নীল নক্ষত্র

নক্ষত্রের গোধূলি পর্ব-৩৭ (অধ্যায় ৩)

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

চারদিকে দেখতে দেখতে হেটে সমারফিল্ডে ঢুকলেন। এক পাশে লাইন ধরে সাজানো ট্রলি রয়েছে। যে বেশি বাজার করবে সে এখান থেকে একটা টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এখানেও সিকিউরিটি গেট এবং অটোমেটিক দরজার সামনে আসতেই দরজা খুলে গেলো। ভেতরে ঢুকেই উষ্ণতার ছোঁয়া। গেটের ভিতরেই ট্রলির পাশে প্লাস্টিকের ঝুরি সাজানো রয়েছে। যে কম কেনাকাটা করবে সে এখান থেকে একটা নিয়ে নিচ্ছে। ঢোকার পর ডানে কাস্টমর সার্ভিসের কাউন্টার, বায়ে সিকিউরিটির সিসি ক্যামেরা মনিটর করার ডেস্ক আর তার পাশে ফুলের সেকশন। নানান রকমের ফুল সাজানো রয়েছে বিক্রির জন্যে। সামনে এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত অনেকগুলি চেক ইন কাউন্টারের উপরে নম্বর লেখা। সবগুলিতেই স্ক্যানার এবং টিল। সিসি ক্যামেরা মনিটর করা দেখে ভাবল এখানেও তাহলে চুরি হয়। ভেতরে ঢোকার পথ আর বের হবার পথ সবুজ আর লাল রঙ দিয়ে লেখা। হ্যাঁ সুপারস্টোরই বটে! বিশাল। কত হাজার রকমের মালামাল রয়েছে কে জানে। ফুল থেকে টেলিভিশন সবই আছে। কোথায় কি কি আছে এতো খুঁজে বের করা কঠিন ব্যাপার। রাশেদ সাহেব ভেতরে ঢুকলেন। হেটে এগিয়ে যেয়ে চেক ইন কাউন্টারে যেখান থেকে নম্বর শুরু হয়েছে সেখান থেকে দেখা শুরু করলেন।

প্রতিটা রো এর উপরে রো নম্বর আর ঐ রোতে কি আছে সেই সব নাম লেখা। তাই দেখে দেখে এক দিক থেকে দেখতে লাগলেন। হাতে ঘড়িটা দেখে নিলেন। না, ঠিক আছে তিনটা বাজে। ইফতারের দেরি আছে। আজ এখান থকেই কিছু কিনে ইফতার করে নিব এজন্যে আর ফিরে যাব না। কত জিনিষ তার হিসাব করা কঠিন। স্কিমড, সেমি স্কিমড, নন স্কিমড দুধ। বিভিন্ন ডেইরি ফারমের উৎপাদিত সাদা প্লাস্টিকের গ্যালনের কন্টেইনার। তিন লিটার, দুই লি্টার, এক লিটার, আধা লিটারের বোতল। লাল সবুজ নীল ঢাকনা আর লেবেল দিয়ে ফ্যাটের পরিমাণ চিহ্নিত করা। লাল ঢাকনায় থাকে সবচেয়ে কম ফ্যাট সবুজ ঢাকনায় থাকে অর্ধেক ফ্যাট আর নীল ঢাকনায় থাকে ফুল ফ্যাট। আরও আছে ল্যাক্টোজ ফ্রি, লং লাইফ অনেক রকম। এতো দেখার সময় নেই। এরপরে দৈ। সেও নানান রকম। আধা লিটার, প্লাস্টিকের গ্লাসে বিভিন্ন স্বাদের, বিভিন্ন ফল মেশানো স্বাদের। তারপরে পনীর এই পনীর যে কত রকমের তা যেমন দেখাও কঠিন লেখাও কঠিন। রান্নার জন্যে সূর্যমুখীর তেল, তিলের তেল, চিনাবাদামের তেল, ভেজিটেবল তেল, আলমন্ড বাদাম তেল, আঙ্গুর বীজের তেল, তুলা বীজের তেল, অলিভ তেল। হাজার রকমের সস। এমনি খাওয়ার সস, রান্নার সস, সালাদ ড্রেসিঙের সস। প্যাকেট সুপ, নুডলস, চিনি, লবণ, চিপস ক্র্যাকারস অর্থাৎ আমরা যা ব্যাবহার করি তার সব কিছুরই অনেক অনেক প্রকার যা আমাদের দেশে আমরা জানিই না। তবে সবজির সেকশনে গিয়ে একটু হতাশ হলেন। ফুলকপি, পাতা কপি, গাজর, পারস্নিপ নামের সাদা গাজর, শালগম, স্পিনাশ নামের আমাদের পালং শাক, ছোট পাতা কপির মত দেখতে স্প্রাউট যা এক বারে একটা মুখে দেয়া যায়। ব্রকলি, সিম, বরবটি, লাল হলুদ সবুজ রঙের ক্যাপ্সিকাম, লীক, এসপারাগাস এই হল সবজী। মটর সুটি আছে তবে ফ্রোজেন। তবে আলু আর পিয়াজের অনেক প্রকার তার মধ্যে সালাদের জন্যে লাল পিয়াজ তার খুব ভালো লাগলো। টমাটো হরেক রকমের, লম্বা চিচিঙ্গার মত শসা। লেটুস যে কত রকমের হতে পারে তা তার ধারনাতেই ছিল না। বিভিন্ন রকমের লেটুস, রেস্টুরেন্টে আলু খেয়েছে বেশ সুস্বাদু। অনেক রকম তৈরি খাবার ফ্রীজে রয়েছে কোনটা এনে কিছুক্ষণ রান্না করতে হবে। কোনটা শুধু মাইক্রোওয়েভে গরম করে নিলেই হবে। সবজির ওখানে দেখেছে অনেক তাজা সবজি আছে যেগুলি চুলায় দেয়ার জন্যে রেডি করা প্যাকেট।

