার জন্য পথ করে দিলে মহিলা কিশোরটিকে টেনে বসিয়ে দিতেই বললাম, এটা কি হলো?

মহিলা আমার দিকে ফিরে তাকাতেই দেখতে পাই খুব সূক্ষ্ম একটি হাসি তার ঠোঁটে। হয়তো মনের ভাব, কেমন জব্দ? মেয়েদের পাশে বসতে চাওয়ার মজাটা এবার দেখ!

তারপর সে বললো, আপনি বড় মানুষ। খানিকটা দাঁড়িয়ে গেলে কি এমন ক্ষতি? সামনের কোথাও সিট পেয়ে যাবেন। কিছু মনে করবেন না, কেমন!

আমি থ। কি বলবো? দিনের শুরুতে একটি কাজে যাচ্ছি আর এরই মাঝে প্রতারিত হয়ে গেলাম?

তখনই কাঁধে একটি হাত পড়তেই মুখ ফিরিয়ে তাকাই। একজন ঠিক আমার পেছনেই উঠে দাঁড়িয়েছে। বললো, এখানে বসেন। আমি নেমে যাচ্ছি সামনে।

ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিয়ে আমি লোকটির পরিত্যক্ত আসনে বসে পড়ি। মহিলাটির প্রতি আমার খুবই রাগ হচ্ছিলো। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় বসতে পারার সঙ্গে সঙ্গে রাগটাও চলে গেল।

একবার আড় চোখে মহিলাটির দিকে তাকাই। জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। একটি হাত দিয়ে বাইরের দিকের ঝুমকাটা ঢেকে রেখেছে। কিছুটা তাহলে সাবধানীই মনে হচ্ছে।

ফার্মগেট ট্রাফিক সিগনালে গাড়িটা দাঁড়াতেই জানালার বাইরে একটি ভিখেরীকে দেখা গেল। আরেকজন কাঠির মাথায় পাপড়ি মেলা আমড়া নিয়ে বলছে, আমড়া আমড়া! বরিশালের কচি আমড়া!

মহিলাটি আমড়া কিনবে হয়তো। দরদাম জিজ্ঞেস করে কোলের উপর রাখা ব্যাগটা খুলে হয়তো খুচরো টাকা অনুসন্ধান করে। তখনই বাইরে থেকে দু’টি হাত তার কানে আর গলায় পড়ে। সঙ্গে সঙ্গেই মহিলার আর্তনাদ শোনা যায়। হায় হায় নিয়ে গেল!

কি নিয়ে গেল? কার নিয়ে গেল? আপনি কি করছিলেন? আগেই সাবধান হওয়া উচিত ছিলো! ইত্যাদি নানা ধরনের বাক্যে মুখর হয়ে উঠলো গাড়ির ভেতরটা।

আমি মহিলার দিকে তাকাতে পারি না। হয়তো মনে মনে আমি খুশি হই। কিংবা এমনি কিছু একটা ঘটুক সত্যিই মনে মনে চাচ্ছিলাম। তখনই নাকের বাঁ দিকের ছিদ্রটা ভীষণ ভাবে সুড়সুড় করতে আরম্ভ করলো। হাতের তালু দিয়ে নাক ঘষি। পকেট থেকে দুমড়ানো মোচড়ানো টিসু বের করে নাক চেপে ধরি। কিন্তু কাজ হয় না। পরপর দু’টো হাঁচি বেরোতেই মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করতে থাকে। তারপর আবার হাঁচি আসে। নাক চেপে ধরে রাখি। বাংলা মোটরের কাছে আসতেই টের পাই নাক দিয়ে পানি পড়ছে। সর্দিই লেগে গেল কি না! খানিক পর বুঝতে পারি যে নাক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জানালার পাশে থাকলে নির্দ্বিধায় মাথা বের করে নাকটা ঝেড়ে নিতে পারতাম। কিন্তু ভেতরের দিকে বসেছি বলে সে সুযোগটা আর নেই। টিসু চেপে ফ্যাড় ফ্যাড় করে নাক পরিষ্কার করতে চাই। টিসুটা ভিজে যাতা অবস্থা হয়ে যায়। ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেলে পাশের দুজন যাত্রীর ঘাড়ের উপর দিয়ে তা বাইরে ছুঁড়ে মারি।

সুর সুর করে নাকের ভেতর থেকে সর্দি গড়িয়ে নামছে বুঝতে পেরেই পকেট থেকে রুমাল বের করি। এটাকে রুমাল বলা ঠিক হয়তো হবে না। যদিও রুমাল হিসেবেই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করছি। আসলে এটি একটি জামার কাপড় থেকে বেঁচে যাওয়া টুকরো। আমার ছাত্রী রাইসার খালা দিয়েছে। গতবার সে কানাডা থেকে ছুটিতে দেশে এসেছিলো। সেখানকার কোনো এক কানাডিয়ান লোককে নাকি বিয়ে করেছে। এ নিয়ে বাবা মা’র সঙ্গে রাগ করে বোনের বাড়িতেই উঠেছিলো। তখনই একদিন রাইসাকে পড়াতে পড়াতেই আমার নাক থেকে পানি ঝরতে আরম্ভ করলে রাইসা ছুটে গিয়ে টিসু নিয়ে আসে। কিন্তু তা অল্পক্ষণেই ফুরিয়ে গিয়েছিলো। ব্যাপারটা তার খালা কাকলি দেখতে পেয়ে বলেছিলো, আপনার রুমাল নেই?

আমি মাথা নেড়ে জানিয়েছিলাম, হারিয়ে যায় বলে সঙ্গে রুমাল রাখি না।

কাউকে রুমাল দিতে নেই। না হলে আমার কাছে নতুন রুমাল ছিলো।

রুমাল দিলে কি হয়? কিছুই হয় না।

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কাকলি বলেছিলো, তবুও দেবো না। তবে আমার জামা বানিয়ে একটা টুকরো আছে। সেটা দিতে পারি।

আমি হেসে বলেছিলাম, ছেঁড়া গামছা টাওয়েল বা এমনিই কোনো ন্যাকড়া হলেও চলবে।

কাকলি হেসে উঠে বলেছিলো, আপনি যে কি না!

তারপরই সে নীল রঙের কাপড়ের টুকরোটি এনে দিয়েছিলো। রঙটা দেখে বলেছিলাম রঙটা নীল হলেও যেন নীল নয়।

এর নাম ইলেকট্রিক ব্লু।

মতিঝিল বাসটা থামতেই তড়িঘড়ি নেমে পড়ি।

রুমালটা বলতে গেলে পুরোটাই নাকের পানিতে ভিজে গেছে। রঙটা গাঢ় হয়ে কেমন কালচে দেখাচ্ছে। এটা একবার ধু’তে পারলে ভালো হতো। হাতটাও কেমন আঠালো মনে হচ্ছে।

এ এলাকায় বাইরের কোনো কল থেকে পানি পাওয়ার উপায় নেই। পানির জন্য কোনো রেস্টুরেন্টে বা আলছালাদিয়াঢাকা হোটেলে ঢুকতে হবে। যেখানে যাবো বলে এসেছি সে অফিসটা দিলকুশায়। সেদিকে অবশ্য কয়েকটি সস্তার রেস্টুরেন্টও আছে।

দুই

একটি পোস্টের জন্য ইন্টার্ভিউ দিতে অনেক লোক এসেছে। এক কোণে বাসে দেখা গয়না হারানো মহিলাটিকেও মনে হয় দেখতে পেলাম। কেন যে আমার মনে হচ্ছিলো সে আমাকে দেখতে পেয়েই খানিকটা ঝুঁকে আড়াল নিয়েছে। আমিও সেদিকে তাকানোর কৌতূহল দেখাই না।

এগারো নম্বরে আমার ডাক পড়তেই আমি দরজা ঠেলে ঢুকি। একটিমাত্র টেবিলে একজন লোক বসা। দেখতেও তেমন কেউকেটা গোছের বলে মনে হয় না। তাই আমি কিছুটা অবহেলা করেই এগিয়ে যাই। আগের ইন্টার্ভিউ বোর্ড ফেস করার মত বিনয়ের অবতার সাজতে ইচ্ছে করলো না।

টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই লোকটি বলে উঠলো, আপনি যে জন্মসূত্রে বাঙালী তা আপনার বায়োডাটাতেই আছে। ধর্মের দিক দিয়েও দেখছি মুসলিম। আমাদের দেশটাও মুসলিম দেশ। কিন্তু আপনি সালাম দিলেন না যে?

লোকটি এত কথা বললেও আমাকে বসতে বলেনি। হিসেব মত আগেই আমাকে বসতে বলার কথা। যেহেতু বসতে বলেনি, তাই দাঁড়িয়ে থেকেই বলি, মুসলমানের দেশ হলেও এ দেশে বিভিন্ন ধর্মের লোক আছে। আর আপনি মুসলিম না নন মুসলিম কি করে জানবো? আপনার নাম কোথাও দেখিনি। তা ছাড়া ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি যে,  নন মুসলিম কাউকে সালাম দেয়াটা ইসলামে বৈধ নয়।

লোকটির মুখ সঙ্গে সঙ্গেই কালো হয়ে গেল। যেন তেতো মুখেই বললেন, বসেন।

ধন্যবাদ জানিয়ে বসতেই তিনি বলতে আরম্ভ করলেন, যে দেশে হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান সম্প্রদায়ের নাগরিক যথেষ্ট সংখ্যায় আছে তেমন একটি দেশ কি করে ইসলামী রাষ্ট্র হয়?

হওয়া উচিত হয়তো নয়। কিন্তু এরশাদ যখন সেক্যুলার থেকে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে ঘোষণা দেন তখন কিন্তু নন-মুসলিম কেউ প্রতিবাদ করেননি। মিটিং-মিছিল-জ্বালাও-পোড়াও ধরনের আন্দোলনও করেননি। মাত্র কয়েক মাস আগেই যেমন একটি বিড়ালের সঙ্গে মোহাম্মদ শব্দটা জড়িয়ে দেশি মোল্লারা বিশ্ববাসীকে যা দেখালো, বাংলাদেশের খৎনা করানো দেখেও অন্যান্য ধর্মের পুরোহিতরা কেন তার সিকিও পারলো না? এমনকি মন্ত্রীসভায় অমুসলিম মন্ত্রী থাকলেও কেউ তার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন বলে জানি না। জানি না নন-মুসলিম কোনো সরকারি আমলাও পদত্যাগ করেছেন বা এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন। কেবল বিভিন্ন পত্রিকায় এ নিয়ে কিছুটা লেখালেখি হয়েছে। পরিণতিতে আমরা কি দেখলাম? দেখলাম নন-মুসলিমরা মিলে একটি ঐক্য-পরিষদ বানিয়েছেন। আমি যার কোনোটাই সমর্থন করি না।

কেন করেন না? নন-মুসলিমদের কি সে অধিকার নেই?

এখন আর নেই। কারণ রাষ্ট্রের যখন খৎনা করানো হয়েছিলো সেটা যেমন নন-মুসলিমরা মেনে নিয়েছেন তেমনি ইসলামী রাষ্ট্রের খাঁটি নাগরিক হতে তাদেরও উচিত ছিলো নিজেদের খৎনা করিয়ে মুসলমান হয়ে যাওয়া।

আমার কথা শুনে ভদ্রলোকের মুখটা লাল হয়ে উঠলো। আমি ধরেই নিয়েছি যে, চাকরি আমার হবে না। একটি  চাকরির খাতিরে আমি যতটুকু জানি-বুঝি বা বিশ্বাস করি তা প্রকাশ থেকে কেন বিরত থাকবো? একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোনো ব্যাপারে আমার ভালো-লাগা খারাপ লাগা বলতেই পারি! যদি তা না-ই বলতে পারি তাহলে এ গণতন্ত্রের নাম ভিন্ন কিছু রাখা উচিত। যে তন্ত্র আমার বলার অধিকার খর্ব করে। আমার বিশ্বাস-বোধকে গুঁড়িয়ে দেয় সে তন্ত্র বোধ করি স্বৈরতন্ত্রের চেয়েও বেশি নোংরা!

ভদ্রলোক হয়তো ভেতরে ভেতরে এতটাই রেগে গেছেন যে, বেশ কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইলেন। হয়তো রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করছেন।

আমি চুপচাপ বসে থাকি। অফিসের ভেতরের আসবাব দেখি। কোণার দিকে একটি কাচের বাক্সে দেখতে পাই  ধাতব নটরাজের মূর্তি। আজকাল অনেক মুসলমানের ঘরেই শো-কেসে বা টেবিলের উপর ফুলদানীর পাশাপাশি মাটির তৈরি নটরাজের মূর্তি সাজানো থাকে। কাজেই এমন ছোট্ট একটি নমুনা দেখেও অনুমান করতে পারি না যে লোকটি হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ। এসব শাহবাগ-রমনাপার্ক এলাকায় আর নিউমার্কেটের কোথাও কোথাও বিক্রি হতে দেখেছি।

কিছুক্ষণ পর ভদ্রলোক হয়তো ধাতস্থ হয়ে বললেন, আপনি আসতে পারেন। আজ আর কিছু হবে না।

আমি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতেই বেশ ক’জন আমাকে ছেঁকে ধরে নানা রকম জেরা আরম্ভ করলো। এত সময় কেন লাগলো? কি কি জিজ্ঞেস করেছে? চাকরিটা কি আপনার হবে?

আমি বলি, তেমন কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। আর এমন হাবিজাবি প্রশ্ন থেকেই অনুমান করা যায় যে চাকরি আগেই কাউকে দিয়ে রেখেছে। এখন কেবল আমাদের চোখে ধুলো দিতেই এ আয়োজন।

সবাইকে হতাশায় ডুবিয়ে দিয়ে আমি রাস্তায় নেমে আসি। এই প্রথমবার কোনো ইন্টার্ভিউ দিয়ে প্রসন্ন মনে বেরিয়ে এসেছি। ভদ্রলোক আমাকে কি ভাববেন কে জানে! কিন্তু যা বলতে চেয়েছি তা যে বেশ জোরেশোরেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পেরেছি সেটাই আমার ভালো লাগার কারণ বোধহয়।

রাস্তার পাশে একটি খোলা রেস্টুরেন্টে ঢুকে ভাজি আর পরাটা দিয়ে নাস্তা করি। সকালের দিকে বের হওয়ার  মুখে এক কাপ চা খেয়ে বেরিয়েছিলাম কেবল। আটা ছিলো না বলে মা খিচুরি রান্না করেছেন। সকালের নাস্তায় আটার তৈরি কিছু না হলে আমার খেতে ভালো লাগে না।

নাস্তা সেরে এক কাপ চা খেতে খেতে ভাবছিলাম আর কোনো কাজ বাকি আছে কিনা। না। তেমন কোনো কাজ নেই। কিন্তু এতটা পথ যেয়ে কি আবার আসবো? থাক। আজ আর কোনো কাজ নয়। সন্ধ্যার দিকে রাইসাকে পড়াতে যাওয়ার আগে আর ঘর থেকে বের হবো না। তা ছাড়া ক্রমাগত নাক মুছতে গিয়ে নাকটা কেমন জ্বলছে। মাথাটাও ব্যথা করছে খুব। এখন কোথাও শুয়ে ঘুমোতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু আজকাল ভবঘুরে লোকের সংখ্যা এতটাই বেড়ে গেছে যে পার্কের বা স্টেশনের কোনো বেঞ্চে বসারও জায়গা পাওয়া যায় না তেমন।

চা মুখে দিয়ে চুমুক দিচ্ছি এমন সময় টপ করে এক ফোঁটা সর্দি কাপের চায়ে পড়ে গেল। এতটা পাতলা সর্দি খুবই খারাপ। কোনো ওষুধেই কাজ হবে না। এখন নিচের দিকে ঝুঁকে মাথা ধরে বসে থাকা ছাড়া পথ নেই। নাকের পানি যতক্ষণ ফোঁটা ফোঁটা পড়ার পরতে থাকুক। কিন্তু নোংরা আর ঘিঞ্জি এই ঢাকা শহরের কোথাও কি এভাবে বসার জায়গা আছে? এত নোংরা আর বিশ্রী শহর তবুও কেন যেন ছেড়ে যেতে ইচ্ছে হয় না আমার। আর সে কারণেই হয়তো আমার দুর্দশা কখনো দূর হবার নয়। নয়তো গ্রামাঞ্চলের কোনো কলেজে কাজ করতে পারলে হয়তো ভালোই হতো। কাশিয়ানী কলেজে ইংরেজির লেকচারার হিসেবে জয়েন করতে পারতাম। বাবা খুবই উৎসাহ দিয়েছিলেন। প্রিন্সিপ্যাল সাহেবও পরপর তিনটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু আমার মনটাই কেন বেঁকে বসেছিলো সেটাই রহস্য। অথচ এখন মাঝে মধ্যে মনে হয় যে, সেখানে জয়েন না করে হয়তো ভুলই করেছি।

ঘরে ফিরতে ফিরতে আবার জ্বরই এসে যায় কিনা সে ভয়ই হচ্ছে। আজ চার তারিখ। টিউশানির টাকা পাবার কথা। যদিও এ পর্যন্ত কোনো হেরফের হয়নি তবুও এতটা নিশ্চিত হওয়া উচিত নয়। প্রত্যাশা বেশি থাকলে কষ্ট পাবারও সম্ভাবনা থাকে। আজকাল আমার ভেতর তেমন কোনো প্রত্যাশা আছে বলেও বুঝতে পারি না। শুনতে পাই প্রায় সাতান্ন বছর বয়সেও মেজ ভাই কোনো এক কলিগের সঙ্গে নাকি চুটিয়ে প্রেম করে বেড়াচ্ছেন। তাদের অন্যান্য কলিগরা ফোনে ভাবিকে জানায়। হয়তো ঈর্ষা থেকেই তাদের এমন গোয়েন্দাগিরি। সব শুনে আলম ভাইকে প্রশ্ন করলে তিনি ভাবিকে জানান, মেয়ের সমান বয়সের কলিগের সঙ্গে কি এসব সম্পর্ক হয় নাকি? হয়তো ভাবির বিশ্বাস হয় না। মাঝেমধ্যে তার চোখে পানি দেখতে পাই। হয়তো খুব বেশি কান্না-কাটির ফলে কখনো কখনো তার মুখও ফুলে থাকতে দেখি। তাদের ছেলে-মেয়ে দুটোও যেন কেমন উদাস হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।

মতিঝিল থেকে শাহবাগ পর্যন্ত জায়গাটুকুর মাঝামাঝি কোনো ওষুধের ফার্মেসি আছে বলে আমার চোখে পড়েনি। অন্তত প্যারাসিটামল পেতে হলেও আমাকে আগে শাহবাগ যেতে হবে। তা ছাড়া পান-সিগারেটের দোকানেও বয়ামের ভেতর প্যারাসিটামল দেখেছি। কিন্তু এখন তেমন দোকানে প্যারাসিটামলও দেখতে পাচ্ছি না। দু একটিতে জিজ্ঞেস করেও পাইনি।

চা খেয়ে উঠে গ্লাসের পানি দিয়ে রুমালটাকে আবার ধুয়ে নেই। হাতটাও ধুয়ে ফেলি। তখনই সেখানকার একজন বলে ওঠে, ভাই অ্যামনে পানি ফালানের লাইগা তো পয়সা দিয়া পানি কিনা আনি না।

অন্যায় কিছু বলেনি। তবুও আমার কিছুটা পানি খরচ করার অধিকার আছে। যেহেতু এখানেই আমি নাস্তা করেছি প্রায় পনের টাকার। সে তুলনায় এক গ্লাস পানি আর কত দাম? আগে মেঘনা আর দাউদকান্দি ফেরিঘাটে পানি বিক্রি হতো। দাম হিসেবে যে যা দেয়। নির্দিষ্ট কোনো রেট না থাকলেও পঁচিশ পয়সার নিচে দিলে ওদের মুখ কালো হয়ে যেতো।

ঝামেলা এড়াতে বলি, তা ঠিক। কিন্তু এই এক গ্লাস অতিরিক্ত পানির জন্যই আমি এতটা দূর হেঁটে এসে নাস্তা করতে বসেছি।

লোকটি কেমন করে হাসে। হয়তো আপসের হাসি একেই বলে।

তিন

ঘরে ফিরতেই দেখি পিলু মুখ ভার করে বসে আছে। সে আমার দু বছরের ছোট। তার হাজবেন্ড ইকবাল কিছুদিন হলো নাইজেরিয়া গেছে চাকরি নিয়ে। তারপর সে এখানেই থাকছে। বলি, কিরে পিলুপিল্লানি, কি হয়েছে?

পিলু গোমড়া মুখে জানালো কিছু হয়নি।

তাহলে মুখ অমন প্যাঁচার মত কেন?

কথার জবাব না দিয়ে সে জানালো, আলম ভাই নাকি আঁখিকে বিয়ে করেছে।

মাথাটা ভারী বোধ হলেও আমি না হেসে পারি না। বলি, আলম ভাই বিয়ে করেছে তো কি হলো? যাকে বিয়ে করেছে সেও তো আমাদের ভাবি হবে। হয়তো কোনো একদিন সেও মুখ কালো করে বলবে, তোদের সঙ্গে কি আমাদের সম্পর্ক রাখতেই হবে?

পিলু বললো, বউ-বাচ্চাকাচ্চা আছে এমন লোক বুড়ো বয়সে বিয়ে করলে আশপাশের মানুষ কি বলবে?

মানুষ কোন কাজটা ভালো বলে বল? তুই যে এখানে আছিস দেখবি ক’দিন পর শুনবি তুই বউ হিসেবে খারাপ বলেই বাপের বাড়ি পড়ে আছিস।

পিলু আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, মানুষ বলবে না তুই বলবি? ঠিক আছে আমি এখানে থাকলে যদি তোদের খারাপ লাগে তাহলে আজই চলে যাচ্ছি!

পিলু সত্যি সত্যিই তার ব্যাগ গোছাতে আরম্ভ করলো।

মাথাটা আরো ভারী মনে হচ্ছিলো। আমার ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ি। অসময়ে শুয়ে থাকাটা মা পছন্দ করেন না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি এসে আমাকে শুয়ে থাকতে দেখেও এ ব্যাপারে কিছু বললেন না। বললেন, পিলুকে কি বলেছিস?

কি বলবো? তেমন কিছু বলিনি তো!

তাহলে ও ব্যাগ গোছাচ্ছে কেন?

হুম। তাহলে আমার ওপর রাগ করেছে হয়তো।

কি বলেছিস তুই?

আমি বিছানায় উঠে বসি। জ্বর এসে গেছে। বেশ শীত শীত মনে হচ্ছে। তবু বলি, পিল্লানিকে বললাম, কদিন পর লোকে বলবে বউ হিসেবে খারাপ বলেই তুই বাপের বাড়ি পড়ে আছিস। এর বেশি তো কিছু বলিনি!

ও এখানে পড়ে থাকলে তোর অসুবিধা কোথায়? নাকি তোরটা খাবে?

মাও রেগে গেলেন? আমি আর কিছু বলি না। আবার শুয়ে পড়লে তিনি বললেন, যেভাবে পারিস ওকে থামা।

বললাম, আচ্ছা।

তারপরই আমি পিলুকে ডাকি। পিল্লানি! অ্যাই পিল্লানি!

মা তখনই সেখান থেকে বেরিয়ে গেলেন।

পিলুকে ডাকার সময় মাথার ভেতরটা কেমন যেন ঝনঝন করছিলো।

আমি অপেক্ষা করি। কিছুটা সময় নিয়ে সে আসে। দরজায় দাঁড়িয়ে বলে, কেন ডাকছিস।

হয়তো কেঁদেছে। মুখটা আরো ভারভার মনে হচ্ছে। বলি, থার্মোমিটারটা কোথায় দেখ তো! আমার মনে হয় জ্বর উঠেছে।

পিলু এগিয়ে এসে আমার কপালে হাত দিয়ে বললো, সত্যিই তো জ্বর! কোনো ওষুধ খেয়েছিস?

প্যরাসিটামল খেয়েছিলাম।

দেখি অন্য কোনো ওষুধ আছে কি না।

বলি, লাগবে না। তুই কি আমাকে এক কাপ চা খাওয়াতে পারবি? চা খেলেই মনে হয় জ্বরটা চলে যাবে।

পিলু হয়তো চা বানাতে যায়। তার হাতের রঙ চা খুবই ভালো হয়। আমি জানি পিলুর অভিমান চা বানাতে বানাতেই চলে যাবে। ভুলে যাবে ব্যাগ গোছানোর কথা। হয়তো ব্যাগটা তেমনিই পড়ে থাকবে তার বিছানায়। কেন সেটা বিছানায় তাও হয়তো পরে মনে করতে পারবে না। এমনিতে পিলু খুবই ভালো মেয়ে। মনটাও ভালো। মনের ভেতর একটা রেখে মুখে অন্যটা বলতে কখনোই শুনিনি। দুজন দুই ইয়ারের ব্যবধানে ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় একবার পিলু এসে বললো, ভাইয়া, তুই কি পিস্তল দেখেছিস?

হঠাৎ পিস্তলের প্রসঙ্গ শুনে চমকে উঠলেও বলি, সিনেমায় দেখেছি।

হাতে পেলে গুলি চালাতে পারবি?

তা হয়তো পারবো। মাসুদ রানা সিরিজের অনেক বইতে কিভাবে পিস্তল লোড করতে হয়। সেফটি ক্যাচ অফ করে গুলি চালাতে হয় তার পরিষ্কার বর্ণনা আছে। আমার কোনো অসুবিধা হবে না।

তাহলে আমার সঙ্গে কাল তুই যাবি। ওকে আমার সামনে গুলি করবি। পারবি না?

কেন পারবো না? মানুষটা যদি তোর শত্রু হয় আর তোর কোনো ক্ষতি করে থাকে তাকে কুকুরের মত গুলি করে মারতে আমার হাত একটুও কাঁপবে না।

পরদিন আমার ক্লাসের দরজায় এসে পিলু আমাকে ডাকতেই বেরিয়ে যাই। ক্যান্টিনের আড়ালে নিয়ে গিয়ে তার ব্যাগ থেকে সত্যি সত্যিই একটি কালো রঙের পিস্তল বের করে আমার হাতে দিতেই ভয়ে আমার ভেতরটা কেঁপে উঠলেও বললাম, কাকে গুলি করতে হবে?

সে মুখ চোখের ভাব কঠিন করে জানালো, ইকবালকে।

কেন?

ওর মত খারাপ চরিত্রের লোকদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। বেঁচে থাকলে দিন দিন ওরা আমাদের সমাজটাকে আরো নোংরা কেরে ফেলবে।

পিস্তল হাতে আমি ভাবতে থাকি। এখন বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ভালো না। চারদিকে পুলিশ পাহারা। যে কোনো সময় যে কোনো কাউকেই পুলিশের লোকেরা ডাক দিয়ে শরীর অথবা ব্যাগ তল্লাশি করছে। অথচ এমন একটি নাজুক সময়ে পিলু পিস্তল পেলো কোথায়? সঙ্গে সঙ্গেই সেটাকে পেটের কাছে প্যান্টের ভেতর লুকিয়ে ফেললাম। কিন্তু যতদূর জানি ইকবালের সঙ্গে পিলুর সম্পর্ক খুবই ভালো। প্রেমের সম্পর্ক। কিন্তু কী এমন কারণ ঘটলো যে, ইকবালকে ও খুন করানোর মত নোংরা কাজ করতে চায়? বলি, তুই এখানে না দাঁড়িয়ে ক্যান্টিনে গিয়ে চা-শিঙ্গাড়া খা। ইকবালকে ঠিক মাথায় গুলি করেই আমি বাসায় চলে যাবো।

পিলুকে ক্যান্টিনে পাঠিয়ে দিয়ে পিস্তলটা আমি সেখানেই ড্রেনের পাশে লুকিয়ে রাখি।

তারপর ছুটে যাই ইকবালের কাছে। বলি, সত্যি করে বল পিলুর সঙ্গে তোর সমস্যাটা কি?

ইকবাল পারলে কেঁদে ফেলে এমনভাবে বললো, আমার কাজিনের সঙ্গে এক রিকশায় দেখতে পেয়েই ক্ষেপে গেছে। আমি ওকে যতই বোঝাই যে, রুমঝুম আপু আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়! তা ছাড়াও তার স্বামী-বাচ্চাকাচ্চা আছে। আমার মনে তেমন কিছু থাকলে তার কাছে নিশ্চয়ই গোপন করতাম! কিন্তু কিছুতেই বোঝাতে পারছি না। কাল থেকে ও আমাকে খুন করাতে লোক খুঁজছে।

ও তো কোত্থেকে যেন সত্যি সত্যিই একটি পিস্তল যোগাড় করে আমাকে দিয়েছে তোকে খুন করতে।

ইকবাল গোমড়া মুখে বললো, আদনান বলেছে। ওটা জার্মানির তৈরি খেলনা পিস্তল হলেও মারাত্মক!

খেলনা পিস্তল?

ইকবাল মাথা নেড়ে জানিয়েছিলো। আর সঙ্গে সঙ্গেই আমার যাবতীয় উদ্বেগ বিদায় নিয়েছিলো। তার কিছুক্ষণ পরই ক্যাম্পাসে চাউর হয়ে গিয়েছিলো, ইকবালকে কে যেন গুলি করেছে।

পিলু পাগলের মত দৌঁড়ে এলো। আমাকে ডিপার্টমেন্টের সামনে দেখতে পেয়েই জড়িয়ে ধরে হাউমাউ কান্না জুড়ে দিয়ে বলেছিলো, এটা তুই কি করলি ভাইয়া?

বললাম, তুই তো বললি?

আমি রাগের মাথায় কি করেছি তুই কেন বুঝতে পারলি না!

তুই কি ইকবালকে বিয়ে করতি?

ওকে ছাড়া আমি কিছুই ভাবতে পারি না!

পিলুর কান্না দেখে কখন আমিও কাঁদতে থাকি বুঝতে পারি না। আমার সহপাঠীরা সবাই চারদিক গোল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। ভেজা চোখে মুহিবকে বললাম, একটু কষ্ট কর না দোস্ত! ইকবাল কোথায় আছে দেখবি?

কিছুক্ষণ পর ইকবাল আসতেই পিলু কান্না ভুলে আঁচল কামড়ে ধরেছিলো। আর আমার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠলো, ভাইয়া তুই কেন কাঁদছিস?

আমার মনের ভেতর হঠাৎ করে জমে ওঠা যাবতীয় কষ্ট মুহূর্তেই দূর হয়ে যায়।

সবাইকে বললাম, ইকবাল আর পিলুর আজই বিয়ে দেবো।

সবাই হাত তালি দিয়ে উঠেছিলো। এ উপলক্ষে সবাই মিলে ছোটোখাটো একটা পার্টির আয়োজনও করে ফেলেছিলো।

তারপর ইকবাল সহ ঘরে ফিরে পিলুকে তার ঘরে নিয়ে গিয়ে বলেছিলাম, তোর কথা মত সত্যিই যদি ওকে গুলি করতাম, তুই কি আমাকে ক্ষমা করতে পারতি?

পিলু আমার একটি হাত টেনে নিয়ে গালে লাগিয়ে বলেছিলো, তুই খুবই ভালো রে ভাইয়া!

আমার বুকটা ফের আনন্দে ভরে উঠেছিলো। আর কিছু না পারি পিলুকে মনে হয় সুখী হওয়ার পথে খানিকটা এগিয়ে দিতে পেরেছি।

পিলু তেমন ভাবেই আবার বলেছিলো, ভবিষ্যতে আমি এমন কিছু বললে তুই আর শুনিস না!

