সম্পূর্ণ উপন্যাস: কম্পেন্ডার (৫০তম পোস্ট)

।। প্রথম পর্ব ।।

সকালের কড়া রোদে সময়টা খারাপ গেলেও দুপুরের পর থেকে তেমন একটা খারাপ লাগে না সোভানের। আকাশটা ফের মেঘলা হয়ে যাওয়াতে সূর্যের তেজ অনেকাংশেই স্তিমিত হয়ে এসেছে। রোদে শরীর ঘেমে শুকিয়ে যাওয়ার ফলে চামড়া কেমন চড়বড় করতে থাকে। হালকা পাউডারের গুঁড়োর মত লবণ ভাসে। দৃষ্টিতে হতাশা নিয়ে চারদিকে প্লাবিত জনপদের দিকে তাকায় সোভান। পাশেই রোদে শুকোতে দেয়া মলিন গামছাটা নিয়ে শরীরে লেগে থাকা ঘামের লবণ পরিষ্কার করে।

শরীর মুছতে মুছতেই প্রচণ্ড ক্ষুধা আর পানির তিয়াস অনুভব করলেও পানির বোতলে বা চিড়া-গুড়ের প্যাকেটে হাত দিতে অযথাই কালক্ষেপণ করে সোভান। বোতলে যতটুকু পানি আছে তা ফুরিয়ে গেলে পরে না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ঘরের ভেতরটা পুরোপুরিই ডুবে আছে পানির নিচে। আজ দশদিন হলো সে বাস করছে ঘরের চালের উপর। ঘুম-নিদ্রা বলতে গেলে নেই। যেটুকু পলিথিন দিয়ে কাঁথা-বালিশ ঢেকে রেখেছে, বৃষ্টির সময় সেটা দিয়ে নিজকেও আবৃত করতে হয়। কিন্তু এত কষ্টের মাঝেও কোথাও যাওয়ার কিংবা বাঁধে গিয়ে আশ্রয় নেয়ারও কোনো আগ্রহ বোধ করে না। রোদের তাপে কাঁথা-বালিশ দুটো মোটামুটি শুকিয়ে এলেও আকাশের অবস্থা দেখে তার ভালো লাগে না।

চারদিন আগে চেয়ারম্যান বাড়ি থেকে এক প্যাকেট চিড়া-গুড় আর এক বোতল পানি পেয়েছিলো। তাতেই সে টিকে আছে কোনো রকমে। কিন্তু চিড়া-গুড় যা আছে তা এখন খেয়ে ফেললে রাতে বা পরদিনের সংস্থান নেই। মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে আবার মন খারাপ হয়ে যায়। এবার যদি বৃষ্টি আরম্ভ হয় তাহলে তার চালের যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাও পানির নিচে চলে যাবে। তখন যে তার কী উপায় হবে তাই বসে বসে ভাবছিলো।

ভাবছিলো নুহের ছেলে কেনানের কথা। যে পাহাড়ে চড়েও প্লাবনের হাত থেকে রেহাই পায়নি। নিজের ঘরের চালে দু হাঁটু মুড়ে বসে থাকলেও কেমন যেন নিজকে কেনান কেনান মনে হচ্ছিলো সোভানের। নুহের তো নৌকা ছিলো। কেনানকে আহ্বান করেছিলো নৌকায় উঠতে। কিন্তু সে গ্রাহ্য করেনি বলেই ভেসে গিয়েছিলো। তাই তারও উচিত হবে না জাহেদার আহ্বানকে উপেক্ষা করা। সকালের দিকে জাহেদা ভেলায় চড়ে যাওয়ার সময় একবার তার চালের সঙ্গে ভিড়েছিল। বলেছিলো, বান্ধের উপরে আইয়া পড়! খবর পাইছি পানি আরো বাড়বো। বান্ধেও পানি চুয়াইতাছে!

সোভান কি বলবে! তার জগতে কেউ নেই যে তার এমন দুরবস্থা নিয়ে ভাববে। তবু তার মনে কিছুটা সান্ত্বনা জাগে যে, জাহেদা অন্তত: তাকে নিয়ে কিছুটা হলেও ভাবছে। সে জানিয়ে গেছে, বাঁধের উপর নাকি আজ রিলিফ দেবে। খবর সঠিক হলে ফের এসে জানিয়ে যাবে। আর বলতে গেলে তখন থেকেই সোভান মনের সঙ্গে কথা বলে চলেছে।

জাহেদা দু একদিন পরপরই তার খোঁজ নিতে আসে। মাঝে মধ্যে দুঃখ করে বলেছে, তোমার তফাজ্জল ভাই যে কোই গায়েব হইয়া গেল আর কোনো হুজ পাইলাম না! মরিয়ম কইছিলো ব্যাডায় আরেকটা বিয়া করছে!

এত কষ্টের মাঝেও জাহেদার কথা শুনে না হেসে পারেনি সোভান। বলেছিলো, আমার মনে তো কয়, ব্যাডায় তোমারেই ভাত-কাপড় দিতে না পাইরা পলাইছে! আরেকটা বিয়া করলে নতুন বউরে খাওয়াইবো-পিন্দাইবো ক্যামনে?

জাহেদা চুপচাপ দূরে বাঁধের দিকে তাকিয়েছিলো। মুখটাও কেমন যেন শুকনো শুকনো দেখাচ্ছিলো। আর তা দেখেই সোভান বলে উঠেছিলো, তোমার মুখটা দেহি হুগনা মনে হইতাছে! বিয়ানে কিছু খাইছিলা?

জাহেদা বলেছিলো, আমার চিড়া-গুড় পানিতে পইড়া ডুইব্যা গেছে!

তখনই সোভান পলিথিনে মোড়ানো চিড়া-গুড়ের প্যাকেটটা বের করে জাহেদার হাতে তুলে দিয়েছিলো।

প্যাকেট হাতে নিতে নিতে জাহেদা বলেছিলো, তোমারিত্ত নাই, আমারে দিতাছ কি বুইজ্যা?

সোভান কথায় জোর দিয়ে বলেছিলো, খাও দুই মুঠ! না খাইলে চলবা ক্যামনে?

জাহেদা ছোট ছোট দু মুঠ চিড়া নিয়ে মুখে দিয়ে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে গিলে ফেলেছিলো গুড় ছাড়াই। পানিও খেয়েছিলো সোভানের ভাগে যেন কম না পড়ে এমন হিসেবে।

তারপর বলেছিলো বাঁধের কথা। তখন কেন যেন সোভানের ততটা আগ্রহ হয়নি। সেখানে আগে থেকেই অনেক মানুষ তাদের গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগি নিয়ে থাকতে আরম্ভ করেছে। নতুন লোক গিয়ে কি ঠাঁই পাবে? তা ছাড়া কাড়াকাড়ি করে রিলিফের কতটুকুই বা পাওয়া যায়! তবু এখন মনে হচ্ছে যে, জাহেদার কথাটাই যেন সঠিক! পানি আরো বৃদ্ধি পেলে তার ঘরের চালও ডুবে যাবে। আর বাঁধের ফাটল দিয়ে যদি পানি চুয়ায় তো বিপদ হবে আরো বেশি। বাঁধ ভেঙে গেলে পানির স্রোত ঠেলে কলাগাছের ভেলা নিয়ে উজানে যাওয়া খুব একটা সহজ হবে না। যেতে হলে এখনই। পরে সুযোগ নাও থাকতে পারে!

সে চিড়া-গুড়ের প্যাকেট বের করে খুব দ্রুতই সবটুকু খেয়ে নেয়। বোতলের পানিটা শেষ করে ফেলে দু ঢোকেই। পানির তিয়াস যদিও মিটলো কিন্তু তার পেটের ক্ষুধার কোনো তারতম্য ঘটে না। আর তখনই সে কাঁথা-বালিশ গুটিয়ে পলিথিন দিয়ে ভালো করে প্যাঁচায়। এখানে থাকা আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না!

ঘরের চালের সঙ্গেই বেঁধে রাখা কলার ভেলাটাতেও পচন ধরেছে। নাড়া খেলেই কেমন যেন খসে খসে পড়তে চায়। আগের মত পুরোপুরি ভর সইতে পারে না। একদিক দিয়ে গড়ান দিয়ে পানি উঠে অন্যপাশে চলে যায়। একটু জোরে চালাতে চাইলেও সামনের দিকটা ডুবে থাকে পানির নিচে। পথ আগায় না। দু পায়ের ফাঁকে পলিথিনে মোড়ানো কাঁথা-বালিশ রেখে সাবধানে লগি হাতে ভেলাটাকে সামনের দিকে ঠেলে। কিন্তু জোরে ভর না দিলেও সামনের দিকটা অর্ধেকের মত পানির নিচেই তলিয়ে থাকে। সে ভাবে, বান্ধ পর্যন্ত যাইতে পারমু? সাঁতরাইয়া তো এতডা পথ যাওন সম্ভব না!

লগিতে আরেকটা ভর দিতেই কঞ্চি আর পাটের দড়ি দিয়ে জুড়ে রাখা কলাগাছগুলোর একটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সে ভেলার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ডুবে যাচ্ছে ভেলা। ভিজে যাচ্ছে কাঁথা-বালিশ। লগিটাকে ভেলার উপর শুইয়ে দিয়ে সে ঝুপ করে লাফিয়ে পড়ে পানিতে। কলাগাছ ধরে পা দুটো নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিয়ে মাটির নাগাল পেতে চেষ্টা করে। কিন্তু পানিতে মাথা ভাসিয়ে রেখেও সে মাটির নাগাল পায় না। ভেলা ধরে আস্তে আস্তে পায়ে পানি কেটে সামনের দিকে এগোতে থাকে সে।

আশপাশের কোনো বাড়িতেই মানুষজন চোখে পড়ে না। যে কটি উঁচু বাড়ি আছে, তাতেও দেখা যায় মানুষ আর গরু-ছাগলে এলাহি কাণ্ড! সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেও এমন কি বাঁধের দিকে যাচ্ছে কি না জিজ্ঞেস করলেও কেউ বললো না যে, তাদের এখানে জায়গা আছে। সে ইচ্ছে করলে উঠতে পারে!

এরই মধ্যে টিপটিপ করে বৃষ্টি আরম্ভ হয়।

সোভান নিজের জন্যে ভাবে না। ভাবে তার কাঁথা-বালিশের জন্য। কয়েকটা দিন কষ্ট করার পর আজ রোদে দিয়ে দু টোকেই কিছুটা শুকিয়ে নিতে পেরেছিলো। ফের যদি ভিজে যায় তো তাকে আবারও কষ্ট করতে হবে। এমনিতেই তো কষ্টে আছে। তার উপর যদি নতুন কষ্ট যোগ হয়, তাহলে সেটা বোঝার উপর শাকের আঁটির চাইতেও খারাপ হবে সন্দেহ নেই। তা ছাড়া সে যাচ্ছে মানিকচর বাঁধের উপর। সেখানে তার এমন কেউ নেই যে তার জন্যে অপেক্ষা করে বসে আছে। সেখানে সে কোথায় উঠবে, কোথায় বা মাথা গুঁজবে তারই কোনো নিশ্চয়তা নেই।

।। ২ ।।

পুরো বাঁধ জুড়েই মানুষ গরুছাগল। অনেকে দু পাশে চালের টিন খাড়া করে দিয়ে ছাউনি বানিয়ে নিচে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ বা নিয়ে এসেছে নৌকার ছই। কারো কারো পলিথিনের কাগজই ভরসা। কেউ বা বৃষ্টিতেই বসে বসে ভিজছে।

সোভানের খারাপ লাগছিলো শিশুদের কষ্ট দেখে। বেশির ভাগই ন্যাংটো আর উদোম গায়ে ভিজছে। মায়ের কোলে থেকেও ভিজছে অনেকে। যদিও তাদের মাথা মায়ের ভেজা আঁচল দিয়ে ঢাকা আছে। তবু তা বৃষ্টির পানিতে আরো ভিজছে। কোনো কোনো শিশুর মাথায় টুপির মত করে পলিথিনের ব্যাগ পরানো আছে। অন্যদের চেয়েও অনেকাংশে তারা নিরাপদ। তাদের মাথা ভিজলেই নাক দিয়ে পানি পড়তে আরম্ভ করবে। আর তা থেকে জ্বর-কাশি-নিউমোনিয়া-আমাশা যে কোনোটিই হতে পারে।

একহাতে লগি আর অন্য হাতে পলিথিনে মোড়ানো কাঁথা-বালিশ নিয়ে বাঁধে উঠে আসে সোভান। তাকে ভেলা ধরে ভেসে আসতে দেখেও কেউ সম্ভাষণ জানায়নি। কেউ জিজ্ঞেসও করেনি যে, সে কোত্থেকে এলো বা কতদূর থেকে এলো। তবে তাদের চেহারায় অখুশি ভাবটাই যেন প্রকট হয়ে উঠতে দেখে সোভান। নবাগত কেউ এলে রিলিফের শরিক একজন বাড়ে বলে সেটা হয়তো কারো প্রত্যাশার ভেতর পড়ে না।

সোভান বাঁধের প্রান্ত ধরে সামনের দিকে এগোতে এগোতে একসঙ্গে দুটো কাজ করে। একটি নিজের জন্যে ঠাঁই খুঁজে ফেরা, আর অন্যটি জাহেদাকে কোথাও দেখা যায় কিনা। বেশ কিছুটা এগোবার পর একটু ফাঁকা জায়গা পাওয়া যায়। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সোভান সেখানে দাঁড়ালে লোকজন তাকে সরে আসতে বলে। মিয়া, চক্ষের মাথা খাইছনি! বান্ধ যে চুল্লাফাডা দিছে দ্যাহ না?

সোভানের চোখে পড়ে বাঁধের ফাটল। কিন্তু তার মনে হয় এতে খুব একটা অসুবিধা হবে না। তবু লোকজন তাকে এত করে বলছে যখন তখন সে সরে আসতে বাধ্য হয়।

বৃষ্টির তোড় বাড়লে ঠাণ্ডায় তার শরীর কাটাকাটা দিয়ে উঠতে থাকে। গতরাতে কাঁথা গায়েও খুব শীত বোধ হচ্ছিলো তার। ভেবেছিলো ভেজা আর ঠাণ্ডা কাঁথা বলে এমনটা হচ্ছে। সকাল বেলা টের পেয়েছে মুখের ভেতরটা কেমন তিতকুটে হয়ে আছে। ঠোঁটের পাশে দেখা দিয়েছে জ্বর-ঠোসা। ব্যাপারটা অবশ্য জাহেদাই তাকে ধরিয়ে দিয়েছিলো। বলেছিলো, রাইতে তোমার গায়ে জ্বর বাইছে নাহি? মুহে দেহি জ্বর ঠোসা-বাইর হইছে!

তারপরই নিজের অজান্তে ঠোঁটের প্রান্তে একটি হাত চলে গিয়েছিলো সোভানের। অনুভব করতে পেরেছিলো জ্বর-ঠোসার অস্তিত্ব। এখন কিছুক্ষণ পরপরই একটা হাতের আঙুল ঘুরে আসছে জ্বর-ঠোসাটার উপর। বাঁধের উপর এত এত নারী-পুরুষ-শিশু এবং তাদের কথোপকথনের শব্দ, চিৎকার, হাঁক-ডাক থাকা সত্ত্বেও নিজকে কেমন নিঃসঙ্গ আর একাকী মনে হতে থাকে। পানিতে ডুবে থাকা ঘরের চালে দশটি দিন কাটালেও নিজকে এতটা একাকী মনে হয়নি সোভানের। সকাল-বিকাল দু একটি পরিচিত মুখ দেখতে পেয়েছে। কিন্তু বাঁধে উঠে এসে খুব সামান্য সময়ের ভেতরই যেন হাঁপিয়ে উঠেছে সে।

জাহেদাকে কোথাও দেখা যায় কি না সে উন্মুখ হয়ে এদিক ওদিক তাকায়। কিন্তু কীভাবে সে অত মানুষের ভিড়ে জাহেদাকে খুঁজে বের করবে? এখানকার সব নারীই যেন জাহেদা। চুপসানো মুখ। বসে যাওয়া গাল। কোটরে বসা চোখ। সরু সরু হাত পা। পেট-পিঠ প্রায় সমান। এখন যে কি করবে কিছুই ঠিক করতে পারে না সোভান। এ মুহূর্তে কোনো একটি ছাউনি বা চালার নিচে যদি আশ্রয় পেতো তাহলে বৃষ্টির তোড় থেকে নিজকে কিছুটা হলেও রক্ষা করতে পারতো।

এমন এক বিপদের দিনে আউয়াল ডাক্তার জেলে না থাকলে সোভানকে এ রকম নিরাশ্রয় হতে হতো না। ভুল চিকিৎসা করে রোগী মেরে ফেলার অজুহাতে তাকে ধরে নিয়ে গেছে পুলিশ। ডাক্তারখানা তালা মেরে বন্ধ করে দিয়েছে। ডাক্তার যেহেতু ভুল চিকিৎসা করে, তার কম্পাউন্ডার হিসেবে সোভানও মানুষকে ভুল ওষুধ দেয়। কাজেই সেও সমান অপরাধী। কিন্তু সে সময় ডাক্তারের বাড়ি থেকে ডাক্তারখানায় যাওয়ার পথে পুলিশের হাতে আউয়াল ডাক্তারের হেস্তনেস্ত হওয়ার খবর শুনেই আর ও-মুখো হয়নি সে। সোজা উল্টো পথে বাড়ি চলে এসেছিলো। পুলিশ বা ক্ষিপ্ত জনতার হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারলেও সে ধরা পড়েছে বন্যার হাতে। বানের পানিতে বন্দী হয়ে থাকার চাইতে জেলে যাওয়াটাই হয়তো তার জন্যে অনেকটা নিরাপদ ছিলো।

বাঁধের পাশ দিয়ে দুটো কাঠের টুকরো ভেসে যেতে দেখেই চার-পাঁচজন কিশোর আর বয়স্ক লোক ঝাঁপিয়ে পড়েছে পানিতে। কে কার আগে সাঁতরে গিয়ে কাঠের টুকরোয় হাত রাখবে তা নিয়েই যেন শুরু হয়েছে আরেক প্রতিযোগিতা। উৎসুক জনতাও সেদিকেই যেন হামলে পড়ে। একজন একটি কাঠের টুকরো ধরতে পারলেও আরেকটি কাঠের টুকরোর দু মাথাতেই একজন বয়স্ক আর একজন কিশোর হাত রাখলো। আর তা নিয়ে শুরু হলো কাড়াকাড়ি আর কথা কাটাকাটি। এ বলে আমি আগে, ও বলে আমি আগে। এ নিয়ে দর্শকের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা নারী-পুরুষও দুটো দলে ভাগ হয়ে গেল।

সোভান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘটনাটা দেখছিল। দু জনই কাঠের টুকরোর দু মাথা ধরে বাঁধের উপর উঠে এলেও বিতর্ক বন্ধ হয়নি। সোভান হঠাৎ বলে উঠলো, দুই টুকরা কইরা ভাগ কইরা নিলেইত্ত হয়!

দু জনের কেউ রাজি না হলেও ভীরের মধ্য থেকে গুঞ্জরন উঠলো, ঠিক কথাই কইছে! ভাগ কইরা নেও!

বয়স্ক লোকটি সোভানের দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে তিক্ত কণ্ঠে বললো, ওই মিয়া, বাড়ি কই তোমার? দিলা তো দুইডা টুকরা কইরা!

সোভান হাসে। বলে, হগলতেই তো এক কথা কইতাছে!

লোকটি কাঠের টুকরোটা ছেড়ে দিয়ে বললো, এই কাঠ নিমু না!

অংশীদার কিশোরটি সবিস্ময়ে বলে উঠলো, তাইলে সবডাই আমার?

হ, যা!

খুশি মনে ছুটে গেলো কিশোর বালক। কিন্তু রুষ্ট বয়স্ক লোকটি এগিয়ে এসে রুক্ষ কণ্ঠে সোভানকে বললো, তুমি কোহানের মাতব্বর? গ্যারামের নাম কি?

সোভান হেসে বলে, কাছেই! ফুলপুর।

ফুলপুর কার বাড়ি?

হাশেম সর্দারের বাড়ি!

সর্দার সাবে তোমার কি হয়?

আমি তানির পোলা!

বয়স্ক লোকটি কেমন নেতিয়ে যায়। বিগলিত কণ্ঠে বলে, তাইলে তুমি সোভান?

সোভান মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, তাইলে বাবারে চিনতেন?

চিনতাম মানি? আমার খুবই বন্ধু মানুষ আছিলো! আমি কেরামত মেম্বর! তোমাগো বাইত্যে কত্ত গেছি! তুমি আমারে চিন না?

মনে করতে পারি না! ছোডবেলা থাইক্যাই তো আউয়াল ডাক্তরের কাছে আছিলাম। বাড়ি-ঘরে বেশি আইতাম না!

আমি অনেকবার তোমারে আনার লাইগ্যা গেছিলাম। কিন্তু গিয়া কোনো বারই বাইত্যে পাই নাই! আউয়াল ডাক্তরের কাছে আছিলা জানলে আগেই লইয়া আইতাম!

সোভান কেরামত মেম্বরের কথার কি মানে বোঝে কে জানে। বলে, আমার পড়া-ল্যাহা তো বেশি না। জাগীর থাকমু ক্যামনে?

ওই ছ্যারা! আমার কি কোনো গুড়া পোলাপাইন আছেনি যে তাগোরে পড়ানি লাগবো! আমার তো পোলা নাই! তুই থাকলে একটা ভসসা পাইতাম!

কেরামত মেম্বরের কথা শুনে অবাক হয়ে যায় সোভান। ব্যাডা কইতাছে কি? এই জমানায় অ্যামনে অ্যামনে কেউ কাউরে বাইত্যে জাগা দেয়? আইজ এতডা পথ পানি দিয়া ভাইস্যা আইলাম কেউ একবার জিগাইলো না! আর এই বুড়ায় কয় কি? মাথায় ছিট নাই তো? কেরামত মেম্বরের চুল-দাড়ির নমুনা দেখে এর চেয়ে ভালো কিছু ভাবতেও পারে না সে।

আমার দুইডা ঘরই পানিতে তলাইয়া গেছে! নতুন বাইত্যে মাডি ফালাইছিলাম। কিন্তু ঘর তুলনের সুযুগ পাই নাই!

কেরামত মেম্বর কলকণ্ঠে মেতে উঠলেও সোভান কিছুই ঠাহর করতে পারে না। এর আগে কখনও লোকটাকে দেখেছে বলেও মনে করতে পারছে না।

এহানে উঠছ কোই? কেরামত মেম্বর হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলে উঠলো। থাকতাছ কোনহানে?

এই কিছুক্ষণ আগেই আইলাম!

টিন-দরজা কিছু আনতে পারছো?

না! ক্যাঁথা-বালিশ আইন্যাও বিপদে পড়ছি! কার কাছে রাখমু? বৃষ্টির পানিতে আবার ভিজতাছে!

কই তোমার ক্যাঁথা-বালিশ? আমার লগে লও!

সোভান পলিথিনে প্যাঁচানো তার কাঁথা-বালিশ কাঁধে নিয়ে লগিটা এক হাতে করে কেরামত মেম্বরের পিছু পিছু চলে। বাঁধের বৃষ্টি-সিক্ত পিছল পথ দিয়ে দু জনেই পা টিপে টিপে সাবধানে হাঁটে। সকালের দিকে কড়া রোদ পেলেও কাদা শুকোবার লক্ষণ দেখা যায় না। লোকজনের পায়ের চাপে ক্রমাগত দলিত-মথিত হয়ে নরম মাটি কাদা হতে হতে এখন ঘন পায়েসের মত হয়ে গেছে। হাঁটার সময় পায়ে আঠার মত লেগে থাকে।

কেরামত মেম্বর চলতে চলতে জিজ্ঞেস করে, বিয়ানে কিছু খাইছিলা?

রিলিফের চিড়া-গুড় আছিলো। হেইডিই খাইয়া মেলা করছি!

আইজ এহানেও রিলিফের মানুষ আওনের কথা আছে! তারপর ফিরে সোভানের দিকে একবার তাকিয়ে সে নিচু কণ্ঠে বলে, রিলিফ আমার কাম নাই! চাইল আর গোল-আলু আছে! তাও ঘরভাঙ্গা মানুষ যহন, রিলিফ না লইলে অন্যরা ভাববো আমার ম্যালা আছে। রাইতেই লুঠ করতে আইয়া পড়বো। অভাবী মানুষ, সুযোগ পাইলে চুরি ডাকাতিও করে!

কেরামত মেম্বরের কথা শুনে ধন্দে পড়ে যায় সোভান। এত থাকলেও লোকটা বাঁধে কেন? বানের পানিতে ঘর কেন ডুবে যায়? অনেক ভেবেও কোনো দিশা পায় না সে।

বাঁধের প্রায় বিপরীত প্রান্তে একটি চৌচালা ঘরের টিনের চাল ফেলে রাখা হয়েছে। একদিকে দরজার মত কিছুটা ফাঁক থাকলেও তা পলিথিনে ঢাকা।

কেরামত মেম্বর চালের কাছে এসে বললো, এইডাই এহনকার মতন আমার মাথা গোঁজনের ঠাঁই! ভিতরে তর চাচি আছে। বিয়ার লায়েক দুইডা মাইয়া আছে!

সোভানের মুখটা হঠাৎ করেই যেন শুকনো মনে হয়।

কেরামত মেম্বর বললো, ডরাইস না! রাইতে আমরা দুইজনের কেউ ঘুমাই না! মাইয়া দুইডারে আর চাইল-আলু পাহারা দেই!

।। ৩ ।।

চালের ভিতর খুব একটা আলো প্রবেশ করতে পারছে না বলে সেখানে আবছা মতন তিনটি নারী-মুখ দেখতে পায় সোভান। ঠিক তখনই কেরামত মেম্বর ভেতরে ঢুকে চালের একটি টিন বাইরের দিকে ঠেলে লাঠি দিয়ে ঠেস দিয়ে রাখে। টিনের ফাঁক দিয়ে আলো প্রবেশ করার ফলে ভেতরকার অন্ধকার দূর হলেও তিনটি নারী-মুখের আদলের অন্ধকার দূর হয় না।

কেরামত মেম্বর দেখতে যেমন কালো তার স্ত্রী জয়তুন বিবিও তেমন। কাজেই মেয়ে দু টোর চেহারা বা গায়ের রঙ যে পিতামাতার চেয়ে পরিষ্কার হবে তা ভাবাটাই বোকামি। মাটির উপর বিছিয়ে রাখা খড়ের উপর হাতের পুটলিটা রেখে একপাশে থেবড়ে বসে পড়ে সোভান। বয়স্ক নারীটি আঁচলে মুখের এক প্রান্ত ঢেকে বললো, লগে কারে লইয়া আইলেন?

হাশেম সর্দারের পোলা! বলার সময় মেম্বরের কণ্ঠ তরল হয়ে আসে।

এইডা কি সোভান?

আরে হ!

হ্যারে পাইলেন কোই?

এহানেই! বান্ধে।

এই কয়দিন আছিলো কই?

কেরামত মেম্বর স্ত্রীর প্রশ্নে অতীত বর্তমানের পার্থক্য ধরতে না পেরে বলে, আউয়াল ডাক্তারের কাছে!

হ্যায় না জেলে!

তার লাইগ্যাই মনে কয় নিজের বাইত্যে ফিরা আইছিলো!

সোভান মাথা ঝাঁকায়।

কেরামত মেম্বর কণ্ঠস্বর নিচু করে বলে, খাওনের কিছু আছে? পোলায় তো খায় নাই কিছু! জয়তুন বিবি মুখ থেকে আঁচলের আচ্ছাদন সরিয়ে বলে, কয়ডা ভাত রানছিলাম। লগে আলু সিদ্ধ! হঠাৎ ভাতের নাম শুনে সোভানের জিভে পানি চলে আসে। দশদিন ধরে রিলিফের চিড়া-গুড় আর বিস্কুট খেয়ে আছে সে। এ কদিন ভাত কি জিনিস বলতে পারবে না।

জয়তুন বিবি সানকিতে ভাত আর সিদ্ধ আলু দিলে বদনি হাতে নিয়ে ডান হাতটা সামান্য পানি দিয়ে ধুয়ে নিয়েই ভাত মাখাতে বসে সোভান। ঠাণ্ডা ভাত। ডাল-তরকারি কিছুই নেই। শুধু লবণ। তাও বর্ষার জলসিক্ত আবহাওয়ার কারণে পানি উঠা ভেজা লবণ। ভাতের গ্রাসের সঙ্গে মাছ-গোস্ত বা তরকারির মত করে আলুর টুকরো দিয়ে মুখে নিয়ে চিবায়। আর তাই যেন তার কাছে অমৃত মনে হয়।

হঠাৎ দশদিন পর পেট পুরে ভাত খাওয়াতে সোভানের শরীর কেমন যেন অবসন্ন হয়ে আসে। ঝিমুনির সঙ্গে কিছুটা কাঁপুনিও টের পায় সে। আমি ইট্টু কাইত হই! বলে, কাঁথা-বালিশের পুটলিটার উপর মাথা রেখে কাত হলে জয়তুন বিবি হাহা করে বলে উঠলো, খ্যাড়ের উপরে হুইলে তো শইল কুটকুট করবো! কিছু একটা বিছাইয়া লও!

জয়তুন বিবি একটি পুরোনো কাপড় ভাঁজ করে সোভানের দিকে ছুঁড়ে দিলে, সে তা বিছিয়েই শুয়ে পড়ে। আর চোখ বুঁজতেই মিহি কণ্ঠে শুনতে পায়, ব্যাডা খাইয়াই বেহুঁশ হইয়া গেল নাহি?

তারপরই চাপা হাসির রিনরিনে শব্দ পাক খায়।

হই মাইয়ারা, চুপ কর! জয়তুন বিবি অস্ফুটে ধমকে ওঠে।

তারপর আবার নিশ্চুপ। বাইরে অস্পষ্ট কোলাহল। শিশুর চিৎকার। চিনের চালে টিপটিপ করে পড়া বৃষ্টির শব্দ। কিন্তু জোর করেও চোখ মেলে রাখতে পারে না সোভান। ঘুম যেন সর্বশক্তি দিয়ে তাকে ঠেসে ধরেছে।

।। ৪ ।।

বৃষ্টি থেমে যেতেই পানির উপর দিয়ে একটি ছোটখাটো লঞ্চ আসতে দেখে বাঁধের উপরকার কৌতূহলী আবালবৃদ্ধবনিতা উৎসুক হয়ে সার বেঁধে দাঁড়ায়। কেউ বললো, পথ হারাইছে! কেউ বললো, রিলিফ আইতাছে! তারপরই যেন সব মানুষ বাইরে বেরিয়ে এসে লঞ্চের দিকে মুখ করে দাঁড়ায়।

কেরামত মেম্বর বাইরের কোলাহল শুনতে পেয়ে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, হুনছস? রিলিফ আইতাছে! যাবি?

জয়তুন বিবি পারতপক্ষে বাইরে বের হয় না। এত লোকজনের সামনে বের হতে তার কেমন লজ্জা লজ্জা করে। তাই সে মেয়েদের দিকে ফিরে বললো, তরা যা!

কেরামত মেম্বর বের হতে হতে বললো, পোলাডারে কোনোখানে যাইতে দিস না। অনেক কামে আইবো!

তারপরই দু কন্যা নিয়ে বেরিয়ে যায় কেরামত মেম্বর। তিনজনই জনতার কাতারে গিয়ে সামিল হয়ে লক্ষ্য করে যে, একটি লঞ্চ আসছে। বাঁধের কাছাকাছি আসতেই লঞ্চের ছাদে একজন লোক উঠে হ্যান্ড মাইকে জানালো, আমরা আপনাদের জন্যে ওষুধ নিয়ে এসেছি!

কেরামত মেম্বর বিরক্ত হয়ে বললো, মানুষ খাইতে পায় না, আর আমার হমুন্দিরা নিয়া আইছে ওষুধ! আরে মিয়ারা যার প্যাডে খাওন নাই, ওষুধ খাইলে কি তার প্যাট ভরবো?

বাঁধের উপরকার লোকজন সবাই হাত নেড়ে বলতে লাগলো, ওষুধ না, খাওন চাই!

লঞ্চটা কেমন যেন গতি কমিয়ে এগিয়ে আসতে লাগলো। পাড়ে ভিড়বে কি ভিড়বে না এ নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভুগছে। এরই মধ্যে খাবারের দাবীটা প্রবল হয়ে উঠলে আবার হ্যান্ড মাইক সরব হয়ে ওঠে। আপনারা ধৈর্য ধরেন! আমাদের পরের লঞ্চেই খাবার আসছে!

কিন্তু লোকজন মাইকের কথায় কর্ণপাত না করে সরোষে বলতে থাকে, ফিরা যাও! ফিরা যাও!

লঞ্চটা পানির উপরই স্থির হয়ে ভেসে থাকে কিছুক্ষণ। লঞ্চের ছাদে দাঁড়ানো সামরিক পোশাক পরা একটি লোক চোখে কালো চশমা লাগিয়ে ফোনে কারো সঙ্গে কথা বলছে। জনতার ভিড় থেকে খাবারের দাবীটা থেকে থেকেই ধ্বনিত হচ্ছিলো। টিপটিপ করে আবার বৃষ্টি আরম্ভ হতেই সামরিক পোশাকের লোকটা লঞ্চের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেলে পুলিশের লোকটি হ্যান্ড মাইক তুলে বললো, এখানে মেম্বার-চেয়ারম্যানের লোকজন কেউ থাকলে সামনে আসেন!

কেরামত মেম্বর খানিকটা এগিয়ে গেলে লোকটি আবার বললো, এই বাঁধে কতজন মানুষ আছে?

কেরামত মেম্বরের ধারণা অনুযায়ী এখানে বড় ছোট মিলিয়ে কম করে হলেও তিন হাজার মানুষ আছে। সে দু হাত মাইকের মত মুখে লাগিয়ে চিৎকার করে বললো, তিন হাজার!

এত হবে না!

জনতার ভিড় থেকে কেউ কেউ চিৎকার করে বলে উঠলো, গইণ্যা দেইখ্যা যাও!

লঞ্চটির ইঞ্জিন চালু হওয়ার গর্জন ভেসে আসে। আস্তে ধীরে লঞ্চের মুখ বাঁক নিতে থাকে। বড় একটি পাক খেয়ে সেটা যেদিক থেকে এসেছিলো সেদিকেই যেতে থাকে। পেছন থেকে লোকজন চেঁচাতে থাকে, ভাত চাই! ভাত চাই!

লোকজনের চিৎকার উঁচু পর্দায় হতে থাকলে সোভানের ঘুম ভেঙে যায়। সে উঠে চোখ ডলতে ডলতে বলে, বাইরে এত চিল্লাচিল্লি− ক্যান?

জয়তুন বিবি বললো, রিলিপ চায়!

সোভানের চোখ থেকে নিদ্রা ছুটে যায়। বলে, রিলিপ আইছে?

না।

আমি দেইখ্যা আই!

তুমি কই যাইবা? যাইতে হইবো না!

জয়তুন বিবির কণ্ঠে ত্রাস ফুটে উঠে যেন।

কিন্তু জয়তুন বিবির কথা গ্রাহ্য করে না সোভান। পলিথিনের পর্দা সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। বাঁধের প্রান্তের দিকে ছুটে যেতে যেতে শুনতে পায় লোকজন চিৎকার করে বলছে, ভাত চাই! ভাত চাই!

সোভানের হাসি পায়। মনে মনে বলে, ভাত দিলে কইবা ছালুন দ্যাও! ছালুন দিলে কইবা নুন কম নাইলে বেশি ক্যান? মাছ-গোস্ত দ্যাও! মাছ-গোস্ত দিলে কইবা কাঁডা আর হাড্ডি ক্যান? তোমরা জনতা খুবই প্যাঁচের মানুষ!

ভিড়ের আড়াল থেকে কেরামত মেম্বরকে বেরিয়ে আসতে দেখে সোভান এগিয়ে গিয়ে বললো, রিলিপ দিলো না?

কেরামত মেম্বরের মুখটা হাসিহাসি না কান্নার মত হলো বুঝতে পারে না সোভান। মেম্বর বললো. প্যাডে নাই ভাত, হমুন্দিরা নিয়া আইছে ওষুধ!

বিস্মিত সোভান বলে, তাইলে ওষুধ রাখেন নাই?

আরে ওষুধ খাইলে কি প্যাট ভরবো? কেরামত মেম্বরের কণ্ঠ চড়ে।

সোভান মুখে চুকচুক শব্দ করে বললো, খুব বড় একটা ভুল হইছে! মানুষজনের প্যাট খারাপ-ডায়রিয়া হইলে ওষুধ পাইবেন কই? খাওনের স্যালাইন পাইবেন কই? মানুষ মরা শুরু হইলে তো গাঙ্গে ভাসাইয়া কুলাইতে পারবেন না! আমরা তো বানের পানিই খাইতাছি। আর এই পানিতে ডায়রিয়া অওনের ডর সবার থাইক্যা বেশি!

কেরামত মেম্বর চুপসানো মুখে দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বললো, তাইলে তো কামডা খুবই ভুল হইয়া গ্যাল! মানুষজন খাওন খাওন কইরা এমন শুরু করলো যে… সে কথা শেষ না করেই থেমে যায় যেন।

রিলিপের মানুষগুলারে ফিরানি যায় না?

পানির বুকে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাওয়া লঞ্চের দিকে আঙুল তুলে কেরামত মেম্বর বললো, উই যে, লঞ্চ যাইতাছে!

সোভানের মন খারাপ হয়ে যায়। সে ভাবে, লঞ্চের মানুষগুলা যদি চোর হয়, তাইলে ওষুধপাতি সব বেইচ্যা দিয়া সরকারের ঘরে লেখাইবো যে সবই দেওয়া হইছে!

সোভান আবার বললো, সরকারী মানুষগুলা পানি পরিষ্কার করনের ওষুধও মনে হয় আনছিলো!

পানি পরিষ্কারের বিষয়টা কেরামত মেম্বরের বোধগম্য হয় না। সে বললো, আমরা পরিষ্কার পানিইত্ত খাই! নতুন কইরা পরিষ্কার করবো কি?

কেরামত মেম্বরের মূর্খতায় মনে মনে কপাল চাপড়ায় সোভান। বলে, পানি যখন কমতে আরম্ভ করবো, তার লগে আরো পচা পানি, মরা জীব-জন্তু, মানুষের পেশাব-পায়খানা মিশ্যা পানি খারাপ হইয়া যাইতে থাকবো। তহন হেই পানি খাইলে রোগ-বালাইর হাত থাইক্যা বাঁচনের পথ নাই। পানি পরিষ্কার করনের ওষুধ দিয়া হেই পানি খাইলেই আর ডরের কিছু থাকতো না!

এ মুহূর্তে সোভানকে খুবই জ্ঞানী বলে মনে হয় কেরামত মেম্বরের কাছে। ওষুধটাও যে কত জরুরী তা বুঝতে পেরে মনে মনে হায় হায় করতে থাকে সে।

কেরামত মেম্বর কোনো কথা না বললে, মনে মনে সামনে বেকুবের মত দাঁড়িয়ে থাকা মাঝ বয়সী মূর্খ লোকটাকে গালমন্দ করতে করতে ফিরে যাওয়া লঞ্চটার দিকে তাকিয়ে থাকে সোভান। আর তার পাশ দিয়েই আনমনে জাহেদা হেঁটে গেলেও সে খেয়াল করে না।

।। ৫ ।।

ওষুধের লঞ্চ ফিরে যাওয়ার পর তিনদিন পেরিয়ে গেলেও খাবার নিয়ে কোনো লোকজন আসেনি। বাঁধে আশ্রয় নেওয়া অধিকাংশ মানুষই ক্ষুধায় প্রায় অবসন্ন শরীরে ধুঁকছে। কারো কারো জ্বর আর পেট খারাপ দেখা দিয়েছে। অসুস্থ লোকজনের খোঁজ-খবর করতে গিয়ে সে অনুভব করে যে এখন খাবারের সঙ্গে ওষুধ আর খাওয়ার স্যালাইন খুবই জরুরী! কয়েকটি বাচ্চার পেটখারাপ দেখে সোভানের মনে হয়েছে ওটা সাধারণ পেট খারাপ নয়। ডায়রিয়া। সময় মত সাবধান না হলে বাঁচানো খুবই কষ্ট হয়ে যাবে। শেষ সময়ে হাসপাতালে নিলেও কোনো আশা থাকবে না। তা ছাড়া হাসপাতালও এখান থেকে খুব একটা কাছে নয়। আসতে যেতেই অনেক সময় লেগে যাবে।

খাওয়ার স্যালাইন হিসেবে গুড় লবণের শরবতের কথা ভেবে সবাইকে জানিয়ে দিলো যে, যার যার কাছে আখের গুড় আছে তা যেন কেউ এমনি এমনি বা চিড়া-মুড়ির সঙ্গে খেয়ে না ফেলে। তার এই অভিনব ঘোষণার কথা শুনে অনেকেই তাকে ঘিরে ধরলো। তখন গুড় লবণের উপকারিতার কথা বোঝাতে চাইলে কেউ কেউ তাচ্ছিল্য করে বললো, গুড় আর নুন দিয়া কি ওষুধ হয় নাহি?

হয়!

ব্যাপারটা ভালোমতো বুঝিয়ে বলতেই কেউ কেউ বললো, রেডিওতে কইতে হুনছি! কিন্তুক তহন এমন কইরা বুঝতে পারি নাই!

খাওনের স্যালাইন যদি আমরা পাইতাম, তাইলে এতডা পেরেশান হইতে হইতো না!

তারপরই সে বললো, চলেন, আমরা থানায় যাই!

আর থানার কথা শুনেই অন্যান্যদের মুখগুলো কেমন শুকিয়ে গেলো। যেন এক একটি ইঁদুর গর্তের সামনে বসে অপেক্ষা করছে সুড়ুত করে সেঁধিয়ে যাওয়ার জন্যে।

সবার অবস্থা দেখে সোভান বললো, থানার কথা হুইন্যা এমন মুখ হুগাইয়া রইছেন ক্যান? থানা মানিই দারোগা-পুলিশ আর জেল-হাজত না! থানায় সরকারি হাসপাতাল আছে। হাসপাতালের বড় ডাক্তার ইচ্ছা করলে আমাগোরে ওষুধ দিতে পারে। থানার বড় সাব ইচ্ছা করলে আমাগো লাইগ্যা রিলিপের জোগানও দিতে পারে। যদি সবতে মিল্যা কই যে, আমরা তিনদিন ধইরা না খাইয়া আছি, তাইলে কাজ কিছুডা হইতেও পারে!

কে কে যাবে, তা নিয়ে প্রথমে কিছুটা বিতর্কের সৃষ্টি হলেও সবাই সোভানকেই সমর্থন করে। কিন্তু কেরামত মেম্বরের কথা উঠলে সে কিছুটা হকচকিয়ে গিয়ে বললো, আমি তো আর পাশ করা মেম্বর না!

তাইলে হইলো কি? আমরা অহন তোমারে মেম্বর বানাইলাম! বলে, উপস্থিত লোকজন কেমন অস্থির হয়ে উঠলো।

আমরা আগে আমাগো পাশ করা চেয়ারম্যানরে জানাইতে পারি!

সোভান প্রস্তাব দেয়। কিন্তু খানিকটা গুঞ্জরনের ভেতর দিয়ে জানা যায়, ওই হালায় চোর! সরকারি টিন বেইচ্যা খাইছে!

সোভান মুখ নিচু করে ভাবে কিছুক্ষণ।

তারপর চিন্তিত মুখে মাথা তুলতেই দেখা যায় কেরামত মেম্বরের বড় মেয়ে মদিনা ছুটে আসছে। ব্যাপারটি দেখে বিব্রত আর উৎকণ্ঠ হয়ে কেরামত মেম্বর বললো, কি হইছে?

হড়বড় করে মদিনা জানায়, মমিনার অবস্থা ভালা না! বিয়ান থাইক্যা দাস্ত হইতাছিলো। অহন ক্যামন জানি করতাছে!

ওরা তিনজনই একই সঙ্গে ছুটে যায়।

কেরামত মেম্বর কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও সোভান তেমন বিচলিত হয় না। সে মমিনাকে দেখেই বুঝতে পারে যে, পানি শূন্যতা দেখা দিচ্ছে। হাত-পা আর শরীর জ্বালা থেকেই মমিনা ছটফট করছে। তবু সে জিজ্ঞেস করে, হাত পাও জ্বলে?

মমিনা মাথা নাড়ে।

সোভান হঠাৎ অস্থিরভাবে বলে উঠলো, গুড়-লবণের পানি খাওয়াইতে হইবো! গুড় আছে? আউখের?

জয়তুন বিবি গুড়ের হাঁড়ি এগিয়ে দিলে সোভান বললো, লবণও লাগবো!

তার কানে তখন ধ্বনিত হতে থাকে, আধা লিটার বিশুদ্ধ পানি, এক চিমটি লবণ, একমুঠ গুড়…। বলে, বোতলের পানি আছে?

বোতল-জাত পানি ওরা এ পর্যন্ত কেউ ব্যবহার করেনি। সবগুলোই এক কোণে সাজিয়ে রেখেছে।

সোভান মনে মনে বিরক্ত হলেও কিছু বলে না। পানিতে গুড়-লবণ মিশিয়ে শরবত বানিয়ে মমিনার দিকে বাড়িয়ে দিতেই সহস্র বছরের তৃষ্ণার্তের মত সে সবটাই খেয়ে ফেলে।

তারপর কেমন লাজুক কণ্ঠে বললো, আরো খামু!

সোভান আবার শরবত বানানোর সময় বললো, আপনেরাও শিখ্যা রাখেন! সময়ে অন্যরেও শিখাইতে পারবেন! এবার কিছুটা বেশি পরিমাণেই শরবত বানায় সোভান। মমিনাকে বলে, যহনই মন চাইবো,তহনই খাইবা! মমিনা কেমন হাসিহাসি মুখে তাকিয়ে থাকে সোভানের মুখের দিকে। আর একটু একটু করে বোতলে মুখ লাগিয়ে পান করতে থাকে গুড়-লবণের শরবত।

তারপর প্রায় ঘণ্টা খানেক পর মমিনা হঠাৎ বলে উঠলো, তুমি কবিরাজ না ডাক্তার?

তারপরই ফিক করে হেসে মুখ আড়াল করে সে।

সোভান বুঝতে পারে যে, গুড়-লবণের পানি কাজ করতে আরম্ভ করেছে। সে মমিনার দিকে তাকিয়ে বললো, আমি কবিরাজও না, ডাক্তারও না!

তাইলে কি?

মমিনা মুখ লুকিয়েই বলে।

সোভান হাসে। বলে, আমি আউয়াল ডাক্তারের কম্পাউন্ডার!

তারপর কেরামত মেম্বরের দিকে ফিরে বললো, আর কোনো বিপদ নাই! কিন্তু লক্ষণডা তো বেশি ভালা মনে হইতাছে না!

কেরামত মেম্বর উদগ্রীব হয়ে উঠলেও কিছু না বলে সপ্রশ্ন দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে। মমিনাত্ত বড়ই! হ্যারই ডায়রিয়া হইয়া গেছে, গুড়া পোলাপানের তো ডর আরো বেশি!

অহন কি করতে পারি? কেরামত মেম্বারের চাহনিটাকে কেমন উদভ্রান্ত দেখায়।

সবতেরে কইয়া দিতে হইবো যে, কেউ জানি বানের পানি না খায়। আর যদি খাইতেই হয়, তাইলে জানি সিদ্ধ কইরা লয়!

জয়তুন বিবি বললো, এত পানি সিদ্ধ করতে গেলে লাকড়ি-খড়ি পাইবো কই?

নাইলে চাপকলের পানি খাইতে হইবো!

কেরামত মেম্বর শুকনো মুখে বললো, গ্যারামে যেই কয়ডা চাপকল আছিলো সবিত্ত পানির নিচে!

সোভান কিছুক্ষণ চিন্তিত মুখে বসে থাকে। তারপর বলে, থানা হাসপাতাল থাইক্যা পানি পরিষ্কারের ওষুধ আনতে হইবো। না হইলে ফিটকারী দিয়াও পানি খাওন যায়! তয় কিছুটা কষ-কষ লাগবো!

কেরামত মেম্বর বললো, বাইন্যারী কফিলের কাছে ফিটকারী থাকবো!

সোভান উৎসাহী কণ্ঠে বলে, তাইলে চলেন!

বেনে দোকানদার কফিলের কাছে গেলেও ফিটকারী ওরা পায় না। সোভান বললো, য্যামনে পার আইন্যা দ্যাও!

