প্রমিত বাংলা বিষয়ে একটি অসম্পূর্ণ আলাপ (শেষ কিস্তি)

Filed under: হ-য-ব-র-ল |


আমাদের দীনতা প্রায় সব ক্ষেত্রেই বেশ দৃষ্টিকটূ হয়ে ফুটে ওঠে। কিন্তু কখনো কখনো নিজেদের দৈন্য স্বীকারেও আমাদের লজ্জা আরো প্রকট হয়ে দেখা দেয়। লাইটার কথাটা ইংরেজি। আরবিতে বা আরো অনেক ভাষায় হয়তো তাদের নিজস্ব শব্দ আছে। কাপ কথাটি ইংরেজি। তাগালুক ভাষায় তার নাম বাসো। কিন্তু আমাদের বাংলায় এমন অনেক শব্দ আছে যা যে ভাষা থেকে এসেছে তেমনই আছে নয়তো খানিকটা বিকৃত হয়ে আমাদের নিজস্ব হয়েছে। কেন আমরা সেসব বিদেশি শব্দের পরিভাষা তৈরি করতে পারছি না?

আমাদের বিজ্ঞজনেরা কর্ম্ম কে কর্ম করে, ধর্ম্ম কে ধর্ম করে অথবা য-ফলার ব্যবহার তুলে দিয়ে এমন ভাব দেখান যে, বেশ কিছু বৃহৎ কর্ম সম্পাদন হইল। এটা কিন্তু একটি দেশের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। কালের পরিক্রমায় মানুষের সঙ্গে ভিন্ন জাতি ও দেশের মানুষের সামাজিক বা ভাষিক যোগাযোগের ফলে অনেক কিছুই নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে জড়িয়ে যেতে পারে, যা আইন করে বা জোর করে বন্ধ করা সম্ভব নয়। কেবল ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার কারণেই পৃথিবীর অনেক ভাষা আজকাল হারিয়ে যেতে বসেছে। যেমন আমাদের চাকমা ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা আছে। অথচ তা কেমন অনেকেই জানেন না। এমনকি অনেক চাকমাই হয়তো খুব বেশি জাতীয়তাবাদী না হলে নিজেদের বর্ণমালা নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামান না বলেই মনে হয়। যার ফলে আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষার দাপটে এমনি অনেক উপভাষা এবং তার বর্ণমালাগুলো একদিন হারিয়ে যাবে

আমাদের ভাষায় প্রচুর সংখ্যক বিদেশি শব্দ আছে সেই সঙ্গে রয়ে গেছে পর্যাপ্ত পরিভাষার অভাব। আর যেগুলো আছে তা শিক্ষার্থীদের কাছে এতটাই কঠিন যার বেশির ভাগ অর্থ জানতে আরেকটি অভিধান প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সুতরাং বানান পদ্ধতি নিয়ে পড়ে থাকলেই আমাদের চলবে না। সেই সঙ্গে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে বিদেশি শব্দের পরিভাষা সৃষ্টির দিকে, যা সহজবোধ্য আর লিখতেও তেমন একটা বেগ পেতে না হয়।

অধ্যাপক হুমায়ূন আজাদের কোনো একটি লেখায় বা চঞ্চল আশরাফের লেখায় পেয়েছিলাম যে, বাংলা একাডেমী একটি প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ রচনার জন্য হুমায়ূন আজাদকে ধরেছিলো। কিন্তু দু পক্ষের চুক্তির মাঝে মাত্র একলক্ষ টাকার ব্যবধান ছিলো। হুমায়ূন আজাদ বাংলা একাডেমীর কাছে তিন লক্ষ টাকা চেয়েছিলেন। আর বাংলা একাডেমী বলেছিলো দু লক্ষ টাকা।

মাত্র একলক্ষ টাকার কৃপণতা বা উদারতার জন্য জাতি বঞ্চিত হলো একটি প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ থেকে। আজ হুমায়ূন আজাদ নেই। বাংলা একাডেমীও নানা খাতে খরচ করার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই। কিন্তু আজ অবধি বাংলা ব্যাকরণ পেলাম না।

বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে বা বাঁচিয়ে রাখার সাধ্য কোনো একাডেমীর নাই। কিন্তু বাংলা ভাষা চর্চা যাতে আরো বেশি মাত্রায় হয় সেই দিকটি নানা মাধ্যমে নানা দিক থেকে উন্মোচিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমী রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

আরেকটি ব্যাপার না বলে পারছি না এ কারণে যে, আমাদের দেশের বাংলা সংবাদপত্রগুলোর লেখালেখির স্বাধীনতাটা অতিমাত্রায় হওয়ার ফলেই হয়তো তারা নিজেদের ইচ্ছে মতো বানান রীতি ব্যবহার করে থাকে। প্রমিত বাংলা বা বানানের ক্ষেত্রে যা নৈরাজ্য বলে বিবেচিত হতে পারে। যে লেখক যে পত্রিকায় লেখালেখি করেন, তিনি সেই পত্রিকার নিজস্ব বানান রীতিকে অনুসরণ করতে বাধ্য হন। অথচ লেখক হিসেবে, জাতির বিবেক বা সমাজের দর্পণ হিসেবে তিনি একটি সুনির্দিষ্ট নীতিকে মেনে চলা উচিত ছিলো। বিশেষ করে সংবাদপত্র, প্রকাশনা সংস্থা, এমনকি প্রকাশকদেরও প্রমিত বানান রীতি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। দেশ একটি। প্রমিত ভাষাও একটি। সে ক্ষেত্রে বানান রীতিও সবাই একটিকেই অনুসরণ করা উচিত। এ ক্ষেত্রে নিজস্ব ধ্যান-ধারণা, রীতি-নীতি প্রশ্রয় পাওয়ার কোনো যুক্তি নেই।