কিন্তু পিলুর বিয়ে নিয়ে ক্ষেপে উঠেছিলেন বাবা। ইকবাল আর পিলুর সামনেই পায়ের স্যান্ডেল খুলে হাতে নিয়ে বলেছিলেন, মেয়ের জন্য আমি ডাক্তার ছেলে ঠিক করেছি আর তুই কিনা বিয়ে দিয়েছিস তোর মত আরেকটার সঙ্গে?

তারপর হাতের স্যান্ডেল দিয়ে মারতে মারতে আমাকে ঘরের বাইরে বের করে দিয়েছিলেন। দু’দিন দরজার সামনে বাইরের দেয়ালে হেলান দিয়ে কাটিয়েছি। পিলু আর মা যথারীতি আমাকে তিন-বেলা খাবার ঠিকই দিয়েছে। তৃতীয় দিন বাবা আমাকে ঘরে ফিরিয়ে নিলেও অনেকদিন পিলু আর ইকবালের বিয়েটাকে মেনে নিতে পারেননি।

পিলু চা আর দুটো ট্যাবলেট নিয়ে ফিরে এসে আমার পাশে বসে বললো, তোর কি মাথা ব্যথা আছে? টিপে দেবো?

টিপতে হবে না। কেমন যেন ভারী হয়ে আছে।

ট্যাবলেট খেয়ে চা খেতে খেতে আমি তাকে ইকবালের কথা জিজ্ঞেস করি।

পিলু জানায়, ইকবাল নাকি ওকেও সেখানে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। কিন্তু সে নাকি মানা করে দিয়েছে।

আমি অবাক হয়ে বলি, বোকা মেয়ে মানা করেছিস কেন?

পিলু আমার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো, তোদের না দেখলে আমি কোথাও গিয়ে থাকতে পারবো না!

তুই তো দেখছি আসলেই গাধা! আমাদের তো তুই ইন্টারনেটেই দেখতে পাবি। ইন্টারনেটে বিভিন্ন ম্যাসেঞ্জারে এ সুযোগ আছে। তা ছাড়া শুনেছি সেল ফোনেও নাকি ভিডিও কলের সুবিধা আছে। তুই গিয়ে তেমন একটা সেট পাঠিয়ে দিলেই তো হতো!

পিলু আঙুলের মাথায় আঁচল জড়িয়ে বললো, তাহলে কি ওকে আবার বলবো ব্যবস্থা করতে?

কেন বলবি না?

মানা করে দিয়ে কি করে আবার বলবো? আমার লজ্জা লাগবে।

তোকে বলতে হবে না। যা বলার আমিই বলবো। যদিও ইকবাল আমাকে এখনও কিছু জানায়নি। হয়তো ব্যাপারটা নিয়ে কেবলই ভাবতে আরম্ভ করেছে। আর তাই জানিয়েছে পিলুকে।

চার

আলম ভাই বিয়ে করেছেন সত্যিই। যাকে বিয়ে করেছেন তাকে আগেও কয়েকবার দেখেছি। আঁখি নামের এই শ্যামাঙ্গী মেয়েটি আলম ভাইয়ের সঙ্গে প্রেম করলেও হুট করে আমাদেরই পাড়ার মাজুলকে বিয়ে করে ফেলেছিলো। সেখানে তার একটি মেয়ে জন্ম নিয়ে হাসপাতালেই মারা গিয়েছিলো। তারপর কোনো কারণে বছর দুয়েক পর ওদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। আমার মনে হয় আলম ভাই এর প্রধান কারণ। বিয়ের পর কোনো ছেলেই চাইবে না তার স্ত্রী আর কারো সঙ্গে ঘুরে বেড়াক। তা ছাড়া যে গাড়িটি প্রতিদিন তাদের অফিসে আনা নেয়া করতো সে গাড়ির ড্রাইভারের ধারণা মেয়েটা আলম ভাইয়ের। আমি ঘরের কাউকে কিংবা ভাবিকে এ ব্যাপারে কিছু বলি না। এ সমস্ত কথা শুনতে বা বলতে আমার ভালো লাগে না। তবুও নানা ধরনের কথা আমার কানে আসে। কোনো কোনোটাতে এতটাই নোংরা ইঙ্গিত থাকে যে, তখন সত্যি সত্যিই খুনি হতে ইচ্ছে হয়।

বড় ভাবি মাঝে মধ্যে মায়ের কাছে এসে কান্নাকাটি করেন। তখন মা কি বলে পুত্রবধূকে প্রবোধ দেন জানি না। মেয়েদের চোখে পানি দেখলে আমারও কান্না পায়। তাই তাদের কান্নাকাটির সময় ধারে কাছে থাকি না। তার স্বামী ঠিক মত ঘরে আসে না। নতুন বউকে নিয়ে নতুন কোনো জায়গায় থাকছে। কিছুদিন পর শুনতে পাই আলম ভাইর মেয়ে চিকু আমেরিকা চলে গেছে। শুনে একটু খারাপ লেগেছিলো। মেয়েটা আমেরিকা চলে গেল অথচ আমাদের কাউকে জানালো না। আলম ভাই বা ভাবিও কিছু জানাননি। কেন জানাননি সেটা হয়তো তারাই বলতে পারবেন। কিন্তু মানুষ যখন বাঁচে তখন কেবল নিজের জন্যেই বাঁচে না। একটি মানুষের সঙ্গে অনেক ধরণের মানুষ সম্পর্কিত থাকে। তার মাঝে কিছু কিছু সম্পর্ক কাছের হলেও মানুষ তাদের কথা ভাবে না। ওদের মেয়ের হুট করে আমেরিকা চলে যাওয়াটাও কেমন যেন অদ্ভুত আর উদ্ভট বলে মনে হয়েছিলো আমার কাছে। মা-বাবা শুনে কষ্ট পেয়েছিলেন। কিন্তু আলম ভাই বা ভাবিকে এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেননি।

রাতের বেলা পিলু জানালো ইকবাল তার নামে টাকা পাঠিয়েছে। অনেক টাকা নাকি। আমি তাকে বলি, কেমন টাকা পাঠিয়েছে রে পিলু?

পিলু ঠোঁট চেপে জানায়, তোকে বলবো কেন? তোর টাকার দরকার হলে বলতে পারিস।

তাই তো বলছি কত পাঠালো? হাজার পঞ্চাশেক দিতে পারবি?

পিলু কিছু একটা ভেবে নিয়ে বললো, এবার হয়তো পারবো না।

তাহলে হাজার দশেক দে!

তখনই একটি দশ হাজার টাকার চেক লিখে দিলো পিলু।

আমাদের ঘরে কোনো ফোন নেই। ইকবাল দেশের বাইরে থাকে। পিলু কল সেন্টারে নয়তো পাশের বাড়ি গিয়ে ইকবালের সঙ্গে কথা বলে তা আমার ভালো লাগে না। তাই ঠিক করেছি একটা সেলফোন তাকে কিনে দেবো। আমার নিজের টাকা থাকলে হয়তো তার কাছ থেকে টাকা নিতাম না।

টাকা তুলেই একটি সিম সহ সেলফোন কিনে ফেলি। নকিয়ার চালু একটি মডেল। এ মডেলটাই বেশিরভাগ মানুষের হাতে দেখি। সবাই যখন কিনছে তাহলে এটা নিশ্চয়ই ভালো হবে। দামও হয়তো সাশ্রয়ী। কিন্তু সেলফোন পেয়ে পিলু একটুও খুশি হলো না। বললো, ল্যান্ড ফোনের জন্য তো টি-এন্ডটিতে টাকা জমা দিয়ে এসেছি! একমাসের ভেতর হয়ে যাবে! আর তুই এটা কিনতে গেলি কেন? আমিই তো অনেক মার্কেট চিনি! টাকাটা দিয়েছিলাম তোকে!

বললাম, আমার টাকার দরকার নেই।

কারো টাকার দরকার নেই কথাটা হাস্যকর।

পিলু আজকাল অনেক ভারী ভারী কথা বলে। মা বাবার সঙ্গে কেমন রেগে রেগে কথা বলে। হয়তো তার টাকার কিয়দংশ আমাদের সংসারে খরচ হচ্ছে বলে সেও আলম ভাইয়ের মত মেজাজ দেখিয়ে কথা বলছে।

একবার টাকা আনতে ভাবির কাছে গিয়েছিলাম। ভাবি কেঁদে ফেলার মত মুখ করে বলেছিলেন, আর কত তোদের টানবো? তোরা কি এখানে আসা বন্ধ করতে পারিস না?

এরপর বাবাকে বলেছিলাম যে, টাকা আনতে আমি আর যেতে পারবো না।

বাবা বলেছিলেন, তোর খারাপ লাগলে আর যাস না।

কিন্তু তবুও আমি অনেকবার গিয়েছি টাকার জন্য। আমার খারাপ লাগলেও ভাবির মুখ কালো করা হাত থেকে টাকা নিয়ে বাবাকে দিয়েছি।

পিলু এখন প্রতি মাসেই শপিঙে যাচ্ছে। নিজের জন্য নানা ধরনের জিনিস কিনে আনছে। জীবনে দেখিনি বা নাম শুনিনি এমন জিনিসও কিনে নিয়ে আসছে। মাঝে মধ্যে আমাদের জন্যও এটা ওটা নিয়ে আসছে।

মা বলেছিলেন, সবই খরচ করে ফেলছিস নাকি? তোর ভবিষ্যৎ নেই? কিছু টাকা ব্যাঙ্কে রেখে দিলেও তো পারিস!

পিলু জবাব দিয়েছিলো, টাকাগুলো আমার খরচের জন্যই পাঠাচ্ছে। জমাবো কেন? ইকবালই তো আমার ভবিষ্যৎ!

মা চুপ হয়ে গিয়েছিলেন।

বাবা অনেকদিন ধরেই বলছিলেন, কি একটা শারীরিক সমস্যায় নাকি তিনি ভুগছেন। পিলুকে কদিন ধরেই বলছিলেন হাসপাতালে নিয়ে যেতে। কিন্তু তার নাকি ভালোই লাগে না। ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়ে কার কার সঙ্গে প্রায় সারাক্ষণই কথা বলে। মা দরজায় কান পেতে কথার ধরণ বুঝতে চেষ্টা করেন।

মা’কে বলি, বাবা আমার সঙ্গে হাসপাতালে গেলেই তো পারেন।

মা বিরক্ত মুখে জানান, তোর কাণ্ডজ্ঞান কিছু আছে নাকি! তোকে নিয়ে যেতে নাকি ভরসা পায় না।

বাবা কেন যেন আমাকে সহ্যই করতে পারেন না আজকাল। মনে হয় কোনো কারণে তিনি আমার মুখ দেখতে চান না। হয়তো বেকার হয়ে পিতা আর ভগ্নির অর্থ অপচয় করছি দেখে আমি বাবার চোখের বিষ হয়ে গেছি। তখনই আমার মনে পড়ে যে, শেষ ইন্টার্ভিউ দেবার সময় প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, এবার চাকরি না হলে রেল লাইনের পাশের কোনো বস্তিতে গিয়ে আশ্রয় নেবো। প্রতিজ্ঞা করেও তা রক্ষা করিনি বলেই হয়তো নিয়তি আমার উপর শোধ নিচ্ছেন।

কিন্তু কোন এলাকায় রেল লাইনের পাশে ঘন বস্তি আছে তাই জানি না। তবে মনে মনে ঠিক করি যে, এবার সত্যি সত্যিই যাবো। আর ক’টা দিন বাদে। রাইসার পরীক্ষা শেষ হলেই যাবো।

মেয়েটা প্রথম প্রথম ভালোই ছিলো। কিন্তু উপরের ক্লাসে উঠবার সঙ্গে সঙ্গে পড়াশুনার প্রতিও যেন মনোযোগ হারাচ্ছে। সেদিন হঠাৎ করেই সে আমাকে বলে বসলো, স্যার আপনার কি প্রেমিকা আছে?

আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকি তার মুখের দিকে। মাত্র এইটে পড়ে মেয়ে। এমন প্রশ্ন করতেই পারে। আর এ থেকেই বুঝতে পারি মেয়েটা বড় হচ্ছে। লেখাপড়ার বাইরে কৌতূহল বাড়ছে।

সে ভেবেছে আমি তার উপর রাগ করেছি। তাই হয়তো বললো, খালা-মণি জিজ্ঞেস করতে বলেছিলো।

আমি বলি, রাগ করিনি। তোমার কৌতূহল ভেবে হঠাৎ চমকে উঠেছিলাম।

কেন স্যার?

ভেবেছিলাম, তুমি তোমার বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছো কিছু।

তেমন কিছু না স্যার। বন্ধুরা আরো অনেক খারাপ খারাপ কথা বলে। সেদিন খালা-মণি হঠাৎ করেই জিজ্ঞেস করলো, তোর স্যার কি তোর সঙ্গে তার নিজের কথা কিছু বলে?

আমি না করতেই ও কথাটা জিজ্ঞেস করলো।

তোমার খালা-মণি কি দেশে?

কাল সন্ধ্যায় এসেছে। এসেই ঘুম দিলো। সকালে স্কুলে যাবো তৈরি হচ্ছি তখনই ও কথাটা বললো।

আচ্ছা আমি উনার সঙ্গে কথা বলবো।

তার মনোযোগ পড়ার বাইরে চলে এসেছে। এখন পড়ায় মনোযোগ ফিরে আসবে না। হয়তো আজ তার পড়াও হবে না। তাই ভিন্ন খাতে সরাতেই বলি, আচ্ছা তুমি না বলেছিলে স্কুল থেকে কোথাও নাকি নিয়ে যাবে। সেটা কবে?

সেটা কবে এখনও তো কিছু জানায়নি। কিন্তু মা আমাকে যেতে মানা করেছে।

কেন?

পরীক্ষার পর দার্জিলিং যাবে বলেছে।

আচ্ছা। সেখানে যে ভালো স্কুল আছে জানো?

জানি। কিন্তু সেখানে পড়তে যাবো না।

কেন? ভালো স্কুল।

আমি এদেশেই থাকবো। কোথাও যাবো না।

আমি বলি, বড় ডিগ্রি নিতে হলে তো যেতেই হবে।

শুনেছি আমাদের ইউনিভার্সিটি থেকেও বড় ডিগ্রি নেয়া যায়।

রাইসার কথা শুনে আমার খুবই ভালো লাগলো। মনে হলো সে তার নিজের দেশটাকে খুবই ভালোবাসে।

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে রাইসা বললো, বিচ্ছেদ কি?

ছাড়াছাড়ি। বিচ্ছিন্নতা।

সেপারেট?

তেমনিই।

তারপর আবার বলি, তোমার বাংলা শব্দ-ভাণ্ডার খুবই দুর্বল দেখছি। অভিধান নেই?

রাইসা কেমন বোকার মত মুখ করে তাকিয়ে থাকে।

বলি, বাংলা ডিকশনারি নেই?

সে মাথা নাড়লো।

বললাম, একটা বাংলা ডিকশনারি কিনে নিও।

বাবা বাংলা পছন্দ করে না। জানেন আমার খুব ইচ্ছে হয় বাংলা বই পড়তে। কিন্তু আমাদের ঘরে একটিও বাংলা বই নেই। শুনেছি বাংলায় কত সুন্দর সুন্দর স্টোরি আর নভেল আছে। বাবা বলেন, বাংলা পড়া নাকি মিডল-ক্লাস টেন্ডেন্সি!

আমার খুবই খারাপ লাগে। রাগও হয়। ইচ্ছে হয় রাইসার বাবার কলার চেপে ধরে এখনই জিজ্ঞেস করি, বাংলা ভাষার ব্যাপারে কেন তার এমন ধারণা হলো? কিন্তু তা করতে হলে বুকের পাটা লাগে। আমি তেমন সাহসী কাজ করতে পারবো না হয়তো। ইচ্ছে করলে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছটা রাইসাকে দিতে পারি। কিন্তু সন্তানের ব্যাপারে কোনো বাবার সিদ্ধান্তকে খাটো করে দেখাটা মুর্খামির পর্যায়েই পড়বে হয়তো। তাই সিদ্ধান্ত নেই আজকের পর রাইসাকে আর পড়াতে আসবো না। অন্য কোথাও টিউশানি খুঁজে নেবো। নয়তো পরিকল্পনা মত কোনো বস্তিতে গিয়ে উঠবো।

পাঁচ

রাইসাকে পড়ানো বাদ দিয়ে যেখানে যেখানে রেল লাইন আছে সেখানে সেখানে গিয়ে আমি খোঁজ নিতে লাগলাম। এভাবে খুব বেশি সংখ্যায় বস্তি দেখতে পাই স্বামীবাগ রেল ক্রসিং থেকে দক্ষিণ দিকে। রেল লাইন ধরে হেঁটে হেঁটে আরো দক্ষিণে গেলে দেখতে পাই দু’পাশে নানা উপাদানে তৈরি সারি সারি ছোট ঘর। এখানকার বাসিন্দারা কেউই হয়তো আমার মত বেকার নয়। লাইনের দু’পাশের বস্তিগুলোর সামনে লাইনের কংক্রিটের স্লিপারের ওপর দেখতে পাই আগর বাতি বানিয়ে শুকোতে দেয়া হয়েছে। কোথাও চিপসের মত করে আলু কেটে রোদে শুকানো হচ্ছে। কোথাও বা দিয়াশলাইর কাঠিতে রঙিন বারুদ লাগিয়ে কুলোর উপর ছড়িয়ে রাখা আছে। কাগজের উপর কোথাও বা শুকোচ্ছে মশার কয়েল। এমন কি সুতোয় রঙ লাগাতেও দেখতে পেলাম কাউকে কাউকে।

আমাকে ঘুর ঘুর করতে দেখে অনেক নারী-পুরুষই প্রশ্ন করলো, কাকে চাই বা কি দরকারে এসেছি?

আমি বলি, এখানে আমার জন্য একটি ঘর তোলার জায়গা খুঁজছি।

ওদের কেউ কেউ বিস্মিত হয়ে বললো, আপনে ঘর তুলবেন কার লাইগা?

আমার নিজের জন্য।

তারা কেউ বিশ্বাস করে না। তারা নানা ধরনের জেরা করতে থাকে। তাদের সন্দেহ আমি পুলিশের লোক। এখানে কোনো অবৈধ কাজ কারবার হচ্ছে কি না জানতে এসেছি বা কোনো অপরাধীকে ধরতে এসেছি। শেষে আমি জানতে চাই এমন ছোটখাট একটা ঘর তুলতে কেমন খরচ হতে পারে।

একজন জানায়, জিনিসপাতি জোগাইতে পারলে আবার খর্চা কি?

আমি তাকে পাল্টা জিজ্ঞেস করি, এসব কিনতে পাওয়া যায় না?

অনিশ্চিত কন্ঠে লোকটি জানায়, তা তো যায়! পুরান বাঁশ-পালা, বেড়া-দুয়ার সবই পাওয়া যায়।

কোথায়?

এহানেই কাছাকাছি। কিন্তু কইলে আমাগ অসুবিধা করবেন না তো? আপনে পুলিশের লোক হইলে আমাগ আরো বিপদ হইতে পারে।

বলি, তোমাদের এসব দেখাশুনা করে কে?

আমার কথা শুনে তাদের চোখমুখ শুকিয়ে যায়।

সে অবস্থাতেই আমি আবার জিজ্ঞেস করি, তোমাদের সর্দার নেই?

আছে।

কোথায়?

তারা পরস্পর মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। তারপর জানায় যে, সে এখানে নেই। মাঝেমধ্যে আসে। ভাড়া নিয়ে চলে যায়।

এবার প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বলি, তাহলে ঘরই ভাড়া নিতে চাই। মাসে ভাড়া কত?

ঘর বুইজ্যা। পঞ্চাশ থাইক্যা তিন’শ ট্যাকা।

আমি কথা বলে আর ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। রোদের তাপে শরীর ঘামতে ঘামতে আমার সার্টটি পিঠের ওপর লেপ্টে যায়। তখনই ঠোঁটে লিপস্টিক আর চোখে কাজল টানা একটি শ্যামলা মেয়ে এগিয়ে এসে হাসিমুখে জানায় যে, সে এখন একাই থাকে। এতদিন যে লোকটা তার সঙ্গে ছিলো কিছুদিন হয় সে অন্য ঘর আরো সস্তায় ভাড়া নিয়েছে। তার মত এমন অনেকেই আছে। বিভিন্ন বয়সের। বয়স আর অবস্থা বুঝে ইচ্ছে করলে মাসে পাঁচ-সাত’শ বা এক হাজার টাকা দিয়ে এক সঙ্গে থাকতে পারি। দু বেলার খাবারও পাওয়া যাবে একই খরচে।

ভেতরে ভেতরে চমকে উঠলেও বলি, কোনো অসুবিধা হবে না?

কিয়ের অসুবিধা? বউ-জামাইর মতন থাকলে কে আবার কি কইবো!

যেন অদৃশ্য কারো সঙ্গে একবার হুঁহ্ বলে মেয়েটি আবার বলে, কত মানুষেই তো থাকতাছে! আপনের ভালা না লাগলে যাইবেন গিয়া। যারে ভালা লাগে তার লগে গিয়া থাকবেন!

তারপরই মেয়েটি কেমন করে ঘাঁড় বাঁকিয়ে তাকায় আমার দিকে। তেমনি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে, দেইখ্যা তো মনে হয় আপনে আমাগরে ঘিন্না করেন! কিন্তু ডাক্তারের কাছে পরীক্ষা করাইতে রাজি আছি। কোনো খারাপ অসুখ পাইবেন না!

মেয়েটির কথায় যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন অতলস্পর্শী কোনো সুগভীর খাদের সন্ধান পাই আমি। যে খাদের প্রান্তে দাঁড়িয়েই ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠি। খাদের দিকে দৃষ্টি ফেলতে সাহস পাই না। আমার মনে হয় সমাজের উঁচু তলা আর নিচতলার মানুষদের চরিত্র একই।

আমি মনে মনে ঠিক করি যে, এখানে এসেই আস্তানা গাড়বো। জীবনটাকে একটু দূর থেকে দেখতে ইচ্ছে হয়। যেমন অনেক উঁচু বিল্ডিঙের ছাদে গিয়ে মানুষ নিচের রাস্তার দিকে তাকায়। তেমনি একেবারে সমাজের নিচু স্তর থেকে আমি দেখতে চাই আমাদের সমাজের উপরের স্তর দুটো। যদিও তাদের কথাবার্তা আর জীবন-যাপন পদ্ধতি জেনে কেমন ঘিনঘিন লাগছিলো। তবুও আমার মনে হলো, এটাও একটি পরীক্ষার মত হয়ে যাবে। মানুষ ইচ্ছে করলেই নিজকে নিচে নামাতে পারে, নাকি নিজ থেকেই অন্তর্গত ভাবে তার পতন হলে এমন জীবন-যাপনে সে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। আমার দেখতে প্রচন্ড ইচ্ছে হয়, কোন ধরনের আর কোন পেশার মানুষগুলো এমন সাময়ীক দাম্পত্য জীবন ভাড়া নেয়?

আমি ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত হয়ে ঘরে ফিরে আসি। দুপুরের খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। দুপুরের পর মা ঘন্টা খানেক ঘুমান। তিনি ঘুমালে ডাকাডাকি করে বিরক্ত করা বারণ। পিলু কিছুটা অস্থির ভাবেই যেন আমার জন্য  অপেক্ষা করছিলো। দরজা খুলে আমাকে দেখতে পেয়েই বলে উঠলো, কই ছিলি সারাদিন? রোদে রোদে ঘুরেছিস?

পিলু মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে এমন আচরণ করে না যে, মনে হয় আমি যেন স্কুল পালানো তার আদরের ছোট্ট ভাই। এখনি পারলে আমার কান টেনে ধরে। এমন ব্যাপারটায় খুবই মজা পাই। এখনও আমাকেই সে শাসন করতে আরম্ভ করলো।

বললাম, জানিস? স্বামীবাগ রেল লাইন দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গিয়েছিলাম।

হুঁ। দেখাচ্ছে যেন সারাদিন রিকশা চালিয়ে ঘরে ফিরেছিস। নেয়ে-ধূয়ে এসে খেতে বস। তোর সঙ্গে জরুরি কথা আছে!

পিলু যখন আমাকে কিছু জানাতে চায় বা বলতে চায় তার সবগুলোই জরুরি। জরুরি নয় এমন কোনো কথা সে আমাকে ডেকে কখনোই বলেনি।

গোসল করে খেতে বসে দেখি মোটামুটি ভালো খাবারই। আমি অবাক হই না। পিলুর হাতে টাকা আসা আরম্ভ করার পর থেকেই যে কোনো ছুতো নাতায় সে ভালো ভালো খাবারের আয়োজন করে। হয়তো সে ভালো রান্না করতে পারে বলেই তা খাওয়াতেও ভালোবাসে।

আমি খেতে খেতেই দেখতে পাই আঁচলের নিচে একটি হাত রেখে পিলু এসে আমার মুখোমুখি টেবিলে বসলো। বললাম, ইকবাল চিঠি দিয়েছে? ছবি পাঠাতে বলেছিলাম।

পিলু কপাল কুঁচকে বললো, চিঠির কোন দরকার? ফোনেই তো যা বলার বলে। বকর বকর আরম্ভ করলে তো ছাড়তেই চায় না!

পিলু কি কোনো কারণে ইকবালের ওপর বিরক্ত? কিন্তু কেন হবে? এমন কি কিছু ঘটেছে ওদের ভেতর? আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, ইকবাল কত মাস হলো গেছে?

গতকাল এক বছর হয়েছে।

আমি আর কোনো কথা খুঁজে পাই না। তবুও বলি, তোর হাতে কি?

তোর একটা চিঠি আছে।

আমাকে আবার কে চিঠি পাঠালো? মনে মনে অবাক হই। এমন কেউ তো নেই যে চিঠি পাঠাবে! আমি অপদার্থ বলে আমার সঙ্গে রাগ করে এত ভালো একটি চাকরি ছেড়ে দিয়ে মাসুমা গ্রামের বাড়ি চলে গেছে তাও বছর দেড়েক হয়ে যাবে। সে যে কোনো কারণে চিঠি পাঠাবে সে সম্ভাবনাও দেখি না। তাই ভাবছিলাম ইকবালই কি না। তবুও বলি, কে আবার চিঠি লিখলো? বুঝতে পারছি না।

তোর দুটো ভালো খবর আছে!

আমার আবার ভালো খবর! পিলু হয়তো এমনিই বলছে। তার কাছে সবই ভালো খবর।

আমি চুপচাপ মুরগির রেজালা দিয়ে পোলাও খাই। খেতে খুবই ভালো হয়েছে। যদিও পিলু রেঁধেছে। কিন্তু অন্যান্য মেয়েদের মত কখনোই সে জানতে চায় না, রান্না কেমন হয়েছে। সে খুবই আত্মবিশ্বাসী মেয়ে। নিজের কাজের গুণাগুণ জানার কোনো কৌতুহল নেই।

এক নম্বরে তোর চাকরি হয়েছে। দিলকুশা হেড অফিস। কিন্তু পোস্টিং রাঙামাটি।

বাকিটুকু না শুনেই বলে দেই, এ চাকরি করবো না!

আগে সবটা শোন, তারপর বলিস!

আমার যদিও রাঙামাটি যেতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, তবুও বলি, বল!

পিলু আঁচলের নিচ থেকে খাম ধরা হাতটা বের করে চিঠিটা খুলে পড়ে পড়ে বলতে লাগলো, ফার্নিশড অ্যাকোমোডেশন। আলাদা গাড়ি। অ্যালাউন্স। বছরে দুটি বোনাস। বছরে একবার দেশের বাইরে আসা-যাওয়ার এক্সিকিউটিভ ক্লাস বিমান টিকেট। ফাইভ স্টার কোনো হোটেলে এক সপ্তাহের থাকা-খাওয়ার খরচ। মাসিক বেতন চল্লিশ হাজার টাকা।

আমার বিশ্বাস হতে চায় না। বাংলাদেশে এমন সুযোগ সুবিধার চাকরি কেউ করে কি না তাও জানা নেই। হয়তো আমার পুরোনো বন্ধুদের কেউ মজা করেছে।

নির্বিকার ভাবে মুরগির হাঁড় চিবোতে চিবোতে বলি, দ্বিতীয় খবরটা কি?

চাকরির কথা কি তোর বিশ্বাস হচ্ছে না?

আমি চুপ করে থাকলে সে বলে, বাবা তোকে এমনি এমনি কান্ডজ্ঞানহীন বলে না! বলে, সে চিঠিটা আমার সামনে টেবিলের উপর ফেলে উঠে যেতে যেতে বললো, কাকলি নামের একজন তোকে আজই দেখা করতে বলেছে।

পিলু যে আমার উপর খুবই রেগে গেছে বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি কী করেই বা বিশ্বাস করবো যে আমার এত ভালো একটি চাকরি হতে পারে? এমন কোনো পোস্টে যে ইন্টারভিউ কখনো দিয়েছি তাও মনে করতে পারছি না।

খাওয়া শেষ করে এক হাতে চিঠিটা চোখের সামনে মেলে ধরি। সত্যি সত্যিই নিয়োগ পত্র। এ মাসের পঁচিশ তারিখের ভেতর জয়েন করতে বলা হয়েছে।

ছয়

নিয়োগ পত্রটা বেশ কয়েকবার দেখলেও মনের ভেতর থেকে তেমন কোনো তাগিদ বোধ করছিলাম না। কিন্তু সুযোগ সুবিধাগুলো আর বেতনের অংকটা নিয়ে ভাবছিলাম। সত্যিই এমন কিছু একটা হলে মন্দ হতো না। জীবনটাকে দেখতে পারতাম উপরতলা থেকে। কিন্তু এত সুযোগ সুবিধা তো একা একা ভোগ করা সম্ভব নয়। কাকে নিয়ে ভোগ করবো? বাবা মা কিছুতেই এ ভাঙা, স্যাঁতস্যাঁতে রঙচটা একচালা বাড়ি ছেড়ে কোথাও নড়বেন না। অচেনা কাউকে নিয়ে বা নতুন করে কারো সঙ্গে পরিচিত হয়ে আবার সব শুরু করবো? তাও আমাকে দিয়ে হবে না। মাসুমার কথা ভাবলে ইচ্ছে হয় একছুটে তার গ্রামের বাড়ি গিয়ে হাত ধরে বলি যে, মাসুমা, অনেক অভিমান হয়েছে। এবার তা ছাড়ো! কিন্তু সে যে টাইপের মেয়ে, আর সাত-আট বছরে তাকে যতটুকু বুঝতে পেরেছি, নিজ থেকে অভিমান ত্যাগ না করলে আমি হাজার কান্নাকাটি করলেও কাজ হবে না। হয়তো বাকি জীবন নিজেও একা থাকবে আমাকেও বাধ্য করবে একা থাকতে।

তখনই আমার খেয়াল হলো যে, কাকলির কথা কিভাবে বললো পিলু? এসব কখনো ঘরে বলেছি বলে তো মনে পড়ে না। তাহলে কি কাকলি এখানেই এসেছিলো? আমাদের ঘরে? কিন্তু কেন?

আমি পিলুর ঘরের দরজায় টোকা দেই। সে দরজায় এসে বলে, কি ঠিক করলি?

কাকলির কথা বলছিলি না?

পিলু গম্ভীর মুখে জানালো, না বললে তুই জানলি কি করে?

সে কি এসেছিলো?

না। আমি গিয়েছিলাম তাদের জিজ্ঞেস করতে, কেন তুই মেয়েটাকে পড়ানো ছেড়ে দিয়েছিস!

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি পিলুর মুখের দিকে।

তারপর নিশ্চিত হতে বলি, তুই গিয়েছিলি? সত্যি?

পিলু দু’হাত কোমরে রেখে বলে, আচ্ছা দিনদিন তোর হচ্ছে কি ভাইয়া? কোনো কিছুই বিশ্বাস করতে পারিস না কেন? আমি তোর সঙ্গে কখনো মিথ্যে বলেছি বলতে পারবি?