পাংশু মুখে কফিল বলে, আইজ তো পারমু না! নৌকাডার তলায় পাতাম মারতে হইবো! কাইল যামু!

সোভান বিরক্ত হয় এই ভেবে যে, মূর্খ মানুষকে কোনো কিছুর গুরুত্ব বোঝানো খুবই কষ্টকর!

।। ৬ ।।

থানা সদরে ওষুধ-পাতি পাওয়া না গেলেও ভালো একটি সুবিধা পাওয়া যায়। বাঁধের আশ্রিত লোকজনের জন্য থানা রিলিফ কমিটির পক্ষ থেকে ত্রাণের ব্যবস্থা হয়। সোভান এবং কেরামত মেম্বর নৌকা বেয়ে বাঁধে পৌঁছুবার আগে আগেই সরকারী লোকজন লঞ্চে করে চাল-ডাল আর বোতল-জাত বিশুদ্ধ পানি নিয়ে এসে ত্রাণ তৎপরতা আরম্ভ করে দেয়। ত্রাণ বিতরণের শেষ মুহূর্তে এসে ওরা দু জন উপস্থিত হলেও চাল-ডাল আর পানি থেকে বঞ্চিত হয়।

ত্রাণ কর্মকর্তা কেরামত মেম্বর আর সোভানের নাম নোট বুকে লিখে নিয়ে বললেন, আপনাদের বউ-বাচ্চারা নিশ্চয়ই পেয়েছে। মন খারাপ করা ঠিক হবে না!

তারপর দু জনের সঙ্গে করমর্দন করে যাওয়ার সময় বললেন, কাল-পরশু একটা চাপ-কলের ব্যবস্থা করতে পারি কিনা দেখি। না হলে তরশু আমার সঙ্গে অফিসে দেখা করবেন!

ত্রাণ-কর্মীরা চলে গেলে কেরামত মেম্বর আর সোভানকে সবাই ঘিরে ধরলো। বয়োবৃদ্ধরা ওদের মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে শতমুখে আশীর্বাদ করতে লাগলেন। সোভান এমন ধরনের আচরণের সঙ্গে পরিচিত নয় বলে তার কেমন যেন লজ্জা লাগছিলো। তাই সে এখান থেকে পালানোর জন্যে বললো, আমি ইট্টু বাইরে যামু!

লোকজনের সাধুবাদের অত্যাচার থেকে পালিয়ে এসে কেরামত মেম্বরের ছাউনিতে এসে ঢুকলে মমিনা বললো, এই যে কম্পেন্ডার, তোমার খিদা লাগে না?

সোভানের সত্যিই ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছিলো। ঘনঘন মাথা নেড়ে বললো, জব্বর খিদা! তারপর খড়ের বিছানায় বসতে বসতে বললো, দেরি কইরা আইলাম দেইখ্যা কিছুই পাইলাম না!

না পাইলে কি হইলো? আমগো অনেক আছে!

মমিনা স্বাভাবিক ভাবেই কথা-বার্তা বলছিলো দেখে সোভান বললো, অহন শইল্যের অবস্থা কি? বাইরে আর গেছিলা? মমিনা লজ্জা পেয়ে নিচের ঠোঁট দাঁতে কামড়ে মাথা নাড়ে।

বানের পানি আর ভুলেও খাইবা না। দুই-চাইরদিনের মইধ্যে এই বান্ধেই চাপকল হইবো!

মদিনা কোনো কথা বলছিলো না। সে মুরগির পাখা দিয়ে কানের ভেতর ফড়ফড় করে চুলকাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো যে, সে এখানে একাই আছে। আশপাশে কেউ নেই। জয়তুন বিবি কয়েকটি সেদ্ধ গোল-আলু সানকিতে করে সোভানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, ভাত হইতে দেরি হইবো!

সানকি থেকে সেদ্ধ আলু তুলে নিয়ে খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে সোভান বললো, চাইরো দিগে যেই অবস্থা, দিনে একবার খাইতে পাইলেই আল্লার কাছে শুকুর করি! দশদিনের মইদ্যে চাইর দিনই আছিলাম না খাইয়া!

রিজিকের মালিক আল্লায়। জয়তুন বিবি মুখ তুলে তাকায় সোভানের দিকে।

তারপর আবার বলে, এমন কথা কইতে নাই!

খোসা ছাড়ানো আলুতে কামড় দিয়ে সোভান বলে, আউয়াল ডাক্তার কি কইতো জানেন কাকি? কইতো, আল্লা হইলেন গরিবের লাইগ্যা। গরিব মানুষ না পায় ট্যাকার জোর, না পায় গায়ের বল! আর তার লাইগ্যাই আল্লা-খোদা বানায় লইছে!

মমিনা বললো, আউয়াল ডাক্তার কাফের দেইখ্যাই জেলে বইয়া পচতাছে!

মদিনার সঙ্গে সোভানের এ পর্যন্ত সরাসরি কোনো কথা হয়নি। কিন্তু তাই বলে কথা-বার্তা বন্ধও থাকে না। সে বললো, মমিনা, কম্পেন্ডাররে জিগা দেহি এই বানের পানি আল্লায় দিছে না মানষ্যে দিছে?

সোভান একমনে আলু ছিলে খেতে থাকলে তার নীরবতা হয়তো মদিনার খারাপ লাগে। বলে, কম্পেন্ডার কি মুখের ভিতরে আলু ঠাইস্যা দিছে নাহি, কথা কয় না যে?

আউয়াল ডাক্তার হইলে কি কইতো জানো? সোভান আলু চিবোতে চিবোতে সরব হয়। কইতো, গতবছর আমাগো দ্যাশে অ্যাত্ত পানি হয় নাই! দিন-রাইত ম্যাঘ-বাদল হইলেও আমাগো ঘর-বাড়ি তলায় নাই! নতুন সরকার গদিতে বইয়া মজিবের মাইয়া হাসিনারে জেলে ঢুকানের কথা কইছে দেইখ্যা ইন্ডিয়ার সরকার ফেরেক্কার পানি ছাইড়া দিছে। তার লাইগ্যাই এইবার অ্যাত পানি!

মদিনা কেমন কঠিন দৃষ্টিতে তাকায় সোভানের দিকে। বলে, কইলা নিজের মনের কথা। নাম দিলা আরেক জনের! পরের নাম ধুইয়া খাওইন্যা মানুষ দুই চক্ষে দেখতে পারি না!

সোভান খাওয়া শেষ করে বললো, গফুর মুন্সি তার মায়েরে ঠিকমতন খেদমত করতেন না। তহন কেউ যদি বুড়িরে জিগাইতো, পোলায় না জিগাইলে চল ক্যামনে? তহন বুড়ি কইতো, কোনোদিন আল্লায় চালায়, কোনোদিন নিজে চলি!

সোভানের কথা মদিনার কাছে অদ্ভুত আর জটিল মনে হয়। ভ্রু কুঞ্চিত করে বলে, এইডা কেমন কথা হইলো? আল্লায় না চালাইলে নিজে চলন যায়?

পানি খেয়ে সোভান বলে, যায়! বুড়ি পোলার বউয়ের লগে রাগ হইয়া যহন না খাইয়া থাকতো, তহন কইতো নিজে নিজে চলতাছে। আর খাওন-দাওন সাইরা কইতো আল্লায় দুইডা খাওয়াইলো!

সোভানের কথা শুনে মদিনা হেসে কুটিকুটি হয়। জয়তুন বিবি হাসিহাসি মুখে আঁচলে মুখ ঢাকে।

মমিনা গম্ভীর মুখে কিছু একটা নিয়ে ভাবছিলো। হঠাৎ সে শোয়া থেকে উঠে বসে বললো, আইচ্ছা কম্পেন্ডার! আর তখনই জয়তুন বিবি ধমক দিয়ে বললো, কম্পেন্ডার কি লো! ভাই কইতে পারস না?

আইচ্ছা ভাই! বিয়ানের দিকে শইল কেমন জানি হইয়া গেছিলো। জোর-বল পাইতে আছিলাম না। গুড়-নুনের পানি খাইয়া অহন হ্যামনডা মনে হইতাছে না!

সোভান বললো, গুড়-লবণের পানির সুবিধা আউয়াল ডাক্তার কি কইছে? কইছে, ঘনঘন দাস্ত হইলে শইল্যের থাইক্যা নুন আর পানি বাইর হইয়া যায়। ওই দুইডা জিনিস যহন পুরাপুরি বাইর হইয়া যায়, তহনই মানুষটা মরে। গুড়-লবণের শরবত খাইলে ওই লবণ-পানির অভাবডা হ্যামন হয় না!

মদিনা কেমন তেরছা ভাবে তাকিয়ে বললো, মানুষটা কি তহন বাঁইচ্যা যায়?

হ!

হায়াত-মউতের মালিক হইলেন আল্লায়। গুড়-লবণের পানি মানুষরে বাঁচায় ক্যামনে?

যেই রুগীর হায়াত আছে, হ্যায়ই চিকিস্সা পায়। আর যার হায়াত নাই হ্যায় ঠিকমত চিকিস্সা পায় না। সময় মতন ডাক্তারের কাছে যায় না। শ্যাষ সময়ে ডাক্তারের কাছে আইয়া মারা যায়। দোষ হয় ডাক্তারের। কেউ কয় না যে, মানুষটার হায়াত ফুরাইছে দেইখ্যা মরছে। কয়, ডাক্তারে মাইরা ফালাইছে! সুলেমান ক্যান জেল খাটতাছে? তোমরা কইতে পারলা না যে, মর্জিনার হায়াত নাই দেইখ্যা সুলেমান তারে মাইরা ফালাইছে! আজ্রাইল সুলেমানের হাত দিয়া মর্জিনার জান কবজ করছেন!

মদিনা কিছু না বলে কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে থাকে সোভানের দিকে। দৃষ্টিতে ঘৃণা নাকি রাগ কোনোটাই বোঝা যায় না।

সোভান আরেক ঢোক পানি খেয়ে উঠে পড়ে বলে, যাই, বাইরের মানুষগুলার অবস্থা কি দেইখ্যা আই!

হ, যাউক না পরের তত্ত্ব-তালাশি করতে! এই পর্যন্ত নিজেরে কয়জনে জিগাইছে?

মদিনার রাগের কারণটা বুঝতে পারে সোভান। কিন্তু কিছু না বলে নিঃশব্দে হাসতে হাসতে সে বাইরে বেরিয়ে আসে।

।। ৭ ।।

বাইরে বেরিয়ে এলেও সোভান কোনদিকে যাবে বা কি করবে মনে মনে ঠিক করতে পারছিলো না। লোকজন অলস আর নিষ্কর্মা বসে থাকলেও নিজকে নিয়েই যেন ব্যস্ত হয়ে আছে সারাক্ষণ। বেশিরভাগ মানুষের চোখই সামনের দিগন্তবিস্তৃত অথৈ জলের দিকে। তাদের প্রত্যাশা কোনো রিলিফের ট্রলার বা লঞ্চ যদি আসে। তখনই সে দেখতে পায় মাথায় করে কয়েকটি ভেজা ডাল-পালা নিয়ে জাহেদা এগিয়ে আসছে।

সোভানকে দেখতে পেয়ে আরো দ্রুত পদক্ষেপে সামনে এগিয়ে আসতে আসতে বললো, আরে সোভান, তুমি কইকই ঘুইরা বেড়াইতাছ? কতবার গিয়া তোমারে খুঁইজ্যা আইলাম। ঘুমাইয়া পানিতে গড়াইয়া পড়লানি হেইডা দেখতে পানিতে ডুবাইয়া তোমারে কত খুঁজলাম! বলতে বলতে জাহেদার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসে। তবু হাসি মুখে সোভানের একটি হাত ধরে বলে, এহানে কহন আইলা?

তফাজ্জল গাঁয়ের সম্বন্ধে ভাই হলেও সোভান জাহেদাকে ভাবি বলে না। পাশের গ্রাম কাজলিতে তার বাপের বাড়ি। সুরেশ্বর প্রাইমারি স্কুলে একই ক্লাসে পড়তো। কিন্তু হঠাৎ করেই সোভানের বাবা-মা দু জনেরই মৃত্যু হলে সে স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলো। কিন্তু জাহেদার সঙ্গে তার প্রায়ই দেখা হতো। ওষুধের জন্য আউয়াল ডাক্তারের ওখানে যেতো মাঝে মধ্যে। যে কারণে ওদের যোগাযোগটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি।

জাহেদা আবার কলকণ্ঠে বলে, তুমি এহানে উঠছ কই?

সোভান জাহেদার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলে, তুমি যাইতাছ কই?

খালার কাছে! খালায় তো বান্ধেই আছে! নৌকার ছই পাইত্যা লইছে!

জয়নাল কই?

নাও লইয়া কই কই ঘুইরা বেড়ায় হ্যায়ই জানে! দুই-একদিন বাদে ইট্টুহানি ফুসকি দেয়। পারলে কিছু চাইল-ডাইল, ত্যাল-নুন দিয়া যায়!

তুমি কি খালার লগেই খাও?

কথা বলতে বলতে ওরা হাঁটছিলো পাশাপাশি। কিন্তু জাহেদা যে শুরুতেই সোভানের একটি হাত ধরেছে। সোভান তার হাত ছাড়াতে একবার আলতো চেষ্টা করেও পারে না। জাহেদা বরং মুঠি আরো শক্ত করে বললো, আইও আমার লগে!

বাঁধের মাঝামাঝি অংশে একটি ছই দেখা যায়। তারই আশেপাশে টিন, বাঁশের চাটাই, এমনকি পলিথিনের ছাউনি দিয়ে মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে। এই যে অ্যাত্তগুলান মানুষ খোলা আসমানের নিচে কষ্ট পাইতাছে, আল্লা কি দ্যাখেন না? যদি দেইখ্যাই থাকেন, তাইলে কোনো ব্যবস্থা নিতাছেন না ক্যান? কাশেম মোল্লার ভাষায় অবশ্য তানি আমাগোরে পাপের শাস্তি দিতাছেন!

তাইলে দু ধের পোলাপানগুলা কোন পাপ করলো?

কাশেম মোল্লা কাঁচাপাকা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলেছিলো, বাপ-মায়ের পাপের শাস্তিও নিষ্পাপ পোলাপানের উপরে বর্তায়!

নুহ নবীর সময় তো দু নিয়া পানিতে ডুইব্যা গেছিলো। তহন তো কোনো নিষ্পাপ মানুষ কষ্ট পায় নাই! আল্লায় আগেই নুহ নবীরে কইছেন নৌকা বানানীর লাইগ্যা। যত ভালা মানুষ সবই নৌকায় উঠছিল। খারাপ মানুষেরা সব পানিতে ডুইব্যা মরছিল। বাপ-মার দোষে তহন তো নিষ্পাপ কেউ ডুইব্যা মরে নাই!

কাশেম মোল্লা কেশে বলেছিলো, তহনকার মানুষের ইমান বড় পোক্ত আছিলো। তহনকার দুনিয়ায় অ্যাত্ত বেইমান আছিলো না!

সোভান বলেছিলো, দু নিয়া তো হেই দুনিয়াডাই আছে। আল্লাও হেই তানিই আছেন। তাইলে দুই কিসিমের ব্যবস্থা হইবো ক্যান?

কাশেম মোল্লা বিরক্ত হয়ে বলেছিলো, আউয়াল ডাক্তার আছিলো একটা কাফের। তার লগে থাইক্যা তুইও কাফেরের মতন কথা কইতে শিখছস! তর লগে কথা কইলে আমার ইমান নষ্ট হইয়া যাইবো! তুই অহন যা!

তারপর থেকেই সোভান কাশেম মোল্লার ধারে কাছে যায় না। দূর থেকে কাশেম মোল্লা তাকে দেখলে কেমন সরু দৃষ্টিতে তাকায়। সোভান তার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারে এ ধরনের মানুষরা নামাজ-কালাম পড়লেও এবং মুখে আল্লা আর রসুলের কথা বললেও মানুষকে খুবই ঘৃণা আর হিংসার চোখে দেখে। সুযোগ পেলেই মনগড়া মত নিজের মতামত কোরআন-হাদিসের কথা বলে চালিয়ে দেয়।

ছইয়ের কাছাকাছি এসে জাহেদা খালা, ও খালা! বলে ডাকলেও ভেতর থেকে কারো সাড়াশব্দ পায় না। কাঁধের ডাল-পালাগুলো ছইয়ের একপাশে ফেলে সোভানের দিকে পেছন ফিরে আঁচল খুলে নিংড়ে পানি ঝরায়। তার খোলা পিঠে একটি লালচে আঁচড় আড়াআড়ি ভাবে ফুটে আছে।

এই বাঁধের বেশিরভাগ নারী-পুরুষের পরনের কাপড়ই ভেজা। শরীরের সঙ্গে লেপটানো। ব্যাপারটা দেখতে এখন আর খারাপ লাগে না সোভানের। কিন্তু জাহেদার পিঠের দাগটা তাকে কৌতূহলী করে তোলে। তোমার পিডে আচুড় লাগলো ক্যামনে?

আর কইয়ো না! বলে, নিংড়ানো আঁচল গায়ে জড়িয়ে আবার বলে, ছইয়ার থাইক্যা বাইর হইয়া খাড়া হইতাছিলাম, তহনই গুনার লগে লাগলো!

জাহেদা ছইয়ের কাঠির সঙ্গে বাঁধা তারটা মুচড়ে কাঠির ফাঁকে আটকিয়ে দিয়ে ছইয়ের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে সোভানকে বললো, তুমিও ঢুইক্যা পড়!

সোভান কিছুটা সংকুচিত হয়ে বললো, না, আমি বাইরেই খাড়াই!

আরে আইও! বলে, খানিকটা মাথা বের করে আবার সোভানের হাত ধরে টানে সে। দক্ষিণদিগে চাইয়া দ্যাহ, অহনই ম্যাঘ নামবো!

বর্ষাকালের বৃষ্টি পড়াটা কেমন করে ধেয়ে আসছে দূর থেকেই দেখা যায়। সোভান দেখলো একটি কুয়াশার পর্দা আকাশ থেকে ঝুলে পড়ে মাটির ওপর ছেঁচড়ে এগিয়ে আসছে। গায়ে পরার মত গেঞ্জি বা জামা কোনোটাই নেই তার। সারাক্ষণ খালি গায়ে থাকে বলে বৃষ্টিকে তোয়াক্কা করে না। কিন্তু বৃষ্টির বড়বড় ফোঁটার লক্ষণে মনে হচ্ছে ভারী বর্ষণ। বৃষ্টির ফোঁটা বড় হলে গায়ে এসে যেন ফুঁড়ে বসে। ঠাণ্ডাও লাগে তেমনি। সোভান ছইয়ের ভেতর ঢুকে পড়লেও পলিথিনের পর্দা ফাঁক করে বাইরে দৃষ্টি রাখে।

সে যতটা না ভেবেছিলো তার চেয়েও বেশি পরিমাণে বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করলো। বৃষ্টির তোড় দেখে সে বললো, ম্যাঘ য্যামনে পড়তাছে, মনে হয় আইজই বান্ধ ভাইঙ্গা যাইবো!

জাহেদা পুটলির ভেতর কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে বললো, বান্ধের পূবে দিয়া দেখলাম পানি চুইতাছে!

পলিথিনের একটি প্যাকেট থেকে লাঠি বিস্কুট বের করে একটা হাতে নিয়ে কুট করে কামড়ে কুড়কুড় করে চিবায় জাহেদা। আরেকটা বিস্কুট সোভানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, খাও! ম্যাঘের সময় এইগুলানই খাইতে ভালা লাগে!

সোভান বিস্কুট হাতে নিয়ে বললো, তুমি কি এই ভিজা কাপড়েই থাকবা?

জাহেদা বিস্কুট চিবাতে চিবাতে হাসে। কাপড় তো এইডাই! শইল্যে থাইক্যা ভিজে। আবার শইল্যে থাইক্যাই হুগায়!

আমার মতনই! বলে, হাসে সোভানও।

জাহেদার অকস্মাৎ কেমন শীত শীত বোধ হয়। সে সোভানের কাছ ঘেঁষে বলে, হুনছি রিলিপের সময় কাপড় আর ট্যাকা-পয়সাও দেয়! এইবার কোনো কাপড়ের দল আইতে দ্যাখলাম না!

আইতেও পারে!

আউয়াল ডাক্তার কি তোমারে ট্যাকা-পয়সা দিতো না? এই পর্যন্ত কত জমাইলা?

জাহেদা সোভানের পিঠে হেলান দিলে মুহূর্তেই তার পিঠের দিকটা কেমন উষ্ণতায় ভরে ওঠে।

বিস্কুটে কামড় দিয়ে সোভান বললো, ট্যাকা-পয়সা তো হ্যামন পাইতাম না! খাওন-পিন্দনই পাইতাম। তিন বছরে সত্তুর ট্যাকা জমছে!

তারপর সোভান জাহেদার দিকে ফিরে বললো, সত্তুর ট্যাকা দিয়া কি পিন্দনের কাপড় পাওয়া যাইবো?

জাহেদা বিস্কুট খুঁটতে খুঁটতে বলে, মনে হয় না!

সঙ্গে সঙ্গেই সোভান কেমন কাতর কণ্ঠে বললো, তাইলে এই সত্তুর ট্যাকা তোমারে দিয়া দেই! পরে কাম-কামাই হইলে আরো দিমু!

নাহ! তোমার সম্বলইত্ত এই কয়ডা ট্যাকা! আমারে দিয়া দিলে বিপদের সময় পাইবা কই? কথায় কয়, সময় থাকতে হাঁইট্যা যাও, সম্বল থাকতে রাইখ্যা খাও! বলে জাহেদা হেসে বিস্কুটে কামড় দেয়।

জাহেদা হাসলেও সোভান কেমন আহত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে।

তারপর বলে, এক কাপড়ে চলবা ক্যামনে?

চলতে তো চাই না! কিন্তু…

কিন্তু কি? সোভান আগ্রহ নিয়ে তাকায়।

কাশেম মোল্লার লগে দ্যাহা হইলেই কয়, তর লাইগ্যা কাপড় কিন্যা রাখছি!

লও না ক্যান?

কয়, রাইতে চুপ্পে চুপ্পে যাইতে!

তারপরই সোজা হয়ে বলে, শয়তান ব্যাডা! মনে করছে আমি কিছু বুঝি না!

সোভান বিস্মিত হয়ে বলে, ব্যাডায় তোমার লাইগ্যা কাপড় কিন্যা রাইখ্যাও শয়তান হইয়া গেল?

তুমিও যেমন! জাহেদা চোখ মুখ কেমন করে বলে। রাইতে চুপ্পে চুপ্পে যাইতে হইবো ক্যান? আইন্যা হাতে দিলেইত্ত পারে!

তবু যেন সোভানের বোধগম্য হয় না। ব্যাডার বউরা কি খারাপ মনে করবো?

জাহেদা সোভানের নির্বোধ জিজ্ঞাসার কোনো জবাব না দিয়ে তাকিয়ে থাকে।

সোভান আবারও বলে, কইলা না?

তুমি বুঝবা না!

তারপর সে বিস্কুট খাওয়ার দিকে মনোযোগ দেয়। সোভানও বিস্কুট কামড়ে মুখে পোড়ে। দু জনের কুড়কুড় শব্দে বিস্কুট চিবানোর সঙ্গে মিশে যায় বাইরে মুষলধারে পড়া বৃষ্টির শব্দ। মুখে কোনো কথা না হলেও যেন বিস্কুট চিবানোর শব্দেই অনেক কথা হতে থাকে।

।। ৮ ।।

অঝোর বৃষ্টি মাথায় করেই মাথালী মাথায় এদিক দিয়েই যাচ্ছিলো কাশেম মোল্লা। ছইয়ের কাছাকাছি হয়ে খালাগো, ও খালা! বলে ডাকে। কিন্তু কারো কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে খানিক ইতস্তত করে পর্দার উপরকার ফাঁক দিয়ে ভেতরে উঁকি দেয়।

সোভানের মাথার উপর দিয়ে তাকানোর ফলে সে কেবল জাহেদার মুখটিই দেখে। আর সে একা আছে মনে করে চাপা স্বরে বললো, খালায় তো নাই! অহনই সুযোগ!

জাহেদা কাশেম মোল্লার এহেন কর্মে যারপর নাই ক্ষেপে উঠলো। হঠাৎ সে চেঁচিয়ে বললো, কিয়ের সুযোগ রে গোলামের পুত? তুই ফুসি দিয়া দ্যাহস কি?

অকস্মাৎ ধরা পড়ে গিয়ে পরবর্তী বিপদ এড়ানোর জন্যে পড়িমরি পালাতে গিয়ে পা পিছলে কাশেম মোল্লা কাদার উপর আছাড় খেলে সারা শরীর কাদায় মাখামাখি হয়ে যায়। আর তখনই ব্যাপারটা দেখার জন্যে সোভান পর্দা ফাঁক করে বাইরে মুখ বাড়ায়।

সোভানকে দেখতে পেয়েই কাশেম মোল্লা উঠে দাঁড়িয়ে বলে, দিনের বেলা একলা ঘরে ব্যাডা মানুষ নিয়া কি করস?

তারপরই সে গলা উঁচিয়ে বলে, তোমরা কে কই আছো, দেইখ্যা যাও!

মুষলধারে বৃষ্টি পড়তে থাকলেও কৌতূহলী মানুষের অভাব হয় না। ছেলে-মেয়ে, নারী-পুরুষ এসে ছইয়ের বাইরে কাশেম মোল্লাকে ঘিরে দাঁড়ায়।

উপস্থিত লোক-জনকে উদ্দেশ্য করে কাশেম মোল্লা বললো, জাহেদা সোভানরে নিয়া ছইয়ের ভিতরে কি করতাছে জিগাও! আর জাহেদার কাছে এই সময় সোভানের কি কাম?

কাশেম মোল্লা যে জাহেদাকে মাঝে মধ্যেই বিরক্ত করে, এ ঘটনা মোটামুটি অনেকেই জানে। তাই রহমত শেখ বললেন, কি করতে দেখছ তুমি?

দেখলাম দুইজনে ছইয়ের ভিতরে কুরকুর করতাছে!

রহমত শেখ বিরক্ত হয়ে বললেন, বুঝলাম কুরকুর করতাছে! কিন্তু দ্যাখলা ক্যামনে?

আমি এহান দিয়াই যাইতাছি। খালারে ডাইক্যা না পাইয়া ভিতরে ফুসি দিয়া দেহি এই কারবার!

তুমি ফুসি দিলা ক্যান? তুমি না মোল্লা মানুষ! তুমিই না কও অন্যের ঘরে ফুসি দিয়া দ্যাখন গোনার কাম! মরলে আজাবের ফিরিস্তারা চউক্ষে গরম সীসা ঢালবো! এই গোনা নিজে করতে গ্যালা ক্যান? তা ছাড়া মানষ্যের ঘরে ফুসি দ্যাওন তো চোট্টা-বদমাইশগো কাম!

আলেকের মা বললো, আমি যে হুনলাম কে জানি কইলো খালায় তো নাই, অহনই সুযোগ! তার বাদেই না জাহেদা গোলামের পুত কইয়া কইলো, এহান দিয়া ফুসি দিয়া দ্যাহস কি?

কাশেম মোল্লা দমে না গিয়ে বললো, ফুসি মারছি দেইখ্যাইত্ত চেইত্যা গ্যাল!

রহমত শেখ বললেন, তুমি একটা মাইয়া মানুষের ঘরে ফুসি দিবা ক্যান?

কাশেম মোল্লা আরো জোরে চেঁচিয়ে বলে, আমি ফুসি মারছি হেইডা দোষ হইয়া গ্যাল আর ওই বেডি যে নাগর লইয়া রঙ-ঢঙ করতাছে হেইডা কইতাছ না ক্যান?

রঙ-ঢঙ করলে তো আমরাও দ্যাখতাম! আলেকের মা বললো। হ্যারা দুইজনে আমার চউক্ষের সামনে দিয়াইত্ত ছইয়ের ভিতরে ঢুকলো। তহন কই আছিলা?

তুমিত্ত কইবাই! কাশেম মোল্লা আরো জোরে চ্যাঁচায়। খাতিরের মানুষের দোষ দ্যাখবা না! এই দুইজনের শরিয়তের বিচার করতে হইবো!

আলেকের মাও যেন ক্ষেপে ওঠে। বলে, মোল্লা, আমার মুখ কিন্তু খোলাইয়ো না! কে কি কইছে আমি কিন্তুক সবই হুনছি!

কাশেম মোল্লা হঠাৎ কেমন চুপসে যায়। তবু মনেমনে যেন জোর সঞ্চয় করে বলে, এই সব না জায়েজ কাম নিজের চউক্ষে দেইখ্যাও তোমরা উচিত কথাডা কেউ কইলা না! আর তার লাইগ্যাই চাইরোদিগে অ্যাত গজব পড়তাছে!

রহমত শেখ বললেন, মোল্লা, তুমি যদি এই মাইয়ারে আর উল্টা-সিধা কিছু কইছ তো দেইখ্যো, সমাজের বিচার আগে হয় না শরিয়তের বিচার আগে হয়!

আইচ্ছা, দেখমু আমিও! কাশেম মোল্লা গজরাতে থাকে। আমি আইজ একলা বইল্যা এরা শরিয়তের বিচার থাইক্যা বাঁইচ্যা গ্যাল!

তারপরই দ্রুত পদক্ষেপে নিজের ছাউনির দিকে হাঁটতে থাকে! সারা গায়ে কাদামাখা কিম্ভূত মোল্লাকে দেখে সবাই হাসতে থাকে। হাসিটা এক সময় ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে।

শোরগোল শুনে কেরামত মেম্বরও সবার পেছনে এসে উপস্থিত হয়েছিলো। চুপচাপ দাঁড়িয়ে সবার কথা শুনছিল। কাশেম মোল্লা চলে গেলে সে ছইয়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। বিভ্রান্ত সোভান কিছুই খেয়াল করে না। তার হাতে তখনও লাঠি বিস্কুটের অর্ধেকটা রয়ে গেছে।

কেরামত মেম্বর বললো, সোভান তুই এহানে ক্যান আইছিলি?

সোভান মাথা তুলে তাকায় কেরামত মেম্বরের দিকে। বলে, জাহেদা আমারে দেইখ্যা কইলো তার লগে আইতে। আওনের কিছুক্ষণ বাদেই ম্যাঘ শুরু হইলে হ্যায় কইলো বাইরে না থাইক্যা ছইয়ের ভিতরে আইয়া বইতে!

তারপর আলেকের মাকে দেখিয়ে বললো, এই খালায় তো আমাগো সামনেই আছিল!

কেরামত মেম্বর সোভানের কথা শুনে আলেকের মায়ের দিকে তাকালে সে বললো, দুইজনের প্যাডের ভিতরে ভাদরমাসি থাকলে কি একজনে আরেকজনের হাত ধইরা হাঁইট্যা আইতো? হ্যাগোরে হাত ধইরা আইতে না হইলেও একশ জনে দ্যাখছে! তহন তো কেউ শরিয়তের বিচারের কথা কইলো না! আর দুইজনের কি কথা হইলো, ক্যামনে ছইয়ের ভিতরে গ্যাল সবিত্ত আমার চউক্ষের সামনে! আমি তো দোষের কিছু দ্যাখলাম না!

কেরামত মেম্বর দু হাত তুলে বললো, আমি জানি, এই দুইজনে তোমার কেউ না! তাও যদি জাইন্যা বুইঝ্যা হ্যাগো দোষ লুকাও, তাইলে ওইডা তোমার পাপ!

আলেকের মা বললো, পাপ-গোনা বুঝি না! জাইন্যা বুইঝ্যা একটা অন্যায্য কথা কমু ক্যামনে?

কেরামত মেম্বর মাথা দোলাতে দোলাতে ফিরতি পথে হাঁটতে হাঁটতে বললো, সোভান, পরে আমার একটা কথা হুনিস!

অহনই কন কাকা! বলে, ছইয়ের তল থেকে বেরিয়ে আসে সোভান।

চল! তাইলে যাইতে যাইতে কই!

সোভান বিস্কুট খেতে খেতে কেরামত মেম্বরের পাশাপাশি হাঁটতে থাকলে সে বলতে লাগলো, বাজান, এই বান্ধে না হইলেও মানুষ আছে তিন হাজার। আরো নতুন নতুন মানুষ আইতাছে। পানি যদ্দিন না কমে, আইতেই থাকবো! কিন্তু এহানে আমরা সবতেই কিন্তু এক গ্যারামের মানুষ না। চাইরোদিগের গ্যারামের মানুষই আছে। এমন মানুষও আছে যাগোরে কোনোদিন দেহি নাই। তারাও আমরারে দ্যাহে নাই। সবতেইত্ত বাজান বিপদে পইড়া এহানে আইয়া উঠছি! একটা কথা মনে রাহিস বাপ, তর কোনো কামে জানি তর মরা বাপের মুহে, আমার মুহে চুন-কালি না লাগে!

সোভান কেরামত মেম্বরের কথার ধারা বুঝতে পারলেও কিছু বলে না। সে জানে যে, কেউ যখন কিছু বলতে আরম্ভ করে, তখন তাকে পুরোটাই বলতে দিতে হয়। শুনতে হয় মনোযোগ দিয়ে। মাঝ পথে কোনো কথার জবাব দিতে নেই।

তুই, আমি এই মানুষগুলার ভালার লাইগ্যা ক্যামন কষ্টডা করতাছি তা সবতেই দ্যাখতাছে। অহন অ্যামন কিছু একটা কইরা যদি মানুষর চউক্ষে খারাপ হইয়া যাই, তাইলে বানের পরে সবতেই আমাগো দুর্নাম মুখে কইরা ফিরা যাইবো। দশ গ্যারামের মানুষ আমাগোরে তহন খারাপ কইবো না? তয় জাহেদা মাইয়াডাও খারাপ না। তাও হ্যার দুর্নামও কম না! কিন্তু হ্যারে নিয়া কোনোদিন বিচার শাইল্যাসের কাম লাগে নাই। কেউ তার নামে খারাপ সাক্ষীও দেয় নাই! তাও কই, বাতাসে যেই কথা ভাইস্যা বেড়ায় তার সবডাই সত্য না! আবার সবডাই মিছা না! কয় না, তিলেরে তাল করছে! তালডা মিছা হইলেও তিলডা কিন্তু মিছা না! সত্য!

সোভান ভাবে যে, জাহেদার সঙ্গে নিভৃতে বসে না হয় দুটো কথা সে বললোই, কিন্তু তাতে তো কারো অসুবিধা হয়নি! এমন কি কারো টাকা-পয়সা বা খাওয়ারও টান পড়েনি! তাহলে কেরামত মেম্বর কেন এত কথা তাকে বোঝাতে চায়? এমন হতো যে, সে নিতান্তই শিশু। অন্যে তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে, পটিয়ে-পাটিয়ে নিয়ে যাবে অন্য কোথাও! তাতো নয়! যদিও তার এখন কোনো কাজ-কর্ম নেই। আউয়াল ডাক্তারও যে, দু  এক সপ্তাহের ভেতর জেল থেকে বেরিয়ে আসবে তারও কোনো সম্ভাবনা নেই! তা ছাড়া এমন বন্যার সময় কাজ-কর্ম পাওয়াটাও কঠিন! কী কাজই বা সে করতে পারে! একমাত্র আউয়াল ডাক্তারের কম্পাউন্ডারি ছাড়া অন্য কাজ সে জানে না। সুদিন হলেও না হয় অন্য কোথাও কাজ জুটিয়ে নিতে পারে কি না চেষ্টা-তদ্বির করে দেখতো!

কেরামত মেম্বর বললো, কি চিন্তা করস? আমার কথা বুঝে আইছে?

আপনে কোনো চিন্তা কইরেন না কাকা!

কেরামত মেম্বর একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, চিন্তা কি করতে চাই? তাও ক্যামনে জানি হাজার চিন্তা মাথায় ঢুইক্যা পড়ে!

।। ৯ ।।

একঘেয়ে আর অভাবগ্রস্ত বাঁধের বৈচিত্র্যহীন জীবনে সামান্য ঘটনা থেকেই মানুষ যেন আহরণ করতে চায় ষোলোআনা আনন্দ। আর তাই সামান্যই তখন তাদের চোখে হয়ে ওঠে অসামান্য।

গ্রামাঞ্চলে চাপকল বসানোর ব্যাপারটা এমন কোনো নতুন ঘটনা নয়। তবু অপ্রত্যাশিত ভাবেই যেন সরকারি লোকজন এসে যেদিন ভোরবেলা বাঁধের মাঝামাঝি জায়গায় প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে চাপকল বসানোর কাজ আরম্ভ করে, আর তা দেখার জন্যেই বাঁধের প্রায় সবার চোখেই যেন সীমাহীন কৌতূহল উপচে পড়তে থাকে। মনে হয় এই প্রথম কোনো চাপকল বসানোর কাজ তারা অবলোকন করছে। কলের জায়গাটির চতুষ্পার্শ্বে কেমন গোল হয়ে দাঁড়ায় জনতার উঁচুনিচু আকৃতিগুলো।

সোভানও এই ভিড়ের একজন হয়ে কল বসানো দেখছিল। তন্ময় হয়ে দেখছিল মাচার উপর দু পা ঝুলিয়ে বসে থাকা লোকটির হাতের ফাঁক গলে মাটি মিশ্রিত কাদা পানি পাইপের উঠানামার সঙ্গে সঙ্গে পাতলা আবরণের মত ছড়িয়ে পড়ছে সামনের দিকে।

ভীরের ভেতর কখন যে মদিনা সোভানের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি। হঠাৎ কাঁধের উপর কারো হাতের চাপ পড়তেই সে মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পায় মদিনা তার কাঁধে একহাতে ভর দিয়ে দু পায়ের গোড়ালি উঁচিয়ে সামনের দিকে উঁকি মেরে দেখতে চেষ্টা করছে। সে বললো, তুমি কহন আইলা?

অল্প কিছুক্ষণ!

কাকি ঘরে আছে?

মদিনা সেভাবেই পায়ের আঙুলের উপর দাঁড়াতে চেষ্টা করতে করতে হাসে। ঘর পাইলা কই? বান্ধের উপরে কোনোহানে একটা ঘর দ্যাহাইতে পারবা?

মদিনা খুবই চালাক আর বুদ্ধিমতী। এই সামান্য কথাতেই সোভানের তাই মনে হয়। সে কিছু না বলে আবার সামনের দিকে মনোযোগ দিলে মদিনা ফিসফিস করে বলে, ইট্টু আইবা? কথা আছে!

সোভান মদিনার এমন আকস্মিক আর অপ্রত্যাশিত আহ্বানে ঘার ফিরিয়ে দূর্বোধ্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে। সে অবস্থাতেই মদিনা ঠোঁট টিপে বলে, কামের কথা!

সোভান জিজ্ঞেস করে, কথাডা কি?

মদিনা দু  পায়ের উপর দাঁড়িয়ে পেছন ফিরতে ফিরতে বলে, আমার লগে আইও!

সোভান মদিনার পিছু পিছু তাদের টিনের ছাউনির কাছে গিয়ে পৌঁছলে মদিনা বললো, ক্যাঁথা-বালিশ রৈদে না দিয়া আর গতি নাই! কেমন জানি গন্ধ বাইর হইতাছে!

এই বলে ভেতর থেকে সর্বাগ্রে সোভানের কাঁথা-বালিশ এনে বললো, এইগুলানরে চালের উপরে ছড়াইয়া দ্যাও!

সোভান কাঁথা-বালিশ হাতে নিয়ে গন্ধ শোঁকে। তারপর বিকৃত মুখে টিনের চালের উপর ছুঁড়ে দিয়ে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু সেগুলো পিছলে এসে কেমন যেন একখানে গুটিয়ে যায়। মদিনা বলে, চালের উপরে উইঠ্যা টুয়ার দুইদিগে বিছাও! বালিশটারেও টুয়ার উপরে চাপা দিয়া থোও!

কাঁথা বালিশ ছড়িয়ে দিতে দিতে সোভান জিজ্ঞেস করে, কাকি আর মমিনা কই?

হ্যারা বাইত্যে গেছে!

সোভান অবাক হয়ে বলে, এই পানির মইধ্যে?

মদিনা আরো কাঁথা-বালিশ নিয়ে এসে সোভানের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলে, ঘর-বাড়ির অবস্থা কি রহম হইছে দ্যাহনের দরকার নাই?

তারপর একটি বাঁশের মই এনে চালের সঙ্গে লাগিয়ে ঠেস দিয়ে দিলে, সোভান সেটার উপর দাঁড়িয়ে অবশিষ্ট কাঁথা-বালিশ ছড়িয়ে দিতে থাকে। সে হঠাৎ নিচের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায় মদিনা যেন অপলক দেখছে তাকে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য ভালোমতো তাকাতেই মদিনা জিজ্ঞেস করলো, জাহেদার কী আছে?

সোভান এমন ধরনের প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিলো না বলে, মুখ ফসকে বলে উঠলো, কোন জাহেদা?

মদিনা মুখ বিকৃত করে বললো, এহ্ বুঝে না জানি! জাহেদা আবার কয়ডারে চিন?

এবার বুঝতে পেরে সোভান বললো, কিছুই তো নাই! বাপ-মা মইরা যাওনের পরে খালার বাইত্যেই থাকতো। তফাজ্জলের লগে বিয়া হইছিলো। তাও ব্যাডার কোনো খোঁজ-খবর নাই!

জাহেদারে তোমার পছন্দ?

এই কথা জিগাও ক্যান?

না। অ্যামনেই জিগাইলাম!

সোভান মদিনার জিজ্ঞাসার কারণ অনুধাবন করতে পারে না। তবু বলে, ব্যাচারী আমার মতনই পরের কান্ধে কান্ধে বড় হইলো। যাও বিয়ার পরে আরেক জনের কান্ধে গিয়া উঠলো, তাও ব্যাডায় হ্যার ভার সইহ্য করতে না পাইরা থুইয়া পলাইছে!

সোভানের কথায় হয়তো মদিনার মনোযোগ থাকে না। তাকে কেমন যেন চিন্তাক্লিষ্ট দেখায়। মই বেয়ে মাটিতে নেমে এলে তাকে মদিনা আবার জিজ্ঞেস করে, পানি হুগাইলে কি করবা?

সোভান কিছুটা ভেবে বলে, দেহি, কিছু একটা তো জুটাইতেই হইবো! কাম-কাজ না করলে খামু কি?

মদিনা হঠাৎ মাথার বেণি দু লিয়ে বলতে লাগলো, মায় আর বাবারে কইতে হুনলাম, তোমারে আমাগো বাইত্যেই রাইখ্যা দিবো! তহন তো তোমার খাওন-পিন্দনের কোনো চিন্তা থাকবো না!

সোভান হাসে। কিন্তু সে হাসির ভেতর কোথাও যেন একটুকরো কান্নার আভাস লুকিয়ে থাকে। বলে, এইডা তো খাঁচার ভিতরে ময়না পালনের মতন!

মদিনা একবার তেরছা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে, ক্ষতি কি? তোমার তো কষ্ট করতে হইবো না!

সোভান মনে মনে ভাবে, ময়নারে সোনার খাঁচায় রাখলেই কি আর বাঁশের খাঁচায় রাখলেই কি! তার পাখনা দুইডা কাইট্যা দ্যাওনের মতনই! আরাম বিচরাইন্যা মানুষই পরে ভিক্ষা কইরা খায়! কাম করতে হ্যাগো কষ্ট লাগে! গ্যারামে গ্যারামে হাঁটতে কষ্ট লাগে না!

সোভানকে চুপ থাকতে দেখে মদিনা তাড়া দেয় যেন, কিছু কও না যে!

কইতাছি! বলে আবার হাসে সোভান। এবারের হাসিটা যেন পূর্বেকার হাসির চাইতে আরো মলিন। আরো বেশি কান্না মিশ্রিত। আরামে থাকতে কে না চায়! একটা কুত্তারে দুইদিন খাওন দিয়া দেইখ্যো যে, তোমার দুয়ার ছাইড়া কোনোহানে যাইবো না!

সোভানের কথায় আপাতদৃষ্টিতে দুঃখ পাওয়ার মত বা রাগ করার মত কিছু আছে কি না বোঝা না গেলেও মদিনার শ্যামলা মুখ আরো কালচে হয়ে যায়। উজ্জ্বল দু চোখ কেমন ধোঁয়াটে হয়ে আসে। কিন্তু সে খুব স্বাভাবিক ভাবেই চালের নিচে ঢুকে যায়।

সোভান বুঝতে পারে যে মদিনার মন খারাপ হয়ে গেছে। ভেতরের দিকে মুখ বাড়িয়ে বললো, তুমি কি কষ্ট পাইলা?

নাহ, খুশিতে আমার নাচনের মন কইতাছে!

মদিনার মুখ থমথম করে।

সোভান ভেতরে ঢুকে খড়ের উপর থেবড়ে বসে বলে, একটা কথা কই, মনের লগে বুঝতে চেষ্টা কইরো!

আমার কারো কথা হুননের কাম নাই! বলে, দুপদাপ করে সোভানের সামনে দিয়েই বাইরে বেরিয়ে পড়ে মদিনা। তারপর কোনদিকে যায় সোভান বুঝতে পারে না।

বাইরে মানুষের শোরগোলের শব্দ পেয়ে সোভানও ছাউনির মুখে এসে দাঁড়ায়। কল পাড়ের মানুষ হৈ-হল্লা করছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের শব্দই বেশি শোনা যায়। হয়তো কলের পানি নিয়ে কিছু একটা ঘটেছে।

মদিনা যেন ঘর ফেলে কোথাও না যায়। কথাটা পইপই করে জয়তুন বিবি বুঝিয়ে গেলেও শোরগোলের উৎস খুঁজতে সে কলপাড়ের ভিড়ের দিকেই এগিয়ে যায়। কিন্তু সোভান ছাউনির কাছ থেকে সরে না। অরক্ষিত জিনিস-পত্র পেলে লোকজন সুযোগ মত নিয়ে যায়। এমন ধরনের কয়েকটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য চুরিও তেমন কিছু না! চাল-ডাল-চিড়া। যে কোনো খাওয়ার জিনিসই চুরি হয়।

চোর বলতে বাঁধেরই কিছু ক্ষুধার্ত মানুষ! তাই সোভান কেরামত মেম্বরের অরক্ষিত সম্পদ ফেলে যায় না। আরো কিছুটা ভেতরের দিকে সরে গিয়ে খড়ের উপর বসে থাকে পাহারাদারের মত।

।। ১০ ।।

সোভান ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রমী। তার বাবা হাশেম সর্দার নিজেও যেমন পরিশ্রমী ছিলো, তেমনি অন্য কাউকেও পরিশ্রম করতে দেখলে খুশি হতো। সোভানও ঠিক বাবার স্বভাব পেয়েছে। কোনো অলস মানুষ মদিনার প্রস্তাবটা পেলে সঙ্গে সঙ্গেই লুফে নিতো। কিন্তু সোভান খুশি হতে পারেনি।

খুশি হতে পারেনি মদিনাও। সোভানের প্রতি যেন কিছুটা ক্ষুব্ধও। কথা-বার্তায় আগেকার মত সে জলতরঙ্গ বাজে না। হেসে কুটিকুটি হয় না যে কোনো কথাতেই। তবে মমিনা আছে আগেরই মত। প্রাণবন্ত। উচ্ছল। সোভানকে কম্পেন্ডার না বললে যেন সাবলীলতা সরে যায় তার থেকে দূরে। সহজ স্বাভাবিক হয়ে কথা বলতে পারে না। একদিন তাই বিরক্ত হয়ে বলেই ফেললো, কম্পেন্ডাররে ভাই কইতে পারমু না! ভাই কইলে মুখ দিয়া কথা বাইর হয় না!

সোভান আপত্তি করেনি। কিন্তু জয়তুন বিবি তেড়ে এসেছিলো বলে মায়ের সামনে মমিনা পরত:পক্ষে সোভানের সঙ্গে কথা বলে না।

জয়নাল বিড়ি টানতে টানতে এদিকেই আসছিলো। সোভানকে কেরামত মেম্বরের চালার কাছে বসে থাকতে দেখে বললো, মনে মনে তোমারেই খুঁজতাছি সোভান ভাই!

সোভান নতুন কেনা হাতাঅলা গেঞ্জিটা টেনেটুনে দেখছিল যে, খুব বেশি ঢিলেঢালা হয়ে গেল কি না। না ঠিকই আছে! যেন নিজেকেই শোনায় সে। তারপর জয়নালের দিকে মুখ তুলে বললো, আমারে ক্যান খুঁজতাছিলি?

একটা ভালা খবর আছে!

ক হুনি!

