কুলদা রায়

তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

আমাদের বাসার সামনে একটি তালগাছ।
এই লাইনটি লিখেছে আমার ছোটো মেয়ে। ও বাংলা লিখতে পারেনা। খুব ছোটোবেলা দেশ ছেড়ে এসেছে। বাংলা লেখা ভুলে গেছে। ওর মা মাঝে মাঝে লেখা শেখায়। বলে, লেখো—স্বরে-অ। ছোটো মেয়েটি বলে, এই লিখিলাম স্বরে—অ।
ও একটি বাংলা খাতা খুলেছে। অনেক কাটাকুটি করেএকটি পাতায় লিখেছে—আমাদের বাসার সামনে একটি তালগাছ। আর কিছু নেই। দাঁড়িও নেই। কমাও নেই। অবাক বাক্যটি। তালগাছটি আমার ছোটো মেয়ের খাতায় দাঁড়িয়ে আছে।
আমাদের বাসার সামনে সত্যি সত্যি একটা তালগাছ ছিল। পুকুরপাড়ে। পুকুরটির নাম তালপুকুর।  তবে তালপুকুরে তালগাছ একটি নয়। অনেকগুলো। সারি করে লাগানো। চৈত্র-বৈশাখে কচি তাল পাড়তেন আমাদের নূরু ড্রাইভার। পানিতাল খেতে মেয়েরা খুব ভালবাসত। বলত, নূরু চাচা, আরেকটা কাইটা দ্যান।
ওদের নূরুচাচা হাসি হাসি মুখে পানিতাল কেটে দিচ্ছে। আর মেয়েদুটো মহাআনন্দে সুপ সুপ করে খাচ্ছে।
এই পানিতালকে আমাদের বাড়িতে তালশাঁস বলা হত। কিন্তু বরিশালে পানিতাল। এই শব্দটি শোনার পরে আর তালশাঁস বলা হয়নি। ওটা আমার একটি প্রিয় শব্দ।
ভাদ্রমাসে তালপুকুর জলে উপচে পড়ত। সে জলের মধ্যে বড় মেয়েটি বুকে দুটো ফিসিং বল বেঁধে সাঁতার কাটত। আর জানালার শিক ধরে ছোটো মেয়েটি বলত, দিদি, দিদি, দিদি।। দিদির তখন সময় নেই। তাকে সারা পুকুর জুড়ে হ্যান্স এন্ডারসনের মৎসকুমারী হতে হবে। তার পাশাপাশি অনেকগুলো রাজহাঁস সারি বেঁধে ভাসছে। বলছে, পাক পাক পাক। ছোটো মেয়েটি তারস্বরে বলছে, দিদি দিদি দিদি। দিদি তখন তালপুকুরের রাজহাঁস। রাজহাঁস ভাসতে ভাসতে তালগাছের  দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছে—তালের রং লাল হয়েছে।
এ সময় মাঝে মাঝে তালপুকুরে ধপ করে শব্দ হত। তালগাছ থেকে পাকা তাল পড়েছে। রাতে এই শব্দটি শুনলে ছোটো মেয়েটি শিউরে উঠত। বলত, ও বাবা, ঐ যে– ধপ ? ওর চোখ বন্ধ হয়ে যেত। আমার গুটি শুটি হয়ে বুকে মুখ লুকাত।
নূরু চাচা সেই পাকা তাল জল থেকে আনত। আর ওদের মা তাল তালের পিঠে করে দিত। মেয়ে দুটি খেয়ে দৌঁড়ে বেড়াত। বলত,
ঐ দেখা যায় তালগাছ–
ঐ আমাদের গাঁ,
ঐখানেতে বসত করে কানি বকের ছা।
লিখেছেন-খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দিন।
একদিন ছোটো মেয়েটি বলল, কানি বক কি?
–বক পাখি।
–বকপাখি কানি কেন?
–পাখিটির চোখ নাই।
–বক পাখি দেখাও।