তুই ক্ষেপে যাচ্ছিস কেন?

আমি তোর একমাত্র বোন! তুই আমাকে অবিশ্বাস করবি কোন যুক্তিতে? যদি আগে থেকেই এমন চালাকি করতাম, না হয় সেটার একটা সম্ভাবনা ছিলো!

তার মন গলাতে আমি বলে উঠি, রাইসার বাবা বাংলা পছন্দ করাটাকে মিডলক্লাস টেন্ডেন্সি বলে মেয়েকে শিখিয়েছে। কথাটা শুনে আমার খুব রাগ হয়েছিলো।

এটা ঠিক হয়নি! আমি হলে মেয়েটার বাবাকে শিখিয়ে আসতাম, যে জন বঙ্গেতে জন্মি নিন্দে বঙ্গ বাণী, সেযে কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি!

কবির নামটা তো ভুলে গেছি!

কবির নাম বড় কথা নয়। কবি কী বললেন সেটাই বড়।

লোকটার মানসিকতা যেমন মনে হচ্ছে এ কথা কোথাও পড়েছে বলে মনে হয় না।

না পড়লেও এ সমস্ত নোংরা কীটদের চোখের সামনে তা মেলে ধরে কান দু’টোও মলে দিতে হয়!

তুই কি আমাকে যেতে বলছিস?

তুই তাদের শিক্ষা দিতে যাবি!

কিন্তু কাকলি কেন যেতে বললো, বলেনি?

সেটা তুই গেলেই শুনতে পাবি! আর মেয়েটার পরীক্ষা সামনে রেখে পড়ানো বন্ধ করা উচিত হবে না!

পিলুর কথাবার্তা শুনে খুবই অবাক হয়ে যাই। বিয়ের পর যেন তার বয়স অনেক বেড়ে গেছে। কোনোভাবে আমার চেয়েও বছর দশেক এগিয়ে গেছে। আর তখনই মনে মনে টের পাই যে, পিলুকে গুরুত্ব না দিলে আমাকেই আরো পস্তাতে হতে পারে।

পিলু আমার মুখের দিকে চেয়ে হঠাৎ বলে উঠলো, কাকলি কি মাসুমা আপুর চেয়েও সুন্দরী আর শিক্ষিত?

আমি চুপ করে থাকলে পিলু আবার বললো, পয়সাঅলা লোকদের পয়সাটাই থাকে। আর কিছু থাকে না। কাকলি যদিও পড়ালেখা করেছে, কিন্তু মাসুমার মত শিক্ষিত নয়। কথাবার্তা বলে আমার মনে হয়েছে বেচারির মনে শাড়ি-গয়না আর কসমেটিক্স ছাড়া কিছুই নেই। ভেতরটা আলকাতরার চাইতেও অন্ধকার!

পিলু কি আমাকে ইঙ্গিতে কিছু বলতে চাচ্ছে? তাও তো মনে হচ্ছে না। বললাম, তোর কথা ঠিক বুঝতে পারছি না!

মুর্খদের সঙ্গ থেকে যতটা দূরে থাকা যায় ততটাই আমাদের জন্য মঙ্গল। কাকলি হয়তো তোকে লোভের জালে আটকাতে চাইবে। নয়তো কেন বললো, তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে?

এটা ঠিক বলতে পারছি না।

পিলু হঠাৎ আমার কাঁধে হাত রেখে বললো, ভাইয়া, চাকরিটাতে জয়েন কর। প্লিজ!

আমার মনে হলো এখন যদি আমি মাথা নাড়ি তাহলে সে কান্না আরম্ভ করবে। আর সে কান্না জুড়লে বাবা শুনতে পাবেন। চাকরির কথাটাও তিনি জেনে যাবেন। আমি চেষ্টা করছি ব্যাপারটা যেন আমার আর পিলুর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাই তাকে বললাম, তুই ভয় পাস না। পঁচিশ তারিখ আসতে আরো বিশদিন সময় আছে। ততদিনে আমি ঠিকই জয়েন করে ফেলবো। তার আগে তুই কাউকে বলিস না যেন!

পিলুকে কথা দিলেও আমি কাকলির সঙ্গে দেখা করতে যাই না। কেন যেন আজ ঘর থেকে বেরুতে মন চাইছে না। আজ হোক আর কয়েক মাস পরই হোক পিলু এ বাড়িতে কিছুতেই থাকবে না। ইকবাল যখন বলেছে তাকে সেখানে নিয়ে যাবে, তা সে করবে। পিলু কি ইকবালের ডাক উপেক্ষা করতে পারবে? সে তা কখনোই পারবে না। ইকবালের জন্য সে পৃথিবীর সব কিছুই ছাড়তে পারবে। তখন বাবা মা কি একা একা থাকবেন? তাদের সুবিধা অসুবিধা কে দেখবে? যদিও বাবা আমাকে এখনও স্যান্ডেল দিয়ে পেটান সেটাও যে এক ধরনের অভিমান থেকেই করেন তা আর কেউ না বুঝলেও আমি বুঝতে পারি। আমাদের চোখের সামনেই আমাদের পাড়ায় যত সহপাঠি ছিলো সবাই কোনো না কোনো চাকরিতে যোগ দিয়েছে। অনেকেই বিয়ে করে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে দিব্যি সংসার সাজিয়ে বসেছে। কেবল আমারই কিছু হলো না। এমন একটা ব্যাপার কোন বাবা-মা মন থেকে মেনে নেবেন? বাবাও হয়তো পারছেন না। যদি চাকরিটার কথা তিনি কোনোভাবে জেনে যান, তাহলে আমাকে সেখানে জয়েন করতে বাধ্য করবেন। আর সে জীবন যাপনে যদি অভ্যস্ত হয়ে পড়ি, হয়তো আমার বর্তমান অভ্যস্ত জীবনে ফিরে আসতে চাইবো না। সঙ্গত কারণেই বাবা মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়বো। তাঁরা ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেলেও আমাকে তখন কিছু বলতে চাইবেন না। ভাববেন, ছেলে এত বড় একটি চাকরি করছে তা কি ছাড়া উচিত হবে? দিনে দিনে আমিও দূরে সরে যাবো আলম ভাইয়ের মত। তার সন্তানদের মত। অভ্যস্ত হয়ে উঠবো ভোগী জীবনে। ফিরে তাকানোর অবসর হবে না চলতে ফিরতে অক্ষম বাবা মা’র প্রতি। এমন জীবনকে আমি ঘৃণা করি। কিন্তু একটিই দুঃখ! আর তা হয়তো এ জীবনে কখনোই প্রকাশ করতে পারবো না।

পরপর তিনদিন ঘর থেকে বের হই না। মা’র সঙ্গে বাবাকে বলতে শুনি, স্টুপিডটা কি আজকাল ঘরেও আসছে না নাকি?

মা বললেন, ঘরে আসবে কি করে? তোমার কাজ-কারবার দেখলে তো মনে হয় ছেলেটা আমাদের না।

তিনিও হয়তো ধরে নিয়েছেন আমি ঘরে নেই। তাই খুব সহজেই আমার পক্ষ নিয়ে কথা বলতে পারছেন।

বাবা বললেন, অমন কি আর সাধে করি! এ পাড়ার সব অপদার্থই চাকরি নিয়ে সংসার করছে। শুধু আমাদের গাধাটারই কিছু হলো না! কবে চাকরি পাবে আর কবে বিয়ে করবে? এ জন্মে হয়তো নাতি-নাতনির মুখ দেখতে পাবে না! তা ছাড়া মাসুমা বলে মেয়েটা খারাপ কি ছিলো? এত বছর প্রেম করতে পারলো আর বিয়ের সময় হতেই যত ঝামেলা বাঁধালো। কান্ডজ্ঞানহীন-অপদার্থ কি এমনি এমনিই বলি?

তোমারও যেমন কথা! আমরা নিজেরা বিয়ে না করালে কি ও নিজে বলবে বিয়ে করবো?

কেন? নিজে যেমন অপদার্থ, মেয়েটাকেও গছিয়েছে আরেকটা অপদার্থের গলায়! আমাকে তো কিছু জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি! আরেকটা তো চোরের মত লুকিয়ে বিয়ে করলো, তোমাকেও কি একবার বলার প্রয়োজন মনে করেছিলো?

সেটা তো তোমার মেয়ে চেয়েছে বলে! আর আলম তো আগেই বলেছে আমাকে। তোমাকে বলিনি?

মেয়েটাও ভালো নাকি? বিয়ে করে সেই যে শ্বশুর বাড়ি গিয়ে চুলো ফুঁকতে আরম্ভ করলো, মাস্টার্সটাও শেষ করলো না!

থাক ওসব নিয়ে তোমাকে অত ভাবতে হবে না!

তারপর বাবা আরো কি কি বলেন বুঝতে পারি না।

আমার খুবই কষ্ট হতে থাকে বাবার কথাবার্তা শুনে। ইচ্ছে হয় চাকরি নিয়ে চলেই যাই। কিন্তু কী করে তাদের বোঝাই যে, সামনে তাঁদের জন্য যে কঠিন সময়গুলো আসছে তা কি দুজন মিলে পার করতে পারবেন? আমি জানি পারবেন না। আমি যদি বেঁচেবর্তে থাকি তাহলেই তাদের সময়গুলো ভালো কাটবে। তার আগে আমাকে ঢাকা শহরেই কোথাও একটি চাকরির সন্ধান করতে হবে।

ঠিক তখনই আমার মনে হয়, যে অফিস থেকে আমার নিয়োগপত্র পাঠিয়েছে সেখানে গিয়ে দেখা করে বাবা মায়ের অবস্থাটা ব্যাখ্যা করা যায়। কেন আমি অতদূর অত সুযোগ-সুবিধা পেয়েও যেতে চাচ্ছি না তারাও হয়তো বুঝতে পারবেন। আর এমন একটি ভাবনা মাথায় আসতেই বেশ চাঙ্গা বোধ করতে থাকি। মনে হয় আমার যাবতীয় সমস্যার সমাধান পেয়ে গেছি।

সাত

কাকলি ঘরে একাই ছিলো। যদিও রাইসা স্কুলের পরীক্ষা শেষ করে তার বাবা মায়ের সঙ্গে দার্জিলিং চলে গেছে তারপরও আমার এখানে আসার কোনো হেতু থাকতে পারে না। কিন্তু আমাকে আসতে হয়। কাকলির জন্যই আসতে হয়। সে নাকি আর কানাডায় ফিরে যাবে না। এখন থেকে দেশেই থাকবে। কিন্তু অনেকদিন সেখানে ছিলো বলে আর ঘরেও বাংলা বলার মত কেউ ছিলো না বলে ঠিকমত বাংলায় কথা বলতে পারে না। আমার কাছে ব্যাপারটা ন্যাকামী মনে হলেও সে পরিষ্কার ভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, তার কোনো এক আত্মীয়ের সঙ্গে নাকি তার গত বছর থেকেই একটি সম্পর্ক তৈরী হয়েছে। তার ইচ্ছে আত্মীয়টিকে বিয়ে করবে। ভালো করে বাংলা বলতে পারে না বলে ব্যাপারটাকে এগিয়ে নিতে পারছে না। এখন আমি যদি তাকে সহযোগীতা করি তাহলেই সে আগাতে পারবে। আমার মনে হয় পিলু যা ধারণা করেছে তা হয়তো ঠিক হয়নি। কাকলির মনে এমন কোনো অভিসন্ধি থাকলে সে এত খোলাখুলি কথা বলতে পারতো না।

কিন্তু কিভাবে আমি তাকে সাহায্য করবো? আমার পড়াশুনার বিষয় তো বাংলা সাহিত্য ছিলো না। আমিও কি ভালো বাংলা জানি? কিন্তু কথাবার্তার ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত মাতৃভাষা নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়িনি। কাকলিকে ভালো সাহায্য করতে পারবে কোনো আবৃত্তি সংঘ। তাকে বললাম, আপনি কোনো আবৃত্তি আর উচ্চারণ ক্লাস করলে ভালো করবেন।

অতটা চিবিয়ে চিবিয়ে বাংলা উচ্চারণ শিখতে হবে না। রেগুলার আমরা যে ওয়র্ডস ইউজ করি তেমনগুলো হলেই চলবে। দুটো ডিকশনারি এনেছি। একটি বেঙ্গলি টু বেঙ্গলি আরেকটা ইংলিশ টু বেঙ্গলি। কিন্তু জানেন আমাদের মেইড মানে কাজের মেয়েটা ব্রেডকে বলে পোয়ালুডি। ইংলিশ টু বেঙ্গলিতে দেখলাম ব্রেড এর বাংলা পোয়ালুডি বলে কিছু নেই। ছোট বেলা পাউরুটি কথাটা শুনেছি। কিন্তু বেঙ্গলি টু বেঙ্গলিটাতেও পোয়ালুডি বলে কোনো ওয়র্ড পেলাম না!

আমার হাসি পেলেও গম্ভীর থাকতে চেষ্টা করি। বলি, তেমন শব্দ পেতে চাইলে আপনাকে আঞ্চলিক অভিধান দেখতে হবে।

আমার কথা শুনে সে উঠে গিয়ে বাংলা ডিকশনারি নিয়ে এলো। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে সে অভিধান শব্দটা বের করে বললো, ডিকশনারি বলতে অভিধান কি সবাই বলে?

না। আমিও কখনো কখনো ডিকশনারি বলি। এমন অনেক শব্দ আমরা ব্যবহার করি যার বাংলা নেই। যেমন গ্লাস। কেউ কেউ গেলাস বলি। কিন্তু ছোট বেলা টেবিলের বাংলা মেজ্ বলে কোনো কোনো প্রবীণের মুখে শুনেছি। পকেটের বাংলা শুনেছি জেব। কিংবা ড্রয়ারের বাংলা শুনেছি দেরাজ। কিন্তু এখন ওগুলো কাউকে বলতে শুনি না। তা ছাড়াও অনেক বাংলা বলে পরিচিত শব্দ কঠিন বলে বেশির ভাগ মানুষ ইংরেজিটাই ব্যবহার করে। অবশ্য আমরা সবাই যদি সেগুলো ব্যবহার করতে থাকি তাহলেই কিন্তু হয়।

তখনই কাজের মেয়েটা চা নিয়ে এসে বললো, আফা, লম্ফা কৌট্টাডা খুলতাম পারছি না!

কাকলি একটি কাপ নিয়ে আমার সামনে রেখে বললো, এই যে লম্ফা কথাটা বুঝতে পারছেন?

পারছি। লম্বা বোঝাতে বলছে।

এমন অনেক ডিফিকাল্ট ওয়র্ডস মার্কেটেও শুনতে পাই। কিন্তু বুঝতে পারি না!

এগুলো বুঝতে হলে তেমন মানুষদের কাছাকাছি আপনাকে যেতে হবে। দেখে শুনে জানতে হবে। এমন অনেক শব্দ আছে, যা হয়তো আঞ্চলিক অভিধানেও নেই। তেমন কিছু শব্দ জানতে পারবেন বাংলা উপন্যাসগুলোতেও। আজকাল অনেকেই তাদের গল্পে উপন্যাসে আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করছেন।

কাকলি যে সত্যিই ভালো বাংলা শিখতে আগ্রহী, তা বুঝতে পারি। কিন্তু তবুও পিলুর কথা ভাবলে আমার মন খুঁত খুঁত করে।

সপ্তাহ খানেক তাকে সময় দিয়ে বলি, আমি হয়তো আর এ সময় আসতে পারবো না। একটি চাকরিতে জয়েন করবো বিশ তারিখে। আপনাকে নিজে নিজেই চেষ্টা করতে হবে। নয়তো আর কারো সাহায্যে কাজটা করতে হবে।

কাকলিকে যদিও বলে এসেছি বিশ তারিখ চাকরিতে জয়েন করবো, কিন্তু কথাটা ঘরের কাউকে বলিনি। ঠিক করে রেখেছি, জয়েনের দিন বাবা মা দু’জনের পা ছুঁয়ে কথাটা জানাবো। পিলু হয়তো ভেবে বসবে আমি রাঙামাটিই যাবো। কিন্তু যে ভদ্রলোককে আমি ইচ্ছে করেই ধর্মের লাঠিতে ধরাশায়ী করেছিলাম তার নাম জয়ন্ত গোস্বামী। তিনি আমাকে দেখে হেসে বলেছিলেন, আপনি খুবই জটিল মানুষ! বসেন! আপনার মত ভাবতে পারলে আমাদের অনেক সমস্যাই মিটে যেতো।

বন্ধুসূলভ আচরণে ভদ্রলোককে খুবই আপন মনে হয়েছিলো। সব খুলে বলতেই তিনি আরো খুশি হয়ে বলেছিলেন, এ ছোট পোস্টটি আমার এক আত্মীয়ের জন্য রেখেছিলাম। কিন্তু আপনার কারণে স্বজন প্রীতি দেখাতে পারলাম না।

আমি বলেছিলাম, আপনার আত্মীয়কে রাঙামাটি পাঠিয়ে দিতে পারেন।

আপনিও যেমন! যাকে যে পোস্টে আমরা নিয়োগ দিয়েছি কাগজপত্র দেখেই দিয়েছি। আত্মীয়কে উপযুক্ত মনে করলে আপনাকে কেন সে পোস্ট দেবো?

তারপর তিনি জানালেন, দেখেন, কেউ যদি শোনে যে, চল্লিশ হাজার টাকার বেতন সহ যে যে সুবিধাগুলো ছিলো তা ছেড়ে আপনি সাড়ে দশ হাজার টাকার বেতনের চাকরিটা নিয়েছেন, আপনাকে পাগল ছাড়া আর কিছু বলবে না!

বললাম, বাবা-মা’র জন্য শুধু পাগলই নয় আরো কঠিন কিছু বললেও আমার ভেতর কোনো প্রতিক্রিয়া হবে না।

জয়ন্ত গোস্বামী আমার নতুন নিয়োগপত্র কম্পোজ করতে দিয়ে বললেন, একটা কথা বলি, হয়তো আপনার খারাপ লাগবে। কিন্তু কথাটা আমার জীবনে খুবই সত্যি।

আমি আগ্রহ দেখিয়ে বলি, বলেন।

যারা বাবা মাকে বেশি ভালোবাসে, তারা ব্যক্তি জীবনে তেমন একটা সফল হতে দেখিনি।

হতে পারে। কিন্তু আমি এ ও দেখেছি যাঁরা বাবা মা’কে ভালোবেসে জীবনের এ দিকটি দিয়ে খানিকটা পিছিয়ে থাকলেও তাঁদের সন্তানদের কাউকে বখে যেতে দেখিনি। অমানুষ হয়ে যেতে দেখিনি।

জয়ন্ত গোস্বামী কেমন অদ্ভূত ভাবে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। কিন্তু মনে হলো ভেতরে ভেতরে বেশ কিছুটা পুলক অনুভব করছেন। এ অবস্থায় আমি তাকে আবার বলি, কিছু বলবেন?

বর্তমান পজিশনে আসতে আমার অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। সেই সাত সকালে বেরিয়েছি। ফিরতে ফিরতে রাত বারোটা একটা। ঘরে গেলে দেখতাম ছেলেমেয়েরা ঘুমে কাদা হয়ে আছে। স্ত্রী চোখে ঘুম নিয়ে ঢুলছেন। সকালের দিকে বেরোনোর সময়ও ছেলেমেয়েরা ঘুমে থাকতো। তবুও আপনার কথাটা আমার জীবনে শতভাগ সত্যি হয়ে ফলেছে। আমার ছেলেমেয়েরা বেশিরভাগ সময়ই আমাকে কাছে পায়নি সত্য। কিন্তু আমার বাবা মা আমার সঙ্গে ছিলেন। এখনও আছেন। মাঝে মধ্যে দুজনই বলতেন তুই কি আমাদের একটি মাত্র ছেলে? অন্যান্যদের কোনো দায় দায়িত্ব নেই? তোর কাঁধে কতদিন বোঝা হয়ে থাকবো?

দুজনের পায়ের কাছে বসে বলতাম, ভগবান যতদিন আমার হাতে তোমাদের অন্ন পাঠান ঠিক ততদিনই। আমি তোমাদের জোর করে ধরে রাখতে যাবো না। বাবা মা যেমন নাতি নাতনীদের ভালোবাসেন, আমার ছেলেমেয়েরাও তাদের দাদু-দিদিমাকে তেমনি ভালোবাসে। বড় ছেলেটা জার্মানিতে আছে। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে দাদু দিদিমার সঙ্গে তার কথা বলা চাই। আমার চার ছেলেমেয়েই স্কলার। নিজেরাই কেমন করে সব ব্যবস্থা করে বিভিন্ন দেশে চলে গেছে। আমাকে একবার বলেনি যে, অত টাকা দিতে হবে।

ভদ্রলোকের কথা শুনতে শুনতে আমিও স্বপ্ন দেখি, বাবা-মাকে ভালোবেসে আমিও বিমুখ হবো না। আর হলেই বা কি। তবুও আমার মনে এ আনন্দটুকু থাকবে যে, আমিই তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ছিলাম।

নিয়োগপত্রটা নিয়ে বাবার হাতে দিয়ে বললাম, বাবা দেখ তো আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার কিনা?

বাবা কেমন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, গাধা যদি ঘোড়া হতো, তাহলে সবাই গাধার বাচ্চা কিনেই পুষতো!

তারপর তিনি চিঠিটা খুলে দেখলেন। খুশি না অখুশি হলেন বুঝতে পারি না। বলি, বাবা, কিছু একটা বলো!

আমার কিছু বলার নেইরে! তোকে কত না হেনস্তা করেছি। কত কষ্ট দিয়েছি বাবা! বলতে বলতে হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরে হুহু করে কেঁদে উঠলেন তিনি।

পিতা মাতার চোখে যখন পানি থাকে কোনো সন্তানের চোখ শুকনো থাকে কিনা আমার জানা নেই। কিন্তু আমি তা সহ্য করতে পারি না। আমার চোখ দিয়েও কেন যেন পানি বেরিয়ে আসতে থাকে।

হঠাৎ পিলুর ঘরের দিকে আমার চোখ পড়তেই দেখি, সে কেমন হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। দৃশ্যটা হয়তো সে কল্পনা করতে পারছিলো না।

আট

মা’র কাছে শুনতে পাই ইকবাল পিলুর সমস্ত কাগজ-পত্র পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন দূতাবাসে আর ট্রাভেল এজেন্সিতে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজগুলো সারতে পারলে সপ্তাহ দুয়েকের ভেতরই পিলু নাইজেরিয়া চলে যেতে পারবে।

মা’র কাছ থেকে শুনে আমি পিলুকে বলি, তুই তো আর আমাদের থাকলি না। কথাটা যদিও বলতে পারি কিন্তু আমার ভেতরে ভেতরে কেমন যেন একটি হাহাকার ধ্বনিত হতে থাকে। পিলু চলে গেলে ঘরে আমার মন বসবে না। আমার খুবই ভালো একজন বন্ধু সে। আমার জন্য যার অনেক ভাবনা আর ভালোবাসা সেই ছোট বেলা থেকেই। সেই পরম বন্ধুর মত আমার প্রিয় বোনটি থাকবে না আমার চোখের সামনে। ইচ্ছে হলেও ক্ষণেকের জন্য যাকে দেখতে পাবো না। আমার ইচ্ছে হয় পিলুকে জড়িয়ে ধরে বলি, তোকে কিছুতেই যেতে দেবো না! তোকে না দেখে আমি থাকতে পারবো না! কিন্তু আমি কিছুই বলতে পারি না। আমার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হলেই তা হয়তো কান্নার বিস্ফোরণ ঘটাবে। আমি পিলুর দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেই। কেঁদে ফেলবো ভয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে পারি না।

পিলু কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। আমাদের ছেড়ে যেতে হয়তো তারও খারাপ লাগছে। সে কি আমাদের দৃষ্টি থেকে কান্না লুকাতেই নিজের ঘরে আত্মগোপন করলো?

পিলুর কাগজ-পত্র ঠিক হতে হতে খবর পাই বড় ভাবি আমেরিকা চলে গেছেন। কবে গেল? কখন গেল? আমরা কিছুই জানি না। তাহলে তো তাদের বড় ছেলেটা খুবই একা হয়ে গেল! মা-বাবা আক্ষেপ করে বলেন, আলমের ছেলেমেয়ে দুটোও জানি কেমন! আমাদের দিকে যেন কোনো টান অনুভব করে না। নাকি ছোটবেলা থেকেই দূরে দূরে ছিলো বলে তাদের মনে আমাদের জন্য ভালোবাসা তৈরী হয়নি? নাকি আমরাই ঠিক মত স্নেহ-মমতা দিতে পারলাম না!

আমি এ নিয়ে কথা বলি না। উচিত হবে না বলেই বলি না। আমার কথাগুলো হয়তো খুবই নিষ্ঠুর আর অমার্জিত শোনাবে। তার চেয়ে চুপ থাকাই সব দিক দিয়ে মঙ্গল।

শুক্রবার পিলু বললো, ভাইয়া, চল তো মার্কেটে যাবো!

সপ্তাহের ছ’দিন অফিস করে আমার ভালো লাগছিলো না ঘর থেকে বের হতে। কোনো ছুতো নাতায় বাবা-মা’র কাছে থাকাটাই আমার উদ্দেশ্য ছিলো। এখন পিলুর সঙ্গে মার্কেটে গেলে সে কোথায় কোথায় আমাকে টেনে নিয়ে বেড়াবে তার ঠিক নেই। চট করে ফিরে আসারও সম্ভাবনা নেই। তাই তাকে বললাম, তুই তো নিজেই সব মার্কেট চিনিস। আমাকে কেন?

খানিকটা রাগিয়ে দিতে পারলে হয়তো সে একাই বেরিয়ে যাবে। কিন্তু সে না রেগে বললো, চল না!

আমার ভালো সার্ট-প্যান্টগুলো পরেই অফিসে যাতায়াত করছিলাম বলে সেগুলো ময়লা হয়ে গেছে তাড়াতাড়ি। সকালের দিকে ধূয়ে দিয়েছিলাম। এখনো শুকোয়নি হয়তো। বললাম, কাপড় তো সব ধূয়ে রোদে দিয়েছি। কি পরে যাবো?

পিলু আমার দিকে তাকিয়ে বললো, যেভাবে আছিস চল!

আমি মা’র দিকে তাকাই। বাবার দিকে তাকাই। তারা কিছুই বলেন না। যেন তারা খুব ভালো করেই জানেন যে, পিলু কেন আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। তাই যেন চুপ হয়ে ছিলেন। ঘরে যে ঝ্যালঝ্যালে প্যান্ট-সার্ট পরে ছিলাম তা পরেই পিলুর সঙ্গে বাইরে বের হই।

রিকশায় যেতে যেতে পিলু বললো, তোর মনে আছে ভাইয়া, তুই যেবার রাণীর ছোট ভাই তামিমকে পড়িয়ে প্রথম ইনকাম করেছিলি?

কবেকার কথা? তখন আমি মাত্র এইটে পড়ি আর পিলু সিক্সের ছাত্রী। তামিম ক্লাস টুতে পড়তো। প্রথম মাসে ওরা পঞ্চাশ টাকা দিলে টাকাটা নিতে চাচ্ছিলাম না। একই এলাকায় পাশাপাশি বাড়ি। এমন পড়শীর কাছ থেকে পড়িয়ে টাকা নিতে আমার লজ্জা লাগছিলো। তবুও তামিমের আম্মা জোর করে টাকাটা পকেটে গুঁজে দিয়েছিলেন।

পিলু আমার দিকে ফিরে কলকল করে বললো, তোর মনে নেই?

মনে আছে।

তুই পুরোটা টাকা দিয়েই আমার জন্য আইসক্রিম কিনে নিয়ে এসেছিলি।

হুঁ।

এর পর আরো কত দামী আর ভালো ভালো আইসক্রিম খেয়েছি। কিন্তু তোর সেই আইসক্রিমের স্বাদ আজও যেন মুখে লেগে আছে।

ঘরে যে শাড়িটা পড়েছিলো সেটা আর বদলায়নি পিলু। চুলও হয়তো আঁচড়ায়নি। কেমন এলোমেলো লাগছে। মুখে কোনো প্রসাধন নেই। তবুও পিলুকে খুব সুন্দর লাগছিলো। মুখ চোখ যেন মায়ায় পরিপূর্ণ হয়ে আছে।

চল, আজ আইসক্রিম খাই!

আমার দাঁত সিরসির করবে।

পিলু হেসে উঠে বললো, আরে বোকা বরফের টুকরোর আইসক্রীম না! সঙ্গে কয়েক রকমের ফলও মিশিয়ে দেয়।

আমি জোর দিয়ে না করতে পারি না। বলি, তুই কি আমাকে আইসক্রিম খাওয়াতে নিয়ে যাচ্ছিস?

পিলু মাথা নাড়তে নাড়তে বললো, আরো অন্য ব্যাপারও আছে।

আমি বুঝতে পারি না পিলু কি ভেবে আমাকে নিয়ে বের হলো। নাকি ক্যাম্পাসে মাঝে মধ্যে আমরা যেমন একসঙ্গে ঘুরতাম সেটা মনে করেই আজ বেরিয়েছে। ইকবালের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর আমরা আর কখনোই একসঙ্গে কোথাও যাইনি।

আইসক্রিম খেতে খেতে পিলু বললো, আজকাল ছেলেরা টাই পরা ছেড়ে দিয়েছে নাকি? আসার সময় কারো গলায় টাই দেখলাম না।

আমি অবাক হয়ে তাকাই পিলুর মুখের দিকে।

তারপর বলি, হঠাৎ টাইয়ের ব্যাপারে তোর এত কৌতুহল হচ্ছে কেন?

না। এমনিই বললাম। আগে বাবাকে দেখতাম টাই পরে অফিসে যেতেন। তখন অনেকেই নিয়মিত টাই পরে বের হতেন। কিন্তু আজকাল অমনটা দেখা যায় না।

দিনদিন মানুষ নানা রকম সমস্যায় জড়িয়ে যাচ্ছে। তার খরচের পরিমাণও বেড়ে যাচ্ছে। তাই হয়তো টাই কেনার দামটা অন্য কোনো খরচের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছে।

আমার তা মনে হয় না।

কি মনে হয়?

আমার মনে হচ্ছে টাই পরতে যে ফুরফুরে মনের দরকার হয় লোকজনের সে মনটাই হয়তো এখন নেই। এখন কেবল কোনো রকমে বেঁচে থাকা বা দিনগুলোকে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যেতেই মানুষ ব্যস্ত।

তাহলে আমি কি বললাম?

তুই কি বললি আবার?

পিলু আইসক্রিমের গ্লাস থেকে একটি পেঁপের টুকরো মুখে তুলে চিবোয়।

দিনদিন মানুষ নানা সমস্যায় জড়িয়ে যাচ্ছে বললাম না!

পিলু আমার গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বললো, তুই তো আসক্রিম খাচ্ছিস না!

বললাম, খুবই ঠান্ডা। দু চামচ খেয়ে আমার গলা ব্যথা হয়ে গেছে।

পিলু আমার গ্লাসটা টেনে নিয়ে আইসক্রিম খেতে খেতে আবার বললো, ছেলেরা দেখতে যেমনই হোক, টাই পরলে তাদের অনেক স্মার্ট আর হ্যান্ডসাম মনে হয়। তুই তো চাকরি করছিস। টাই পরে অফিসে যেতে পারিস না?