জয়নাল হাতের বিড়িটা ফেলে দিয়ে সোভানকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নিয়ে জানায়, তুমি নাও বাইতে পারবা?

সোভান যেন জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক কথাটি শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সোভানের মুখের দিকে।

জয়নাল বললো, কথা হুইন্যা আসমান থাইক্যা পড়লা মনে হয়?

আসমান থাইক্যা পড়মু না তো কিয়ের থাইক্যা পড়মু? পানির দ্যাশের মানুষ নাও বাইতে পারমু কি না জিগাস কি বুইঝ্যা? নৌকা ছাড়া যাগো বছরের অর্ধেক চলে না! তা ছাড়া আউয়াল ডাক্তারের নাও কে বাইতো? তুই?

আমি হেইডা কইতে চাই নাই! কইতে চাইছিলাম নাও বাইতে তোমার কোনো অসুবিধা আছে কি না। শইল-গতিক তো ভালা নাও থাকতে পারে!

শইল-গতিক ভালাই আছে!

তাইলে চল, মুন্সিগঞ্জের একটা ক্ষ্যাপ মাইরা আই!

কিয়ের ক্ষ্যাপ?

ব্যাপারডা গোপন! পাট্টি কইছে বিশ্বাসী মানুষ লইতে!

পাট্টিরে চিনস?

ভালা মতনই চিনি!

সোভান অনিশ্চিত কণ্ঠে বলে, কিয়ের ক্ষ্যাপ না জানলে কই ক্যামনে?

জয়নাল কণ্ঠস্বর নিচু করে ফিসফিস ধ্বনি পর্যায়ে এনে বললো, সোনা-রূপার! হিতু বাবুর সোনার দোকান মুন্সিগঞ্জে নিয়া যাইবো! উপরে থাকবো পাটখড়ি!

সোভান আশ্চর্য হয়ে বলে, পাটখড়ি উপরে থাকলে তর হিতুবাবু বইবো কই?

হ্যায় যাইবো না!

তাইলে তো বিপদ!

বিপদ আবার কি? জয়নালও যেন অবাক হয় কিছুটা। হিতু বাবু থাকলেইত্ত ট্যাকা-পয়সার লোভে ডাকাইতে ধরতে পারে!

সোভান কিছুটা ইচ্ছে করেই বললো, পথে ডাকাতি হইয়া যদি নৌকাডাই কেউ কাইড়া লয়? অ্যা ছাড়াও অনেক দামের জিনিস বইল্যা কথা! আমরাই যদি আরেক পথে নৌকা লইয়া পলাই?

জয়নাল হাসে। বলে, পলাইতে পারমু ঠিকই! কিন্তু সোনা-রুপা বেচতে পারমু না! দুইডা লোহার বাক্স। নম্বর তালা। ভাঙতে হইলে কামারের কাছে যাইতে হইবো। আর যদিও কোনো রকমে তা বাইর করতে পারি বেচতে গেলেই ধরা পড়মু! তার চাইয়া ভালা বেশি লোভ না কইরা নৌকা ভাড়া আর বখশিশ যত পাই তাই শুক্কুর!

সোভান জয়নালের কথায় মুগ্ধ না হয়ে পারে না। প্রশংসাও গোপন রাখতে পারে না। জয়নালের কাঁধে হাত রেখে বলে, তুই খুবই ভালা মানুষ আর বুদ্ধিও তর অনেক! অ্যামন মানুষ বেশিদিন গরিব থাকনের কথা না!

জয়নাল সোভানের কথায় অভিভূত না হয়ে পারে না। বয়সের দিক থেকে যদিও সে সোভানের দু তিন বছরের ছোট হবে তবু সে সোভানের পা ছুঁয়ে বলে, দোয়া কইরো! এই পরথম একটা আশার কথা হুনলাম!

জয়নালের প্রগলভতায় সোভানের কোনো পরিবর্তন হয় না। সে নির্বিকার ভাবেই জিজ্ঞেস করে, ভাড়া কত দিবো কইছে?

কইছিলো তো এক হাজার! কিন্তু আমি কইলাম, তিনজনে এক হাজার ট্যাকা ক্যামনে ভাগ কইরা নিমু? একটা মিলের ভিতরে থাকলে ভালা হইতো না?

সোভান আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করে, হিতু বাবু কি কইলো?

দুই চোখ কপালে তুইল্যা কইলো, যাবি তো দুইজন! তিনজন পাইলি কই? কইলাম আমার নৌকার এক ভাগ! বাবু খুশি হইয়া কইলো আইচ্ছা, বখশিশটা বাড়াইয়া দিমু। কিন্তু ভাড়া এক হাজার!

সোভান মনে মনে ভাবে তিনভাগ হইলেও পামু তিনশ তেত্রিশ ট্যাকা। একলগে হাতে পাইলে মন্দ কি? বখশিশের চিন্তা সে করে না। এখন তিনশ তেত্রিশ টাকাই তার কাছে বিশাল অঙ্কের টাকা বলে মনে হয়। জাহেদা আশা করেছিলো প্রতিবারের মত এবারও লাল-নীল-হলুদ কাপড়ের উপর বিভিন্ন রঙের বাহারি নামের দল আর নেতাদের নাম লিখে পালের মত বাতাসে ফুলিয়ে বিভিন্ন দল খাবার-কাপড় আর টাকা-পয়সা নিয়ে আসবে। কিন্তু নতুন সরকারের কারণে ওইসব রঙিলা দলগুলো গর্তে লুকিয়েছে মনে হয়। কাপড়-লুঙ্গি নিয়ে কোনো দল এ পর্যন্ত আসেনি। নৌকা বাওয়ার টাকাটা হাতে এলে জাহেদার জন্য একটা পরনের কাপড় কিনবে। শত হলেও একসময় একই স্কুলে পড়েছে। খেলেছে। শৈশবের সে বন্ধু যদি চোখের সামনে কষ্ট পায় তার জন্যে কিছু করতে না পারাটা যেমন কষ্টের, তেমনি লজ্জারও। সে বললো, কবে যাইতে কস?

তুমি রাজি থাকলে কাইলই মেলা করি!

পাটখড়ি তুলবি কোনখান থাইক্যা?

মেরালীর বাজার থাইক্যা!

বাজারে পানি উঠছে?

হ। হিতু বাবুর কারবারের ঘরে হাঁটু তলান পানি!

সোভান বললো, তাইলে এই কথাই সই! কাইলই মেলা করি!

জয়নাল খুশি হয়ে বললো, তাইলে কথা দিলা কইলাম!

দিলাম!

কথার জানি লড়চড় না হয়!

হইবো না!

তাইলে আমি তৈয়ার হই! নায়ের তলাডায় কয়ডা পাতাম মারতে হইবো! গলুইয়ের লগে দিয়া দুইডা কড়া লাগামু!

সোভান অবাক হয়ে বলে, কড়া লাগাবি কোন কামে?

দূরের পথ তাড়াতাড়ি পাড়ি দিতে চাইলে কড়া দুইডায় বৈডা বাইন্ধা একলগে দুই বৈডা মারন যাইবো!

ব্যাপারটা সোভানের মাথায় ঢোকে না।

জয়নাল বললো, দেখলেই বুঝতে পারবা!

জয়নাল চলে গেলে সোভান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলো যে, কথাটা কেরামত মেম্বরকে জানাবে কি না। ঠিক তখনই কলপাড়ে জাহেদাকে দেখতে পেয়ে সে এগিয়ে গিয়ে বলে, কয়দিন দেখলাম না যে?

বাইর হই নাই!

কাইল জয়নালের লগে যামু ঠিক করছি!

ভালাই হইবো! পুরুষ মানুষ বইয়া খাওনডা অলক্ষ্মী!

আমি এইডা চিন্তা কইরাই রাজি হইছি!

জাহেদা একবার আঁচল টেনে পায়ের উপর পানি ঢেলে বললো, মেম্বর কাকুরে জানাইও!

আইচ্ছা জানামু!

জাহেদার যেন ঘরে ফিরে যাওয়ার তাড়া ছিলো। কলসে পানি ভরে সে তা কাঁখে নিয়ে ঘাড় কাত করে হেঁটে যায়। সোভান সেদিকে তাকিয়ে থাকে এক ঠায়। জয়নালের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করার কথাটা বেশি মানুষকে জানানো ঠিক হবে না ভেবে সে কেরামত মেম্বরকে সামান্য আভাস দেবার কথা ঠিক করলো। তাই সে কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বললো, আমি কাইল জয়নালের লগে মুন্সিগঞ্জ যামু!

মুন্সিগঞ্জ কি? কেরামত মেম্বর কথাটা বলে কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

সোভান তরল কণ্ঠে বলে, জয়নাল ক্ষ্যাপ নিয়া যাইবো। আমি তার লগে যামু আর কি! অনেক দিন তো বইয়াই কাটলো!

তর কাকিরে কইছস?

কাকিরে কওনডা ঠিক হইবো? হুদাহুদি চিন্তা কইরা পেরেশান হইবো!

হারা দিনে একবার না দেখলেও চিন্তা করবো। আমারে জিগাইবো!

আপনে বুঝাইয়েন। বেশি দেরি দেখলে কইয়েন!

ফিরবি কবে?

কথা তো আছে একদিনে যামু ফিরতে পরের দিন!

আইচ্ছা! যাওন নাই!

।। ১১ ।।

সকাল সকাল বেরোবার মুখে মমিনা হঠাৎ বললো, কাইল রাইতে নাহি কাশেম মোল্লারে কারা পিডাইয়া আধামরা কইরা ফালাইছে!

সোভান বিস্মিত হয়ে বললো, মোল্লা অহন কই?

হ্যার ঘরেই আছে!

সোভানের মনটা অকস্মাৎ দু লে উঠলো। ঘটনাটা তার কাছে কেমন যেন গোলমেলে মনে হয়। কিছুটা শঙ্কা নিয়েই সে মোল্লাকে দেখার জন্য রওয়ানা করে। অনেকেই আহত কাশেম মোল্লাকে দেখতে গিয়েছিলো। এখানে ওখানে এ নিয়ে নারী-পুরুষের কয়েকটি জটলাও দেখা যায়। লোকজন তার দিকে কেমন করে যেন তাকাচ্ছে। কারো কারো চোখে পরিষ্কার ভয় ফুটে উঠতে দেখলো।

ঠোঁটকাঁটা মানুষ রহমত শেখ। মানুষের মুখের উপরই নানা রকম উল্টা-পাল্টা কথা বলে এরই মধ্যে যথেষ্ট দুর্নাম কুড়িয়েছে। তার সঙ্গে দেখা হতেই সে বলে উঠলো, অ্যাত ঘন বাইন ঠিক হয় নাই!

সোভান রহমত শেখের রহস্যময় কথা ধরতে না পেরে কেমন বোকার মত বললো, মিয়া ভাইয়ের কথাডা ঠিক বুইঝ্যা উঠতে পারলাম না!

বিলাইয়ে মাছ খাইয়া পরে আর কিছুই বুঝে না! বলে, কেমন হো হো করে হেসে ওঠে রহমত শেখ।

তারপর আবার বলে, তুমি আর জয়নাল মিল্যাই বাইনডা উডাইছিলা! অ্যাঁ?

সোভানের বুঝতে আর বাকি থাকে না। বলে, এমন বিপদের সময় এমন একটা কাম করমু কইতে পারলেন?

কামডা তো আর আসমান থাইক্যা ফিরিস্তা আইয়া কইরা যায় নাই!

সোভান দৃঢ় কণ্ঠেই বলে, কামডা যদিও কেউ না কেউ করছে, তয় আমরা যে করি নাই তা কিন্তুক সত্য!

তাইলে কাইল দুইজনে কি নিয়া শল্লা করলা? জয়নালরে দেখলাম তোমার পাও ছুইয়া দোওয়া লইতে!

অ! তার লাইগ্যা আপনে সন্দ করতাছেন? বলে হেসে উঠলো সোভান। তারপর বললো, আমরা কাইল নৌকা নিয়া মুন্সিগঞ্জ মেলা করমু! হেই কথাই জয়নাল কইলো!

রহমত শেখ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সোভানের মুখের দিকে। হয়তো কিছু একটা নিয়ে ভাবে। তবু তার কণ্ঠ থেকে সন্দেহের সুর হারিয়ে যায় না। তাইলেত্ত ভালাই! জুম্মাবারে দরবারে থাইক্যো। মানুষে যদি তোমাগো কথা বিশ্বাস করে তাইলেই বাঁচতে পারবা!

জয়নাল হন্তদন্ত হয়ে এসে বললো, কই কই ঘুইরা বেড়াইতাছ? এদিকে তোমারে না পাইয়া আমার মাথা নষ্ট!

কাশেম মোল্লারে কারা জানি পিডাইছে হুনলাম! দেখতে যাইতাছি!

জয়নাল বিরক্ত হয়ে বললো, ফিরা আইস্যাও দ্যাখন যাইবো! সে সোভানের হাত ধরে টানে।

জয়নালের সঙ্গে যেতে যেতে সোভান বলে, রহমত শ্যাখ মনে করে আমরা দুইজনে মিল্যাই কামডা করছি!

আগে ফিরা আই! বলে, জয়নাল কাঁধের গামছাটা খুলে বাতাসে ঝাপটা মেরে বলে,  তারবাদে দেখমু কে কি ঘডাইছে!

তুই কিছু হুনছস নাহি?

জয়নাল গামছাটা কোমরে পেঁচিয়ে বলে, অহনো কিছু হুনি নাই! ফিরা আইলে জানতে পারমু!

ক্যামনে? কে কইবো কইছে?

জাহেদা বুবু!

হ্যায় কইবো কই থাইক্যা?

যারা কামডা করছে, তারাই কইছে কইলো!

তবু দ্বিধান্বিত কণ্ঠে সোভান জানায়, তাইলে রহমত শ্যাখ যে কইলো জুম্মাবারে দরবার!

দরবার অউক ঠিক আছে! কিন্তুক বিচার হইবো না!

ক্যামনে বুঝলি?

মোল্লা হ্যাগোরে চিনে! বিচার চাওনের হইলে তো যারা পিডাইছে, আর যারা যারা মোল্লারে দ্যাখতে গেছে, তাগো কাউরে না কাউরে দুই একজনের নাম কইতো! মিছা কইরা হইলেও তো তোমার আমার নাম কইতে পারতো!

তারপর ঘাড় ফিরিয়ে জয়নাল হাসিমুখে আবার বললো,কইলো না ক্যান?

সোভান এতটা জটিল করে কিছু ভাবতে পারে না। অথচ জয়নাল কত সহজেই একটি জটিল ব্যাপার তাকে পইপই করে বুঝিয়ে দিলো।

বাঁধের নিচে পানিতে জয়নালের নৌকাটা কাদায় গেঁথে রাখা লগির সঙ্গে বাঁধা থাকলেও ঢেউয়ের আঘাতে ধীরে ধীরে উপর নিচে দুলছিলো। পাটাতনের উপর গুণ টানার জন্য রশি, লাঠি দেখা যাচ্ছে। তালগাছের ফালি কেটে সদ্য বানানো দুটো বইঠাও দেখা যাচ্ছে।

জয়নাল হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বললো, দৌঁড় পাইরা আইতাছে কে? মমিনা না?

সোভান ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বলে, মমিনাইত্ত!

তারপর শঙ্কিত কণ্ঠে আবার বলে, হ্যায় অ্যামনে দৌঁড় পাইড়া আইতাছে ক্যান? খারাপ কিছু হইলো নাহি?

জয়নাল তেমন একটা বিচলিত হয় না। নির্বিকার ভাবে বলে, আগে কি কয় হুনি না!

মমিনা কাছাকাছি হতেই উদ্বিগ্ন কণ্ঠে সোভান বলে, কি হইছেরে বইন?

কিছু না! সোভানের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো সে।

তাইলে দৌঁড় পাইরা আইলা ক্যান?

হাতের মুঠি খুলে পাঁচ টাকার একটি মুদ্রা দেখিয়ে বললো, ধর!

বিস্মিত সোভান মুদ্রাটা হাতে নিয়ে বলে, এইডা দিয়া কী আনমু?

মমিনা দাঁত বের করে হেসে বলে, লিবিস্টিক!

তারপরই ফের উল্টো ঘুরে ছুটতে থাকে।

হায়রে মাইয়া মানুষ! জয়নাল তরল কণ্ঠে বলে উঠলো। পানির ভিতরে ঘর-বাড়ি ফালাইয়া আইছে, যাগো থাকন খাওনের ঠিক নাই!

সোভান তার কোমরের কাছে লুঙ্গির ভাঁজে মুদ্রাটি পেঁচিয়ে রেখে বাঁধের ঢাল বেয়ে নামতে নামতে জয়নালকে জিজ্ঞেস করে, লিবিস্টিকের দাম জানস?

না জাননের কি হইলো? জয়নাল হাসে।

সোভান কেমন সরু চোখে জয়নালের দিকে তাকিয়ে বলে, তর তো বউও নাই, বইনও নাই!

জয়নালও নৌকার গলুইয়ে উঠে পানিতে পা নেড়ে কাদা পরিষ্কার করে। তারপর কাদায় গেঁথে রাখা লগি থেকে নৌকার বাঁধন আলগা করে সেটা তুলে নিয়ে দাঁত বের করে বলে, অ্যাক্কবারে যে কেউ নাই হেইডা আবার কও ক্যামনে?

সোভান পানিতে নেমে এগিয়ে গিয়ে পা ধুয়ে নৌকায় চড়ে সামনের গলুইয়ে বসে পা দুটো লম্বা করে দেয়। সে জয়নালকে কিছু জিজ্ঞেস করতে আগ্রহ বোধ করে না।

জয়নাল মাটিতে লগি ঠেকিয়ে নৌকায় ভর দিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে বলে, হেই বদর বদর! দয়াল মুর্শিদ! জীবনের পরথম একটা বড় ক্ষ্যাপ! ইমান বিশ্বাস ঠিক রাইখ্যো!

জয়নালের লগি ঠেলে ভর দিতে থাকলে নৌকা ছরর-ছর করে এগিয়ে চলে। সোভান একহাতে একটি শাপলা টান দিয়ে তুলে ফুলের সঙ্গে ডগার আঁশ রেখে দিয়ে শাঁসটা ফেলে মালার মত বানিয়ে নৌকার মাথায় লাগিয়ে দেয়। তারপর ফিরে বলে, মেরালীর বাজার কতদূর?

লগিতে চাপ দিয়ে জয়নাল বললো, বেশি দূর না! এক ঘনটার মতন লাগে!

সোভান চুপচাপ বিস্তীর্ণ জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকে। এবারকার মত পানি আগে কখনো দেখেনি সে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। এইবার পানি সরতে অনেক দেরি হইবো রে জয়নাল!

পানি টান দিলে দ্যাখবা তিন-চাইর দিনেই অর্ধেক হইয়া যাইবো!

তারপর আবার চুপচাপ। নৌকার তলায় পানির আঘাত খাওয়ার বিচিত্র শব্দ পাক খেয়ে কানে আসে।

জয়নাল!

সোভান ফের কথা বলে ওঠে।

কি কও?

বাসলীর চর ক্যামন দূর?

যাইবা নাহি?

জাহেদা কইতাছিলো সুদিনে তারে নিয়া যাওনের লাইগ্যা!

সুদিনে ক্যান? মুন্সিগঞ্জ থাইক্যা ফিরাই লও যাই!

বাসলীর চরে জাহেদার কে আছে?

জয়নাল আগ্রহী হয়ে বলে, আমার নানীগ বাড়ি না! নানী তো বুবুরে কবে ধইরাই কইতাছে একবারে যাওনের লাইগ্যা। নানী একলা মানুষ। তার চলতে ফিরতে কষ্ট হয়। হ্যায় নিজেও অ্যাত কষ্ট কইরা চলে, তাও যায় না। মায় তো কয়দিন পরপরই কয়! তাও যে কি বুইঝ্যা পইড়া রইছে, হ্যায়ই জানে!

তুই খালারে নিয়া গেলেইত্ত পারস!

জয়নাল হেসে বলে, আমাগোরে জাগা দেয় না!

তুই না কইলি তর নানী! জাগা দিবো না ক্যান?

সোভান বিস্ময় মাখা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে।

মায় নানীর কাছ থাইক্যা নিজের ভাগ বুইঝ্যা পাইয়া আইয়া পড়ছে! আমাগো গ্যারামে জমি কিনছে। চাচার ভাগের বাড়িডা কিনছে!

তাইলে জাহেদার মায়ের ভাগ কি হইলো?

ওইডা অহনতরি আছে দেইখ্যাইত্ত জাহেদা’বুর কদর! নানায় বাইচ্যা থাকতেই দুই মাইয়ারে সম্পদ ল্যাহাপড়ি কইরা দিয়া গেছিলো!

জয়নালের কথা কিছুটা হলেও সোভানকে ভাবিয়ে তোলে। নানীর বাড়িতে সম্পদের মালিক হয়েও কেন জাহেদা এখানে পড়ে আছে? কিসের আশায়, কেন সে এমন কষ্টকর জীবন বেছে নিয়েছে? নানীর বাড়ি চলে গেলে জাহেদার যেমন কষ্ট থাকতো না, তেমনি তার নানীরও একটু বল-ভরসা হতো! জাহেদাকে কেমন যেন অদ্ভুত বলে মনে হয় সোভানের কাছে।

অন্যদিকে কেরামত মেম্বরের মেয়ে মদিনার হিসাব ভিন্ন। সে চায় সোভানকে শিকল দিয়ে বেঁধে খাঁচায় আটকে রেখে পোষ মানাতে। কিন্তু সোভান তো নিজকে জানে! আরো কঠিন কিছু দিয়ে বাঁধলে বা আরো মূল্যবান কিছুর লোভ দেখালেও সে পোষ মানার মানুষ নয়। পোষা জীবন অচল জীবন। যে জীবনে সংগ্রাম নেই, চাওয়া-পাওয়ার পুরষ্কার নেই, সে জীবন বলতে গেলে এক রকম অচল জীবনই। একই ঘরে জন্ম, বার্ধক্য আর মৃত্যু। একঘেয়ে! তাই হয়তো আরামের স্থবির জীবনটাকে উপেক্ষা করে কষ্টকর জীবনের সঙ্গে নিজকে মানিয়ে নিয়েছে জাহেদা।

সোভান জয়নালকে বললো, এইবার তুই বইয়া জিরা। লগি আমার কাছে দে!

সে উঠে গলুইয়ের উপর দাঁড়ালে জয়নাল বললো, মোরালীর বাজার তুমি চিন না। চুপচাপ বইয়া থাক! আর কিছুক্ষণের মইদ্যেই আমরা বাজারে গিয়া পৌছমু!

সত্যিই দূর থেকে পানির উপর মাথা জাগিয়ে ভেসে থাকা মেরালীর বাজার দৃষ্টিগোচর হয়। বাজারটা দেখতে তেমন একটা ছোটোখাট বাজার নয়। বিশাল এলাকা নিয়ে তার বিস্তার। জয়নাল নৌকা বেয়ে একেবারে হিতেন পোদ্দারের কারবারের ঘরের দরজায় গিয়ে থামে। দরজার চৌকাঠের উপর এক টুকরো টিনের উপর প্রায় ঝাপসা হয়ে যাওয়া লেখা হিতেন পোদ্দার। আরো ছোটছোট অক্ষরে কিছু লেখা থাকলে সোভানের পক্ষে পাঠোদ্ধার সম্ভব হয় না।

হিতেন পোদ্দার যেন জানতো যে, এ সময়ই জয়নাল নৌকা নিয়ে আসবে। তাকে দেখতে পেয়ে সে বললো, ভাবতাছিলাম আইজ আমিও মেলা করি!

জয়নাল খুশি হয়ে বললো, ভালাইত্ত হইতো। আমরা গিয়া আপনের কাছেই মাল বুঝাইয়া দিতে পারতাম!

তা তো হইতোই। আমি চাইছিলাম একবার নারায়ণগঞ্জ ঘুইরা যাইতে। লঞ্চের টাইম-টেবিল তো অহন ঠিক নাই! ঘাটে গিয়া কতক্ষণ বইয়া থাকতে হয় ক্যামনে কমু?

আমি ছোডো মানুষ একটা কথা কই! বলে, বিপুল আগ্রহ নিয়ে হিতেন পোদ্দারের মুখের দিকে তাকিয়ে যেন অপেক্ষা করে জয়নাল।

হিতেন মাথা দুলিয়ে বললো, থামলি ক্যান?

আপনে ঘাটে গিয়া বইয়া থাকলেও আমাগো থাইক্যা দশ মাইল আগাইয়া থাকবেন!

হিতেন পোদ্দারের মুখে একটু হাসির আভাস ফুটেই মিলিয়ে যায়। কিন্তু কিছু একটা নিয়ে যেন ভাবতে থাকে। জয়নাল কিছুটা অস্থির হয়ে বললো, বাবু, দেরি কইরা তো লাভ নাই!

লাভ আছে! বলে সে মাথা তুলে তাকায়। তারপর বলে, বিটু পালের হোটেলে গিয়া আমার কথা কইয়া দই-চিড়া খা! ততক্ষণে নৌকায় পাটখড়ি তোলার কাজডা করাই!

জয়নাল বললো, তাইলে তো আমরা হাঁইট্যা যাইতে হইবো!

আমার ঘরের পিছন দিয়া উঁচা পথ আছে!

ওরা হিতেন পোদ্দারের কারবারের ঘরের পেছনকার সরু আর পিছল পথ দিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটে। পানিতে ডুবে আছে পথটা। পায়ের গিরা পর্যন্ত পানিতে ডুবে থাকে। সোভান জিজ্ঞেস করে, বিটু পালের দোকান চিনস?

জয়নাল হাত তুলে দেখিয়ে বলে, উইত্ত দ্যাহা যায়! তারপর বলে, হুঁশ কইরা হাইট্যো! এহানে কামারের দোকান আছিল। পায়ে লোহার গুঁতা লাগতে পারে!

পথটুকু সামান্য মনে হলেও এত আস্তে আস্তে হাঁটলে সোভানের মনে হয় বিটু পালের দোকানে পৌঁছুতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।

।। ১২ ।।

লগি ঠেলে বেশ কিছুক্ষণ পাটখড়ি বোঝাই নৌকা ভালোই এগিয়ে নিতে পারে ওরা। কিন্তু বাজার পেছনে ফেলে আরো খানিকটা এগিয়ে যেতেই নৌকা হয়তো খালে পড়ে। জয়নাল উপুড় হয়ে লগিটা পানির নিচে পুরো ডোবালেও মাটির নাগাল পায় না। লগি পাটখড়ির উপর শুইয়ে রেখে বললো, সোভান ভাই, বইঠা মার! আমরা গাঙ্গে পড়ছি মনে কয়!

বৈঠা মেরে স্রোতের বিপরীতে উজানে নৌকা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়! নৌকা যেন আগাতেই চায় না। তবু দু জনে মিলে চেষ্টা করে নৌকাটাকে ক্ষেতের উপর সরিয়ে নিতে। কিন্তু কোথায় গাঙ আর কোথায়ই বা ক্ষেত তার কিছুই ধারণা করতে পারে না ওরা। তবু বৈঠা মেরে মেরে ওরা স্রোতের বিপরীতে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ চলার পর পানিতে ডুবে থাকা কাশের ঝোপের ডুবে থাকা মাথা দেখতে পেয়ে জয়নাল ফের লগি হাতে নিয়ে নৌকায় ভর দেয়। সোভান উঠে দাঁড়িয়ে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে বৈঠাটাকে পাটখড়ির উপর রেখে দিয়ে বললো, আমরা বান্ধের উপর থাইক্যা মনে করতাছি কত না কষ্টে আছি! ওই যে বুড়ির দিগে চাইয়া দ্যাখ, হ্যার হিসাবে আমরা তাইলে রাজার হালতে আছি!

বুড়ির চারদিকে কাছাকাছি কোনো ঘরদোর দেখা যায় না। পানির উপর তিন চার হাতের মত জায়গা ভেসে আছে। বিঘত খানেক উঁচু। তাও কচুরি পানা জড়ো করে করে এই ভিটি বানানো হয়েছে। সম্পূর্ণ খোলা জায়গা। মাথার উপর ছাউনি নেই। তাও বুড়ি আছে এখানে। একটি ছাগল, দুটো মুরগি আর একটি কুকুর এই দ্বীপে বুড়ির সঙ্গী। তাহলে বুড়ির খাওয়ার সংস্থান হচ্ছে কি করে?

সোভান বললো, বুড়ির কাছে দিয়া যা! হ্যায় খায় কি দেইখ্যা যাই! বাইচ্যা আছে ক্যামনে হুনি!

পাটখড়ি বোঝাই নৌকা দেখে বুড়ি তাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে।

জয়নাল দ্রুত লগি ঠেলে কাছাকাছি হতেই বুড়ি বললো, অ নাতিরা, আমারে কয়ডা পাটখড়ি দিয়া যা! রান্দা-বাড়ির কিছু নাই!

জয়নাল বললো, পাটখড়ি দিলে তো ম্যাঘের পানিতে ভিজবো!

পলিটিন দিয়া ঘুইরা রাখমু!

তুমি মাথায় দিবা কি?

পলিটিন!

সোভান বললো, আহারে!

তারপর বুড়িকে বললো, আমরা মুন্সিগঞ্জ যাইতাছি! তোমার কেউ থাকলে কও নানী, নৌকা দিয়া নামায় দেই!

গায়ে মুখে অসংখ্য ভাঁজ পড়া, দাঁতহীন ফোঁকলা মুখে বুড়ি হেসে বললো, আমার কেউ নাই!

তাইলে চলে ক্যামনে?

তগো মতন নাতিরা আইতে যাইতে আমার খোঁজ লয়। কিছু কিছু দিয়া যায়! বলে বুড়ি একটি হাঁড়িতে ক’টি মাছ দেখিয়ে বলে, একজনে মাছ দিছে। আগুন জ্বালানির কিছু নাই! পাটখড়ি কয়ডা পাইলে রানমু!

জয়নাল বললো, চাইল ডাইল আছে?

বুড়ি দুটো কলস দেখিয়ে আবার হেসে বললো, ভরা আছে! আমার অভাব নাই! অভাব হইলো আগুনের!

ওরা বিটু পালের হোটেল থেকে দু পুরে খাওয়ার মত দই-চিড়া পলিথিনের প্যাকেটে করে নিয়ে এসেছিলো। জয়নাল বললো, আমাগো লগে দই-চিড়া আছে। খাইবা? ভিজা চিড়া!

বুড়ি হেসে বললো, মাছ খামু না?

সোভান বললো, পরে খাইও!

তাইলে তরা ইট্টু সবুর কর, দুইডা মাছ ত্যালে দিয়া দেই!

জয়নাল দু আঁটি পাটখড়ি নামিয়ে দিয়ে বললো, আইজ সময় নাই নানী! কাইল ফিরনের সময় তোমার লগে বইয়া ভাত খামু!

সোভান তার দই-চিড়ার প্যাকেটটা বুড়ির হাতে দিয়ে বললো, তোমার কিছু লাগলে কও, আমরা নিয়া আমু!

নুন নাই! ম্যাজভান্ডিও দুই একদিনের ভিতরে শ্যাষ হইয়া যাইবো!

জয়নাল বললো, ম্যাচভান্ডি ভালা না! তোমারে ঘ্যাসের ম্যাচলাইট দিয়া যামু!

বুড়ি তার ফোঁকলা মুখে তোবড়ানো গাল আরো ভেঙে চুড়ে হাসে।

লগিতে ভর দিয়ে নৌকা ঠেলে জয়নাল বললো, দোয়া কইরো নানী! অনেক দূরের পথে যাইতাছি!

বুড়ি একটি হাত আকাশের দিকে তুলে দিয়ে হাসিমুখে মাথা কাত করে। কিছুদূর এগিয়ে এসে সোভান বললো, জয়নাল, খেলাডা কি ভাইব্যা দ্যাখছস?

কোনডা?

এই যে বুড়ির কেউ নাই। কোনোখানে যাওনেরও জাগা নাই। কিন্তু খেলাডা হইলো, আমরা বান্ধের হুগনা জাগায় থাইক্যাও খাইতে পাই না। আর বুড়ির খাওনের অভাব নাই!

রিজিকের মালিক হইলেন আল্লায়! তানি যারে রিজিকের ব্যবস্থা কইরা দেন, তহন সোভানের মতন কাফের মানুষও নিজের রিজিক তারে দিয়া দেয়!

আল্লায় দিলো, না আমি দিলাম? সোভান হাসে।

আল্লায় দিলেন!

ক্যামনে?

আল্লায় তোমারে মনে করায় দিলেন যে, দই-চিড়া লইয়া লইলে দু ফুরের খাওনডা চলবো! কিন্তু আল্লায় মনে মনে ঠিক কইরা রাখলেন এইডা বুড়িরে খাওয়াইবেন! তার লাইগ্যা আমরা বৈঠা মারতে মারতে আসল রাস্তার থাইক্যা সইরা আইলাম। মুর্শিদ বুড়ির লগে দ্যাখা করায় দিলেন। তুমি কইলা দেইখ্যা যাই! না দ্যাখলেও চলতো। আমরা আমাগো পথে যাইতাম গিয়া! আমরা গেলাম না। তোমার মনে হইলো যে, দই-চিড়া খাইলে বুড়ির এক বেলা রান্দা-বাড়ির কষ্টডা কমে! বলে জয়নাল হাসে। বড় বিশুদ্ধ সে হাসি। কোনো এক ঐশী আলোয় তার মুখ ঝলমল করছে। আসলে রহমানের রাহিম নিজের কুদরতের হাতে কিছু করেন না। কুদরত দিয়া করেন! আমরা নাদান আর মূর্খ মানুষ তা বুঝতে পারি না!

সোভান বুঝতে পারে যে, জয়নালের এ বিশ্বাস তার অস্তিত্বের গভীরে প্রোথিত। আর বিশ্বাস যেখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় সেখানে কোনো যুক্তি-প্রমাণ চলে না। চলে না এ নিয়ে বিতর্কও। তবু সে বলে, এইসব আউলা-বাউলা কথা শিখলি কই?

কিছু হুইন্যা শিখছি, কিছু নিজেই বুঝি!

জয়নালের কথা শুনে ভালো লাগে সোভানের। এই যে পৃথিবী, তার যাবতীয় সৃষ্টি, রঙ-রস-গন্ধ-রূপ, তা কি এমনি এমনিই হয়ে গেছে? অবশ্যই না। এই যে আজকের সোভান, তাকেও কোনো না কোনো ভাবে জন্ম নিতে হয়েছে। সৃষ্টি হতে হয়েছে। আর এ সমস্ত ভাবনা মনে উদয় হলে যুক্তি-তর্কের ধারে কাছে যেতে ইচ্ছে করে না। কোনো এক রহস্যময় কারণে আপনা আপনিই মনের ভেতরটা নরম হয়ে আসে। ইচ্ছে হয় কোনো এক অপার মহিমময় কারো সামনে নত হতে। নিজের যাবতীয় অজ্ঞতা, মূর্খতা, অহংকার, ক্রোধ, স্বার্থ সবই সেই অদৃশ্যের পদতলে উৎসর্গ জলাঞ্জলি দিতে।

সোভানকে ভাবতে দেখে জয়নাল বললো, আমার লগে চল একদিন! কথা কইয়া, হুইন্যা, জিগাইয়া মনে শান্তি পাইবা!

তুই কি ভাণ্ডারী হইতাছস? নাকি পির ধরছস?

জয়নাল বললো, ভাণ্ডারীও না পির সাবও না! তয় ওস্তাদের সুর হুনলে ঠিকই বুঝবা!

লইস একদিন! যামুনে!

জয়নাল কেমন দূরাগত কণ্ঠে বললো, সুদিন আউক!

সোভান বললো, লগিডা আমারে দিয়া তুই জিরা। বেলা তো আর কম হয় নাই! দুইডা খাইয়া ঘুমাইয়া লইলেও পারস!

জয়নালকে হঠাৎ করেই আজ বেশি ভালো লাগতে থাকে সোভানের। পৃথিবীর এত এত খারাপ মানুষের ভিড়ে জয়নালের মত এমন দু একজন নিষ্কলুষ মানুষ থেকে যায়। যাদের সন্ধান সবাই কাছাকাছি থেকেও কখনো পায় না। সোভানের মনে হয় ভেতরে ভেতরে জয়নাল আরো উচ্চ শ্রেণীর মানুষ। নিচু আর ইতর শ্রেণীর মানুষ স্রষ্টার মহিমা বিশ্বাস করে না বলে দেখতেও পারে না। যে কারণে কখনো বিশ্লেষণও করতে পারে না।

সোভানের হাতে লগি দিয়ে জয়নাল পাটখড়ির বোঝার উপর কনুইর ভর রেখে তাকিয়ে থাকে দিগন্তের পানে। নৌকা বাইতে বাইতে হঠাৎ সোভান জিজ্ঞেস করে, তর ওস্তাদ পিরসাব না বয়াতি?

কোনোডাই না!

তয়?

আমার দয়াল মুর্শিদ!

তারপরই হঠাৎ সুর করে জয়নাল গাইতে থাকে, দয়াল মুর্শিদরে! দ্যাখা দ্যাও দ্যাখা দ্যাও মোরে…আমি রইলাম আশায় তোমার পন্থে চাইয়ারে মুর্শিদ…

জয়নালের গলাটা খুবই সুন্দর আর সুরেলা! তার ভরাট কণ্ঠে উচ্চকিত গানের সুর পানির উপর ভেসে ভেসে অদ্ভুত এক দ্যোতনা সৃষ্টি করে। সোভান মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে ঐশী শক্তিতে বলীয়ান এক যুবকের কণ্ঠ নি:সৃত ঐশী বাণী। সে ভাবে, আর কেউ কি জানে তার এই সঙ্গীত সাধনার কথা? তার মা কি জানে? জানে কি জাহেদা? মনে হয় এটা খুবই গোপন এক সম্পদের মত অন্যদের কাছ থেকে সযত্নে আড়াল করে রেখেছে জয়নাল। নয়তো এর আগে কিছুটা হলেও কানে আসতো।

।। ১৩ ।।

হিতেন পোদ্দারকে নৌকা বুঝিয়ে দিয়ে তারা বাজারের অলিগলি ঘুরে বেড়ায়। দোকানের বেঞ্চিতে বসে বনরুটি চায়ে চুবিয়ে চুবিয়ে খায়। এমন সময় হিতেন পোদ্দারের সরকার হাওলাদার এসে বলে, জয়নাল, তোমারে সারা বাজারে খুঁইজা বেড়াইতাছি!

বনরুটি খাওয়া থামিয়ে জয়নাল জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, ক্যান?

মেঘনার একটা ক্ষ্যাপ আছে! যাইবা?

কি যাইবো?

গোল আলু আর চিড়ার বস্তা!

জয়নুল সোভানের দিকে তাকিয়ে বলে, রাজি অমু?

অসুবিদা কি?

মেঘনা কি বাড়ির কাছে?

সোভান বিরক্ত হয়ে বলে, কই যাইতাছি হেইডা কথা না! কথা হইলো, নাও লইয়া খালি ফিরা তো লাভ নাই! বাইর হইছি দুইডা পয়সা কামাই করনের লাইগ্যা! না কি?

জয়নাল আর কিছু না বলে মাথা দুলিয়ে বনরুটির টুকরো চায়ে চুবায়। হাওলাদার বললো, তাইলে মাল তুইল্যা দিমু?

জয়নাল চায়ে ভেজানো বনরুটির টুকরোয় কামড় দিয়ে ফের মাথা নাড়লে হাওলাদার তড়িঘড়ি ফিরে যায়। সেদিকে তাকিয়ে সে অনিশ্চিত কণ্ঠে বিড়বিড় করে বললো, ভাড়া জানি কত দেয়?

সোভান জয়নালের কথা শুনতে পেয়ে বলে, যাই দেউক! একবারে না পাওনের থাইক্যা ভালা!

তা ঠিক!

জয়নাল সম্মতি জানিয়ে আরেক কাপ চা আর বনরুটি নেয়। সোভানকে আরো চা বনরুটি নিতে বললে সে নেয় না। দোকানের প্লাস্টিকের গ্লাসে পানি নিয়ে ঢকঢক করে পানি গিলে বড় একটা ঢেকুর তুলে বললো, মেঘনা থাইক্যা ফিরতে ফিরতে রাইত হইয়া যাইবো না?

জয়নাল হেসে বললো, ফিরতে ফিরতে না, যাইতে যাইতেই রাইত হইবো!

তাইলে ঘুমামু কই?

জয়নালের মুখে কেমন যেন রহস্যজনক হাসি ফুটে ওঠে। বলে, হেই ব্যবস্থা হইবো!

চা দোকানের পাওনা পরিশোধ করে জয়নাল বলে, চল, যাই!

ওরা হিতেন পোদ্দারের ঘরের সামনে নৌকা বোঝাই বেশ কয়েকটি বস্তা দেখতে পায়। নিচের দিকে  আলুর বস্তা দিয়ে উপরে দিয়েছে চিড়ার বস্তা। কিন্তু বস্তাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট কাপড়ের পুটলি দেখতে পেলো বেশ কটিই আছে। কিন্তু ওগুলোতে কি বুঝতে না পেরে বললো, বাবু ন্যাকড়া গুইঞ্জা দিছেন ক্যান?

হিতেন পোদ্দার হাসে। বলে, কোনো অসুবিদা নাই! পলিথিন দিয়া সুন্দর মতন ঢাইক্যা দিবো! ম্যাঘ বাদলের দিন, কওন তো যায় না কহন শুরু হয়!

জয়নালের মন কেমন যেন দুরুদুরু করে। কোনো একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার এতে আছে যা হিতেন পোদ্দার তাদের কাছে গোপন করে গেছে। তাই কিছুটা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে সে বললো, চালান তো লাগবো! একখানের মাল আরেকখানে গেলে চালান ছাড়া অনেক বিপদ!

তাও আছে! কইলাম না অসুবিদা নাই!

হিতেন পোদ্দার দু টি চালান লিখে জয়নালের হাতে দিয়ে বললো, লঞ্চ ঘাটে গিয়া এমভি রিনা নামের একটা লঞ্চ খোঁজ করবি। লঞ্চ দেখলে সারেংরে কইবি পোদ্দারের মাল নিয়া আইছি! তার বাদে তর কাম শ্যাষ। চালানের একটা সারেংরে দিয়া আরেকটায় মাল বুইঝ্যা পাইছে লেইখ্যা দস্তখত দিয়া দিবো। আর ট্যাকা পয়সা ফিরা আইলে পাবি!

অহন দিবেন না?

ট্যাকা কোমরে গুইঞ্জা কোই ঘুমাইবি ঠিক আছে? দুইদিনের কষ্টের কামাই চুরি হইলে?

জয়নাল কোনো কথা না বলে কাঁধ থেকে গামছাটা নিয়ে মাথায় পেঁচিয়ে পাগড়ীর মত বাঁধে। নীল রঙের পলিথিন দিয়ে সুন্দর মত মালগুলো ঢেকে বেঁধে দিয়েছে দু জন লোক। জয়নাল ঘুরে ফিরে বাঁধন পরীক্ষা করে।

হিতেন পোদ্দার বললো, মেলা কর! লঞ্চ না দেখলে ঘাটে বইয়া থাকবি! মাল না বুঝাইয়া দিয়া তগো নিস্তার নাই কইলাম!

জয়নাল সোভানকে বললো, আল্লারে ডাইক্যা উইঠ্যা পড়!

জয়নাল ঢাল বেয়ে নেমে লগি হাতে নিয়ে নৌকাটা ঘুরিয়ে দিলে এ প্রান্তে সোভান উঠে দাঁড়ায়।

নৌকার দু প্রান্তে দু জন। একজন বসে থাকলে কেউ কাউকে দেখতে পাবে না। বাজারের ঘাট থেকে নৌকা বের করে খালের মুখে এসে জয়নাল বললো, রাইত হইলে ডাকাইতের ডরও আছে! কি করমু মাথায় কিছু ধরতাছে না! তার মুখটা কিছুটা শুকনো শুকনো দেখায়।

সোভান বললো,  রাইত বেশি অওনের ডর থাকলে কোনোখানে নৌকা ভিড়াইয়া রাখমু!

তাইলেও ডর আছে!

তুই কি চিন্তা করলি?

কইলাম না মাথায় কিছু আইতাছে না!

সোভান কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বললো, মেঘনার কাছাকাছি কোন বাজার আছে?

ব্যালতলী!

সোভান হেসে বলে, দোয়াই ল্যাংটার ব্যালতলী?

হ।

তাইলে রাইতটা ব্যালতলী বাজারে কাডাইয়া ফজরের সময় আবার মেলা করমু। রাইত অওনের আগে আগে ব্যালতলী যাইতে পারমু না?

ক্ষেতের উপরে উপরে চললে পারা যাইবো!

যা করে আল্লায়! বলে সে বললো, সামনে দিয়া আমি বইডা টানমু!

গলুইর দু পাশে দুটো লোহার কড়া লাগানো আছে। সে দু টোর সঙ্গে বৈঠা দুটো বেঁধে নিয়ে ছিপ নৌকার মত দু হাতে বৈঠা টানা যায়। মনে মনে জয়নালের বুদ্ধির তারিফ না করে পারে না সোভান। বৈঠা দুটো বেঁধে গলুয়ে উল্টো ফিরে বসে জয়নালের মুখো মুখি বসে দু হাতে একই সঙ্গে বৈঠা দুটো পানিতে ফেলে টানতেই নৌকার গতি দ্বিগুণ হয়ে যায়। আর ব্যাপারটা টের পেয়ে জয়নাল উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলো, বদর বদর, খোয়াজ খিজির, দয়াল মুর্শিদ, আল্লা-রসুলের পাক নাম সার!

সোভান খুবই মজা পাচ্ছিলো বৈঠা টানতে। শেষে বস্তার উপর দু পা ঠেকিয়ে প্রায় চিত হয়ে বৈঠা টানতে থাকলে কোমরের কাছটায় কেমন যেন আরাম বোধ হয়। বৈঠা টানতে টানতে মনে মনে সে হিসাব কষে যে, হিতেন পোদ্দারের ভাড়া থেকে পাবে তিনশ তেত্রিশ টাকা। এখনকার ভাড়া থেকে কম করে হলেও একশ পঞ্চাশ টাকা। আর ফিরতি পথে যদি দু একশর ভাড়া পাওয়া যায় তো মন্দ হয় না।

মোটামুটি ছয়শ টাকার একটি ভালো আয়। হিসাবটা করতে পেরেই সে মহা উল্লাসে বৈঠা টানতে থাকে। আর দু দিক থেকে দু জনে নৌকা বাওয়ার ফলে তেমন একটা ক্লান্তি তাদের স্পর্শ করে না। তবু বেলতলা বাজারের ঘাটে পৌঁছতে পৌঁছতে ওরা মগরেবের আজান শুনতে পায়।

ঘাটে হরেক রকমের মাল বোঝাই বিভিন্ন আকৃতির নৌকা চোখে পড়ে। সারিবদ্ধ নৌকাগুলোর দু টির ফাঁকে নিজের নৌকা ভিড়িয়ে দিয়ে জয়নাল আলু আর চিড়ার বস্তায় হেলান দিয়ে বসে। বেজায় ক্লান্তি লাগছে! এদিকে সোভানের অবস্থাও তথৈবচ। কেউ কারো খোঁজ নেবার প্রয়োজন মনে করে না। যার যার প্রাণ নিয়েই আপাতত ব্যস্ত।

সোভানের প্রচণ্ড ক্ষুধার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমও পায়। সে কোনটা করবে ঠিক করতে না পেরে, গলুইয়ের উপরই চিত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

অন্যদিকে জয়নাল বিশ্রাম নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সোভানের উদ্দেশ্যে বললো, হাতমুখ ধুইয়া লও! আগে চাইর-ডা ভাত খাই! কিন্তু সোভানের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সে পানিতে নেমে নৌকার এ প্রান্তের দিকে হেঁটে এসে দেখে চিত হয়ে ঘুমুচ্ছে সোভান। তার তুলনায় সোভান মোটামুটি কম কষ্ট করেই বড় হয়েছে। যে কারণে বেশি পরিশ্রমে কিছুটা বেশি পরিমাণেই শ্রান্ত হয়ে পড়ে। সে কিছুক্ষণ হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে থেকে সোভানের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সোভানের জন্য মনে মনে তার খারাপ লাগতে থাকে। সে সোভানকে ফেলে একা একা খেতে যেতে চায় না। তাই কাছা খুলে পরনের লুঙ্গিটা উপরের দিকে তুলতে তুলতে সে পানির আরো গভীরতার দিকে এগিয়ে যায়। এক সময় লুঙ্গিটা খুলে নৌকার মাথিতে রাখে। তার পর ঝুপঝাপ ডুব দিয়ে গামছা দিয়ে শরীর ডলে ডলে গোসল করে।

গোসল সেরে নৌকায় উঠে লুঙ্গি পরে শরীর মোছে। গলুইয়ের নিচে রাখা পলিথিনের ব্যাগ থেকে দুমড়ানো মোচড়ানো সার্টটা বের করে গায়ে দেয়। ভেজা মাথা গামছায় মুছে ভেজা চুল আঙুলে আঁচড়ায়। বাবরি চুল পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে ফের ভেজা গামছাটা হাতে নিয়ে লুঙ্গি কাছা দিয়ে পানিতে নেমে হেঁটে আসে সোভানের কাছে। তখনো সোভান ঘুমুচ্ছে।

কিছুক্ষণ ইতস্তত করে সে সোভানের গায়ে আলতো ঠেলা দিয়ে ডাকে, সোভান ভাই! ওই সোভান ভাই!

