ধ্রুব তারা

গল্প : খুন

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

আমার পেশাটা বেশ অদ্ভুত। আমি খুন করি। কি চমকে উঠলেন? না ভুল শোনেননি। হ্যা, সত্যিই আমি খুন করি। যাকে বলে রীতিমত পেশাদার খুনী।

তবে ভাববেন না, আজকাল ৫০০টাকায় নিউমার্কেট হতে ভাড়া করা কোন হঠাৎ গজানো খুনী আমি। পৃথিবীর সবকিছুরই একটা আর্ট আছে। খুনের-ও আছে – অনেকটা এ্যাবসট্রাক্ট আউটসাইডার আর্টিস্টদের মতোন। আর আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমি সেই আর্ট রপ্ত করেছি, হু…বলতে পারেন অনেকটাই করেছি, আর না করলেও নিদেনপক্ষে চেষ্টা যে চালিয়েছি তা বিলক্ষণ।

এইতো কিছুদিন আগেই, আমার খুনের ব্যস্ত স্কেজিউল আর মুখোশের সমাজচারীতার মাঝে সময় করে কোন্ একটা মুভি দেখছিলাম যেন। নাক উঁচু কোনো ইংলিশ মুভি হবে…Rambo বা The Bridge on River Kwai গোছের। যাকে বলে নিরেট যুদ্ধবাজ ছবি। সে যা হোক, মুভিটা দেখতে দেখতে একটা কথা খুব মনে ধরে যায়, ‘If you are on the go, killing is as easy as breathing’. কোথায় যেন নিজের সাথে মিল খুঁজে পাই। আমিও হয়তো প্রতিটি খুনের পর ছোট্ট একটি নিঃশ্বাস ফেলি সাফল্যের, তৃপ্তির ঢেকুর তুলি নিজের অজান্তেই।

তবে মজার ব্যাপার কি জানেন? এমন একটা সময় ছিল, যখন আমি সাম্যবাদের বই পড়তাম। নাগা রেড্ডি বা চারু মজুমদারের নামে কল্কিতে দু’টো টান বা এক পেগ চোলাই-এ উচ্চকিত হয়ে বলতে চাইতাম, ‘Long live revolution, long live Russia’. হ্যা আমি বলতে চাইতাম এ সব ট্র্যাশ। আত্মস্থ করতে চাইতাম। এদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতে চাইতাম, দেখাতে চাইতাম। তবে নাহ, এসব-এর কিছুই করা সম্ভব হয়নি আমার পক্ষে। শ্রেণি সংগ্রাম শ্রেণিহীণ মানুষেরাই করতে পারে, যাদের প্রতিনিয়ত নিজের শ্রেণি ধরে রাখতেই প্রানান্ত, তারা পারে না। তারা পারে শুধু স্বপ্ন দেখতে। কে যেন বলেছিল যে, মধ্যবিত্ত বাঙালি এ্যাডভেঞ্চার প্রিয় জাতি। সামর্থ্য না থাকুক সাধ আছে ষোল আনা।

কি আমার বিপুল ট্রানজিশনে অবাক হচ্ছেন? সে আর নতুন কি! আমিও হই মাঝে মাঝেই। আবার ভাবি, কে জানে হয়তো সেইদিনও আমার মাঝে এমন-ই খুনে বীজ প্রোথিত ছিল। শুধ সুপ্ত অবস্থায়, এই যা পার্থক্য। সবার মতো সেদিন হয়তো আমিও বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার আনন্দে জুলুজুলু চোখে তাকাতাম। সবার সাথে আমিও হয়তো কোন শিল্পপতির মৃত্যুতে হস্তমৈথুনের স্বাদ খুঁজতাম। আসলে খুন হয়তো আগের মতোই আছে, পাল্টেছে শুধু রূপ। আর যদি রূপ না পাল্টে আমিই শুধু আমূল পাল্টে যাই তাতেও বা সমস্যাটা কোথায়? কথায় বলে ‘Opposite attracts’ হা…হা…হা…হুম Opposite did attract me a lot.

ধ্যাৎ বড্ড বকবক করছি আজ। ওটাতো কবি-সাহিত্যিকের কাজ। কোন নির্জণ জঙ্গলে গিয়ে গাছের মাঝে নারীর স্তন-নিতম্ভ খুঁজবে আর পাতার পর পাতা কালি দিয়ে নষ্ট করবে। আমার পেশা হল খুন। ভাল হোক, খারাপ হোক কাজ কাজ-ই। আর এ পেশায় আসা কিন্তু একেবারে চাট্টিখানি কথা নয়। রীতিমত প্রতিযোগিতা আর অধ্যবসায়ের পর পেয়েছি, Certificate of License to Kill. তবে তখনো বুঝিনি যে এটা আসলেই খুনে ব্যবহার করা যাবে। বাবাকে একগাল হাসি নিয়ে বুক ফুঁলিয়ে বলেছিলাম, Did I make you proud? বাবা সেদিন কিছু বলেননি, তাঁর চেখে শুধু দু’ফোটা জল ছিল। তিনিও হয়তো সেদিন জানতেন না, ওটাকে যে Certificate of License to Kill বানানো যাবে। তার ছেলে যে, Certified Professional Killer হতে যাচ্ছে। বা হয়তো জানতেন বা না জানলেও বুঝতেন!