পিলুর কথা শুনে আমি না হেসে থাকতে পারি না। বলি, তুই তো দেখিসনি সকালের দিকে কেমন ধাক্কাধাক্কি করে বাসে উঠতে হয়। সে সময় গলায় টাই বাঁধা থাকলে ফাঁস লেগেই মারা যেতে হবে। নয়তো লোকজনের টানে সেটা ছিঁড়ে রাস্তায় পড়ে থাকবে।

পিলু একবার সেলফোনটা তুলে ধরে সময় দেখলো মনে হয়। তারপর বললো, এটাও একটা প্রধান কারণ হয়তো। আমাদের এদিকের রাস্তায় যখন সিটি লাক্সারি বাস সার্ভিস চালু হবে তখন হয়তো সমস্যাটা থাকবে না।

আইসক্রিমের গ্লাস ঠেলে দিয়ে পিলু বললো, চল বেরোই!

আমি যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ি। বলি, আর কোথায় যাবি?

ইস্টার্ন প্লাজা। ইকবালের জন্য একটা টাই কিনবো। আর তোর জন্য দু একটা গিফট।

এমন ব্যাপারটা ভাবনায় আসেনি। বলি, দোকানের লোকেরা আমাদের ফকির ফাকরা ভেবে হয়তো দামই বলতে চাইবে না।

পিলু হেসে উঠে বললো, আগে দেখি না কি ধরণের আচরণ করে!

নয়

দূতাবাস থেকে ফোনে পিলুকে জানালো যে, শুক্রবার দিন তার ইন্টারভিউ। সকাল নটার আগেই যেন সেখানে সে উপস্থিত থাকে। পিলু আর আমি এক সঙ্গে দূতাবাসে গেলাম। আমরা অপেক্ষা করতে করতে ঘড়ি দেখছিলাম। ন’টা বাজতে দু’তিন মিনিট বাকি আছে। ঠিক তখনই কোথাও একটি মিষ্টি জলতরঙ্গের সুর বেজে উঠলো। আমাদের পাশের দরজা ঠেলে, মোটাসোটা একজন মহিলা বেরিয়ে এলেন। গায়ের রঙে আর চেহারাই জানিয়ে দিলো যে, তিনি আফ্রিকার কালো গোত্রের নারী। বিচিত্র রঙের পোশাকে তাকে তেমন একটা মন্দ লাগছিলো না।

তিনি আমাদের দিকে তাকিয়ে হাতের কাগজে সাঁটানো ছবি দেখেই হয়তো সরাসরি পিলুকে ইংরেজিতে বললেন, তুমি কি পিলু হায়দার?

সঙ্গে সঙ্গেই পিলু  উঠে দাঁড়িয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে সুন্দর করে ইংরেজিতে বললো, তুমি ঠিকই ধরেছো। আমিই পিলু হায়দার!

এসো আমার সঙ্গে। মহিলা ভেতরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিলুও পা বাড়ালো।

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম পিলুর মুখের দিকে। এত সুন্দর করে ইংরেজি বলতে শিখলো কোথায়? নাকি কোনো কোর্স করেছে? সম্ভাবনাটাকে ছোট করে দেখা ঠিক হবে না। আমরা যখন ভাবতাম টাকা পেয়ে পিলু কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায়? হয়তো বা তখনই সে ইংরেজির ওপর কোনো কোর্স করছিলো।

মিনিট দশেক পরই হাস্যোজ্জ্বল মুখে বেরিয়ে এসে পিলু বললো, হয়ে গেল! ভিসা পেতে সপ্তাহ খানেক লাগবে। পিলুর এ কথা শুনেই আমার মনটা খারাপ হতে থাকলো। মনে হতে লাগলো সত্যি সত্যিই পিলু চলে যাবে। কিন্তু এতটা তাড়াতাড়ি কেন? মনে মনে চাচ্ছিলাম যে, কিছুদিনের জন্য যেন পিলুর যাওয়াটা বিলম্বিত হয়।

চল ভাইয়া! কিছু খাই!

এখন আবার কি খাবি? আমি অবাক না হয়ে পারি না।

পিলু হাসতে হাসেতে বললো, এই যে তেমন কোনো ঝামেলা ছাড়াই ব্যাপারটা মিটে গেল, আমার কি উচিত না এটাকে সেলিব্রেট করি?

হাতে কাঁচা পয়সা থাকলে খরচ করার জন্য মানুষ নানা ধরণের উপলক্ষ্য খোঁজে। পিলুও একটি উপলক্ষ্য পেয়ে গেছে। আমি জানাই, এখন কিছু খেতে পারবো না। ভালো লাগবে না।

তবুও কিছু একটা খাই। না হয় দুটো জুস নয়তো দুটো চকলেট! মোট কথা আমাদের এখন  মিষ্টিজাতীয় কিছু একটা খাওয়া উচিত। পিলুর উচ্ছ্বাস দেখে আমার আর না করতে ইচ্ছে হয় না।

সত্যি সত্যিই পিলু চলে যাবে? ব্যাপারটা মনে হলেই কেন যেন আমার হাত পায়ের শক্তি নিঃস্ব হয়ে যেতে থাকে। তখন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। যদিও আমার খারাপ লাগছিলো, কিন্তু বাবা-মাকে দেখি খুবই খুশি হয়েছেন। তাঁদের একমাত্র মেয়েটি এ সংসার ছেড়ে চলে যাবে। কোন দিন ফিরে আসবে। আদৌ ফিরে আসবে কিনা। মন চাইলেও দেখতে পাবেন না। তবুও যেন তারা মনেপ্রাণে চাচ্ছেন পিলুর যাওয়াটা যত দ্রুত হয় ততই যেন মঙ্গল। আমি ভেবে পাই না, বাবা-মা কি পিলুর ব্যাপারে খানিকটা নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিচ্ছেন কিনা? তাঁদের কি মন খারাপ হচ্ছে না?

দুদিন পর অফিস থেকে ফিরে আসার পথে আমার মনে হলো যে, পিলু যদি চলে যায়, তাহলে বাবা-মাকে দেখবে কে? এতদিন পিলু ছিলো বলে, বাবা-মাকে নিয়ে তত একটা দুর্ভাবনা ছিলো না। আমাদের এমন কোনো আত্মীয় নেই, যে কেবল খাওয়া-পরা আর থাকার জন্য আমাদের বাড়ি বাকি জীবনের জন্য চলে আসতে পারে। এমন কাউকে যদি পাওয়া যেতো তাহলে বাবা-মার অযতœ কিছুটা হলেও কমতে পারতো। তা ছাড়া বাইরের কাজের মানুষ আজকাল তেমন পাওয়া যায় না। বাসাবাড়িতে কেউ কাজ করতে চায় না। অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে ঢাকা শহরে অনেক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি হয়েছে। মেয়েরা যেনতেনভাবেই সেখানে নিজে খেয়ে-পরে  চলার মত একটি কাজ জুটিয়ে নিতে পারে। যে কারণে বাসাবাড়ির অনিশ্চিত অবহেলিত কাজের প্রতি দিনদিন নিরন্ন ঘরের মেয়েদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

সন্ধ্যার দিকে ঘরে ফিরে পিলুকে দেখতে পেলাম না। মাকে জিজ্ঞেস করলাম, পিলু কোথায় গেছে মা, এখনো আসেনি যে?

মা জানালেন পিলু তার শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে গেছে। সেখানে কদিন থাকবে।

ভেতরে ভেতরে পিলুর জন্য খানিকটা গর্ব বোধ করি হয়তো। মেয়েরা বাবার বাড়ি থাকার সুযোগ পেলে শ্বশুর বাড়ি যেতে চায় না। তাঁদের ছেলেটাকে নিজের করে ভাবতে পারলেও শ্বশুর-শাশুড়ি আর দেবর-ননদকে তেমন একটা আপন ভাবতে পারে না। তা ছাড়া কোনো যুক্তিতে যদি শ্বশুর বাড়ি থেকে দূরে থাকা যায় সে যুক্তি খোঁড়া হলেও সেটিকেই আঁকড়ে ধরে জোরেশোরে। পিলুকে পেয়ে নিশ্চয়ই খুশি হবে তার শ্বশুর-শাশুড়ি। ইতোমধ্যে তাদের মনে পুত্রবধূ সম্পর্কে যদি কিছুটা ভুল ধারণার জন্ম হয়েও থেকে থাকে এ সুযোগে হয়তো সেটা কেটে যাবে। পিলু সত্যিই বুদ্ধিমতী। বাবা মার ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করার জন্য আমি পিলুর আসার অপেক্ষায় থাকি। কিন্তু এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও পিলুর আসার কোনো লক্ষণ দেখি না। ভেতরে ভেতরে আমার অস্থিরতা বেড়ে যায়। অফিসের কাজে মন বসাতে পারি না।

আমার অস্থিরতা হয়তো অন্যান্যদের চোখেও পড়েছে। যে কারণে কেউ কেউ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেও কিছু বলে না। না। এভাবে চলতে পারে না। অফিস থেকেই পিলুকে ফোন করি। কিরে কেমন আছিস? এতদিন কি করছিস ওখানে?

পিলু জানায় তার শাশুড়ি অসুস্থ।

বললাম, তোর পাসপোর্ট আনতে যেতে হবে না?

সে নির্বিকার ভাবেই বলে দিলো যে, এমন সময় তার কোনোদিকে পা বাড়ানো সম্ভব না।

তাহলে তোর ভিসার কি হবে?

সে পরে দেখা যাবে। কম করে হলেও নব্বই দিন সময় পাওয়া যাবে।

পিলু লাইন কেটে দিতেই হঠাৎ আমার মনে হলো যে, কোনো একজন কাজের মানুষ রাখার ব্যাপারে তার সঙ্গে আলাপ করা উচিত ছিলো।

তখনই আবার ফোন করি। বলি, তোর সঙ্গে একটি জরুরি আলাপ ছিলো।

পিলু জানালো, তাহলে অফিস শেষে এখানেই চলে আয়।

ইকবালের সঙ্গে ওদের বাড়ি অনেকবার গিয়েছি। কিন্তু পিলুর বিয়ের পর আর যাওয়া হয়নি। এতদিন পর হঠাৎ করে গেলে সেটা কি প্রশ্নাতীত থাকবে? তখনই আমার মনে হয় যে, আমার তো এমনিই যাওয়া উচিত। সামাজিক নিয়মের আওতায় পিলুর শ্বশুর বাড়ির কেউ অসুস্থ হলে আমাদের ঘর থেকে কেউ যাওয়াটা আত্মীয় সেবার আওতায় পড়ে। বাবা-মা না গেলে সে দায়িত্বটুকু অ লিখিতভাবেই আমার কাঁধে বর্তায়। সুতরাং পিলুর অসুস্থ শাশুড়িকে দেখতে যাওয়াটাও আমার কর্তব্য।

অফিসে কাজের চাপ কিছুটা বেশি থাকায় আমার বেরুতে বেরুতে বেশ দেরি হয়ে গেল। মতিঝিল থেকে ধানমণ্ডি আজকাল বাসে চেপেই যাওয়া যায়। কিন্তু অফিস পাড়া একই সঙ্গে ছুটি হয় বলে, রাস্তায় বেরিয়েই সব ধরণের যানবাহনের ওপর হামলে পড়ে মানুষ। এ সময় রিকশা, সিএনজি চালকরাও সুযোগ পেয়ে ভাড়া হাঁকে বেশি।

তবুও আমাকে বাধ্য হয়ে দেড়গুণ ভাড়ায় রিকশায় চড়তে হয়। শান্তি বাগের ভেতর পিলুর শ্বশুর বাড়িটা খুবই পুরোনো আমলের পলেস্তারা খসা ইট-সুরকি বেরিয়ে থাকা নোনাধরা দেয়ালের একতলা বাড়ি ছিলো। কোনো নাম্বার ছিলো কিনা মনে করতে পারি না। স্মৃতি হাতড়ে যে পথে রিকশা এগিয়ে যায় সেখানে পুরোনো কোনো বাড়ি চোখে পড়ে না। খানিকটা ঘুরে আমি রিকশা ছেড়ে দিয়ে একটি দোকান থেকে পিলুকে ফোন করে বলি, তোর শ্বশুর বাড়িটা কোথায় খুঁজে পাচ্ছি না।

পিলু বললো, তুই এখন কোথায়? কোনো দোকান পাটের সামনে থাকলে সেটার নাম বল।

যে ফার্মেসি থেকে ফোন করেছি সেটার নাম বলতেই পিলু জানালো, ডান দিকে দুটো বাড়ির পরই এটি গেটের পাশে দেখতে পাবি আলো-মন্দির লেখা আছে। তার দোতলায়।

আমি এগিয়ে গিয়ে বিস্ময় চেপে রাখতে পারি না। পলেস্তারা খাসা জীর্ণশীর্ণ বাড়িটি কবে এমন আলি-শান হয়ে উঠেছে বলতে পারি না। পিলুও কখনো বলেনি যে, তার শ্বশুর বাড়িটিকে ভেঙে পাঁচতলা করা হয়েছে। এটা একটা আনন্দের ব্যাপার। অথচ পিলু হয়তো এর ভেতর বলার মত কিছু পায়নি।

পিলু দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলো। আমাকে দেখতে পেয়েই কেমন উজ্জ্বল মুখে জিজ্ঞেস করলো, ভালো আছিস ভাইয়া? বাবা মা ভালো আছে?

আমি পিলুর কথায় অবাক না হয়ে পারি না। বাড়ির ভালোমন্দ প্রতিদিনই অফিসে ফোন করে জেনে নিচ্ছে সে। অথচ আমাকে দেখতে পেয়েই ফের একই প্রশ্ন করে বসলো। বলি, হ্যাঁ। সবই ভালো। কিন্তু পিলুকে দেখে মনে হয় সে কোনোভাবেই ভালো নেই। কেমন যেন শুকিয়ে গেছে মনে হচ্ছে। চোখদুটো বসে গেছে। চেহারায় দিনরাত পরিশ্রমের মত ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।

তখনই ভেতর থেকে কেউ জানতে চাইলো, কার সঙ্গে কথা বলছো বউ মা?

পিলু নেপথ্য কণ্ঠের জিজ্ঞাসার জবাব না দিয়ে বললো, দূতাবাস থেকে ফোন করেছিলো।

ঘরের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে বলি, তুই কি বললি?

তখনই পিলু নিচু স্বরে বললো, তোকে কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবি আমাকে নিয়ে যেতে এসেছিস।

দশ

পিলু ঘরে ঢুকতেই একজন বয়স্কা মহিলা এগিয়ে এসে বললেন, মানুষের সঙ্গে সারাদিন এত কথা কিসের? এটি আবার কাকে ডেকে আনলে?

পিলু বললো, আম্মা আমার ভাই রেজা।

মেয়েদের স্বামী কাছে না থাকলে কত আত্মীয়-স্বজন বেরোয়! কই আগে তো কখনো একে দেখিনি। তোমার মুখেও এর কথা কখনো শুনেছি বলে মনে পড়ে না।

ভদ্র মহিলা আমার দিকে কেমন কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে পিলুর দিকে ফিরে বললেন, তা কেমন ভাই, মামাতো-খালাতো নাকি চাচাতো-ফুপাতো?

কথা শুনে রাগে আমার শরীর জ্বলছিলো। এই যদি শাশুড়ি-পুত্রবধূর কথোপকথনের ধরন হয়, তাহলে অনায়াসে অনুমান করে নেয়া যায় যে, পুত্রবধূটি কেমন আদরের ভেতর রয়েছে।

পিলু বললো, আম্মা এ আমার মায়ের পেটের ভাই। আমার এই একটিই ভাই।

তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, ইকবালকে জিজ্ঞেস করবো?

পিলু অপমানে যেন কেঁদে ফেলবে। তবুও হয়তো কোনোরকমে কান্না সামলে নিয়ে বললো, জিজ্ঞেস করতে পারেন। সত্যমিথ্যাটা আপনার জানা দরকার।

আমার মনে হচ্ছিলো যে, পিলুকে এখনি হাত ধরে টেনে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। মনের ভেতর এত সন্দেহ নিয়ে কতদিন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব? এমন একটি জংলী আত্মীয়তাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না।

আমাদের সামনেই তিনি সেল ফোনে হয়তো ইকবালকে রিঙ করলেন। খানিক পর ফোন বেজে উঠতেই তিনি কথা বলে পিলুর কাছে ফোন এগিয়ে দিতেই পিলু বললো, শোনো, রেজা ভাইয়া এসেছে। আর আম্মা…’

পিলুকে হয়তো কথা শেষ করতে দেয় না ইকবাল। তখনই পিলু আমার কাছে ফোন এগিয়ে দেয়। বলে, তোর সঙ্গে কথা বলবে।

আমি ফোন ধরে হ্যালো বলতেই, ইকবাল বলে উঠলো, রেজা, তুই আজই পিলুকে এখান থেকে নিয়ে যাবি। মা’র কোনো কথা শুনবি না।

বলি, যদি রাগারাগি করেন?

কোনো কিছুকেই পাত্তা দিস না। মা আসলে একটু অন্য রকম। একই কারণে আমার বড় ভাই আর ভাবি মাকে ছেড়ে গেছে। প্লিজ, দেরি করিস না।

তখনই আমি খানিক জোর কণ্ঠে বলে উঠলাম, পিলুকে তো নিয়ে যেতে এসেছি। অনেকদিন এখানে থাকলো। আমরা চাই সে আমাদের ওখানে গিয়ে থাকুক ক’টা দিন।

তখনই পাশ থেকে পিলুর শাশুড়ি বলে উঠলেন, বউ মা এখন কোথায় যাবে? আমার শরীর তো এখনও সারলো না। আবার যদি বিছানায় পড়ি তো কে দেখবে আমাকে?

ইকবাল বললো, মাকে বল, কদিন পরই আবার আসবে।

আমি ইকবালের কথা মত তাই বলি।

তখনই তিনি আবার বলে উঠলেন, উনি বাড়ি নেই। ঘরের মুরুব্বিকে না বলে ছেলের বউ বাপের বাড়ি যাবে ব্যাপারটা কি ভালো হবে?

আমি কিছু বলার আগেই ইকবাল বললো, মাকে ফোনটা দে। যা বলার আমি বলছি।

মাতা-পুত্রে কি কি কথা হলো বুঝতে পারলাম না। হঠাৎ তিনি কেঁদে উঠে বললেন, আরে আমি তোর সৎ-মা হতাম তাহলে না এ কথা বললে মেনে নিতে পারতাম। এমন ছেলে পেটে ধরে কি পাপ করলাম। ও আল্লা! ঠিক আছে এক্ষুনি তোর বউকে চলে যেতে বল!

তিনি পিলুর দিকে ফোন এগিয়ে দিতেই পিলু কানে লাগিয়ে কেবল মাথা নাড়লো বার কয়েক আর তার সঙ্গে সঙ্গে হুঁ হুঁ করে ফোনটা ফিরিয়ে দিলো তার শাশুড়ির হাতে।

ইকবাল পিলুকে কী বলেছে বুঝতে পারি না। তখনই পিলু তার শাশুড়ির পায়ের কাছে ঝুঁকলে তিনি লাফিয়ে সরে গিয়ে বললেন, আমাকে ছোঁবে না! চলে যেতে চাইছো যাও। তোমরা গেলে আমি দরজা লাগাবো।

পিলু আমার দিকে মুখ তুলে বললো, চল ভাইয়া!

বললাম, তোর কিছু নিবি না এখান থেকে?

তখনই পিলু আমার হাতটা ধরে চাপ দিলো।

আমি তার শাশুড়িকে বললাম, যাই।

পিলু তখনই ছুটে গিয়ে তার হ্যান্ড ব্যাগটা নিয়ে এসে বললো, চল!

দরজা দিয়ে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে যেন পিলু আরেক রকম হয়ে যায়। তার চলনে মনে হচ্ছিলো যে, সে যেন দীর্ঘকাল কারাভোগের পর মেয়াদ পূরণের আগেই মুক্তি পেয়ে গেছে।

গেট থেকে বেরিয়েই সে একটি সিএনজিকে হাত দেখালো আর সেটা থামতেই পিলু ছুটে গিয়ে চালকের সঙ্গে কথা বলে, আমাকে হাতছানি দিয়ে নিজে আগে উঠে পড়লো।

আমি উঠে বসতেই চালক সিএনজি ছেড়ে দিলো। পিলুর চোখে মুখে খুশি উপচে পড়ছিলো যেন। কিন্তু আমার কিছু বলতে ইচ্ছে হয় না। কেউ তার বোনের শ্বশুরবাড়ি থেকে এমন অপমান হয়ে হয়তো কখনো বেরিয়ে আসেনি। আমিই এক হতভাগ্য যে অপমান হজম করতে বাধ্য হচ্ছে কেবল বোনের মুখের দিকে চেয়ে।

ঘরে ফিরতে ফিরতে বলি, ইকবাল যে বললো, ওর বড়ভাই আর ভাবির কথা, ঘটনা কি?

সে বিরাট ইতিহাস। প্রথম বউটা তো সহ্য করতে না পেরে শাশুড়ির সামনেই নাকি বিষ খেয়েছিলো।

পিলুর কথা শুনতে আমার আর কোনো আগ্রহ থাকে না। বলি, থাক ওসব। তোর ভিসা হয়ে গেলে দেরি করা ঠিক হবে না।

দেরি হবে না। আমার কটা কাজ বাকি আছে। সেগুলো আশা করি দু’চারদিনে করে ফেলতে পারবো। আর সে কদিন ছুটোছুটিও আছে অনেক।

আমি ভেতরে ভেতরে পুড়তে থাকি অপমানের বিষে। অথচ কিছুই করার নেই। আসলে মানুষের জীবনটা খুবই জটিল বলেই সময়ে সময়ে তাকে অনেক কিছুর সঙ্গেই আপস করে নিতে হয়। কখনো বা কিছু করার থাকলেও নিজকে রাখতে হয় নিষ্ক্রিয়।

ঘরে ঢোকার মুখেই পিলু বললো, আমরা যে এভাবে এসেছি, বাবা মাকে কিছু বলিস না।

বললাম, যদি জানতে চান খালি হাতে এলি কেন?

সেটা আমিই যা বলার বলবো। তুই কিছু বলিস না। প্লিজ!

আচ্ছা বলবো না।

পিলু ঘরে ঢুকেই মাকে জড়িয়ে ধরলো। মা অবাক হলেও কিছু বলার সুযোগ পেলেন না। নানা কথায় আর প্রশ্নে মাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুললো সে।

তখনই বাবা কেমন করে পিলুর দিকে তাকিয়ে বললেন, কারাবাস তাহলে শেষ হলো?

পিলু অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, তোমার খুশি দেখে আমার তাই মনে হচ্ছে।

পিলু কেমন চমকে উঠে বললো, ওসব থাক বাবা। আমার ভিসা হয়ে গেছে। এখন টিকেট আর বিমানের সিট কনফার্ম করা বাকি।

তাহলে আর দেরি করছো কেন? তোমরা তো আমাদের যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব নিঃস্ব করতে পারলেই খুশি।

পিলু বললো, তাহলে কি যাওয়া বন্ধ করে দেবো? আমার কোনো সমস্যা হবে না।

যাও। না গিয়েই বা করবে কি। যে তোমাকে মাথায় তুলে রাখবে তার কাছেই তোমার থাকা উচিত।

বাবার কথা শুনে মা যেন খানিকটা রেগে উঠলেন। বললেন, মেয়েটা আসতে না আসতেই তাকে কথা শোনাতে আরম্ভ করলে? একটু থামলে কি হয়!

তখনই পিলু বললো, মা চলো। তোমার সঙ্গে কথা আছে।

পিলু আর মা একই সঙ্গে পিলুর ঘরে ঢুকে গেলে আমি আমার ঘরে এসে কাপড় পাল্টানোর সময় আমার মনে পড়ে যে, যেটা আলাপ করতে পিলুর ওখানে গিয়েছিলাম তার কিছুই বলা হলো না।

এগার

পিলু নেই। গত বুধবার সে চলে গেছে। নাইজেরিয়া পৌঁছে সে ফোন করেছিলো। ইকবালও কথা বলেছে বাবা মার সঙ্গে। তারপরই বাবা মাকে বেশির ভাগই দেখি কেমন যেন চুপসে আছেন। পিলুর জন্য খারাপ লাগাটা হয়তো এখন আর গোপন করতে পারছেন না। তাদের দুজনকেই দেখি প্রয়োজনের চেয়েও যেন কিছুটা বেশি ব্যস্ততা দেখান। যে কারণে আগে কখনও ধর্মকর্ম করতে না দেখলেও আজ দেখলাম বাবা নামাজ পড়ছেন। যার পর নাই অবাক না হয়ে পারি না। সময় কাটানোর বা মনকে ভারমুক্ত রাখার একটি উপায় হিসেবেই কি তিনি ধর্মকর্মকে আঁকড়ে ধরলেন?

আমিও অফিসে চলে গেলে হয়তো তাদের আরো বেশি করে খারাপ লাগতে থাকে। ঘরে কেউ একজন থাকলে হয়তো ততটা খারাপ লাগতো না। যাবার আগে পিলু এয়ারপোর্টে সেলফোনটা আমাকে দিয়ে বলেছিলো, এতে মাসুমার নাম্বার আছে। সময় পেলে ফোন করিস।

আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম, তুই মাসুমার নাম্বার পেলি কোথায়?

পিলু সে কথার জবাব না দিয়ে বলেছিলো, বাবা-মাকে তোর চেয়ে বেশি কেউ ভালোবাসে না। তবুও বলি, তুই ছাড়া তাদের আর কেউ নেই। বলতে বলতে তার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসে।

তারপর চোখ মুছে সে বলেছিলো, বাবা মা দুজনই মাসুমাকে খুব ভালোবাসেন। পারলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করিস। আর একটিবার হলেও তাকে দেখে আসিস।

পিলু আমাকে না জানিয়ে গোপনে গোপনে আমাদের জন্য কত কিছু করে গেছে। আস্তে ধীরে তা টের পাচ্ছিলাম। পিলু যাবার প্রায় সপ্তাহ দুয়েক পরই শুক্রবার সকালের দিকে কে যেন এসে বাইরের দরজায় ঠকঠক করতে লাগলো। দরজা খুলে দেখি একটি বারো তের বছরের কিশোরী হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছু বলার আগেই সে জানালো, পিলু খালা আজ আমাকে আসতে বলেছিলেন। তার পাশে একটি বড়সড় ট্র্যাভেল ব্যাগ। কাঁধে মাঝারি আকৃতির আরেকটি।

পিলু তো দেশে নেই! আমি অবাক হয়ে বলি। তা ছাড়া পিলু এ কথা কেন বলেছে? কে তুমি? আর এত বড় ব্যাগে কি?

সে কাঁধের ব্যাগ থেকে একটি চিঠি বের করে এগিয়ে দিলো।

সেটা খুলতেই দেখলাম, পিলুর হাতের লেখা। সে লিখেছে, রেজা ভাইয়া, বাবু নামের এই মেয়েটি  অনাথ। পৃথিবীতে তার তেমন কেউ নেই। একটি বেসরকারি এতিমখানায় সে এতদিন ছিলো। ছাত্রী হিসেবেও খুব ভালো। তাকে আমাদের বাড়ির পাশের গার্লস স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছি। আমাদের বাড়িতে থেকেই পড়াশুনা করবে আর বাবা মাকে দেখাশুনা করবে। ওর খরচের জন্য ভাবিস না। আমি মাঝে মাঝে ওর খরচের জন্য কিছু টাকা পাঠিয়ে দেবো। আমি জানি তোরা ওকে খুবই পছন্দ করবি। মোটামুটি বুদ্ধিমতী। যদি কিছু মনে না করিস আমার ঘরটিতে ওকে থাকতে দিস। এটা আমার অনুরোধ। আরেকটি অনুরোধ, যেভাবেই পারিস মাসুমাকে বউ করে নিয়ে আয়। আমরা সবাই খুশি হবো। তুইও হয়তো সুখী হবি। পরে ফোনে কথা বলবো।

মেয়েটিকে বললাম, আয়! ভেতরে চলে আয়!

মেয়েটি কোমর বাঁকিয়ে তার বড়সড় ব্যাগটি নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মা জানতে চাইলেন, কেরে অত সকাল সকাল দরজায়?

আমি দরজা লাগিয়ে দিয়ে মাকে বলি পিলুর চিঠির কথা। মা অবাক হয়ে বললেন, কই, আগে থেকে তো আমাদের কিছু জানায়নি!

বাবুর ব্যাগের দিকে তাকিয়ে মা অবাক হয়ে বললেন, অত বড় ব্যাগে কি?

বাবু বললো, বই-খাতা।

মা আরো অবাক হয়ে বললেন, কাজের মেয়েরা কি স্কুলে যায়?

বাবু তেমনি অম্লান মুখে জানালো, আমি যাবো।

মা আবার বললেন, সেটা কেমন করে? ঘরের কাজকর্ম করে তোর কি ইচ্ছে হবে লেখাপড়া করতে?

আমার অসুবিধা হবে না।

না হলেই ভালো।

তারপর আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে মা বললেন, পরে না আবার চুরি-টুরি করে পালায়?

মনে হয় না। পিলু জেনে বুঝে এমন বোকামি করার মেয়ে না।

দেখিস কিন্তু!

তুমি কেন বুঝতে পারছো না মা, মেয়েটা এতিমখানায় ছিলো! তার কেউ থাকলে কি এতিমখানায় থাকতো? আর চুরি করে যাবেই বা কোথায়?

আগে থেকে কিছুই বোঝা যায় না।

আচ্ছা, চুরি করলে একবারই করতে পারবে! এ নিয়ে অযথা ভয় পেয়ো না।

পিলুর ঘরে বাবু থাকবে শুনে মা খুব বেশি অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কিছুতেই রাজি হলেন না। বললেন, পিলুর ঘর আমি তালা দিয়ে রাখবো।

তাহলে বাবু থাকবে কোথায়? তার তো পড়াশুনা করতে হলে একটু ভালো পরিবেশ চাই।

ছোট রুমটা খালি করার ব্যবস্থা কর। ওটা তো কোনো কাজেই লাগে না।

বাবুকে রুমটা খুলে দেখিয়ে বললাম, এটা এখন স্টোর হিসেবে আছে। তুই থাকতে পারবি? অবশ্য তুই রাজি হলে একটা জানালা আর ফ্যানের ব্যবস্থা করে দেবো।

বাবু হাসি মুখে জানায়, তাহলে তো ভালোই।

আমি আর বাবু মিলে রুমটার যত হাবিজাবি আছে সব নিয়ে বাথরুমের ফলস সিলিঙের ওপর নিয়ে রাখলাম। তারপর বাবু ঘরটাকে ধুয়ে মুছে নিজের জন্য উপযুক্ত করে নিলো।

বাবা বললেন, মেয়েটা কি ফ্লোরে ঘুমুবে?

বললাম, অসুবিধা কি?

অসুবিধা আছে। অনাথ মেয়ে। আমাদের এখানে যখন এসেছে তাকে যতটুকু সুবিধা দিতে পারি ক্ষতি তো হবে না। মেয়েটি আমাদের জন্যই এসেছে। সে ভালো থাকলেই না আমাদের জন্য বেশি করে ভাববে। তুই ওকে একটা চকি বা খাটের ব্যবস্থা করে দে।

টেপ দিয়ে মেপে দেখলাম টেবিল আর চেয়ারের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে মাত্র আড়াই ফুট জায়গা থাকবে। আমি বাবুকে বললাম, আড়াই ফুট জায়গায় ঘুমোতে পারবি?

সে মাথা নেড়ে জানালো যে, পারবে।

বললাম, রাতে গড়ান দিয়ে পড়ে যাবি না তো? ভালো হবে যদি ফ্লোরে ঘুমাস। তোকে মোটা ফোমের জাজিম কিনে দেবো।

বাবু আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো, আমার বিছানা সঙ্গেই আছে। এতদিন তো ফ্লোরেই ঘুমিয়েছি।

মিস্ত্রি ডাকিয়ে বাবুর ঘরটিতে একটি জানালার ব্যবস্থা করে দেই। ছোট একটা সিলিং ফ্যান আর আড়াই ফুট বাই ছ’ফুট মাপের একটি ফোমের মোটা ম্যাট নিয়ে আসতেই বাবু খুব খুশি হলো। আমাকে বললো, মামা, পিলু খালার টেবিল-চেয়ার কি এ ঘরে আনতে পারবো?

