কুলদা রায়

ও টগর, ও কুক্কুট…

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

প্রথম পর্ব

বরইগাছটার গায়ে সামান্য আগুনের তাপ লেগেছে। কয়েকটি ডাল শুকিয়ে গেছে। বাঁকলের একটি অংশ কালো। দূর থেকে বোঝা যায় না এই ডালে আগুনের আঁচ লেগেছিল। বরই ধরেছে প্রচুর। গোল গোল। দাঁতে কাটলে কচ করে শব্দ হয়। টক এবং মিষ্টি।

বরইগাছটির নিচে একটি বাঁধানো চবুতরা। সবাই জামাকাপড় কাঁচে। মা কাঁচে না। এক বালতি জল এনে গাছটির গোড়ায় খুব ধীরে ধীরে ঢেলে দিল। পুড়ে যাওয়া বাকলে একটু তেল-সিদুঁর মেখে দিল। ঝির ঝির করে বরই পাতা কাঁপছে।

পুকুরঘাটে দাদু ততক্ষণে মাথায় পাগড়ির মত করে গামছা বেঁধে ফেলেছে। দাদা পুকুরে ডুবিয়ে ডুবিয়ে পাক থেকে তুলে আনছে কাঁসার থালা, ঘটি, বাটি। কমণ্ডলুটি খুঁজে পেতেই দাদু খুশি হয়ে হয়ে বলে উঠল, অ বৌমা, তোমার কোষাকুষি আইয়া পড়তেছে। আর বেপদ নাইক্যা।

ঠিক তখনি ঠাম্মা দোতলার বারান্দায় একা একা ঘুরছে। কার্নিশে মৌচাক  বসেছে। পোকাগুলো ভনভন করে উঠল। আর ঠাম্মা তারস্বরে ডেকে উঠল,কুকরু কু। কুকরু কু। কু কু কুউউউউ।মা তখন ঘুরে ঘুরে  নিমগাছের গোড়ায় জলদান করছে। বেলগাছটির গোড়ায় নিচু হয়ে প্রণাম ঠুকছে। নারিকেলগাছগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কান্না লুকোচ্ছে। শিউলিগাছগুলোতে স্বর্ণলতা ঢলে পড়েছে। জবা পাতার উপর থেকে ছাড়িয়ে দিচ্ছে মাকড়সার জাল। লেবুগাছটি শুকনো হয়ে চেয়ে আছে। ছল ছল চোখ।

হারুণ চাচা এলেন কাঁঠালকাঠের পিঁড়িটা হাতে করে। বেশ ভারী। পোড়া ঘরটির ভেতর থেকে এই অক্ষত পিঁড়িটি তিনি সোর করে রেখেছিলেন। হারুনকাকী লম্বা ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে দুটো মুরগীর ছাও। দাদু গদগদ গলায় বললেন, বৌমা, তোমার লাইগা গড়িয়াহাটের কাপড় আনছি একখান। লোচনের মার কাছে আছে।

ঠিক তখনি ঠাম্মা দোতলার বারান্দায় একা একা ঘুরছে। কার্নিশে মৌচাক  বসেছে। পোকাগুলো ভনভন করে উঠল। আর ঠাম্মা তারস্বরে ডেকে উঠল, কুকরু কু। কুকরু কু। কু কু কুউউউউ।

বাসকগাছের পাশে গন্ধভাদুল। মাটিতে ঝুঁকে পড়ে ঝোঁপালো হয়ে গেছে। একটি আমগাছ দীর্ঘ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ডালপালা থেকে ঝুলে পদ্মগুলঞ্চের লতা। পাশে তেলি কদম। মাহবুব ভাইয়ের আম্মা বড়চাচী এক টিন মুড়ি নিয়ে এলেন। সঙ্গে রুম্মী কলা আর নলেন গুড়। মার হাত ধরে বলে উঠলেন, বিনা আইছ! বিনা আইছ!