সোভান চোখ মেলে তাকিয়েই আধো অন্ধকার দেখে ধড়মড় করে উঠে বসে। কিরে ডাক পাড়স ক্যান?

লও, বাজারের ভিতরে যাই! অনেক খিদা পাইছে!

হ, চল!

সোভানও নৌকা থেকে নেমে ঘাটের ঢাল বেয়ে উপরে উঠে একবার চারদিকে তাকায়। বাজারের ভেতর এখনও অনেক লোকের উপস্থিতি চোখে পড়ে। এখানে সে কখনো আসেনি। অপরিচিত এলাকা তার সবসময়ই ভালো লাগে। ভালো লাগে অপরিচিত মানুষের দিকে তাকিয়ে তাদের কথা-বার্তা আচার আচরণ লক্ষ্য করতে। সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করে যে, প্রতিটা মানুষই আলাদা। আলাদা তাদের কণ্ঠস্বর। কখনো কখনো সামান্য মিল লক্ষ্য করা গেলেও তাতে ধরা পড়ে ভিন্নতা আছে।

চারদিকে অবাক হয়ে তাকাতে তাকাতে সোভান এগিয়ে চলে জয়নালের পিছু পিছু। একটি সস্তা ভাতের হোটেলে ঢুকে চেয়ারে বসে জয়নাল বললো, ভাতের লগে কি খাইবা? মাছ না গোস্ত?

তর যেইডা খুশি! বলে, সোভান একটি গ্লাসে পানি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে হাতমুখ ধোয়। মুখে পানি নিয়ে কুলকুচা করে ফুড়ুৎ করে পানি ফেলে।

তারপর গামছায় মুখ মুছতে মুছতে এগিয়ে এসে জয়নালের সামনা সামনি টেবিলে চেয়ার টেনে বসে পড়ে। তখনই তাদের বয়সের এক যুবক এসে বলে, কি দিতাম?

ভাত দুইডা! বলে, জয়নাল ফের জিজ্ঞেস করে, তরকারি কি আছে?

বাইলা-রুই-কাতলা-বোয়াল-ট্যাংরা-কই-মাগুর-গরু-মুরগি-ডাইল-সবজি-আলুভর্তা কোনডা দিতাম?

জয়নাল বললো, একটা কইরা গরু-সবজি-ডাইল!

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর দু হাতে দুটো চিনামাটির বাসনে ভাত নিয়ে আসে যুবক। পেছন পেছন একজন নিয়ে আসে গরুর গোস্ত আর সবজির বাটি।

জয়নাল তাড়া দিয়ে বললো, শুরু কর!

দু জনেই ভাত মাখিয়ে গরাসে গরাসে ভাতের দলা মুখে তোলে। আরো ভাত আসে। ডাল আসে। আসে গোস্তর ঝোল। ভাতের থালা উঁচু উঁচু করে দু জনেই ভাত নেয়। খেতে সোভানের ভালো লাগছিলো বেশি। কতদিন পর সে পেট পুরে তরকারি দিয়ে ভাত খাচ্ছে। মনে হচ্ছিলো যে শুধু ডাল দিয়েই সে এক হাঁড়ি ভাত খেয়ে ফেলতে পারবে! ডালের জন্য পয়সা দিতে হবে না জানতে পেরে আরো এক বাটি ডাল চেয়ে নিয়ে সুরুৎ সুরুৎ করে চুমুক দিয়ে খায়। সোভানের কাণ্ড দেখে জয়নাল হাসে। হাসে পাশের টেবিলের দু একজনও। কিন্তু কোনো কিছুই ভ্রুক্ষেপ করে না সোভান। ছোট বেলা থেকেই সে শিখেছে যে, পেটে ক্ষুধা নিয়ে সংকোচ বা লাজ-লজ্জা রাখতে নেই।

খাওয়া হলে, সেখানে বসেই জয়নাল একটি বিড়ি ধরিয়ে বলে, আরো কিছু খাইবা? গরমগরম জিলাবী ভাজতাছে!

ভাত খাওয়ার পর অতিরিক্ত কিছু খেতে ভালো লাগে না সোভানের। অভ্যাসও নেই। তাই সে বলে, তর মন কইলে খা!

কিন্তু হোটেল থেকে বেরিয়ে এলেও জয়নাল জিলাপির দোকানের দিকে যায় না। বাজারে ঘুরে বেড়ায়। সোভানও কিছু না বলে জয়নালের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটে। কাপড়ের দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বিভিন্ন রঙের শাড়ি দেখে। প্রতিটিই মনে মনে জাহেদাকে পরায়। কোনটা বা কোন রঙটা তাকে ভালো মানাবে। কিন্তু তার মনে হয়, যে কোনোটি পরলেই তাকে মানিয়ে যাবে।

বেশিক্ষণ ঘুরাঘুরি করতে পারে না তারা। ফিরে এসে চিড়ার বস্তার উপরই পাশাপাশি দু জন ঘুমিয়ে পড়ে। বাজারের কোথাও ঘুমিয়ে পড়তে পারতো। কিন্তু নৌকার নিরাপত্তার কথা ভেবে দু জনেই একমত হয়। শক্ত চটের বস্তার উপরকার পলিথিনের উপর শুয়ে পড়ে কিছুটা অস্বস্তিতে ভুগলেও গাঙের বা খালের খোলা হাওয়ায় ঘুমিয়ে পড়তে বেশি দেরি হয় না তাদের।

পরদিন কিছুটা বেলা করে ঘুম ভাঙার ফলে মেঘনা ঘাটে এসে পৌঁছুতে তাদের কিছুটা দেরি হয়ে গিয়েছিলো। যে কারণে এমভি রিনাকে তারা খুঁজে পায় না। জয়নাল মনে মনে শঙ্কিত হয়ে ভাবে যে, লঞ্চ এসে চলে গেল কি না। তাই ঘাটের লোকজনকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, মিয়া ভাই! এমভি রিনা লঞ্চ কি ছাইড়া গেছে?

একজন বিশ্রী চেহারার লোক পান খাওয়া মুখে হেসে বললো, হ। কাইল রাইত দশটায় ছাইড়া গেছে! ফিরতে ফিরতে আইজ দিনের দশটা-এগারটা বাজবো!

জয়নাল লোকটির এ কথার ভেতর থেকেই লঞ্চের আসার সময় অনুমান করে নিতে পারে অনায়াসে। নৌকায় ফিরে গিয়ে সোভানকে বলে, লঞ্চ আইতে বেলা দশটা-এগারটা! এতক্ষণ করমু কি?

সোভান হেসে বললো, তাইলে ঘুমাইয়া পড়!

জয়নাল বিস্মিত হয়ে বললো, রইদ তো আস্তে আস্তে চ্যাত্তাছে! ঘুমামু ক্যামনে?

সোভান যাত্রী ছাউনিতে ঘুমিয়ে থাকা লোকজনের দিকে আঙুল তুলে দেখায়। আর তা দেখে জয়নাল হাসিমুখেই সেদিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

।। ১৪ ।।

কাজ-কামাই ভালো হওয়াতে জয়নাল আর সোভান মুন্সিগঞ্জ বাজারে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন বেলোয়ারী পসরা দেখে বেড়ায়। মমিনার লিপস্টিক কিনতে চাইলে দোকানদার বিভিন্ন রঙের বিচিত্র আকৃতির লিপস্টিক দেখায়। বিভিন্ন দেশের নাম বললে সোভানের আর সাহস হয় না দাম জিজ্ঞেস করার। নাম এবং জন্মস্থানের কথা শুনেই সে ধারণা করতে পারে যে, পাঁচ টাকায় এসব জিনিস কিনতে পাওয়া যাবে না। তবু সে শঙ্কিত কণ্ঠে বলে, আরো কম দামের নাই?

দোকানদার বিরক্ত হয়ে বলে, আরো কম দামের কত চান? বিশ ট্যাকার কমে দিতে পারমু না! আর দশ ট্যাকা দামের একটা আছে, ওইগুলা তেমন ভালা হইবো না!

সোভানের মুখ শুকিয়ে গেলেও জয়নাল বলে, আমাগোরে তো পাঁচ ট্যাকা দিয়া দিলো!

কথা শুনে দোকানদার হাহা করে হাসে। হাসতে হাসতে বলে, বাইদানীগ কাছে যাও! তিনটাকা দিয়াও পাইবা!

সোভানের রাগ হলেও সে নিজকে সংযত করে ভাবে, মমিনার বাপের অনেক আছে। তাগো পিছে খরচ কইরা লাভ নাই। জাহেদার একটা কাপড় না হইলে চলবো না!

ওরা মাথা নিচু করে দোকান থেকে বেরিয়ে আসে। পুরো বাজার ঘুরে বেদেনীর পসরা খোঁজে। কিন্তু পায় না। মমিনার লিপস্টিক না নিয়ে গেলেও যে মান থাকবে না। তাই সে জয়নালকে বললো, তুই এত জাগা ঘুইরা বেড়াস, বাইদানীরা কই সওদা লইয়া বয় কইতে পারস না!

জয়নাল মুখ চুন করে বলে, এহানে হ্যাগো বহরের কাছেইত্ত বইতো! ফুল মণিরে কতবার এহান থাইক্যা কিন্যা নিয়া দিছি!

সোভান চমকে উঠে বলে, ফুল মণি কে?

জয়নাল সাবধান হয়ে বলে, আছে একজন!

তর লগে কি সমন্ধ?

কিছু না!

কিন্তু সোভান যতই চাপাচাপি করে জয়নাল এর বেশি কিছু বলে না।

ফুল মণি তর কে যে তারে লিবিস্টিক কিন্যা দিছস?

জয়নাল কথা কাটাতে বলে,তোমার গিরার থাইক্যা আরো পাঁচ ট্যাকা ভইরা একটা লইয়া লও!

তা ছাড়া আর রাস্তা দ্যাখতাছি না!

তারা ফের পূর্বেকার দোকানটায় ফিরে যায়। সোভান দশ টাকার একটি নোট বাড়িয়ে দিয়ে দোকানিকে বলে, দ্যান একটা! দশ টাকার দামের!

দোকানদার মুচকি হেসে লালরঙের একটি সস্তা লিপস্টিক এগিয়ে দিলে সোভান সেটা নিয়ে কোমরের কাছে লুঙ্গির ভাঁজে গুঁজে রাখে। তারপর আবার কি মনে করে বলে, ভাই, একটা কথা জিগাই! রাগ হইয়েন না!

রাগ অমু ক্যান? আপনে আমার কাস্টমার না!

নীলা রঙ্গের নাই?

কি?

লিবিস্টিক!

লোকটা আবার শব্দ করে হাসে। তেমনি হাসতে হাসতেই বলে, আমার জন্মে নীলা রঙ্গের লিপস্টিক দেহি নাই! নামও হুনি নাই!

আইচ্ছা যাই! বলে, সোভান দ্রুত দোকান থেকে বেরিয়ে পড়ে।

পেছন পেছন জয়নাল এগিয়ে এসে বলে, নীলা রঙ্গের লিবিস্টিক ঠোঁডে দিলে ক্যামন দ্যাহা যাইবো?

ভালাইত্ত লাগনের কথা!

কিন্তু কার জন্যে এই নীল রঙের লিপস্টিক সে প্রশ্নে না গিয়ে জয়নাল আপন মনেই বলে উঠে, মদিনা-মমিনা যেই কালার কালা, তাগো ঠোঁডে লাল রঙডাই দ্যাহা যাইতে চায় না!

সোভান হঠাৎ বললো, ল, কাপড়ের দোকানে যাই!

ঠিক কথাই কইছো! মার লাইগ্যা একটা ঘরে পিন্দনের কাপড় লমু।

সোভান জিজ্ঞেস করে, কয়ডা লইবি?

কয়ডা আবার? জয়নাল আশ্চর্য হয়ে বলে, একটাই!

সোভান কিছুটা ভেবে বলে, ক্যামন দামের কিনবি?

এই ধর গিয়া দেশ-শ দুই-শর মইদ্যে! এর কমে তো কাপড় পাওয়া যায় না!

সোভান সলজ্জ ভাবে হেসে বললো, আমি তো কোনোদিন কাপড় কিনি নাই, কাপড়ের দোকানেও আই নাই! তুই আমারে একটা নীলা রঙ্গের কাপড় কিন্যা দিস!

ট্যাকা কে দিবো? তুমি না আমি?

আমিই দিমু!

জয়নাল বুঝতে পারে না কেন সোভান শাড়ি কিনবে? তাই কিছুটা রহস্য করে বলে, লুঙ্গি ছাইড়া শাড়ি কাপড় পিন্দনের কথা চিন্তা করতাছ নাহি?

আরে না! তরল কণ্ঠে বললো সে।

তাইলে কার লাইগ্যা?

জাহেদারে দিমু!

তুমি দিবা ক্যান? আমার খালাতো বইন! আমিইত্ত দিতে পারি!

সোভান জয়নালের কাঁধে হাত রেখে বলে, তর ভইনেরে তুই দশ-বিশটা যতডা মনে চায় কিন্যা দিস। তয় আইজগা আমারে কিনতে দে!

জয়নাল কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সোভানের মুখের দিকে। কিন্তু এর হেতু সোভান বুঝতে পারে না। বলে, কিরে?

জয়নাল দৃষ্টি আনত করে বললো, কিছু না! তারপর বলে, লও, যাই!

একটি কাপড়ের দোকানে ঢুকতেই দোকানে বসা তিনজন একই সঙ্গে বলে উঠে, আসেন! বসেন! ওরা দু জনের কেউ বসে না। দোকানের বিভিন্ন দিকে ঝুলিয়ে রাখা হরেক রকমের শাড়ি-কাপড় দেখে।

দোকানের বয়স্ক লোকটি বলে, কি নিবেন? জয়নাল বললো, আমাগোরে দুইডা সুতীর কাপড় দেখান!

কার লাইগ্যা? বয়স ক্যামন হইবো?

সোভানের ভালো লাগে না। বলে, কার লাইগ্যা কইলে চিনবেন? আর বয়স দিয়া করবেন কি?

বয়স্ক লোকটি বললো, চ্যাতেন ক্যান বাজান? শোনেন, আমরা জিগাই এই কারণে যে, যদি কয় বইনের, তাইলে ভাইরে দেইখ্যা ভইনের গায়ের রঙ অনুমান করি। আর সব কাপড় তো সবেরে মানাইবো না! তার লাইগ্যাই বয়স জিগাই!

জয়নাল আর সোভান দু জনেই বুদ্ধিমান। তাই অল্প কথাতেই বুঝে যায়। সোভান বললো, বুঝতে পারি নাই!

তারপর সলজ্জ কণ্ঠে বলে, এর আগে তো কোনোদিন কাপড়ের দোকানে আই নাই! তার লাইগ্যা ভাও বুঝি না!

আপনেরা বসেন! বলে, প্রবীণ লোকটি আবার জানতে চায়, ক্যামন কাপড়? ঘরে পিন্দনের না তোলার?

সোভান বললো, নীলার মইদ্যে একটা দ্যাহান! বয়স আমার মতন। গায়ের রঙ পরিষ্কার! আরেকটা দ্যাহান আমার খালার লাইগ্যা। বয়স পঞ্চাশের মতন। ঘরে পিনবো।

লোকটি নীলের মাঝে অনেকগুলো কাপড় নামালে সবগুলোই সোভানের পছন্দ হয়। কিন্তু কোনটি নেবে, তা আলাদা করতে না পেরে বললো, নিমু একটা! অ্যাত দ্যাহাইলে মাথা ঠিক রাখমু ক্যামনে?

খুব পরিষ্কার হইলে এইডা! বলে লোকটি নীল জমিনে সাদা ফুলের ছাপ দেয়া লাল পাড়ের একটি শাড়ি দেখায়।

তারপর পরিষ্কার শ্যামলা হইলে এইডা নিতে পারেন! বলে, নীলের জমিন, সবুজ আঁচল আর কমলা রঙের চওড়া পাড়ের আরেকটি শাড়ি দেখায়।

সোভানের ইচ্ছে হয় জাহেদার জন্যে দুটো শাড়িই নিয়ে নেয়। কিন্তু জাহেদাকে কাপড় কিনে দিলে মদিনা মমিনার কানেও কথাটা যাবে। তা শুনে দু জনেই মন খারাপ করতে পারে। তাই সে জিজ্ঞেস করলো, কালা মাইয়াগোরে কোনডা ভালা লাগবো?

লোকটি হাসলো। কালা মাইয়াগোরে নীলা রঙ ভালা লাগবো না! তাগোরে ভালা লাগে চকরা¬বকরা আর কড়া রঙে!

জয়নাল সোভানের কানের কাছে মুখ এনে বললো, সব ট্যাকা অহনই খরচ কইরা ফালাইবা নাহি? তোমার নিজের তো কিছুই নাই!

সোভান জয়নালের কথা পাত্তা না দিয়ে বললো, নীলার মইদ্যে সাদা ফুলেরডা দেন! আর চকরা¬বকরা দুইডা নামান!

লোকটি হেসে দুটো চকরা বকরা ফুলেল কাপড় নামায়।

জয়নাল বললো, মায়ের লাইগ্যা কোনডা নিমু?

হালকা আকাশী রঙের একটি কাপড় দেখিয়ে সোভান বলে, খালার লাইগ্যা এইডা ল!

দরদাম নিয়ে বা কাপড়ের মান নিয়ে ওরা দু জনের কেউ মাথা ঘামায় না। সোভান বলে, বেশি দাম রাইখ্যেন না! দুইদিন নৌকা বাইয়া রুজি করছি!

বুঝতে পারতাছি! এক দাম কমু, না দরদাম করবেন?

এক দাম! পারলে ট্যাকা বাইর কইরা দিমু! নাইলে চুপচাপ বাইর হইয়া যামু! প্রবীণ তার অন্য সহযোগী দু জনের দিকে তাকিয়ে একবার হেসে বললো, চাইরডা কাপড় ছয়শ পঞ্চাশ ট্যাকা দেন! কথা শুনে সোভানের ঠোঁট শুকিয়ে যায়। একবার জয়নালের দিকে তাকিয়ে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। কোনডা কত ধরলেন? নীলাডার দাম ধরছি দুইশ আর তিনডা দেশ-শ কইরা!

সোভানের চেহারা আরো ম্লান দেখালে লোকটি বলে, বেশি দাম চাই নাই! চাইরো দিকে পানি। অভাব। ব্যাচা-বিক্রি নাই! চাইরডা কাপড়ে কি চলি−শ ট্যাকা দিবেন না? আর কোনো কথা না বলে সোভান খুটে হাত দিয়ে টাকা বের করে। দেখাদেখি জয়নালও খুটে হাত দেয়।

দাম পরিশোধ করে ওরা দোকান থেকে বেরিয়ে কিছু দূর এলে জয়নাল বললো, মদিনা-মমিনার লাইগ্যা কাপড় লইছ ঠিক আছে! কিন্তু জাহেদা বুবুর লাইগ্যা লইলা কি বুইঝ্যা? হ্যায় তো তোমার কেউ না!

সোভান হাসে। কেউ না হইলে কি কিছু দ্যাওন যায় না?

জয়নাল চুপ করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে।

সোভান আবার বলতে থাকে, জাহেদা আমি এক লগে ইস্কুলে পড়ছি। এক কেলাসে। আমরা সবতেই যাইতাম খালি পায়ে। জাহেদা একজনই যাইতো খালের জুতা পিন্দা। আমাগো সবতের কাপড় ময়লা থাকলেও জাহেদার পিন্দনে থাকতো পরিষ্কার জামা। হ্যায় জানি আমারেই মনে মনে পছন্দ করতো। কতদিন এক লগে তাগো বাড়ির রাস্তা পর্যন্ত গেছি! জাহেদা আইয়া তাগো বাড়ির রাস্তা পর্যন্ত আমার লাইগ্যা খাড়াইয়া থাকতো। তার বাদে একদিন দেহি হ্যায় ইস্কুলে যায় না। পরদিনও না। তার বাদেও না। তাগো বাইত্যে গিয়া দ্যাখলাম আরেক জাহেদা। মাথায় ত্যাল নাই। উদাম গায়ে। ময়লা কাপড় পিন্দনে। পরে জানছি হ্যার মায় মারা গ্যাছে। হতাই মা তারে ইস্কুলে যাইতে দিতো না। পড়তে দিতো না। অ্যামনেই জাহেদা আমি বড় হইতে থাকলাম। একদিন বাবার প্যাট খারাপ হইলো। দাস্ত আর বমি। রাইতে বাবারে কবর দিলাম। বিয়ান থাইক্যা মার শুরু হইলো দাস্ত আর বমি। দুইদিন ভুইগ্যা মায়ও শ্যাষ! জমিজমা তো দাদায় থাকতেই মামলা কইরা সব শ্যাষ করছে। বাবার ভাগে বেশি পড়ে নাই। এই বান্ধের নিচেই আমাগো সব জমি। সরকারের মানুষের চালাকি বাবায় বুঝে নাই! জমি-জমা আগে আগে লেইখ্যা দিছে বইল্যা আর কোনো ট্যাকা পয়সাও পায় নাই! পরে যহন আউয়াল ডাক্তারের ঘরে গিয়া কামে লাগলাম, তহন মাঝে মইদ্যে জাহেদার লগে দ্যাহা হইতো। টুকটাক কথা-বার্তা হইতো। এহন জাহেদারে ছাড়া এত কাছের আর কেউ আমার নাই!

সোভানের মুখটা আরো ম্লান দেখায়। কিন্তু দুটো উজ্জ্বল চোখ যেন আরো দূরের কিছু অবলোকন করে। আর তেমনি দূরাগত কণ্ঠে সে আবার বলতে থাকে, জাহেদার আর কোনো পিন্দনের কাপড় নাই। একটাই কাপড়। এইডাই গায়ে ভিজে। এইডাই গায়ে হুগায়! এই সুযুগে কাশেম মোল্লার মতন আর জলিল মুহুরির মতন মানষ্যে তারে কাপড়ের লোভ দ্যাহায়। রাইতের আন্ধাইরে চুপ্পে চুপ্পে যাইতে কয়। অহন যেই কাপড়ডা জাহেদার পিন্দনে আছে, তা যদি ছিঁড়া যায়, তহন হ্যায় কি পিনবো? ল্যাংটা থাকবো? কেউ না কেউ তো তারে কাপড় দিতে হইবো নাকি? বলে, সোভান জয়নালের বিস্মিত মুখের দিকে তাকায়।

তারপর আবার বলে, নাকি তুই কইবি জাহেদা একবার কাশেম মোল্লা আরেকবার জলিল মুহুরির কাছে রাইতের আন্ধাইরে চুপ্পে চুপ্পে যাউক?

জয়নালের যেন এতক্ষণে বোধগম্য হয় সোভানের কথা। চুপ্পে চুপ্পে যাওয়ার প্রস্তাবের রহস্যও তার কাছে আর অস্পষ্ট থাকে না। সে হঠাৎ সোভানের দু হাত ধরে বলে উঠলো, তুমি জাহেদা’বুরে বিয়া কইরা ফালাও! তোমার মতন এমন কইরা কেউ বুবুর কথা চিন্তা করবো না! আমরা দুই ভাইয়ে মিল্যা যা কামাই করমু, তা দিয়া আমাগো চইল্যা যাইবো! কও সোভান ভাই!

জয়নালের ঝাঁকুনিতে সোভান যেন বাস্তবে ফিরে আসে। নিজের অস্তিত্ব ভেবেই যেন বলে, আমারিত্ত থাকন খাওনের ঠিক নাই! আমি ক্যামনে জাহেদারে বিয়া করমু? অ্যা ছাড়া কেরামত মেম্বর চাইতাছে আমি তার বাইত্যে গিয়া থাকি!

না। তুমি ওই বাইত্যে যাইবা না! জয়নালের কণ্ঠে যেন আর্তি ফুটে ওঠে। হ্যার মাইয়া মদিনারে তোমার কাছে বিয়া দিবো! তাগো চেহারা-সুরত যেমন বদ, কথা-বার্তাও হ্যামনি চুক্কা! উঠতে বইতে তোমারে ঘরজামাই কইয়া খোডা দিবো!

সোভান কেমন অসহায়ের মত বলে উঠলো, পানি নাইম্যা গেলে কই থাকমু? আমার ঘর তো পানিতে পইচ্যা নষ্ট হইয়া গেছে! নতুন কইরা যে ঘর তুলমু, হেই আশাও তো দেহি না!

তাইলে তুমি তিনডা কাপড় কিন্যা ট্যাকাগুলান নষ্ট করলা ক্যান?

কথার প্রসঙ্গ ভিন্ন দিকে মোড় নিচ্ছে দেখে সোভান শঙ্কিত হয়ে ওঠে। হয়তো কাপড়গুলো ফিরিয়ে দেবার জন্যে জয়নাল জেদ ধরে বসবে। তাই সে বললো, তার আগে ল কিছু খাই! পথ তো কম না!

জয়নালেরও ক্ষুধা ছিলো। সে আর প্রতিবাদ না করে প্রথম যেই হোটেলটা দেখতে পায় সেটাতেই ঢুকে পড়ে।

হোটেলে বসে ওরা মুগের ডাল আর ইলিশ ভাজা দিয়ে সরু চালের ভাত খায়। ক্ষুধার প্রাবল্যে ভাতের গ্রাস মুখে দিতে দিতে ওরা ভুলে যায় ওদের পারিপার্শ্বিকতার কথা। যে প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলছিলো তা আর কারো মনে উদয় হয় না। ফিরতি পথে বাঁধে ফিরে আসার সময় তারা মনে করতে পারে না নিঃসঙ্গ বুড়িকে দেয়া প্রতিশ্রুতির কথা। যে কারণে বুড়ির সঙ্গে তাদের দেখাও হয় না।

।। ১৫ ।।

মানুষের জীবনে প্রত্যাশার চাইতে প্রাপ্তির পরিমাণ যদি বেশি হয়, তাহলে তার মাঝে কিছুটা হলেও অহংকার আর জেদ ফুটে ওঠে। জাহেদা যদিও সোভানকে বলেনি কাপড়ের কথা, তবু সে যখন সত্যি সত্যিই এমন সুন্দর একটি শাড়ি নিয়ে এলো, তখনও কিন্তু সে বিশ্বাস করতে পারেনি।

সে নিজে যেমন অভাবী তার চেয়ে আরো বেশি অভাবী সোভান। জাহেদা যদিও সোভানের কাছে কাপড় চায়নি। তবু যে এমন সুন্দর একটি শাড়ি নিয়ে আসবে কল্পনাও করতে পারেনি। কাজ-কামাই যার নেই এমন অবস্থায় এ রকম একটি অভাবনীয় কাজ করে ফেলবে সোভান, ব্যাপারটি যেমন বিস্ময়কর, তেমনি আনন্দেরও। তাই খোলা শাড়িটা কোলের উপর ফেলে দু পা ছড়িয়ে বসে বসে চোখের পানি ফেলছিলো জাহেদা আর মনে মনে ভাবছিলো, আল্লার কাছে হগল সময় উল্ডা বিচার। নরম মনের মানষ্যেরে বানায় গরিব আর পাত্থরের মতন শয়তান মানুষগুলারে বানায় ট্যাকার মালিক! আল্লায় জানি গরিব মানষ্যের লগেই পারে। বড়লোকের লাইগ্যা তার দয়ার সীমা নাই! কথায় কয়, নরম পায় যারে, যাইত্যা ধরে তারে! সোভানের মতন মানুষগুলা কি গরিব হইলে চলে? গরিব তো হইবো কাশেম মোল্লা আর জলিল মুহুরির মতন মানষ্যেরা!

জাহেদাকে বসে বসে কাঁদতে দেখে জয়নালের মা আছু বিবি বললো, অ্যামন সোন্দর একটা কাপড় পাইয়াও যদি কান্দস, তাইলে ক্যামনে হয় ক দেহি? আল্লাহতালায় অ্যার লাইগ্যাই গরিব পছন্দ করে না! গরিবরা পাইলেও কান্দে আর না পাইলেত্ত কান্দন আছেই!

খালার কথায় জাহেদা কোনো জবাব দেয় না। তেমনি নীরবে চোখের পানি ফেলতে থাকে।

আছু বিবি এগিয়ে এসে জাহেদার মাথায় হাত রেখে বলে, মারে তর তো থাইক্যা কষ্ট করতে আছস! সোভানের কি আছে? তাওত্ত হ্যায় তরে কত আপন মনে কইরা এই কাপড়ডা কিন্যা দিছে। তুই যহন মায়ের কাছে যাবি গিয়া, তহন কিন্তু সোভানরে ভুলিস না! সব বাপ-মায় এমন একটা পোলার জন্ম দিতে পারে না!

জাহেদা চোখ না মুছেই বলে, জয়নালের খারাপটা কি দ্যাখলা?

আছু বিবি জিভ কামড়ে বললো, বাপ-মায় নিজের পোলা-মাইয়ারে ভালা কইলে খারাপ! দশজনে ভালা কইলেই না আল্লায়ও তারে ভালা কইবো!

ক্যান ইঞ্জিন্যার শাহনাজ, ওই যে কৃষ্ণপুরের অহেদ মাস্টরের পোলা, হ্যায় তো তার বাপ-মারে হারামজাদা কয়! হ্যারে কি ভালা কইবা না?

যেই পোলাপান তার বাপ-মায়েরে গাইল দিতে পারে, তাইলে বুঝতে হইবো বাপ-মায়ের রক্তেও দোষ আছে! আর হেই পোলাপানের জন্মেও দোষ আছে! ঠিক বাপ-মায়ের পয়দা হইলে হেই পোলাপান বাপ-মায়ের পাও চাইট্যা কূল পাইবো না, গালি দিবো কোন সমে?

জাহেদার কান্না থেমে যায়। শাড়িটা উঁচিয়ে বলে, খালা, কাপড়ডা তোলা থাউক! এইডা পিন্দা নানীগ বাইত্যে যামু!

আছু বিবির চোখ দুটো কেমন চকচকে দেখায়। সত্যই তুই যাবি?

নয় তো করমু কি? কাশেম মোল্লা আর জলিল মুহুরিরা তো পাগলা কুত্তার মতন পিছে পিছে ঘুরন বন্ধ করবো না!

মারে! বলে, আছু বিবি এবার জাহেদার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। তারপর বোনঝির দু গাল দু হাতের তালুতে চেপে ধরে বলে, তরে যে তর বিপদের কালে ফালায় দেই নাই, মনে রাখবি তো? মাজে মইদ্যে আমার তত্ত্ব-তালাশ করবি তো?

জাহেদা হঠাৎ হেসে উঠলো। কী যে কও না খালা! তুমি হইলা গিয়া আমার মায়ের ভইন! তোমার শইল্যে যে আমার মায়ের বাস পাই, হেইডা কি তুমি বুঝ? তোমারে না দেইখ্যা আমি থাকমু ক্যামনে?

জাহেদা আছু বিবির গলা জড়িয়ে ধরে বললো, তুমি মনে কইরো আমি তোমারই মাইয়া! ডরাইও না!

আছু বিবি খুশির আতিশয্যে কেঁদে ফেলে। আঁচলে চোখ মুছে বলে, আমার তো পিন্দনের কাপড় আছে! তুই নতুনডাই পিন্দিস! তয় জয়নাল তো তোরে কাপড় কিন্যা দিতে কইছিলোই, না করছিলি ক্যান?

মনে বুঝছিলাম, রিলিপের কাপড় তো পামুই! কিন্তু এইবার যে রিলিপঅলারা গর্তে বইয়া থাকবো কে জানছিলো?

কিন্তু জাহেদা মনে মনে ভাবে যে, কথাটা সোভানকে কিভাবে বলবে! আর সোভানকে বললেই যে, সে রাজি হবে তারও তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। এরই মধ্যে একবার বলেছে সুদিনে নিয়ে যেতে। এখন আবার কোন মুখে বলবে যে, অহনই দিয়া আওনের ব্যবস্থা কর! তা ছাড়া এত আগে আগে চলে গেলে কি সোভান তাকে দেখতে অত দূর যাবে? না সে সোভানকে দেখতে পাবে? তাই আপাতত বানের পানি যতটা দিন নেমে না যায়, ততদিন সে সোভানের কাছাকাছিই থাকতে চায়।

এদিকে শাড়ি পেয়ে জাহেদা খুশি হয়ে কান্নাকাটি করলেও মদিনা সোভানের দেয়া শাড়ি দেখে রেগে আগুন হয়ে যায়। কাপড়গুলো খড়ের উপর ছুঁড়ে দিয়ে বললো,ইসসোরে! ত্যাল্লাচোরাও পক্ষী হইতে চায়! আমার বাপের কি কিছু নাই? না কি আমরা দুই বইন পাথারে পড়ছি? তুমি নাও বাওনের ট্যাকা দিয়া আমাগো লাইগ্যা কাপড় আনতে গ্যালা ক্যান? কত ট্যাকা হইছে তোমার? একদিন কামাই কইরা কি নিজেরে ট্যাকার আড়তদার মনে করতাছ? আরে ব্যাডা, তুমি সারা জনম হুইয়া বইয়া খাইলেওত্ত আমার বাপের টান পড়বো না!

সোভান বুঝতে পারে না যে, এমন একটি ব্যাপার নিয়ে মদিনা কেন হঠাৎ ক্ষেপে গেল? সে যে তাদেরটা খাচ্ছে, এমন বিপদের সময় তাদের কাছে আশ্রয় পেয়েছে সে জন্যে কি তার কৃতজ্ঞতা বোধ থাকার দরকার নেই? নাকি সে কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করতে পারবে না? আর সেই কৃতজ্ঞতা বোধ থেকেই না সে এমন একটি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে! তাই বলে, অতটা ক্ষেপে যাওয়ার মত তো কিছু সে করেনি!

সোভান মদিনার বাক্যবাণে অতিষ্ঠ হয়ে ছুটে গিয়ে কেরামত মেম্বরকে ডেকে আনে। আসতে আসতে ঘটনার কথা জানিয়ে বলে, আমি কী এমন অন্যায্য কামডা করলাম? আপনেই কন কাকা! কিছু যে বুঝাইয়া কমু হেই সুযুগটাও পাইতাছি না!

কেরামত মেম্বর হেসে শুধায়, তুই হ্যাগো দুই বইনেরে কাপড় কিন্যা দিছস?

হ! আর আইন্যাও তো বিপদে পড়ছি!

তুই হ্যাগোরে কাপড় দিবি, আমারে একবার জিগাইলেও তো পারতি!

মনে করলাম যারা আমারে পানি থাইক্যা তুইল্যা আইন্যা থাকতে দিছে, খাইতে দিছে, তাগো লাইগ্যা ভালা কিছু করতে জিগানের কি আছে? আপন মাইনষ্যেরে কিছু দিতে হইলে জিগানি লাগবো হেইডা তো ভাবি নাই!

কেরামত মেম্বর একটু হাসলো শুধু। কিন্তু কিছু বললো না। তার টিনের ছাপরার কাছে আসতেই মদিনা যেন ফুঁসতে ফুঁসতে এলো। বাবা, আপনেই কন না, আপনের মাইয়ারা কোনোদিন রিলিপের কাপড় পিনছে? কন?

কেরামত মেম্বর ফণা তোলা কন্যাকে বললো, মা, ইট্টু থাম! মানষ্যে হোনলে কইবো কি?

মদিনা হয়তো তার বাবার কথা খেয়াল করে না। মনের ভেতরে উথলে উঠা কথাগুলোই উগড়ে দিতে থাকে। আমরা যদি অকিন্নি ফকিন্নির মাইয়া হইতাম তাইলে না হয় একটা কথা আছিল! এই ব্যাডা কয় পয়সার মানুষ! অ্যাঁ? আমরা কি কাপড় পিন্দি না? না কি জাহেদার মতন এক কাপড়ে থাকি যে, সামনে যেইডা পামু হেইডাই পিন্দা ফালামু?

মদিনার পূর্বেকার কথগুলো শুনতে যেমনই লেগেছিলো, এখনকার কথাগুলো যেন সোভানের বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করে। সে আর কোনো কথা শোনার অপেক্ষা করে না। কেরামত মেম্বরকে বললো, কাকা, আমি একটা কাম সাইরা আইতাছি!

সোভান এখানে থাকলে মদিনা আরো কত কঠিন কথা বলে ফেলবে ঠিক নেই। তার চেয়ে ভালো এখান থেকে সরে যাওয়া। আরো ভালো হতো যদি এই বাঁধ ছেড়ে সে কোথাও চলে যেতে পারতো!

কেরামত মেম্বর মেয়েকে বোঝাতে চায়। কিন্তু গ্রামের ভেতর সবচেয়ে বেশি সম্পদের অধিকারী কেরামত মেম্বরের মেয়ে সে। বাপ যেমন কখনো ইলেকশনে না দাঁড়ালেও লোকে তাকে মেম্বর বলে, তেমনি তার মেয়ে হিসেবে মদিনারও তো কিছুটা অহংকার হওয়ার কথা। আর এমনিতেও সে বেশ কিছুটা অহংকারী! কিছুটা জেদিও। তাই পিতৃ-মাতৃহীন আর চালচুলোহীন অনাথ সোভান যদি তার পরিশ্রমের টাকায় কিছু কিনে দিতে চায়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে ধৃষ্টতার পর্যায়েই পড়ে।

কেরামত মেম্বর মেয়ের যুক্তির কাছে নতজানু হয়ে বললো, দেহি, কাপড় দুইডা ক্যামন?

রিলিপের কাপড় বাবা! এইসব কাপড় আপনে কোনোদিন আমাগোরে কিন্যা দ্যান নাই!

মদিনা কাপড় দুটো দেখিয়ে দিলে কেরামত মেম্বর হাতে নিয়ে বলে, কাপড় দুইডার দাম যেমনই অউক, দেখতে কইলাম সোন্দর!

দু ধ খাওনের বয়সে কুত্তার ছাও তো সোন্দর হয়, তাই বইল্যা কি নিজের ব্যারাইম্যা পোলাপান ফালাইয়া মানুষে কুত্তার ছাও কোলে লয়?

মেয়ের কথা শুনে কেরামত মেম্বর থ হয়ে যায়। তার মুখে কোনো কথা যোগায় না। সে ভাবছিলো যে, সোভানের কিছু নাই তো হইছে কি? সৎ মানুষের পোলা। বংশাবলীও উঁচা। তার কিছু নাই বইল্যা সময়ের গুণে মদিনা তারে হেনস্তা করতে পারতাছে। অথচ সোভানের নানার বাইত্যে বছর কামলার কাম করছি! আমার বাপ নেয়ামত আলি হাশেম সর্দারের বাপ নিজাম সর্দারের বাইত্যে কামলার কাম করছে অনেক বছর। মদিনা যদি এই সব কথা হোনে, তাইলে কি তার লাফ-ফাল থাকবো? মদিনার আছেডা কি? বাপের অর্থ-সম্পদ! না আছে জাত বংশ। না আছে রূপ-গুণ! মাইয়া কিয়ের বলে সংসার করবো?

কেরামত মেম্বর তার দু মেয়েকে কিছুটা বেশি আদরই দিয়ে ফেলেছে। যে কারণে তার দু জনেই অহংকারী আর জেদি হয়ে উঠেছে। তাদের দর্প চূর্ণ না করলে তারা কখনোই নিজেদের সংসারে সুখী হতে পারবে না। তাই কেরামত মেম্বর একটি কাপড় হাতে নিয়ে বললো, এই কাপড়ডা পিন্দা তুই বাইরে গিয়া খাড়া। কেউ যদি কয় কাপড়ডায় তরে ভালা দ্যাহা যায় না, তাইলে আমি নিজের হাতে কাপড় দুইডা পুড়মু! আর যদি কেউ কয় ভালা লাগতাছে, তাইলে কি করবি?

মদিনা কিছুটা চিন্তায় পড়ে যায়। বিভ্রান্ত হয়ে বলে, কি করমু?

সোভান তগো দুই বইনেরে পছন্দ করে বইল্যাইত্ত তার অ্যাত কষ্টের কামাই দিয়া দুইডা কাপড় কিন্যা আনছে! অপছন্দের মানুষের লাইগ্যা যত দামী আর সোন্দর কাপড়ই আনুক না ক্যান, হেইডা পিনলে ভালা লাগবো না! কিন্তুক মায়া কইরা, পছন্দ কইরা কাপড় দিলে আরো দেখতে খারাপ মানষ্যেরেও দেখতে ভালা লাগে! মায়া কইরা কেউ কিছু দিলে হেইডা কত ট্যাকার জিনিস তা বড় কথা না। কথা হইলো মানুষটা মায়া কইরা দিছে! কে কারে অ্যামনে অ্যামনে কিছু দ্যায়? না দিতে দ্যাখছস?

মদিনা হঠাৎ কেমন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার বাবার মুখের দিকে। তার মনে হলো যে, কথার মারপ্যাঁচে বাবা তাদের দু বোনকে যেন অসুন্দরীই বললো। কিন্তু তার মা যে বলে, আমার দুই কইন্যার রূপে চক্ষে কিছুই দেহি না! আসলে কথাটার মানে কি?

মদিনার চিন্তা-ভাবনা যেন কিছুটা এলোমেলো হয়ে যায়। আসলে তার মাও ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে তাদের অসুন্দরীই বলে। বাবা মা দু জনের কথাই যেন দীর্ঘকাল পর তার বোধগম্য হয়। সে যেন কিছুটা ক্ষুণ্ণ মনেই ছাউনির ভেতর ঢুকে যায়।

কেরামত মেম্বর ছাউনির ভেতর ঢুকে দু মেয়ের সামনে বসে বলে, মাগো, তোমরা ত পয়দা হইয়া দ্যাখতাছ যে, তোমাগো বাপের অনেক আছে! ধান-চাইল-কলাইর অভাব নাই! তোমরা ক্যামনে বুঝবা ট্যাকা কামাই কত কষ্টের?

ঠোঁট ফুলিয়ে মদিনা বললো, এই কথা আমাগোরে হুনাইয়া লাভডা কি?

কেরামত মেম্বর হেসে বললো, ছ্যারাডায় নাও বাইয়া যদি পাঁচ ট্যাকা দিয়াও তোমাগোরে কিছু আইন্যা দেয়, তাও অনেক দামের! হ্যায় যদি কাপড় না আনতো, তাইলে কি কিছু কইতে পারতা? পারতা না! আনছে দেইখ্যাই বেচারারে আ্যতগুলান কথা কইতে পারছ! আমি সোভানের দাদার ঘরে কামলা খাটছি! আমার বাপে খাটছে তার দাদার বাপের ঘরে। নিজাম সর্দারের পোলা হাশেম সর্দার। তার পোলা হইলো এই সোভান সর্দার!

মদিনা নাক-মুখ কুঁচকে বলে, যার জমিজমা নাই, ঘরবাড়ি নাই, হ্যায় বলে আবার সর্দার!

মাগো, এইডা বংশ! সোভান সর্দার যত বড় ঘরের মাইয়া বিয়া করতে পারবো, তারা তোমার বাপেরে তাগো উডানেও খাড়াইতে দ্যায় কি না সন্দ আছে! যদিও অ্যাহনও তোমার লগে তার সমন্দের কথা কই নাই, তাও ব্যাডা আমার বাইত্যে থাকতে রাজি হয় কিনা আগে দ্যাহ!

বাপের কথা শুনে মদিনা কেমন গুম হয়ে বসে থাকে।

কেরামত মেম্বর আবার বললো, আমি ঠিক করছি কাইল পশশুই বাইত্যে ফিরা যামু!

মদিনা প্রায় আর্ত কণ্ঠে বলে, এই পানির মইদ্যে কই উডবেন? ভিডার মাডি প্যাচ প্যাচ করবো না?

ইট বিছাইয়া লমু! কাইল বিয়ানে দুই হাজার ইট আনাইতাছি!

মদিনা আবার ঝিমিয়ে পড়ে যেন। সে ভাবে যে, শত হলেও রক্ত পানি করা টাকা! এ টাকা দিয়ে যদি সোভান তাদের কাপড় কিনে দিয়েই থাকে, সেটা তো আর ভিক্ষা বা দান-খয়রাত নয়! তাদের পছন্দ করে, মায়া করে বলেই তো কাজটা সে করতে পেরেছে। এ না হলে সে পেট ভরে খাওয়ার জন্যেই পড়ে থাকতো। পায়ের কাছে বসে কুঁই কুঁই করতো সারাক্ষণ। কিন্তু সে তো তাদের দয়া-দাক্ষিণ্যের আশায় বসে থাকেনি। নিজের উদ্যোগে বেরিয়েছে রোজগারের আশায়। এমন একজন বড় মনের মানুষকে এতটা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা ঠিক হয়নি। আর এ কথা মনে হতেই মদিনা যেন মরমে মরে যেতে লাগলো।

।। ১৬ ।।

বাঁধের ঢালু বেয়ে যেখানে কংক্রিটের ব্লকগুলো পানির ঢেউয়ের আঘাত থেকে মাটিকে রক্ষা করার জন্য বাঁধের গোঁড়ার মাটিকে জড়িয়ে ধরে উপুড় হয়ে আছে, সেখানে দেখা গেল জয়নাল আর সোভান নৌকা ভিড়িয়ে নৌকার উপর বিছিয়ে রাখা বাঁশের চটির পাটাতনের উপর বাবু হয়ে বসে আছে। আর কংক্রিটের ব্লকের ভেসে থাকা প্রান্তে পায়ের গোড়ালি আটকে বসে আছে জাহেদা।

জয়নাল আর জাহেদাকে স্বাভাবিক দেখা গেলেও সোভানের মুখটা কেমন যেন থমথমে মনে হয়। অপমানের গ্লাণিতে যেন ফর্সা মুখ লালচে হয়ে উঠেছে।

জাহেদাকে বলতে শোনা যায়, তুমি বুঝাইয়া কইলেই পারতা যে, মুন্সিগঞ্জের বাজার থাইক্যা কিন্যা আনছ!

সোভান হাত নেড়ে বলে, আরে না! ওইডা না! রিলিপে য্যামন হস্তা আর কম দামের কাপড় দ্যায় হেইডা কইছে!

জয়নাল বললো, হাজার ট্যাকা দিয়া কাপড় কিন্যা দিলেই মনে কয় খুশি হইতো! আর মাশাল্লা কই, ছেরিগ যেই রূপ, ধারে কাছে কাউয়াও বয় না!

এত কথা শুনলেও জাহেদা তার উদ্দেশ্য ভুলে যায় না। তাই মদিনাদের রূপ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য শুনেও আগ্রহ দেখায় না। বলে, পানি য্যামনে টান ধরছে, একদিনেই পাঁচ হাত পানি কমবো!

সোভান বললো, কেরামত কাকুর ভিটার পানি তো সব নাইম্যা গেছে! অহন ঠিক মতন রৈদ পাইলেই হয়!

জাহেদা বলে, তারা বাইত্যে ফিরবো কবে? হুনছো কিছু?

কাইল-পশশুই যাইবো গিয়া মনে কয়!

তুমি কোই থাকবা? তোমার ঘর তো সবডাই পানিতে পচছে!

কেরামত কাকুর কথায় যা বুঝলাম, তাগো বাইত্যেই উঠতে হইবো!

জাহেদা কিছুক্ষণ সোভানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

তারপর বলে, তুমি ওহানে গিয়া থাকবা? বছর কামলাগ মতন?

আরে নাহ! তুমিও পাগল হইলানি? তাগো বাপ-দাদায় আমার বাপ-দাদার কামলাগিরি করছে। কেরামত কাকু নিজেইত্ত নানীগ বাড়ির কামলা আছিল!

জাহেদা চোখ বড়বড় করে বললো, হাচা?

তাইলে কি মিছা কইতাছি?

আমি যে হুনলাম মদিনারে তোমার লগে বিয়া দিয়া ঘরজামাই করবো!

