শৈলী বাহক

এক হামিদার (সুমু’র) গল্প

এক হামিদার (সুমু’র) গল্প
Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

অবিদিত আনকা: ‘ভাইজান আপনের দেশের বাড়ি কোথায়? ফোনে আপ্নে বাংলায় কথা কৈতেছিলেন তাই বুজলাম আপ্নে বাংলাদেশের মানুষ।’

    আমি বসেছিলাম মিডটাউন, গ্রীন এরিয়ার এক বেঞ্চে। এক ক্লায়েন্টের সাথে কাজ শেষ করে ভাবলাম  একটু বসে এক কাপ কফি খাই। ম্যানহাটানের অগণিত পার্কগুলোর একটি, এই  গ্রিন পার্কটা  ছোট হলেও বেশ সুন্দর এবং ছিমছাম। পাকের তিন দিকে আকাশচুম্বী দালান আর এক দিকে রাস্তা এবং দোকানপাট, বানিয়ারি অফিস।  পার্কে অনেক গুলো মজবুত কাঠের এবং গ্রানাইট পাথরের বেঞ্চ পাতা। পুরু টাইলস দিয়ে তোলা মোড়ানো, মাটিতে বিভিন্ন ধরণের ফুল গাছ, গ্রিনারির সমাহার।  আর তিন দিক দিয়ে ৩০-৪০ ফিট উঁচু গাছগুলো পার্কটিকে আদরে আগলিয়ে রেখেছে।  সূর্যের প্রকট কিরণ পরল পরল গাছের পাতার ব্যারিকেডে আটকে পরে যায়। স্বভাব চঞ্চল এই আলো লুকোচুরি খেলতে খেলতে নিচে নেমে আসে কিন্তু ততক্ষনে তার উত্তাপ কমে যায় তবে পার্কটাতে ছড়িয়ে দেয় মনোরম,পর্যাপ্ত প্রভা। ক্ষণেক্ষণে  চিকাডি এবং ব্ল্যাকবার্ডের ডাক আর অদূর থেকে ভেসে আসা ট্রাফিকের সহনীয় কোলাহল পার্কে সুক্ষ একটা বাতাবরণের সৃষ্টি করে। এখানে কিছুটা সময় নির্লিপ্তভাবে বসে সহজেই কাটিয়ে দেয়া যায়। আমি  যখনি ম্যানহাটনের মিডটাউনের  এই অঞ্চলে কাজে  আসি, তখন এখানে কিছুক্ষনের জন্য বসে সময় কাটিয়ে যাই আর আসেপাশে কফির মান কেমন সেটা আস্বাদন করে দেখি। Life, consists of many small pleasures!

    আমি প্রশ্নকারীর দিকে তাকিয়ে দেখি মধ্যবয়স্ক,  মিডিয়াম বিল্ট একজন বাংলাদেশী ভদ্রমহিলা  বসে আছেন আমার বা দিকের এক বেঞ্চে। কীলক হীলের জুতো পায়ে, রিলাক্স ফিটেড জিনসের  প্যান্ট এবং  ভার্টিকাল স্ট্রাইপেড টুনিকের শার্ট ইন করে পড়া, শার্টের হাতা গুটানো, এক হাতে দুটো সোনার বলা এবং অন্য হাতে ঘড়ি, লালচে ডাই করা ফ্রেঞ্চ বব কাট চুলের ওপর সানগ্লাস পার্ক করা, ফেসে কাঁচা হাতে উগ্র ধরণের মেকআপ করা, পুরু করে দেয়া একসান্ত্রিক গোলাপি রঙের লিপস্টিক, থুতনির অবাঞ্চিত সময়ের ছোট্ট খেয়ার নিচে ঝুলছে ফেস মাস্ক এবং কোলে রাখা হ্যান্ডব্যাগ।  

    মিটি মিটি হাসি মুখে ভদ্রমহিলা আমাকে ওই প্রশ্নটি  করলেন।  আমি জানালাম, ‘এস্টোরিয়া, কুইন্সে।’  উনি তখন বললেন, ‘না না, আমি দেশের বাড়ির  কথা জিজ্ঞেস করছি।’ আমি বললাম আপু, ‘নিয়তির পরিহাসে as a teenager, তিন যুগ আগে বাংলাদেশ ছেড়ে আমি এই সুদূর আমেরিকাতে ইমিগ্রান্ট  হয়ে এসেছি। মেনে নিয়েছি বাস্তবতাকে, appreciate করি এদের মনুষত্ব, সুযোগ সুবিধা, গ্রহণ করেছি নাগরিকত্ব।  আমি এখন এদেশকে আপন করে নিয়েছি, তাই, কেউ  জিজ্ঞেস করলে প্রথমে এখানকার ঠিকানাটাই ধর্তব্বতে আসে।’  