বছরখানেক পরে দেখা হচ্ছে। মা নিচু হয়ে প্রণাম করেছে বড়চাচীকে। মাহবুব সুপুরীগাছের উপরে কী একটা পাখি ডাকতে শুরু করেছে—হিট্টি হিট্টি হিট্টি। মাহবুব ভাই এখনো ফেরেনি। বড়চাচী আর মা কাঁদছে। মাহবুব ভাই বেশ লম্বা চওড়া মানুষ। এ বাড়ির পেয়ারাগাছ থেকে পড়ে ছেলেবেলায় তার বাঁ চোখের নিচে কেটে গিয়েছিল। সেই কাটা দাগটিকে মনে করে দুজন কাঁদছেন। তাঁর ফুরফুরে চুলের কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছেন। আর মাথার উপরে সেই পাখিটা হিট্টি হিট্টি করে ডাকছে। বড়চাচী কাঁদতে কাঁদতে কলমা তৈয়্যেবা বলছেন– লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। মা মাথায় কাপড় দিয়েছে। বড়চাচী কলেমা তৌয়্যেবা বলতে বলতে পুকুরপাড়ের দিকে তাকাচ্ছেন। গাছপালার ফাঁক দিয়ে দূরের বটতলাটির দিকে তাকাচ্ছেন। গোহাটার পথের দিকে তাকাচ্ছেন। এই পথ দিয়ে লোকজন যায়–এই পথ দিয়ে লোকজন ফিরে আসে। ছোট বোনদুটি মন্দিরের সামনে খোলা উঠোনে কাজলী ফড়িয়েংয়ের পেছনে ছুটতে লেগেছে। ফড়িংটা একটু উপরে ওঠে। আবার নীচু হয়। দুরে যায়। আবার কাছে আসে।

দাদা পুকুরে নেমেছে। জলের ভিতর থেকে কী একটা ঘটি ছুড়ে মারল উপরে। ছিটকে পড়ল জলকাদা। ঘুরতে ঘুরতে ঘটিটা বরই গাছের ডালে আটকে গেল। নড়ে না- চড়ে না—পড়ে না। টপ টপ করে কাদা আর জল ঝরে ঝরে পড়ছে। দাদু নীচ থেকে ভাল করে দেখতে দেখতে বলে উঠল—দুগ্গা দুগ্গা। চোখ নাই। নাক নাই। কান নাই। হে হে করে বেরিয়ে আছে দাঁত। দুটো দাঁতে পোকা ধরা। আর আক্কেল দাঁত মরনকালেও ওঠে নি। করোটির কপালে একটি ছিদ্র। ছিদ্র পথে গল গল করে কাদাজল বেরিয়ে আসছে। দোতলার বারান্দা থেকে ঠাম্মা মন্দিরের সামনে নেমে এসেছে। দেওয়াল ঘেষে একটি টগরগাছ উঁকি দিচ্ছে। তাই দেখে ঠাম্মা চেঁচিয়ে উঠেছে—কুকরু কু। কুকরু কু। কু কু কু।

এ সময় বাড়ির সামনে একটি রিক্সা থেমেছে। নামলেন কিরণ পিসেমশাই। তার মুখে লম্বা দাড়ি। পিসিমা কলকল করতে করতে বাড়ির উঠোনে পা রাখল। পিছনে বাচ্চুদা, বিশুদা,মানিক, ম্যাগা এবং মীরা। রাস্তা থেকে চুনু পিসি ডাকতে শুরু করেছে—মা, অ মা।

দালানের দরোজা খুলে মেজ ঠাম্মা হাউ মাউ করতে বেরিয়ে এসেছে। বলে, তোরা আছিস। বাঁইচা আছিস।

বাচ্চুদা গান ধরেছে দালানের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে–পিঁয়া পিঁয়া ডাকে । বিশুদার এই গানটি পছন্দ নয়। বিশুদা হাঁক পেড়ে বলে , থাম দাদায়। মীরা ধর তো গান—

–কোনডা ?