আমি বলি, না। তোর জন্য টেবিল-চেয়ার কিনেছি। বিকেলের দিকে নিয়ে আসবে।

বাবুকে সহ আমাদের প্রথম সকালটি শুরু হলো অদ্ভুত ভাবে। সে কখন ঘুম থেকে উঠেছে। কখন নাস্তা বানিয়ে রান্নাবান্না করে বাবার পুরোনো হট ক্যারিয়ারটাতে ভাত তরকারি দিয়ে টেবিলের উপর রেখে দিয়ে সবাইকে ডেকে বললো, নাস্তা রেডি!

বাবা মিটি মিটি হাসছিলেন। তিনি গুটিগুটি পায়ে খাওয়ার টেবিলে এসে বসে বললেন, হট ক্যারিয়ারটা এখানে কেন?

টেবিলে নাস্তা সাজাতে সাজাতে বাবু বললো, মামার জন্য। দুপুরে বাইরের খাবার বেশিদিন খেলে অসুখ হবে।

মা টেবিলে বসে আরো অবাক হয়ে বললেন, তুই এত কিছু শিখলি কখন? এতিমখানার মেয়েরা তো সংসারের এত কিছু জানে না!

আমি যেখানে ছিলাম সেখানে আমাদের রান্না থেকে আরম্ভ করে একটি পরিবারে কি কি ধরনের কাজ হতে পারে, কি কি সমস্যা হতে পারে এসব শিখানো হতো।

বাবা তেমনি হাসিহাসি মুখে বললেন, তোদের আর কি কি শেখানো হয়েছে? মারামারি শিখিসনি?

বাবু হঠাৎ হেসে উঠে বললো, নানু ভাই, আমি গাড়ি চালাতেও জানি!

খুব দ্রুতই যেন বাবু আমাদের আপন হয়ে গেল। একটি সংসার থেকে কেউ যখন চলে যায় তার স্থানটা আর কেউ এসে ভরাট করে দেয়, বাবুকে দেখেই কথাটির সত্যতা অনুভব করতে পারি। পিলু না থাকলেও বাবু এসে সে স্থানটা পূরণ করে দিয়েছে। আগে পিলুর কণ্ঠ তেমন একটা শুনতে পাওয়া যেতো না। কিন্তু বাবু যতক্ষণ পড়ার বাইরে থাকে সারাক্ষণই তার কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। মা বাবা নানা বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন। নাতনি হিসেবে হাসি ঠাট্টা করেন। বাবু আমাদের ঘরটাকে সারাক্ষণ আনন্দে মাতিয়ে রাখে যেন।

একদিন শুক্রবার দেখলাম বাবু বাবাকে বাইরে বসিয়ে গোসল করাচ্ছে। শরীরে সাবান মাখিয়ে ফেনা তুলে ছোট তোয়ালে দিয়ে গায়ের ময়লা তুলতে তুলতে বললো, নানু ভাই, শরীর ডলে গোসল করো না কত বছর বলতে পারবে?

শুনতে পাই বাবাও হাসতে হাসতে বলছেন, রিটায়ার করার পর থেকে মনে হয় ও কাজটা আর হয়নি।

বার

আস্তে আস্তে বাবু সংসারের কর্তৃত্ব হাতে নিয়ে রান্না ঘরের পুরো দায়িত্ব নিয়ে নিলো। মাকে কোনো কাজ করতে দেয় না বলে মা একদিন হাসতে হাসতে বললেন, এটাকে না তাড়ালে আর নয়!

আমি অবাক হয়ে বলি, কেন? ও তো ভালোই করছে!

আমাকে কিছুই ধরতে দিচ্ছে না। সারাদিন কি শুয়ে বসে থাকা যায়?

বাবুকে বলি, বিকেলে মাকে আর বাবাকে নিয়ে পার্কে যেতে পারিস না?

তাতো প্রতিদিনই যাই। আমরা পার্কে এক ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করি।

বাবুর কথা শুনে আমার খুব ভালো লাগে। ইচ্ছে হয় তাকে আদর করি। কিন্তু ও তো আর আমাদের কেউ নয়। শেষে কোনটা হতে কোনটা হয়ে যাবে। তাই তাকে নানা জিনিস উপহার দিয়ে সেটা পুষিয়ে দিতে চেষ্টা করি। মাও করেন। তিনি বাবুকে তার পুরোনো দিনের গয়নাগুলো থেকে দুটো কানপাশা দিয়েছেন। সেগুলো কানে পরে বাবু খুব খুশি। দশটায় স্কুলে গিয়ে টিফিনের সময় ঘরে চলে আসে। বাবা মাকে খাইয়ে দিয়ে নিজে খেয়ে আবার চলে যায়। চারটার দিকে ফিরে এসে চা বানায়। তিনজনে মিলে চা খেতে খেতে গল্পে মেতে ওঠে। এভাবেই সে দিনদিন বাবা মা’র কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে লাগলো।

একদিন জয়ন্ত গোস্বামী বললেন, রেজা সাহেব, সময় করে রাঙামাটিটা ঘুরে আসেন! আপনাকে তো কেউ সেখানে চেনে না। দু’চারদিন থেকে কিছু রিপোর্ট কালেকশন করে আনবেন। শুনতে পাচ্ছি ওখানকার দুজন অফিসার লোকাল কার সঙ্গে যেন ঝামেলা বাঁধিয়েছে। পত্রিকায় ছোট্ট একটা নিউজও দেখলাম। জেনে আসেন আসল ব্যাপারটা কি?

সেখানে কি অফিসিয়ালি যাবো?

না না। আন-অফিসিয়ালি যাবেন। কোনো গেস্ট হাউজে উঠবেন। লোকজনের সঙ্গে কথা বলবেন। এভাবেই আমাদের লোকজনের খবরও পেয়ে যাবেন। বলে হাসতে লাগলেন জয়ন্ত গোস্বামী।

সেখানে গেলে মাসুমাকে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। আমার কেন জানি ক’দিন ধরে মনে হচ্ছিলো যে, মাসুমা আমাকে খুবই আশা করছে। আমি তার সঙ্গে দেখা করলে বা ফোনে কথা বললেই সে বিসর্জন দেবে তার অভিমান। যাবো ভেবেও মনেমনে পরিকল্পনা করছিলাম কবে যাবো। জয়ন্ত গোস্বামীর পরিকল্পনা জানতেই আমারও পরিকল্পনা দাঁড়িয়ে যায়। তাকে বললাম, আমি এ সপ্তাহের ভেতরই যাচ্ছি।

তাহলে কাল থেকেই আপনাকে এক সপ্তাহের ছুটি পাইয়ে দিচ্ছি।

টাঙ্গাইল কালিহাতি থানার কাছাকাছিই মাসুমাদের বাড়ি। একবার রোজার মাসে তাকে চমকে দিতেই সেখানে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। কিন্তু মাসুমার কোনো পরিবর্তন হয়নি। দেখে মনে হয়েছিলো, সে যেন জানতোই আমি যাবো। কিন্তু এবার কি সে তেমন করে টের পাবে? যদি সত্যিই তাই হয় তাহলে তাকে একবারেই ঢাকা নিয়ে আসবো। বাবা-মাও খুশি হবেন।

পিলু ফোনে জানিয়েছিলো সেখানকার একটি মেয়েদের স্কুলে সে ইংরেজি পড়ায়। দু বছরে কি মাসুমা অনেকটা বদলে গেছে? মাস্টারি করে বলে হয়তো তার গাম্ভীর্য কিছুটা বেড়ে থাকবে।

খুব সকালের দিকেই মাকে আর বাবুকে বললাম, আমি টাঙ্গাইল যাচ্ছি। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে।

বাবু বললো, নাস্তা করে যাও।

আমি অবাক হয়ে বলি, এত সকালে নাস্তা?

আমরা খুব ভোরে উঠে ঘুরতে বেরোই। এসেই নাস্তা বানাতে বসি। ছ’টার ভেতর আমাদের নাস্তা খাওয়া হয়ে যায়।

তাহলে তুই পড়াশুনা করিস কখন?

সাড়ে ছ’টা থেকে সাড়ে ন’টা।

আমি ভেতরে ভেতরে স্তব্ধ হয়ে যাই। পড়াশুনার প্রতি এর এত আগ্রহ? মনে মনে ঠিক করি যে, মাসুমা বউ হয়ে এলে তাকে আর কোনো কাজ করতে দেবো না। তার কাজ হবে পড়াশুনা। পিলুর হারমোনিয়ামটা অনেকদিন ধরে ঘরে পড়ে আছে। সেটাকে আবার টিউন করিয়ে তাকে ভর্তি করে দেবো গানের স্কুলে। কথাবার্তার সময় মনে হয় তার কণ্ঠটা যথেষ্ট সুন্দর।

নাস্তা খেতে খেতে বলি, তুই গান জানিস?

এখানে আসার আগে গান শিখতাম তো!

আমি চমকে উঠে বলি, তাই?

তারপর জানাই, পিলুর হারমোনিয়ামটা পড়ে আছে। তাহলে ওটা টিউন করিয়ে দেবো।

আমি ওটা দেখেছি। মনে হচ্ছে টিউন করাতে হবে না।

আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বলি, তুই কিকি জানিস না বলতো?

অনেক কিছুই। তারপরই সে ছুটে যায় রান্নাঘরে। মিনিট খানেক পর ফিরে আসে চায়ের কাপ নিয়ে। বলে, আমি কাঁদতে পারি না। কত কষ্ট পেয়েছি! ব্যথা পেয়েছি! কিন্তু আমার চোখ দিয়ে কখনো পানি বেরোয়নি! চেষ্টা করেও কাঁদতে পারি না!

আমার মনে হয় দুঃখ পেতে পেতে বাবু পাথরের মত কঠিন হয়ে গেছে। যে দুঃখগুলো একটা আরেকটার পিঠে চড়ে এসে ক্রমাগত ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার ওপর। বলি, পিলু আবার ফোন করলে বলবো, তোকে যেন হারমোনিয়ামটা দিয়ে দেয়।

বাবু আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে বলে উঠলো, খালা তো আমাকে ওটা লিখিত ভাবেই দিয়ে দিয়েছে। তিনদিন আগে চিঠি এসেছে। সেখানে হারমোনিয়াম, বিউটি-বক্স, বই-পত্র আর যতগুলো শাড়ি রেখে গেছে সবই নাকি এখন থেকে আমার।

বাবুকে বলি, তুই তোর জীবনের সবচেয়ে বেশি কান্নাটা কাঁদবি যখন আমাদের ছেড়ে যাবি।

বাবু বললো, আমি এখান থেকে যাবোই না!

মাসুমা যে স্কুলে পড়ায় সেটার আশে পাশে কোনো দোকানপাট দেখি না। স্কুল আরম্ভ হবে দশটায়। কিছু কিছু ছাত্রী আসছে। শিক্ষকরা মনে হয় আরো কিছুটা দেরিতে আসে। একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম যে, মাসুমা কোন দিক দিয়ে আসবে। তাদের বাড়িটা পড়েছে স্কুলের পেছনের দিককার এলাকায়। তাই মাসুমা আসার সম্ভাব্য পথটা অনুমান করতে পারি না। আমি ঠিক করে রেখেছি যে, তাকে আসতে দেখলেই ফোন করবো। ফোনে আমার কথা শুনে তার চলায় কিকি পরিবর্তন হয় দেখবো।

তখনই দেখতে পাই ছাতা মাথায় কেউ আসছে স্কুলের পাশ দিয়ে। মাথা নিচু করে হাঁটার সময় হয়তো আমাকে খেয়াল করবে না। মাসুমাকে ভেবে আমি ফোন বের করে তাকে রিঙ দেই।

ছাতা মাথায় মহিলাটি মাসুমা নয়। রিঙ বাজতে থাকলেও তার চলায় কোনো পরিবর্তন হয়নি। মাসুমা হয়তো এখনো বাড়িতেই আছে। কিংবা স্কুলের খানিকটা পেছনে। মাসুমা ফোন তুলে বললো, কেমন আছ রেজা?

মাসুমাকে অবাক করে দিতে গিয়ে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাই। বলি, বুঝলে কি করে? আমার কণ্ঠস্বর তো শুনতে পাওনি।

মাসুমা ফোনের ও প্রান্তে হেসে উঠলো। তুমি আর বদলালে না! তোমার বুদ্ধি আর কবে হবে?

নির্বোধের মত করলাম কি?

পিলুর ফোন তোমার হাতে। তুমি ছাড়া আমাকে কে আর ফোন করতে পারে এ সময়? সত্যি করে বলো তো  স্কুলের কাছাকাছি কোথাও দাঁড়িয়ে কথা বলছো কি না?

সত্যিই। একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছি।

গাছটার নাম কৃষ্ণচূড়া?

হ্যাঁ।

তোমার সার্টের রঙ আকাশী। মেরুন রঙের টাই। সাদা প্যান্ট।

তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছো। কোথায় তুমি?

স্কুলের দোতলার দিকে তাকাও। তুমি যখন এসে দাঁড়িয়েছো তখন থেকেই তোমাকে দেখছি আর মনে মনে হাসছি।

আমি মুখ তুলেই মাসুমার হাসি মুখ দেখতে পাই। বলি, নেমে এসো।

তুমি আমাদের বাড়ি যাও। হেড-মিস্ট্রেসকে বলেই আসছি!

মাসুমার বাবা মা আমাকে দেখতে পেয়েই বললেন, এতদিন কি করলা? মাসুমা তোমার আসার কথা বলার পর এক বছর পার হয়ে গেল।

নানা কাজে জড়িয়ে পড়েছিলাম। সময় করে উঠতে পারছিলাম না। তা ছাড়া…কথাটা বলা ঠিক হবে কিনা ভাবতেই মাসুমাকে ঘরে ঢুকতে দেখি। আর তাকে দেখেই থেমে যাই।

সে বললো, কি বলছিলে বলো!

তা ছাড়া তোমার সঙ্গে যোগাযোগ হচ্ছিলো না। তুমি কি করছো বা যে পরিস্থিতিতে তুমি চলে এসেছিলে, মন মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে কি না ভেবেই আসলে আসতে সাহস পাচ্ছিলাম না।

মাসুমার মা বললেন, এসে ভালোই করেছো। মেয়ে আইবুড়ি হয়ে গেল। বিয়ে করছে না বলে চারদিকে কান পাততে পারছি না বাবা! মানুষ খুবই আজেবাজে কথা বলে।

মাসুমা বললো, তোমাদের আর আজেবাজে কথা শুনতে হবে না। পারলে আজই সব মাটি চাপা দিয়ে দেবো।

তারপর সে আমার দিকে ফিরে বললো, তোমাদের বাড়িতে কথা বলো তো! ওনারা আসতে পারবেন কি না!

বললাম, বাবা-মা গাড়ির পথে কোথাও যেতে পারেন না। তুমি তো জানো তাদের বয়স।

তাহলে জানিয়ে দাও, আমাদের কথাটা। আজই বিয়ে।

মাসুমার মা কেমন অবাক হয়ে তাকালেন আমাদের দিকে। তারপর বললেন, তোর বাবাকে জানাবো?

জানিয়ে দাও। আর আত্মীয়-স্বজন কাকে কাকে বলবে লোক পাঠিয়ে দাও!

মাসুমার মা যেন ছুটে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। বললাম, আমি তো তৈরি হয়ে আসিনি। টাকা-পয়সার ব্যাপার আছে না!

মাসুমা হেসে বললো, বিয়ে তো তুমি আমাকে করছো না। আমি তোমাকে করতে যাচ্ছি!

আমি যেন দেখতে পাই আমার খুবই পরিচিত সেই মাসুমাকে। যে আমার ওপর নির্ভর করার চাইতে আমার নির্ভরতাটাকেই পছন্দ করতো বেশি।

আমি ঘরে ফোন করতেই বাবু ফোন ধরলো। বললাম, মাকে ফোনটা দে তো!

বাবু বললো, তুমি কি বিয়ে করে বউ নিয়ে আসবে?

কে বললো তোকে?

নানু বললো।

আচ্ছা তুই তাই বলিস!

মাসুমা বললো, বাবু কি এতিমখানার মেয়েটা?

হুঁ। পিলু কি তোমাকে সবই বলেছে?

পিলু প্রায়ই আসতো এখানে। তার কাছেই তোমার সব খবর পেতাম।

পিলু এ ব্যাপারে তো কিছুই বলেনি?

কেন বলবে? বলে হাসে মাসুমা।

তারপর বলে, আসলে ও আমাকে তোমার চেয়েও বেশি ভালোবাসে। বলতো, আপু তুমি ছেলে হলে ইকবালকে ছেড়ে তোমার কাছে চলে আসতাম!

এত কিছু ঘটে গেছে এরই মধ্যে?

শুধু কি তাই? বাবার সঙ্গেও একদিন কথা হয়েছে প্রায় চল্লিশ মিনিট। তিনি বলছিলেন, মাগো, আমার গাধাটার গলায় পারলে এবার দড়িটা বাঁধ! আর কত? আমরা তো বুড়ো হয়েছি!

আমি ভেতরে ভেতরে বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে উঠি। কৃতজ্ঞ হই পিলুর কাছেও।

তের

খুবই সাদামাটা বিয়ে হলো আমারও। পিলুর বিয়েতে যেমন সানাই বাজেনি। বাজি পোড়েনি। গায়ে হলুদ হয়নি। বরযাত্রী আসেনি। আমার আর মাসুমারও একই অবস্থা। তবে সন্ধ্যার দিকে মাসুমার আত্মীয়-স্বজন অনেকেই এসেছে। তবুও মাসুমাকে যতটুকু না সাজালে বউ-বউ দেখাবে না, তার বেশি সাজতে চাইলো না সে। বললো, এত বয়সে বিয়ে হচ্ছে আনন্দের বদলে কেমন লজ্জা লাগছে যেন।

বাড়ি ভর্তি মানুষ। আমি কোনো বাড়িতে এত মানুষ দেখিনি। কাজি বিয়ে পড়িয়ে দিয়ে গেলেও আমাদের পরস্পর মুখ দেখার ব্যবস্থা হলো না। অন্যান্য বিয়ের মত আমরা পাশাপাশি বসে আয়নায় কারো মুখ দর্শন করলাম না। হতে পারে মাসুমাই এগুলো করতে নিষেধ করেছে।

রাত বেড়ে গেলেও কোথায় ঘুমুবো এ নিয়ে কেউ কিছু বললো না। পরে একজন কিশোরীকে মাসুমার কথা বলতেই মাসুমা এগিয়ে আসে। বলে, চলো খাবে।

মাসুমার পেছন পেছন একটি ঘরের ভেতর যেতেই দেখতে পাই একটি টেবিলের ওপর খাবার সাজানো আছে। আশপাশে কেউ নেই। খেতে বসে মাসুমা বললো, কোনো কোনো মানুষের কমন-সেন্স এত যে কম সেটা আগে কখনো দেখিনি।

বলি, কেন, কি হয়েছে?

খাবার এগিয়ে দিতে দিতে সে বললো, তোমার আমার জন্য যে রুমটা ঠিক করা হয়েছিলো, সেখানে ছোট খালা তার বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ঘুমিয়ে আছে। ডাকাডাকি করতেই বললো যে, আমরা যেন আর কোথাও শুয়ে পড়ি।

ব্যাপারটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হলো না আমার কাছে। বললাম, তাতে তো তেমন কোনো সমস্যা দেখছি না।

বারে, বিয়ে করলাম আর বাসর ঘর হবে না এ কেমন কথা?

বিয়ে আর হলো কই? আমি কি বরযাত্রী নিয়ে এসেছি? বাজি পুড়িয়ে পটকা ফাটিয়ে তো আমাদের বিয়ে হয়নি। গতানুগতিক বিয়ে হলে না হয় এমন একটা আক্ষেপ থাকলে চলতো।

তবুও। আমাদের জীবনে একটি বিশেষ রাত। এটা কি একান্তই আমাদের দুজনের জন্য হতে পারতো না?

ও নিয়ে ভেবো না। সামনে কয়েক হাজার রাত পড়ে আছে। সবই আমাদের।

যদিও মাসুমাকে এ কথা বলি, তবুও আমার মন বলে, কথাটি সে মিথ্যে বলেনি। মানুষের জীবনে অনেক কিছুই ঘটে যায়, যেগুলোর মাঝে প্রত্যাশিত ঘটনা যেমন থাকে অপ্রত্যাশিত ঘটনাও কম ঘটে না। এমনভাবে যে কখনো বিয়ে করবো সেটা আমার কল্পনাতেও ছিলো না। হয়তো মাসুমাও কখনো এমন একটি সাদামাটা বিয়ের কথা ভাবেনি।

আমাদের বাসরঘর হলো না। কেউ আমাদের সে কথা বললো না। কারণ বাড়ি ভর্তি লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে যে যেখানে পেরেছে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

মাসুমা বললো, তোমার কি ঘুম পাচ্ছে?

বলি, না। কিন্তু খুবই আশ্চর্য হচ্ছি এই ভেবে যে, কতদিন তোমার সঙ্গে আমার দেখা সাক্ষাৎ নেই, আমাকে হঠাৎ দেখতে পেয়ে হয়তো তুমি অবাক হয়ে যাবে। কেঁদে ফেলবে। আমিও তোমাকে দেখতে পেলে হয়তো কেঁদে ফেলবো। কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি।

মাসুমা আমার একটা হাত তার কোলে নিয়ে বললো, এমন তো না যে, কোনো দুর্বিপাকে তোমার আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছিলো। তা ছড়া আমিও তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আসিনি। আমার ভেতর এ বিশ্বাসটা ছিলো যে, কোনো একদিন আমরা আবার কাছাকাছি হবো। নাকি ভেবেছিলে আমি বিয়ে করে সংসারী হয়ে যাবো?

না। তেমন ভাবনা কখনোই হয়নি। তবে এতটুকু ভয় হতো যে, তুমিও সংসারী হবে না আমাকেও বাকি জীবন একা থাকতে বাধ্য করবে।

এমনটা প্রথম প্রথম মনে হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটাও ভুলে গিয়েছিলাম। তারপরই যেন হঠাৎ করেই সে কলকল করে উঠে বললো, জানো, ক’দিন ধরে খুবই অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। মনেমনে এও ঠিক করে রেখেছিলাম কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে তোমাকে খবর পাঠাবো যে, শেষবারের মত দেখতে চাইলে আসতে পারো।

মাসুমার কথা শুনে আমার ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। এতদিন কার অভিমানগুলো যেন সুযোগ পেয়েই কে কার আগে ঝাঁপিয়ে পড়বে তারই প্রতিযোগীতায় হুটোপুটি আরম্ভ করেছে। তবুও সেদিকে না গিয়ে বললাম, আমার সঙ্গে দেখা করলে কি হতো?

সঙ্গে সঙ্গেই সে ঝুঁকে পড়ে নিচু কণ্ঠে বললো, আমার কষ্টটা তো সেখানেই। তোমার সঙ্গেই রাগ করে চলে এলাম সব ছেড়ে-ছুঁড়ে। এখন কোন মুখ নিয়ে তোমার সামনে দাঁড়াতাম?

তোমার কি হেরে যেতে এত ভয়?

ওটা হেরে যাওয়া নয়। নিজের কাছেই ছোট হওয়া। এমন কাজ কেন করবো, যে কাজে নিজেরই সমর্থন থাকবে না!

আমাদের যেন কথার ভূতে ধরেছিলো। দুজনের বুকের ভেতর এতদিন ধরে জমতে থাকা কথাগুলো যেন না বলে থাকতে পারছিলাম না। মাসুমা বললো, চা খাবে?

আমার যেন সত্যিই চায়ের প্রয়োজন ছিলো। মাসুমার কথা শুনেই আগ্রহটা জেগে উঠলো। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলি, হবে নাকি এক আধ কাপ?

একটু বসো। আমি বানিয়ে নিয়ে আসছি। বলেই উঠে গেল সে।

বাইরের দিকে রাতের অন্ধকারে গাছগাছালির ঝোপঝাড় বেশ ঘন মনে হয়। কোনো একটি গাছে রাতের পাখি কিংবা বাদুড় হুটোপুটি করছে। এমন সময় কারো একটি ছোট বাচ্চা কেঁদে উঠলো। তারপর ক্ষণে ক্ষণে শিশুটি কেঁদেই চললো। হয়তো ঘুমের ঘোরে তার জননী ভুলে আছে তার কথা। আমার খারাপ লাগে। আমার আর পিলুর বয়সের ব্যবধান খুব বেশি না হলেও একবার মায়ের কাছে শুনেছি যে, পিলু কাঁদলে আমি সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে আসতাম। যতক্ষণ তার কান্না না থামতো, আমি নাকি সেখান থেকে সরতাম না। এখনও শিশুটির কান্না শুনতে পেয়ে আমার কেন যেন অস্থির লাগে। ইচ্ছে হয় শিশুটির জননীকে ডেকে তুলি। কিন্তু এ বাড়িতে বলতে গেলে সবাই অপরিচিত। তা ছাড়া যে ঘরে মেয়েরা ঘুমাচ্ছে সেখানে যে কোনো কারণেই হোক আমার যাওয়াটা শোভন হবে না। আর সত্যিই নিরুপায় হয়েও যদি যেতে হয়, তবুও এ নিয়ে একবার বিতর্ক হবে যে, পুরুষ মানুষ কেন গেল? তারপর হয়তো যুক্তি-তর্কে পড়ে ব্যাপারটা শিথিল হবে। কিন্তু বিতর্ক অবধারিত। শিশুটির কান্নার পাশাপাশি কারো কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। এই, বাচ্চাডা কানতাছে দেহস না?

খানিক পরই পেছনের দিকে কারো পায়ের শব্দ পাই। মাথা ঘুরিয়ে দেখতে ইচ্ছে হলেও আমি চুপচাপ বসে থাকি। পেছনের আগন্তুক হাই চাপতে চাপতে বলে, নতুন জামাই ঘুমান নাই? মাসুমা কই?

মাসুমা হয়তো সে কথা শুনতে পায়। তার দূরাগত কণ্ঠস্বর শুনতে পাই, এই তো আমি। চা বানাইতে গেছিলাম।

তোরা ঘুমাস নাই?

মাসুমার হাসি শোনা যায়। তারপরই সে বলে, কোন জাগায় ঘুমাইতাম আমরা? তোমরা কি কেউ বলছিলা?

তুই কি করলি? ব্যবস্থা করতে পারলি না?

যার বিয়া হয় সে কি এইসব ভাবে?

তারপরই যেন থেমে যায় কথোপকথন। শিশুটিও যেন কান্না থামিয়েছে। পুরো বাড়িটা কেমন সুনসান মনে হয়।

মাসুমা এগিয়ে এসে আমার হাতে চায়ের কাপ দিয়ে ফের পাশে বসে বললো, রাত তো বেশি নাই। কিছুক্ষণ পরই আজান দেবে।

চায়ে চুমুক দিতেই টের পাই চা ভালো লাগছে। বলি, ভোর হতে হতেই চলো যাই।

কথায় কথায় সত্যিই ভোর হয়ে আসে। চারদিক কেমন ফর্সা হয়ে উঠতে থাকে। গাছে-গাছে পাখিরা মেতে উঠতে থাকে বিচিত্র কলকাকলিতে।

চৌদ্দ

মাসুমাকে নিয়ে যখন ঘরে আসি। দুজনেই বাবা মাকে সালাম করে দাঁড়াই। তখনই বাবা হাসি মুখে মাকে বললেন, ঘোড়ার বাচ্চাকেও অনেক সময় গাধা বলে ভুল করে মানুষ!

বাবা নিজের ভুল স্বীকার করবেন না। জোর করে আমাকে গাধাই বানিয়ে রাখবেন।

বাবু স্কুলে ছুটির দরখাস্ত দিয়ে সকাল থেকেই নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে রয়েছে। নিজেই বান্ধবীকে নিয়ে বাজারে গিয়ে সবকিছু কিনে এনেছে। সে রান্না ঘরে ব্যস্ত ছিলো বলে আমাদের দিকে তেমন মনোযোগ দিতে পারছিলো না। মাসুমাকে প্রায় বুকে করে মা আমার ঘরে নিয়ে গেলেন। বললেন, গাধাটা এতদিনে আমাদের মন মত একটা কাজ করেছে।

মাসুমা অল্প কিছুক্ষণের ভেতরই যেন আমাদের পরিবারের একজন হয়ে গেল। সদ্য বিবাহিতা মেয়ের জড়তা কাটতে কিছুটা হলেও সময় লাগে। কিন্তু মাসুমার আচরণে মনে হচ্ছিলো যে, সে যেন ক’দিনের জন্য এ বাড়ি থেকে বাবার বাড়ি গিয়েছিলো মাত্র।

আমার যেটা খুব বেশি ভালো লাগলো, তা হলো বাবুর সঙ্গে তার স্বাভাবিক আচরণ। রান্নাঘরে গিয়ে বাবু আর তার বান্ধবীর সঙ্গে কী নিয়ে বেশ আলাপ জুড়ে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর দেখি মাও সেখানে গিয়ে হাজির হয়েছেন। মাসুমা আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বাড়ির আবহটাই যেন পাল্টে গেল। এতকাল পিলু থাকা সত্ত্বেও যেমন একটি গুমোট ভাব বিরাজ করতো তা যেন সে এ বাড়িতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই উধাও হয়ে গেছে।

বিকেলের দিকে পাড়ার অনেক মেয়ে এলো মাসুমাকে দেখতে। কেউ কেউ আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ও যে শেষপর্যন্ত বিয়ে করতে পারবে আমরা কিন্তু ভাবতে পারি নাই। কাউকে না জানিয়ে একা একা বিয়ে করেছে সেটা না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু বউভাতের অনুষ্ঠান কি হবে না?