    উনি তখন বললেন, ‘ভাইজান আপ্নে ঠিক বলছেন, আমরা বাঙালিরা শুধু রেষা রেশী করি, মন ছোট, একজন আর একজনের পিছনে লাইগ্গা থাকি।  তা বাংলাদেশের বাড়ি কোথায়?’ আমি জানালাম, ‘জম্নস্থান যেহেতু বাংলাদেশে তাই একজন বাঙালি দেখলে সে  বাংলাদেশের লোক, প্রথম দৃষ্টিতে সে পরিচয়টাই আমি যথেষ্ট মনে করি।’ 

    একটা দিলখোলা হাসি দিয়ে উনি বললেন, ‘ভাইজান এবার গরম মনে হয় আমাগো স্যুপ বানাইয়া ছাড়বো’ সেকথা শুনে দুজনেই হাসলাম।  এবার গ্রীষ্মে নিউ ইয়র্কে একটানা বেশ গরম পড়েছে তাই আবহাওয়া নিয়ে একটু কথা বললাম।  উনি তখন বললেন এদেশে শীত কালটা মজার, সুন্দর সুন্দর পোশাক পড়া যায়, ফ্যাশনের টুপি পড়া যায়, বুট পড়া যায়। দুজনে বরফ দেখার আনন্দ নিয়ে কথা বললাম এবং একমত  হলাম যে পৃথিবীর সুন্দরতম দৃশ্যের মধ্যে বরফ পড়া একটি। 

    আমি তখন তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর বোন, আছেন কেমন নিউ ইয়র্কে?’ তিনি আমার প্রশ্নের ধরণ দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বললেন, ‘ভাল’ এবং তিনি তার পরিচিতি দেয়া শুরু করলেন।  তার নাম হামিদা, ডাক নাম সুমু। ব্রনক্সে থাকে গত পাঁচ বছর যাবৎ এক বাঙালি মহিলা’র সাথে বাসা শেয়ার করে।  এর আগে স্বামীর  সংগে থাকতো কুইন্সের উডসাইড এলাকাতে। বনিবনা হয়নি তাই ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে সাত বছর আগে। এই পর্যায়ে থেমে জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাইজান গাম খাইবেন, সুগার ফ্রি গাম?’ সুমু তার মাইকেল কোরের সারলেট্ ব্যাগ থেকে ট্রাইডেন্ট গামের মোড়ক থেকেই দুই পিস্ গাম বের করে আমাকে একটা দিল, ফয়েল খুলে অন্য পিসটা মুখে দিয়ে উত্ফুল্লতার সংগে চিবুতে থাকলো।  

    গাম বেচারির সবটুকু গ্লুকোজ চিপকে নিয়ে সুমু আবার শুরু করলো তার কথা। সুমু পুরোনো ঢাকা’র মেয়ে, ১৯ বছর বয়সে জগন্নাথ কলেজে পড়ুয়া জামালপুরের এক ছেলের (সজল) সাথে প্রেম করে বিয়ে করে। মা মরা এই মেয়ে, আব্বার অমতে বিয়ে করে শশুর বাড়ি চলে যায় ২০০১ সালে।  বিয়ের দুই বছর পর তার স্বামী আমেরিকাতে চলে আসে এবং তার তিন বছর পরে স্বামী বাংলাদেশে যেয়ে তাকে নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসে। নিউ ইয়র্কে আসার আগ পর্যন্ত সুমু জামালপুরেই ছিল। 

    ও বললো তার আব্বা মারা যান আমেরিকা আসার পর এবং পৈতৃক বাড়ির কারো সাথে যোগাযোগ নেই। বিয়ের সময়ে আব্বার  দেয়া উপদেশ এখন হাড়ে হাড়ে টের পায়। আব্বা বলেছিলো “মারে, এই ছেলে আশা দিবে কিন্তু আয়েশ দিবে না।”  পুরোনো ঢাকার স্মৃতি তার মনে এখনো জাগগ্রত আর মিস করে বিয়ের পূর্ব জীবনকে, ছোটকালের বান্ধবীদের, পুরানো ঢাকার বিভিন্ন উৎসব, শিক কাবাব, ঘুন্নি,পরোটা, হালুয়া।  আমি তখন সুমুকে কথায় কথায় বললাম যে আমার বাল্য-কৈশোর কেটেছে আজিমপুরে এবং কৈশোরে পুরোনো ঢাকায় যাতায়াত ছিল। বললাম, আমি শান দিয়ে সুতো ভালো মাঞ্জা দিতাম আর গুড্ডির  বগ্গায় পারদর্শী ছিলাম তাই  পুরোনো ঢাকার অনেক সাথী আমাকে নিয়ে যেত help’র জন্য। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকে সৌখিন সিঙ্গাপুরি গাপ্পি, প্লাটিস, আর সোর্ডটেল মাছ বাসায় চাষ করতাম এবং শেখ সাহেব বাজার রোড আর পুরান ঢাকার অনেক ক্লাসের বন্ধু এসে কিনে নিয়ে যেত।