স্টোরের ভিতরে কিছু খাওয়া নিষেধ এদিকে ইফতারের সময় হয়ে এসেছে। পানীয়ের কাছে গেলেন। এক ক্যান ডায়েট কোক নিয়ে আবার হালকা খাবারের কাছে এসে দুইটা ভেজিটেবল পেটিসের মত নিলেন। চেক ইন পয়েন্টে দাম দিয়ে বের হবার পথে মনে করলেন দেখি কোন ফুলের কেমন গন্ধ। কাছে এসে শুকে দেখে হতাশ হলেন। কি ব্যাপার দেখতে কি সুন্দর অথচ কোন ফুলেই গন্ধ নেই! অবাক হয়ে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে রইলো। আচ্ছা এ ব্যাপারে পরে ভাবব। বাইরে এসে কার পার্কের কাছে বসার বেঞ্চ দেখেছেন ওখানে বসলেন। ঘড়ি দেখে আস্তে আস্তে ইফতার করলেন। পেটিসটা গরম করা দরকার ছিল কিন্তু কোথায় করবে তাই গরম না করেই খেয়ে ফেললেন।
ইফতারের পরে কিছুক্ষণ বেঞ্চেই বসে রই্লেন। একটা সিগারেট বানিয়ে অনেকক্ষণ ধরে টানলেন। এতক্ষণ মাথায় কোন চিন্তা আসার সুযোগ আসেনি। এখন মনি আর মেয়েরা কখন যে এসে মাথায় ভিড় করেছে টের পায়নি। শীত লাগছে তবুও উঠছে না। সিগারেটটা ফেলে দিয়ে আবার গ্লোভস পরে নিলেন। ঠাণ্ডার মধ্যে বসা যাচ্ছে না কিন্তু রুমে গিয়ে কি করবেন সময় তো কাটতে চাইবে না। ওহ ভালো কথা! ফিরোজকে একটা ফোন করবে। উঠে দাঁড়াল। এদিক ওদিক দেখে ফোন বক্স পেয়ে কাছে গিয়ে ফিরোজকে পেয়ে কিছু কথা বারতা হল। তেমন কিছু না, কেমন আছ কেমন লাগছে এই সব। এতেই চল্লিশ পেনি লেগে গেল। ফোনটা ছেড়ে রাস্তার দিকে হেটে এলেন। বাস স্ট্যান্ডের পাশে বেঞ্চ আছে তারই একটাতে বসলেন। এখন কি করবে? অন্ধকার হয়ে গেছে, যদিও দিনের মত আলো জ্বলছে কিন্তু শত হলেও রাততো এদিকে ভালোই ঠাণ্ডা লাগছে আর কিছু দেখা হোল না। থাক আছিইতো পরে দেখা যাবে। কত দিন থাকতে হবে কে জানে, তখন কি করবো আস্তে আস্তেই দেখা যাবে। না এখন ফেরা যাক ভাবলেন। তবুও বসে রইলেন, ঠাণ্ডা লাগছে তবুও। আবার একটা সিগারেট বানিয়ে জ্বালালেন। রাস্তায় মানুষ জন নেই। সে যেখানে বসেছে তার চতুর্দিকে রাস্তার পাশে আরও কয়েকটা বেঞ্চ আছে কিন্তু সবই খালি। তার মত শীতের মধ্যে রাতের বেলা কেউ বসে নেই। এখান থেকে রাস্তাটা পাঁচ দিকে বেরিয়ে গেছে। একটা দিয়ে সে অক্সফোর্ড থেকে এসেছে, একটা গেল লাইব্রেরির দিকে, একটা রেস্টুরেন্টের দিকে জর্জ স্ট্রি্‌ট। বাকি দুইটার কোনটা কোথায় গেছে কে জানে! সব রাস্তার মাথায় ফোন বুথ আছে, আর আছে আবর্জনা ফেলার বিন। উপরে ঢাকনা দেয়া এতে কোন ভুল নেই, জ্বলন্ত সিগারেট নিভিয়ে ফেলার জন্যে ঢাকনার উপরে আলাদা ব্যবস্থা।