বললাম, হবে। তবে বউভাতের মত না। একটি ছোটোখাটো অনুষ্ঠান করবো আপনাদের নিয়ে।

কেউ কেউ বললো, ওতেই আমরা খুশি।

বাইরে বেরোতেই মুখ চেনা থেকে আরম্ভ করে ছোটবেলা থেকে যাদের সঙ্গে এক সাথে খেলাধুলো করে বড় হয়েছি তাদের অনেকেই ছেঁকে ধরলো আমাকে। ওদের সবার কথা থেকে একটিই সারমর্ম উদ্ধার করতে পারি যে, যেমনই হোক পার্টি একটা দিতেই হবে। নইলে ছাড়াছাড়ি নেই।

এ নিয়ে বাবা মা’র সঙ্গে আলাপ করতেই তারা বললেন, অনুষ্ঠান একটা না করলে হয় কি করে? আমাদেরও তো আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। কাউকে না জানিয়ে হুট করে বিয়ে করে ফেললি তা কেউ কি সহজমনে নেবে? আমরা মা-বাবা বলে না হয় আমরা সমস্যাটা দেখতে পাই, কিন্তু একটা ছোটোখাটো অনুষ্ঠান করে সবাইকে আসতে বললেও খানিকটা মান থাকে। পিলুর শ্বশুর বাড়ির লোকজনকেও না বললে মান বাঁচে না।

মা বললেন, তোর ফুপুদের না বললে কি ওরা এমনিতেই ছেড়ে দেবে? ওরা নিজেদের ভালোটা খুবই বোঝে। জোট বেঁধে এসে ঝগড়া করার আগেই ঝামেলা মিটিয়ে ফেলা ভালো। তা ছাড়া পিলুর বিয়ে নিয়েও অনেক কথা শুনিয়ে গেছে। এবার তোর ফুপুদের একটি করে ভালো শাড়ি কিনে দিস। নিজেদের সংসারে গিয়ে খানিকটা মাথা উঁচু করতে পারবে। এতেও খরচ অনেকটা বেড়ে যাবে।

পাড়ার কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া নিয়ে অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত হলো। কিন্তু অনুষ্ঠানটা এখনই করার প্রয়োজন নেই। একটু সময় নিয়ে ধীরেসুস্থে করাটাই ভালো।

আমি ইচ্ছে করলে বলতে পারতাম যে, মেজ খালার ছেলেমেয়েদের বিয়ের সময় আমরা কেউ কোনো সংবাদ পাইনি। আমরা যে তাদের কোনো রকম আত্মীয় হই তাই যেন ওরা কখনো ভাবেনি। অথচ আমাদের অনুষ্ঠানে কেন তাদের গুরুত্ব দিতে হবে ভেবে পাই না। মায়ের কথায় বা বাবার কথায়ও কোনো প্রতিবাদ করতে চাই না। যে কারণে মনেমনে চাচ্ছিলাম যে, অনুষ্ঠানটা না হোক। কিন্তু বাবা বললেন, এটা একটা উপলক্ষ। তোর শ্বশুর বাড়ির লোকজনদেরও  আমাদের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের প্রয়োজন আছে। তা ছাড়া তাদের মেয়েটা কেমন মানুষের বউ হয়ে গেল সেটাও তারা না দেখলে সময় সুযোগে অন্যান্যরা তাদের নানা কথা বলতে পারে।

বাবার যুক্তিটাকে অগ্রাহ্য করতে পারি না। আজকাল যদিও অনেকেই এসব ব্যাপার নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামায় বলে মনে হয় না, তবুও সামাজিকতার ব্যাপারগুলোর মাঝে বেশ কিছু ভালো দিকও রয়েছে। মানুষে মানুষে সুসম্পর্ক থাকলে শান্তি-স্বস্তি দুটোই হয়তো মোটামুটি বজায় থাকে।

দুদিন পর মাসুমাকে বললাম, বাবুকে ছুটি দিয়ে দাও! ওর বদলে আর কোনো কাজের মেয়ে পাও কি না দেখ।

ওকে ছুটি দিতে হবে কেন?

এখন থেকে ও কোনো কাজ করবে না। ওর কাজ হবে পড়াশুনা আর গানের স্কুলে যাওয়া।

মাসুমা অবাক হয়ে বললো, এটা কেমন কথা বললে? পিলু কি সংসারের কিছুই করেনি?

তাতো করেছে।

তাহলে? বাবুকে কিছু করতে হবে না কেন?

বললাম, ও তো অনাথ একটি মেয়ে। ওর খারাপ লাগতে পারে।

মাসুমা দৃঢ়কন্ঠে বললো, ও সবই করবে। তা ছাড়া ও যদি সংসারের নানা কাজে সম্পৃক্ত থাকে তাহলে নিজকেও এ বাড়িরই একজন বলে ভাবতে পারবে। ভাবতে পারবে যৎসামান্য হলেও এ সংসারে তার অবদান আছে।

মাসুমার কথা যেন আমার কানের পাশ দিয়ে উড়ে যায়। তাই কি বলবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে সে আবার বললো, মানুষ কারো জন্য ভালো কিছু করতে পারলে নিজকে সুখী ভাবে। বাবুও যে আমাদের জন্য কিছু করছে বা ওকে ছাড়া আমাদের চলবে না এমন ব্যাপারটা ওকে ভাবতে দিলেই ও ভালো থাকবে। এখানে নিজকে ফ্যালনা ভাবার বদলে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শিখবে। আর একটা মানুষ যখন নিজের গুরুত্ব বুঝতে পারে তখনই তাকে দিয়ে আরো ভালো কিছু আশা করা সম্ভব।

মনেমনে হলেও আমাকে স্বীকার করে নিতেই হয় যে, মাসুমার বোধবুদ্ধির ধারে কাছে যেতে হলেও আমাকে হয়তো আরো কয়েকটা জন্ম ঘুরে ঘুরে আসতে হবে। বাবুর ব্যাপারটা ও যেভাবে চিন্তা করছে তা আমি কেন, অনেকেই হয়তো এমন করে ভাবতে চাইবে না।

হয়তো বা আমাকে অন্যমনস্ক দেখতে পেয়েই মাসুমা আমার মুখটা তুলে বললো, শোনো, তুমি কি এ সংসারের জন্য কিছু করছো না? আর ও নিজের বাবা-মার সঙ্গে থাকলে কি সে সংসারে কাজ করতো না?

এবার যেন ব্যাপারটি আমার বোধগম্য হয়। নিজের অজান্তে হয়তো মাথাও দোলাই। মাসুমা তখনই বলে ওঠে, তুমি ওসব নিয়ে ভেবো না। মা আমাকে সব চাবি দিয়ে বলেছেন সংসারটা এখন থেকে আমার। আর আমার সংসারে এখন থেকে কারো একক মতামত চলবে না।  বলে, হাসতে লাগলো সে।

বললাম, ঠিক আছে। কিন্তু বাবা মার কথা ফেলে দিতে যেয়ো না যেন!

মাসুমা সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলো, সেটা বাবা মা’র কথা। একজনের না।

তার সঙ্গে কখনোই কথায় পেরে উঠি না। সে চেষ্টাও করি না। তার কাছে হেরে যেতেই যেন আমার আনন্দ।

আমার ছুটি তিনদিন পেরিয়ে চতুর্থ দিন চলছে। কিন্তু রাঙামাটি যাবার কথাটা কিছুতেই মাসুমার কাছে তুলতে পারছিলাম না। দুপুরের খাওয়া দাওয়ার পর সব কিছু গুছিয়ে সে যখন আমার ঘরে এলো তখন বললাম, চলো কোথাও ঘুরে আসি। তা ছাড়া অফিসের একটা কাজে রাঙামাটি যাওয়াও জরুরি। চলো এক সঙ্গে যাই।

মাসুমা খোপা থেকে ভেজা তোয়ালে খুলতে খুলতে বললো, তুমি যাবে অফিসের কাজে। আমি থাকলে তোমার কাজের কিছুই হবে না।

আরে সে ধরনের কাজ না! দু’জনে ঘোরাঘুরি করতে করতেই হয়ে যাবে। কিছু ইনফরমেশনের জন্য যাবো। ন’টা পাঁচটা ডিউটি করার মত না।

কাজটা কী ধরনের জানতে পারি?

ওখানে আমাদের যে প্রজেক্টটা চলছে, সেখানকার কাজকর্ম কেমন হচ্ছে, লোকজন স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কী নিয়ে ঝামেলা পাকাচ্ছে এমনই কিছু ইনফরমেশন যোগাড় করতে যাবো।

তাহলে যাওয়া যায়।

কিকি নেবে দুপুরের খাওয়ার পর গুছিয়ে ফেলতে হবে। সম্ভব হলে রাতের ট্রেনেই যাবো।

তাই! মাসুমা যেন অন্তর্গত খুশি গোপন রাখতে পারে না। তারপর বললো, তাহলে বাবা মা’কে আগেই কথাটা জানিয়ে দাও।

তা বলেছি আগেই।

কি পরে যাবো? শাড়ি?

তোমার যেটা খুশি।

মাসুমার মাঝে পরিবর্তনটা চোখে পড়ার মত। খানিক পরই তার কণ্ঠ থেকে গুনগুন সুর বেরোতে থাকে। একসময় নাকি সে খুব ভালো গাইতো। পরে একবার টাইফয়েড হলো। তারপরই গান গাইতে গেলে তার মাথা ব্যথা আরম্ভ হয়। একটি সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে গেল বলে অনেক দুঃখ ছিলো তার। কিন্তু সময়ে সেটা অনেকাংশে কমে গেছে।

পনেরো

থাকার জন্য ভালো একটি হোটেলের সন্ধানে আছি জানতে পেরে মাসুমা মুখ বিকৃত করে বললো, হোটেল না! নামটা শুনলেই কেমন ঘেন্নাঘেন্না লাগে!

তাহলে থাকবো কোথায়?

মাসুমা বললো, শুনেছি এখানে ভেতরের দিকে কোথাও রিসোর্ট আছে। রেষ্টহাউজও নাকি আছে।

সেগুলোর হয়তো চার্জ বেশি। তা ছাড়া এতটা ভেতরের দিকে যাওয়া ঠিক হবে?

মাসুমা বললো, চার্জ হয়তো খুব বেশি হবে না! ভেতরের দিক হলেই তো ভালো। প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকা যাবে।

তাতো বুঝলাম। তবে এসব এলাকায় শান্তিবাহিনী বলে একটি যন্ত্রণা আছে। এলাকা যতটা দুর্গম এরাও ততটা বেপরোয়া।

আমার কথা শুনে মাসুমার চেহারায় সত্যি সত্যিই যেন আতঙ্ক ফুটে উঠতে দেখি। সে হঠাৎ করেই বলে উঠলো চলো ফিরে যাই। এত অনিশ্চয়তার ভেতর থাকতে পারবো না।

এ এলাকাটা তো তেমন অসুবিধা নেই। রাস্তাঘাট যানবাহন তো ভালোই আছে। সারাদিন ঘুরাঘুরি করে ফিরে আসলেই হবে।

তাহলে শহরের দিকে চলো।

আমরা ফিরে আসি ঘন লোকালয়ের দিকে। খানিকটা ঘোরাঘুরি করতেই একটি গেস্ট হাউজ পাওয়া গেল। দেখতে তেমন সুন্দর না হলেও বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কেয়ারটেকার কাম ম্যানেজার সাহেব আলি জানালো, এখানে আরো দুটি পরিবার আছে। তাদের সঙ্গেও আলাপ করিয়ে দেবে। এদের মাঝে একটি যুগল আছেন যারা দু সপ্তাহ ধরে আছেন এখানে। আর তখনই একজন বয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। পেছন পেছন বড় বড় ছাপার শাড়ি পরনে এক শ্যামাঙ্গিনী। দেখে স্বামী-স্ত্রী মনে হলেও ভদ্রলোকের আর তার স্ত্রীর বয়সের ব্যবধান কম করে হলেও পঁচিশ-ত্রিশ বছর হবে। সেজে গুঁজে দুজনই কোথাও যাওয়ার জন্যেই হয়তো বেরিয়ে ছিলেন। আমাদের দেখতে পেয়েই কৌতূহলী হয়ে দাঁড়ালেন। আলাপের সময় ভদ্রলোক নিজকে শাহ আলম, পেশায় স্থপতি বলে পরিচয় দিলেন। পাশে দাঁড়ানো শ্যামলা নারীটির দিকে বুড়ো আঙুল তুলে বললেন, ইনি আমার বেটার হাফ। দু সপ্তাহ ধরে আছি। আপনারা এখানে থাকলে আরো আলাপ হবে।

বললাম, দিনরাত তো কাটাচ্ছেন এখানে। কেমন মনে হচ্ছে?

ভদ্রলোক বলে উঠলেন, অসাধারণ! বাবুর্চি স্বপনের রান্নার হাত আরো চমৎকার! একটি ইউনিট খালি আছে বোধ হয়। নিয়ে নেন। ভাড়াও কম। পরিবেশটাও খারাপ না।

ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিতেই তিনি বললেন, আমরা একটু ঘুরে ফিরে আসছি। আজ রেস্ট নেন। পারলে কাল কথা হবে।

ভদ্রলোক তার বেটার হাফকে নিয়ে বেরিয়ে যেতেই সাহেব আলি বললো, চলুন রুমগুলো দেখাই।

ঘুরে ফিরে রুম দুটো দেখে ভালোই মনে হলো। একটি বড় রুমকে পর্দা দিয়ে ভাগ করে ড্রয়িং আর ডাইনিং হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পর্দার দু প্রান্তে ড্রয়িং আর ডাইনিং স্পেসে টেবিল চেয়ার, সোফাসেট রাখা আছে। দু পাশেই বড় বড় দুটো জানালা। বেডরুমটায় এটাচ্ড বাথরুম। মোটা গ্রিলে ঢাকা একটি চওড়া বারান্দা। বারান্দা দিয়ে দেখা যায় আরো উঁচুনিচু পাহাড়ি এলাকার ছোটছোট ঘরগুলো। বারান্দায় দাঁড়াতেই আমার মন ভরে গেল। মাসুমাও একবার বাহ বলে তার খুশি প্রকাশ করলো যেন।

সাহেব আলিকে বললাম, ঠিক আছে, আমরা থাকছি দু’তিনদিন।

তাহলে হাজার খানেক আগাম হিসেবে দেন।

রান্নাবান্না যে করে তাকে কত দিতে হবে?

আপনারা যা খাবেন সেটার উপর নির্ভর করবে। আমি বিল বানিয়ে দিয়ে দেবো।

তাকে কি পাওয়া যাবে?

আমাকেই বলতে পারেন। আমাদের ফ্রিজে মাছ-মাংস-ডিম-সবজি সবই আছে। এখানে সপ্তাহে একদিন হাট বসে। আরো তিন কিলোমিটার দূরে আছে বাজার। খাওয়া নিয়ে কোনো অসুবিধা হবে না। ক’টার দিকে খাবার চান জানালে সময় মত রেঁধে পৌঁছে দিয়ে যাবে।

রাত আটটার দিকে দিতে বলেন। মাসুমাকে বললাম, কি খাবে?

সে বললো, তার আগে জানা দরকার, কি কি মাছ আছে?

সাহেব আলি বললো, পাবদা, সরপুঁটি, পাঙ্গাশ রুই আর চিংড়ি।

তাহলে ভাতের সঙ্গে পাবদা মাছ আর মুগের ডাল। সঙ্গে যে কোনো একটি সবজি।

ঠিক আছে। আমি জানিয়ে দেবো। সে চাবি দিয়ে হাত পেতে দাঁড়ালো টাকার জন্য।

চাবিগুলো তার হাত থেকে নিয়ে টাকা বের করে দিতেই সে বের হয়ে গেল। যেতে যেতে বললো, আটটার সময় খাবার নিয়ে দরজায় নক করবে স্বপন।

জয়ন্ত গোস্বামী আমাকে দুটি ঠিকানা দিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে দেখা করার আগে খানিকটা খোঁজ-খবর করি। আশপাশের দু চারজনের সঙ্গে কথা বলে যা জানা যায় তা মোটেও ভালো নয়। এরা যে কাজে এখানে এসেছে আসল কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। কথায় বলে, বামুন গেল ঘর তো লাঙল তুলে ধর। আমাদের দেশের মানুষের কাজে ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা দূর না হলে উন্নতির জন্য হাজারো পদক্ষেপই যে ব্যর্থ হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

মাসুমা দরজা লাগিয়ে দিয়ে সুটকেস খুলে ঘরে পরার মত কাপড়, তোয়ালে, টুথব্রাশ-পেস্ট আর সাবান বের করে নিয়ে বললো, এখানকার পানি কেমন? গোসল করা যাবে?

ওয়াসার সাপ্লাইর পানি তো আর পাওয়া যাবে না। মাটির নিচে থেকে পানি তোলার ব্যবস্থা থাকতে পারে। বাথরুমে গিয়ে দেখে আসি বলে, আমি ট্যাপ ছেড়ে দেখি পানির বেগ ভালোই। মুখে দিয়ে দেখলাম কেমন আলুনী মনে হচ্ছে। পানিতে আয়রন বেশি হয়তো।

ফিরে এসে দেখি মাসুমা সুটকেসটাকে নিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। বললাম কি ভাবছো?

সে বললো, সুটকেসটা কোথায় রাখতে পারি দেখছি।

রেখে দাও মেঝেতে। দুদিনের জন্য এত গোছালো হয়ে কি হবে!

মাসুমা কিছু না বলে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলো।

ঠিক তখনই দরজায় কেউ ঠুকঠুক করে শব্দ করে।

আমি এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখি সাহেব আলি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। বলি, কি ব্যাপার? ঝাল কেমন খাবেন?

না না, অত ঝালের দরকার নেই। কম দিতে হবে। না দিলেও চলবে।

সাহেব আলি চলে যেতেই দেখি একটি দরজা দিয়ে মাথা বের করে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে একটি নারী মুখ। চেহারাটা কেমন পরিচিত মনে হলো। আমি তাকিয়ে থেকেও চিনতে পারলাম না।

তিনি বললেন, আপনি রেজা?

আমি মাথা দোলাই।

এ ইউনিটেই উঠেছেন?

আমি ফের মাথা দোলাই।

তিনি আবার বললেন, সঙ্গে কে আছে?

বলি, মাসুমা।

মাসুমা কে?

আমার স্ত্রী।

আপনি বিয়ে করেছেন? বলতে বলতে তিনি বেরিয়ে পড়লেন। কবে বিয়ে করলেন? হানিমুনে এসেছেন?

আমার বিব্রত মুখভঙ্গি দেখে হয়তো তিনি বুঝতে পারেন যে তাকে আমি চিনতে পরিনি। তখনই তিনি বলে উঠলেন, আমাকে চিনতে পারেন নাই? আমি টিনা।

তখনই হালকা পাতলা গড়নের একটি যুবতীর মুখ ভেসে উঠলো আমার মানস পর্দায়। টিনা পাড়ার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নাচতো। আমার বন্ধুদের অনেকেই তাকে খুব পছন্দ করতো। চিঠিও দিতো অনেকে। যতদূর জানি টিনা সবার চিঠিরই উত্তর দিতো। এ নিয়ে একবার বন্ধুদের মাঝে বেশ গণ্ডগোল হয়ে গেল। শেষে কলেজ থেকে ফেরার পথে সবাই মিলে টিনাকে ঘিরে ধরলো রাস্তার ওপর। সবার সঙ্গে প্রতারণার শাস্তি হিসেবে নান্টু এসিড নিয়ে এসেছিলো টিনার চেহারায় ছুঁড়ে মারবে বলে। আমি মনেমনে ঠিক করে রেখেছিলাম যে ও কাজটি হতে দেবো না। তাই আমি নান্টুর শরীর ঘেঁষেই দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু টিনাকে সবাই যখন একে একে প্রশ্ন করতে লাগলো, তখন সে একটুও ঘাবড়ে না গিয়ে বললো, তোমাদের সমস্যা কি আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তোমরা চিঠি লিখেছো আমি উত্তর দিয়েছি।

নান্টু বলেছিলো, সবার সঙ্গে তুমি প্রেমের অভিনয় করছো!

টিনা সবার মুখের দিকে এক এক করে তাকিয়ে বলেছিলো, তোমাদের চিঠিগুলো কি সঙ্গে আছে? না থাকলে বাড়ি গিয়ে আবার সবগুলো পড়ে দেখবে কোথাও আমি লিখেছি কিনা যে, আমি তোমাদের সঙ্গে প্রেম করছি বা করবো। এমন কি কাউকে ভালোবাসি কথাটি একবার লিখেছি প্রমাণ করতে পারবে না! তোমরা একই পাড়ার ছেলে। ছোটবেলা থেকেই তোমাদের দেখছি। বয়সও প্রায় আমারই সমান। তোমাদের হয়তো অপছন্দ করি না। অপছন্দ করলে চিঠি নিয়ে অনেক কমপ্লেন করতে পারতাম। পাড়ার গার্জেনদের কাছে বা বড়ভাইদের কাছেও নালিশ করতে পারতাম। কিন্তু করিনি। তোমরা কি বুঝে আমাকে চিঠি লিখেছিলে আমি তা নিয়ে ভাবিনি। আমার মত উত্তর দিয়েছি। তোমরা বুদ্ধিমান হলে ঠিকই বুঝতে পারতে।

পরে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে কেউ আর টিনার মুখোমুখি হয়নি। আমি টিনাকে নিয়ে কিছুই ভাবতাম না। কারণ ততদিনে মাসুমা একদিন আমাকে দেখতে না পেলে পরদিন ক্লাসে এসে খুব কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে জানতে চাইতো যে, গতকাল কেন ক্লাসে আসিনি? তখন থেকেই মাসুমাকে ভালো লাগতো বলে আর কোনো মেয়ের দিকে আমার আগ্রহ ছিলো না।

টিনা এগিয়ে এসে বললো, আমি টিনা। নাচুনি টিনা। তুমি রেজা ভাই। আমার কোনো ভুল হয়নি। তোমার বোন পিলু আর আমি একই ক্লাসে পড়তাম মনে আছে?

বললাম, এখন চিনতে পেরেছি।

তাহলে চুপ করে আছো কেন?

কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। তা ছাড়া শুনতে পেয়েছিলাম যে, তুমি বিষ খেয়েছিলো।

মরে গেছি তা তো শোনোনি! বলেই সে হেসে উঠলো।

তখনই আরেকটা পুরুষের মুখ দরজা দিয়ে বাইরে উঁকি দিলো। বললো, ঝগড়া করছো কার সঙ্গে?

সে মাথা ঘুরিয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললো, ঝগড়া করছি না। আমাদের একই পাড়ায় বাড়ি। রেজা ভাই। দেখ না, একই পাড়ায় বড় হলাম আর এখন আমাকে দেখেও চিনতে পারছে না।

ভদ্রলোক হাসি মুখে বেরিয়ে এলেন। একই পাড়ায় যখন ছিলে তখন তো তুমি দেখতে এমন ছিলে না। রেজা সাহেব যদি তোমাকে চিনতে না পারেন তো দোষ তোমার। তার না।

টিনা বললো, রাতের খাবারের পর তোমার ঘরে আমরা আসছি। নাকি ভাবিকে নিয়ে আসবে?

বলি, তোমরাই চলে এসো।

তোমার বউকে বলবে, আমরা আসছি।

আচ্ছা।

টিনা তাদের রুমে চলে গেলে আমিও দরজা বন্ধ করে দিয়ে ফিরি। আমাকে দেখেই মাসুমা বললো, কার সঙ্গে কথা বললে?

টিনা। আমাদের পাড়ার মেয়ে। বললো, খাওয়া হয়ে গেলে আসবে।

এখানে কি করছে?

ঠিক জানি না।

নতুন বিয়ে হয়েছে?

না তো। প্রেম করে অনেক আগেই বিয়ে করেছিলো।

আচ্ছা আসুক।

দরজায় কেউ ফের নক করে তখন। মাসুমা বললো, দেখ, হয়তো খাবার নিয়ে এসেছে।

ষোল

পিলুর বন্ধু বলেই হয়তো মাসুমা টিনার সঙ্গে জমে গেল। আর তা দেখেই হয়তো রঞ্জু বলে উঠলো, মেয়েতে মেয়েতে জমে গেছে। আমরা এখন আউট অব ফোকাস। তারচেয়ে ভালো আমাদের ওখানে চলেন। স্কচ আছে। আপনার এসব না চললে অবশ্য আমিও ওতে হাত দেবো না। সাধু-সন্ত মানুষের ব্যাপারই আলাদা। অনেকদিন ধরেই সঙ্গে সঙ্গে রাখছি। মুখ খোলার কোনো উপলক্ষ পাচ্ছি না।

বললাম, আমার উঠতে ভালো লাগছে না।

আরে চলেন তো? বলেই ভদ্রলোক আমার হাত ধরে টানলেন।

প্রথম সাক্ষাতেই কেউ অমন আচরণ করে কি না আমার জানা নেই। কিন্তু রঞ্জুকে আমার মনে হচ্ছিলো না যে, এখনই মাত্র তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।

তাদের রুমে যেতেই মেঝের ওপর ছড়ানো ছিটানো কাগজে নানা আঁকিবুঁকি দেখতে পেয়ে বললাম, ছবি আঁকছেন নাকি?

আরে না! এসেছি লোকেশন দেখতে। প্রতিদিনই ঘুরে বেড়াচ্ছি। কিন্তু জুতসই মনে হচ্ছে না।

আমার কৌতূহল বেড়ে যায়। বলি, কিসের লোকেশন?

একটা শর্ট ফিল্ম নিয়ে কাজ করছি। শুটিঙও অর্ধেকের মত হয়ে গেছে। কিন্তু একটি সিকোয়েন্সই কেবল অরণ্যের কাছাকাছি। যেটার ওপর ডিপেন্ড করবে পুরো ফিল্মটার সাকসেস-আন সাকসেস। এক একটি সাইটে যাচ্ছি আর রুমে ফিরে মিলিয়ে দেখছি। সুবিধা হচ্ছে না। বলতে বলতে ফ্রিজ থেকে একটি বড়সড় বোতল বের করলো রঞ্জু।

বোতলটা দেখেই বুঝতে পারি ভালো জিনিস। যদিও অন্যান্যরা অনেক কিছুই বলে, কিন্তু আমার কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। জাসিন্তা গোমেজের বিয়েতে আমাদের জন্য স্পেশাল ড্রিংকস-এর আয়োজন ছিলো। আমি খেয়ে কিছু বুঝতে পারিনি। কিন্তু মাসুমা হেঁচকি তুলতে তুলতে হাসছিলো। আমাকে দেখে বলেছিলো, আমার পরনের কাপড়গুলো কোথায় যেন পড়ে গেছে। এ নিয়ে আমাদের কাছাকাছি যারা ছিলো সবাই হেসে উঠেছিলো। তারপর সে ঘটনার কথা জানতে পেরে লজ্জায় পুরো এক সপ্তাহ আমার সঙ্গে দেখা করেনি সে।

গ্লাসে তরল সোনার মত পাণিয় ঢালতে নিলে রঞ্জুকে বললাম, আপনি একাই খান। আমি খাবো না।

কেন? অবাক হয়ে সে তাকায় আমার দিকে। বলে, আপনার জন্যই তো বোতলটা খোলা হলো।

বললাম, ভরা পেটে খেলে অসুবিধা হতে পারে।

আরে ভাই কিছুই হবে না। এটা কি দেশি মাল পেলেন নাকি?

তার জোরাজুরিতেই আমি গ্লাস হাতে নেই। স্বাদ পাই না বলে খেতেও ইচ্ছে হয় না। আমি অপেক্ষা করি। রঞ্জু এক পেগ শেষ করে দ্বিতীয় পেগ ঢালতে ঢালতে আমার গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, আরে করছেন কি! গিলে ফেলেন! গিলে ফেলেন!

আমি তাই করি। সেও ফের ঢেলে দেয়। আমি সেটাকেও নির্জলা গিলে ফেলে বসে থাকি। কিন্তু দ্বিতীয় পেগ শেষ করার আগেই রঞ্জু অস্বাভাবিক হয়ে উঠলো। যদিও প্রচুর কথা বলছিলো। কিন্তু প্রায় শব্দই জড়িয়ে যাচ্ছিলো বলে অনেক কিছুই আমার বোধগম্য হলো না। বললাম, আর খেতে হবে না। আপনি কিছুক্ষণের মধ্যেই আউট হয়ে যাবেন।

তৃতীয় পেগ ঢালতে ঢালতে সে বললো, আমি আউট হই না। মাতাল হয়ে খিস্তি করি না। চার পেগ পেটে পড়লেই প্রচণ্ড ঘুম পায়। আমি ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন আমার ব্রেন খুব ফ্রেশ মনে হয়। শরীরটাও যেন নতুন হয়ে ওঠে। টিনাকেও অতটা মুটকি মনে হয় না। বলে, হাসতে আরম্ভ করলো রঞ্জু। একজন অর্ধ মাতাল যখন হাসতে আরম্ভ করে তখন সে হাসতেই থাকে। তাকে দেখলে মনে হবে যে, হাসি ছাড়া আর কিছুই সে জানে না।

রঞ্জুর হাসির তরঙ্গ হয়তো আমাদের ইউনিটেও পৌঁছে যায়। আর সে কারণেই হয়তো দেখি টিনা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকছে। পেছনে মাসুমা। সে চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বললাম, কিছু বলবে?

মাসুমা ভেতরে ঢুকে বললো, বোতলটা আমি ঘরে নিয়ে যাই?

তখনই টিনা বলে উঠলো, এ আপদটা বিদায় হলেই বাঁচি। নয়তো সকালেই আবার শুরু করবে।

মাসুমা তখনই বোতলটা তুলে নিয়ে আমাকে বললো, চলো।

আমি অবাক হয়ে বলি, ওটা নিচ্ছো কেন?

আগে চলোই না! বলে, আমার একটি হাত ধরলো সে। আমি বুঝতে পারছিলাম না যে, সে কী করতে যাচ্ছে। নাকি আমি মদ খেয়েছি বলে তার রাগ হয়েছে? এমন তো হওয়ার কথা না। সে আর আট-দশটা মেয়ের মত এসব ছোটোখাটো সংস্কার মনের ভেতর পোষে না বলেই জানি। কিন্তু হঠাৎ করেই তার আচরণ আমার কাছে রহস্যময় মনে হতে লাগলো।

ঘরে ঢুকেই সে দরজাটা ভালো মত বন্ধ করে দিয়ে খাওয়ার টেবিল থেকে একটি গ্লাস উঠিয়ে নিয়ে আমাকে ঠেলে বেড রুমের দিকে যেতে যেতে বললো, কয় পেগ গিলেছো? সত্যি করে বলবে!

বললাম, তিন পেগ।

তি-ই-ই-ন পে-এ-এ-গ! বলো কি? এখনো তুমি ঠিক আছো?

তুমি তো জানো এসবে আমার কিছু হয় না।

হয় কি না আজ দেখবো। আর তাই সবটা নিয়ে এলাম। বলতে বলতে সে বেডরুমের দরজাটাও আটকে দেয়। আমার খানিকটা ভয় ভয় হতে থাকে। বলি, কি করছো তুমি?

খাটের পাশে রাখা ছোট্ট কেবিনেটটার ওপর বোতল আর গ্লাস রেখে সে বললো, শুনেছি প্রতিটি মানুষের ভেতরে আসল মানুষটা লুকিয়ে থাকে। সে মানুষ ভালো কি মন্দ মাতাল হলেই টের পাওয়া যায়। মাঝে মাঝে আমাকে আমি বুঝতে পারি না। আমি ভালো কি মন্দ সেটা জানার খুব ইচ্ছে। মদ খেয়ে মাতাল হবো।

তখনই আমি বলে উঠি, তোমাকে খেতে হবে না। আমি জানি তুমি কেমন।

মাসুমা বিছানায় বসে মুচকি হেসে বললো, কেমন?

বললাম, জাসিন্তার বিয়েতে মাতাল হয়ে কি করছিলে মনে নেই?

সেটা তো শুনেছি। হাফ মাতাল হয়েছিলাম বলে বুঝতে পারোনি। আমিও আজ তিন পেগ খাবো। তুমি খেয়াল রাখবে। বলে, সে বোতল থেকে গ্লাসে হুইস্কি ঢালতে ঢালতে বললো আবার, কতটুকুতে তিন পেগ হয় বলবে আমাকে।

আধ গ্লাস থেকে খানিকটা বেশি হতেই বললাম, হয়েছে। তারপরও বোতলে আরো অর্ধেকেরও বেশি রয়ে গেছে।

মাসুমা বললো, বাকিটা তোমার জন্য। কাল সকালের দিকে পুরোটা শেষ করবে। দেখবো মাতাল হও কি না।

আমার একটি বিশ্বাস আছে যে, আমি কখনোই মাতাল হবো না। অনেক মানুষ আছে, যারা প্রচুর মদ পান করলেও মাতাল হয় না। আমিও তেমন কি না সে পরীক্ষাটাই কি মাসুমা করতে চাচ্ছে? বললাম, তুমি আমাকে পরীক্ষা করতে চাচ্ছো?

হুম!