      সুমুকে জানালাম লালবাগ কেল্লা’র কথা, শীতকালে লালবাগ মাঠে ক্রিকেট খেলা দেখতে যাওয়ার কথা, কেল্লার উঁচু ভূমি থেকে গড়াগড়ি করে নিচে পরে খেলার আনন্দের কথা, কেল্লা’র ভিতরের সুড়ঙ্গ দিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে  যাওয়ার শোনা গল্পের কথা, চকবাজারের কথা, মহররমের তাজিয়ার কথা , জোনাকি, মুন, রূপমহল, ষ্টার, ওয়ারী সিনেমা হলের কথা, লালবাগ থানায়  আমার এক ভ্রাতৃপ্রতীমের আটক হয়ে থাকার ঘটনার কথা, আজিমপুর থেকে সদরঘাটে পুরোনো ঢাকার মধ্যে দিয়ে রিকশা করে যাওয়ার কথা,  নৌকা করে জিঞ্জিরা সফরের কথা, এবং আমার কয়েকজন বন্ধু থাকতো পুরোনো ঢাকায় সেখানে মাঝেমধ্যে  আড্ডা দেয়ার কথা। আরো জানালাম বিব্রতকর এক বিয়ের হলুদ অনুষ্ঠানের কথা যেখানে রং ছাড়াও রাস্তার খোলা ড্রেন থেকে ময়লা ছুড়াছুড়ি করেছে।  সুমু বললো এপ্রথা  ওদের মহল্লায়, ওর সময়েও বজায় ছিল।  সে বললো ছোটকালের কারো সাথে যোগাযোগ নাই শুধু এক স্কুলের বান্ধবী ক্যালিফর্নিয়া থাকে কিন্তু সুমুর ডিভোর্সের পর আর খবরাখবর নাই। 

    এই পর্যায়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কফি খাবে কিনা।  সুমু বললো, ‘এখন কফি খাইবেন ক্যান?’ আমি তাকে জানালাম আমার গতানুগতিক এখানে এসে কফি উপভোগ করার ছোট্ট সুখের কথা।  সুমু জানালো খাবে, দুই চামচ চিনি আর দুধ বেশি দিতে।  আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘লাইট এন্ড সুইট?’ ও সম্মতিতে মাথা নাড়া দিলো।  আমি  বললাম, ‘একটু সময় বেশি লাগবে যেহেতু  করোনা- ১৯ ভাইরাস’র জন্য সীমিত দোকান খোলা।’  সুমু জিজ্ঞেস করলো, ‘আপ্নে কি ফিরা আসবেন?’ আমি মৃদু হেসে জানালাম আপু, ‘এখানে এসে কফি না পান করে যাব তা তো হয় না!’  সুমু বললো ভাইজান, ‘আমাগো মুখের কথা’র কোনো ইস্টিশন নাই।  মুখে কৈ একটা আর করি আর একটা!’ 

    আমি কফি নিয়ে ফিরে এসে দেখি সুমু একজনের সঙ্গে ফোনে বাদানুবাদ করছে। আমাকে দেখে কথা শেষ করে, ফোন অফের পর একটা তৃপ্তির এবং স্বস্থির  হাসি উপহার দিলো। আমি লক্ষ্য  করলাম তার উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণ, কাটা কাটা  চেহারায় এবং ডাউনটার্ন্ড হেজেল চোখে  ক্লান্তির ছোয়া কিন্তু হাসিটি ছিল আন্তরিকতায় ভরপুর, উচ্ছল এক মুখ ভরা হাসি।  আমি তাকে কফির সাথে একটা danish pastry দিলাম। সুমু বললো, ‘এটা আবার ক্যান?’ আমি জানালাম যে চায়ের সাথে টা এর মতো আমি কফি’র সাথে হালকা স্নাক্স জাতীয় কিছু সব সময় উপভোগ করি।  সুমু হেসে কফি এবং “টা” খাওয়া শুরু করলো।  চিনি নাড়তে নাড়তে আমাকে বললো, ‘thank you, many thanks!’   আমি, ‘you are welcome!’ বলে মনে  মনে wow , nice!  বললাম এইজন্য যে মাত্র চারটি শব্দে ওর  সুন্দর  ইংরেজি উচ্চারণতা ছিল স্পষ্ট এবং সাবলীল।  মনে হলো ও ইংরেজি অনুশীলন করে যা অনেক প্রবাসীরা ততটা গুরুত্ব দেননা। 

