হরিপদ কেরানী

অণুগল্পঃ এনকাউন্টার

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

রাত্রির তৃতীয় প্রহর। রফিক অপক্ষো করছে। যে কোন সময় তাঁকে দৌঁড়াতে বলা হবে। আশ্বিনের শুরুর এই সময়টা দারুণ এক সময়। হালকা হালকা শীত। সামান্য কুয়াশা। গড়াই নদীর ফুরফুরে হাওয়া মনটা মাঝে মাঝে উদাস করে দেয়। জীবনটাকে মনে হয় খুব সহজ এবং আনন্দময়। “লালবই” এর তত্ত্বগুলোর ঠিক যেন বিপরীত।

রফিকের হাতে সময় খুব বেশী নেই। এই মুহূর্তে সে কিছু সুখ স্মৃতি মনে করতে চাচ্ছে। সুখম্মৃতি যা আছে সবই তো শৈশব আর কৈশোরে। তারুণ্যের সবটাই তো রয়ে গেছে লাল বইয়ের অক্ষরে অক্ষরে। লাল বই, লাল সালাম, ভুল বিপ্লব, ভুল তত্ত্ব-অবশেষে ভুল পথ। জীবনটাই চলে গেল ভুলে ভুলে। মা, তোমার মুখটা খুব মনে পড়ছে। তোমার মৃত্যুর খবর পেয়েও তোমার মুখটা শেষবারের মতো দেখতে যেতে পারিনি। হাই কমান্ডের নির্দেশ পালন করেছি। বড় করে দেখেছি লাল বইকে। তোমার চেয়েও।

শৈশবের পাঠশালা, গড়াই নদীতে ঝাঁপাঝাঁপি, বিকেল বেলা বাবার তর্জনী ধরে হাটে যাওয়া – কতই না সরল, সুন্দর ছিলো জীবন! তারুণ্যে এসে পরিচয় হলো মিলির সঙ্গে। ভালোবাসা, স্বপ্ন আর দাবিতে ভরা একজোড়া চোখ। এখনও চোখ বুঁজলে ঠিক মনে পড়ে। তার সমস্ত চাওয়াকে উপো করে আমি ভালোবেসেছিলাম লাল বইকে। দেশে বিপ্লব হবে। সব মানুষ হবে সমান। না খেয়ে থাকবে না কেউ। গরীব কৃষককে করতে হবে না বর্গা চাষ। মিলির ভালোবাসা তো এসবের কাছে অনেক তুচ্ছ!

রফিক অপেক্ষা করছে সেই বিশেষ নির্দেশের। যে কোন সময় নির্দেশ চলে আসবে। সে এখন ভাবছে তার বাড়ীর কথা। কতকাল, কত বছর সে বাড়ী যায়নি। চৌচালা ঘর, ঝকঝকে উঠোন, উঠোনের শেষ সীমানায় খড়ের পালা, তার পাশে গোয়াল ঘর, একটা লাউয়ের মাচা- আহা! একেবারে ছবির মতো এক বাড়ী। তাঁর খুব ইচ্ছে করছে বাড়ীর উঠোনে পাটি বিছিয়ে শুয়ে শুয়ে শীতের রাতের কালপুরুষকে খুঁজতে!

রফিকের চিন্তায় ছেদ পড়ে। নির্দেশ এসে গেছে। কিন্তু কোন্ দিকে দৌঁড়াবে সে বুঝতে পারছে না। চারদিকই তো ফাঁকা। কিন্তু এলাকাটা তাঁর চেনা। তাঁর বাড়ী কোনদিক তাও সে জানে। সে বাড়ীর দিকেই দৌঁড়াতে থাকে। এটাই মানুষের চিরন্তন টান। নদীর স্রোতের মতো স্বভাবিক স্বভাব। কিন্তু লাল বই তাঁকে জীবনের বড় একটা অংশ তাঁর বাড়ীর বিপরীত দিকে ছুটিয়েছে।

আমন ধানের ক্ষেতের উপড় দিয়ে রফিক ছুটছে। সে জানে পেছনে কি ঘটবে। কিন্তু সে তাকাতে চাচ্ছে না। তাঁর পেছনে কালো পোশাকের কিছু মানুষ রাতের কালো অন্ধকারে কালো রাইফেল তাক করে আছে তাঁর দিকে। অনেক বছর পর সে এখন মায়ের শরীরের গন্ধ পাচ্ছে। আশ্বিনের রাতের এই তৃতীয় প্রহরে মায়ের কোলে গুটিশুটি মেরে শুয়ে সে এখন মায়ের কাছ থেকে ওম নেবে। আলস্যমাখানো আনন্দময় ওম!

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


11 Responses to অণুগল্পঃ এনকাউন্টার

  1. নীল নক্ষত্র এপ্রিল 15, 2011 at 8:23 পূর্বাহ্ন

    কেরানী বাবুর লেখা ভালই লাগে। কাম কাজ ফালাইয়া লেখালেখি করলেতো মনে যোগ দিয়াই লেখা যায়।
    ধন্যবাদ দাদা। :rose:

    • hafij2005@gmail.com'
      হরিপদ কেরানী এপ্রিল 15, 2011 at 4:55 অপরাহ্ন

      সব কাজ ফালায়া লেখালেখি করতে পারলে তো খুবই ভালো হতো। সেই কপাল কি আমাদের আছে? ধন্যবাদ দাদা!

