নীল নক্ষত্র

নির্বাক বসন্ত-৬

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page


দেশ স্বাধীন হলো। নতুন দেশ। জাহিদের বাবা তার ছুটির কাগজ পত্র নিয়ে ঢাকায় এলেন। সাথে ঢাকা শহর দেখার জন্য জাহিদও এলো। জাহিদের মামার ধানমন্ডির বাসায় উঠল। পরদিন তার বাবা সেক্রেটারিয়েটে গেলেন কি করা যায় সেই উদ্দেশ্যে। ভাগ্য ভাল সেক্রেটারিয়েটে তার কাগজ পত্র দেখে পর দিন থেকে কাজে জয়েন করতে বলে দিল। বাবার চাকরী হয়ে গেল। জাহিদ ২/৪ দিন নতুন দেশের রাজধানী শহরে বেড়িয়ে বাড়ি ফিরে এলো। বাবা ঢাকায় রয়ে গেলেন। ফেরার দিন বাবা বলে দিলেন দুই এক মাসের মধ্যে একটা বাসা পেলে তোমাদের নিয়ে আসব, কলেজে ভর্তি হতে হবে। মনযোগ দিয়ে পড়াশুনা করবে বেশি ঘোরা ঘুরি করবে না।

সময় চলে যায়। আকাশে তারা জ্বলে, চাদ ওঠে জোসনা ছড়ায় আবার সুর্য ওঠে। শীতের সোনালি বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়। ইছামতি নদী দিয়ে পানি পদ্মায় গিয়ে মিশে আবার সেই পানি পদ্মা থেকে মেঘনা হয়ে বঙ্গোপ সাগরে গিয়ে মহা মিলনের জন্য মিশে যায়। গ্রামের মেঠো পথ ধরে ঝাকা মাথায় হাটুরেরা হাট থেকে নানা সওদা মাথায় নিয়ে বাড়ি ফিরে, জাহিদ পথের পাশে হালটে বসে বসে চেয়ে থাকে। কলই ক্ষেতে নীল ফুল ফোটে, সীম ধরে আবার সেগুলি ফসল হয়ে উঠে। কৃষকেরা মাথায় করে বাড়ি নিয়ে আসে। সোনালী গম ক্ষেতের আড়ালে আবার সুর্য তার রক্তিম আভা ছড়িয়ে দিগন্তে হারিয়ে যায়। দোয়েল, শালিক, ঘুঘু পাখি ডেকে ডেকে বিষন্ন দুপুরের মায়া ছড়িয়ে দেয়। এ ভাবেই প্রকৃতি তার অস্তিত্ব জানিয়ে দেয়, আমি আছি। সবাই তার নিজস্ব ভঙ্গিতে চলতে থাকে কিছুই থেমে থাকে না। জাহিদের জীবনও থেমে থাকে না। পারুর সাথে নিয়মিত না হলেও প্রায়ই দেখা হয়। ক্ষনিকের জন্য চারটি চোখে কি যেন এক দুর্বোদ্ধ কথা হয়।

এক দিন সন্ধ্যায় মাঠ থেকে ফিরে জাহিদ দেখল বাবা এসেছেন। রাতে খাবার পর বাবা বললেন ঢাকায় বাসা পেয়েছেন। তোমরা সবাই আগামী শুক্রবারে চলে এসো। একটু কাগজ আন আমি ঠিকানা লিখে দিই। জাহিদ উঠে তার রাফ খাতা আর একটা কলম এনে বাবার হাতে দিলে বাবা ঠিকানা লিখে জাহিদকে বুঝিয়ে দিলেন গাবতলি বাস স্ট্যান্ডে নেমে কি ভাবে যেতে হবে বুঝিয়ে দিলেন। জাহিদের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞ্যেস করলেন, কি চিনে আসতে পারবে না কি আমি আসব?
না, আপনাকে আসতে হবে না, আমি যেতে পারব।

ঢাকায় যাবার দিন ঠিক হবার পর থেকেই জাহিদের মনটা বিষন্ন, কি জানি কি এক আশঙ্কা। শীতের শেষে প্রকৃতিও যেন জাহিদের মনের সাথে যোগ দিয়েছে। পারুর বোন যুইএর সাথেও তেমন কথা জমে উঠেনা, মালেকের সাথেও খুব একটা দেখা সাক্ষাত নেই বললেই চলে। গাছের সবুজ পাতা সেই কবেই ঝরে গেছে মাঠ ঘাটের সবুজ তাজা ঘাস গুলিও যেন শুকিয়ে হলুদ বিবর্ন রূপ ধারন করছে। বাশ ঝারের পাতা গুলি ঝরে গিয়ে কাঠির মত দাঁড়িয়ে রয়েছে। চারি দিকেই কেমন যেন একটা শুকনো মলিন ভাব। সুর্য ডোবার আগে দিগন্তের রক্তিম আভার সাথে গরু বাছুরের পায়ের ধুলো, রাখালের পায়ের ধুলো, বাড়িতে বাড়িতে কলই গম মাড়ানর ধুম। পিয়াজ খেতের ফুল গুলি শুকিয়ে বিবর্ন হয়ে আসছে কখন যেন কৃষক এসে তুলে নিয়ে যাবে। বিলের ধারে সকাল বে্লা বক পাখি ধ্যানে মগ্ন থাকছে না। রোদের তেজ যেন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তাহলে কি ওরাও জাহিদের মনের কথা বুঝতে পেরেছে?
যাবার আগে সন্ধ্যা বেলা  মালেকদের বাড়ি এলো। মালেক বাড়ি নেই, যুই বেরিয়ে এসে জিজ্ঞ্যেস করল কিরে, তোরা তাহলে কালই চলে যাবি?কখন যাবি?আয় ভিতরে আয়। আজ আমাদের খৈ বানিয়েছে, হাট থেকে বাবা দৈ এনেছে একটু খেয়ে যা। ভিতরে নিয়ে বসতে বলে রান্না ঘরের দিকে চলে গেল। দরজার পাশে এসে দাড়াল পারুল।

যুই একটু পরে এক হাতে দৈ খৈ এর পেয়ালা আর এক হাতে এক গ্লাশ পানি এনে জাহিদের সামনে টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল নে খা। আবার কবে আসবি না আসবি তার ঠিক নেই। তোদের বাড়িতে তাহলে কেউ থাকবে না সবাই চলে যাবি?
আর কে থাকবে বল।
বাবা মনে হয় আমাকে মানিকগঞ্জের কলেজে ভর্তি হতে দিবে না, কাজেই আমার পড়া শুনা বন্ধ। তুই কিন্তু বাবাকে বলে যাবি অন্তত তুই ঢাকায় যে কলেজে ভর্তি হবি মালেককেও যেন সেখানে ভর্তি হতে দেয়।
এসব কথার কিছু জাহিদের কানে ঢুকছে কিছু ঢুকছে না। তার মন রয়েছে দরজার ওপাশে। ও কি একটু ভিতরে আসতে পারছে না?কোন রকম খৈ খেয়ে যুঁইকে বলল মালেক এলে ওকে রাতে দেখা করতে বলবি। বলেই বের হয়ে বাড়ি চলে গেল।(চলবে)

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


2 Responses to নির্বাক বসন্ত-৬

  1. রাজন্য রুহানি মার্চ 24, 2011 at 4:15 পূর্বাহ্ন

    :rose: %%-

You must be logged in to post a comment Login