    কফি খাওয়ার মাঝে সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো ভাবী কোথায়?  আমি জানালাম ভাবী ছিল কিন্তু এখন নাই, বর্তমানে আপন সমুদ্রে সাঁতার কাটি।  ও হেসে জিজ্ঞেস করলো এস্টোরিয়াতে কার সঙ্গে থাকি? আমি জানালাম এক বাড়ির দোতলায় একা থাকি।  ও বললো ওখানে তো এখন অনেক ভাড়া? সুমু  জিজ্ঞেস করাতে বাসার বর্ণনা দিলাম এবং ওর প্রশ্নসূচক চাহনি দেখে বললাম আমি একটু বড়বাসায় থাকা পছন্দ করি, এটা আমার একটা ভাইস স্বরূপ!  উৎসুক সুমু জিজ্ঞেস করলো একা এক খারাপ লাগে না? জানালাম  not bad, জীবন যখন যেমন আর একটু humor করে বললাম যখন নাকের বাঁশি বাজে কেউ ধাক্কা দিয়ে ডিসটার্ব করে না। তখন উচ্চ হাসি দিয়ে বললো ভাইজানতো মজার মানুষ এবং একটু অন্য রকম।  আরো বললো যে নিউইয়র্কে বাঙালিরা একজন মেয়েমানুষ একা দেখলে দারোগার মতো প্রশ্ন করা শুরু করে আর আপ্নে…….. বলে চুপ হয়ে কফির দিকে মনোযোগ দিল।  

    আমি খেয়াল করলাম সুমুর চেহারায় হালকা মলিনতার আভাস, ওর মনের অনুভূতিটা কিছুটা হলেও উপলদ্ধি করতে পারলাম।  এই প্রবাসে আমরা বেশিরভাগ বাঙালিরা একজন আর এক জনকে দেখলে সচরাচর মুক্ত মনে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করিনা। ভেবে দেখিনা যে, “হাল জাজা উল ইহসান ইল্লাল ইহসান (ভালো কাজের প্রতিদান ভালো কাজ ছাড়া আর কি হতে পারে)?” হয়ে যাই আঞ্চলিক বাঙালি,  শুভান্যুধায়ী সুমনা মানুষ বাঙালি না।  প্রবাসে, যেখানে একে  ওপরের মাঝে  ক্ষনিকের তরে দেখবো “বাংলার মুখ” সেখানে unfortunate attitude এই রকম যে “নদীর এপার কহে  ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওই পারেতে  কিছু ত্রুটি আমার বিশ্বাস।” আমাদের মনুষত্ব শুরু হয় স্বরবর্ণ দিয়ে আর হয় sad despise of having a neutrality, feeling  mutuality. তাই “দাড়াও পথিক বর” ক্ষণকালের জন্য দাঁড়িয়ে দেখেনা।  এই অনুযোগটা সরাসরি না করলেও আমি সুমু’র যাতনাটা share করলাম। 

    কফি শেষ করে সুমু আবার তার পূর্ববর্তী  প্রসঙ্গে চলে  গেল।  বললো নিউ ইয়র্কে আসার পর দেখে  স্বামী দিনের বেলা গাড়ি চালায় আর রাতে মদ পান করে এবং বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়, তাস জুয়া খেলে।  তার প্রতি  তেমন আকর্ষণ নেই।  এই নিয়ে তাদের মনোমালিন্যের শুরু হয়।  সুমু নিয়মিত “প্যানপ্যান” করাতে ২০০৯ সালে তারা বাংলাদেশ ঘুরতে যায়।  ওখানে তার শশুর, সজলকে তাওবা করায় এবং সে ওয়াদা করে ভালো হয়ে যাবে।  দুই মাস থেকে  তারা ফিরে আসে। ওই বেড়ানোর সময়টা ছিল আনন্দময়। কিন্তু ফিরে আসা’র পর সব কিছু আবার আগের মতো চলতে এবং অশান্তি ক্রমেক্রমে বাড়তেই থাকে।  সুমুর আক্ষেপ, নিজের পছন্দে বিয়ে করেছে কিন্তু ভালোবাসার স্বাদ কখনো পায় নাই। 

    আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, ‘বিয়ের আগে সজল কেমন ছিল?’ সুমু বললো, ‘আর দশটা বাঙালি পোলা’র মতন, আড্ডা মারতো, মাঝেমধ্যে আতাউতা  খাইতো, তাস খেলত  এসব তো সবাই করে।  বিয়ের পর তো ঠিক হয়ে যেতে হয়।’ তখন আমার লালন শাহর বাণী মনে পড়লো, “অগতির না দিলে গতি, ওই নামে রবে অখ্যাতি। নাই আমার ভজন সাধন, চিরদিন কুপথে গমন।” আমি সুমুকে  কিছু বললাম না যদিও আমার ইচ্ছে হচ্ছিলো এই বাণীগুলো শুনানোর এবং বলতে যে আমার যেভাবে গড়ে উঠি তার ফলাফল সচরাচর তাই হয়ে উঠে। বলতে ইচ্ছে হলো,  “(usually), you reap what you sow” কিন্তু  অনুভব করতে পারলাম যে সুমু নিজেকে একটু খুলতে চাচ্ছে তাই আমি ওর চেতনার দরজায় কড়া নাড়লাম না। 