–কোনডা আবার। বলেই বিশুদা হাত ঘুরিয়ে নেচে নেচে গেয়ে উঠল, মেরা জুতা হ্যায় জাপানি। মীরা একটু চড়া গলায় গানটি ধরল। আর বিশুদা লাফিয়ে লাফিয়ে নাচছে। বাচ্চুদা মাথায় একটি গামছা বেঁধে নিয়েছে।তারপর একটু অপেক্ষা করে দীর্ঘ গলায় ধরল গান—

হাওয়া মে উড়তা যায়ে

মেরা লাল দোপাট্টা মল মল

এইবার পাঁচ ভাইবোনে ঘুরে ঘুরে নাচে আর গান গায়। গাইতে গাইতে নাচে। আর নাচতে নাচতে গান গায়। দোতলার কার্নিশে একটি চাক থেকে মৌমাছিগুলো প্রথমে কেঁপে উঠেছে এবং ভো ভো করে উড়তে লেগেছে। তাই দেখে মেজ ঠাম্মা চেঁচিয়ে উঠেছে-তোরা ভিতরে আয়। ভিতরে আয়। মোমাছি চেইতা গেছে।

ঠিক এ সময়ে দাদা পুকুরের জলের ভিতর থেকে কী একটা ঘটি মতো ছুড়ে মারল উপরে।  ঘটি থেকে ছিটকে পড়ল কাদা। ঘুরতে ঘুরতে বরইগাছের ডালে আটকে গেল। গাছ থেকে ঘটিটা পড়ে না। ভেতর তেকে টপটপ করে কাদা আর জল ঝরে পড়ছে। দাদু নিচ থেকে ভাল করে দেখতে পেয়ে বলে উঠল, দুর্গা। দুর্গা। ওটা ঘটি নয়। মড়ার খুলি। চোখ নাই। কান নাই। হে হে করে দাঁত বেরিয়ে এসেছে। খুলির কপালে একটি ছোট ছিদ্র। গলগল করে জল কাদা ছিদ্র পথেও বেরিয়ে আসছে। দাদু পরে নামাবে ভেবে রাস্তার দিকে তাকাল।  দোতলার বারান্দা থেকে ঠাম্মা মন্দিরের সামনে নেমে এসেছে। দেয়াল ঘেষে একটি টগরগাছ উঁকি দিচ্ছে। তাই দেখে জোরে জোরে চেঁচিয়ে উঠল, কুকরু কু। কুকরু কু। কুকরু কু। কু কু কু।

একটা রিকশা থেমেছে বাড়ির সামনে। কিরণ পিসেমশাই হাসি হাসি মুখে নামছেন। মুখে লম্বা দাড়ি। পিছনে পিছনে কলকল করতে করতে পিসিমা। ছুট্টে আসছে বাচ্চুদা, বিশুদা, মানিক, ম্যাঘা এবং মীরা। রাস্তা থেকেই চুনু পিসি ডাকতে শুরু করেছে, অ মা। মা। অ মা, মা।

দালানের দরোজা খুলে মেজ ঠাম্মা হাউমাউ করতে করতে বেরিয়ে এলো। বলল, তোরা আইছিস! তোরা আইছিসগো মা!

মা ডাল চড়িয়ে দিয়েছে। বড় চাচী রায়েন্দা চাল দিয়ে গেছেন। হাড়িতে টগবগ করে ফুটছে। খবর পেয়ে বিমল কাকা এসেছেন। সিঁড়িতে বসে খুরে ধার দিতে দিতে অবাক হয়ে পিসে মশাইকে দেখছে। পিসিমশাইয়ের চোখে সুরমা টানা। গৌরবর্ণ গা। দক্ষিণাঞ্চলের রাজবেশ। দাদু উঠোনে খুরপি দিয়ে ভাদলা ঘাস বাছছে। আর পিসেমশাই গব গব করে বলছেন, বোজজেন কাকা, মেলিটারি আইবে শুইনা কলমা পইড়া ফেলাইলাম। আম্মুয়া থেইকা ধ্বলা হুজুর আইছেলেন। তিনি কইলেন, আপনের নামডা কি রাখবেন রায়মুশাই? শাহজাহান।