আমারে অ্যাতই পাগল মনে কর? যারা আমার বাপ-দাদার কামলা আছিল, তারা আমারে সোনা-চান্দি দিয়া ঘর বানাইয়া দিলেও তো তাগো বাইত্যে থাকমু না! বিয়া তো পরের কথা! কোনো কাম না পাইলে জয়নালের লগে নাও বাওনের কাম করমু! তাও ওই বাইত্যে যামু না! আর মদিনার যেই কথা! হুনলে কানের ভিতরে যেই পোক-জোঁক আছে তাও মইরা যাইবো!

জাহেদা তাদের মাথার উপর দিয়ে দূরে ভেসে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের লাল-কমলা রঙের বলগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, আমি অনেক ভাইব্যা দ্যাখলাম, একলা একলা পইচ্যা মরণের থাইক্যা নানীর কাছেই যামু গিয়া! বুড়া মানুষের খেদমত করলে দোয়াও পামু! মানষ্যের আ-কথা কু-কথা আর সইহ্য হয় না!

জয়নাল বললো, মায় তো কাইলকাও তোমারে এই কথাই কইলো! কবে যাইবা কও? পানি থাকতে থাকতেই কইয়ো!

তর নাওয়ে কইরা দিয়া আইবি?

তাইলে কই কি? জয়নাল হেসে ওঠে।

জাহেদা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে বলে, অহনই! খালারে কইয়া আইতাছি!

অহন না বুবু! জয়নাল দু হাত তুলে জাহেদাকে বললো। একটা ক্ষ্যাপ মাইরা আই! বেশি দূর না। বেলা পড়লেই আইয়া পরমু!

জাহেদা অবাক হয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। বলে, আমারে দিয়া আইলে কতক্ষণ লাগবো?

জয়নাল দাঁত বের করে হাসে। বলে, নানীর বাইত্যে একলা গেলে তো সাদর পাই না! কুটুম লইয়া যামু! ভালামন্দ রাইন্দা খাওয়াইবা! বিয়ানে গাছে উইঠ্যা নাইরকল পারমু। চিড়া কুটবা। নাইরকল-চিড়া খাইয়া তার বাদে দুই ভাইয়ে মেলা করমু!

আইচ্ছা! বলে, জাহেদা কেমন নৃত্যের ভঙ্গিমায় দুহাতের মুদ্রা ফুটিয়ে কংক্রিটের ব্লকের উপর দাঁড়িয়ে পেছন ফেরে। তারপর ঢাল বেয়ে দ্রুত উঠে তাদের চোখের আড়াল হয়ে যায়।

খালার কাছে ফিরে আসতেই জাহেদার মনটা কেমন হয়ে গেল। এতটা দিন এ মানুষটা তাকে বুকে আগলে রেখেছে। নিজে যা খেতে পেয়েছে তাই দিয়েছে। অনাথিনী বলে অবহেলা করেনি। রাতের বেলা যাতে ভিন্ন ধরনের কোনো বিপদ আপদ এসে তাকে ছিন্নভিন্ন করতে না পারে, সে জন্যে তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে প্রায় বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছে। এমন একজন মায়াবতী, যার শরীরে তার মৃতা মায়ের বাস পায়, তাকে ছেড়ে চলে যাবে! কথাটা মনে হতেই তার চোখ দুটো কেমন বাষ্পাকুল হয়ে আসে। আর তা দেখে আছু বিবি বললো, তর হইছে কি?

জাহেদা হঠাৎ খালাকে জড়িয়ে ধরে বললো, খালা গো! এতদিন তোমার লগে লগে রইছি, য্যান মনে হইছে মায়ের লগেই আছি! সময়ে তোমারে কত রহম কথা কইছি! মনে কষ্ট রাইখ্যো না! আমার কোনো দোষ পাইলে মাপ কইরা দিও!

বোনঝির কথা শুনে আছু বিবির চোখও পানিতে টলটলায়মান হয়ে ওঠে। সে নাক টেনে বলে, তর কোন কথায় কষ্ট পামু ক? আমি তো তরে আমার মাইয়া বইল্যাই জানি! তারপর জাহেদার মুখ তুলে বললো, আৎখা তুই এইসব কি কইতাছস বুঝতে পারতাছি না!

খালা, আমি ঠিক করছি আইজগাই নানীর কাছে যামু গিয়া!

হাচা? আছু বিবির কণ্ঠে খুশি উপচে পড়ে।

আর কত মানষ্যের কথা হুনমু কও? আমি গেলে নানীরও কষ্ট কিছুডা কমবো!

আমি তো অ্যার লাইগ্যাই তরে কত কইরা কইলাম!

তারপর আছু বিবি জাহেদার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, যা মা! দোয়া করি আল্লায় তরে শান্তিতে রাহুক! তফাজ্জইল্যা আইলে আর জাগা দিবি না কইলাম! এক বছরের বেশি দিন ধইরা ছ্যারায় নিরুদ্দেশ! শরিয়ত মতন তগো মাইদ্যে ছাড়াছাড়ি হইয়া গেছে! হ্যায় অহন তর কেউ না!

খালা, মাঝে মইদ্যে তোমারে আইয়া দেইখ্যা যামু!

আইস তুই! তয় কোনসুম মেলা করবি, জয়নলরে কইছস?

কইছে বেলা পড়লে আইয়া খবর দিবো!

তাইলে দুইডা ভাত চুলায় দিয়া দে! আলু নাইলে বেগুন পুইড়া ভর্তা বানামু!

জাহেদা মাটির কলস থেকে চাল ঢেলে হাঁড়িতে নিয়ে কল পাড়ের দিকে যায়। চাপকল স্থাপনের পর থেকে, কলস-বালতি, হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে মেয়েদের ভিড় লেগেই আছে। কেউ না কেউ পানি নিচ্ছেই। অতি ব্যবহারে এরই মধ্যে কলের হাতল ক্ষয়ে গিয়ে মসৃণ আর চকচকে হয়ে উঠেছে। হাতলের সঙ্গে লাগানো পাম্প করার লোহার দণ্ডটিও দু পাশে ঘষা খেতে খেতে ক্ষয়ে গিয়ে পাতলা হয়ে গেছে।

চালের হাঁড়ি হাতে নিয়ে জাহেদা কলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে আলেকের মা নিজের কলসে পানি ভরা রেখেই বললো, কলের মুহে তর পাতিলডা ধর!

পানিতে হাঁড়িটা ভর্তি হয়ে গেলে জাহেদা একপাশে সরে গিয়ে মাটিতে হাঁড়ি নামিয়ে পানিতে চালগুলোকে হাত দিয়ে কচলায়। চালের ময়লাতে হাঁড়ির পরিষ্কার পানি ঘোলা হয়ে ওঠে। সেই পানি ফেলে দিয়ে সে আবার হাঁড়িতে পানি নিয়ে চাল কচলাতে বসে। তখনই সে বলে, আলেকের মা খালায় একটা কথা হুনছো?

কোন কথা? কলের হাতলে চাপ বন্ধ রেখে সে বলে।

আমি আইজ নানীর কাছে যাইতাছি গিয়া!

জাহেদার কথা শুনে আলেকের মাও যেন খুশি হয়। বলে, এইডাই ভালা হইবো! পরের পোলার আশায় আর কয়দিন কষ্ট করবি?

আলেকের মা কলস ভরে চলে গেলে জাহেদা হাঁড়ির পানি ফেলে দিয়ে নতুন পানি নিয়ে চাল কচলায়।

মদিনা দু হাতে মাটির কলসটা দোলাতে দোলাতে জাহেদার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, তোমাগো জয়নাল কি বাইত্যে আছে?

না। বলে, হাঁড়ি থেকে আবার ঘোলা পানি ফেলে জাহেদা।

তারপর বলে, হুনছি নাও লইয়া কই জানি যাইবো!

মদিনা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জাহেদার চাল ধোয়া দেখে। একটু ইতস্তত: করে জিজ্ঞেস করে, জয়নালের লগে কম্পেন্ডাররে দেখছিলা?

জাহেদা অবাক হয়ে চাল ধোয়া বন্ধ রেখেই কপালে ভাঁজ ফেলে বলে, কম্পেন্ডার ক্যাডা গো?

মদিনা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে, চিনলা না? সোভানের কথা কইতাছি!

জাহেদা আরো অবাক হয়ে বলে, কোন সোভান? কানা সোভান, গুড়া সোভান আর সর্দার সোভান! কার কথা কও?

আমাগো সোভান!

জাহেদার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। হ্যায়ইত্ত সর্দার সোভান!

মদিনা যেন না পারতে আবার জিজ্ঞেস করে, দ্যাখছিলা?

দেখছিলাম জয়নালের লগে নায়ে বইয়া থাকতে!

মদিনা আর কিছু জিজ্ঞেস করবে কি না ভাবছিলো। কিন্তু জাহেদার সঙ্গে এত কথা বলতে ভালো লাগে না তার। মনে মনে জাহেদার গায়ের রঙকে সে খুবই ঈর্ষা করে। কিন্তু গ্রাম দেশে গরিবের মেয়ে যতই সুন্দরীই হোক না কেন, ভাল ঘর বা ভাল বর কমই জোটে। জাহেদা সুন্দরী হলেও তার বিয়ে হয়েছে তফাজ্জলের সঙ্গে। লোকটা কিছুদিন ওষুধ ফেরি করেছে। তারপর কিছুদিন হাঁড়ি-পাতিল বিক্রির কাজ করতো। এখন শুনতে পাচ্ছে নারায়ণপুর না নারায়ণগঞ্জে গিয়ে আরেকটা বিয়ে করেছে।

সোভানের কথা বারবার জিজ্ঞেস করতে সংকোচ হচ্ছিলো মদিনার। তাই সে বললো, জয়নালরে দেখলে কইয়ো আমার একটা কথা হুনতে!

আইচ্ছা, কমু! বলে, জাহেদা চাল ধোয়া শেষ করে হাঁড়িতে পরিষ্কার পানি নিয়ে ফিরে যায়। যেতে যেতে হঠাৎ তার মনে হলো যে, মদিনা যেন না পারতে তার সঙ্গে কথা বলেছে! সম্ভব হলে সে তাকে কিছুই জিজ্ঞেস করতো না।

।। ১৭ ।।

মদিনা বুঝতে পারছে যে, কি সমস্যা সে তৈরি করেছে। কিন্তু না বুঝে সে সোভানকে যাই বলুক না কেন, সোভান যে রাগ করেছে বা রাগ করতে পারে, তখন তার মুখ দেখে বুঝতে পারেনি মদিনা। অবশ্য সোভানের মুখে হয়তো সে সময়কার মনের অবস্থা রেখাপাত করেনি। যদি পরে কখনো মদিনার আচরণের কথা ভেবে থাকে তাহলে নিশ্চয়ই মনে কষ্ট পাবে। আর সোভান না হয় কম দামী কাপড়ই নিয়ে এলো। কাজটায় যে, তার আন্তরিকতা রয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই! কিন্তু দরিদ্র মানুষ সে। শুধুশুধু কেন টাকাগুলো সে খরচ করতে গ্যাল? তাই না মদিনার মেজাজটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। সে অতটা না রাগলেও পারতো! কাপড় দুটো সামনে নিয়ে বসেছিলো মদিনা। সে হঠাৎ মমিনার দিকে তাকিয়ে বললো, তর কোনডা পছন্দ?

মমিনা বাচ্চা মেয়ে। পছন্দ অপছন্দ নিয়ে ততটা মাথা ঘামায় না। পৃথিবীর যাবতীয় জটিলতা এখনো তাকে স্পর্শ করেনি। তাই সে ঠোঁট উল্টিয়ে বলতে পারে, তুমি নিয়া যেইডা থাকবো, হেইডাই আমার পছন্দ!

যে কাপড়টাতে ফিরোজা রঙের ছোপ আছে সেটা নিয়ে মদিনা বললো, তুই তো পোলাপান মানুষ! লাল আর হইলদা যেইডার মইদ্যে বেশি আছে, হেইডাই তর লাইগ্যা রাখলাম!

মমিনা মাথা ঝাঁকায়। তার মনোযোগ ডিমের খোসার উপর কাজল দিয়ে আঁকা একটি নারীর মুখের প্রতি। কালোচুল আর ঠোঁট এঁকে ঠোঁটে কিছুটা লিপস্টিকও লাগিয়েছে। তবু কেন যেন তার মনে হতে থাকে- সোন্দর লাগতাছে না! কি জানি নাই নাই!

সে মদিনার সামনে সেটা উঁচু করে ধরে বললো, বুবু, এইডারে সোন্দর লাগতাছে না ক্যান? মদিনা একবার তাকিয়েই ডিমের খোসায় আঁকা মুখটার খুঁত ধরে ফেলে। বলে, কপালে ফোডা দ্যাছ নাই!

মমিনা দেখলো সত্যিই। খোসার কপালে একটি কালো বিন্দু দিয়ে দিতেই সেটার নিখুঁত সৌন্দর্য ফুটে উঠলো। মমিনা নিজের আঁকা খোসা সুন্দরীর মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠলো, সোন্দর মানষ্যেরে কালা ফোডায় আরো সোন্দর লাগে! তারপর মদিনার দিকে ফিরে বলে, বুবু, আমরা কোনোদিন কালা ফোডা লাগাইতে পারমু না!

মদিনা চোখ-মুখ কুঁচকে বলে, ক্যান?

কপালে কালা ফোডা দিয়া আয়নায় মুখ দেইখ্যো! বলে, সে মদিনার কপালে দুই ভ্রুর মাঝখানে তর্জনী দিয়ে একটি ফোঁটা দিয়ে দেয়। তারপর কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা আয়নাটা মদিনার মুখের সামনে ধরে বলে, কালা শইল্যে কালা রঙ ক্যামন দ্যাহা যায়?

মদিনা মাথা উপর নিচ করে বলে, কালা মাইয়ার চোহে কাজল,কপালে কাজলের ফোডা অনেক সোন্দর!

ইয়ার্কি মনে করে মমিনা আয়নাটা নিয়ে রেখে দেয়। তারপর হঠাৎ করেই যেন ডিমের খোসায় আঁকা মুখটার উপর তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে। তখনই পায়ের নিচে খোসাটাকে ফেলে গোড়ালি দিয়ে দুমড়াতে দুমড়াতে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলতে থাকে।

এইডা করলি কি? মদিনা মমিনার কাণ্ড-কারখানায় অবাক হয়ে বলে।

মমিনা মুখ ভার করে বলে, খুব ভালা করছি! এইডার সামনে আমরা দুই ভইন পেত্নী ছাড়া আর কি?

মদিনার হাসি পেলেও সে হাসে না। বলে, মায় কই?

গোসল করতে গেছে!

তাইলে আমরাও যাই! তুই আগে যাবি না আমি আগে যামু?

তুমিই যাও!

মদিনা বাঁধের কংক্রিটের ব্লক দেয়া ঢালের দিকে যেতে যেতে দেখতে পায়, জাহেদা একটি কাঠি দিয়ে ভেজা চুলে বাড়ি দিয়ে দিয়ে পানি ঝরাচ্ছে। পরনে একটি নতুন কাপড় থাকলেও কেমন যেন বয়স্কাদের মত দেখায়।

ঢালের উপর দাঁড়িয়ে মদিনা তার মা জয়তুন বিবিকে জিজ্ঞেস করে, বাসঅলা সাবানডা কই রাখছ?

লাল মাডির পাতিলডায় দ্যাখছস?

মদিনা আবার ফিরে আসে। ছাপরায় ঢুকে শিকেয় ঝুলিয়ে রাখা লাল মাটির হাঁড়িতে হাত ঢুকিয়ে সাবানটা বের করে আনে। নাকের সামনে তুলে গন্ধ শোঁকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই সাবানের সুবাস যেন তার মনেও ছড়িয়ে পড়ে। এখানে উঠে আসার পর সাবানটার কথা একদিনের জন্যেও মনে পড়েনি তার। বেশ কিছুদিন অব্যবহৃত থাকার ফলে, সাবানটা কেমন যেন শক্ত আর শুকনো হয়ে গেছে।

।। ১৮ ।।

গায়ে গন্ধ সাবান মেখে গোসল সেরে, চারদিকে সুবাস ছাড়াতে ছড়াতে হাঁটে মদিনা। হাঁটার সময় লক্ষ্য করে যে, তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া নারী বা পুরুষটি কিছুদূর গিয়ে আবার পেছন ফিরে তাকাচ্ছে। হয়তো তারা হাঁটার কারণে হঠাৎ করে পাওয়া সাবানের সুগন্ধের উৎসটা খুঁজতেই একবার ফিরে তাকায়।

কিছুটা পথ উল্টো গিয়ে আছু বিবির ছইয়ের পাশ দিয়ে আসার সময় তার সঙ্গে যেচে কিছুক্ষণ আলাপ করে। কিন্তু ছইয়ের ভেতর অন্য কারো সাড়াশব্দ টের পায় না। সাবধানী চোখে এদিক সেদিক তাকালেও সোভানের দেখা সে পায় না। হতাশ হয়ে ফিরে আসবার সময় সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, জয়নালরে মনে কয় দ্যাখলাম না?

হ্যায় তো নাও লইয়া কই জানি গ্যাল!

আইলে কইয়েন আমার একটা কথা হুনতে!

আইচ্ছা!

মদিনা ফিরে এসে চালের নিচে ঢুকে পরনের কাপড়টা খুলে সোভানের দেয়া নতুন কাপড়টা কুঁচি দিয়ে পরে। তারপর গায়ে আঁচল জড়িয়ে মমিনাকে বললো, বাসঅলা ত্যালডা দ্যাখতাছি না!

মমিনা কিছু না বলে উঠে গিয়ে কাঠের বাক্সে হাত দিয়ে গন্ধরাজ তেলের শিশিটা বের করে আনে। মদিনা ভেজা চুলেই তেল মাখে। লাল ফিতে দিয়ে পেছনের দিকে টানটান করে চুলের ঝুঁটি বাঁধে। তারপর কলার ডগায় সর্ষের তেলের সলতে পুড়িয়ে মমিনার তোলা কাজল নিয়ে সাজতে বসে।

মমিনা মুগ্ধ চোখে মদিনার দিকে তাকিয়ে বলে, ফোডা দিবা না?

দিমু! বলে, সে আঙুলের মাথায় কাজল লাগিয়ে কপালের মাঝখানে একটি ফোঁটা লাগায়। আয়নায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজের চেহারা দেখে। তখনই মমিনা তার লিপস্টিকটা এনে এগিয়ে দিয়ে বলে, লিবিস্টিকটাও লাগাও!

মদিনা লিপস্টিক হাতে নিয়ে সেটার মুখ খুলে গোঁড়াটা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে লাল রঙের মোমটা বের করে দু ঠোঁটে ঘষে। কালচে ঠোঁটে লাল রঙ তেমন ফুটে না উঠলেও তার কাছে খারাপ লাগে না।

মমিনা ফিক ফিক করে হেসে বলে, তোমারে কেমন জানি বউ বউ লাগতাছে!

মদিনা দু ঠোঁট এক করে এবড়ো থেবড়ো ঠোঁট সমান করে। বলে, আমি তো বউই সাজতাছি! বউ সাজলে আমারে কী রহম দ্যাহা যায় হেইডাই দেখমু!

মমিনা কিছুক্ষণ মদিনার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠলো, কার লাইগ্যা অ্যামন সাজতাছ? কেউ কি আইবো?

মদিনা নির্বিকার ভাবে বলে, কেউ না আইলে কি সাজন যায় না?

কাউরে না দ্যাহাইলে কি মানষ্যে হুদাহুদি সাজে?

পাকনামি করিস না! বলে চোখ পাকায় মদিনা। তারপর তেমনি রুষ্ট স্বরে বলে, পাকতে পাকতে অ্যাক্কবারে ঝুনা নাইরকল হইয়া গেছে!

ধমক খেয়েও আজ খারাপ লাগে না মমিনার। বুবুকে দেখতে কেমন পরী পরী মনে হয়। সে দৃষ্টিতে মুগ্ধতা নিয়েই বলে, অহন তো তোমারে কত সোন্দর লাগতাছে! তাও মায় আমাগোরে পেত্নী কইয়া গাইল পারে ক্যান?

আয়না রেখে দিয়ে মদিনা বললো, সাজলে পেত্নীরেও সোন্দর লাগে!

তারপর আবার বলে, দেইখ্যা আয় দেহি জয়নাল আইছে নাহি?

আসলে জয়নাল যে মুখ্য নয়, সেটা বুঝতে পারে মমিনা। মদিনার এই সাজুগুজু সবই সোভানের জন্যে। কিন্তু সোভানকে সে যে অপমান করেছে, সেকি মদিনার সামনে আর আসবে? মদিনার ওই কথা শোনার পরই সোভান এ পর্যন্ত এদিকে আসেনি। দু পুরের ভাতও খায়নি। মমিনা উঠে শ্লথ পায়ে বাইরে বেরিয়ে এলেও জয়নালদের ছইয়ের দিকে যায় না। দুদিন আগে ফাতেমার একটি ভাই হয়েছে। দেখতে কেমন পুতুল পুতুল মনে হয়। মমিনার ইচ্ছে হয় ফাতেমার ভাইকে কোলে নিতে। কিন্তু সে অসাবধানে ব্যথা দিয়ে ফেলতে পারে বলে তাকে ছুঁতেও দেয়া হয় না। তাতে কি? দেখতে তো দেয়। এতেই সে খুশি!

কিছুটা পথ গিয়েও কি মনে করে সে আবার ফিরে আসে। জয়নালের মায়ের ছইয়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। আর তখনই ছইয়ের ভেতর থেকে জাহেদা বেরিয়ে আসে। পরনে নীল রঙের জমিনে সাদা ফুলের ছাপ দেয়া সূতীর একটি শাড়ি। মাথায় তেল দিয়ে বড় একটি হাত খোঁপা করা। যদিও তার চোখে কাজল, কপালে ফোঁটা বা ঠোঁটে লিপস্টিকের ছোঁয়া নেই, তবু কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে! যদিও মদিনা বউ সেজে বসে আছে, তবু জাহেদার তুলনায় মদিনাকে পেত্নীর মতই লাগছে। মমিনা জাহেদার সুন্দর মুখের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে সব ভুলে যায়। এরই মধ্যে জয়নাল এসে তাড়া দেয়, বুবু, তোমার হইলো?

হ! হ্যায় কই?

নায়ে বইয়া রইছে!

মমিনা হঠাৎ বললো, কই যাইতাছ তুমি?

জাহেদা খুশির দোলায় দুলছিলো যেন। তাই মমিনার মুখটি দুহাতে তুলে ধরে বললো, নানীগ বাইত্যে!

আর আইবা না?

জাহেদা হেসে মাথা নাড়ে।

মমিনা কেমন আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে জাহেদার দিকে।

জয়নাল ফের তাড়া দিলে জাহেদা আছু বিবিকে সালাম করে এগিয়ে যায়। সামনে আলেকের মায়ের সঙ্গে দেখা হলে বললো, দোয়া কইরো!

আলেকের মা বললো, দোয়া করি! আল্লায় তরে শান্তিতে রাহুক!

কিছুটা দ্রুত পদক্ষেপে জাহেদা জয়নালের পিছু পিছু বাঁধের ওপাশে ঢালের দিকে এগোলে মমিনাও পিছু পিছু যায়। কিন্তু নৌকায় সোভানকে বসে থাকতে দেখলেও সে কিছু বলে না। জাহেদার সামনে বলাটা ঠিক হবে কিনা তাই ভাবছিলো।

জাহেদা নৌকায় উঠে সোভানের পাশে বসে মাথায় ঘোমটা টেনে দিলে তাকে সত্যিই বউ বউ মনে হয়। মমিনা চঞ্চল পদক্ষেপে ঢাল বেয়ে নেমে এসে নৌকার কাছাকাছি হয়ে সোভানকে বললো, কম্পেন্ডার! তুমিও যাইবা?

সোভান হেসে বলে,আবার আইয়া পরমু!

এদিকে যে কম্পেন্ডারের জন্যে মদিনা সেজেগুজে বসে আছে কথাটা সে সোভানকে বলতে পারে না। জয়নাল লগিতে ভর দিয়ে নৌকাটা পানিতে ভাসালে তার চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে। সে কিছু দেখতে পায় না। কিছুক্ষণ পর চোখ মুছে নৌকার দিকে আবার তাকালে সে দেখতে পায় লগি হাতে জয়নাল নৌকা বাইছে। আর নৌকার উপর নীল জমিনে ফুটে আছে সাদাসাদা ফুল। কিন্তু কম্পেন্ডারকে নৌকার কোথাও দেখা যায় না।

।। প্রথম পর্ব সমাপ্ত ।।

।। দ্বিতীয় পর্ব আরম্ভ।।

কোনো কোনো জায়গায় কচুরিপানা এতটাই ঘন যে, নৌকা ঠেলে আগানোটাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। কখনো নৌকা পেছনে সরিয়ে ভিন্ন পথে চালাতে বাধ্য হয় জয়নাল। এভাবে নৌকা নিয়ে প্রায় আধাআধি পথ এগোবার পর জয়নাল সামনের দিকে হাত তুলে দেখিয়ে বলে, সোভান ভাই দ্যাহ, উই যে নানীগ নাইরকলগাছ!

সোভান জাহেদার ঘোমটার দিকে তাকিয়েছিলো। মাথা ঘুরিয়ে সে জয়নালের নির্দেশিত দিকে দৃষ্টি ফেরালে নারকেল-গাছগুলো তার গোচরীভূত হয়। আর তখনই সে বলে ওঠে, ওইডা তর নানীর বাড়ি? ওই বাইত্যে আউয়াল ডাক্তাররে নিয়া কতবার গেছি!

জয়নাল বলে, ওই বাড়ির লগেইত্ত আউয়াল ডাক্তরের হউর বাড়ি!

হেইডাত্ত জানিই! কিন্তু তর যে নানীর বাড়ি, হেইডা জানমু ক্যামনে?

জয়নাল খুশি হয়ে বলে, তাইলে ভালাই হইলো! তোমার বেড়ানির জাগা দুইডা হইছে!

জয়নালের কথা শুনে সোভানের মুখে হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে যায়। বলে, হ, হইছে! তর নানীর বাইত্যে তো তর বইনেও যাইতাছে! আমার বেড়ানির জাগা কি আর থাকবো?

জাহেদার অগোচরেই নয় কেবল, বলতে গেলে সবারই অগোচরে এ পর্যন্ত ওদের মাঝে হাজারো কথা হয়ে গেছে। জয়নাল আর সোভানের মাঝে এখন শালা-দু লাভাই সম্পর্ক। যদিও এখন জাহেদার সামনে সেই দু টি স্পর্শকাতর শব্দ কেউ মুখে উচ্চারণ করছে না! কিন্তু কথাবার্তার আড়ালে সেই সূত্রই যেন কলকাঠি নাড়ায়।

সোভানের কথা শুনে জাহেদা একবার ঘোমটার ফাঁক দিয়ে তাকায় শুধু। কিন্তু কিছু বলে না। সোভানের সঙ্গে তার হার্দিক সম্পর্কটা যে কতটা নিকটবর্তী তা জয়নালের জানার কথা নয়। আর জাহেদাও চায় না যে, ব্যাপারটা এখনই জয়নালের কাছে প্রকাশ হয়ে যাক!

সোভান একদৃষ্টে নারকেল গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলো। ঘোমটার ফাঁকে জাহেদার কৌতূহলী দৃষ্টি তার গোচরে আসে না। সে ভাবে যে, ওই বাড়িতে এখন আউয়াল ডাক্তারের শ্বশুর-শাশুড়ি তাকে দেখতে পেলে কি ভাববে? দু জনেরই চিকিৎসার জন্য কদিন পরপরই আসতো আউয়াল ডাক্তার। কখনো সোভান নিজেই ওদের জন্যে ওষুধ-বড়ি নিয়ে এসেছে। দু জনেই তাকে যথেষ্ট স্নেহ করতেন। প্রতি রোজার ঈদে একটি লুঙ্গি আর একটি গামছা তার জন্য বরাদ্দ ছিলো। কোরবানির ঈদে বরাদ্দ ছিলো একটি সার্ট। আউয়াল ডাক্তার জেলে গেছে আজ ছয়মাস হতে চললো। এরই মধ্যে এদিকটায় আর আসা হয়নি। সত্যি কথা বলতে কি, আসলে এদের কথা তার একটিবারের জন্যও মনে পড়েনি। তা না হলে সে বানের আগেই নিজের জন্য একটি নিরাপদ আবাস খুঁজে নিতে পারতো। এঁদের কাছে এলে, হয়তো এঁরা খুশি মনেই তাকে গ্রহণ করতো।

অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের নৌকা গিয়ে বাড়ির নামায় ধাক্কা খেয়ে থামে।

জাহেদা তার পুটলিটা হাতে নিয়ে সোভানকে পাশ কাটিয়ে আগে আগে নেমে দ্রুত পায়ে বাড়ির ভিতর অদৃশ্য হয়ে যায়।

জয়নাল লগিটাকে কাদার ভেতর ঘাই দেবার মত করে গেঁথে দিয়ে তার সঙ্গে নৌকার দড়িটা বাঁধে।

তারপর নেমে গিয়ে সোভানকে বলে, নাইম্যা পড়!

একটি অচেনা বাড়িতে হঠাৎ কী করেই বা সে উঠবে? এ নিয়ে সারাটা পথই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেছে। আগে কথাটা প্রকাশ করেনি জাহেদা কিছু মনে করতে পারে বলে। কিংবা তার সংকোচ দেখে উল্টো বাঁধের দিকে ফিরে যাওয়ার জেদও ধরতে পারতো। এমনই সন্দেহ ছিলো তার। আর সেই সন্দেহ থেকেই নিজস্ব অনুভূতি চেপে রেখেছিলো এতক্ষণ। জয়নালের আহ্বানেও তার সংকোচ কাটে না। বলে, তুই যা! আমি এহানেই বই! পরে আইয়া ডাইক্যা নিস!

জয়নাল বুঝতে পারে সোভানের সমস্যা। বলে, তুমি তো আর আমাগো পর না! তোমার আবার শরম কি?

সোভানের দ্বিধা তবু কাটে না। আর তখনই জাহেদা গাল-মুখ তোবড়ানো চামড়ায় অসংখ্য ভাঁজ পড়া এক বৃদ্ধাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে। সোভান নিশ্চিত হয় যে, এই হচ্ছে জয়নাল আর জাহেদার নানী। তিনি সোভানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ব্যাডার কি এইডা হউর বাড়ি নাহি, যে শরম পাইতাছে? তারে আগ্যাইয়া নিতে হইবো কী অ্যামন কামডা করছে হুনি?

সোভানের পক্ষে নৌকায় বসে থাকা আর সম্ভবপর হয় না। অগত্যা তাকে উঠতেই হয়। নৌকা থেকে নামতেই হয়। নৌকা থেকে নামতে নামতে সে বলে, বড় মানষ্যের বেডি কয় কি? আমি কি হেই কপাল কইরা আইছি?

নানী হেসে বললেন, আগে ঘরে আইয়া বও! তারবাদে আমিন দিয়া মাইপ্যা দেখমু কয় নালের কপাল!

জাহেদা হয়তো আগে আগে গিয়ে নানীর কাছে তার সম্পর্কে কমবেশি কিছু বলেছে। যে কারণে তিনি এমন একটি মজার সম্পর্কের সূত্র ধরে কথা বলতে পারছেন।

জয়নালের গায়ে একটি হলুদ সার্ট থাকলেও সোভানের গায়ে গেঞ্জিটাই কেবল। এটাও তার সংকুচিত বোধ করার আরেকটি কারণ ছিলো।

নানীর পেছনে দাঁড়িয়ে জাহেদা ইঙ্গিতে দেখায় নানীকে সালাম করতে। প্রথমটায় বুঝতে না পারলেও দ্বিতীয়বারের ইঙ্গিতটা সে ধরতে পারে। আর নানীর সামনে নিচু হয়ে বসে কাজ সারতে দেরি করে না।

তিনি সোভানের মাথায় হাত রেখে বললেন, আদব-কায়দা যার ভালা, তার দুখ তো আল্লায় বেশিদিন রাহনের কথা না!

কদমবুসি সেরে সোভান উঠে দাঁড়াতেই তিনি আবার বলেন, কি কও নয়া নাতি?

সোভান দু হাত কচলে বলে, ময়-মুরুব্বিগ দোয়া থাকলে আল্লায় দিতে কতক্ষণ?

কথাও দেহি ভালাই জানে! দোয়া করি নয়া নাতি! আল্লায় জানি কোনো অভাব না রাহে! তারপর তিনি জাহেদার দিকে তাকান। কিন্তু সে ইচ্ছে করেই তাকিয়ে ছিলো জয়নালের মুখের দিকে। নানী সোভানের হাত ধরে বাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে জয়নালের দিকে ফিরে বললেন, একলা আইলে সাদর পাস না দেইখ্যা দোয়ারকী হইয়া আইছস?

জয়নাল দেঁতো হাসি হেসে মাথা নাড়ে। নানী বললেন, গাছে উইঠ্যা দ্যাখ ডাব পাস কি না! একটা পাড়বি কইলাম!

একটি ডাবের কথা শুনে জাহেদা বললো, আমি কি তোমার পর নানী?

আলো নাইরকল গাছ তো সবই তর! তর গাছেথ্যে তুই ডাব খাবি না নাইরকল খাবি হেইডা আমি কওনের ক্যাডা? কি কও নয়া নাতি? বলে, নানী সোভানের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসেন।

সোভান বললো, আমি হইলাম বাইরের মানুষ, কি না কি কইয়া কোন বিপদে পড়ি তার কোনো  ঠিক আছে?

বাইরের মানষ্যেইত্ত হাচা কথা কয়! ঘরের মানুষ লাভ-লোকসানের ডরে হগল সমে হাচা কথা কয় না!

নানী সোভানকে নিয়ে ঘরে গেলে জয়নাল কণ্ঠস্বর নিচু করে জিজ্ঞেস করে, বুবু, কয়ডা পারমু?

বেশি কইরা পারলেইত্ত কয়ডা লইয়া যাইতে পারবি!

জয়নাল লুঙ্গি কাছা মেরে নিপুণ দক্ষতায় খুবই দ্রুত নারকেল গাছের আগায় উঠে যায়। ডাব কি আর ডাব আছে? বলতে গেলে সবই নারকেল হয়ে গেছে। তবু সে বেছে বেছে যেটাতে সবচেয়ে কম শাঁস হবে সেটাই বোঁটা ছিঁড়ে নিচে ফেলে। জাহেদা বুড়ো ডাবটা কুড়িয়ে এক হাতে নিয়ে অন্য হাতে দা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে মুখটা পাতলা করে। ততক্ষণে জয়নাল গাছ থেকে নেমে এসে বলে, নাইরকল কি করমু?

অহন নিয়া নানীর চকির নিচে রাখ! জাহেদা ডাবের মুখটাতে দায়ের আগা দিয়ে ছোট্ট একটি কোপ দিয়ে একটি টুকরো ফেলতেই সেটার ভেতরকার শাঁস আর পানি যুগপৎ দৃষ্টিগোচর হয়। একটি ফুলতোলা কাচের গ্লাসে ডাবের কাটা মুখ উপুড় করে ধরতেই ভেতরকার পানিতে গ্লাসটি ভর্তি হয়ে যায়।

তারপর গ্লাসটি সোভানের হাতে দিলে সে বলে, জয়নাল কই?

জাহেদা ভ্রু কুঁচকে বলে, জয়নালরে অহন কোন কাম?।

দুইজনে এক লগে আইলাম, আমার বেশি খাতির হইলে হ্যায় মনে কষ্ট পাইবো না?

তুমি খাও দেহি! হ্যার মন যহন চায় তহনই খাইতে পারবো!

সোভান জাহেদার দিকে গ্লাস বাড়িয়ে ধরে বললো, তুমি?

জাহেদা হেসে উঠে বলে, নানী কইলো না যে, সব গাছই আমার!

সোভানের পিপাসা পেয়েছিলো খুব! সে কয়েক ঢোকে পুরো গ্লাস খালি করে ফেলে। শূন্য গ্লাস ফিরিয়ে দিতে দিতে বলে, খুবই মিডা লাগলো!

গ্লাস হাতে নিয়ে জাহেদা বলে, খিদার সময় নুন-ভাতই কেমন সোয়াদ লাগে নিজে বুঝ না!

নানী হয়তো তাদের কথোপকথন খেয়াল করছিলেন। জাহেদার কথা শুনে বললেন, নয়া নাতি অ্যাত্ত বুঝলে আবার হুদা হাতে আইলো ক্যামনে?

সোভান নানীর কথা শুনে হাসে। কণ্ঠস্বর কিছুটা চড়িয়ে বলে, হুদা হাতে আইলাম ক্যামনে কই? হারা বছর যেইডার লাইগ্যা কানলেন, হেইডারেইত্ত লগে কইরা লইয়া আইলাম! তাও আপনের মন ভরে না?

নানী এগিয়ে এসে সোভানের মাথায় হাত রেখে বললেন, অনেক খুশি হইছি ভাই! তোমারে দোয়া করি মন ভইরা! তয় দুঃখ একটাই! তা হইলো আনলা শ্যাষ বয়সে!

নানী, আল্লায় কি মানষ্যের সব আশা পুরা করে?

নানী এবার হেসে উঠে বললেন, আশার মতন আশা করতে জানলে পুরা হয় না কইছে ক্যাডা?

সোভান মনে মনে উপযুক্ত কথা খুঁজছিলো। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই নানী আবার বললেন, পাপ মনের আশা আল্লায় পুরা করে না!

জয়নাল হয়তো নারকেলগুলোকে গুছিয়েই এলো। সোভানকে বললো, ডাক্তরের হউরের বাইত্যে যাইবা না?

নানী যেন হঠাৎ ক্ষেপে উঠলেন। ওই ছ্যারা, বেশি চালাক হইস না! কিছুক্ষণ বইয়া জিরা!

জয়নাল লাজুক ভঙ্গীতে সোভানের পাশে চকিতে এসে দু পা ঝুলিয়ে বসে।

নানী সোভানের দিকে ফিরে বললেন, বইয়া জিরাও! পরে আইয়া কথা কমুনে!

তারপর তিনি জাহেদাকে টেনে নিয়ে ঝাঁপের আড়ালে চলে গেলেন।

সোভান নিচু স্বরে জয়নালকে জিজ্ঞেস করলো, তুই কি হাচাই থাকবি?

জয়নাল পা দোলাতে দোলাতে মাথা নেড়ে বলে, পাগল আর কারে কয়! খাইয়া-দাইয়াই মেলা করমু!

।। ২ ।।

নয়া নাতিরে ভাত খাইতে দিমু কি দিয়া? অ্যাঁ? হুদা বাইত্যে আইছে ক্যান? একটা বড় মাছ লইয়া আইলে কি হইতো?

নানীর কথা গায়ে মাখে না সোভান। বলে, জাল নাই, বড়শি নাই, মাছ ধরমু ক্যামনে? নায়ে কইরা আওনের সময় দুই একটা মরা মাছ পানিত্যে ভাইস্যা থাকতে দেখলেও উডাইয়া আনতে পারতাম!

আইজগা আমার একটা মুরগা দিয়াই চালায় দিতাছি! পরে কিন্তু হুদা হাতে আইলে নুন-ভাত দিমু!

তারপর তিনি একটি জাল নিয়ে এসে জাহেদাকে দিয়ে বললেন, দুই ঘরের মইদ্যে আটকাইয়া একটা মুরগা ধর!

জাহেদা জাল পেতে হাঁসমুরগি ধরার কৌশলটা জানে বলে, সে দু ঘরের বেড়ায় জাল আটকে দিয়ে সরে আসে।

নানী উঠোনের দিক থেকে কয়েকটা মোরগ মুরগি তাড়িয়ে এনে দু ঘরের মধ্যবর্তী ফাঁকা অংশটায় নিয়ে এলে সেগুলো হঠাৎ জালে বাঁধা পেয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে লাফ-ঝাঁপ শুরু করে দেয়। আর তখনই জাহেদা ছুটে এসে একটি বড়সড় লাল মোরগ ধরে ফেলে। তা দেখে নানী হায় হায় করে বললেন, আমার খোঁয়াড়ের রাতাডারেই ধইরা ফালাইলি?

জাহেদা মোরগটাকে বুকের কাছে চেপে ধরে বললো, তোমার আরো মোরগ আছে না? হেইডিওত্ত কম বড় না!

এইডারে গনিশাহের লাইগ্যা মানত করছি! মাজারে দিমু!

নানী যে দিন দিন কী হইতাছ না! বলে, জাহেদা আবার নাকমুখ কুঞ্চিত করে বললো, তোমার গনি শাহ কবরে বইয়া মোরগ রাইন্দা খাইবো?

নানী বিরক্ত হয়ে বললেন, তরা হইলি গিয়া কলির কাইল্যা বেইমান পোলাপান! তরা মানতের কি বুঝবি?

জাহেদা মোরগটির ঝুঁটিতে হাত বুলাতে বুলাতে হেসে বলে, আমরা গনিবাবার নাম কইরা খামু! তাইলেইত্ত হইবো নানী! কি কও?

নানী বললেন, তাইলেওত্ত গনিশাহের নাম রইলো!

তারপর তিনি খুশি মনে হাঁক দিয়ে বললেন, জয়নাল! নয়া নাতিরে লইয়া মুরগাডা জবাই দিয়া দে দেহি!

জয়নাল সোভানের হাত ধরে বললো, লও, মুরগা জবাই দেই!

তারপর ঘর থেকে বের হতে হতে বললো, নানী, মুরগা কহন পাক হইবো, কহন খামু?

নানী ধমক দিয়ে বললেন, তর খাইতে হইবো না! খিদা লাগলে মুড়ি চাবা!

তারপর তিনি হাতে একটি হাঁড়ি নিয়ে বের হয়ে গেলেন।

জাহেদা জয়নালের হাতে মোরগটা ধরিয়ে দিয়ে বললো, তর খিদা লাগলে মুড়ি দেই? ভাত হইতে তো কিছু দেরি হইবো!

সোভান কণ্ঠস্বর নামিয়ে বলে, একমাস ধইরা না তিন বেলা পোলাউ-গোস্ত খাইতাছি, তো অ্যাত বিয়ানবেলা খিদা লাগবো না ক্যান? তারপর আবার বলে, আমরা না ক্ষ্যাপ মারতে গ্যালাম ভুইল্যা গ্যালা?

জাহেদা কেমন বিচলিত হয়ে বললো, যদি কিছু না খাইয়া থাক হ্যার লাইগ্যাই না জিগাইলাম!

সোভান মাথা দোলায়। আর তখনই জয়নাল হঠাৎ বলে ওঠে, বুবু, দাও-ছুরি কিছু একটা দ্যাও!

জাহেদা কিছুক্ষণ আগের ডাব কাটার দাটাই জয়নালের হাতে তুলে দেয়।

সোভান এগিয়ে গিয়ে জয়নালের হাত থেকে দা নিয়ে জাহেদাকে বললো, তুমি যাইয়া মশলাপাতি তৈয়ার কর। মুরগা জবাই দিয়া ছিল্যা, কাইট্যা-কুইট্যা দিমু। তুমি খালি ধুইয়া পাতিলে ছাইড়া দিবা!

জাহেদা অবাক হয়ে বলে, এইডা ক্যামন কথা? মাছ-গোস্ত কুডাকুডির কাম তো মাইয়া মানষ্যের!

সোভান হেসে উঠে বলে, এইডা কইলা কি? কামের আবার পোলা-মাইয়া ভাগ আছে নাহি?

জাহেদা অবাক হয়ে বললো, আছে না?

আমার তো বউ-মাইয়া কেউ আছিলো না। আমার ঘর কি ঝাড়ু দিমু না? মাছ আনলে রাইন্দা খামু না? নাকি ভাত রান্দন মাইয়া মানষ্যের কাম কইয়া না খাইয়া মরমু?

সোভানের কথাগুলো খুবই ভালো লাগে জাহেদার। খুবই সত্যি এবং বাস্তব! কিন্তু তাও কেমন যেন নতুন নতুন। সে কেমন অদ্ভুত ভাবে একবার সোভানের দিকে তাকায়। তারপর বলে, আমি ইট্টু আইতাছি! দেরি দেখলে আবার চিল্লা-ফাল্লা কইরো না জানি!

জাহেদা ঘরের এক দরজা দিয়ে ঢুকে আরেক দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল বলে মনে হলো সোভানের কাছে। সে জয়নালকে বললো, আমরা কিন্তু আন্ধার নামনের আগেই বান্ধে ফিরন চাই!

জয়নাল মোরগের পাখা দুটো কেটে পেটের কাছে চিড়ে চামড়া ছাড়াতে চেয়েও তা থামিয়ে কেমন অবাক হয়ে তাকালো সোভানের মুখের দিকে। আন্ধার নামনের আগেই ক্যান যাইতে হইবো?

কেরামত কাকু কাইল সব গোছগাছ কইরা নিজের বাইত্যে ফিরা যাইবো।

জয়নাল আরো অবাক করা কণ্ঠে বলে, মেম্বর হ্যার বাইত্যে ফিরা গেলে আমাগো কি করনের আছে?

হ্যার মাল-সামান নিয়া দিতে হইবো না! হ্যারা কি একলা একলা পারবো?

বান্ধে আইয়া উঠছিলো ক্যামনে?

সোভানের কাছে জয়নালের যুক্তি-তর্ক ভালো লাগে না। বলে, অ্যাত কথা কইস না তো ভাই! হাজার হইলেও তাগো নুন-দানা আমার প্যাডে আছে! তাগো লাইগ্যা কিছু না করলে ক্যামনে হয়?

একটি টান দিয়ে মোরগের চামড়া অর্ধেকের মত টেনে ছাড়িয়ে ফেলে সে বললো, কাম কইরা ভাতের দাম শোধ করবা হেইডা কও!

সোভান হাসে। বলে, কাম কইরা না হয় ভাতের দাম শোধ হইলো! কিন্তু আমারে যে আদর কইরা থাকতে দিলো। যত্ন কইরা ঘুমাইতে দিলো। তার কি হইবো?

জয়নাল চোখ-মুখ বাঁকা করে বলে, হ্যাগো দুই ভইনেরে দুইডা কাপড় দিছ! মমিনার লিবিস্টিকে পাঁচ ট্যাকা ভর্তুকি দিলা! তাগরে সময় মত পাহারা দিল! অ্যাত কইরাও আদর যত্নের দাম শোধ হইবো না?

আদর-যত্ন কি জনিসপাতি, ট্যাকা-পয়সা দিয়া শোধ করন যায়? তার লাইগ্যাও হ্যামন জিনিস লাগে!

সোভানের কথা শুনে জয়নাল হঠাৎ হাসতে থাকে।

তার এই হাসির কারণ সোভান হঠাৎ বুঝতে না পেরে কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

জয়নাল তেমনি হাসতে হাসতেই বলে, তাইলে কি কও ঘরজামাই হইয়া শোধ করবা?

সোভান সহসা কোনো উত্তর দিতে পারে না। চিন্তার অলি-গলিতে কথাগুলো ছুটোছুটি করে।

তারপর ভেবে নিয়ে বলে, কথাডা বেশি ভুল কস নাই! কিন্তু তা কী কইরা হয়? আমি হইলাম তিন কূল হারাইন্যা লগি বৈডা ছাড়া নায়ের মতন। ভাসতে ভাসতে কই গিয়া ঠেকি তার কি ঠিক আছে?

জয়নালের কাছে সোভানের কথাগুলো তেমন একটা পছন্দ হয় না। এইসব হাবিজাবি বাদ দ্যাও! আমরা তো অহন বান্ধের উপরে বাতাস খাইয়া ঘুইরা বেড়াইতাছি না! বান্ধ এহান থাইক্যা কম কইরা হইলেও চাইর-পাঁচ মাইল দূরে!

সোভানের চোখ দুটো তবু কেমন ঘোলাটে আর দূর্বোধ্য মনে হয়।

বাঁচতে গেলে একজন মানুষকে কখনো কখনো অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিছু কিছু দায়ভার কাঁধে তুলে নিতে হয়। যা কেউ তাকে করার জন্য বাধ্য করে না বা পিড়াপিড়িও করে না। তবু কোনো এক বোধ মনের ভেতর ক্রমাগত খোঁচাতে থাকে। যা থেকে নিস্তার পাওয়া খুব একটা সহজসাধ্য হয় না।

জাহেদা হয়তো এতক্ষণ চুলোর কাছে রান্নার কাজে ব্যাস্ত ছিলো। কাপড়ে আর মাথায় খড়-কুটো লেগে আছে। সে এসেই জয়নালের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, ভাই, ইট্টু কষ্ট কইরা কয়ডা শাপলা তুইল্যা আন! যা!

জয়নাল বিস্মিত হয়ে বললো, কাডাইলা মুরগা! শাপলা দিয়া করবা কি?