    এরপর সুমু আরো অনেক কিছুই বললো। বললো বিরতিহীন নিত্য কলহ-দুঃখের কথা, স্বামী’র অন্যদের সাথে সম্পর্কের কথা,  সংসার অচল হয়ে  যাওয়ার কথা, নিজেকে হারিয়ে ফেলার কথা, পরিবেশের চাপে পরে  নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা।  বললো কিভাবে তার স্বামী’র  বন্ধুরা তা সাথে শারীরিক সম্পর্ক  করলো এবং সময়ের স্রোত জীবনের নোংরা ডিঙিটাকে বয়ে নিয়ে গেলো।  এর মধ্যে সুমু অনেক চেষ্টা করেছিল দেশে ফিরে যেতে কিন্তু সজল রাজি হয়নি এবং তার শশুরবাড়ির কেউ  সজলকে চাপ দেয়নি যেহেতু তারা আর্থিক ভাবে সজলের মুখাপেক্ষী ছিল।  

    ওদের পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপ হতে থাকে এবং মৌখিক ঝগড়া কুৎসিততায় রূপ নেয়।  ওর দৃষ্টিতে ওই জীবনের কোনো  নোঙ্গর  ছিলনা।  এক পর্যায়ে ওদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় এবং সুমু ম্যানহাটানের এক হোলসেল দোকানে কাজ নেয়।  এখন করোনা-১৯  এর জন্য দোকান বন্ধ।  ও আজ এসেছে মালিকের সাথে দেখা করতে।  ছাড়াছাড়ির পর তারা একই  বাসায় কয়েক মাস ছিল এরপর  সুমু ম্যানহাটানে এক বাঙালি পরিবারে’র সাথে কিছু দিন থাকার পরে ব্রনক্সে চলে যায়।  সুমু দুঃখ  করে বললো কেই তার জন্য আগায়ে আসে নাই বরং তার স্বামীর কয়েকজন বন্ধু তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখে ডিভোর্সের পরেও।  একা একা না থেকে সুমুও এই জীবনে অনিচ্ছাসত্বেও অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।  এইসময় সুমুর একটা কল আসাতে  আলাপে একটু ছন্দপতন ঘটলো।  

    তখন আমার বছর খানেক আগের ঘটনা, এক বাঙালি বোন, বেলীর  কথা মনে পড়ে যার সাথে পরিচয় ম্যানহাটানের  F line,  ব্রডওয়ে স্টেশনে।  বেলী, এক হাতে পণ্যের থলে আর সাথে দুই বাচ্চা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিলো।  একজন  স্ট্রোলারে বসা আর কোলের জনের  গায়ে জ্বর।  আমি তাকে তার ব্রকলীনের চার্চ এভিনিউ বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এসেছিলাম।  বেলী  বলেছিলো নেশাদার , রাজনীতির পোকা স্বামী  আর্থিক খরচ ছাড়া, সংসারের আর কোনো দায়িত্ব পালন করে না তাই প্রবাসী জীবনটা অতিষ্ট হয়ে গেছে।  আরো বলেছিলো একবার স্বামীকে কোনোভাবে রাজি করে বাংলাদেশ যেতে পারলে ওখানে থেকে যাবে।  বেলীর সাথে আর দেখা হয়নি।  

    ফোন কল শেষ করে সুমু আবার পূর্ব আলাপে ফিরে গেলো। বললো, মাঝে মাঝে ওর ইচ্ছে হয় বাংলাদেশ চলে যাবে, নতুন একটা জীবন শুরু করবে কিন্তু যাবে কোথায়? ওর তো কেউ নেই পরিচিত!  আমেরিকাতে বেঁচে খেয়ে চলে যাচ্ছে দিন কিন্তু বাংলাদেশে কি ওর মতো মেয়েদের থাকা সম্ভব? বাংলাদেশের সরকারি অরাজকতা, নিরাপত্তাহীনতা এবং মানুষের আচার-আচরণ ওকে বিমর্ষ করে তোলে।  ইচ্ছে হয় একবার বাংলাদেশ ঘুরে আসতে কিন্তু সাহস করে উঠতে পারে না।   আমি বললাম পরিচিত কারো সাথে একবার ঘূরে আসতে কিন্তু ও দুঃখ করে বললো যে ভাই, কেউ কারো না।  দুইটা এপার্টমেন্ট বিল্ডিঙে থাকছি, যেখানে অনেক বাঙালি ফ্যামিলি থাকে এবং তারা  যে কি পরিমান নোংরা আর খারাপ আমি তার চাইতে আমি অনেক ভাল আছি।  বাঙালি মেয়েরা ওকে  নিয়ে খারাপ কথা বলে আর পুরুষেরা হয় কু দৃষ্টিতে তাকায় বা হেয় করে  দেখে।  অনেক পুরুষ যেচে তার ফোন নাম্বার চায়। বেশিরভাগই বিবাহিত কিন্তু “শুকুরনাই” বা অসুখী।  বলতে থাকলো যে শুধু odd job করে তারা না, শিক্ষিত শালীন লোকও  ওকে প্রপোজ করেছে। গত বছর এক কলেজের অধ্যাপক চেয়েছে সুমু তার বাসায় কিছুদিন থাকুক যেহেতু তার পরিবার সামারের ছুটিতে বাংলাদেশ গেছে। তার দৃষ্টিতে, যা ঘটে তার চেয়ে অনেক বেশি রটে।  সুমু বিব্রত হয়ে জানালো যে বাঙালি পুরুষেরা বিদেশে সিঙ্গেল  বাঙালি মেয়েদের পিছে লেগে থাকে কিন্তু আমেরিকান মেয়েদের  ভয় পায়।  আমরা অবলা এবং এরা তার সুযোগ নেয়। ঘর করবো, সোহাগ করবো এমন মানুষ পাইলাম না, সবাই যেন সুযোগসন্ধানী।  তারপর ও চুপ হয়ে বসে রইলো। 