পিসেমশাই গলাটা বিমলকাকার ঝকঝকে খুরের নিচে পেতে দিয়েছেন। বলছেন, আপনেগো মাইয়ার নাম—মমতাজ। তাজ মুহলের মমতাজ মহল। ফটাফট দাড়ি রাইখা ফেলাইছি। মসজিদে থাহি। আর আল্লা আল্লা করি। আপনের বড় নাতির নাম দারোশিকো। মাইজাটা—আলমগীর।  সুজা আর মুরাদও আছে।

বিমলকাকা পিসেমশাইয়ের কানটা চেপে ধরেছেন। হালকা ভারে একটু একটু করে বাঁগালের দাড়ি কামিয়ে দিলেন। আর বার বার খুরে ধার দিতে লাগলেন। নয় মাসের পুরনো দাড়ি। ফেলতে সময় লাগছে। পিসেমশাই মীরাকে ডেকে বললেন, অ মা মীরা, তর নামডা য্যান কি?

–জাহানারা।

দাদু ঘাস বাছতে বাছতে থেমে গেল। ডিএল রায়ের শাহজাহান নাটকের কথা মনে পড়ে গেছে। শাহজাহানের পার্টটা বলতে পারলে তার বেশ ভাল লাগত। মীরা ঘরের মধ্যে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান ধরেছে—নূরজাহান, নূর জাহান/ সিন্ধু নদীতে ভেসে এলে মেঘনা নদীরও পাড়ে। বড় মিষ্টি সুর। মেঘনা নদীর পাড়ে এলে ইরানী গুলিস্তান। চুনুপিসি ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা তসবী বের করে বাগানে ছুড়ে ফেলল। লম্বা করে একটা শ্বাস ফেলল। তার ফ্যার কাটতে শুরু করেছে। মা ডালে ফোঁড়ন দিয়েছে। ফোঁড়নের বাস ছড়িয়ে পড়েছে চরাচরে। মীরা গাইছে—নার্গিস লালা গোলাপো আঙুর লতা, শিরী ফরহাদ সিরাজের উপকথা…।

বিমলকাকা ফস করে জিজ্ঞস করলেন, অ জামাইবাবু, দ্যাশতো স্বাদিন হৈল—অখন কী বোঝেন?

–খুব ভালা বুজি। য্যাগো ভিটা নাই হ্যারা ভিটা পাইবে।

–কী কন?

–তাইলে যুদ্ধ হইল ক্যান!

–য্যাগো ভিটা আছে হ্যাগো?

–হ্যাগো আর ভিটা ছাড়া হওন লাগবে না।

–হ্যাচানি?

উত্তেজনায় বিমলকাকা দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তার চোখে জল এসে পড়ছে। চিকটিগাছের সরু ডালে একটি কাকলাস সুড় সুড় করে এগিয়ে এসে জিহ্বা বের করছে। পিসিমশাই হাত-আয়নায় মুখ দেখছেন। মুখটি ফকফকা। বহুদিন পরে তার নতুন আনন্দ হচ্ছে।  নিজেকে  ফেরেস হিন্দু হিন্দু লাগছে। বিমলকাকাকে টেনে বসালেন। বললেন, হোনো মুশাই,বিশ্বাসে মিলায় বস্তু—তর্কে বউ দূর। বোজলা–সব হাচা। হাচা। হাচা। শ্যাখ মুজিবে কইছেন। হ্যার মাথার উপ্রে লোক আছে। চিন্তা নাই।

বিমলকাকা খুর দিয়ে থুতনির অবশিষ্ট দাড়িটা পোঁচ মেরে নামিয়ে দিলেন। এইবার জল দিয়ে মুখ মুছে দেবেন। ভাল করে ফিটকিরি ঘসে দেবেন। খুরের সাবান আর কাটা দাড়ি কাঠিতে মুছতে মুছতে টের পেল তার শরীরে কম্প হচ্ছে। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, বারবার ভিটা ছাড়তে পরান চায় না। এক জনমে কয়বার দ্যাশ ছাড়া যায় জামাইবাবু?