(সমাপ্ত)

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

8 Responses to প্রমিত বাংলা বিষয়ে একটি অসম্পূর্ণ আলাপ (শেষ কিস্তি)

  1. সাথে আজকালের কিছু টিভি চ্যানেল এবং রেডিওর সংবাদ পাঠের স্টাইল লক্ষ্য করে দেখুন কেমন শোনায়? যেমন “এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন আবু গদাই বাবু” অথচ আমরা জেনেছিলাম ” আবু গদাই বাবু এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন”। ভেবে দেখুন আমরা আধুনিকতা বা স্বকীয়তার নামে কোথায় যাচ্ছি! এগুলি দেখার কি কেউ আছে বলে মনে হয়??

  2. সংবাদপত্র, প্রকাশনা সংস্থা, এমনকি প্রকাশকদেরও প্রমিত বানান রীতি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। দেশ একটি। প্রমিত ভাষাও একটি। সে ক্ষেত্রে বানান রীতিও সবাই একটিকেই অনুসরণ করা উচিত।

    খাস কথা। :rose:

    রাজন্য রুহানি
    জুন 2, 2011 at 3:29 অপরাহ্ন

  3. তিনটা পর্বই পড়লাম। তারপরও বলবো, আমরা লিখতে গেলে বানানেই বেশি ভুল করি। এর কারণ হিসেবে আমার মনে হয়, আমাদের উন্নাসিকতা, এক ধরণের কেয়ারলেস (ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করলাম) ভাব। এটা খুবই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বলে আমি মনে করি। উদাহরণ হিসেবে আমি একটা শব্দ দিচ্ছি, যা শতকরা ৮০/৯০ ভাগ ব্লগার ভুলভাবে লেখে। শব্দটা হলো: সার্থক। ৮০% থেকে ৯০% জন ব্লগার এই বানানটা ভুলভাবে লেখে এইরুপে: স্বার্থক। কেন এইরুপে লেখে, তার কোন যুক্তিসংগত কারণ আমার জানা নেই। মনে হয় সবাই সবার স্বার্থ-টাই বেশি বুঝে। হা হা হা।

    অনেক ধন্যবাদ আপনাকে এই পোস্টের জন্য।

    shamanshattik@yahoo.com'

    শামান সাত্ত্বিক
    জুন 2, 2011 at 10:36 অপরাহ্ন

  4. আগে এতটা ভাবার ফুরসৎ বা ইচ্ছা কোনটাই হয়ত ছিল না।আমাদের শিক্ষানীতির পেছনে ভো-দৌড় দিতে দিতে।
    ইদানিং টুকটাক লিখতে গিয়ে পরিভাষার ব্যাপারটা খেয়াল করলাম।যে যতই বাংলার সুন্দর শব্দ দিয়ে বাক্যটা সাজাতে চাই,কিছু বিদেশি শব্দ বেয়ারা ভাবেই ফুটে উঠে এবং যেগুলোর কিছু কিছুর পরিভাষা আছে ঠিকই কিন্তু চর্চার অভাবে তা বড্ড স্থুল শোনায়।যেমন চেয়ার টেনে বসলাম।এখানে কেদারা টেনে বসলাম শুনতে ভালো লাগছে না হয়ত এইজন্য যে আমরা শুনে বা বলে অভ্যস্ত নই।পরিভাষা পর্যাপ্ত নাই ঠিক আর যা আছে তার চর্চা বর্তমান উৎকৃষ্ট সাহিত্যেও তেমন নেই।
    তবে প্রথম দুই কিস্তিতে প্রমিত নিয়ে যে দ্বিধা ছিল এখানে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হলো যে,

    সে ক্ষেত্রে বানান রীতিও সবাই একটিকেই অনুসরণ করা উচিত। এ ক্ষেত্রে নিজস্ব ধ্যান-ধারণা, রীতি-নীতি প্রশ্রয় পাওয়ার কোনো যুক্তি নেই।

    কথাটা মেনে চলার চেষ্টা থাকবে।
    পরিশেষে সম্মান, ধন্যবাদ,সাধুবাদ।
    (*) :rose: %%-
    ছুটির সকালের এক কাপ চা।
    ~O)

    rabeyarobbani@yahoo.com'

    রাবেয়া রব্বানি
    জুন 3, 2011 at 3:46 পূর্বাহ্ন

  5. ইচ্ছে মত বানান রীতি কত দেখলাম। সেই যায়যাযদিনের কথাই ধরি—ক্রিয়া কে লিখত কৃয়া, ক্রিকেট কে কৃকেট। ….

    সুন্দর এই লেকার জন্য অভিনন্দন না দিলে গোনাহ হবে। অভিনন্দন আপনাকে।

  6. ভাল লিখা।
    সাব্বাস।

    udraji@gmail.com'

    সাহাদাত উদরাজী
    জুন 4, 2011 at 1:31 অপরাহ্ন

  7. ভাষা নিয়ে বহুত ঝামেলায় আছি

You must be logged in to post a comment Login