  2. mamunma@gmail.com'
    মামুন ম. আজিজ এপ্রিল 15, 2011 at 8:31 পূর্বাহ্ন

    আমাদের এলিট বাহিনী যখন কোন নিরীহ যুবকের উপর গুলি চালায়, যুবকটির অনুভূতি কি গুলি খাওয়ার আগে এমনই হয়?

    সুন্দর আপনার লেখার ধরন। সুন্দর বেশ।

    কিন্তু পাঠক কম দেখে আমি শৈলারদের উপর রুষ্ট।

    • hafij2005@gmail.com'
      হরিপদ কেরানী এপ্রিল 15, 2011 at 4:53 অপরাহ্ন

      বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করা খুবই অন্যায় কাজ। এটা বন্ধ হওয়া উচিৎ। মন্ত্যবের জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।

  3. imrul.kaes@ovi.com'
    শৈবাল এপ্রিল 15, 2011 at 9:21 পূর্বাহ্ন

    হরিপদ’দা , কেমন আছো গো ! অনেকদিন পর শৈলীতে এলে ।লেখাটাও সুন্দর হয়ছে খুব ।

    • hafij2005@gmail.com'
      হরিপদ কেরানী এপ্রিল 15, 2011 at 5:04 অপরাহ্ন

      টানা দুই মাস খুব ঝামেলায় ছিলাম। লেখালেখিও করিনি। হঠাৎ গতরাত্রে এই গল্পটা লিখলাম। তারপরই প্রকাশ করে দিলাম। ইদানিং মন ভালো নেই।

      ভালো থাকবেন দাদা। মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ!

  4. চঞ্চল এপ্রিল 15, 2011 at 9:35 পূর্বাহ্ন

    নিজেকে ঐ চরিত্রে কল্পনা করে বার বার শিউরে ওঠেছি ।

    দারুন মর্মস্পর্শী এবং ভাল লিখেছেন।

    • hafij2005@gmail.com'
      হরিপদ কেরানী এপ্রিল 15, 2011 at 4:57 অপরাহ্ন

      আমি নিজেও আপনার মতো করে ভেবেছিলাম এবং আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে এসেছিলো। খুবই ভয়াবহ একটা ব্যাপার।

  5. রাজন্য রুহানি এপ্রিল 15, 2011 at 4:01 অপরাহ্ন

    :-bd
    লা-জবাব। অতুলনীয়।
    %%- :rose: %%-

  6. rabeyarobbani@yahoo.com'
    রাবেয়া রব্বানি এপ্রিল 16, 2011 at 2:04 পূর্বাহ্ন

    অসাধারণ গল্প । চমত্‍কার লেখনী ।

  7. রিপন কুমার দে এপ্রিল 18, 2011 at 4:10 অপরাহ্ন

    এক অদৃশ্য শক্তি অনেক যত্ন করে একেকটা মানুষ তৈরি করে। শুক্রানু আর ডিম্বানুর মিশ্রনে গড়া ভ্রুন বড় হয়। কত আয়োজনই না হয়, এই ভ্রুনকে সুরক্ষিত রাখতে।তাকে রক্ত দেয়া হয়, অক্সিজেন দেয়া হয়। অতি যত্নে তার শরীরের একেকটা অঙ্গ তৈরি হয়।প্রথমে হাড়, কদিন পর ফুসফুস, তারপর খাদ্যনালী! এত যত্নে গড়া একটি জিনিস ঠুস করে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলা খুব অযোচিত এবং মর্মান্তিক।

    তবে, আমি ব্যক্তিগতভাবে এইসব ব্যাপারে খুবই লিবারেল। বৃহত্তর দৃষ্টিকোন থেকেই সবকিছু চিন্তা করি। র‍্যার মূলত আমেরিকার ডিফেন্স বোর্ডের প্রদান করা আইডিযা। বর্তমানে আমেরিকাতে এটার সাক্সেসফুফ ইম্লিমেন্টশান। কিন্তু আমি প্রথমেই বলব, এটার প্রয়োগ তথনই করতে হবে, যখন সন্ত্রাসী সঠিকভাবে চিন্থিত করতে পারা যাবে। আমেরিকাকে যে প্রমিটেন্সি টা অনেক হাই। কিন্তু আমাদের দেশের লাগাতার ভুল সন্ত্রাসী চিন্থিতকরন নীতি র‍্যাবের পুরো ব্যাপারটিকেই রাষ্ট্র কর্তৃক গনহত্যার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাই হয় সন্ত্রাসী চিন্থিতকরন নীতি যথাযথ করতে হবে, অথবা ক্রসফায়ার পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। একেকটা মানুষ একেকটা স্বপ্ন, এককটা ভবিষ্যৎ। এখানে বিচ্ছিন্ন ঘটনার দোহাই দিয়ে একেটা স্বপ্নকে মেরে ফেলার অধিকার কারো নাই, কোন রাস্ট্রের তো না্ ই। আর মানুষ ক্যান্সার জীবানু না। হিউম্যান বিং কে ট্রিট করতে হবে ভিন্নভাবে, অনেক যত্ন নিয়ে, অনেক ভালবাসা নিয়ে। আমার কাছে যা মনে হয়, র‍্যাব থাকুক, কিন্তু যদি না “সন্ত্রাসী চিন্থিতকরন” সঠিকভাবে করতে পারা না যায়, তাহলে বিনা বিচারে ক্রসফায়ারকে নিষিদ্ধ করা হোক। একটি সিঙ্গেল স্বপ্নের মৃত্যুও যেন না হয়!

You must be logged in to post a comment Login