জামাইবাবু হা হা করে হেসে উঠছেন। হাসতে হাসতে তিনি চুলে একবার টেরিও কাটলেন। চুনুপিসি দৌঁড়ে এলেন। বললেন, কী হৈছে তুমার?

–পিসেমশাই হাসতে হাসতে কি বলবেন মনে করতে পারলেন না। হাসতেই থাকলেন। হাসতে হাসতে কড়া এক বিষম খেলেন। পিসি বিমলকাকার ছোট্ট বাটি থেকে সাবানজল পিসেমশার মাথার থালুতে ঢেলে দিলেন। বললেন, দুর্গা। গুর্গা। দুর্গা।

ঠাম্মা মুরগীর বাচ্চা দুটোকে দানাপানি দিতে দিতে চেঁচিয়ে উঠল, কুকরু কু। কুকরু কু। কু কু কু।

সেদিন রাতে চাঁদ ওঠেনি। ঘোর অমাবশ্যা। মন্দির শূন্য। কালীমা নেই। পিসেমশাই গভীর রজনীতে মন্দিরের সামনে একজোড়া পাঁঠা বলি দিলেন। ফিনকি দিয়ে উঠল রক্ত। বহুদিন পরে কপালে গরম রক্তের ফোঁটা লাগিয়ে আকাশ বাতাস মথিত করে ধ্বনি দিলেন, জয় মা কালী। জয় মা কালী।

সেবারে পিসেমশাই বেশ কিছুদিন থেকে গেলেন। কয়েকজন বোবা লোকদের ধরে আনলেন। ওরা খায় দায়। রগড় করে। দালানের সিঁড়িতে বসে ধোঁয়া গেলে। মাঝে মাঝে দোতলার বারান্দায় উঠে আসে। আ আ করে শব্দ করে। মা লম্বা ঘোমটা দিয়ে ঘরে ঢুকে যায়। বোবা লোকগুলো ঘরে ঢুকে কলসী থেকে জল ঢেলে খায়।

একদিন ডেলাইট জ্বালিয়ে উঠোনে মাইফেল হয়ে গেল। রাজকাপুরকা রাত। শহরের রাজ্জাক মুন্সী মুখের সামনে হাত তুলে গান ধরল, জিনা এহা মরনা এহা, ইসকা শিবা জানা কাহা…। পিসে মশাইয়ের গোপ রাজ কাপুর ছাট। তিনি হেলে দুলে নেচে গেয়ে উঠলেন, জি চাহে জব হামকো আওয়াজ দো/ হাম ওহি—ওহি হাম থে জাঁহা…। অনেক লোকজন এলো। দাদু শুধু বটতলায় কাটিয়ে দিল। বড় দুটো বোন দোতলার ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে গান শুনতে পিসি মশাইয়ের গলা ছিল সত্যি সত্যি সিনেমার  রাজ কাপুরের মত। মুকেশর মত। লোকজন মুগ্ধ। ঠাম্মা শুধু বার তিনেক বলে উঠল, কুকরু কু। কুকরু কু। কু কু কু।

পিসে মশাই তখন মধ্যরাতের হাওয়া পাল্টে গান ধরেছেন—মেরা জুতা হ্যায় জাপানি…।

পিসেমশাইয়ের বরিশালে ফেরত যাওয়ার আগের দিন ভোরবেলা তিনজন করাতি এসে বরই গাছের ডালপালা ছেটে ফেলল। ডালে ডালে বরই ডাঁসা হয়ে উঠেছে। বরইগুলো তুলে নিয়ে চুনুপিসি মাকে বলল, বউদি, শুকাইয়া রাইখ। পরের বার নিয়া যামুআনে।