জাহেদা কিচুক্ষণ তাকিয়ে থাকে জয়নালের মুখের দিকে।

তারপর বলে, কইলে মনে কষ্ট পাবি!

জয়নাল হেসে বলে, হরাডা জীবনইত্ত কষ্ট করলাম! কথায় আর কষ্ট পামু কি?

অভাবে পইড়া শাপলা খাওন হিকছি! সইর্ষা দিয়া শাপলা ভাঁজি খাইছস?

খাইছি বুবু! জয়নাল উচ্চকিত হয়ে ওঠে। খুবই সোয়াদ!

জাহেদা অবাক হয়ে বলে, কই খাইলি?

অহন কওন ঠিক হইবো না! বলে, মিটমিট করে হাসে জয়নাল।

জাহেদা আরো অবাক হয়ে বলে, ক্যান?

ওস্তাদের নিষেধ আছে! জাহেদা প্রায় তেড়ে উঠার মত বলে, দিমুনে এক কানডলা! তর ওস্তাদ কয়ডারে? হই বান্দর!

জয়নাল সত্যিই ভয় পেয়েছিলো। যে কারণে সে সোভানের পেছনে গিয়ে আশ্রয় নেয়। জাহেদা আবার বললো, রান্দা পরায় শ্যাষ! তাড়াতাড়ি কয়ডা শাপলা আইন্যা দে!

জয়নাল সোভানকে বললো, লও সোভান ভাই!

না!

জাহেদা বাধা দেয়। দুইজনে গেলে গপ কইরা দেরি করবি। তুই একলাই যা!

সেদিন বৃষ্টির সময়টা ছাড়া জাহেদা আর একান্তে পায়নি সোভানকে যে, মন খুলে দুটো কথা বলবে। তাই প্রয়োজন না থাকলেও শাপলার কথা বলে সে জয়নালকে দূরে পাঠায়।

সোভানের অবশ্য তেমন কোনো সমস্যা নেই। জাহেদাকে নিয়ে এ পর্যন্ত তার মনে তেমন কোনো জটিল ভাবনার সৃষ্টি হয়নি। সে এখান থেকে ফিরে গেলে পুনরায় মদিনার বিরস কথায় আক্রান্ত হতে পারে বলে মনে মনে কিছুটা শঙ্কায় ভুগছিলো।

মানুষের চেহারাও অনেক সময় তার মনের প্রতিনিধিত্ব করে। কুটিল মনের মানুষের চেহারাতেও তার ছাপ অনেক সময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তেমনি অসুন্দর মানুষেরও অনেক কিছুই অসুন্দর মনে হয়। এ ছাড়াও তার ব্যক্তিগত সমস্যা আর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মনের দিক থেকে প্রায় স্থবির করে রেখেছে তাকে।

বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে, যেখানে শাপলাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে তাদের চারপাশ আলো করে ফুটে আছে, সেখানে যেতে আসতে কম করে হলেও জয়নালের আধঘণ্টা সময় প্রয়োজন। এতগুলো সময় জাহেদার প্রয়োজন নেই। তার আগেই হয়তো সে মনের ভেতর আলোড়িত কথাগুলো সোভানের কাছে উপস্থাপন করতে পারবে। তবু যেন কিছুটা উদ্বেগ তার মুখাবয়বে বিবক্ষার চিহ্ন ফুটিয়ে তুলেছিলো। যে কারণে সোভান তাকে জিজ্ঞেস করতে পারে, কিছু কইবা?

আবার কবে আইবা?

সোভান জাহেদার কথা হয়তো হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। তাই বলে, কোন কামে আমু? আর কথাটা বলেই সে বুঝতে পারে প্রশ্নটা খুবই বোকার মত হয়ে গেল।

জাহেদা তাকায় সোভানের মুখের দিকে। যেখানে কোনো প্রত্যাশা নেই। স্বচ্ছ দুচোখের মণিতে নেই কোনো স্বপ্নের আভাসও। কিন্তু রয়েছে বিপুল আগ্রহ।

অ্যাদ্দিন য্যামনেই চলছি, খাইলে খাইছি, না পাইলে না পাইছি! কিন্তু সময়ে সময়ে তোমারে দুই একবার দেখতে পাইছি! এহানে থাকলে তো মন চাইলেও তোমারে দেখতে পামু না!

জাহেদার মুখে এমন ধরনের কথা শুনতে পাবে এটা আশা করেনি সোভান। তার তো নিজেরই চালচুলোর ঠিক নেই। কোথায় গিয়ে উঠবে, কিভাবেই বা তার অনাগত দিনগুলোতে খেয়ে পরে বেঁচে থাকবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কোনো একটা কাজ শুরু না করলেই নয়। কিন্তু কী যে করবে এখনো ভেবে ঠিক করতে পারেনি। এরই মধ্যে যদি তাকে নিয়ে জাহেদা ভাবতে শুরু করে, তাহলে যে তার কোনোটাই হবে না!

সে এখনই জাহেদাকে কোনো কথা দিতে পারে না। বলে,আমার নিজেরিত্ত কোনো ইস্টিশন নাই! তার উপরে তুমি যদি অ্যামন কথা কও, তাইলে যে,আমার দিন ফুরাইবো না!

জাহেদা কেমন স্বপ্নাতুর চোখে তাকিয়ে থাকে সোভানের মুখের দিকে।

তারপরই যেন বাস্তবতার কঠিন ভুমিতে অবতরণ করে বলে, অ্যাতডা দিন য্যামনেই রইছি, কাছাকাছিই আছিলাম। সময়ে অসময়ে, বিপদাপদে তোমারে পাইছি। অহন একটা ঘরে আমরা দুইডা মাইয়া মানুষ! আমাগোরে দ্যাহার লাইগ্যাও তো একজন পুরুষ মানষ্যের কাম লাগে! নানী কইতাছিলো…।

কথা শেষ না করেই জাহেদা থেমে গেলে সোভান ব্যাকুল কণ্ঠে বলে ওঠে, নানী কি কইতাছিলো?

জাহেদা যে কথাটি বলতে পারেনি, তা লজ্জার কি আনন্দের কিংবা সুখের অথবা দুখের সে ছাপ জাদোর চেহারায় পরিদৃষ্ট না হলেও তার দৃষ্টি কেমন আনত হয়ে আসে।

সোভান যখন আবার জিজ্ঞেস করে, নানী কইতাছিলো কি? তখনই হয়তো জাহেদা সেই না বলা কথাটি গোপন রাখারই সিদ্ধান্ত নেয়। তাই সে কথা ঘুরিয়ে দিতে বলে, নানীর একটা কথা! অ্যাতদিন ধইরা একলা থাকতে থাকতে মাথায় ছিট দ্যাহা দিছে! কি কইতে কি কয় নিজেই জানে না!

তারপরই সে সোভানের মুখের দিকে তাকিয়ে ফের ব্যগ্র কণ্ঠে বলে ওঠে, কবে আইবা?

সঙ্গে সঙ্গেই সোভান হ্যাঁ কিংবা না করতে পারে না। জাহেদার মুখের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ ভাবে।

জয়নালকে ফিরে আসতে দেখে যেন উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো জাহেদা। সোভানের একটি হাত ধরে মৃদু  ঝাঁকি দিয়ে বললো, কও না, কবে আইবা আবার?

কেমন অনিশ্চিত কণ্ঠে সোভান বললো, দেহি!

দেহি না!

জাহেদার কণ্ঠস্বর অসহিষ্ণু মনে হয়। দেরি কর ক্ষতি নাই! তাও কোন দিন আইতে পারবা ঠিক কইরা কও!

সোভান মনে মনে হিসেব কষে। এটা ভাদ্র মাস হলেও পানিতে পুরোপুরি টান ধরবে আশ্বিনের দিকে। হাতে সময় আছে বারো-চৌদ্দ দিনের মত। এরই মধ্য থেকে একটি দিনের কথা তাকে বলতে হবে। কিন্তু দিন-তারিখ দিয়েও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই সে বললো, এইডা কি অমাবস্যার চান না?

হ!

তাইলে পুন্নির আগেই একবার আইতে চেষ্টা করমু!

চেষ্টার কথা না! আইবা কও!

সোভান জাহেদার চোখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়। এ কোন জাহেদা? এ দৃষ্টি কেমন? তার পরিচিত জাহেদার সেই মায়াময় হরিণের মত দীঘল চোখ তো এ নয়! সে দৃষ্টির সামনে পড়ে কেমন সম্মোহিতের মত সোভান বলতে থাকে, আইজ বুধবার! বুধে বুধে আষ্ট! বিষুদে নয়। শুক্কুরে দশ। শনি এগার! না শনি না! বিষুদ নাইলে শুক্কুরবারে আমু!

ঠিক তো?

ঠিক!

জয়নালের নৌকা প্রায় ভিড়েছে। এমন সময় জাহেদা প্রায় অস্ফুটে বলে উঠলো, বিয়ানের দিগে আইয়া পড়বা! একলা!

সোভান কেমন যেন হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু কিছু বলার সুযোগ পায় না। ততক্ষণে জাহেদা পৌঁছে গেছে জয়নালের নৌকার সামনে।

।। ৩ ।।

বাঁধের উপর যারা বাস করছে, আগামী এক-দেড় মাসের ভেতর কেউ তার আবাসস্থল স্থানান্তরের কথা ভাবছে বলে মনে হয় না। ইঁদুরের গর্ত থেকে কিছু কিছু রঙিলা মানুষ বেরিয়ে আসছে। যাদের নিতান্তই সাধারণ মানুষের ভোট ছাড়া ক্ষমতার আসনে আসীন হওয়ার উপায় নেই। তেমনই কিছু কিছু মানুষ ট্রলার নিয়ে এসে কিছু কিছু খাবার কাপড়, কেউ কেউ পঞ্চাশ-একশ করে টাকাও দিচ্ছে। যা ভোটের সময় প্রচারের কাজে আসবে। সাধারণ মানুষ ভাববে যে, এ লোকটিই বিপদের সময় আমাদের জন্য খাবার,কাপড় আর টাকা নিয়ে এসেছিলো। অথচ তারা দূর্গতদের যা দিচ্ছে বা দিয়েছে সব মিলিয়েও তারা যে পরিমাণ সরকারকে ঠকায় তার ছিটে ফোঁটা হবে মাত্র। আসল টাকায় হাত পড়বে না কখনোই। মোটামুটি খাবারের অভাব বোধ না হওয়া পর্যন্ত এদের কেউ নড়বে বলে মনে হয় না। কিন্তু একটিমাত্র ব্যক্তি যে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছে। আর সে লোকটি হচ্ছে কেরামত মেম্বর।

যদিও বাঁধে অনেকেরই গবাদিপশু রয়েছে। কিন্তু কেরামত মেম্বরের এসবের বালাই নেই বলে ফিরে যেতেও কোনো সমস্যা নেই। বন্যার লক্ষণ টের পেয়ে সে আগেভাগেই তার যাবতীয় পোষা জীব-জন্তু হাঁটে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে। গয়নাগাটি সোনা-রূপা যতটুকুই ছিলো, বিক্রি করে দিয়ে টাকা-পয়সা সব ব্যাঙ্কে জমা করে দিয়ে নির্বিঘ্নে আর নিশ্চিন্ত মনে সহায়-সম্বলহীনদের কাতারে নেমে এসেছে। গবাদিপশুর অসুবিধা হবে ভেবে যারা আপাতত ফিরতে পারছে না, সে ক্ষেত্রে বৈষয়িক বুদ্ধির জোরে অন্যান্যদের চাইতে অনেকটাই এগিয়ে আছে কেরামত মেম্বর।

সোভান আর জয়নাল সন্ধ্যা নামার খানিকটা আগে বাঁধে ফিরে এলে অনেকেই কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে যে, সারাটা দিন তারা কোথায় ছিলো?

জয়নাল চটপট জবাব দেয়, একটা ক্ষ্যাপ আছিলো!

কেউ কেউ নিচু কণ্ঠে বলে, জাহেদা তাইলে কার নায়ে গ্যাল?

আমিইত্ত দিয়া আইলাম!

তাইলে সোভান কই আছিলো?

একজনে কি নৌকা বাইয়া এত তাড়াতাড়ি দুইখানে গিয়া ফিরা আওন যায়?

পাল্টা প্রশ্নে নিমেষেই উবে যায় সাধারণের কৌতূহল।

নতুন আর কোনো প্রশ্নর সম্মুখীন হয় না দেখে তারা দু হাতে দু জোড়া করে নারকেল নিয়ে বাঁধের মাঝামাঝি এগিয়ে আসে।

সোভানের একবার মনে হয় যে, নারকেল নিয়ে গেলে আবার মদিনার কোন কথার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে হয় তার ঠিক নেই। আর সে আশঙ্কাতেই নারকেল চারটে জয়নালকে দিয়ে দিতে মনস্থ করে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার ভাবে, আগে হুনি কি কয়!

দু হাতে দু জোড়া নারকেল ঝুলিয়ে নিয়ে কেরামত মেম্বরের দোচালার সামনে এসে দাঁড়ালে জয়তুন বিবি তাকে দেখে বললো, এই সময় নাইরকল পাইলা কই?

জয়নালের নানীর বাইত্যে গেছিলাম। তারাই দিলো!

নতুন শাড়িটি পরে সারাদিন সেজে গুজে বসেছিলো মদিনা সোভানকে দেখাবে বলে। কিছুক্ষণ আগেই মাত্র রাগ করে সব ধুয়ে মুছে এসেছে। পাল্টে ফেলেছে নতুন কাপড়ও। যে কারণে সোভানের চোখে পড়ে একঘেয়ে আর বিরক্তিকর মদিনাকে। দু পুর থেকেই সে সোভানের উপর রেগে ছিলো। কিন্তু রাগ ঢালবার মত কোনো বিষয় বা উপলক্ষ্য পায়নি। নারকেলের কথা শুনে সে বললো, জয়নালের নানী হ্যাগো লাইগ্যা নাইরকল লইয়া বইয়া আছিলো না! নিজের মাইয়া একদিনের লাইগ্যা গেলেই দূরদূর করে! হ্যামন কিপ্পন মানষ্যে দিবো নাইরকল? তাও আবার দুই জোড়া!

সোভান কেমন অসহায়ের মত তাকায় জয়তুন বিবির দিকে। বলে, হাচাই নানী দিছে!

তারপর সে নারকেলগুলো ভেতরের দিকে রেখে আবার বললো, আমি ইট্টু আইতাছি!

জয়তুন বিবি বললো, কই যাইবা?

গাও গোসলডা দিয়া আই!

দেরি কইরো না বেশি!

হাত বাড়িয়ে সে দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা কেরামত মেম্বরের দেয়া শুকনো লুঙ্গিটা নিয়ে কাঁধে ফেলে বাঁধের ওপারের দিকে যায়।

তারপর কংক্রিটের ব্লকগুলোর বেরিয়ে থাকা উঁচুনিচু মাথাগুলোর উপর লুঙ্গিটা রেখে গা থেকে গেঞ্জিটাও খুলে রেখে পানিতে গিয়ে নামে। দু হাতের ভেজা তর্জনী দু কানে ভেতর ঢুকিয়ে কান ভেজায়। ঝুপঝাপ করে দুটো ডুব দিয়ে বুক পানিতে দাঁড়ায়।

এমন সময় একলা একলা পানিতে নামন ঠিক না! বলতে বলতে মদিনা কংক্রিটের ঢাল বেয়ে নামতে থাকে।

উদ্বিগ্ন সোভান পানিতে ফিরে দাঁড়িয়ে বললো, তুমি আবার আইলা কি মনে কইরা?

তার কণ্ঠস্বরে বিরক্তি গোপন থাকে না।

এমন সময় পানিতে কাউরে একলা পাইলে ভূত-পেত্নী যাইত্যা ধরে! তার লাইগ্য আমি আইলাম পাহারা দিতে! বলতে বলতে সে ব্লকের ঢালের উপর দু পা ছড়িয়ে বসে পড়ে।

মদিনার কথাগুলো সোভানের ভালো লাগার কথা হলেও মদিনার অতিরিক্ত খবরদারী তার ভালো লাগে না। গামছায় শরীর ডলতে ডলতে তার মাথায় হঠাৎ করেই একটি দুষ্টু বুদ্ধি চাপে। আর তখনই হাউপ! শব্দ করে পানির নিচে ডুব সাঁতারে বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে কচুরিপানার দঙ্গলের আড়ালে ভেসে ওঠে। মদিনা তা খেয়াল করে না। সোভান যেখানটায় ডুব দিয়েছিলো, সেখানটায় কেমন বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে সে। মিনিট দুয়েক পেরিয়ে গেলে মদিনা উঠে দাঁড়িয়ে কচুরিপানার দঙ্গলের দিকে তাকায়। কিন্তু সোভানকে দেখতে পায় না। অথবা দেখতে পেলেও ক্রমাগত পাক খাওয়া কচুরিপানার আড়ালে সন্ধ্যার ম্লান আলোয় সোভানের মুখ আলাদা ভাবে সনাক্ত করতে পারে না হয়তো। সত্যি সত্যিই সোভানের অশুভ কিছু হলো কিনা ভেবে মদিনার চোখেমুখে কেমন ত্রাস ফুটে উঠতে থাকে। তা দেখে সোভানের খারাপ লাগে। আর কিছুটা দেরি হলে মেয়েটা হয়তো কেঁদে ফেলবে। অকারণে সে কাউকে কাঁদাতে চায় না। ফের ডুব সাঁতারে যেখানটায় ডুব দিয়েছিলো তার কাছাকাছিই পানিতে আলোড়ন তুলে ভেসে উঠলো সে।

অকস্মাৎ সশব্দে পানি আলোড়িত হলে মদিনা চমকে উঠে বুকে থুতু ছিটায়। তারপরই সক্রোধে সোভানকে বলে, অ্যামন কইরা মানষ্যেরে ডর দ্যাখায়?

সোভান হাসে। তার মনটা আজ খুবই ভালো। তাই মদিনার কোনো কথাই গায়ে মাখার মত মনে হয় না। সে গলা পানিতে দাঁড়িয়ে বলে, খুব ডরাইছিলা?

না, রঙ্গে আমার নাচনের মন কইতাছিলো!

মদিনার কণ্ঠস্বর কেমন বিশ্রী ভাবে কড়কড় করে ওঠে। সে তেমনি কড়কড়ে কণ্ঠে বলে, অ্যামন শয়তানী করনডা আমি দুই চক্ষে দেখতে পারি না! আর হোনো, জয়নাল জাহেদারে লইয়া গ্যাছে তার নানীর বাইত্যে! তুমি গ্যালা কোন মুহে? অ্যাঁ? তারা কি তোমার কুটুম?

সোভানের ইচ্ছে হয় বলে যে, জাহেদা যেমন তার কুটুম না, সেও তো তার কোনো আত্মীয়-স্বজন না। সেই বা কেমন করে অধিকার পেলো এমন কথা বলার? কিন্তু সে তা না বলে বললো, কুটুম না হইলে কি যাওন যায় না?

না! যায় না! তুমি ক্যান গ্যালা?

জয়নালের লগে চড়নদার লইয়া গ্যালাম!

চড়নদারডা কি! আহহারে! জাহেদা আবার চড়নদার হয় ক্যামনে? দশ দুয়ার মাইগ্যা খায় যেই বেডি, হ্যায় বলে হয় চড়নদার!

শেষটায় নিজে নিজেই গজগজ করে আরো কি কি বলে মদিনা যা সোভান বুঝতে পারে না।

সোভান গামছাটাকে পানির উপর ভাসিয়ে দিয়ে আবার উপরে তুলে হাতের চাপে নিংড়িয়ে বলে, ব্যালা ডুইব্যা গ্যাছে। তুমি এহানে বইয়া আছ দেখলে মানষ্যে মন্দ কইতে পারে!

মদিনা যেন সহসাই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললো, অ্যামন বাপের মাইয়া-পোলা পয়দা হয় নাই অহনতরি! আমারে কি মিনমিন্না জাহেদা পাইছ?

জাহেদার নাম উঠতেই সতর্ক হয়ে সোভান বলে, জাহেদা মিনমিন্না হইলো ক্যামনে?

মুহুরি আর কাশেম মোল্লা তারে অ্যাত আ-কথা কু-কথা কইছে, হ্যায় রাও পাড়ছে কোনোদিন? না কারোরে জানাইছে?

সোভান মনে মনে স্বীকার করে যে, এদিক দিয়ে জাহেদা ঠিকই নীরবতা পালন করেছে।

মদিনা আবার বলে, মুখ বন্ধ কইরা রাখছ ক্যান?

কোন কথায় আবার তার কথার ঝালে আক্রান্ত হয়, তাই সাবধানে আবার সোভান বলে, তোমার কথা কি ভুল হইতে পারে!

মদিনা কেমন অকস্মাৎ গম্ভীর হয়ে ওঠে। সোভানের কথাটায় কেমন একটু খোঁচার আভাস পাওয়া গেল।

সোভান বললো, জাহেদা নানীর বাইত্যে অহন সুখেই থাকতে পারবো!

ফণা তোলা সাপের মতই মদিনা আবার জেগে ওঠে যেন। জাহেদা সুখে থাউক আর দুখে থাউক, তুমি হেই বাইত্যে আর যাইবা না!

সোভান এগিয়ে এসে কোমর পানিতে দাঁড়ায়। পানিতে গামছা চুবিয়ে উপরে তুলে ফের নিংড়ায়। গামছা মেলে শূন্যে ঝাপটা দিয়ে তাতে মাথা মুছতে মুছতে বলে, আমি না গেলে খুশি হইবা?

মুখ ঝামটে জানি না! বলে অন্য দিকে মুখ ফেরায় মদিনা।

মদিনার ছেলেমানুষি দেখে সোভানের হাসি পেলেও সে হাসে না। মনে মনে ভাবে, পেত্নীর মতন চেহারা লইয়া মাইয়া দ্যামাগে বাঁচে না! জাহেদার অর্ধেক রঙ পাইলেওত্ত মনে হয় ছেরি চক্ষে মুহে মানুষ দেখতো না!

মাথা আর শরীর মুছতে মুছতে সোভান বললো, আমারে কি দিয়া বানবা ঠিক করছ? আমি হইলাম গিয়া বাপ-মা ছাড়া ঠাইল্লা বান্দর! বনের পক্ষীর মতন। আমার কি পোষ মানতে ভালা লাগবো?

মদিনা একই ঢঙে বলে ওঠে, ঠিক মতন দানা পানি পাইলে কাউয়াও পোষ মানে! তুমি আবার কোন পক্ষী?

সোভান আরো সামনে এগিয়ে এসে কংক্রিটের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে উবুড় হয়ে লুঙ্গির প্রান্ত গুটিয়ে হাঁটু পর্যন্ত তুলে চিপে পানি ঝরায়। সে অবস্থাতেই ঘাড় ফিরিয়ে মদিনার দিকে তাকিয়ে বলে, আমি চিল-কাউয়া না। হগুনের চাইয়াও বড়!

তাইলে বাবারে কইয়া বড় চাইয়া লোহার খাঁচা বানাইতে কমু! বলেই হেসে উঠলো মদিনা।

দশ-পনের দিনের ভেতর এইই প্রথম হাসতে দেখা গেল মদিনাকে। চেহারা গায়ের রঙ ম্লান হলে কি হবে! হাসির সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ সহস্র মুক্তার ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো যেন।

।। ৪ ।।

বাড়ির উঠোন থেকে পানি নেমে গেলেও মাটি শুকোতে যথেষ্ট সময় দরকার। এখনও কোনো জায়গায় প্যাচ করে পা দেবে যায়। ঘরের ভিটি বাইরের দিক থেকে খসে খসে পানিতে মিশে গিয়ে টিনের বেড়ার নিচ দিয়ে অনেকাংশে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। সে অংশগুলো নতুন কাদামাটি দিয়ে ভরাট করে দিচ্ছিলো কেরামত মেম্বর।

সোভান বললো, কাকা, যেহান দিয়া বেশি চলাচল হইবো, হেইদিগ দিয়াই ইট বিছাই! কি কন? সারা উডানে বিছাইয়া তো লাভ নাই!

কেরামত মেম্বর নিজের কাজ বন্ধ করে দু হাত কোমরে রেখে মাথা ঘুরিয়ে সারা বাড়ি দেখে।

তারপর মাথা দু লিয়ে বলে, কথাডা মিছা কস নাই! তাইলে চকি দুইডা আগে বাইর করি! পরিষ্কার না করলে বুঝন যাইবো না যে, পানিতে থাইক্যা ক্যামন হইছে!

এবার সোভানও উঠে দাঁড়ায়। চকি বাইরে বার করলে রৈদ না পাইলে হুগাইবো না! ঘরের ভিতরে বিছনা বিছাইলেও তল দিয়া ভিজ্যা উঠবো!

কেরামত মেম্বর মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, তাইলে ওই কামডাই আগে করি!

ওরা দু জনে মিলে ঘরে ঢুকে চকি দু টোর অবস্থা দেখে। চকি দুটো মনে হয় পানিতে বেশি দিন ভিজতে পারেনি। প্রায় শুকনো থাকলেও চারদিককার ভেজা আবহাওয়ার কারণে কাঠের উপর সাদা সাদা ছাতা জমেছে। কোথাও কোথাও শ্যাওলার মত সবজে ভাবও পরিদৃষ্ট হয়।

হেইদিগ দিয়া ধর! বলে, কেরামত মেম্বর চকির অপর প্রান্ত আগলে ধরে।

সোভান তার দিকটা তুলে বললো, কাইত কইরা লন!

দু জনে ধরাধরি করে একে একে দুটো চকিই বাইরে বের করে উঠোনের এক পাশে রাখে।

জয়তুন বিবি চকি দু টোর দিকে এক পলক তাকিয়ে বললো, মাইয়ারা, তরা দুইজনে চকি দুইডা উপরে নিচে ডইল্যা পরিষ্কার কইরা ফালা!

মদিনা ইটের স্তূপের উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেন অন্যান্যদের কাজের তদারকি করছিলো। মায়ের ফরমাশ শুনে বিরক্ত হলেও প্রকাশ করে না। মনে মনে সুযোগ খুঁজতে থাকে কোনোভাবে কাজটা করা থেকে বিরত থাকা যায় কি না। সে ইটের স্তূপ থেকে নামতে নামতে বলে, ডলমু কি দিয়া?

খ্যাড় দিয়া ডল!

এটি মোটামুটি সহজ ব্যাপার। সে মমিনার দিকে তাকালে মমিনা মুখ ফেরায় মায়ের দিকে। সালটিনডা রাখছিলা কই? ও মা!

জয়তুন বিবি বিরক্ত হয়ে বললো, হগলই আমারে কইয়া দিতে হইবো? খুইজ্যা দ্যাখ আছে কই!

ঘরের ভেতর মেঝের যে অংশ বিশেষ দেবে গিয়েছিলো, উঠোনের পাশ থেকে মোটামুটি কম কাদা হয়েছে এমন মাটি কোদাল দিয়ে কেটে এনে সেখানটায় ঢেলে দিয়ে ইট দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে সমান করে দিচ্ছিলো সোভান।

কেরামত মেম্বর ইটের ব্যাবহার লক্ষ্য করে বললো, তাইলে অ্যাতগুলান ইট আনাইয়া ভুলই করলাম মনে কয়!

সোভান নিজের কাজ করতে করতে বললো, ইট আবার কামে না লাগে?

কেরামত মেম্বর নির্বোধের মত কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সোভানের দিকে।

তারপর বলে, তর কথাডা ঠিক বুঝলাম না!

মাডি হুগাইলে ভিডা আরো এক-দেড় হাত উঁচা কইরা ইট বিছাইয়া পাকা কইরা দিবেন। বাইরে দিয়া পিড়া-পৈডা পাকা কইরা দিবেন। সিঁনকাডা চোরের ডর থাকবো না!

সোভানের কথাটা খুবই পছন্দ হয় কেরামত মেম্বরের। সে খুশি হয়ে বললো, কথাডা মন্দ না! তয় উত্তরের ঘরে তো চকি নাই। ইট বিছাইয়া চকির সমান উঁচা কইরা লইলে ঘুমাইতে পারবি না?

তা যাইবো! বলে সোভান আরো মাটি এনে ঘরের ভেতর ফেলে।

দুটো ঘরের মেঝে আর বাইরের অংশ ঠিক করতে করতে বেলা বেশ গড়িয়ে যায়। রান্নাঘর থেকে জয়তুন বিবি মুখ বাড়িয়ে বললো, হই মাইয়ারা! কাজ-কাম ফালাইয়া গাও-গোসল দিয়া আয়! তর বাবারে আর সোভানরেও যাইতে ক। খাইয়া লইয়া আবার কাজ-কাম করন যাইবো! মদিনা-মমিনা!

মমিনা বললো, যাইতাছি! আর ইট্টুহানি আছে!

সে চকির ময়লা-মাটি পরিষ্কারের কাজে রত থাকলেও মদিনা সঙ্গে সঙ্গেই বালতির পানিতে হাত চুবিয়ে ধুয়ে ফেলে।

তারপর ঘরের ভেতর ঢুকে মেঝের অবস্থা দেখে বললো, সব জাগা তো হমান হইলো না! চকি পাতলে খটখট কইরা লড়বো না?

সোভান বললো, বৈকালে যাইয়া জয়নালরে লইয়া আমু। তহন সবি ঠিক হইবো!

ঘরের থাইক্যা নামনের সময় তো আছাড় খাইয়া পড়মু! কোদাল দিয়া জাগাডা টান দিয়া দিও!

সোভান দাঁড়িয়ে পড়ে কোমর থেকে গামছা খুলে মুখের ঘাম মুছে বলে, সব হইবো! তয় আস্তে আস্তে। মাডি অহনতরি ভালা মতন হুগায় নাই!

সোভানের সামনে থেকেই নতুন কাপড়-ব্লাউজ আর গন্ধ সাবান নিয়ে মদিনা বেরিয়ে গেলে সে বাইরে বেরিয়ে এসে গাছের ছায়ায় একটি ইট বিছিয়ে বসে। পুরো শরীর ঘামে জবজব করছে।

কিছুক্ষণ পরই মদিনা ফিরে এসে সোভানের সামনে দাঁড়ায়। কোনো ভণিতা না করে সরাসরিই বলে, পুষ্কুনির ঘাটলার সব গাছ পানিতে ভাইস্যা রইছে! নামতে না পারলে গোসল করমু ক্যামনে? ওই কম্পেন্ডার!

সোভান মুখ তুলে মদিনার দিকে তাকাতেই রান্নাঘর থেকে জয়তুন বিবি বলে উঠলো, বান্ধে অ্যাত দিন ক্যামনে নামছস? পোলাডা খাইট্যা-খুইট্যা ইট্টু জিরাইতে বইছে! তর কামে তুই যা দেহি!

পরের পোলার লাইগ্যা মায়া কত দ্যাহ না! বলে, মদিনা একবার কটমট করে তাকায় রান্না ঘরের দিকে।

তারপরই হনহন করে এগিয়ে যায় পুকুরের দিকে।

সোভান কথাগুলো শুনতে পেলেও কিছু বললো না। উঠে গিয়ে কেরামত মেম্বরকে বললো, গোয়াল ঘরে কয়ডা ইট বিছাইয়া দেই! কি কন কাকা?

কেরামত মেম্বর ঘরের দরজার সামনে ইট বিছিয়ে সমান করতে করতে বললো, যাউক আরো কয়ডা দিন! অহনই গরু-বাছুর কিননের ইচ্ছা নাই!

কথা শুনে যেন বোকা হয়ে যায় সোভান। কেমন স্তব্ধ হয়ে সে তাকিয়ে থাকে কেরামত মেম্বরের দিকে।

কেরামত মেম্বর ফিরে তাকালে সে বললো, তাইলে আপনের জমিন করবেন ক্যামনে?

কেরামত মেম্বর হাসিমুখে উঠে দাঁড়ায়। বিছানো ইটের উপর দাড়িয়ে পা দিয়ে ইট চাপাতে চাপাতে বলে, ঠিক করছি একটা ছোড ট্রাক্টর কিনমু!

তারপর কাছে এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বললো, তুই আমি ভাগে চালামু! নিজের জমিনের কামও হইবো, আবার মানষ্যের জমিন চাষ দিয়াও দুইডা আয় হইবো!

সোভান মনেমনে ভাবে যে, খুবই ভালো একটি পরিকল্পনা।

কেরামত মেম্বর কিছুটা ঝুঁকে পড়ে আবার বলে, তর তো কিছুই নাই! কি কইরা চলবি? আমার বাইত্যে থাইক্যা আমার লগে পাছে ক্ষেতের কামে গেলেও খারাপ মানষ্যে মুখ বন্ধ কইরা রাখবো না। তরে আমার বাড়ির বছর কামলা কইলে কি আমার ইজ্জত বাড়বো?

সোভান এ কথার উত্তরে কি বলবে তেমন কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে কেরামত মেম্বরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

তারপরই যেন তার মনে পড়ে যায়। বলে, নিজের বাইত্যে থাকলে কি কাম করতাম না?

মেম্বর হাসে। তর আর আমার বইল্যা একটা কামের ফারাক আছে!

পরের কাজ করতে করতেই তো সে বড় হয়েছে। কেরামত মেম্বরের বাড়িতে বা ক্ষেতে কাজ করলে কী এমন অসুবিধা সেটাই সে বুঝতে পারছে না।

টাক্টার কিন্যা তরে দিয়া দিমু! আমারে দিনে পঞ্চাশ ট্যাকা কইরা দিস! যেদিন কাম থাকবো না, হেই দিন কিছু দিতে হইবো না!

সোভান আরো অবাক হয়ে তাকায় কেরামত মেম্বরের মুখের দিকে। কিন্তু মেম্বর তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আবার বলে উঠলো, যা, গাও গোসল দিয়া আয়! একলগে বইয়া চাইরডা খাই!

আইচ্ছা, যাই! বলে, সোভান তার লুঙ্গি নিয়ে উঠোন পেরিয়ে যায়। একটি আমের ডালা ভেঙে নিয়ে তাতে দাঁত ঘঁষে। কারণ পুকুরে এখন মদিনা আছে। আগে সে ফিরে আসুক। সে অপেক্ষায় সে মমিনাকে বললো, তুমিও গাও-গোসলডা সাইরা ফালাও বইন! দেরি করলেই দেরি!

মমিনা হাতের খড় ফেলে দিয়ে বললো, যাইতাছি!

মমিনার সঙ্গে কথা বলে ঘুরতেই সোভানের চোখ পড়ে পুকুরের দিকে। সিক্ত বসনে পাড়ে দাঁড়িয়ে মদিনা হাতছানি দিয়ে ডাকছে নিঃশব্দে। কিন্তু সে যেভাবে ঘুরছিলো, গতি না থামিয়ে ফের বিপরীত মুখো হয়ে থামে। আমের সরু ডালে দাঁত ঘষতে ঘষতে ভাবে যে, মদিনা কেন তাকে ওভাবে ডাকছে? কেন তাকে শব্দ করে জোরে ডাকলো না? এতে কোনো একটা গোপন ব্যাপার না থেকে পারে না। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ে কোশেম মোল্লা আর জলিল মুহুরি জাহেদাকে চুপ্পেচুপ্পে যেতে বলতো! ব্যাপারটা খারাপ বলেই গোপনীয়তার প্রয়োজন পড়ে। যা প্রকাশ্যে সহজ, তাই আড়ালে গিয়ে পরিণত হয় কঠিনে! সরলতা পরিণত হয় বক্রতায়।

সে মুখ থেকে থুথু ফেলে আমগাছের উপরের দিকে মনোযোগ দেয়।

।। ৫ ।।

মদিনা পানিতে ডুব দিয়ে পাড়ে উঠে সোভানকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেও তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে না। সে নিজে নিজেই বিড়বিড় করে বলে, আমগাছে কী অ্যামন মধুর দিগে চাইয়া রইছে? নাকি আমারে দেইখ্যাও না দ্যাহনের ভান করলো?

মনেমনে সোভানের উপর খুবই রেগে যায় সে। আইচ্ছা, ছুডামুনে তোমার ভান!

মমিনা পুকুরে গোসল করতে এলে শুনতে পায় মদিনা বিড়বিড় করে কিছু বলছে।

নিজে নিজে কি কও?

ধরা পড়ে গিয়ে হঠাৎ চমকে উঠে মদিনা বললো, কই কি কই? ধান্দা হুনস মনে কয়?

মনে হইলো চেইত্যা চেইত্যা কি জানি কইতাছিলা!

ভালা করছি! কইলে কইছি!

মমিনা পানিতে ঝুপ করে লাফিয়ে পড়ে চার হাতপায়ে পানি ছিটিয়ে ধুপধাপ করে সাঁতার কাটে। ডুব দেয়। মুখে পানি নিয়ে ফুড়ুৎ করে পানি ছিটায়। অকস্মাৎ সে বলে ওঠে, বুবু, কম্পেন্ডার কি আমাগো বাইত্যেই থাকবো?

মদিনা ছোট বোনের কথা পাত্তা না দিয়ে বলে, এইডা দিয়া তর কি কাম?

তারপর সে আবার পানিতে নেমে হালকা ভাবে শরীর ভাসিয়ে সরে এসে উঠোনের দিকে তাকায়। কিন্তু সোভানকে দেখা যায় না।

মমিনা আবার বলে, কম্পেন্ডারের কি ঘরবাড়ি নাই?

সোভানকে দেখতে না পেয়ে এমনিতেই তার রাগ হচ্ছিলো। মমিনার অর্থহীন বাক্যালাপে আরো ক্ষেপে গিয়ে বলে, জানি না!

মমিনা ঝুপঝাপ করে আরো কটি ডুব দিয়ে পাড়ে উঠে পড়ে। ভেজা শাড়ি পাল্টে সোভানের দেয়া শাড়িটা পরলে মদিনা পানিতে দাঁড়িয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয় মমিনার শাড়িটাই বেশি সুন্দর!

মমিনা দু পা একত্র করে তার উপর ভেজা শাড়িটা কয়েকবার আছড়ে নিয়ে লম্বা করে ছড়িয়ে পানিতে ভাসায়। ভেজা শাড়ির নিচের দিকে বাতাস ঢুকে কিছু কিছু অংশ ফুলে থাকে। সে শাড়িটাকে একবার সামনে টেনে নিয়ে আবার পেছনের দিকে ঠেলে দেয়।

মদিনা মমিনার খেলা দেখে বিরক্ত হয়ে বলে, এইডা আবার কোন শয়তানী শুরু করলি? তাড়াতাড়ি ঘরে যা!

ধমক খেয়ে মমিনা ভেজা কাপড়টা গুটিয়ে পানিতে চুবিয়ে নিয়ে চিপে পানি ঝরায়। তারপর দড়ির মত ভাঁজ করে কাঁধে ফেলে পরনের কাপড় হাঁটুর কাছে ধরে সামান্য তুলে ধরে ঘরের দিকে হেঁটে যায়।

মদিনা আবার পানিতে শরীর ভাসিয়ে এদিক ওদিক হালকা সাঁতারে আসা যাওয়া করে। কিন্তু সোভানকে দেখতে পায় না। সে পানিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে আঁচলে শরীর ডলে।

এতদিন বাঁধের ঢালে খোলা জায়গায় গোসল করলেও শরীরের ময়লা পরিষ্কার না হয়ে বানের ঘোলা পানি থেকে আরো ময়লা শরীরে লেগেছে। গোসলের পর চামড়া শুকালে কেমন চড়চড় করতো। এতদিনকার সঞ্চিত ময়লা-মাটি যেন স্থির পানিতে এসে আলগা হয়। যতই কাপড় দিয়ে ঘষা দেয় ততই সরু সরু আকৃতির ময়লা উঠে আসতে থাকে। কাপড়ের ঘষায় শ্যামলা চামড়া কেমন লালচে দেখায়। হঠাৎ তার মনে হয় যে, আসলে তার গায়ের রঙটা ভালোই ছিলো। কিন্তু গ্রামে থেকে আর পুকুরের নোংরা পানিতে গোসল করে করে রঙটা খারাপ হয়ে গেছে। একবার তার মনে হয় শহরে থাকলে হয়তো তার গায়ের মলিন চামড়া কিছুটা হলেও ফর্সা হতো। কিন্তু শহরে সে যাবে কি করে? একে তো লেখাপড়া না জানা, তার ওপর কোন সূত্র ধরে সে শহরে গিয়ে থাকবে? শহরে থাকবে এমন কারো সঙ্গে বিয়ে হবে তেমন আশাও নেই। অনেক ভেবে তার মনে হয় যে, আসলে সবই ভাগ্য! যার বাবা-মায়ের গায়ের রঙ দেখতে মাগুর মাছের মত, তাদের সন্তান ফর্সা হবে কি করে? আর এ কথা মনে হতেই ফর্সা হয়ে জন্ম না নেবার আক্ষেপটা দূর হয়ে যায়।

গোসল সেরে সে আর দেরি করে না। দ্রুত কাপড় পাল্টে কোনো রকমে ভেজা শাড়িটা পানিতে চুবিয়ে নিংড়ে নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসলেও সোভানকে দেখতে পায় না। সে বুঝতে পারে না কেন হঠাৎ করেই সোভানকে আড়ালে নিয়ে বা তার সঙ্গে একান্তে দুটো কথা বলার জন্যে অস্থির হয়ে উঠেছে। কই, বাঁধের উপর এতটা দিন পাশাপাশি থেকেও তো এমনটা কখনো মনে হয়নি?

সে চুপি চুপি মমিনাকে জিজ্ঞেস করে, কম্পেন্ডার কই রে?

মমিনা ঠোঁট উল্টে বলে, আমি আইয়া দেহি নাই!

ঘরের বেড়ায় শাড়িটা মেলে দিয়ে মদিনা রান্নাঘরে ঢুকলে দেখতে পায় জয়তুন বিবি কইমাছ ভাঁজছে। সে অবাক হয়ে বলে, কইমাছ পাইলা কই?

সোভান ধইরা আনলো!

কয়ডা মাছ? জাল পাইলো কই?

হাতেই ধরছে! ক্ষেতের নামায় অল্প পানিতে চড়বড় করতাছিলো!

কিন্তু মা, যে মাছ ধরলো হ্যায় কই?

কইলো তো অহনই আইবো!

গেছে কোনহানে?

গোসল করতে গ্যাল না!

না! আমি পুষ্কুনি থাইক্যা অহনইত্ত আইলাম!

জয়তুন বিবির মুখে সাদা দাঁত ঝকমক করে উঠলো। আলো গাঙ্গে গ্যাছে!

অ।

তারপর সে আবার বলে, ভাত হইছে?

ইট্টু সবুর কর! পোলাডা আউক! এক লগেই বইস!

মদিনা সোভানের গুরুত্ব দেখে আরো ক্ষেপে ওঠে যেন। বলে, ওই ব্যাডার লাইগ্যা তোমাগো দুই জনের অ্যাত টান ক্যান? হ্যায় তোমাগো আপন, না আমরা?

জয়তুন বিবি আবার হাসতে হাসতে বলে, তুই যদি ওই পোলার দুশমন হইয়া যাস তো আপন বানামু ক্যামনে?

বলতে বলতে তখনই মাথায় ভেজা গামছা আর গায়ে ভেজা লুঙ্গি জড়িয়ে সোভান এসে উপস্থিত হয়। ইটের স্তূপের উপর গামছা আর লুঙ্গি মেলে দিয়ে গেঞ্জিটা পরে রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে বলে, কাকি, কাকায় কই?

গোসল করতে যাইবো কইলো!

রোদে থেকে চকি দুটো ভালোই শুকিয়েছে। এখন এ দু টোকে ঘরে নিয়ে গেলেই চলে। বেশিক্ষণ রোদে থাকলে তক্তা ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সোভান হাত দিয়ে চকির তক্তার উত্তাপ পরখ করে। তারপর মদিনাকে ডেকে বলে, আর কিছুক্ষণ রৈদে থাকলে চকির তক্তা ফাডা শুরু করবো!

মমিনা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললো, তাইলে অহনই ঘরে তুইল্যা ফালাই!

সোভান মমিনার আগ্রহ দেখে হাসে। বলে, তুমি পোলাপান মানুষ! একলা পারবা না!

বুবু ইট্টু আইও দেহি!

তাকে সহযোগিতার জন্য মমিনা মদিনাকে ডাকে।

রান্নাঘর থেকে মদিনা মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, অহন পারমু না!

সোভান মদিনার উদ্দেশ্যে বলে, তক্তা ফাইট্যা যাইবো!

ফাডুক! ভাত না খাইয়া কিছু করতে পারমু না!

গোসল সেরে ফিরে এসে কেরামত মেম্বর মদিনার কথা শুনতে পেয়ে আপন মনেই হাসে। তারপর বলে, আমার বড় মায় কাজে কামে খুবই আলিস্যা! তারপর সে তার হাতের ভেজা লুঙ্গি মমিনার হাতে দিয়ে, ধর দেহি সোভান! বলে, দু হাতে চকির এক প্রান্ত আগলে ধরে।

সোভান আরেক প্রান্ত তুলে ধরে বললো, কাইত করেন!

দুজনে মিলে চকি দুটো ঘরে নেবার পর কেরামত মেম্বর বললো, চকিতে বইয়াই ভাত খামু! কি কস?

সোভান হাসে। তা খাওন যায়। তয় পরে পায়ার নিচে একটা কইরা ইট দিয়া দিলে ভালা হইবো!

হেইডা তো দ্যাওনই লাগবো! তারপর কেরামত মেম্বর স্ত্রীর উদ্দেশ্যে ফের হাঁক দিয়ে বলে, আর কতক্ষণ?

জয়তুন বিবি রান্নাঘর থেকে বলে, আপনেরা বইয়া পড়েন! তারপর পাশে বসা মদিনাকে বললো, তুই যাইয়া বাসন-খোরা নামা! মমিনারে ক আইতে!

বাইরে থেকে মমিনা মায়ের কথাটা শুনতে পেয়ে ছুটে এসে বললো, কি করমু কও!

তুই ছালুন আর মাছের বাডি লইয়া যা! আমি ভাত-ডাইল লইয়া আইতাছি!

কেরামত মেম্বর চকির উপর জোড়াসনে বসে সোভানকে তাড়া দিয়ে বললো, বইয়া পড়!

আজ কাজের সময়ের তারতম্যের ফলে ঠিক সময়ে কারোরই খাওয়া হয়নি। যে কারণে সবাই একই রকম ক্ষুধার্ত। চকির উপর ভাত-তরকারি সব চলে এলে মদিনা মমিনাও বসে পড়ে।

কেরামত মেম্বর দরজার দিকে ফিরে বলে, কই গ্যাল?

আমার দেরি আছে! জয়তুন বিবি রান্নাঘর থেকেই বলে। আপনেরা শুরু করেন!

আমি গাও-গোসল দিয়া পরে খামু!

হাত-মুখ ধুইয়া আইয়া পড়! সবতে মিল্যা একলগে বইয়া খাই!

কইলাম না আমার দেরি হইবো!

কেরামত মেম্বর মেয়েদের দিকে ফিরে হেসে বলে, তাইলে উইঠ্যা পড়লাম!

জয়তুন বিবি জানে স্বামীর পাগলাটে স্বভাবের কথা। তাই ত্রস্তে বললো, আইতাছি!

খানিকক্ষণ পর সে এসে উপস্থিত হলে ঘরের ভেতরটা কেমন উৎসবের আমেজে ছেয়ে যায়।

।। ৬ ।।

একটি বাড়ি গোছগাছ করা চাট্টিখানি কথা না। চারদিকের জমি থেকে বানের পানি নেমে গেলেও ঘরের মেঝে কেমন স্যাঁতস্যাতে মনে হয়। কাদা দিয়ে লেপা-পোছা করার পর মেঝে শুকাতে বেশ দেরি হয়। কেরামত মেম্বর কোন একটি কাজে ঘরের ভেতর এলে মেঝেতে নরম কাদার প্রলেপে তার পায়ের ছাপ বসে যায়। এটা দেখে মদিনা খুবই বিরক্ত হয়।

কেরামত মেম্বর কাতর কণ্ঠে বলে, মারে, অহন যতই ল্যাপাপোছা কর, অ্যাত তাড়াতাড়ি হুগাইবো না!

মদিনা কান্নার সুরে নাকি কণ্ঠে বলে উঠলো, তাই বইল্যা তুমি সারা ঘরে ঘুইরা বেড়াইবা? আমি যে কষ্ট কইরা ল্যাপা-পোছা করতাছি হেইডা তোমার চউক্ষে লাগে না?