কয়েকটা দোকানের সাইনবোর্ড দেখা যাচ্ছে কোনটা কিসের দোকান সব বোঝা যাচ্ছে না সবই প্রায় বন্ধ তবে কাচের দেয়াল থাকাতে সবই দেখা যেত যদি ভেতরে আলো থাকতো। একটা ব্যাঙ্ক, বারকলেজ ব্যাঙ্ক, একটা মনে হোল বাচ্চাদের খেলনার দোকান কাচের দেয়ালের বাইরে থেকে রাস্তার আলোতে ভিতরে যা দেখা যাচ্ছে তাতে সেইরকম মনে হল। একটা মোবাইল ফোনের দোকান, একটা চুল কাটার সেলুন পরিষ্কার লেখা “কোলিনস বারবার শপ” একটা ফিস এন্ড চিপসের দোকান। সামনে দুই একজন দাড়িয়ে। এখানে বসে আরও কয়েকটা পাব দেখা যাচ্ছে। ভিতরে মৃদু বাজনার শব্দ আসছে। আজ মঙ্গল বার তাই ভিড় নেই। হাতের সিগারেটটা শেষ হলে ফেলে দিয়ে এবারে উঠে দাঁড়ালেন। রেস্টুরেন্টে ঢুকার পথে কিচেনের ভিতর দিয়ে ঢুকতে হয়। তাকে দেখেই বলে উঠলো
কি ভাই সাহেব, কোথায় গেছিলেন?
রাশেদ সাহেব সারা দিনের ফিরিস্তি দিলেন।
এখানে এসে ইফতার করে যেতে পারতেন।
ক্ষুধা লেগেছে কিছু খাবেন?
আমতা আমতা করে বললেন হ্যাঁ দিবেন কিছু?
কি খাবেন?
যা দিবেন তাই।
তাহলে একটা নান খান।
মারুফ একটা নান বানিয়ে তন্দুরির ভিতরে ঢুকিয়ে বলল
কি দিয়ে খাবেন?
যা দিবেন তাতেই হবে ঘরের বাইরে যখন এসেছি তখন আর কোন চাহিদা নেই যা দিবেন তাই আলহামদুলিল্লাহ।
সেই সেদ্ধ করা ভেড়ার কিমা দিয়ে তাদের এই বিলাতি কায়দায় একটু নেড়ে চেড়ে কি একটা করে বলল নেন খান।
এটা কি দিলেন?
এটা হোল কিমা ভুনা।
ও আচ্ছা, তা আসেন আপনারা আসেন।
না আপনে খান আমরা খাইছি।
বেয়াই সাহেব শুনছেন কালতো ঈদ।
তাই নাকি? বেশ তা হলে ঈদ মোবারক সবাইকে।
কোথায় যাবেন ঈদের দিন?
কেন কাল কি বন্ধ নাকি?
হ্যাঁ দিনের বেলা বন্ধ তবে রাতে খুলবো।
না ভাই আমি কোথায় যাব এখানেই ঘুরা ঘুরি করবো আজকের মত। আপনারা কি করবেন? আমরা সবাই আজকে রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে লন্ডন চলে যাব। আসাদ মিয়া যাবে অক্সফোর্ড তার ভাইয়ের কাছে শুধু কবির থাকবে।
কেন কবিরও কি আমার মত নাকি?
না ওর অনেকেই আছে তা উনি যাবে না কোথাও। আপনের জন্যে একা একা থাকার চেয়ে ভালো হবে।
আপনাদের তো সবার গাড়ি আছে কিন্তু নুরুল ইসলাম আর আসাদ ভাই কেমনে যাবে? এতো রাতে বাস পাবে নাকি বাসতো বন্ধ হয়ে গেছে দেখে আসলাম।
না নুরু যাবে আমার সাথে, আসাদ যাবে ওসমানের সাথে ওসমানের বাসাতো অক্সফোর্ডে। এমন সময় সামনে থেকে খবর এলো রাশেদ সাহেবের ফোন। (চলবে)

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


4 Responses to নক্ষত্রের গোধূলি পর্ব-৩৭ (অধ্যায় ৩)

  1. রিপন কুমার দে জুলাই 17, 2011 at 2:54 পূর্বাহ্ন

    বেশ সাবলীল লাগল

  2. রাজন্য রুহানি জুলাই 17, 2011 at 7:57 পূর্বাহ্ন

    %%- :rose: %%-

You must be logged in to post a comment Login