আর পিসেমশাই শহরের ভবঘুরে বোবা লোকগুলোর সঙ্গে হাসকি ফাসকি করতে করতে দেখলেন  করাতিরা ডালাপালাহীন বরইগাছটির গোড়া কেটে ফেলেছে।  পুকুরপাড়ে অতি সাবধানে কায়দা করে কাটা গাছটিকে কাত করে ফেলতে পেরেছে। কিছুই নষ্ট হয়নি। বরইগাছ দিয়ে তিনি নৌকা বানাবেন। গাছটি পুরনো বলে সারি। কতটা পুরনো তা কেউ বলতে পারে না। ভাল নৌকার জন্য সারি গাছের তুলনা নাই। পিসেমশাই নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তক্তা বানালেন। করাতিরা করাত চালাল। আর মাঝে মাঝে হুকো টানল। বলল, জামাইবাবু, দ্যাশের কী অবস্থা?

–পিসেমশাই চোখ ছোট করে ফিসফিসিয়ে বললেন, খুব ভাল। আবার খুব খারাপ।

করাতিরা করাত ঠেলা বন্ধ রেখে প্রশ্ন করল, তাইলে তো সমসস্যা!

–কোনো সমসস্যা নাই। কার্তিক মাসে আইয়া সব সোর কইরা দিমুআনে। বলে পিসেমশাই বরইগাছের ডালে ঝুলে থাকা মড়ার খুলিটা অতি গুপ্তভাবে বেলগাছের ডালে ঝুলিয়ে দিলেন। হাওয়া এলে শনশন করে শব্দ হয়। শব্দ শুনে পিসেমশাই গেয়ে উঠলেন, মে আওয়ারা হু…।

যাওয়ার সময় চুনুপিসি মায়ের হাত ধরে কেঁদে পড়লেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, বউদি, তুমি ছাড়া আর কেডা আছে। আমার মায়েরে দেইখো।

(চলমান–পাঁচ পর্বে রচিত)

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


4 Responses to ও টগর, ও কুক্কুট…

  1. রাজন্য রুহানি এপ্রিল 16, 2011 at 7:59 পূর্বাহ্ন

    %%- :rose: %%-
    বাকি পর্বগুলো পড়ার প্রতীক্ষায়…।
    %%- :rose: %%-

  2. নীল নক্ষত্র এপ্রিল 16, 2011 at 2:16 অপরাহ্ন

    আজ থেকে ভাই আপনাকে কথা চিত্রী নামে ডাকার ইচ্ছে হলো। দাদার নাম কথা শিল্পী রাখা হয়ে গেছে বলে ওই নামে ডাকতে পারছি না তাই এই বিকল্প।
    কথা দিয়ে এমন ছবি আকা যায়!!কি অদ্ভুত লেখনী শক্তি!!

    • porimanob@gmail.com'
      কুলদা রায় এপ্রিল 16, 2011 at 4:24 অপরাহ্ন

      কী কাণ্ড! আমি আবার কথাশিল্পী হলাম কবে থেকে? আমি হচ্ছি ছাতামাতা লেখক। যা মনে আসে তাই লিখি।
      তবে সবাইতো ছবি আঁকে। যেমন সঙ্গীত শিল্পী হাওয়া দিয়ে ছবি আঁকে। চিত্রশিল্পী রং দিয়ে ছবি আঁকে। আর লেখকরা তো শব্দ দিয়েই তো ছবি আঁকবে, তাই না।
      আমার এই গল্পটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। দ্বিতীয় পর্ব পড়ার আমন্ত্রণ থাকল।

  3. sokal.roy@gmail.com'
    সকাল রয় এপ্রিল 18, 2011 at 1:37 অপরাহ্ন

    ওরেব্বাস কি লিখা রে !!
    ম্যালাদিন পরে এমন লেখা পড়লেম………

You must be logged in to post a comment Login