আমি বক পাখি আঁকতে শুরু করেছি। আমার আগে বড় মেয়েটি পাখিটি এঁকে ফেলেছে। আমারটা বাতিল। আমার মেয়ের পাখিটির লম্বা লম্বা দুটো পা। পায়ে হলুদ রং লাগিয়েছে। লম্বা ঠোঁটে সোনালি রং। তারপর ওরা দুই বোন মিলে একটি ডানায় দিয়েছে লাল রং। আরেকটি ডানা নীল। গলা করেছে সবুজ। আর বুকে পেটে হালকা খয়েরী। একটি রঙিন বকপাখি।
কানি বকের চোখ নাই। কিন্তু ছোটো মেয়েটি তার কুসুমকোমল হাত দিয়ে কালো কালো চোখ এঁকে দিল। বলল, কানি বকের চোখ আছে। তুমি দেখতে পাও নাই।
ওরা অনেক কিছু দেখতে পায়। আমরা পাই না।
কানি বকের চোখ আছে। চোখের পাপড়ি আছে। পাপড়ির উপর কাজল টেনেছে। বলল, এই দেখো চোখ।  সত্যি সত্যি কানি বকের চোখ হাসছে। বলছে, আমাকে আর কানি বক বলো না। আমি হলাম, বকপাখি। রেডিওতে গান হেমন্ত গাইছেন,  আকাশে উড়িছে বকপাঁতি। বেদনা আমার তারি সাথি।
কিন্তু বকটি কোথায়? জলে?—না, জঙ্গলে। মাঠে, না, আকাশে?
মেয়ে দুটো চেয়ে আছে আমার দিকে। আমি চেয়ে আছি ওদের মায়ের দিকে। ওদের মা চেয়ে আছে তার ছেলেবেলার বাড়িটির দিকে। সেই বাড়ি একটি গ্রামে। নাম—তালতলা। গ্রামে ঢুকতে একটি নদী। নদী  থেকে মাটির রাস্তা উঠে এসেছে মাঠের মধ্যে। এই রাস্তার পূব পাশে তালগাছের সারি। মেয়েটি সেই তালপাতায় লিখতে শিখেছিল।  তালপাতা তার বর্ণপাতা। স্বর্ণপাতা। এই বর্ণপাতা স্বর্ণপাতা বগলে করে পাঠশালায় যেত। হাতে দোয়াত। দোয়াত ভরা কয়লার কালি।  গুরুমশায় বলতেন, লেখো—অ। খাগের কলম কয়লার কালিতে ডুবিয়ে মেয়েটি লিখত, এই লিখিলাম স্বরে–অ। এই লিখিলাম স্বরে—আ।
আমার বড় মেয়েটি জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। ছোটো মেয়েটি তার পাশে চলে গেছে। বাইরে রোদ উঠেছে। তালপুকুরে লোকজন নাইতে নেমেছে। নূরুচাচা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কে একজন হেঁকে বলছে, আগামীকাল হরতাল। সকাল দুপুর হরতাল।
হরতাল শব্দটি শুনে মেয়ে দুটি ফিস ফিস করে শলা করছে। ওদের মা তালমিছরি বোতলে রাখছে। আর বড় মেয়েটি ফসফস করে বক পাখির নিচে একটি তালগাছ এঁকে ফেলেছে। ছোটো মেয়েটি অবাক চোখে দেখছে– বকপাখিটি তালগাছের উপরে দাঁড়িয়ে আছে।
নিচে বড় বড় করে লেখা, এই আমাদের তালগাছ।
তালগাছটি আর কানি বকটি, ক-কক, ক-কক করে ডাকছে।
আমার ছোটো মেয়েটির খাতায় এখন সেই তালগাছটি এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। বকপাখিটি নেই। পাখিটি বকপাঁতি হয়ে তার মায়ের গ্রামে উড়ে গেছে। বহুদূরে। সাত সমুদ্দুর পাড়ে। গ্রামটির নাম– তালতলা।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