    আমি লক্ষ্য করলাম শুরু’র দিকে সুমু বেশ সাবলীল ভাবে কথা বলছিল কিন্তু আস্তে আস্তে তার মাঝে একটা বিষন্ন ভাব ফুটে উঠছিল।  মনে হচ্ছিলো, জীবনের প্রতিটি অধ্যায় এক এক করে ভর করছিলো স্কন্ধে আর তার ভারে সুমু নুয়ে পরেছে।  জীবন চলার পথের মাঝে ও জীবনের মধ্যে জীবন হারিয়ে ফেলেছে এবং যাকে এই ধরণের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় সাধারণত সে দিশেহারা হয়ে পরে। সুমু যেন আর  খুঁজে পাচ্ছেনা any sense, nor a sense of belonging! 

    আমার তখন ওকে কিছু একটা বলতে ইচ্ছে হোল। যে কথা যা কোনো শান্তনা বা  আশ্বাস -উপদেশও  নয়।  এমন একটা কিছু যা সুমু তার নিজের মতো করে অনুধাবন করতে পারবে।  মনে হলো ওয়ার্ডসওয়ার্থের  Ode on Intimations of Immortality থেকে কয়েকটা লাইন শোনাই কিন্তু বললামনা এই ভেবে সম্ভবত সুমু এর সাথে পরিচিত নয়।  একবার ভাবলাম, Country Road বা Blue Bayou থেকে কিছু বলি।  হঠাৎ তখন বাংলার এক সাধক কবির একটা গানের দুটো লাইন মনে পরে গেলো। এই  দুটো লাইন কদাচিৎ আমার মনের অজান্তে ঠোঁট ফসকিয়ে বের হয়ে যায় এবং নিজের অগোচরে  আমি উদাস হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। সে উদাসতা  নিরাশার  মর্মবেদনা বা বিষন্নতার নয় বরং সুখের, এক ভাষাহীন  ভালোলাগার, বরই আদরের। তখন চেতনা ইঙ্গিতে বলে, নাই আক্ষেপ কোনো দেনাপাওনার, সামনে রয়েছে পথ এগিয়ে যাওয়ার। 

     আমি তখন তাকে বললাম আপু, ‘আমি একটা গানের দুটো লাইন আপনাকে শোনাবো তা আপনার ভালো লাগতে পারে।’  সুমু কোনো প্রত্যুত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে বসে রইলো।  ওকে আমি তখন  সেই গানের কলিগুলো দুবার শোনালাম,

“আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়

পারে, লয়ে যাও আমায়, পারে, লয়ে যাও আমায়।”

     এটা শোনার পর সুমুর যে প্রতিক্রিয়া হলো তা আমি ঠিক আশা করিনি।  কিন্তু মানুষের সৌন্দর্য  এখানেই যে মন যদি বাহুল্য এবং কুটিলতা বর্জিত হয়, সে তার নিজের মতো করে তত্ত্ব কথার অর্থ খুঁজে নেয়।  গানের কলি দুটো যেন ওর বুকে অব্যার্থ এক তীরের মতো বিঁধে গেলো এবং এটা শোনামাত্র সুমু আহহহ আর উচ্চস্বরে কান্নার শব্দ করে বলে উঠলো, ‘ভাইজানগো, আমার কেউ নাই, আমার কেউ নাই, অনেক কষ্টে আছি রে বাই, অনেক কষ্ট! বাল্লাগেনা এই জীবন।’  প্রথমে ডুকরে এবং পরে মুখে হাত দিয়ে চাপা কান্না। এ কান্নার মধ্যে যেন ওর  সঞ্চিত দুঃখ, হতাশা, যন্ত্রনা প্রতিফলিত হচ্ছিলো।  Sudden uneasiness কাটিয়ে উঠার পর  আমার ইচ্ছে হচ্ছিলো যে ওর মাথাটাকে আমরা প্রশস্ত বুকে স্থান দিয়ে হাত বুলিয়ে দেই।  কিন্তু, আমি জানি সুমু কোন সমাজে বড়ো হয়েছে এবং অনিচ্ছাসহকারে মেনে নিলাম ঐ সমাজের বাধনটাকে। পারলাম না আমার সুস্থির আবেগ, স্নেহ, মমতা, মায়া, এবং আদরের স্পর্শ দিয়ে ওর পাথর চাপা জীবনের অস্তিত্বটাকে একটু হালকা করে দিতে।  Shower করতে ইচ্ছে হচ্ছিলো  a little touch of assurance, touch of bliss! এই সময়ে ওর এই ছোয়াটার খুব বেশি প্রয়োজন ছিল।    

    আমাদের নিকটে এক মার্কিন ছেলে বসে ছিল ও জিজ্ঞেস করল সব কিছু ঠিকঠাক কিনা।  আমি বললাম,  ‘my dear young man, she is crying to relieve her stress,  her tears are tears’ of transformation.  So, let her cry, she will be okay.’