তাহলে এর চেয়ে আরো কড়া কিছু লাগবে। এখানের লোকাল মদটা শুনেছি খুবই কড়া। কাল খোঁজ করবো পাই কি না।

আগে এটাতেই দেখ না। বলতে বলতে গ্লাসের পানীয়টা পানির মত ঢক ঢক করে গিলে ফেললো মাসুমা। আর তারপরই সে মুখটাকে বিকৃত করে বুকের উপর হাত ডলতে লাগলো। আমি এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরতেই সে বললো, আমি ঠিক আছি।

বললাম, এসব পানির মত খেলে নেশা হবে না। আস্তে আস্তে খেলে হয় শুনেছি।

তাহলে আরো দেখি। বলে সে গ্লাসে আরো খানিকটা হুইস্কি ঢাললো। জগ থেকে সেটাতে খানিকটা পানি ঢেলে দিলাম।

সে বিরক্ত হয়ে বললো, পানি দিলে কেন?

এত করে এটা হালকা হবে। গলা বুক জ্বলবে না।

তাহলে দেখি। মনে হচ্ছে এবার তেমন কিছু হবে না।

বললাম, সময় নিয়ে আস্তে আস্তে খাও।

মাসুমা হাসিহাসি মুখে গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিলো। তা দেখতে দেখতে আমার মনে হচ্ছিলো, বাঙালী ঘরের অধিকাংশ মেয়েই নিজেরা যেমন মদ খেতে চায় না, অন্য কোনো মেয়েকে তো দূরের কথা, ছেলেরা মদ খায় জানলেও যেন তাকে দু চোখে দেখতে পারে না। কিন্তু মাসুমাই যেন আরো আট-দশটা মেয়ের চাইতে খানিকটা ভিন্ন। সংস্কার ভাঙার একটা জেদ আছে। কিন্তু সে তুলনায় উগ্র নয়। কিন্তু এখন আমার কাছে মাসুমাকে সত্যি সত্যিই অচেনা মনে হচ্ছে।

খানিক পর মাসুমা হাতের গ্লাসটা আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে বললো, আমার পুরো শরীর ঝিমঝিম করছে। মাতাল হয়ে যাচ্ছি নাকি? বলেই সে হেসে উঠলো।

গ্লাসটা রেখে দিয়ে আমি মাসুমার পাশে বসে বললাম, কেমন লাগছে বলো, মাসুমা হঠাৎ করেই কিছু দেখে যেন চমকে উঠলো মনে হলো। বললো, এই আমাকে ধরো ধরো। কে যেন আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বলতে বলতে সে চিৎকার করে উঠলো। আমিও তাকে বুকে চেপে ধরি যাতে করে তার ভয় দূর হয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। সে কাঁদতে আরম্ভ করে। বলে, আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না। আমি যত খারাপই হয়ে যাই না কেন, যত অন্যায়ই করি না কেন, আমাকে কখনো তাড়িয়ে দিও না। বলো, আমাকে তাড়াবে না? বলো, বলো?

মাসুমা অনেক কাঁদলো। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলে কাঁদলো। কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়েও পড়লো। ঘুমিয়ে থাকা মাসুমাকে সত্যিই মাসুম বলেই মনে হয়। মনে হয় এতকাল তাকে যেমন প্যাঁচগোচহীন দেখে এসেছি, ভেতরে ভেতরে সে প্রকৃতই তেমন একজন মানুষ। তবে, খানিকটা ভীতু প্রকৃতিরও হয়তো। হয়তো সে নারী বলেই স্বামী কিংবা পুরুষ হিসেবে আমার প্রতি তার আস্থাও কিছুটা কম।

সতের

পরদিন সকাল সকালই দরজায় ঠকঠক করে চিৎকার করে ডাকতে লাগলো রঞ্জু। তার ডাকেই আমার ঘুম ভাঙলো। কিন্তু মাসুমার দিকে তাকালে বোঝা যায় তার ঘুম ভাঙতে অনেক দেরি আছে। তাই দরজাটা ফাঁক করে মুখ বাড়াতেই রঞ্জু বললো, চলেন ঘুরতে যাই। ঘুরে ঘুরে একটা লোকেশন ঠিক করি।

বললাম, কেমন সময় লাগবে?

সারাদিন লাগলেই ক্ষতি কি? দরকার হলে বাইরে খাবো।

না। তবে মাসুমার শরীরটা মনে হয় ভালো নেই। ওকে একা ফেলে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?

আরে আপাকেও নিয়ে নেন। আমরা সবাই মিলে ঘুরি।

আচ্ছা দেখি। মাসুমার ঘুম ভাঙুক। একটু দেরি করে বের হলে তো ক্ষতি নেই।

না। ঘণ্টা দেড় দুই পরে বের হবো।

ঠিক আছে। বলে, আমি অপেক্ষা করি রঞ্জুর ফিরে যাওয়ার। সে ফিরতেই আমি ঘরের ভেতর মাথা এনে দরজা লাগিয়ে দিয়ে ফিরে আসি মাসুমার কাছে।

সে খুবই গুছিয়ে কাত হয়ে ঘুমোচ্ছে। তাকে দেখে দেখে যেন আমার আশ মেটে না। রঞ্জুকে আমার উৎপাত বলেই মনে হয়। বুদ্ধুটা কেন যে বুঝতে পারছে না যে, মাসুমা আর আমার প্রতিটি মিনিটই এখন মহামূল্যবান। কোনোভাবে যদি রঞ্জুকে নিরস্ত করতে পারতাম তাহলে খুবই ভালো হতো। কিন্তু তার লক্ষণে মনে হচ্ছে আমাকে না নিয়ে বেরুবে না। তখনই মাসুমা নড়েচড়ে ওঠে। কিন্তু চোখ খোলে না। হয়তো কোনো সুখ স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে। যে কারণে হয়তো মুখটাও হাসি হাসি হয়ে উঠেছে। আমার খুব ইচ্ছে হয় তাকে আদর করি। কিন্তু তার ঘুমটা যদি নষ্ট হয়ে যায়। হ্যাঙওভারে যদি কষ্ট পায়? তাই তাকে আর ছুঁয়েও দেখি না। ঘুমাক যতক্ষণ ঘুম না ভাঙে।

বারান্দার দিক থেকে কেমন একটা অদ্ভুত শব্দ আসছিলো। শব্দের উৎস খুঁজতেই আমি এগিয়ে যাই। গ্রিলের বাইরে দৃষ্টি ফেলতেই দেখতে পাই বারান্দার নিচ থেকে মাটি একটু কোণাকুণি ভাবে বেশ কিছুটা নিচে নেমে গেছে। উচ্চতা কম করে হলেও একতলা সমান উঁচু হবে। দৃষ্টি ঘোরাতেই চোখে পড়ে একটি দোকানের মত। কাঠের বেঞ্চে বসে দুজন স্থানীয় গ্লাসে করে চা খাচ্ছে। তখনই একজন গ্লাসটা বাড়িয়ে ধরতেই দেখতে পাই দোকানের ভেতর থেকে কেউ বোতল থেকে কিছু একটা ঢেলে দিচ্ছে। কি মনে করে লোকটা উপরের দিকে মুখ তুলতেই দেখতে পাই সাহেব আলি। আমাকে দেখেই বলে উঠলো, গলাটা ভিজিয়ে নিচ্ছি সার!

বললাম, দেশি না বিদেশি?

সাহেব আলি জানালো, চোলাই।

সাহেব আলির নেশা হয়েছে হয়তো। তাই সে ব্যাপারটাকে তরল করে দেখছে। নয়তো এরা এমনই। মদ খাওয়াটাকে গোপনীয় কিছু মনে করে না। বললাম, আমার কাছে বিদেশি আছে। চলবে?

হয়তো আমার কথা শুনেই আড়াল থেকে আরো দুজন খালি গায়ে বেরিয়ে এসে উপরের দিকে হাত তুললো।

আমি তাদের হাতের ইশারায় দাঁড়াতে বলে ভেতরে এসে বোতলটা নিয়ে ফিরে যাই। কিন্তু গ্রিলের ফাঁক দিয়ে সেটাকে বাইরে বের করলে ওরা সবাই হাত নাড়ে। একজন বললো ঘুরে আসার কথা।

আমি বারান্দা থেকে ভেতরের দিকে আসতে আসতেই মেন দরজায় ঠকঠক শব্দ শুনতে পাই। এগিয়ে গিয়ে দরজা ফাঁক করেই দুজনের হাসি মুখ দেখতে পাই। হয়তো দৌঁড়ে এসেছে। ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছিলো। দরজার ফাঁক দিয়ে বোতলটা বাড়িয়ে ধরতেই ওদের ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলোর বিস্তৃতির পরিমাণ বেড়ে গেল যেন। বললাম, মিলে মিশে খেয়ো।

ওরা চলে যেতেই দরজা বন্ধ করে ফের বারান্দায় ফিরে আসি। কিছুক্ষণ পরই দেখতে পাই যেন উৎসব শুরু হয়ে গেছে। রঞ্জুর স্কচ হুইস্কির বোতলটাকে মাথায় নিয়ে একজন নাচছে। আরেকজনকে দেখি শুকনো ডালপালা জমিয়ে আগুন ধরানোর চেষ্টা করছে। খানিক পরই মাংস পোড়া গন্ধ ভেসে আসে। তাহলে কি এখান থেকেই ফ্রিজের মাংস ওখানে চলে গেল?

আমার খারাপ লাগে না। কোনো মানুষ যখন অল্পতেই খুশি হতে পারে, তাহলে বুঝতে হবে তার দুঃখবোধও সে পরিমাণে কম।

আমি মাসুমার পাশে এসে বসে থাকি তার মুখের দিকে তাকিয়ে। তখনই সে চোখ খুলেই হাসি হাসি মুখে বলে, উঠেছো কখন?

ঘণ্টা খানেক।

আমাকে ডাকলে না কেন?

ঘুমুচ্ছিলে বলে আর ডাকতে ইচ্ছে হয়নি।

সে আমার একটি হাত টেনে নিয়ে তার গলায় লাগিয়ে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আবার চোখ বোঁজে। বলি, আবার ঘুমুতে আরম্ভ করলে নাকি?

নাহ।

টিনার হাজবেন্ড বলে গেছে সবাই মিলে ঘুরতে বেরোবে।

চোখ বোজা অবস্থাতেই সে বললো, শুভলঙ কতদূর এখান থেকে?

আমার জানা নাই। লোকজনকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে।

কখন যাবে বলেছে? নাস্তা দিয়ে গেছে?

হ্যাঁ। হয়তো এতক্ষণে ঠাণ্ডাও হয়ে গেছে।

মাসুমা উঠে বসে বললো, না ঘুরতে পারলে লাভটা কি! কেবল ঘুমিয়ে কাটালে ঢাকায় কি অসুবিধা ছিলো?

তাহলে তৈরি হয়ে নাও। আর ঘন্টা খানেক বাদেই রঞ্জু আসবে।

মাসুমা বিছানা থেকে নামতে নামতেই বললো, আজ বেশিদূর গিয়ে কাজ নেই।

আমি ঠিক করেছি আশপাশেই ঘুরবো। বারান্দা দিয়ে যেই পাহাড়ি গ্রামটা দেখা যায়, পারলে ওখানে যাবো।

আমার কথায় টিনা আর রঞ্জুও একমত হলো সে গ্রামটিতে যেতে। সকালের দিকে যে লোক দু’জনকে বোতলটা দিয়েছিলাম, তাদেরও দেখতে পেলাম। বললাম, এখানে যারা ঘরে-ঘরে প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে, তাদের অফিসটা কোথায়। তারা জানালো যে, সামনের গ্রামটিতেই। কথায় কথায় আরো জানা গেল যে, সেখানকার দুজন অফিসার খুবই খারাপ। স্থানীয় দুটি মেয়েকে ফুসলিয়ে ঘরের বার করলেও বিয়ে করতে চাচ্ছে না। এ নিয়ে খুবই গণ্ডগোল হয়েছে। পুলিশ এসে গ্রামের অনেক মানুষকে পিটিয়েছে। মেয়ে দুটোকেও জেলে ঢুকানোর ভয় দেখিয়েছে।

ওরা আর কি কি করে জানা আছে কিছু?

দুজনই পালাক্রমে আমাকে যা বললো, তাতে আমার এখানে আসার উদ্দেশ্য পুরোটাই সফল বলতে হবে। স্থানীয় অফিসের পাহাড়ি টাইপিস্ট কেনেডি নেশার ঘোরে জানিয়ে দিলো যে, ওরা বেনামে বিভিন্ন খাতে টাকা দেয়ার ভাউচার দেখাচ্ছে আর সে টাকায় আনন্দ করছে দিনরাত।

আমাদের সঙ্গে ঘুরতে বেরিয়ে রঞ্জুর কাজ হয়ে গিয়েছিলো। সে দুটো হাত ক্যামেরার মত তাক করে বলে উঠলো পেয়ে গেছি!

আমি অবাক হয়ে বললাম কি?

ওই দেখেন। বলে, হাত উঁচিয়ে দেখালো সে।

পাহাড়ি ঝোঁপঝাড়ে পূর্ণ একটি এলাকা দেখিয়ে সে আবার বলে উঠলো, লাল মাটির সরু পথটা কেমন সাপের মত উঠে গেছে দেখতে পাচ্ছেন? ঠিক অমন একটি জায়গাই খুঁজছিলাম আমি। বলতে বলতে সে টিনার হাত ধরে বললো, চলো টিনা। ফিরি। আমার তো কাজ হয়েই গেল।

টিনা বললো, রেজা ভাইয়া আর ভাবির সঙ্গে ভালোমতো কথাই তো হলো না।

ফোন নাম্বার নিয়ে নিয়েছি আগেই। আমাদের বাসায় আসতে বলেছি।

তখনই টিনা আমার দিকে ফিরে বললো, ফোন করলে ভাবিকে নিয়ে যাবে তো? তারপর সে আবার মাসুমাকে ধরলো, বললো, যাবেন কিন্তু।

মাসুমা ঘাড় কাত করতেই রঞ্জু আর টিনা পাহাড়ি গ্রামটার ঢালু পথ বেয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে নামে।

মাসুমা বললো, আমরাও কিন্তু চলে গেলে পারতাম!

বললাম, কালকের দিনটা থাকি। তুমি না শুভলঙ যেতে চেয়েছিলে!

মাসুমার মুখটা আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠতেই আমার জানা হয়ে যায় যে, তার প্রবল ইচ্ছেটাকে এতক্ষণ চেপে রেখেছিলো।

আসলে জয়ন্ত গোস্বামী আমাকে যে কথা জানতে পাঠিয়েছিলেন, আমি তার চেয়েও আরো মারাত্মক কিছু তথ্য সংগ্রহ করে আনি। যা জয়ন্ত গোস্বামীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ার মত বিপদ থেকে রক্ষা করেছিলো। তিনি পরে খুব করে ধরেছিলেন, রাঙামাটি প্রজেক্টের ডিরেক্টর হয়ে যেন যাই। কিন্তু আমার যেতে মন চাইছিলো না। বাবা-মাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারবো না সেখানে। কাজেও মন বসাতে পারবো না।

মাসুমা সব কথা শুনে বললো, বাবা মাকে দেখার জন্য আমরা দু’জন আছি। তা ছাড়া বাবু তাদের জন্য যতটা করবে তুমি এখানে থেকেও তার সিকি পরিমাণ করতে পারবে না। তোমার যে বেতন হবে তার অর্ধেকের বেশিও যদি তোমার আসা যাওয়ার পেছনে খরচ হয়ে যায় আমার কোনো আপত্তি নেই। এমন তো না যে, আমাদের বিলাসী জীবন-যাপন করতে হবে। এখন যে পরিবেশে আছি তেমনটা বজায় রাখতে পারলেই মনে করবো অনেক। তুমি নিশ্চিন্তে নতুন পোস্টে জয়েন করতে পারো।

তাই বলে আমাদের ভবিষ্যৎ নেই?

আছে। আমাদের ভবিষ্যৎ তৈরি করাই আছে। ওসব ভেবে মগজ ক্ষয় করার মানে হয় না। বৃহস্পতিবার চলে আসবে। শনিবার সকালে চলে যাবে। ও দুদিনও তোমার ডিউটির আওতায় পড়বে। সমস্যা হবে না। সমস্যা হচ্ছে তুমি আসা যাওয়াতে কতটুকু ক্লান্ত আর বিরক্ত হও তার ওপর।

তাহলে কিছুদিন দেখি।

বাবা মা’র সঙ্গেও আলাপ করে নাও। বাবাও তো শুনেছি এভাবে প্রতি সপ্তাহে লাকসাম-ঢাকা ছুটোছুটি করেছেন। কিন্তু তুমি বিমানে আসা যাওয়ার সুবিধাটা নেবে। এয়ারপোর্ট থেকে যেতে আসতে যা সময় লাগে।

বাবা-মা’র সঙ্গে আলাপ করতেই তারা বললেন, কদিন পরই না হয় জয়েন কর। এর আগে তোদের বিয়ে উপলক্ষে যে অনুষ্ঠানটা করতে চেয়েছিলাম সেটা করে ফেলা উচিত।

বললাম, কতদিনের ভেতর করতে চাও?

সপ্তাহ খানেকের ভেতর পারবি?

সে তো অনেক টাকার ব্যাপার! এক সপ্তাহে ম্যানেজ করতে পারবো না!

বাবা হাসিহাসি মুখে বললেন, তোর কাণ্ড-জ্ঞান থাকলে কি আর এ কথা বলিস? তোর যে যোগ্যতা, তাতে তুই কমিউনিটি সেন্টারের মালিক কাশেমকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলতে পারিস। আর আমরা একটা লিস্ট করে দেবো সে লিস্ট ধরে ধরে সবাইকে সামনের শুক্রবার চলে আসতে বলবি। এ ছাড়া তোর করার কিছু আছে বলে কি মনে করিস?

আমার বাবাই এমন কি না জানি না। নাকি অন্যান্য ছেলেদের বাবারাও এমনই। বাবা ইচ্ছে করলে বলতে পারতেন যে কাশেমকে খবর দিস তো, খরচ-পাতি নিয়ে আলাপ করি! আর কাকে কাকে ইনভাইট করা যায় তার একটা লিস্ট করে ফেলিস। কিন্তু তিনি সোজা ভাবে না বলে, বাঁকা করে বলে কী সুখ পেলেন বুঝতে পারি না।

আঠার

মানুষ যদি চেষ্টা করে তাহলে অনেক কিছুই পারে। আমার ভেতর চেষ্টা বলে কিছু নেই। আমার অনেক কিছুই যেন এমনি এমনিই হয়ে যায়। কিন্তু যে মানুষ লুটপাট করতে শিখে গেছে, অনায়াসে টাকা রোজগারের পথ জেনে গেছে, সে মানুষ তার পথের কাঁটা সরাতে যে কোনো পদক্ষেপই নিতে পারে। কথাটা আমার জানা থাকলেও কেমন করে যেন বিস্মৃত হয়েছিলাম। আর সে সুযোগটাই নিলো, আগের ডিরেক্টর নিজাম উদ্দিন আর সেরাজ মিয়া।

নারীর প্রতি আমার কোনো মোহ নেই বা সুন্দরীর প্রতি আমার আকর্ষণ নেই বলাটা অনেক বড় মিথ্যে হয়ে যায়। কিন্তু মানুষটি খানিকটা সন্দেহ প্রবণ বলেই হয়তো চট করে পরিপার্শ্ব ভুলে যেতে পারি না। আর তাই আমাদের স্থানীয় মাঠ কর্মী পিথু যখন তাদের বার্ষিক অনুষ্ঠান বৈসাবিতে নিমন্ত্রণ করে, তখন আমার ভেতর থেকেই যেন কেউ অকস্মাৎ বলে ওঠে সাবধান। নিজামের ডান হাত এই পিথু। যদিও তার যোগসাজশের কোনো প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি, তবুও সে যে নিজামের হয়ে আমাকে ছোবল দেবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। নিশ্চয়তা নেই নিজাম কিংবা সেরাজের সঙ্গে তার যোগাযোগ আছে কি না। তবুও আমি তার নিমন্ত্রণ হাসিমুখে গ্রহণ করি। জানতে চাই অনুষ্ঠানটা কোথায় হবে? এখান থেকে কতটা দূরের পথ? হেঁটে যেতে হবে নাকি গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে?

পিথু জানায় হেঁটে যেতে হবে। তাদের গ্রামটির পরের গ্রামটিতেই প্রতিবছর অনুষ্ঠান হয়। আমি এখানে জয়েন করার আট-দশদিনের মাথায়ই জানতে পারি সামনের  দু’চারটি গ্রামের আশেপাশে কোনো সেনা ক্যাম্প নেই। যার ফলে শান্তি বাহিনীর সদস্যরা নাকি দিনের বেলাতেই অস্ত্র প্রশিক্ষণ চালায়। ওদের অঞ্চলে কোনো সামরিক অভিযান হলে দেখেছি একসঙ্গে তিন-চারটি হেলিকপ্টার উড়ে যেতে। যেখানে দুর্গম বলে সামরিক বাহিনীর সদস্যরাই হেঁটে যেতে সাহস রাখে না, সেখানে আমি সাধারণ একটি মানুষ, যে ইতোমধ্যে জড়িয়ে পড়েছে নানাবিধ জটিলতায়, সে কী করে অমন দুঃসাহস দেখাবে? তা ছাড়া আমাকে যে উৎসবে যাওয়ার পথেই কিডন্যাপ করা হবে না বা গুলি করে মেরে ফেলা হবে না, তাই বা কী করে বিশ্বাস করি?

অবশ্য শান্তি বাহিনীর কোনো বেপথু সদস্যের সহায়তায় নিজাম-সেরাজরা আমাকে অফিসে বসা অবস্থাতেই খুন করাতে পারে। দূরের আড়াল থেকে আমার মাথায় একটি গুলি লাগালেই হবে। কিন্তু তার পরিণতিতে আশপাশের গ্রামগুলোকে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা তছনছ করে দিতে পারে। সে যুক্তি আমাকে দেখিয়েছে করম আলি। ছোটোখাটো স্বার্থের জন্য হয়তো তারা নিজেদের অভয়াশ্রম হারাতে চাইবে না। সেদিক থেকে হয়তো কিছুটা নিরাপদ আমি। কিন্তু দু’টো পাহাড়ের মাঝে অথবা দু’পাশে ঘন গাছপালার কারণে দৃষ্টি প্রতিবন্ধক পথে যে কোনো বিপদে পড়বো না সে ভরসা আমার ছিলো না। তাই পিথুকে বললাম, কাল দুপুরের দিকেই আমি পৌঁছে যাবো আপনাদের বাড়ি। আপনারা যখন যাবেন এক সাথে চলে যেতে পারবো।

পিথু খুশি হয়ে চলে গেল। কিন্তু আমি তাকে কথা দিয়েছি যে, যাবো। কিন্তু আমার যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। পিথুকেও যাতে আমার প্রতিপক্ষের কাছে ছোট হতে না হয় সে চিন্তা করে বন্ধু-প্রতীম ডাক্তার ইব্রহিমকে ধরলাম। তিনি বললেন, আমার ক্লিনিকে একটি কেবিন দিচ্ছি। দুদিন শুয়ে আরাম করেন। বিষ্যুদবার বিকেলের দিকে বাড়ি চলে যাবেন। সে অনুযায়ী  মঙ্গলবার রাত দশটার দিকে আমার জন্য বরাদ্দ কেবিনে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। পরদিন সকাল সকালই অনেকেই আমাকে দেখতে এলো। করম আলি অফিসের চাবি নিতে এসে কেঁদে ফেললো।

ক’দিন পর তার মেয়ের বিয়ে। বলেছিলাম সে বাড়ি যাওয়ার সময় কিছু টাকা দেবো। হয়তো সে ভেবেছে আমার কঠিন কিছু হলে বা আমি যদি মরে যাই তাহলে তার মেয়ের বিয়ের জন্য টাকাটা পাবে না। বললাম, ভেবো না করম আলি। আমার কিছুই হয়নি। তুমি ভয় পেয়ো না।

অফিসের সব কর্মচারী আর মাঠ কর্মীদের সবাই আমাকে দেখতে এলেও পিথু এলো না। এমন নয় যে সে সংবাদ পায়নি। গতরাতে আমি ক্লিনিকে এসেছি। রাতেই হয়তো সবাই জেনে গেছে আমার খবর। পিথু খবর পায়নি এ হতেই পারে না। তাহলে কি সে অফিসে হাজিরা দিতে আসেনি?

পরের সপ্তাহে ঢাকা থেকে ফিরে অফিসে যেতেই দেখতে পাই পিথু বসে আছে বাইরে। তার হাতে একটি খাম।

কিছুক্ষণ পরই পিথু এসে আমার টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। বলি, আমি খুবই দুঃখিত যে, আপনাদের ওখানে যেতে পারলাম না!

পিথুর কোনো পরিবর্তন বুঝতে পারি না। খামটা এগিয়ে দিয়ে বললো, আমি আর চাকরি করবো না।

আমি তার কথায় অবাক না হয়ে পারি না। কেন? চাকরি করতে অসুবিধা কি?

আমার পারিবারিক একটি সমস্যা আছে।

পারিবারিক সমস্যা বলতেই আমি আর কিছু জানতে চাই না। অনেকে ব্যক্তিগত সমস্যার কথা বলতে চায় না। জিজ্ঞেস করলে উল্টো কথা শুনতে হতে পারে। বললাম, ঠিক আছে। এটাকে আমি ফরোয়ার্ড করে দিচ্ছি হেড অফিসে। সপ্তাহ খানেক পরই জানতে পারবেন। আপনার কি কি পাওনা আছে বা আপনার কাছ থেকে আমাদের কোম্পানির কিকি পাওনা আছে তা দেখে জানানো হবে।

আমি যাই। বলে, আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে পিথু হনহন করে বেরিয়ে যায়।

দুদিন পর একটি ঋণগ্রহীতা পরিবারের কার্যকলাপ দেখার জন্য পাশের গ্রামটিতে যেতেই কয়েকজন জানায় যে, পিথুকে কারা যেন জবাই করে পথের পাশে ফেলে রেখেছে।

পরিদর্শন শেষে ফিরে এসে থানায় যোগাযোগ করতেই সেখান থেকে জানানো হলো আমাকে সন্ধ্যার দিকে থানায় যেতে হবে।

থানায় যাওয়ার আগেই পিথুর কাকা শীতল বরণ চাকমা জোড় হাত করে বললো, পিথুকে যেন পোস্টমর্টেমের জন্য না নেয়। সে অনুরোধ যেন করি।

আমি ভেবে পাই না কি করবো? আমার কথা পুলিশ কেন শুনবে সে যুক্তিই দাঁড় করাতে পারলাম না। তবুও শেষ পর্যন্ত থানায় গিয়ে আমি নিজে তো জেরার মুখে পড়লামই, পিথুর কথা বলে আরো সমস্যায় পড়লাম। ওসি শরিফুদ্দিন বললেন, আপনার স্বার্থ না থাকলে আপনি নিজ থেকে কেন এ কথা বললেন?

জানালাম শীতল বরণ চাকমা পিথুর কাকা। সেই আসার সময় আমাকে বলতে বলেছিলো।

তারপর আরো ঘণ্টা দুয়েক থানায় বসে থাকতে হলো পিথুর আপনজনদের অপেক্ষায়। তারা এসে যখন জানালো যে, তারা কোনো কেস করবে না। এ নিয়েও আরো কত বিতর্ক হয়ে গেল। শেষটায় শীতল বরণকেই জেলে ঢোকানো পাঁয়তারা করছিলো ওসি। পরে শুনেছি বেশ কিছু টাকার বিনিময়ে পিথুর কেসটা ছেড়ে দিয়েছিলো পুলিশ।

এভাবেই আশপাশের গ্রামের পাহাড়ি মানুষদের সঙ্গে নানা ঝামেলায় আর তাদের নানা সমস্যা দেখতে দেখতে আমার দিন কেটে যায়। যদিও জয়ন্ত গোস্বামী বলেছিলেন, দু’মাস কষ্ট করে দেখতে। তারপরই তিনি আমাকে আবার হেড অফিসে নিয়ে আসবেন। কিন্তু দু’মাসের জায়গায় ছ’মাস পেরিয়ে গেলেও বুঝতে পারি না। যার ফলে ব্যাপারটা দিনদিন কেমন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যেতে থাকে। এ নিয়ে আমিও আর কোনো আগ্রহ দেখাই না। সমস্যাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাঝে তাদের কোনো একটি সমস্যা উত্তরণের আনন্দের সঙ্গে নিজকে সম্পৃক্ত রাখার যে আনন্দ তা বোধ করি আরো অনেক আনন্দের চেয়েও আনন্দময় হয়ে উঠতে পারে। এ ব্যাপারটি এখানে না এলে হয়তো কখনোই বুঝতে পারতাম না।

একদিন মাঝরাতে টেলিফোন বেজে উঠলে বিনা কারণেই আমার মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যায়। কদিন ধরে একটি অচেনা কণ্ঠস্বর আমাকে অকারণেই নানা ধরণের হুমকি ধামকি দিচ্ছিলো। প্রথম প্রথম ব্যাপারটাকে পাত্তা দিচ্ছিলাম না। যখন অফিসের নানা ফাইলের ঘাপলার কথা বললো, তখনই বুঝতে পারি যে, এটা নিজাম কিংবা সেরাজ কেউ একজন হবে। চাকরি থেকে সাসপেন্ড হয়ে আমাকে কোনোভাবে গলাতে না পেরে এখন কঠিন পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু আমার একটি বল আছে আর তা হলো স্থানীয় লোকজন। বলতে গেলে আমি এখন মিশে গেছি তাদের মাঝেই। সেখান থেকে বিপদের কোনো সম্ভাবনা দেখি না। আর ভীতু নিজাম-সেরাজ কী আর করতে পারবে! আমিও আমার কৌশল পাল্টে ফেলি। মুখে যা আসে তাই বলি। আজও এমনি খিস্তি করতেই একটি মেয়েলী কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে নিজকে সংযত না করে পারি না। কান পাততেই বুঝতে পারি পিলু। কিন্তু এনালগ লাইনে কথাগুলো খুব স্পষ্ট শুনতে পাই না। মনে হয় কত দূর থেকে ভেসে আসছে শব্দগুলো।

সে বললো, তোর সমস্যাটা কি ভাইয়া? ফোনে অমন নোংরা ভাষায় কথা বলছিলি কেন? তুই তো অমন ছিলি না! আর সেলফোনটা বন্ধ করে রাখিস কেন?

বললাম, এখানে নেটওয়ার্ক থাকে না বলে সেলফোন চলে না। এখানকার যে ক’টা টাওয়ার আছে আমার এলাকাটা তার রেঞ্জের বাইরে।

অনেকদিন পর পিলুর ফোন পেয়ে আমার খুব ভালো লাগে। বলি, তোদের দিন চলছে কেমন?

পিলু বললো ভালোই। সে আরো জানালো যে সে এখন চাকরি করছে। সপ্তাহ খানেক হলো জয়েন করেছে।

বললাম, তাহলে তো খুশির খবর!

পিলু বললো, না ভাইয়া। বাবা-মা আর মাসুমাকে জানাবে না। বাবা রাগ করবেন বেশি।

বললাম, নারে, বাবা এখন অনেক বদলে গেছেন। তিনি যে আমাদের কতটা ভালোবাসেন, সেটা গোপন করতেই উপর দিয়ে একটি শক্ত খোলস পরে থাকেন।

ইকবাল কেমন আছে?

ভালো। ওকে দে, কথা বলি।

ঘুমুচ্ছে।

তাহলে তুই জেগে আছিস কেন?