5 Responses to তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে

  1. ahmad_haq2007@yahoo.com'
    আহমাদ মুকুল জুলাই 7, 2011 at 3:49 পূর্বাহ্ন

    খুব ভাল লাগল আপনার গল্প বলার ঢং। নস্টালজিক করে দিয়েছেন বার বার। আবার সমসাময়িকতায় ফিরিয়ে এনেছেন।

  2. porimanob@gmail.com'
    কুলদা রায় জুলাই 7, 2011 at 4:33 পূর্বাহ্ন

    ধন্যবাদ। এই গল্পটির প্যারাগুলো মিশে গেল কেন। ওটা ঠিক করা দরকার।

  3. imrul.kaes@ovi.com'
    শৈবাল জুলাই 7, 2011 at 1:58 অপরাহ্ন

    এই গল্পটা আগে পড়া হয় নি , এই পড়লাম , মনে হচ্ছে ” প্রজ্ঞা পারমিতা জলতল অথবা এ্যন্ডারসনের চকোলেট ” এর পরম্পরা । আপনার কথামালার নিচে আপনার নামটা না লিখলেও , যারা পড়ে তার ঠিক বুঝতে পারে এটা কার লিখা , আপনার লেখার আলাদা একটা ধরণ আছে যার বাইরে আপনি যেতে পারেন না কিংবা যান না ইচ্ছে করেই … একটা মায়াজাল যার কিছু সুতো বাস্তবের কিছু সুতো কল্পনার তবে মাঝে ঘুম ভাঙার দায় নেই , নির্নিমেষ পড়া যায় ।

    বলতে লজ্জা পাই না আমি যতটুকো লিখি তারচেয়ে লিখতে পারি না অনেক বেশি আর স্বপ্ন তার চেয়েও অনেক বেশি , একটা ছোট্ট ইচ্ছা নিজের একটা আলাদা ধরণ , বিখ্যাত হতে চাই না তবে আপনার মতো যেন লেখাই কবির নাম বলে দিতে পারে এমন ভাবে লিখতে চাই , আর্শীবাদ করবেন ।সুস্থ থাকুন সুন্দর থাকুন ।
    এই গল্পটা আগে পড়া হয় নি , এই পড়লাম , মনে হচ্ছে ” প্রজ্ঞা পারমিতা জলতল অথবা এ্যন্ডারসনের চকোলেট ” এর পরম্পরা । আপনার কথামালার নিচে আপনার নামটা না লিখলেও , যারা পড়ে তার ঠিক বুঝতে পারে এটা কার লিখা , আপনার লেখার আলাদা একটা ধরণ আছে যার বাইরে আপনি যেতে পারেন না কিংবা যান না ইচ্ছে করেই … একটা মায়াজাল যার কিছু সুতো বাস্তবের কিছু সুতো কল্পনার তবে মাঝে ঘুম ভাঙার দায় নেই , নির্নিমেষ পড়া যায় ।

    বলতে লজ্জা পাই না আমি যতটুকো লিখি তারচেয়ে লিখতে পারি না অনেক বেশি আর স্বপ্ন তার চেয়েও অনেক বেশি , একটা ছোট্ট ইচ্ছা নিজের একটা আলাদা ধরণ , বিখ্যাত হতে চাই না তবে আপনার মতো যেন লেখাই কবির নাম বলে দিতে পারে এমন ভাবে লিখতে চাই , আর্শীবাদ করবেন ।সুস্থ থাকুন সুন্দর থাকুন ।

    • porimanob@gmail.com'
      কুলদা রায় জুলাই 7, 2011 at 4:20 অপরাহ্ন

      শৈবাল, আপনার ধারণাটি ঠিক। এই লেখাটি প্রজ্ঞা পারমিতার জলতলেরই পরম্পরা। সে সময় আমরা এই তালপুকুরের পাড়ে থাকতাম। এখানে ছিলামও অনেকদিন। আমার বড় মেয়েটি এখানে হয়েছে। ছোটোটিও। বড়টি সাঁতার শিখেছে। ছোটোটি শেখা শেষ করতে পারেনি। এর আগেই আমাদের বরিশাল শহরে চলে যেতে হয়। সেখানে আমাদের পুকুর ছিল না। তবে আমরা সদর রোডের বিবির পুকুর পাড়ে বসতাম প্রতিদিন বিকেলে। জলে ভাসত তেলাপুইয়া মাছ। ছোট মেয়েটি মাছেদের চিপস খেতে দিত। দিত মুড়ি–খই।
      এর মধ্যে বহুদিন কেটে গেছে। এখনো আমার মেয়েটি বলে–সেই মাছগুলো এখনো তার জন্য বিকেলে অপেক্ষা করে। বলে, এখন কত বড় হয়ে গেছে।
      আমার ছোটো মেয়েটিও বেশ বড় হয়ে গেছে।

  4. mannan200125@hotmail.com'
    চারুমান্নান জুলাই 9, 2011 at 7:07 পূর্বাহ্ন

    বাহ দারুন :rose:

You must be logged in to post a comment Login