    সুমু বেশ কয়েক মিনিট শরীর কাঁপিয়ে কাঁদলো এবং তারপর দুই হাতে মুখ ঢেকে আস্তে আস্তে ফোঁপাতে লাগলো।  আমি কোনো মৌখিক  শান্তনা দিলাম না।  আমার মনে হচ্ছিলো ওর কান্নাটাকে  এক মহাঔষদের মতো এবং গতিশীল নিউ ইয়র্কের চলমান জীবনে সুমুর জন্য, এই কান্নাটা আজ অনেক বড়  কিছু একটা পাওয়া। 

    ও একটু সুস্থির হয়ে, চোখ-মুখ মুছে বললো ভাইজান, ‘আমি সরি।’  আমি কিছু বললাম না শুধু এক চিলতে caring  হাসি আমার দুই ঠোঁটের মাঝে উঁকি দিলো।  দেখলাম, কান্নার জৈলুশে ওর চেহারাটা  একটু উখলিত হয়ে উঠেছে।  মুখের আনাড়ী মেকআপ লাঘব পেয়েছে, কপোল এবং নাসিকাতে হালকা লালচে আভা, চোখ ভাবপ্রবণ এবং মুখশ্রীতে একটু আদুরে ছোয়া তাকে অনেক আবেদনময়ী করে তুলেছে (natural beauty)। ভাবলাম, নচ্ছার মেকআপ!  সুমু বললো, ‘আপনের নামটা তো জানা হোল না?’ আমি নাম বলে ওকে একটু সহজ  করার জন্য আজ্ঞাকারী স্বরে fun করে বললাম “how do you do young lady?” সুমু ফিক করে হেসে, একটু থেমে আমার ফোন নং চাইল।  সেই মুহূর্তে আমি একটু অভিনিষ্টভাবে ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম ও আমার দিকে শূন্য এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে।  তখন আমার মধ্যে একটা চিন্তার রেশ বয়ে গেলো। 

    জীবন চলার পথে যখন মন -সংসার ভেঙে যায়, লক্ষ্যবিহীন মানুষের কাছে মাঝেমধ্যে শরীরে সহবাসের চাহিদাটা  প্রকট হয়ে ওঠে। সুমুর  জীবনটা ইচ্ছায়  বা অনিচ্ছায় হোক, একটু ভিন্ন পথে চলে গেছে।  এই পথহারা আওরাত  সীমিত ক্ষনের জন্যে কারো কারো সান্নিধ্যে আশ্রয় খুঁজে বেড়ায়।  সনাতন বাঙালি নারীর স্বভাবগত লজ্জা তার লোপ পেয়েছে বা বিসর্জন দিতে হয়েছে।  এখন প্রাণ চায়, চক্ষুও চায়।  হয়তো, অনেকে হামিদার সঙ্গ পেয়ে “হামদ” করেছে।  হয়তো, কখনো কাওকে  মধ্যরাতের শুল্ক দিয়ে  ক্লান্তিতে পরে থাকে নিদ্রালু সুমু। স্থবির,আব্রু বিহীন শরীর নেতিয়ে পরে বিছানার এক দিকে, অবহেলিত স্তন দুটি অলসভাবে বুকের দুই পাশে।  সকাল হলে তার ক্ষনিকের  শয্যা সঙ্গী তাড়া  দেয় চলে যাওয়ার জন্য।  সে সহযোগী, তার বিবস্ত্র কোমল শরীরটাকে আদর করে ধরে পালক চুমোতে ভরে দেয় না কোমল ওষ্ঠ জোড়া , যুগল নেত্রপল্লব।  খেলেনা নাসা যুদ্ধ, জড়িয়ে ধরে না নিবিড় ভালোবাসার অস্থিরতায়, যেই কাম্য আজদাহাসম উষ্ণ আলিঙ্গনে দ্রবীভূত হয়ে উঠবে তার কোষ। 

    চপলমতি এই মেয়েটাকে কেউ নিবেদন করে না প্রেমের পূজারী ওমর খইয়ামের একটি রুবাইয়াৎ।  ভাসায়না তার জন্য দুখু মিয়ার প্রেমের তরী,  শ্যুট করেনা জর্জ স্ট্রেইট “I carry your love with me,”  নেই শেক্সপিয়ারের “one pain is lessen’d by another anguish” করার, মর্ম দেয়না  অবোধের শান্তনা সম টেনিসনের heart-wrenching রাইমে 

“I hold it true, whate’er befall;

I feel it when I sorrow most;

‘Tis better to have loved and lost

Than never to have loved at all.” 