কেরামত মেম্বর কেমন যেন বিড়ালের ভঙ্গিতে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে।

বাবাকে হাসি হাসি মুখে দেখতে পেয়ে মমিনা এগিয়ে এসে বললো, বাজান, বানের পানি ত হুগাইছে, আমার গলার-কানের জিনিস কবে আনবা?

কেরামত মেম্বর এখনই ওসব নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না। তার মনে এখন হ্যান্ড ট্রাক্টরের টাকার চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। বউ-মেয়েদের গয়না-গাটি এখনই ফেরত দিলে টাকায় টান পড়তে পারে। এখন তার সামনে অনেক কাজ। টাকারও প্রয়োজন অনেক! জমানো টাকায় হাত দিলে তার যাবতীয় পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে। সে মেয়ের কথায় মুচকি হেসে বললো, আরো কয়ডা দিন যাউক! অ্যাহন চাইরো দিগে চোর-ছোচের আওয়া-যাওয়া বেশি হইবো। জিনিস-পাতি চুরি অওনের ডর আছে!

চোরদের উপর খুবই রাগ হয় মমিনার। বলে, চোরেরা আর কোনো কাম হিকতে পারে না? ধরা পড়লে অ্যাত্ত অ্যাত্ত মাইর খায়, তাও যদি ব্যাডাগ লাচ্ছরম হইতো!

যাগো লাচ্ছরম আছে, তারা তো চুরিদারি করে না মা! দ্যাহ না খাউল্যারে জুতা দিয়া পিডাইলো তাও হ্যার আর হ্যার পোলাপাইনের শরম হইছে? হ্যার পোলায় ফকিন্নির চাউলও মাইরা খাইছে!

হ্যামন মানুষগুলারে মাইরা ফালাইলেইত্ত হয়!

আসলে সমাজের অনেক নোংরা-পচা আর দুর্গন্ধ ইচ্ছে করেই মানুষ ঢেকে রাখে। এগুলো পরিষ্কারের নামে ঘাটাঘাটি করলে তার দুর্গন্ধে সমাজ আরো কলুষিত হয়ে পড়ে। এদের বীজ রূপকথার রাক্ষস-খোক্ষসের মত। যাদের এক ফোঁটা রক্ত মাটিতে পড়লে আরো শত রাক্ষস-খোক্ষসের জন্ম হয়। তার চেয়ে একটিই একশটি জন্মের চাইতে অনেকাংশে কম বিপদজনক!

সোভান নিজের ঘরে শুয়েছিলো। শুনতে পাচ্ছিলো পিতা-পুত্রীর কথোপকথন। এ ঘরে যদিও কেরামত মেম্বরের কথা অনুযায়ী ইট বিছিয়ে চকির সমান উঁচু করে বিছানা পেতে নিয়েছে। ইটের উপর পুরু করে খড় বিছিয়ে তার উপর বিছিয়েছে মোটা কাঁথা। শুতে বেশ আরাম হলেও সারাক্ষণ তার শুয়ে বসে থাকতে ভালো লাগে না। সে উঠে বাইরে বেরিয়ে এসে কেরামত মেম্বর বা মমিনাকে দেখতে পায় না। উঠানের দু পাশে মদিনা আর জয়তুন বিবি মুগুর দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে মাটি সমান করছিলো। সে দরজায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ মাতা-কন্যার কাজ দেখে।

তারপর গলা খাকারি দিয়ে বলে, হুইয়া-বইয়াতো আমার শইল পইচ্যা গ্যাল! কিছু একটা করতে না পারলে…।

মদিনা তখনই মুচকি হেসে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে বলে,তাইলে আমাগো লগে আইয়া মাডি পিডানের কাম কর!

তারপরে কি করমু?

পরেরডা পরে!

সোভান সত্যি সত্যিই বেরিয়ে এসে মদিনার পাশে দাঁড়ালে জয়তুন বিবি বললো,সোভান! মাইয়ায় পাগল বইল্যা কি লগে লগে তুমিও পাগল হইলা?

সোভান নির্বোধের মত দাঁড়িয়ে থাকলে মদিনা মুখ লুকিয়ে হাসতে থাকে। তখনই মমিনা পুকুর ঘাট থেকে এসে সোভানকে হাতছানি দিয়ে বলে, কম্পেন্ডার, দেইখ্যা যাও!

সোভান মমিনার পিছু পিছু যায়।

পানিতে ভেসে থাকা ঘাটের একটি গাছের গুড়ি টেনে মমিনা বললো, এইডারে ক্যামনে আটকাই, কও দেহি?

সোভান বিস্মিত হয়ে বলে, তুমি এই কাম করতে আছিলা?

হ!

তারপর মমিনা আবার বলে, বিয়ানে একবার পিছল খাইয়া পড়ছি! আরো কেউ যদি পিছল খায়?

সঙ্গে সঙ্গেই সোভান নিজের কর্তব্য স্থির করে ফেলে। বলে, ভালা দেইখ্যা একটা দাও আন!

মমিনা একছুটে বাড়ি এসে দা নিয়ে ফিরে যায়। সোভান দা হাতে নিয়ে এদিক ওদিক তাকায়।

মমিনা কৌতূহলী হয়ে বলে, কি দ্যাহ?

খুঁডি বানাইলে গাছের ডাইল ভালা হইবো, না বাঁশ ভালা হইবো দ্যাখতাছি!

বাঁশ ভালা হইবো!

তোমাগো বাঁশঝাড় আছে?

মমিনা পুকুর পাড়ের বাঁশঝাড়গুলো দেখিয়ে বলে, ওইডিইত্ত আমাগো!

সোভান বাঁশঝাড়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে চিকন এবং ঘন গাঁইটঅলা দুটো বাঁশ কাটে।

তারপর চেঁছে ছুলে কয়েকটি টুকরো করে এক প্রান্ত কেটে চোখা করে নিয়ে ঘাটলায় ফেলে রাখা গাছের মোটামোটা গুড়িগুলোর ফাঁকে ফাঁকে বসিয়ে মুগুর দিয়ে পিটিয়ে ভালোমতো মাটিতে গেঁথে দেয়। নিজে গুড়িগুলোর উপর দিয়ে সিঁড়িতে উঠানামার মত করে হাঁটে। পা দিয়ে ঝাঁকি দিয়ে সেগুলো নড়েচড়ে কিনা পরখ করে নিশ্চিত হয়ে মমিনাকে বলে, দেইখ্যা লও! আবার কিছু করতে হইলে কইও!

মমিনা লাফিয়ে লাফিয়ে ঘাটলার গাছের দৃঢ়তা পরখ করে! কোনো একটি গুঁড়ি বিন্দুমাত্র নড়ে বলে মনে হয় না। সে খুশি হয়ে বললো, হইছে!

সোভান দাটা হাতে তুলে নিয়ে বলে, আর কি করতে হইবো কও! মমিনা কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলে, তাইলে লও শিম আর লাউয়ের দানা লাগাই!

সোভান মনে মনে খুশি হয়। মদিনার চেয়ে মমিনাই সংসার ভালো বুঝবে। যে পাখি উড়ে সে বাসাতেই ছটফট করে। মমিনার মাঝে এখন থেকেই সবার ভালো কি করে হয় তেমন একটি ভাবনা ডানা মেলতে আরম্ভ করেছে হয়তো। সে বললো, শিম-লাউয়ের দানা লাগাইবা জাগা ঠিক করছ?

করছি! বলে মমিনা যে জায়গা দেখায় তা সোভানের পছন্দ হয় না। সে তাদের বাড়ির ঢালু জায়গাগুলো দেখিয়ে বলে, এহানে লাগাইলে গাছে ঠিক মতন রৈদ-বাতাস লাগবো। ফলনও ভালা হইবো! দানাও লাগাইতে পারবা বেশি!

তাইলে শিম লাগামু কোনহানে?

সোভান ঘুরে ঘুরে জায়গা দেখিয়ে দিলে মমিনা ঘর থেকে কোদাল নিয়ে আসে।

সোভান কোদাল হাতে বললো, অহন কি লাউ লাগাইলে কাম হইবো? মমিনা বললো, না হইলে কি! লাউ পাতার শাক আর ভর্তা তো খাওন যাইবো!

সোভান আবার চমৎকৃত হয় মমিনার কথায়। সে তুলনায় মদিনা যেন একেবারেই অকাজের।

ওদের কাজে জয়তুন বিবি খুশি হলেও মদিনা খুশি হতে পারে না। বলে, ঘরের লগে শিম-লাউ লাগাইলে গান্ধী আর স্যাঙ্গা ঘরে আইবো না?

সোভান মাটি কোপাতে কোপাতে বলে, বিয়ান বেলা গাছের উপরে বাসী মুহে ছাই ছিডাইয়া দিলেইত্ত হইবো!

মদিনা ক্ষিপ্ত হয়ে বললো, অ্যাত কিছু পারমু না! যে গাছ লাগাইতাছে হ্যায় জানি এইসব করে!

তুমি কি লাউ-শিম খাইবা না? বলে ঠোঁট টিপে হাসে মমিনা।

মদিনা চোখ পাকিয়ে তাকায় মমিনার দিকে।

মমিনা বড় বোনের চোখ রাঙানো পাত্তা না দিয়ে বললো, তুমি হুদাহুদি ডরাইও না! তোমার কিছু করতে হইবো না!

মদিনা দাঁতে দাঁত পিষে বলে, একটা স্যাঙ্গা ঘরে ঢুকলে তগো লাউ আর শিম গাছের গোঁড়া দিয়া কাটমু!

মমিনা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে, কাইট্যো!

জয়তুন বিবি বললো, মদিনা, শুরুডা করলি কি? একটা ভালা কাম হইতাছে হেইডাও তর পছন্দ না?

আসলে মদিনা চাচ্ছিলো যে, সোভান তার দিকে দৃষ্টি ফেলুক। তাকে দেখুক। নতুন ঢঙে শাড়ি পরেছে। দেখতে কেমন হয়েছে নিজের চোখে তা দেখুক। কিন্তু সোভানের কোনো দিকে মন নেই। একমনে মাটি কুপিয়ে কুপিয়ে শিম আর লাউয়ের বীজ লাগানোর জন্যে মাটি তৈরি করছে।

সোভানের অমনোযোগ দেখে খুবই রাগ হয় মদিনার। দুঃখও হয়। হঠাৎ তার কান্না পেলে কাজ ফেলে উঠে ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে।

জয়তুন বিবি অসময়ে মেয়েকে শুয়ে পড়তে দেখে এগিয়ে যায়। বলে, হুইয়া পড়লি যে! তর কি শইল খারাপ?

মায়ের কণ্ঠের আন্তরিকতার ছোঁয়া পেতেই মদিনার অন্তর্গত রাগ বা অভিমান তরল হয়ে অশ্রু আকারে পরিস্ফুট হয়।

জয়তুন বিবি মেয়ের কপালে হাত ছোঁয়ালে তার কান্না আরো বেগবান হয়। কিন্তু মেয়েকে কাঁদতে দেখলে মায়ের মনও নরম হয়ে আসে। কী হইছে মা? ক আমারে?

মদিনা কি বলতে পারবে যে, সোভান কেন তার দিকে ফিরে তাকাচ্ছে না? সে যে এতটা যত্ন নিয়ে নতুন ঢঙে শাড়িটা পরেছে, তা কি সে দেখতে পাচ্ছে না? সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও সোভানের চোখে পড়ার মত বস্তু কি সে নয়? নাকি এতটাই সামান্য আর অবহেলিত যে, সোভানের মত প্রায় ছিন্নমূল একজন মানুষের কাছেও তার গুরুত্ব নেই? সে চেষ্টা করলেও হয়তো বলতে পারবে না তার অন্তর্গত বেদনার কথা। জানাতে পারবে না তার অভিমানের কথা। তাই কান্নাই তার একমাত্র সহায়।

জয়তুন বিবি উদ্বিগ্ন হয়ে আবার জিজ্ঞেস করে, প্যাট কামড়াইতাছে?

মদিনা চোখের পানি ফেলতে ফেলতে নিঃশব্দে মাথা নাড়ে।

জয়তুন বিবি উদ্ভ্রান্তের মত মদিনার পেটের উপর হাত রেখে মমিনাকে ডাকে। মমিনা! অ মমিনা!

মায়ের ডাক শুনে ঘরে এসে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় সে। বলে, বুবুর কি হইছে মা?

কইলো তো প্যাট কামুড়!

মমিনা ফের ছুটে আসে সোভানের কাছে। সোভান ভাই!

হঠাৎ চমকে উঠে ফিরে তাকায় সোভান। এ পর্যন্ত দু বোনের কেউই তার নাম মুখে উচ্চারণ করেনি। তাই মমিনার মুখে নিজের নাম শুনতে পেয়ে দৃষ্টিতে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তাকায়।

সোভান ভাই, বুবুর প্যাট কামড়াইতাছে!

সোভান হাতের কোদাল ফেলে মাটি মাখানো হাতেই ছুটে যায়। মদিনা যে ঘরে শুয়ে আছে, সে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলে, কি হইছে?

জয়তুন বিবি হঠাৎ কেঁদে উঠে বললো, প্যাট কামুড়! অহন কী করি কও দেহি বাজান?

উদ্বিগ্ন কণ্ঠে সোভান জিজ্ঞেস করে, ক্যামন কামুড়? খামছি দিয়া ধরনের মতন, না পাক দ্যাওনের মতন?

আঁচলে চোখ মুছে জয়তুন বিবি মদিনার মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, ক্যামন কামুড় মা?

মদিনা চোখ মেলতেই সোভানের উদ্বিগ্ন মুখ দেখতে পায়। আর তা দেখেই তার ভেতরকার অভিমান রাগ সবই দূরীভূত হয়ে যায় যেন। মনটা প্রসন্ন হয়ে ওঠে সোভানের প্রতি। বেচারা সত্যিই ভয় পেয়েছে দেখে মনে মনে হাসি পেলেও সে মুখের ভাব ম্লান করে রাখে।

সোভানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, পাক দ্যাওনের মতন!

সোভান তেমনি উদ্বেগকুল হয়ে বললো, উপরে নিচে আইতাছে? নাকি একখানেই পাক খাইতাছে?

উপরে নিচে!

সোভানের মুখ ফের স্বাভাবিক হয়ে আসে। জয়তুন বিবির দিকে ফিরে বলে, ঘ্যাস হইছে! নুন আর আদা ছেইচ্যা খাইতে দ্যান!

আমি অহনই আনতাছি! বলেই মমিনা বেরিয়ে যায়। মদিনার মন হালকা হয়ে যায়। কান্নার ফলে বুকটাও যেন হালকা হয়েছে। যদি সত্যি সত্যিই পেট ব্যথা হতো তাহলে কি হতো বলা যায় না। তবে সে মনে মনে নিজকে এই বলে ধিক্কার দেয় যে, কেন সে এমনটা করলো? আসলে তার দিকে সবারই তো মনোযোগ আছে! সোভান তাকে দেখেও যদি কিছু না বলে তাহলে কী বা করার আছে? আর কিছু একটা যে বলবে সে সুযোগ বা পরিবেশটা কোথায়?

ইচ্ছে না করলেও মমিনার বাড়ানো হাত থেকে লবণ-আদা ছেঁচার ছোট মণ্ডটা হাতে নিয়ে মুখে দেয়। সে জানে যে, শুধু শুধু আদা-লবণ খেলেও কোনো অসুবিধা নেই।

।। ৭ ।।

টুকলি এবং তার আশপাশের গ্রামে কেমন একটা উৎসব উৎসব ভাব বিরাজ করছে। আট-দশ কিলোমিটারের ভেতর কোনো স্কুল ছিলো না এতদিন। তাই স্কুলের নাম শুনে সবাই যেন সহস্র বছরের ঘুম থেকে জেগে উঠলো। বিশেষ করে টুকলি গ্রামের মানুষের উৎসাহ সবার চেয়ে বেশি। কারণ স্কুলটি এ গ্রামেই হচ্ছে। খুশির আতিশয্যে কেরামত মেম্বর বলে উঠলো, ইস্কুল ঘরডা আমি কইরা দিমু!

চেয়ারম্যান হরি দাস বললো, ইস্কুল ঘরের ট্যাকা সরকারে দিবো! অখন দরকার ঘরের জাগা!

ইস্কুল ঘর কোনহানে তুলবি ঠিক করছস?

ইনসপেক্টার আইয়া ঘুইরা ফিরা যাওনের সময় হালটের লগে আমার যেই তিন বিঘা জমিন আছে তাই পছন্দ কইরা গেছে। আর কইয়া গেছে লগের পাল কাকার জমিনডা আর তোমারডা লইতে! কিন্তু…

কিন্তু কি?

কেরামত মেম্বর হরি দাসের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

কিন্তু পাল কাকা কি জমিনডা দিবো?

কেরামত মেম্বর অবাক হয়ে বলে, আশ্বিনী পাল গরিব মানুষ! হ্যারে মাইরা লাভ কি?

হরি দাস আরো অবাক হয়ে বললো, মারমু ক্যান? দাম চাইলে দাম দিমু। জমিন চাইলে জমিন দিমু! তাও আমার ইস্কুলঘর চাই!

তাইলে চল পালের লগে কথা কই!

হরি দাস চেয়ারম্যান দুষ্টু লোক বলে, নিজ বাড়িতে তার আগমনের হেতু বুঝতে না

পেরে আশ্বিনী পাল শঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন তার দিকে। ভাবেন যে, আবার কোন সর্বনাশের সংকেত নিয়ে এলো লোকটা?

একমাত্র মেয়ে গায়ত্রী চেয়ারম্যানের অশোভন প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি বলে, ষড়যন্ত্র করে গ্রাম্য শালিসের মাধ্যমে চিত্তেশ্বর মুচির সঙ্গে বিয়ে দিতে বাধ্য করেছিলো। জাতের মিল না হলেও গায়ত্রী বাধ্য হয়ে সংসার করছে বাপের মুখ চেয়ে।

পাল কাকা ক্যামন আছ?

পাল হরি দাসকে ঘৃণা করেন। পাশে এক দলা থুথু ফেলে নিরামিষ উত্তরে বলেন, ক্যামন থাকমু তুইত্ত ভালা জানস?

ধুরন্ধর লোক হরি দাস পালের কথায় রাগে না। বলে, রাগের কথা ছাড় দেহি কাকা! একটা কাজে আইছি!

দৃষ্টিতে সন্দেহ এবং অবিশ্বাস নিয়ে আশ্বিনী পাল বললেন, আমার মতন মানষ্যের কাছে তর আবার কি কাজ?

গ্যারামে যে ইস্কুল হইতাছে হেই খবর পাইছ?

ওইডা তো পাইছিই!

ইস্কুল ঘরের লাইগ্যা তো জমিন চাই! কেরামতের লগে দিয়া হালটে তোমার কদ্দুর জমিন আছে?

আশ্বিনী পালের বুকের ভেতরটা আচমকাই ধড়াস ধড়াস করতে লাগলো। চোখ দুটো যেন ভিজে উঠছে। ঘোলা দৃষ্টিতে তিনি তাকান হরি দাসের দিকে।

কথা কও কাকা!

হরি দাস যেন তাড়া দেয় আশ্বিনী পালকে।

আশ্বিনী পাল উদ্গত কান্না চেপে বললেন, পোণে এক বিঘা!

ওইডা ইস্কুলের নামে দিয়া দ্যাও!

আশ্বিনী পাল প্রচণ্ড রাগ আর ঘৃণায় কাঁপতে থাকেন। বলেন, ইস্কুলরে আমার ভিটাডা দিতে হইবো না?

কেরামত মেম্বর হাসিমুখে এগিয়ে গিয়ে পালের কাঁধে হাত রেখে বললো, কাকা, তোমার বাড়ির নামায় আমার জমিডার লগে এওয়াজ বদল কইরা ফালাও! রাজি আছ?

কেরামত মেম্বরের কথা অকস্মাৎ বিশ্বাস হয় না আশ্বিনী পালের। তবু বলেন, এহানে তোমার জমিন আছে দেড় বিঘা! পোণে এক বিঘার লগে অ্যাওয়াজ বদল ক্যামনে হয়?

কেরামত মেম্বর জোরে হেসে উঠে বললো, আমরা চাইলেই হয়! তোমার হাঁস-মুরগি আর গরু-ছাগলের অত্যাচারে কোনো বছরইত্ত আধা বিঘার ফসল পাই না! তোমার নিজের হইলে ফসল নষ্ট করতে কিছুডা চিন্তা করবা!

প্রস্তাবটা ভালোই! একজন জ্ঞাতি ভাই হলেও খারাপ মানুষ। অন্যজন মানুষ ভালো হলেও ভিন্ন ধর্মের। দু জনকে কতটুকু বিশ্বাস করা যায়? আশ্বিনী পাল মনে মনে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। কেরামতের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রমাণ তিনি আগেই পেয়েছেন। তাই তাকে এবং তার প্রস্তাবটাকেই বিশ্বাস করতে চান। কিন্তু পৌণে এক বিঘার তুলনায় দেড় বিঘা অনেক বলে, বিশ্বাসে অনেকগুলো ফাটল সৃষ্টি হলে তিনি চুপচাপ ভাবেন। কিন্তু কী উত্তর দেবেন ভেবে পান না।

কেরামত মেম্বর বললো, কাইল রেজিস্টার অফিসে যাইতাছি! রাজি থাকলে আমার লগে লও!

আশ্বিনী পালের তেমন কোনো জরুরি কাজ না থাকলেও বললেন, কাইল তো পারমু না! দুইদিন পরে জানাই?

আইচ্ছা জানাও! বলে হরি দাস ঘুরলো।

কেরামত মেম্বর আশ্বিনী পালকে বললো, তাইলে যাই কাকা!

আশ্বিনী পাল মাথা দোলালে কেরামত মেম্বর হরি দাসের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসে। হাঁটতে হাঁটতে কেরামত মেম্বর বললো, আমি জমি দিলে ইস্কুল আমার পছন্দের মানষ্যের নামে হইবো!

হরি দাস অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে, দিবা তো দেড় বিঘা!  তোমার পছন্দে হইবো ক্যান?

তাইলে পালেরে যেই জমি দিমু হেইডা?

তোমার বাড়ির সামনে করিম বক্সের যেই দেড় বিঘা আছে, তা তোমার নামে লেখাইয়া দিমু!

করিম বক্সের কি হইবো?

অবাক হয়ে বলে কেরামত মেম্বর।

কমিটি জমিনের দাম শোধ করবো।

হ্যায় কি রাজি হইবো?

হরি দাস হেসে বলে, প্রস্তাবডা হ্যায় নিজেই দিছে!

এরপর হরি দাসের সঙ্গে আর কোনো কথা হয় না কেরামত মেম্বরের। কিন্তু পরদিন খুব ভোরেই বাড়ি এসে উপস্থিত হন আশ্বিনী পাল। এ সময়ে আশ্বিনী পালের আসার কোনো কথা ছিলো না বলে উঠোনে তাকে দেখতে পেয়ে খুবই অবাক হয়ে যায় কেরামত মেম্বর। কি মনে কইরা কাকা?

আশ্বিনী পাল হঠাৎ কেরামত মেম্বরের দু হাত ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে বলেন, বুড়া কালে কি পথে বমু?

বিস্মিত কেরামত মেম্বর বললো, কি কও আমি তো বুঝতে পারতাছি না!

তারপর আশ্বিনী পালকে ঘরে নিয়ে বসিয়ে কেরামত মেম্বর বলে, মাথা ঠাণ্ডা কইরা আস্তে ধীরে কও কাকা! তোমার কথা আমার মাথায় ঢুকতাছে না!

কাইল রাইতে যা কইলা ক্যামনে বিশ্বাস করি? হরি দাস তো তার বাপের বছর কামলার জন্ম। খারাপ মানুষ!

জমিন বদলাইবা আমার লগে। হরি দাস কি করবো?

হ্যায় য্যামন খারাপ মানুষ, তোমারেও যে প্যাঁচে হালাইবো না তার কি ঠিক আছে?

হেইডা আমারে চিন্তা করতে দ্যাও! জমিন বদল করবা আমার লগে। হরি দাসের লগে সমন্দ কি? তুমি দিবা আমারে আর আমি দিমু তোমারে!

আশ্বিনী পাল দু হাতের তেলোয় মাথা চেপে ধরে কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বললেন, ইস্কুল কি সত্যই হইবো?

সত্যই! বলে, কেরামত মেম্বর হাসে। এই কামের নাম একবার উঠলে না হইয়া কি পারে?

আশ্বিনী পাল আবার কেরামত মেম্বরের হাত ধরে বলে উঠলো, তাইলে আমার সুবলরে একটা মাস্টারির চাকরি দিও! জমিনডা আমি ইস্কুলরে অ্যামনেই লেইখ্যা দিমু!

ধুরো হমুন্দির পুত! বুড়া হইলে কি মানষ্যের বুদ্ধি কইম্যা যায়?

গাল খেয়ে আশ্বিনী পাল কেমন নির্বোধের মত তাকিয়ে থাকেন কেরামত মেম্বরের মুখের দিকে।

কেরামত মেম্বর আশ্বিনী পালকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলে, সুবল আমাগো গ্যারামের একটা শিক্ষিত পোলা। তারে তো অ্যামনেই ইস্কুলের মাস্টার হইতে হইবো। হ্যায় না চাইলেও আমরা সবতে মিল্যা ধরতাম! হুদাহুদি জমিডা হাতছাড়া কইরা লাভ কি?

বুঝলাম না বাপ!

আশ্বিনী পাল চোখ পিটপিট করেন।

তুমি ইস্কুলরে জমি লেইখ্যা না দিলেও সুবলের চাকরি হইবো!

কথা শুনে আশ্বিনী পালের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

কেরামত মেম্বর প্রায় ফিসফিস করে আবার বলে, এই কথা কাউরে কইও না যে, তুমি ইস্কুলরে জমি অ্যামনেই লেইখ্যা দিতে চাইছিলা!

আশ্বিনী পাল কেমন যন্ত্রের মত মাথা নাড়েন।

ঠিক তখনই হঠাৎ কেরামত মেম্বর গলা বাড়িয়ে বলে,কই? হুনছে?

কোনো সাড়াশব্দ না পেলেও সে আবার বলে, আমাগো লাইগ্যা কয়ডা মুড়ি পাডাও দেহি!

আশ্বিনী পাল বললো, আমি কিছু খামু না!

কিছু না খাইলে অসুবিদা আছে! আমরা এহান থাইক্যাই মেলা করমু!

আশ্বিনী পাল একই ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে।

কেরামত মেম্বর বললো, নকশা-পরচা নিছ? নাকি মনে আছে?

কেরামত মেম্বরের কথা শুনে আশ্বিনী পাল হেসে উঠলেন। হালটে আমার জমিই একটা! দাগ-খতিয়ান আর মৌজা শুদ্ধা পুরা চৌহদ্দিই মুখস্থ!

তাও আমি কাগজ-পাতি সব লইয়া লমু! তসিল অফিসে গিয়াও খোঁজ লমু! তোমরা মালাউনের জাত তো আমাগো শ্যাখেরে বিশ্বাস কর না! তোমার মন যহন কইবো সব ঠিক আছে, তহনই যামু মুহুরির কাছে!

আশ্বিনী পাল হেসে বলে, বিশ্বাস না করলে,যুদ্ধের সময় আশি ভরি সোনা-রূপার জিনিস, দলিল আর আড়াই মণ তামা-কাঁসার জিনিস তোমার জিম্মায় থুইয়া যাইতাম না!

তাও তো তোমার বউ স্বাধীনের পরে কইছিলো, তামা-কাঁসার জিনিস ক্যামন জানি পাতলা-পাতলা লাগে। সোনা-রূপার জিনিস ক্ষয় যাওইন্যা!

তাইলে আর মাইয়া মানুষ কইছে কারে? আণ্ডা-কণ্ডা ছাড়া কাছাখোলা মানুষ অ্যামন কথা তো কইতেই পারে!

হ্যার লাইগ্যা ঠিক করছি হলধর মুহুরি লেখবো দলিল। আমাগো মৌজার হগল দাগ-খতিয়ান তার মুখস্থ!

আশ্বিনী পাল এবার যেন সত্যি সত্যিই মন থেকে হাসতে পারেন। কেরামত মেম্বর এমনিতেও ভালো মানুষ আর বিশ্বাসী! তবু যেন লোকটি  ছত্রিশ বছর পরও তেমনি খাঁটি আর নির্মল রয়েছে বলে আশ্বিনী পালের মনে হয়।

।। ৮ ।।

অনেক রাত অবধি শুয়ে থাকলেও ঘুমুতে পারে না মদিনা। পাশে অঘোরে ঘুমুচ্ছে মমিনা। মমিনার ঘুম মদিনার মত এলোপাথাড়ি নয়। সে যেদিকে কাত হয়ে ঘুমুবে, তেমন ভাবেই জেগে উঠবে ঘুম থেকে। কিন্তু মদিনা যদি ঘুমায়, জেগে উঠলে প্রায়ই দেখতে পায় দুটো পা মমিনার গায়ের উপর। পরনের কাপড় খুলে গিয়ে গিয়ে কিংবা হাঁটুর উপরে উঠে যাচ্ছে তাই অবস্থা! তবে তার ভাগ্য ভালো বলতে হবে যে, মমিনা এমনটি কখনো নিজের চোখে দেখেনি। নয়তো সে অনেক আগেই নিজের আলাদা ঘুমের ব্যবস্থা করে নিতো।

বিছানায় শুয়ে থেকে থিকথিকে ঘন অন্ধকারের দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকে মদিনা। বাইরে দু একটা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া কোনো শব্দ নেই। কিছুক্ষণ আগে একবার উঠে গিয়ে কলস থেকে হাতের তালুতে পানি নিয়ে মাথা ভিজিয়েছিলো। কিন্তু বলতে গেলে সঙ্গে সঙ্গেই মাথার তালু শুকিয়ে গিয়ে দু পুরের মত শুকনো আর ঝরঝরে হয়ে উঠেছে। এক ধরনের অস্থিরতা তাকে আজ সকাল থেকেই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কোনো ভাবেই নিজকে স্থির করতে পারেনি সে। অন্ধকারেই সে উঠে পা ঝুলিয়ে চকির উপর বসে থাকে। কি করবে সে? এখন কি ঘরের বার হবে? কিন্তু অন্ধকারকে তার ভীষণ ভয়!

পাশের চকিতে তার মা জয়তুন বিবির নাক ডাকার মিহি শব্দ শোনা যাচ্ছে। সে আস্তে করে চকি থেকে নেমে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। হুড়কো লাগানোর পরও আড়াআড়ি ভাবে আরেকটি কাঠের টুকরো দিয়ে দরজা আটকানো হয়। সেটা খুলতে গেলে অনেক জোরে শব্দ হয়। আর সে শব্দে বাবা নয়তো মা, কখনো কখনো দু জনই এক সঙ্গে জেগে উঠে বলে, ক্যাডা? তখন নিতান্ত বাধ্য হয়েই বলতে হয়, আমি মদিনা! কিন্তু আজকের রাতটা ব্যতিক্রম। তার বাবা কেরামত মেম্বর বাড়িতে নেই। আশ্বিনী পালের সঙ্গে দলিল করতে থানা রেজিস্ট্রি অফিসে গেছে। কুটুম বাড়িতে রাতটা থেকে সকাল সকাল ফিরে আসবে।

বাঁধ থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর এক মাসের মত পার হতে চললো। কিন্তু সোভানকে একান্তে একটি কথা বলার জন্যে সুযোগ করে উঠতে পারছে না। যদিও সন্ধ্যার দিকে একটি সুযোগ এসেছিলো, তাও মমিনা হঠাৎ সেখানে চলে এলে তার মনের কথা মনেই রয়ে গেছে। সে পণ করেছে, আজ রাতে যে করেই হোক, সোভানকে কথাটা সে বলবেই। আজ কথাটা বলতে না পারলে আর কখনো সুযোগ পাবে কিংবা আদৌ কোনো সুযোগ আসবে কি না বলা যায় না।

তার বাবা আশ্বিনী পালকে সঙ্গে নিয়ে দলিল করতে গেলেও কেন রহিমার বাড়িতে যাবে, সে খবর তাদের স্বামী-স্ত্রীর শলা-পরামর্শের সময় বাইরে দিয়ে গিয়ে কান পেতে সবই শুনেছে। ওরা ভেবেছে তাদের পরামর্শ কেউ শুনতে পায়নি।

রহিমা জয়তুন বিবির সতালো বোন। তার একটিই মাত্র ছেলে গুজু। একবার বিয়ে করেছিলো। কিন্তু বউ মারা যাওয়ার পর বর্ষার আগেই তার সঙ্গে মদিনার প্রস্তাব দিয়েছিলো রহিমা। কিন্তু মদিনার পছন্দ নয় তাকে। একে তো একবার বিয়ে করেছিলো। তার উপর পিঠটা কুঁজো বলে সবাই তাকে গুজু বলে ডাকে। আব্দুর রহিম নামটা কেবল ভোটার লিস্টে আর তার পূর্বেকার বিয়ের কাবিন নামাতেই সীমাবদ্ধ।

মদিনার ইচ্ছে, সোভানকে নিজের পছন্দের কথাটা জানিয়ে তার সম্মতি পেলেই যেমন করে হোক সে মাকে জানাবেই। সোভানের বংশাবলী ভালো। তার সঙ্গে বিয়ের কথায় বাবা মা অমত করবে না কিছুতেই। বাঁধে থাকার সময়ই বাবার মতামত জানতে পেরেছে সে। সোভানও হয়তো তাকে ততটা অপছন্দ করবে না। সেদিন দরজায় দাঁড়ানো তার উদ্বিগ্ন মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছে যে, মদিনার জন্যে তার কিছুটা হলেও মমতা রয়েছে। গুজুর সঙ্গে বিয়ের কথা শুনলে তারও নিশ্চয়ই খারাপ লাগবে। আর তখন সোভানকে বিয়ে করার প্রস্তাবটা জানালে অমত করতে পারবে না।

কিন্তু সোভানকে কথাটা সে জানাবে কি করে? সে যে এখনও সোভানকে একান্তে পায়নি! এরই মধ্যে দরজার কাছে গিয়ে সে ফিরেও এসেছে। দরজার আড়াআড়ি কাঠটা খুলতে গেলে অবশ্যই শব্দ হবে। আর সে শব্দে তার মা জেগে গিয়ে বলবে, ক্যাডা? তাকে বাধ্য হয়েই তখন বলতে হবে, আমি মদিনা। বাইরে যামু! তখন জয়তুন বিবিও তার সঙ্গী হবে।

মদিনা ফের উঠে নিঃশব্দে বন্ধ দরজার কাছে আসে। আস্তে আস্তে আড়কাঠটা আলগাও করে ফেলে। নিঃশ্বাস বন্ধ করে এক প্রান্ত খুলে আরেকটা প্রান্ত আলগা করতে পারলেও অকস্মাৎ সেটা হাত ফসকে নিচে পড়ে যায়। দরজার পাল্লায় আঘাত খেয়ে কাঠের টুকরোটি ভীষণ জোরে শব্দ করে উঠলে জয়তুন বিবি ধড়মড় করে জেগে উঠে বলে, ক্যাডারে? আন্ধারে দরজা খুলে ক্যাডা?

বাধ্য হয়ে মদিনাকে বলতে হয়, আমি! বাইরে যামু!

জয়তুন বিবি বললো, আন্ধাইরে বাইরে যাবি, আমারে ডাক দিবি না?

পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়াতে মদিনার কান্না পায়। রুদ্ধ কণ্ঠে বলে, দরজা খুললে তো অ্যামনেই জাগনা পাইবা! হ্যার লাইগ্যা ডাক দেই নাই!

খাড়া! বাত্তিডা ধরায় লই! আমিও আইতাছি!

এবার মদিনার চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসে। তবু বলে, বাত্তির কাম নাই! বাইরে বার অও!

আলো জ্বালালে চোখের পানি গোপন থাকবে না। আর হঠাৎ করে চোখের পানি রোধ করাটাও কঠিন। তাই সে বারণ করে বাতি জ্বালাতে।

বাইরের প্রয়োজন ছিলো না মদিনার। যেহেতু এ কথা বলেই তার মাকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছে, তাই লোটা হাতে করে সে কিছুটা দূরে গিয়ে অন্ধকারেই শুধুশুধু কিছুক্ষণ বসে থেকে উঠে পড়ে। ফিরে আসার সময় হাত ধোয়। পায়ে পানি ঢেলে প্লাস্টিকের স্যান্ডেলে ছপছপ শব্দ তুলে জয়তুন বিবির হাতে লোটা দিয়ে সে অপেক্ষা করে।

অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মদিনা কাঁদে। কাঁদতে কাঁদতে নানা উপায় অন্বেষণ করে। কিন্তু তেমন কোনো উপায় খুঁজে পায় না। একবার তার ইচ্ছে হয় মায়ের সম্মুখ দিয়েই সে ছুটে যায় সোভানের ঘরে। গিয়ে বলে সব কথা। কিন্তু সোভান যদি তাকে ফিরিয়ে দেয়? মায়ের সামনে মুখ থাকবে না। বাবা কেরামত মেম্বর এ কথা জানতে পেলে লজ্জায় গলায় দড়ি দেয়া ছাড়া পথ থাকবে না। আর যাই হোক, বাবাকে সে কিছুতেই লজ্জায় ফেলতে পারবে না!

।। ৯ ।।

এক পূর্ণিমা গিয়ে পরবর্তী অমাবস্যা চলে এলেও কাজের চাপে সোভান একদিনের সময় নিয়ে বের হতে পারছে না। তার উপর নতুন হ্যান্ড ট্র্যাক্টর দেখে যাদের হালের গরু আছে, তারাও শখে শখে আসছে সোভানের কাছে। শতাংশে পাঁচ টাকা করে নিলেও দামটা বেশি মনে হচ্ছে না কারো কাছে। দিন দিন চাপ কেবল বাড়ছেই। প্রাকৃতিক প্রয়োজন ছাড়া বলতে গেলে আসন থেকে নামছে না সে। সকাল-দু পুরের খাবারটা মমিনা নয়তো কেরামত মেম্বর নিজে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসছে।

একদিন মদিনা বায়না ধরলো যে, হ্যান্ড ট্রাক্টরে কিভাবে জমি চাষ হয় দেখবে। তাই সোভানের জন্যে সেদিনের সকালের খাবারটা যেন মদিনাকে দিয়েই পাঠানো হয়। কিন্তু এ কথা শুনে জয়তুন বিবি বললো, মাশাল্লায় দিলে, তোমার য্যামন রূপ! তার উপরে ক্ষ্যাতের উপরে দিয়া দৌঁড় পারতাছ হেইডা মানষ্যে দেখলে আর বিয়ার কাম লাগবো না! বাকি জীবন ঘরের খুঁডি হইয়াই থাকতে হইবো!

কথায় কথায় মদিনার আগ্রহের কথা কেরামত মেম্বরের কানে উঠলে, পরদিনই বাড়ির লাগোয়া জমিটা চাষের যোগ্য না হলেও সোভানকে বলা হয় তাতে চাষ দিয়ে দিতে। উঠোনে দাঁড়িয়েই যেন মদিনা দেখতে পায় কিভাবে ট্রাক্টর দিয়ে চাষ হয়!

সোভান ট্রাক্টর চালিয়ে জমি চাষ দিলেও মদিনা তা দেখার উৎসাহ পায় না। পুনরায় তার পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যায় দেখে ভীষণ কান্না পায়। আর কান্না লুকোতে অকস্মাৎ চোখে কী একটা উড়ে আসার ছুতোয় সে মুখ ঢেকে ঘরের ভেতর গিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে।

মমিনা এসে বলে, বুবু, তোমার চোহে কি পড়ছে দেহি?

মদিনার দু চোখ বেয়ে পানি পড়ে। কিন্তু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেও মদিনার দু চোখে কোনো ময়লা বা পোকা আবিষ্কার করতে পারে না মমিনা। সে বুঝতে পারে না, এক চোখে কিছু একটা উড়ে এসে পড়লে দু চোখ দিয়ে কেন পানি পড়বে? শেষটায় বিজ্ঞের মত মাথা নেড়ে সে জানায়, তোমার চোহে মনে কয় বাতাস লাগছে!

মদিনার কান্না আরো বেগবান হলেও সে শব্দ করে কাঁদে না। অবিরাম চোখ দিয়ে পানি পড়তেই থাকে।

সোভান কেরামত মেম্বরের জমি চাষ দেয়া শেষ করতেই ছুটে আসে কফিল মৃধা। তার জমির জো চলে যাচ্ছে। আজ চাষ না দিলে আর পরে সুযোগ আসবে না। সোভান ট্রাক্টর বন্ধ না করেই সেখান থেকে চলে যায় কফিল মৃধার জমিতে। যে কারণে মদিনার চোখে বাতাস লাগার খবর তার কর্ণগোচর হয় না।

প্রতিদিন কাজ শেষে সন্ধ্যার দিকে ট্রাক্টরের ইঞ্জিনে ভটভট শব্দ তুলে সোভান যখন ফিরে আসে। জায়গা মত ট্রাক্টরটাকে রেখে বড়সড় পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেয়। ঘর থেকে লুঙ্গি নিয়ে পুকুরের দিকে যায়। গাও-গোসল দিয়ে উঠোনের দড়িতে ভেজা লুঙ্গি-গামছা মেলে দেয়। সবই ঘরের ভেতর থেকে মদিনা লক্ষ্য করে। বাতাস লাগার পর থেকে সে খুব একটা বাইরে বের হয় না। সংসারের কোনো কাজে হাত দেয় না। গোও-গোসল দেয় না ঠিকমত। মাথায় তেল দিয়ে রঙিন ফিতেয় চুল বাঁধে না। মমিনার আলতা লিপস্টিক কেড়ে নিয়ে নিজেকে সাজাতে বসে না।

কয়েকদিন মদিনাকে দেখতে না পেয়ে সোভান মমিনাকে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করে, তোমার বুবু কি বাইত্যে নাই? কই গেছে নাহি?

মমিনা সে কথার জবাব না দিয়ে বলে, আমাগো গ্যারামে ইস্কুল হইতাছে, জানো?

তাতো কবেই হুনছি!

মমিনা কলকণ্ঠে বলে, বাজান কইছে আমারে ইস্কুলে পড়াইবো!

এইডা তো খুব ভালা কথা! তুমি ইস্কুল পাশ দিয়া কলেজে পড়বা। কলেজ পাশ দিলে শহরের ইনবার্সিটিতে পড়বা! তোমার কত বিদ্যা আর জ্ঞান হইবো! আমরা তহন তোমার লগে কথা কইতে ডরামু!

মমিনা অবাক হয়ে বললো, ডরাইবা ক্যান?

বিদ্বান মানষ্যের লগে কথা কওনের অনেক বিপদ! কোন কথায় কি ভুল হইয়া যায়, হেই ডরে মানুষ বিদ্বান মানষ্যের লগে কথা কয় কম!

সোভানের কথাগুলো খুবই ভালো লাগে মমিনার। বিদ্বান মানুষ অনেক সন্মানও পায়। সুবল বিচ্চির লগে মানষ্যে জোরে গলা উঁচা কইরা কথা কয় না। বুড়ারাও তারে আপনে আপনে কইরা কথা কয়।

এদিকে মদিনা ঘরের ভেতর থেকে জানালা দিয়ে হাতছানি দিয়ে সোভানকে ডাকলেও সোভানের দৃষ্টি সেদিকে পতিত হয় না। অভিমানে মদিনার বুক ভরে যায়। হঠাৎ করেই সে জানালার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে পাশ ফিরে শোয়। মনে মনে খুব কষ্ট পেলেও কেন যেন তার চোখ দিয়ে পানি বের হয় না। চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠতে থাকে। চোখ দু টোয় কেমন আগুন ছুঁয়ে যায়।

কুটিলা গ্রামের সব জমি চাষ হয়ে গেলেও সোভানের কাজ বন্ধ হয় না। প্রতিদিনই আশপাশের গ্রামগুলো থেকে দু একটি করে বায়না থাকছে। সকালের দিকে কাজ সেরে হাত-পা ধুয়ে জিরিয়ে নিয়ে কখনো কটা মুড়ি বা চিড়া, কখনো বা দু একটি পিঠা খেয়েই কেরামত মেম্বরের সঙ্গে ছুটে যায় ক্ষেতে। সেখান থেকে ফিরে এসে গাও গোসল দিয়ে খাওয়ার পর লম্বা ঘুমে পার করে দেয় দু পুর। বিকেলের দিকে উঠে মেম্বর বা কখনো চেয়ারম্যানের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে স্কুলের জন্য চাঁদা তুলতে। সবাই কমবেশি দেয়। সব চেয়ে গরিব বা হত দরিদ্র যেই রঙ্গি বুড়ি, সেও কিছু দান করার ক্ষমতা না থাকলেও এক হালি হাঁসের ডিম দেয় স্কুল ফান্ডে। খবরটা যেন মুহূর্তেই ছড়িয়ে যায় আশপাশের গ্রামে। কিছুক্ষণ পরই ছুটে আসেন সিদ্ধেশ্বরী গ্রামের আমিন বয়াতি। বয়সের কারণে অনেকদিন হয় গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি এসেই বললেন, চেয়ারম্যান, ইস্কুল ফান্ডের ডিম কার কাছে?

সোভান তার হাতের ছোট্ট বেতের ঝুড়িটি দেখিয়ে বলে, এহানে আছে!

ডিমের দাম কত?

এক হালি ডিম কত আর? তিন-চাইর ট্যাকা হইবো!

আমার পোলা করিম দ্যাওয়ান এক হাজার ট্যাকা পাডাইছে ইস্কুলের নামে! আমারে দিছে পাঁচ শ! আমি ঠিক করছি আমার পাঁচ শ ট্যাকা দিয়া ডিম চাইরডা কিনমু! মসজিদে শিন্নি দিমু!

চেয়ারম্যান হরি দাস কিছুটা রাগত স্বরে বললো, বয়াতি, ট্যাকার গরম দেখাইও না!

আমিন বয়াতি হরি দাসের কথায় ক্ষেপে উঠে বললেন, আরে হরি দাস, তুই ট্যাকাডাই দেখলি? ইস্কুল ফান্ডে যে ফকিন্নির দান পড়ছে হেইডার দাম দেখলি না?

খারাপ হলেও বিচক্ষণ মানুষ হরি দাস। বললো, তাইলে আমি কিনমু হাজার ট্যাকায়। তিনশ ষাইট দেব-দেবীরে ভোগ দিমু!

আমিন বয়াতি খুশি হয়ে বললেন, তাইলে দে! তাও দামী জিনিসের উপযুক্ত দাম দে! আমার সামর্থ্য থাকলে তর থাইক্যা আরো বেশি দিতাম!

হরি দাস হেসে উঠে বললো, আমরা পাইছি উপযুক্ত দাম! গুরু তোমারে করি প্রণাম! এই বলে, হরি দাস সত্যি সত্যিই জোড় হাতে আমিন বয়াতির সামনে প্রণত হয়।

সবাই ধন্য ধন্য করে হরি দাসকে।

স্কুল ফান্ডে ডিম দেবার সংবাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে, হাঁস-মুরগি-কবুতর, ছাগল, এমনকি ধান-চাল-কলাইও মানুষ যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী দিতে থাকে। সে দান সামগ্রী বিক্রির জন্যে আবার সপ্তাহে দু দিন শনি আর মঙ্গলবার প্রস্তাবিত স্কুলের জমিতে হাট বসতে লাগলো।

নতুন হাটের কথা জানতে পেরে মানুষ দূর-দূরান্ত থেকেও তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী বেচা-কেনার জন্যে আসতে লাগলো। ফলে, জায়গাটির একটি নতুন নামও লোক মুখে প্রচার হয়ে গেল। আর তা হলো বিদ্যার হাট। এভাবে মাত্র তিনমাসের ভেতর স্কুলের জন্য করিম বক্সের জমির দাম পরিশোধ করেও অনেক টাকা বেঁচে যাওয়াতে সরকারি অনুদান টিনের ঘরের থাকলেও দেয়াল ঘেরা স্কুল ঘর তৈরি হয়ে যায়। পরবর্তী মাসে স্কুল কমিটির বৈঠক বসার আগেই বিদ্যার হাট প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কমিটির নামে সরকারি চিঠি আসে।

।। ১০ ।।

স্কুলের কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে কেরামত মেম্বর যেমন নিজের স্ত্রী-সন্তানের দিকে দৃষ্টি দিতে পারেনি। তেমনি সোভানও ভুলে গিয়েছিলো জাহেদার কথা। হঠাৎ অবসর পেতেই তার মনে পড়লো জাহেদার কথা। জয়নালের কথা। কিন্তু একে ওকে জিজ্ঞেস করেও জয়নালের কোনো সন্ধান পায় না সোভান।

ব্যর্থ মনোরথ হয়ে কেরামত মেম্বরের বাড়িতে ফিরে এলে সোভান শুনতে পায় যে, মদিনার শ্বাস-কষ্ট হচ্ছে! সে ছুটে গেলেও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বিছানার সঙ্গে প্রায় লেপটে থাকা মদিনার দিকে। কিন্তু ঘনঘন আর দীর্ঘশ্বাস টানার ফলে মদিনার বুক হাপরের মত উঠানামা করলেও চোখ দুটো বিস্ময়কর উজ্জ্বলতায় তাকিয়ে থাকে সোভানের মুখের দিকে।

সোভানের কাছে অকস্মাৎ সে দৃষ্টির অর্থ দিনের উজ্জ্বল আলোকের মতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লহমায় সে পড়ে ফেলে মদিনার মনের অব্যক্ত বাসনা। তখন যে হঠাৎ তার কি হয়। কেমন উদভ্রান্তের মত অন্যান্য বাড়ির মেয়েদের ভিড় ঠেলে ছুটে গিয়ে সে মদিনার পাশে বসে একটি হাত নিজের দু হাতে মুঠো বন্দী করে বলে, তোমার কি হইছে মদিনা? কেউ তো আমারে একবার কয় নাই তোমার অ্যামন অবস্থা!