এমনিই। ঘুম আসছে না। তোর কথা খুব মনে পড়ছিলো। আচ্ছা রাখি।

পিলু কি কেঁদে ফেললো? শেষটায় কথাগুলো কেমন যেন শোনাচ্ছিলো।

ফোন রাখতেই আমার মনটা খারাপ হয়ে যায়। কতদিন ধরে পিলুকে দেখি না। ঘরে একা একা হয়তো সময় কাটে না। যে কারণে চাকরি নিতে বাধ্য হয়েছে। তাও ভালো। দিনভর একাকীত্বের কষ্ট থেকে দূরে থাকতে পারবে।

উনিশ

একবার এক বৃহস্পতিবার বাড়ি আসতেই মাসুমা বললো, ডাক্তারের কাছে যাবে। কিন্তু কেন তা আর বললো না। সন্ধ্যার মুখেই গ্রিন রোডে ডাক্তার জামিলা খাতুনের চেম্বারে গিয়ে জানতে পারি রাত ন’টায় আসবেন। মাসুমাকে বললাম, অন্য কোনো ডাক্তারের কাছে চলো। এ ডাক্তার মনে হয় এখনো হাসপাতালে রোগী দেখছেন।

মাসুমা বললো, আমি অন্য কোনো ডাক্তারকে চিনি না। তোমার মনে নেই একবার তোমাকে নিয়ে এসেছিলাম?

আমি অবাক হয়ে বলি, এখানে কবে এলাম?

এখানে না, তখন তার চেম্বার ছিলো কাঁঠাল বাগান।

তখনই আমার মনে পড়ে হালকা পাতলা লম্বা গড়নের ভদ্র মহিলা। দেখতে সুন্দরী। আমার কাছে খুব ভালো লেগেছিলো। মাসুমা আমার আগ্রহ দেখে বলেছিলো, তোমাকে নিয়ে আর আসা যাবে না দেখছি!

কেন?

ভদ্রমহিলার দিকে যেভাবে তাকাচ্ছিলে।

তাকালে অসুবিধা কি? উনি আমার পাঁচ-ছ’বছরের বড় হবেন।

তাতে কি? ছেলেদের ওই সেন্স আছে নাকি?

ছি! একেবারে জাত তুলে কথা বলছো?

বলবোই তো! আমি যখন তোমার সঙ্গে বাইরে থাকবো, আমার চেয়ে ইম্পর্টেন্স আর কিছুতেই দিতে পারবে না।

বলতে পারতাম, তাহলে কি প্রাকৃতিক ব্যাপারও তার আওতায় পড়বে? কিন্তু তা না বলে সেবার অনেক মিষ্টি কথার ঘুষ দিয়ে তার কথার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম। বললাম, চলো, তাহলে ঘুরি। নয়তো কোথাও বসি।

মাসুমা বললো, চলো ফুচকা খাই!

বললাম, সর্বনাশ! এখন চারদিকে যেভাবে জন্ডিস হচ্ছে, বাইরের এসব খাবার থেকেই এ রোগটা ছড়াচ্ছে বেশি।

মাসুমা বললো, দেখ, আজ বাজে কথা বলবে না। বাইরের খাবার খাচ্ছি আজ না। হলে আরো অনেক আগেই হতো। তারপর সে কথায় কেমন তাচ্ছিল্য ফুটিয়ে বললো আবার, শোনো, সব সময় যারা নানা জাতের জীবাণু খায় তারা নিজেরাই জলজ্যান্ত অ্যান্টিবায়োটিক হয়ে যায়। টোকাইদের কাউকে জন্ডিস, ডায়রিয়া, টিবি, ক্যান্সার হয়ে মরতে দেখেছো? যারা এটা না, ওটা না করে পুতু জীবন কাটায় তাদেরই দেখ কত বড়বড় রোগ নিয়ে হাসপাতালের সিট দখল করে রেখেছে মাসের পর মাস।

আমি তর্ক না বাড়িয়ে হার মানাটাকেই নিরাপদ মনে করে বলি, ওই যে চলো, রাস্তায় চার চাকার গাড়িতে ফুচকা বিক্রি হচ্ছে। চারদিকে গোল হয়ে চেয়ারে বসে আছে কত মানুষ!

মাসুমা বললো, এখানে না। একটি ছোট্ট দোকান আছে আর একটু সামনে। ওরা কেবল চটপটি আর ফুচকা বিক্রি করে।

মাসুমার কথা শুনে আমি অবাক না হয়ে পারি না। এবং সত্যি সত্যিই তেমন একটি কাচ ঘেরা দোকানে ঢুকে অবাক হয়ে যাই।

একটি টেবিলে বসতেই একটি কিশোর এগিয়ে এসে বললো, কোনটা দিমু?

খাঁটি তেঁতুল তো, নাকি এসিডের পানি?

ছেলেটি হেসে বললো, আপা এসিডের পানি না, ওইটা টক-লবণ!

তেঁতুল নেই?

আছে।

বেশি করে তেঁতুল পানি সহ দুটো ফুচকা।

ফুচকা নিয়ে আসতেই মাসুমা চায়ের মত চুমুক দিয়ে কাপ থেকে তেঁতুল গোলানো কালচে কফির মত পানি খায়। দেখে আমার মুখের ভেতরটা লালা পূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু মাসুমাকে দেখে মনে হচ্ছে জগতে এর চাইতে স্বাদের পানীয় আর নেই। কাপটা খালি করে দিয়ে সে আরেক কাপের জন্য বললো। আমি বলে উঠলাম, তুমি আরেক কাপ খাবে?

বারে! ফুচকায় লাগবে না?

আমার তেঁতুলের পানির প্রয়োজন হয় না। এমনিতেই আমার ভালো লাগে। মাসুমা চামচ দিয়ে ফুচকার ভেতর তেঁতুলের পানি টুবুটুবু করে দিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে খায় আর আমার দিকে এমনভাবে তাকায় যেন ও যে কী অমৃত খাচ্ছে তার স্বাদ কেবল আমিই বুঝলাম না!

ফুচকা খেতে খেতে সে হঠাৎ বললো, তোমার ওখানে হাট বসে না?

বসে।

তাহলে দেখো তো পরিষ্কার আর নতুন পাকা তেঁতুল পাওয়া যায় কি না!

দেখবো।

নেক্সট উইকে পারলে দু-আড়াই কেজি নিয়ে এসো।

দু-আড়াই কেজি! আমি অবাক না হয়ে পারি না।

হুঁ। চাটনি বানাবো আর আচার বানাবো।

আচ্ছা, মনে থাকলে অবশ্যই আনবো।

আমি ফোন করে বলে দেবো।

ফুচকা খেয়ে আমরা ফিরে আসি ডাক্তারের চেম্বারে। বসার ঘরে অনেকেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। বেশিরভাগই মহিলা। বললাম, ভিড় তো অনেক! কখন সিরিয়াল পাবে কে জানে!

মাসুমা বললো, অসুবিধা নেই। বেশিক্ষণ লাগবে না। তুমি ছেলেদের ওদিকটায় গিয়ে বসো।

আমি বসতে জায়গা পাই না বলে, দরজার কাছাকাছি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি।

প্রায় ঘণ্টা খানেক পর মাসুমাকে দরজায় দেখেতে পেয়ে এগিয়ে যাই। বলি, কি বললো?

তেমন কিছু না। তুমি ছেলেমানুষ জেনে কি করবে?

আমি আর কথা বাড়াই না। কিন্তু ঘরে ফিরে আসতেই বাবা মা’র মুখে যেন নতুন কিছু দেখতে পাই। তারাও যেন ভেতরে ভেতরে খুশিতে ফেটে পড়ছেন।

মাসুমা কিছু বললে এমনিতেই বলতো। তাই আমিও আর চাপাচাপি করি না। আমার সময়গুলো রাঙামাটি টু চিটগং টু ঢাকা করতে করতেই হুহু করে চলে যেতে থাকে। আমি কেবল বৃহস্পতি আর শনিবারটার দেখা পাই। বাকি দিনগুলো যে কিভাবে কাটে বুঝতে পারি না।

মাসুমা হঠাৎ করেই আগের চেয়ে সুন্দরী হয়ে উঠতে থাকে। কিছুটা যেন মোটাও হয়। মাঝে মাঝে দেখি পান খেয়ে ঠোঁট মুখ লাল করে রাখে। কিন্তু হঠাৎ করেই আমার সন্দেহ হয় যে, আমার সামনেও কেন সে শরীরটাকে খুব ঢেকে ঢুকে রাখে। ব্যাপারটা কি? তেমন কিছু ভাবতে পারি না। বলি, সারাদিন শুয়ে-বসেই থাকো নাকি?

মাসুমা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, কেন বললে?

দিনদিন যেভাবে মোটা হচ্ছো আর পেটে চর্বি জমাচ্ছো, ক’দিন পর আর চলতেই পারবে না!

সে কেমন রহস্যময়ীর মত হেসে বললো, চর্বি জমছে জমুক। বেরিয়ে এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তার কিছুদিন পরই সে তার পেটের ওপর আমার হাতটা লাগিয়ে বললো, দেখ তো কিছু বুঝতে পারো কিনা?

আমি তার পেটে হাত রাখতেই টের পাই কিছু একটা এদিক থেকে ওদিক গেল। আমি বিস্মিত হয়ে আরেক পাশে হাত রাখি। জীবন্ত কিছু যেন নড়ছে মাসুমার পেটের ভেতর। আরে একি? আমার কাছে সব রহস্যের অন্ধকারই কেটে যায়। বলি, ব্যাপারটা গোপন রাখলে কেন?

মাসুমা হাসতে হাসতে বললো, তুমি আশ্চর্য হওনি, বলো?

তা তো নিজেই দেখলে।

এ মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। মাকেও বলে রেখেছিলাম তোমাকেও যেন না বলেন।

আমি কি করবো বুঝতে পারি না। আমি বাবা হচ্ছি আমিই জানতে পারলাম না! মাসুমা কেমন অদ্ভুত ভাবে ব্যাপারটা এতদিন গোপন রাখতে পারলো! আমি যে সত্যিকারই একটি গাধা। না হলে স্বামী টের পাবে না তার স্ত্রীর গর্ভের পরিবর্তন, এ কেমন কথা?

আমার এতটাই খুশি লাগছিলো যে, কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। মাসুমাকে বললাম, আল্ট্রাসনোগ্রাম করিয়েছো?

তা করতে হবে কেন?

আরে ছেলে না মেয়ে জানতে হবে না?

মাসুমা কেমন গম্ভীর হয়ে বললো, ছেলে-মেয়ে বলে পার্থক্য টানছো কেন? সন্তানের আবার জেন্ডার কি?

সে জন্যে না। ছেলে হলে এক ধরনের আয়োজন আর মেয়ে হলে আরেক রকম।

সেটা কেমন?

মেয়ে হলে আনতে হবে পুতুল আর ছেলে হলে আনতে হবে বল, ব্যাট।

মাসুমা বললো, ছেলে।

মেয়ে হলে অবশ্য আরো ভালো হতো। তাকে নূপুর বানিয়ে দিতাম। ঘরে হাঁটার সময় শব্দ হতো ঝুনঝুন করে। বুঝতে পারতাম আমাদের মেয়ে ধারে কাছেই আছে।

একটা ভালো খবর আছে। তোমার ওখানে টিভি দেখতে পারো?

আমি দেখি না। সময় পাই না।

আসছে বুধবার বিটিভির আটটার পরের অনুষ্ঠানগুলো দেখো। একটা প্রোগ্রামে বাবু গান গেয়েছে।

তাই নাকি? ও কবে টিভিতেও চান্স পেয়ে গেল?

গত মাসের দিকে ওদের স্কুলের একটা অনুষ্ঠানে গান গাইলো। গান শেষ করে আমার পাশে এসে বসতেই দু’জন লোক এসে বাবুকে বললো, টিভিতে গান করবে?

মাসুমার কথার মাঝখান দিয়ে বলে উঠলাম, গানের স্কুলে ভর্তি করাতে পারলে খুব ভালো হতো।

মাসুমা বললো, স্কুলে কি আর না দিয়েছি! এ বাড়িতে বউ হয়ে আসার পরের সপ্তাহেই তাকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিয়েছি। তুমি তো আছো তোমার অফিস আর বউ নিয়ে ব্যস্ত! বাবুর কথা মনে আছে তোমার?

সত্যিই! বাবুটার দিকে আমার মনোযোগ বলতে গেলে নেইই। বলি, ও কি এ ব্যাপারে কিছু বলেছে?

বলবে কেন? আমিই সব পুষিয়ে দিচ্ছি।

ও কি ঘুমিয়ে পড়েছে?

মাসুমা দেয়ালে টানানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো, এখন ঘুমাবে কি? মাত্র ন’টা বাজে।

বলি, তাহলে চলো একটু বাইরে যাই। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই ফিরে আসবো।

কোথায় যাবে?

সামনের মার্কেটটাতে। বাবুর জন্য কিছু কিনে নিয়ে আসি।

কি কিনতে চাও?

এ বয়সের মেয়েরা কি পেলে খুশি হবে তুমিই হয়তো বলতে পারবে।

কি দেবে! মাসুমা ভাবে হয়তো। তারপর বলে, বলতে গেলে ওর তো তেমন কিছুর অভাব রাখিনি। কি দিতে পারি!

একটা এমপি থ্রি প্লেয়ার কিনে দেই?

সিডি প্লেয়ারটা তো ওর ঘরেই থাকে।

তাহলে ঘড়ি?

তা ওর আছে। তবে সুন্দর মডেলের আরেকটা দিতে পারো।

বিশ

অডিটের কারণে গত দু’সপ্তাহ বাড়ি যেতে পারিনি। মাসুমা ফোনে জানালো যে, বাবা হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আমি যেন টেনশন না করি।

যার বাবা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন, তাকে টেনশন করতে মানা করলেও তা কি আর সম্ভব? মাসুমা ফোন করেছিলো সন্ধ্যা সাতটা সাড়ে সাতটার দিকে। এখানে সন্ধ্যা নামলেই গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আমি ড্রাইভার সুমনকে বললাম, আমাকে চিটাগং নামিয়ে দিয়ে আসতে পারবি?

সে বললো, কখন?

এখনই। কতক্ষণ লাগবে? ঘণ্টা দুয়েক লাগতে পারে।

ঠিক আছে। আর তুই রাতের বেলাটা এখানে ফিরে আসার দরকার নেই। হোটেলে থেকে যাস।

সুমন বললো, হোটেলের কাজ নাই। দেওয়ান হাট আমার এক বন্ধু আছে। তার কাছেই থাকতে পারবো।

মনে মনে ঠিক করেছিলাম তাকে একহাজার টাকা দিয়ে দেবো। কিন্তু বন্ধুর সঙ্গে থাকবে শুনেই আমার মন বললো, পাঁচ’শ টাকাই অনেক!

প্লেন না পেয়ে রাতের ট্রেনে উঠে সকালের দিকে আমি বাড়ি এসে পৌঁছতেই সবাই কেমন অবাক হয়ে তাকায়। বলি, বাবা কেমন আছে?

কেরে? বলতে বলতে বাবা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলে আমি বলি, হাসপাতাল থেকে কখন এলে?

বাবা লুঙ্গিতে হাত মুছতে মুছতে বললেন, আরে, কিছুক্ষণ পরই বললো অসুবিধা নেই। তাই রাতেই চলে এসেছি।

তারপর আবার বললেন, এদিকে আয়।

আমি এগিয়ে যেতেই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আস্তে আস্তে বললেন, বাবা-মাকে এত বেশি ভালোবাসতে নেইরে! দেখ কত কষ্ট করে এলি অথচ আমাকে ঘরেই দেখতে পাচ্ছিস।

বলি, বাবা, এটাই আমার জন্য অনেক শান্তির।

তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে মাসুমাকে বললেন, বউ মা, তুমি হাসপাতালে যাওয়ার খবরটা দিলে, ফিরে আসারটাও দিতে পারতে।

মাসুমা বললো, আমি এতটাই ভয় পেয়েছিলাম যে, কি করছি বুঝতে পারছিলাম না। পরে ফোনের কথাটা আর মনে ছিলো না।

ছেলেটা শুধু শুধু কষ্ট পেলো।

কষ্ট কেন হবে বাবা? এতটুকু যদি না করলো তাহলে বুঝবো কি করে বাবার প্রতি ছেলের টান কতটুকু?

মাসুমার কথা শুনে বাবা হাসতে লাগলেন।

বাবু সে সময় রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললো, কেমন আছ মামা?

বলি ভালো। কিন্তু বাবুর মুখটা কেমন শুকনো শুকনো দেখাচ্ছিলো বলে বললাম, তুই ভালো আছিস তো?

আমার আবার কি হবে!

তোর মুখটা অমন লাগছে কেন?

কেমন লাগছে? বলেই সে মাসুমার দিকে ফিরলো, মামি!

মাসুমা বললো, তোকে অনেকদিন পর দেখছে তাই !

কিন্তু আমার মনে হয় বাবু ভালো নেই। ভেতরে ভেতরে তার কিছু একটা ঘটছে। কিন্তু নিজের কষ্ট হলেও ব্যাপারটা সে সবার কাছ থেকে আড়াল করছে।

মা কেমন করে যেন আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। আমি মায়ের দৃষ্টিটাকে অন্যান্য বারের মত দেখতে পাই না। তিনিও যেন খানিকটা বিষণ্ণ।

মাসুমা কি এসব কিছুই দেখতে পাচ্ছে না?

জয়ন্ত গোস্বামীকে জানিয়ে দেই বাবার অসুস্থতার খবর পেয়ে আমি ঢাকা চলে এসেছি। তিনি বললেন, ভালোই হয়েছে। একবার আমার সঙ্গে দেখা করে যান।

আমি ঠিক করি তিনটার দিকে যাবো। তার আগে কিছুক্ষণ ঘুমাতে পারলে ভালো হতো। এ ভেবে আমি কাপড় পাল্টে বিছানায় শুয়েও পড়ি। কিন্তু ঘুম আসে না। বাবুর ব্যাপারটা মাথার ভেতর কিলবিল করতে থাকে। হঠাৎ আমার মনে হয় বাবুর এ পরিবর্তনের পেছনে কোনো না কোনো ভাবে মাসুমা জড়িত। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে বাবুর বিষণ্ণ চেহারা। আর মাসুমা সেটাকে অন্য দিকে ঘুরাতে চেষ্টা করছে কেন?

বাবুর সঙ্গে আর মার সঙ্গে আলাদা আলাদা আলাপ করবো বলে ঠিক করি। কিন্তু মাসুমাকে সামনে রেখে তা করতে চাচ্ছি না। মাসুমা যেমন আড়াল করতে চাইছে আমিও তার থেকে আড়াল করবো। আমাকে জানতে হবে সত্যটা কি!

মাসুমাকে বলি, বাপের বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে পারো কিছুদিন। পরে তো আর বাচ্চাকাচ্চা সামলে সুযোগ পাবে না। শেষ তিনমাস বেরুতে পারবে না কোথাও।

সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গেল সে। বললো, তাহলে আজই চলো।

আমি বললাম, আমি তো তিনটের দিকে হেড অফিসে যাবো। সামনের সপ্তাহে যাই।

না। তুমি আমাকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এসো। পরের সপ্তাহে গিয়ে নিয়ে আসবে।

দেখো, পরে আমাকে এমন কথা শুনতে যেন না হয় যে, বউকে একা একা বাপের বাড়ি পাঠিয়েছি!

কে বলার আছে? আর আমার বাবা মা জানেন না তোমার কাজটা কি?

মাসুমা কিছুক্ষণ পরই বলে উঠলো, আমাকে তাহলে এখনি বাসে তুলে দিয়ে এসো।

আমি তো তিনটার আগে বেরুবোই!

ততক্ষণে আমি বাড়ি পৌঁছে ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়ে উঠতে পারবো!

মাসুমাকে বাসে তুলে দিয়ে ফিরে এসে মা’কে বলি, মা, পিলুর ছবির অ্যালবামটা কি তোমার কাছে?

না। ওর ঘরেই আছে।

চাবিটা কি দেবে একটু?

মা চাবি নিয়ে এসে দরজা খুলে দিতেই বললাম, কোথায়?

তিনি অ্যালবামটা বের করতেই বললাম, বসো। বাবা কি করছে?

কি একটা বই নিয়ে বসেছে।

মা পিলুর বিছানায় বসতেই বলি, বাবুর কি হয়েছে তুমি জানো কিছু?

তুই এ নিয়ে আবার বউমা’র সঙ্গে সমস্যা করবি না তো?

কি হয়েছে খুলে বলো। বাবু কি কিছু বলেছে?

না। যদি কথা দিতে পারিস বউমা’কে এ নিয়ে বিরক্ত করবি না বা কিছুই বলবি না, তাহলে বলতে পারি!

কথা দিচ্ছি।

আমাকে ছুঁয়ে বল!

আমি মায়ের হাতটা মুঠো করে ধরে বলি, মাসুমার সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাপ করবো না।

বাবুকেও হারাতে চাই না। আর বউমা’কেও কষ্ট দিতে চাই না। বাবু কিছু বোঝে না বলেই কোনো কেলেঙ্কারি হয়নি। কিন্তু ধরতে গেলে অনেক জটিল হয়ে উঠবে ব্যাপারটা।

তুমি বলো।

তোর বউ বাবুটাকে আর তোর বাবাকে নিয়ে বিশ্রী সন্দেহ করছে।

সঙ্গে সঙ্গেই আমার কান দুটো যেন বনবন করে ওঠে। টের পাই মুখে রক্ত জমছে। কেমন গরম হয়ে উঠেছে চোখ-মুখ।

মা হয়তো ব্যাপারটা দেখতে পেয়েই আবার বলে উঠলেন, তোর বাবার বয়স পঁচাশি-নব্বই চলছে। এ বয়সে মানুষের তেমন কোনো বোধ থাকে না। তোর বউ শিক্ষিত মেয়ে হয়ে এমন একটা ধারণা করে কিভাবে? আর তোর বাবা যেমন বউমা বউমা বলতে অজ্ঞান, তেমন বউমার ব্যাপারে এমন কথা শুনলে ঠিক থাকতে পারবে? অতটুকুন একটা বাচ্চা মেয়ে, যার মনে মেয়ে সুলভ কোনো বোধেরও জন্ম হয়নি, এমন মেয়েটাকে নিয়ে এমন ধরনের কথা বলা খুবই অন্যায়! বলতে বলতে মা চোখে আঁচল চেপে ধরেন।

তিনি উঠে যেতেই আমি বাবুকে ডাকি, বাবু! অ্যাই বাবু! বাবুনি!

বাবু ছুটে এসে হাসিমুখে দরজায় দাঁড়ায়। বলি, আয় ভেতরে আয়। আমার সামনে বস।

সে বললো, চুলোয় রান্না চড়ানো আছে।

স্কুলে যাসনি?

আজ মহরমের বন্ধ।

তাহলে চুলো নিভিয়ে দিয়ে আয়।

বাবু হয়তো চুলো নিভিয়ে দিয়েই ফিরে আসে।

সে এলেও পিলুর বিছানায় বসে না। বলি, তোর গান শুনলাম বিটিভিতে। তোকেও দেখলাম। তোকে বাচ্চাদের সঙ্গে দিয়েছে কেন? গান তো অনেক সুন্দর গেয়েছিস! বড়দের অনুষ্ঠানে যেতে পারলি না?

আমার বয়স নাকি খুবই কম।

কত তোর বয়স?

পনেরো নাকি হবে না।

তোর জন্ম তারিখ কত জানিস?

সে মাথা নাড়ে।

তাহলে পনের হবে না বলিস কি করে?

আমি যখন এতিমখানায় আসি তখন নাকি আমার বয়স তিন-চার হবে। এতিমখানায় ছিলাম দশ বছরের মত।

বাবুর সঙ্গে কথা বলতে থাকলেও আমি মাসুমার প্রসঙ্গটা তুলতে পারি না।

মাসুমা তাকে কি বলেছে সে প্রশ্নটা তাকে করতে পারি না। বলি, আমি যদি তোর মামিকে এখান থেকে আমার ওখানে নিয়ে যাই, তাহলে কি তোর কষ্ট হবে?

কিসের কষ্ট? আমিই তো সব করি।

তোর মনে হয় না যে, আমাদের জন্য তোকে খুব খাটা-খাটনি করতে হচ্ছে? লেখা পড়া আর গানের ক্ষতি হবে না?

কেন হবে? আমার তো বেশিক্ষণ পড়তে হয় না।

তোর মামিকে কেমন মনে হয়?

ভালোই তো। কিন্তু সেদিন বলেছে, নানু ভাইয়ের সঙ্গে এত মাখামাখি না করতে। আচ্ছা মামা, মাখামাখি কি? নানুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি হঠাৎ রেগে উঠে বললেন, দূর হ!

বলি, এ জন্যে তোর মন খারাপ?

বাবু মাথা নাড়ে।

বলি, তাহলে বাবা মাকে তুই একা দেখে রাখতে পারবি?

কেন পারবো না? নানু ভাইকে আমিই তো হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম কাল রাতে। আবার সঙ্গে করে নিয়েও এসেছি।

আমার বুক থেকে যেন পাষাণ ভার নেমে যায়। বাবুর হাতে বাবা মাকে ছেড়ে মনে হয় নিশ্চিত থাকতে পারবো। বাবুর কথায় মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। তাকে বলি, আরো কাছে আয়। তোকে আদর করি।

সে বললো, না। তুমি পুরুষ মানুষ। নানু ভাইয়ের মত না।

তার কথা শুনে মনে হয় কেউ যেন আমার দু’গালে কষে দুটো থাপ্পড় লাগিয়ে দিয়েছে। যার যন্ত্রণায় ছটফট করলেও প্রকাশ করতে পারি না। আমি ভেতরে ভেতরে আহত হই। ক্ষত-বিক্ষত হয়ে ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে থাকি। আর তখনই দীর্ঘ দিন পর হঠাৎ করে টের পাই, আমার নাকের বাঁ পাশটা যেন ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

————

পূর্বে সামু -আমুতে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত। এখন আবার সম্পাদনা করে শৈলীতে পোস্ট করা হলো।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


24 Responses to উপন্যাস: পুরুষ

  1. শৈলী ফেব্রুয়ারী 21, 2011 at 5:20 অপরাহ্ন

    সুপ্রিয় শৈলার জুলিয়ান,

    পাঠকমহলে সহজ বোধগম্য করার লক্ষ্যে এবং আর্কাইভে সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষিত হওয়ার লক্ষ্যে আমরা পোস্টটির নামের পূর্বে “উপন্যাস” শব্দটি সংযুক্ত করেছি। ধন্যবাদ।

    — শৈলী টিম

  2. imrul.kaes@ovi.com'
    শৈবাল ফেব্রুয়ারী 21, 2011 at 7:39 অপরাহ্ন

    একটানা পড়াতে ইচ্ছে হয় না , তাই গল্প উপন্যাস খুব একটা পড়া হয় না । কিন্তু জেদ চেপে গেলে সারা রাত পড়তে পারি ।অনেক দিন পর সেই জেদ চাপলো , একটানে পড়লাম কিন্তু এতো আর ছাপানো পাঠ্যপুস্তক না । মোবাইল থেকে পড়তে পড়তে চোখ ঝাপসা হয়ে এলো । সাথে মনটাও ঝাপসা হলো … একটা কথা বলবো বলে
    সালাম জুলিয়ান সিদ্দিকী সালাম ।

  3. dr.daud@ymail.com'
    ড. দাউদ ফেব্রুয়ারী 22, 2011 at 10:16 পূর্বাহ্ন

    আসসালামুয়ালিকুম স্যার
    অসাধারন লিখা,এক নিমেষে পড়ে নিলাম
    আশা করি ভাল থাকবেন

  4. rabeyarobbani@yahoo.com'
    রাবেয়া রব্বানি ফেব্রুয়ারী 22, 2011 at 1:03 অপরাহ্ন

    শুরূ করলাম।একটানে পড়ার মতই গল্প।

  5. mamunma@gmail.com'
    মামুন ম. আজিজ ফেব্রুয়ারী 22, 2011 at 1:29 অপরাহ্ন

    ঝরঝরে লেখা…অর্ধেক পরে ফেলেছি..বাকী অর্ধেক পরে…..

  6. sokal.roy@gmail.com'
    সকাল রয় ফেব্রুয়ারী 22, 2011 at 1:57 অপরাহ্ন

    পড়া শুরু করলাম শেষ কবে হবে জানিনা

  7. নীল নক্ষত্র ফেব্রুয়ারী 23, 2011 at 3:37 অপরাহ্ন

    সামুতে একবার পড়েছিলাম। সময়ের এত আকালের মধ্যেও আবার পড়লাম।
    আপনার কথা শৈলীর কথা নতুন করে কিছু বলার নেই। তা ভাইয়া, কবে
    আসছে্‌ন??

  8. রাজন্য রুহানি ফেব্রুয়ারী 25, 2011 at 5:55 পূর্বাহ্ন

    আগেও পড়েছি, এখনও পড়লাম। পড়ার মধ্যে ফাঁকটুকুও ধরলাম। এবারই লেগেছে বেশ।
    ……………….
    বিশেষ সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত হওয়ায় দিলখোলা অভিনন্দন, কবি-ঔপন্যাসিক-গল্পকার জুলি ভাই।
    :rose: :rose: :rose:

  9. সঞ্চয় রহমান ফেব্রুয়ারী 26, 2011 at 1:27 পূর্বাহ্ন

    দেশে থাকতে প্রচূর পড়তাম। আমেরিকা আসার পর ব্যস্ততা ও বাংলা বইয়ের দুস্প্রাপ্যতার জন্য পড়া হয় না। অনেকদিন পর আবার বাংলায় একটি পুরো উপন্যাস পড়লাম। এককথায় চমৎকার !!!! =D>

  10. বৈশাখী ফেব্রুয়ারী 27, 2011 at 9:34 পূর্বাহ্ন

    উপন্যাসটি সত্যিই খুব ভাল লাগল। অভিনন্দন। :rose:

  11. bonhishikha2r@yahoo.com'
    বহ্নিশিখা মার্চ 3, 2011 at 6:55 পূর্বাহ্ন

    আপনার উপন্যাস পড়ে সৈয়দ শামসুল হকের ‘মার্জিনে মন্তব্য গল্পের কলকব্জা’ বইয়ের ২৬ পৃষ্ঠা থেকে উদ্বৃতি দিতে মন চাইল। কথাগুলো এ রকম :

    “গদ্যের শরীরে রয়েছে দু’টি ঘটনা— গতি এবং ভঙ্গী; আবার ভালো করে দৃষ্টি দিলে দেখব, ঐ গতিটিও ভঙ্গীরই অন্তর্গত। গদ্যের গতি এবং চাল বিষয় বুঝে পাল্টায়, কিন্তু ভঙ্গীটি অক্ষুন্ন থেকে যায়; বলতে লোভ হয়, এবং বলেই ফেলি— লেখকের গদ্য তার ভঙ্গী, ভঙ্গী ছাড়া আর কিছু নয়।”

    ভালো থাকুন, ভালো লিখুন— এই কামনা।

    • juliansiddiqi@gmail.com'
      জুলিয়ান সিদ্দিকী মার্চ 3, 2011 at 5:16 অপরাহ্ন

      খুব ভালো বলেছেন। :rose:

      শৈ শা হক হলেন লেখকদের গুরু। আমি বিচিত্রা বা কোনো একটি ঈদ সংখ্যায় হক সাহেবের এক যুবকের ছায়া-পথ পড়ে খুব বেশি আলোড়িত হয়েছিলাম। তখনই মনে হয়েছিলো এমন লেখা যদি আমি কখনো লিখতে পারতাম। তখন আমি নিতান্তই বালক। সন মনে নাই। তারপর মনে মনে হক সাহেবকে গুরু মেনে লেখালেখি শুরু করি ১১ক্লাসে উঠে। আজ পর্যন্ত ভালো লেখার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

      আপনার উদ্ধৃতি পড়ে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে-

      গুরুবাক্য শিরোধার্য।

      আমার লেখা পড়ে আপনি এমন কথা বললেন, যা আমার জন্য খুব বড় একটি বিস্ময়, তার চেয়ে বড় একটি আনন্দ হয়ে থাকবে।

      নিরন্তর ভালো থাকুন।

You must be logged in to post a comment Login