    কিংবা উপহার দেয় না আদরের রঙিন চাদর, করেনা  ভালোবাসার ইফতার নিয়ে অধর্যতে অপেক্ষা রোজার সূর্যাস্তের,  যায়না মনোমুগ্ধকর  তুষারপাত দেখতে দেখতে হারিয়ে আনন্দ শঙ্করের “snowflower”তে। তার প্রথম কাননের কলি পুষ্পষিত হওয়ার আগেই শুকিয়ে যায় তাই একটি পূর্ণ বিকশিত জাহারার সুঘ্রান রিদয়ঙ্গম করেনি। ওর কাছে জীবনটা হয়ে যাচ্ছে রবার্ট ফ্রস্টের না খুঁজে পাওয়া ফুলের মতো।  

    সেই চিন্তার প্রসার ধরে আমি ঠীক করলাম ফোন নং exchange  করবো না।  যদি সে কোনো বিশেষ আহবান করে, সেই ডাকে সারা না দিলে লজ্জিত হবে তাই  আমি অপারগতা প্রকাশ করলাম বিনীত ভাবে। ও যাতে being rejected feel না করে তাই বললাম, ‘বোন, পৃথিবী ছোট হয়ে যাচ্ছে , who knows, we may bump each other sometimes soon!’ আর  মনের অজান্তে আওড়ালাম Latin একটা শব্দ “tempus fugit”. 

    সুমু তখন নিরসিক্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো।  দেখলাম ওর চেহারায় আহত, বিব্রতকর একটা ভাব ফুটে উঠেছে।  সুমুর পূর্ব পরিচিত পুরুষদের সঙ্গে ছিল ভিন্ন ধরণের অভিজ্ঞতা। কিন্তু  ওর মাঝে পাইনি কোনো বেহেল্লাপনা, বেদনার সাথে দেখেছি আগ্রহের ঝলক, সৌন্দর্যের স্ফুলিঙ্গ, a subtle sense of deep eagerness for subdued dream’র। দুই অচেনা বাংলাদেশী অনেক কথা বলেছি, তৃপ্তি পেয়েছি প্রায় এক  যুগ  পরে এক প্রবাসী বাঙালির সাথে স্বার্থবিহীন, অবহিত কথোপকথনে।  সুমু আমার কাছ থেকে  পেয়েছে ধীরে বয়ে যাওয়া  শুচি বাতাসের মৃদু ছোয়া।  হয়তো আমাদের এই ক্ষণিকের আলাপটুকু ওকে কিছু চিন্তার খোরাক দেবে। কামনা করেছি যেন উত্সৃঙ্খল জীবনের দেনা মিটিয়ে ভবিষ্যৎকে ছুঁয়ে দেখতে পারে। জীবন হয়ে উঠে মোহময় যখন আমরা চেষ্টা করি সুন্দর হবার। আসুক ওর জীবনে  স্বস্থির  নব লহরীর তরঙ্গ, বাজুক এক ভোরে বিসমিল্লাহ খানের সানাই।  না হয় হোক আজ ওর ধারণার একটু ছন্দপতন, থাকুক একটু অস্বস্তি, সংশয়।  It is nice to have a little mystery in life sometimes!

    ঘড়ি’র দিকে তাকিয়ে দেখলাম আমরা  প্রায়  ৮০  মিনিট আলাপ করেছি।  এরপর বেঞ্চ থেকে উঠে ফিস্ট শেক করে সুমুর কাছ থেকে  বিদায় নিয়ে আমি রওনা দিলাম গন্তব্যস্থলের  দিকে।  মধ্যাহ্নর প্রখর রোদের  তাপের তোরে সাবওয়ে যাওয়ার পথে হাটার গতি বাড়িয়ে  দিলাম। 

-অবিদিত আনকা, নিউ ইয়র্ক ‘২০ 

————————————————————–x————————————————————-

** উপক্রমণিকা **

আমেরিকা আসার পর, পারিবারিক সদালাপ ছাড়া আমার বাংলায় লেখার চর্চা হয়ে উঠেনি।  দীর্ঘ এক বিরতির পর, জুন’২০, বাংলাদেশের বেশ কিছু বাল্য-কৌশোরিক কালের সাথীদের সাথে আবার যোগাযোগ হয়।  হামিদা’র সাথে আমার দেখা হয় (ম্যানহাটান, নিউ ইয়র্কে) মধ্যে অগাস্ট ‘২০ আর উপরোক্ত যোগাযোগে উদ্বুদ্দ হয়েই এই লেখাটা লিখি।  এর পর আরো বেশ কয়েকটি আখ্যানরূপে ছোট গল্প লিখি আর একটি উপন্যাস মাত্র সম্পন্ন করেছি। 

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


You must be logged in to post a comment Login