নস্টালজিয়া…নস্টালজিয়া…নস্টালজিয়া…মধ্যবিত্ত বাঙালির অহংকার আর আমার মতো নব্য মধবিত্তোতীর্ণ বাঙালির হয়তো সম্পদ। সে যাই হোক, এখন নষ্ট লজিকে নষ্টালজিক হবার সময় আমার নয়। এখন আমার সময় খুন করবার। শুনেছি আমার ভিক্টিমরা বাইরে লাইনে দাড়িয়ে গেছে। দেখুনতো কথার চোটে বলাই হয়নি যে, আমার ভিক্টিমরা নিজে থেকেই আমার কাছে খুন হতে আসে। কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ বাধ্য হয়ে।

আমি আর কথা বলতে পারছি না। খুন-রক্ত-ছুড়ি-কাঁচি আমাকে মোহাবিষ্ট করে তুলছে। বছরের অভ্যাসের পরেও কেমন এক অস্থিরতা জেঁকে বসতে চায়। প্রথম যৌন অনুভূতির মতোন নিশ্বাস গাঢ় হয়ে ওঠে একই সাথে ভয় আর আনন্দে। কেমন জানি তেঁতিয়ে উঠি। আমার কাঁপা হাতে ছোঁয়ায় টুংটাং বেজে ওঠা বেলে, লুঙ্গি পরা জবথুথু ভদ্রলোক ঢুকলে মিষ্টি হেসে তাকে এক চৌকোণা কার্ড ধরিয়ে দিয়ে বলি,

“ওটায় আমার ব্যক্তিগত চেম্বারের ঠিকানা আছে, বিকেলে দেখা করুন…”

[প্রতিটি গল্পের সাধারণত একটি প্যাটার্ন থাকে এরকম যে, শেষে বা শুরুতে ডিসক্লেইমার দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয় কোন ব্যক্তি বা গ্রুপকে উদ্দেশ্য করে তা লেখা হয়নি। আমারো ভীষণ ভাবে ইচ্ছে করে সেরকম কিছু একটা জুড়ে দেই। কিন্তু শুধু শুধু মিথ্যে বলে লাভ-ই বা কি! আমার গল্পটা অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট গ্রুপকে ইঙ্গিত করে লেখা। সেই গ্রুপের বোকাসোকা একটা দল এখনো খুনী হয়ে উঠতে পারেনি বলেই হয়তো আমরা সুস্থ্য হয়ে উঠি শত অসুস্থতার পরেও। আর, গ্রুপের আরেকটি গোষ্ঠী নির্বিচারে করে চলছে শান্ত মাথায় হত্যা। তাদের না আছে জবাবদিহিতা, না আছে আমাদের আমজনতার টাকায় তাদের হাতে তুলে দেওয়া Certificate of License to kill এর প্রতি কোন দায়িত্ববোধ। জানি খুনী হওয়া কঠিন নয়, কিন্তু মানুষ হওয়া কি এতটাই শক্ত?]

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


4 Responses to গল্প : খুন

  1. juliansiddiqi@gmail.com'
    জুলিয়ান সিদ্দিকী আগস্ট 26, 2010 at 7:01 অপরাহ্ন

    খুনী চোর গুন্ডা-বদমাশ হওয়ার চেয়ে মানুষ হওয়া খুবই শক্ত। তার চেয়ে আরো শক্ত মনুষ্যত্ব ধরে রাখা।

  2. রিপন কুমার দে আগস্ট 26, 2010 at 8:39 অপরাহ্ন

    ভালো লাগল, তবে নামকরনের টা ভিন্ন হতে পারত।

  3. imrul.kaes@ovi.com'
    শৈবাল আগস্ট 26, 2010 at 11:18 অপরাহ্ন

    ভূমিকায় যতো ভূমিকা ছিল মনে হলো শেষটা ততো তাড়াতাড়ি শেষ হলো ,তবে যদি বলেন এটাই অনুগল্পের ব্যাকরণ তখন বলবো বেশ বেশ …

  4. mahirmahir3@gmail.com'
    আহমেদ মাহির আগস্ট 27, 2010 at 1:36 অপরাহ্ন

    ভিন্ন ধাঁচের লেখা । লেখায় আধুনিকতার ছাপ বর্ণনাশৈলী সুস্পস্ট করেছে ।

    ভালো লেগেছে । শুভকামনা ।

You must be logged in to post a comment Login