সোভান খুব ভালো করেই চেনে এ রোগের লক্ষণ। রোগ কতটা গাঢ় হলে এমন ধরনের লক্ষণ পরিস্ফুট হয়ে ওঠে দীর্ঘ দিন ধরে আউয়াল ডাক্তারের সঙ্গে থেকে তারও অভিজ্ঞতা কম হয়নি।

মদিনার চোখ-মুখ আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠলেও দু চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে সঙ্গে হাপরের মত বুকের উঠানামাও বাড়তে থাকে। দু চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে সোভান আর্ত কণ্ঠে হঠাৎ চিৎকার করে বলে, তারপিন ত্যাল আনেন!

সোভানের আর্ত চিৎকার শুনতে পেয়ে জয়তুন বিবি ছুটে যায় তারপিন তেলের শিশি আনতে। কিন্তু দীর্ঘদিন অব্যবহারের ফলে শিশির তেল উবে গিয়ে শূন্য হয়ে আছে।

মমিনা বুদ্ধিমতী মেয়ে। শূন্য শিশি হাতে মায়ের বিভ্রান্ত চেহারা দেখতে পেয়ে মুহূর্তেই নিজের কর্তব্য স্থির করে ছুটে যায় রবিয়াদের বাড়িতে। তার দাদি কোমরের ব্যথায় প্রায়ই কাঁদেন বলে, রবিয়ার মা শাশুড়ির কোমরে তারপিন তেল ডলে দিয়ে কাপড় গরম করে সেঁক দিয়ে দেয়। মমিনা জানে সে শিশি কোথায় থাকে।

সে একছুটে গিয়ে কাউকে কিছু না বলেই তারপিন তেলের শিশি হাতে নিয়ে ফিরে আসে। ব্যাপারটা রবিয়ার চোখে পড়লে, চোর-চোর বলে, সে ছুটে আসে মমিনার পিছু পিছু। কিন্তু মদিনাকে কেন্দ্র করে মানুষের জটলা আপাতত তাকে নীরব থাকতে বাধ্য করে। সে বুঝতে পারে না এ সময় তার কি করা উচিত।

মমিনা তারপিন তেলের শিশি এগিয়ে দিলে সোভান হাতে তেল ঢেলে নিয়ে মদিনার ব্লাউজের নিচে হাত ঢুকিয়ে দেয়। তেল ডলে। ব্যাপারটা গ্রামবাসীর কাছে এক অর্থে গর্হিত হলেও এ মুহূর্তে কারো মনে কোনো প্রশ্ন বা কারো দৃষ্টিতে বিস্ময় জাগে না। ব্যাপারটা যেন এমনই হবার কথা ছিলো।

দীর্ঘক্ষণ মদিনার বুকে তারপিন তেল ডলার ফলে তার শ্বাস-প্রশ্বাসও স্বাভাবিক হয়ে আসে। সোভান মদিনার বুক থেকে হাত সরিয়ে আনতে নিলে দু হাতে সে হাত আঁকড়ে ধরে মদিনা। সোভানও জোর করে না। কিন্তু এভাবে সে সহজও হতে পারছিলো না। তাই মাথা নিচু করে চুপ চাপ মদিনার পাশে বসে থাকে।

আস্তে-ধীরে ভিড় পাতলা হয়ে যেতে থাকে। কৌতূহলী মেয়েরা চলে যেতে থাকে তাদের যার যার ঘরে। যেতে যেতে কেউ একজন বলে, ছ্যারায় সত্যই কম্পেন্ডার! রুগী মাইয়া মানুষ মনে কইরা শরম পাইলে মদিনারে আইজই কবর দিতে হইতো!

জয়তুন বিবি সোভানকে কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে ফিরে তাকাতেই দেখতে পায় তার কন্যা সোভানের দু হাত আঁকড়ে ধরে রেখেছে। ব্যাপারটা কতটুকু স্বাভাবিক বা কতটা লজ্জাকর তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে চুপচাপ উঠে গেল সে। কিন্তু মমিনা ঠিকই বসে আছে তার বুবুর মাথায় হাত দিয়ে।

সোভান বললো, তোমার অ্যামনডা ক্যামনে হইলো মদিনা?

মদিনা কোনো জবাব না দিয়ে চোখ বোঁজে। কিন্তু তার বন্ধ চোখের দু পাশ দিয়ে আবার পানি গড়িয়ে পড়ে। একি প্রাপ্তির আনন্দ? নাকি মরণের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে আসার আনন্দ?

সোভান ভাবে যে, এমনটা তো দু একদিনে হয়নি। মদিনা যে তিলে তিলে নিজকে মরণের দ্বার প্রান্তে নিয়ে গিয়ে উপস্থিত করেছে, তা কি কারো চোখে পড়লো না? জয়তুন বিবি কেমন মা? তার কি একবারও চোখে পড়লো না আত্মজার আত্মহননের পথে নিঃশব্দ যাত্রাটুকু?

সোভান মুক্ত হাতে মদিনার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলে, আর ডর নাই! আমি জানি ক্ষয়কাশের ওষুধ!

কেরামত মেম্বর ঘরে আসতেই মদিনা সোভানের হাতটা ছেড়ে দিলে, সোভান আঁচল দিয়ে মদিনার বুকটা ঢেকে দেয়।

কেরামত মেম্বর কেমন গম্ভীর কণ্ঠে বলে, আমার মায়ের ক্ষয়কাশ ক্যামনে হইলো? কবে হইলো? আমরা কি কেউ বাইত্যে আছিলাম না?

তারপরই দু হাতে মুখ ঢেকে মেঝের উপর বসে ডুকরে কেঁদে উঠলো কেরামত মেম্বর।

সোভান মদিনার বিছানা থেকে নেমে কেরামত মেম্বরের কাঁধে হাত রেখে বললো,কাকা, এই রোগের সব ওষুধ আমি জানি! রুগীরে অহন গরম দু ধ খাইতে দিলে ভালা হইবো!

সোভান দরজার দিকে এগোলে কেরামত মেম্বর উঠে সোভানের একটি বাহু ধরে বললো, তুই কই যাস বাজান?

থানা হাসপাতালে!

আমার মায় বাঁচবো তো?

আল্লার কাছে দোয়া করেন!

তারপরই সোভান নিজের ঘরে এসে নতুন কেনা শার্টটা গায়ে চড়িয়ে দ্রুত হাঁটতে থাকে। একবার মাথা তুলে সূর্যের দিকে তাকিয়ে সময় পরিমাপ করে। তারপর ভাবে যে, এখনও তাড়াতাড়ি পৌঁছুতে পারলে হাসপাতালের ডাক্তারকে হয়তো পাওয়া যাবে।

।। ১১ ।।

ঘরের অন্যান্য সদস্যদের নিরাপত্তার কারণে মদিনার থাকার জায়গা হলো সোভানের বিছানায়। একটি ঘরে দু টি অবিবাহিত যুবক যুবতী থাকবে, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বেশি জোরদার হতে পারলো না। কারণ মদিনা যুবতী হলেও সে ক্ষয়-কাশের রুগী। আর সোভান যুবক হলেও কম্পেন্ডার হিসেবে ভালো। মদিনার চিকিৎসা তার চেয়ে ভালো কেরামত মেম্বর বা জয়তুন বিবিরা বুঝতে পারবে না। আপাতত দু জনেই এবং কেরামত মেম্বর সমাজের বাঁকা চোখটির দৃষ্টিতে বিদ্ধ হলেও কেউ তেমন কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করছে না। তবে লক্ষ্য রয়েছে যে, শেষাবধি অবস্থা কোন দিকে গড়ায়! কারণ সবচেয়ে বড় কথা হলো যে, যুবতীটি ক্ষয়কাশে আক্রান্ত। বাঁচে না মরে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই!

মদিনা সোভানের বিছানায় শুলেও সোভান পাশেই আরো ইট বিছিয়ে শোবার জন্য আরেকটি জায়গা করে নিয়েছে। রাতের বেলা ওষুধ খাওয়ানোর সময় সোভান অনুভব করে যে, দেখতে এমন কুৎসিত মেয়েটির জন্যে তার বুকে এত ভালবাসা আর মমতা সঞ্চিত হয়েছিলো তা কি সে নিজেই টের পেয়েছে কখনো? আর ভালবাসা ব্যাপারটা কি এমনই এক মারাত্মক বিষ যে, তাতে আক্রান্ত হয়ে বেদনায় নীল হয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কেউ অনুভব করতে পারে না? আর যখন বুঝতে পারে যে সে বিষে আক্রান্ত, তখন ভালবাসায় সমাহিত হওয়া ছাড়া তার জন্যে কোনো পথও খোলা থাকে না।

প্রতিদিন দু বেলা কার্বলিক অ্যাসিড মেশানো গরম পানি দিয়ে মদিনাকে গোসল করায় সোভান। কাপড় পাল্টানো থেকে আরম্ভ করে কাপড় ধোয়া, চুল মুছে তেল দিয়ে আঁচড়িয়ে ফিতে দিয়ে চুল বেঁধে দেয়া, তিন বেলা নিজের হাতে খাওয়ানো সবই করে সে। ঘরের পাশেই নিরাপদ স্যানিটারি ব্যবস্থা করে দিয়েছে। প্রাকৃতিক প্রয়োজনে সোভানের কাঁধে ভর দিয়ে কাজ সেরে ফিরে আসে মদিনা। ব্যাপারটা দেখলে যে কেউ বলবে যে, জন্ম-জন্মান্তরের জন্যেই যেন একে অন্যের জন্য সৃষ্টি হয়েছে।

সোভান তার ঘরে মদিনার বাবা-মা-বোন, পাড়া-প্রতিবেশী কাউকেই উঁকি মারতেও দেয় না। বলে, এই রোগ যারে সামনে পায় তারেই ধরে! তাই পারতপক্ষে এ ঘরের ধারে কাছেও কেউ আসে না। ওরা সোভানকেও যেন কিছুটা এড়িয়ে চলে। তবু জয়তুন বিবি বলে, বাজান, আমার মাইয়ার লাইগ্যা না তর আবার কোনো সর্বনাশ হয়!

সোভান হেসে জানায়, আমার ডর নাই! আমি তো জানি ক্যামনে এই রোগের বীজ থাইক্যা নিজেরে বাঁচাইতে হয়!

তবু জয়তুন বিবির মন থেকে আশঙ্কার মেঘ কাটে না। পরের ছেলে হলেও সোভানের জন্যে ইদানীং তার মনে ভেতর স্নেহ আর মমতা দু টোই উথলে ওঠে। তার প্রথম সন্তানটি ছেলে ছিলো। সকালের দিকে জন্ম নিলেও বিকেলের দিকে কোনো অজ্ঞাত কারণে তার বুকের ভেতরই মরে শক্ত হয়েছিলো। কবর দেবার আগে মসজিদের ইমাম সাহেব বলেছিলেন, পোলাপান মইরা গেলেও তাগ নাম রাখন লাগে!

জয়তুন বিবি অসুস্থ শরীরে মৃত ছেলেকে স্বামীর কোলে তুলে দেবার সময় আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলো, অ্যার নাম রাজা রাইখ্যেন!

তাই মাঝে মাঝে সোভানের মুখে যেন সে তার মৃত ছেলে রাজার আদলই খুঁজে পায়। রাজা বেঁচে থাকলেও আজ নিশ্চয়ই সোভানের মতই জোয়ান আর বলিষ্ঠ হতো। দু জনের রাতের খাবার নিয়ে জয়তুন বিবি সোভানের ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে বলে, সোভান!

সোভান দরজায় মুখ বাড়িয়ে দেখে। খাবারে বাটি, সানকি দেখে হাত পেতে নেয়।

জয়তুন বিবি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলে, মাইয়ার অবস্থা কি?

কোনো চিন্তা কইরেন না কাকি! চিকিসসা শুরু হইছে! আল্লায় দিলে ভালাও হইবো!

জয়তুন বিবির বিশ্বাস হয় সোভানের কথাগুলো। মনে যেন বল ফিরে পায় অনেকটা। তবু বলে, নিজের দিগেও দেহিস বাজান!

সোভান নিঃশব্দে হাসে। কিন্তু কিছু বলে না।

জয়তুন বিবি বাইরে দাঁড়িয়ে বিছানায় শোয়া মদিনার দিকে তাকিয়ে থাকে অপলক। হঠাৎ করেই অকারণের তার দু চোখ বেয়ে পানি পড়তে থাকে। সে আর দাঁড়ায় না। অন্ধকারেই ফিরে যায় নিজের ঘরে।

সোভান খাবারের সানকিতে মুরগির বাচ্চার ঝোল দিয়ে ভাত মাখিয়ে মদিনাকে বলে, খাইয়া লও তাড়াতাড়ি! ওষুধ খাওনের সময় হইছে!

মদিনা মাথা নাড়ে। বলে, তুমি আগে খাইয়া লও! আমারে খাওয়াইয়া হেই হাতে তুমি আবার খাইবা, বিপদ হইতে কতক্ষণ?

সোভান ভাতের গ্রাস মদিনার মুখের সামনে ধরে বলে, আমারে অ্যাত পাগল মনে কইরো না! তোমারে খাওয়াইয়া দুই হাত আর মুখ ডেটল দিয়া ধুইয়া তার বাদে খাইতে বমু!

দুর্বল কণ্ঠে তবু প্রকাশ হয়ে পড়ে মদিনার ঝগড়াটে স্বভাব। বলে, কাইল দেখলাম, অ্যামনেই খাইলা!

গতকাল এতটা সাবধান হতে পারেনি সে। ক্ষুধা ছিলো প্রচণ্ড। তাই ডেটল মেশানো পানি দিয়ে হাত ধোওয়ার সময় পায়নি। ক্ষুধার কাছে সব কিছুই হার মানতে বাধ্য হয়। বললো, আমার ডরের কিছু নাই। তোমার ওষুধ আনতে যাইয়া আমি টিকা লইয়া আইছি!

টিকা জিনিসটা কি মদিনা বুঝতে না পারলেও পাল্টা কোনো প্রশ্ন করে না। নীরবে হা করলে সোভান তার মুখে ভাতের গ্রাস তুলে দেয়। খাওয়ার সময় কেমন অদ্ভুত ভাবে সে তাকিয়ে থাকে সোভানের দিকে। তখন মনে পড়ে, বাঁধে থাকার সময় কতই না তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছে এই মানুষটিকে। ভেবেছিলো হত দরিদ্র মানুষ সোভান খুব অল্পতেই বশ মানবে। কেরামত মেম্বরের সম্পদের আশায় পায়ের কাছে বসে বসে লেজ নাড়বে। আসলে ভাত ছিটালেও সব কাক কিন্তু এগিয়ে আসে না। সোভান বড় মনের মানুষ বলে তার দুর্ব্যবহার মনে রাখেনি। আর মনে রাখলেও হয়তো তা নিয়ে ততটা মাথা ঘামায় না। সোভান যদি সেদিনের কথায় রাগ করে দূরে কোথাও চলে যেতো, তাহলে তার এ অবস্থায় আর কে এমন করে এগিয়ে আসতো? আর এ সমস্ত কথা মনে হতেই অনুতাপানলে দগ্ধ হতে থাকে সে। তার বুক ফেটে কান্না আসে। দু চোখ বেয়ে পানি পড়তে থাকলে সোভান বলে,আবার কান্দনের কি হইলো?

মদিনা সোভানের হাতটি দু হাতে ধরে বলে, বান্ধে থাকতে তোমারে কত রহমের কথা কইছি! আমি জানি, তুমি অনেক দুঃখ পাইছ! আমি কিন্তু বুইজ্যা তোমারে অত কথা কই নাই! তুমি আমারে মাপ কইরা দিও!

সোভান আরেকটি গ্রাস মদিনার মুখে তুলে দিয়ে বলে, যদি মইরা যাও তাইলে মাপ কইরা দিমু! কিন্তু রুগী হইয়া বাঁইচ্যা থাকলে মাপ নাই!

মদিনা বুঝতে পারে যে, এগুলো সোভানের রাগের কথা না। তার প্রতিটি স্পর্শেই সে অনুভব করে তার হৃদয়ে উথলে উঠা ভালবাসার রঙিন বুদবুদ। তাই বলে, তাইলে কি আমারে মরতেই হইবো?

না মইরা আরেকটা কাম করতে পার!

কি কাম করতে হইবো?

প্যাট ভইরা ঠিকমতন খাওন-দাওন কর। ওষুধ বড়ি খাও ঠিক মতন। যেদিন ডাক্তারে কইবো যে, ক্ষয়কাশ ভালা হইছে, হেই দিন মাপ পাইবা!

মদিনা খেতে খেতে এক হাত সোভানের উরুতে ফেলে রাখে। এটাই তার স্বস্তির! এটাই তার আনন্দের!

সেদিন সকালের দিকে মদিনাকে গোসল করিয়ে চুল মুছে দিচ্ছিলো সোভান। হঠাৎ গামছাটি টেনে নিয়ে মদিনা বললো, থাউক! আমিই মুছতে পারমু! বলে, সে নিজে নিজেই মাথা মোছে।

সোভান কেমন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মদিনার দিকে। তাকিয়ে দেখে মৃত্যুর হিম-শীতল কঠিন গহ্বর থেকে একটি মেয়ের উচ্ছল জীবনের দিকে উত্তরণ। মদিনা ভালো হয়ে যাচ্ছে। ফিরে আসছে তার শরীরের হৃত বল।

তারপর সে বললো, নিজে নিজে মাথা মুছতে পারলে কাপড়ও নিজে নিজে পিনতে পারবা!

মদিনা সলাজ হাসিতে মুখ উদ্ভাসিত করে বলে, না! এইডা খুবই কষ্টের। অহনই নিজে নিজে কাপড় পিনতে পারমু না! বলে, গামছা ফিরিয়ে দিয়ে কেমন যেন লম্বা লম্বা শ্বাস ফেলে সে।

আসলে প্রতিদিন খাওয়ার সময় আর গোসলের পর কাপড় পরানোর সময়টার জন্যে সে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। বিশেষ করে কাপড় খুলে পাল্টানোর সময় সোভানের চোখ বন্ধ করে রাখাটা তার কাছে খুব বেশি মজার বলে মনে হয়। যদিও সোভান তার বেআব্রু শরীরের দিকে দু চোখ মেলে তাকানোর অধিকার আগেই পেয়ে গেছে, তবু এ সময়টা সে চোখ বন্ধ করে রাখবেই। তাই আরো বেশি ভালো লাগে মদিনার। ভালো লাগে একজন যুবকের নিজের কাছে নিজকে সৎ রাখার চেষ্টা। একজন বেআব্রু যুবতীর দুর্বলতার সুযোগেও নিজকে নির্লোভ রাখার প্রচেষ্টা।

প্রাথমিক ভাবে তিন মাসের জন্য ওষুধ দেয়া হলেও মাস দেড়েকের মাথায় মদিনা নিজে নিজেই সব করতে পারে। অসুস্থতা জনিত দুর্বলতা কিছুটা থাকলেও সে সোভানের ঘর থেকে ফিরে যেতে উৎসাহ বোধ করে না। মাঝে মাঝে রাতের বেলা সোভানের ঘুম ভেঙে গেলে আবিষ্কার করে যে মদিনা ঘুমুচ্ছে তার বুকের ভেতর। সে সময়টা তার ভীষণ কষ্ট হয়। কষ্টে কষ্টে নিজকে আরো বিশুদ্ধ করে তোলার আপ্রাণ প্রয়াসে লিপ্ত হয়। যদিও আজকাল মদিনার হাব ভাবে এটি স্পষ্ট যে, সে যদি সীমা অতিক্রম করেও যায় তো তার জন্যে কোনো কিছু বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। কিন্তু একজন বিশুদ্ধ মানুষ সহসা নিজকে অশুদ্ধতার পাঁকে নিমজ্জিত করতে সাহস পায় না। সাহস পায় না, যে কঠিন সাধনায় নিজকে শুদ্ধতার সীমায় টেনে এনেছে, সেখান থেকে বিচ্যুত হতে। সে প্রতীক্ষা করে সে দিনটির জন্য। যে দিনটি তার জন্যে সত্যি সত্যিই বয়ে নিয়ে আসবে আরো নির্মলতা। আরো আনন্দ!

একদিন সোভান বললো, ওষুধ তো সব শ্যাষ! লও শহরের বড় ডাক্তার দিয়া তোমার রোগ পরীক্ষা করাইয়া আনি!

মদিনা ঝলমল করে উঠে বললো, সবডাইত্ত তুমি করলা। এইটুক আর বাকি থাহে ক্যান?

সোভান হেসে বলে, আমি যে কম্পেন্ডার!

কেরামত মেম্বর আর জয়তুন বিবির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দু জনে শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলে বাড়ি থেকে বোরোবার মুখেই রহিমার সঙ্গে দেখা হয়।

সোভানের সঙ্গে মদিনাকে দেখে কিছুটা ক্ষুব্ধ হলেও রহিমা জিজ্ঞেস করে, লগে এইডা কে? তুই কই যাস?

মদিনা গোমড়া মুখে জানায়। আমার ক্ষয়কাশ! শহরে বড় ডাক্তরের কাছে যাইতাছি!

রহিমা ত্রস্তে বাড়ির ভিতর ঢুকে জয়তুন বিবিকে বললো, বুবু, তর মাইয়ার ক্ষয়কাশ আগে কইলি না?

জয়তুন বিবি নির্ভার মনে বলে, হ্যার লাইগ্যাইত্ত তর ভাইসাব তারিখ দিতে যায় নাই!

রহিমা চোখে মুখে আতঙ্ক ফুটিয়ে বলে, কী সব্বনাশের কথা! ক্ষয়কাশের রুগীর লগে আমার গুজুর বিয়া দিমু না!

পোলা তর! ক্যামন মাইয়া বিয়া করাবি তুই বুঝস!

ক্ষয়কাশ খুব খারাপ রোগ! এক বাইত্যে হইলে সব বাইত্যে অ্যার বীজ ছড়ায়! তাই রহিমা সংক্রমণের ভয়ে এমন  খারাপ রুগীর বাড়িতে দেরি করাটা নিরাপদ মনে করে না। সে উঠে বলে, আমি যাই! আরেকদিন আমু!

ব্যস্ত পায়ে ত্রস্ত রহিমার বেরিয়ে যাওয়া দেখে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে একা একা হাসতে থাকে জয়তুন বিবি।

।। ১২ ।।

জেল থেকে ছাড়া পেয়েই আউয়াল ডাক্তার সোভানের খোঁজ করতে করতে কেরামত মেম্বরের বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়।

লোক মুখে বা সোভানের মুখে আউয়াল ডাক্তারের নাম শুনলেও তাকে কখনো দেখেনি কেরামত মেম্বর। তাই নিজের বাড়িতে তাকে দেখতে পেলেও সে চিনতে না পেরে বলে, ভাই সাবরে তো চিনতে পারলাম না!

আপনে কেরামত মেম্বর?

কেরামত মেম্বর কিছুটা লজ্জিত ভাবে হেসে উঠে বলে, আমি মেম্বর না। মানষ্যে অ্যামনেই মেম্বর কয়!

মেম্বর তো মানষ্যেই বানায়, নাকি?

কেরামত মেম্বর হাসে। আউয়াল ডাক্তার বলে, আমি আউয়াল। ডাক্তারি করতাম। রুগী মইরা গেছে দেইখ্যা আমারে জেলে ঢুকাইছিলো! গতকাইলই ছাড়া পাইলাম!

পরিচয় পেয়ে হাত ধরে আউয়াল ডাক্তারকে ঘরে এনে বসায় কেরামত মেম্বর।

হুনলাম সোভান আপনের বাইত্যেই আছে! বলে, আউয়াল ডাক্তার কেরামত মেম্বরের মুখের দিকে তাকায়। হ্যারে ট্রাক্টার কিন্যা দিছেন। বাইত্যে থাকতে দিছেন! খুশি হইছি! আমি জেলে থাইক্যা খুবই চিন্তায় আছিলাম! হ্যায় কি বাইত্যে নাই?

আমার বড় মাইয়াডারে লইয়া শহরের ডাক্তরের কাছে গ্যাছে!

মাইয়ার হইছে কি?

ক্ষয়কাশ!

এইডা একটা অসুখ হইলোনি! আউয়াল ডাক্তারের চোখেমুখে তাচ্ছিল্য ফুটে ওঠে। সোভান তো জানে এই ওষুধ!

কেরামত মেম্বরের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। হ! থানা হাসপাতাল থাইক্যা ওষুধ বড়ি আইন্যা দিছে। পুরা দেড়ডা মাস দিন রাইত খাইট্যা মাইয়াডারে খাড়া করছে! আমি তো মনে বুঝছিলাম মাইয়া আমার বাঁচবো না! আইজগা শহরে গেছে পরীক্ষা করানের লাইগ্যা!

এইডাইত্ত উচিত! বলে মাথা দোলায় আউয়াল ডাক্তার।

অহন কি আবার ডাক্তরি শুরু করবেন?

নাহ! বলে, মাথা দোলায় আউয়াল ডাক্তার।

তারপর বলে, কান ধইরা মনে মনে তবা করছি! মানুষ খুবই খারাপ! রুগী মইরা যাইতাছে, তারে আইন্যা কয় চিকিসসা কর! আরে, যেই রুগী বাইত্যে থাকতেই তিনভাগ মইরা গ্যাছে, তারে চিকিসসা করলে কি বাঁচে?

কেরামত মেম্বর বলে, সোভানরে বিচরাইতে আইছেন! তারে লইয়া আবার কিছু করতে চান নাহি?

একটা কিছু তো করতে হইবো! সোভানরে পাইলেও না হয় বুদ্ধি পরামর্শ কিছু করতাম!

কেরামত মেম্বর উঠে দরজার কাছে গিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলে, হুনছে? ম্যামানরে খালি মোহে কতক্ষণ রাখমু?

এ কথা শুনেই আউয়াল ডাক্তার উঠে পড়ে বলে, ঝামেলা কইরেন না! আমি অহনও বাইত্যে যাই নাই! ঘুরাঘুরির  মইদ্যেই আছি!

কিছু মুহে দিলেন না, এইডা কি হইলো?

সোভানরে যে, মায়া কইরা নিজের বাইত্যে রাখছেন এইডা দেইখ্যাই মনে অনেক শান্তি পাইছি! বাপ-মা মরা পোলাডা ছোডকাল থাইক্যাই আমার লগে আছিলো। জেলে থাইক্যা চিন্তা করছি, ছ্যারায় ক্যামনে চলবো, কি কইরা খাইবো?

তারপর সে কেরামত মেম্বরের হাত ধরে বললো, ভাইসাব! বড় খুশি হইছি! পোলাডা অনেক ভালা! বড় বংশের। আপন করতে পারলে ঠকবেন না!

কেরামত মেম্বরের বুকটা ভরে ওঠে যেন।

যাই ভাইসাব! বলে, আউয়াল ডাক্তার বেরিয়ে দ্রুত পদক্ষেপে বাড়ি থেকে নেমে পড়ে।

তখনই জয়তুন বিবি এগিয়ে এসে কপালে ভাঁজ ফেলে বলে, দিন দিন আপনের বুদ্ধি কি কমতাছে?

কেরামত মেম্বর জয়তুন বিবির মুখে এমন এক কথা শুনে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো। বিয়ের পর থেকে যে আজ পর্যন্ত কোনো কথার প্রতিবাদ করেনি। গলা উঁচিয়ে কোনো কথা বলেনি। তার মুখে এমন কথা অবশ্যই হতবাক হওয়ার মতই বটে! তা ছাড়া এ তল্লাটে তার বুদ্ধি বিবেচনা নিয়ে এ পর্যন্ত কেউ কোনো অভিযোগ তোলেনি। আর ঘরের সব চেয়ে নীরব মানুষ জয়তুন বিবিই সরব হয়ে উঠেছে! কী এমন নির্বুদ্ধিতার কাজটা সে করে ফেললো? তাই সে ভাবছিলো জয়তুন বিবির মুখের দিকে চেয়ে।

কি কইলাম বুঝ হইলো?

কেরামত মেম্বর তরল কণ্ঠে বলে উঠলো, চেষ্টা করতাছি!

জয়তুন বিবি এক হাত কোমরে রেখে, আরেক হাত নেড়ে বলে, আল্লা-রসুল মানে না, অ্যামন একটা মানুষরে আপনে আমারে খাওয়াইতে কন? শয়তানেওত্ত আল্লা-রসুল মানে! এইডা কী রহম শয়তান, আল্লা-রসুলও মানে না?

কেরামত মেম্বর হঠাৎ হাহা করে হেসে উঠে বললো, হ্যার লাইগ্যা তুই মানুষটারে কিছু দ্যাস নাই?

যেই মানুষ মানুষও না, শয়তানও না, তারে আমি খাইতে দিলেইত্ত! আর আপনেরে জিগাই, কী মনে কইরা মানুষটারে ঘরে জাগা দিলেন?

কেরামত মেম্বর জয়তুন বিবির কথায় যার পর নাই বিস্মিত না হয়ে পারেনি। শয়তান যে আল্লা-রসুল মানে কিংবা আউয়াল ডাক্তারের মত মানুষরা তাও মানে না, এমন ভাবনা তার মাথায় কখনোই উদয় হয়নি। তাই সে বলে, তর মতন কইরা তো ভাইব্যা দেহি নাই!

মানুষটারে আবার জাগা দিলে হ্যায় যতক্ষণ ঘরে থাকবো, ততক্ষণ আপনের কথাও হুনমু না! ঘরেও থাকমু না!

জয়তুন বিবির এ পরিচয় আগে কখনো প্রকাশ পায়নি। সে যে রান্না-খাওয়া পরা আর স্বামী-সন্তানের বাইরে কিছু ভাবতে পারে সেটাই কখনো বুঝতে পারেনি। আর এখন এই একই মানুষের মুখে সম্পূর্ণ নতুন কথা শুনে কেরামত মেম্বর গভীর ভাবনায় ডুবে গেল।

।। ১৩ ।।

শহর দেখতে কেমন কারো কাছ থেকে বিস্তারিত কোনো বর্ণনা শোনেনি মদিনা। যাও নিজের কল্পনায় সাজিয়ে নিয়েছিলো তার থেকেও যেন আরো সুন্দর আর প্রাণ-চঞ্চল এই শহর। এখানকার কোথাও খুব একটা সবুজ গোচরীভূত না হলেও এর চাকচক্য আর চোখ ধাঁধানো মেয়েগুলোকে দেখে সে অবাক না হয়ে পারে না।

বাসে-রিকশায় বা পায়ে চলা পথে যেমন-তেমন মেয়ে দেখেও তার কাছে পরী পরী মনে হয়। তাদের তুলনায় সে যে নিতান্তই ছাই আর কাদামাটির মত তা অনুভব করতে পারে। আর এ কথা অনুভব করতে পারে বলেই মনের কোনো এক গহীনে শহরে বাস করার বাসনা লালন করলেও নিমেষেই তা জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য হয়। তার উপর মেয়েগুলোকে বেহায়ার মত বুক টান করে মাথা উঁচু করে চলতে দেখে তার মন আরো খারাপ হয়ে যায়। সে সঙ্গে নতুন  একটি ভয় তাকে প্রায় মুমূর্ষু করে তোলে যে, শহরে এলে তার মত মেয়ের দিকে ফিরেও তাকাবে না সোভান। তাকে পাওয়ার জন্য তাকে মৃত্যুর দ্বার অবধি যেতে হয়েছিলো। কিন্তু শহরে এসে যদি সে মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করে, তবু সোভানকে সে নিজের করে ধরে রাখতে পারবে না। আর এ কথা মনে হতেই তার হাত-পা কেমন বিবশ হয়ে আসতে লাগলো। সারা মুখ ঘামে চকচকে হয়ে উঠলো। আঁচলে মুখ মুছলেও সে কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়া ঘামের প্রবাহ রোধ করতে পারে না। অকস্মাৎ সোভানের বাহু আঁকড়ে ধরে সে বলে উঠলো, বড় ডাক্তারের কাছে না গেলে হয় না?

সোভান হেসে বলে, তাইলে ক্যামনে বুঝমু যে রোগ আরোগ্য হইছে?

যদ্দুর হইছে, চলবো না?

আমি তো অ্যাত কিছু বুঝি না!

সোভান মদিনার মনের অবস্থা বুঝতে পারলেও কথার ফাঁদে পা দেয় না। হাসপাতালের গেটের সামনে এসে বললো, এই রোগ একবার যার হয়, সাবধান না থাকলে আবার হইতে পারে!

কথা শুনে গলা শুকিয়ে আসে মদিনার। অত তাড়াতাড়ি মরতে চায় না সে। আরো অমূল্য কোনো কিছুর বিনিময়েও হারাতে চায় না সোভানকে। সে সোভানের বাহুতে ঝাঁকি দিয়ে বলে, কাম সাইরা তাড়াতাড়ি ফিরা চল!।

হ্যাঁ, তাকেও ফিরতে হবে। এখানে এসেই তার মনে পড়েছে যে, কথা দিয়েও জাহেদার সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারেনি। তার দেরি দেখে বেচারি নিশ্চয়ই মন খারাপ করে আছে!

কফ আর রক্ত পরীক্ষা করতে দিয়ে বুকের এক্সরে করিয়ে পরের সপ্তাহে গিয়ে রিপোর্ট আনার স্লিপ হাতে করে তারা হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে আসে। সোভান মদিনার দিকে তাকিয়ে বলে, চল, বড় মার্কেটে যাই!

মদিনা অবাক হয়ে বলে, মার্কেট কি?

বাজারের মতন। তোমারে পছন্দের কিছু কিন্যা দেই!

মদিনা আপত্তি করে বলে, আমার কিছু কিনতে হইবো না! বাইত্যে লও!

অগত্যা সোভানকে ফিরে আসতেই হয়। তার ইচ্ছে ছিলো, মদিনাকে খুব ভালো আর দামী দেখে কিছু কাপড়-চোপড় কিনে দেবে। কিনে দেবে তার নিজের পছন্দের নীল শাড়ি। নীল টিপ। পাওয়া গেলে নীল লিপস্টিকও। কিন্তু বোকা মেয়েটার কোনো আগ্রহই নেই!

বাড়ি ফিরে যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে মদিনার। সে মনে মনে বলে, মাগ্গো! হ্যারে আর শহরে যাইতে দ্যাওন যাইবো না!

বেলা করে ফিরে আসার কারণে আউয়াল ডাক্তারের ফিরে আসার সংবাদ কেরামত মেম্বর ইচ্ছে করেই সোভানকে বললো না। আউয়াল ডাক্তারের কথা শুনলে হয়তো না খেয়েই ছুটবে সে। কিন্তু শহর থেকে ফিরে এসে কিছুটা হলেও তার বিশ্রাম প্রয়োজন। এখনি তাকে ফের বাইরে বেরুতে দেয়া উচিত হবে না।

যদিও কেরামত মেম্বর আউয়াল ডাক্তারের কথা সোভানের কাছে চেপে গিয়েছিলো, খাওয়ার সময় কথায় কথায় জয়তুন বিবি কথাটা বলে দিয়েছে। আর সে কথা শুনতে পেয়েই তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে সোভান। জয়তুন বিবি বা মদিনার অনুরোধ সত্ত্বেও আর কিছু পাতে নেয় না। শেষে মদিনার চাপাচাপিতে সে কিছুক্ষণ শুয়ে বিশ্রাম নিতে সম্মত হয়।

মমিনা সোভানের এক পাশে বিছানায় এসে বসলে সোভানের বিশ্রামে ব্যাঘাত হবার কথা বলে মদিনা তাকে চলে যেতে বললে, সোভান বলে, থাউক না! কি হইছে?

মদিনা মনে মনে মমিনার উপর চটে উঠলেও প্রকাশ করে না। চুপচাপ নিজের বিছানায় বসে পা দোলাতে দোলাতে চুল হাতড়ে উকুন খোঁজে।

কম্পেন্ডার ভাই! তোমরা টাউনে গ্যালা, আমার বই-খাতা-পিন্সিল আনলা না?

মমিনা তার অভিযোগ জানাতে দ্বিধা করে না।

তুমি যদি যাওনের সময় মনে করায় দিতা, তাইলেইত্ত হইতো!

মমিনা অভিমানী কণ্ঠে বললো, আমি না ইস্কুলে গ্যালাম গিয়া!

সোভান এক হাতে মমিনার একটি হাত ধরে বলে, পরের হপ্তায় আবার যামু। তোমার কি লাগবো একটা লিস্টি কইরা দিও!

মমিনা অবাক হয়ে বলে, লিস্টি কি?

সোভান হাসে। ফর্দ দ্যাহ নাই? বাজারের চোতা চিন না?

মমিনা বলে, বুঝছি!

তাইলে একটা কাগজে লেইখ্যা দিও!

সোভানের কথা শুনে হেসে বাঁচে না মমিনা। হাসে মদিনাও।

হঠাৎ দু বোনের হাসির কারণ অনুধাবন করতে না পেরে বোকার মত তাকিয়ে সোভান বলে উঠলো, হাসনের কি হইলো?

মমিনা তেমনি হাসতে হাসতে বলে, আমি অহনও লেখতে পড়তেই জানি না!

এবার সোভানও না হেসে পারে না।

।। ১৪ ।।

জমিতে যারা আগে আগে বীজ বুনতে পেরেছিলো, তাদের জমিতে ধানের চারা এক বিঘতের সমান লম্বা হয়ে উঠেছে। বানের পরের বৎসর সব ফসলই ভালো হয়। এবার মনে হয় ধানের ফলন অন্যান্যবারের চাইতেও বেশ ভালো হবে।

সোভান বাঁধ পেরিয়ে ঢালুতে নামার সময় দূর থেকে দেখতে পায় সরকারি চাপকলটা এখনও তার জায়গাতেই রয়ে গেছে। কিন্তু ওটার হাতলটা চোখে পড়লো না। মানুষ সরকারি জিনিসের কদর বোঝে না। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে যত্নের কথাও ভুলে যায়।

আউয়াল ডাক্তারকে বাড়িতে না পেয়ে তার শ্বশুর বাড়িতে খোঁজ করার জন্য বাসুলীর চরে যাওয়াই ঠিক করেছে সোভান। জমির আল ছেড়ে কোণাকুণি পথে সোভান অল্প সময়েই প্রায় আধাআধি পথ চলে আসার পর জাহেদার নানীর বাড়ির নারকেলগাছগুলো তার দৃষ্টিগোচর হলে তার মনে হয় যে, জাহেদা হয়তো রাগ করে তার সঙ্গে কথাই বলবে না। কিন্তু সে যে এতটা দিন কী ঝামেলার মধ্যে ছিলো তা বুঝিয়ে বললে কি জাহেদার রাগ কমবে না?

তাকে সে কথা দিয়েছিলো যে, দশদিন পর এসে দেখা করবে। কিন্তু কী যে তার হয়েছিলো, প্রথমে স্কুল স্কুল করে, পরে মদিনার অসুখ নিয়ে এতটাই বিস্মরণের পাঁকে ডুবেছিলো যে, একটিবারও তার মনে হয়নি। আর জাহেদার কথা যদি তার মনে পড়তো, তাহলে কি না এসে পারতো? এখন এতটা দিন পর জাহেদা তার উপর খুব বেশি রাগ না হলেই হয়!

জাহেদার নানীর বাড়ির কাছাকাছি হলে একটি জমিতে জয়নালের মত কাউকে কাজ করতে দেখতে পায় সোভান।  কিন্তু জয়নাল এখানে কাজ করতে আসবে কোন কারণে? ভেবে তেমন গা করে না সে। কিন্তু জমিতে কর্মরত লোকটি হঠাৎ এদিকে দৃষ্টি ফেরাতেই সোভানকে দেখতে পেয়ে বলে উঠলো, দু লাভাই!

তারপরই সে কাজ ফেলে ছুটে আসে। সোভান ভাই! ক্যামন আছ?

প্রথমটায় অবাক হলেও সোভান জিজ্ঞেস করে, তুই এহানে কি করস?

জয়নালের মুখে আবার হাসি ফুটে ওঠে। বলে, আলু লাগাইতাছি!

অ্যাত দূর কাম করতে আইছস?

জয়নালের চোখ মুখ আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কলকণ্ঠে সে বলে, আমরা তো অহন নানীর বাইত্যেই থাকি!

আর এ কথা শুনে আচমকা সোভানের মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে, জাহেদা ক্যামন আছে?

জাহেদা’বু তো ভালাই আছে! রাজরানীর কপাল!

জয়নালের কথা বুঝতে পারে না সোভান। সে কেমন ঘোলা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে।

জয়নাল যেন বুঝতে পারে সোভানের দৃষ্টির অর্থ। বলে, বাইত্যে চল! যাইতে যাইতে কইতাছি!

তারপর সে হাঁটতে হাঁটতে বলে, আমরা যাওনের কয়দিন পরেই নাহি তফাজ্জল ভাই আইয়া হাজির হইছে। নানী তারে নাহি দেইখ্যা পিছা দিয়া মারতে গেছিলো!

সোভান অবাক হয়ে জয়নালের মুখের দিকে দৃষ্টি তুলে তাকালে সে আবার বলে, তহন তফাজ্জল ভাই নাহি নানীর হাতে পায়ে ধইরা কইলো, হ্যায় মুন্সিগঞ্জ টাউনে বাড়ি বানাইছে। অ্যাদ্দিন জ্যালে আছিলো। খবর যে দিবো হ্যামন কাউরে পায় নাই! পরে জ্যাল থাইক্যা বাইর হইয়াই আইছে বউয়ের খোঁজ লইতে!

সোভানের একবার ইচ্ছে হয় যে, জিজ্ঞেস করে, তফাজ্জল হঠাৎ এত টাকার মালিক হলো কী করে? কিছুদিন আগেও তো সে হাড়ি-পাতিল ফেরি করেছে। কিন্তু প্রশ্নটা মাথায় উদয় হলেও পরে আর জিজ্ঞেস করে না। আজকাল মানুষ কত কী করেই তো আঙুল ফুলে তালগাছ হয়ে যাচ্ছে। তফাজ্জল তো আর বাইরের কোনো দেশের মানুষ না। এ দেশেরই মানুষ। সুযোগ পেলে কি বিড়াল মাছ-মাংসের হাঁড়িতে মুখ না দেয়?

যদিও সোভানের সন্দেহ হয় যে, জাহেদা ফের স্বামীর ঘরেই ফিরে গেছে। তবু কথাটা জয়নালকে জিজ্ঞেস করতে সংকোচ হয়।

জয়নাল আবার বলে, উপরে টিন আর চাইরোদিগে দেওয়াল। কত্ত বড় বাড়ি! তোমারে একদিন নিয়া যাইতে কইছে!

কে? জাহেদা?

না! তফাজ্জল ভাই!

সোভানের মনে হয় যে, জাহেদার কথা সে এমনি এমনিই ভুলে যায়নি। তফাজ্জল ফিরে আসার পর নিজের সংসার ফিরে পাওয়ার সুখে জাহেদা আগেই বিস্মৃত হয়েছিলো সোভানকে। তার মনে ঠাঁই হয়নি সোভানের। আর ঠিক একই কারণে হয়তো সোভানের মনেও উদয় হয়নি জাহেদার কথা। সুতোর ও মাথায় টান না পড়লে তো এ মাথা সরবার কথা নয়!

(সমাপ্ত)

[উপন্যাসটি কানাডার অনলাইন সাপ্তাহিক দ্য বেঙ্গলি টাইমস-এ প্রকাশিত।]

juliansiddiqi@gmail.com'
জগতের সব কাজই আমি পারি না। অনেক কাজে অলস হলেও লিখতে কখনও ক্লান্তি বোধ করি না। এতে করে আমার সময়গুলো ভালো কাটে।
শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

7 টি মন্তব্য : সম্পূর্ণ উপন্যাস: কম্পেন্ডার (৫০তম পোস্ট)

  1. ওরিইই… ১৪ মাইল লম্বা পোস্ট! :D
    সম্পূর্ণ উপন্যাস যেহেতু, পড়ার আশা রাখলাম।
    আপাতত অগ্রিম গোলাপী সাধুবাদ। :rose:

    রাজন্য রুহানি
    অক্টোবর 9, 2011 , 6:05 পূর্বাহ্ন

  2. পুরোনো লেখা ? … জানিতো ! পত্রিকায়া ছেপেছিল ।

    ৫০তম পোস্ট যে ? কলম তুলে দেখান … অভিবাদন ।
    এখনতো দুই হাতে লিখছেন কোন হাত তুলবেন !

    imrul.kaes@ovi.com'

    শৈবাল
    অক্টোবর 10, 2011 , 3:03 অপরাহ্ন

  3. :-bd

    রিপন কুমার দে
    অক্টোবর 12, 2011 , 1:45 পূর্বাহ্ন

  4. সারাক্ষন উপন্যাসের চরিত্রের মধ্যে ডুবে থেকে থেকে রাত ২:৩০ এ.এম শেষ করলাম। পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের মতো উপন্যাসটি টেনে নিল পরিবেশ আর চরিত্রের ভাব-ভাবান্তরে। এমন একটা উপন্যাসের জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা রইল ভাইয়া। :rose:

  5. আপ্নে খুব বালা লেহেন যে, এমুন লেহায় হাতে তালি দেওন ছারা অবমূল্যায়ন অইবো।
    =D>

    bonhishikha2r@yahoo.com'

    বহ্নিশিখা
    অক্টোবর 13, 2011 , 7:41 পূর্বাহ্ন

  6. উপন্যাসের প্রেক্ষাপট, চরিত্র চিত্রণে বাস্তব নৈপূণ্য এবং বর্ণনার স্রোতধারা আমাদের আন্ত:সম্পর্কীয় স্বার্থবাদ আর মানসিক দ্বন্দ্বের যে মুখোশ খুলে দেয় শোষিত, শাসিত ও সুযোগ সন্ধানীর; খুবই তা পীড়নের।
    অনুসন্ধানী তৃতীয় নয়নে নদী ভাঙনের শিকার নিম্নাঞ্চলের বানভাসী কোনো একটা সমস্ত এলাকার মানুষের যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবি মনে হলো উপন্যাসটি; যেন একটা গাছের সব শাখাতেই যতটুকু জীবনীশক্তির প্রয়োজন ফুল ও ফলের পূর্ণতা পেতে, অকৃপণ হাতে সেই গাছটিই এঁকেছেন ঔপন্যাসিক, বাস্তব-নিরেট।
    ……..
    একটা একটা করে পর্ব পড়ে একসময় অলসতা এলে পরে আর পড়া হয় নি। নেট ঘাঁটাঘাঁটির সময় এই উপন্যাসের জাভা-ইবুক পেয়ে গেলাম, তাও প্রায় বছর দেড়েক আগে, ঠিক মনে নেই, টানা পড়তে থাকলাম মন্ত্রমুগ্ধের মতো। আমিও যেন সোভান হয়ে গেলাম বানভাসী লোকের অরণ্যে আর আমার চারপাশে খেলছে পরিবেশ-প্রকৃতি।
    ……..
    লাল সালাম, জুলিয়ান ভাই।

    রাজন্য রুহানি
    নভেম্বর 6, 2014 , 5:19 অপরাহ্ন

  7. সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু উপ্যাসটি যতটা আলোচনায় আসা উচিত ছিল তা হয় নাই। এই লেখাটা নিয়ে আমার প্রত্যাশা অনেক ছিল। যাই হোক সময়ের চোখে লেখাটা নিজেকে তুলে ধরতে পারে কিনা।
    সবাই ভালো থাকেন এই প্রত্যাশা।

মন্তব্য করার জন্য আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে। Login