সুমাইয়া হানি

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর সাক্ষাৎকার

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর সাক্ষাৎকার
Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

ggএকটি ভারতীয় সাময়িকীতে সুনীলের একটা সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারের কতগুলো কথা বেশ গুরূত্বপূর্ণ। সাক্ষাৎকারটি সুনীল ভক্তদের জন্য শেয়ার করলাম।

যেভাবে বেড়ে উঠি : মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে। সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভালোবাসাকে রেখে যাবে – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

জীবনের শুরুতে কারা আপনার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিলেন ?
জীবনের শুরুই যদি হয় তখনতো মা-বাবার প্রভাবই বেশি থাকে। এবং রবীন্দ্রনাথ। আমাদের পড়াশোনা তো রবীন্দ্রনাথ থেকেই শুরু। রবীন্দ্রনাথ মুখস্থ করা। প্রভাব যদি বলো সুজান, রবীন্দ্রনাথের প্রভাব খুবই আছে। আমার ‘মা’ বই পড়তে খুবই ভালোবাসতেন। ‘মা’ বই পড়তেন বলে আমিও বই পড়তাম। বাবা শিক্ষার জগতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ফলে বাড়িতে একটা শিক্ষার আবহাওয়া ছিল। সেগুলোই প্রভাব ফেলেছে।

জীবনের কোন্ ঘটনা আপনার বিশ্বাস গঠনে প্রভাব ফেলেছে?
অনেক ঘটনাই আছে। তার মধ্যে ধরো আমরা দেখেছি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। তার পরিপ্রেক্ষিতে একটা দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। একটা সময় মানুষ খেতে পেত না! আমরাও তার শিকার হয়েছিলাম। খাবার সংগ্রহ করতে আমাদের খুবই অসুবিধা হতো। তারপর দেখেছি দাঙ্গা। বীভৎস দাঙ্গা! যারা এক সময় প্রতিবেশী ছিল, বন্ধু ছিল তাদের মধ্যে হঠাৎ অবিশ্বাস, হিংসা চলে আসে। দাঙ্গার সময় কি হয়? যারা শক্ত লোক, যারা আসলেই খুনি, বদমাশ তাদের তো কিছু হয় না। হয় নিরীহ লোকদের। কত নিরীহ লোক মারা পড়েছে! বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে! আর যারা এসব রাজনীতি নিয়ে খেলেছে, তাদের এসব কিছুই হয়নি। দেশ বিভাগ দেখেছি। দেশ বিভাগের যে বিচ্ছেদ তা যেমন করুণ তেমন ভয়াবহও বটে। কত লোকের বাড়িঘর চলে গেছে। শুধু যে এখান থেকে আমরা চলে গেছি তাই নয় আবার পশ্চিম বাংলা থেকেও তো অনেকে এদিকে এসেছে। কাজেই দেখতে গেলে এসবেই বহু পরিবার, লাখ লাখ পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। এসবই তো মনের মধ্যে ছাপ ফেলে দিয়েছে। তাই এসব থেকেই সব সময় মনে হয়েছে মানুষ কেন মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে? মানুষ যদি এক হয়ে থাকতে পারত তাহলে পৃথিবীটা সত্যিই একটা সুন্দর জায়গা হতো। এই চিন্তা থেকেই তো লেখালেখি শুরু করেছি।

জীবিত অথবা মৃত কোন ব্যক্তিকে আপনি বেশি পছন্দ করেন এবং কেন?
কোন ব্যক্তি বলে একদম নির্দিষ্ট কেউ নেই। একেক সময় একেকজন হয়। তবে যদি পছন্দ করি এরকম অনেকেই আছে। ‘একজন কেউ নেই।’

কোন কোন বই, কোন কোন লেখক আপনার বিশ্বাসকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে, কেন?
রবীন্দ্রনাথের ‘গীতবিতান’। সেটা আমায় খুবই মুগ্ধ করেছে। রবীন্দ্রনাথের কবিতাও অনেক মুখস্থ করেছি। তবে গানের কথাগুলো আমাকে বেশি টানে। এখন অনেক গান গুন গুন করি। বেশি ভালো লাগে। তো আমাকে যদি কোথাও নির্বাসন দেয়, আমি বলব ‘গীতবিতান’ বইটি আমি চাই। সঙ্গে রাখব। তারপর যখন কলেজ চলে আসি লেখাপড়া করে যখন বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে একটু একটু ধারণা হয় তখন মনে হয় যে শেকসপিয়রের লেখা না পড়লে তো আমার জীবন ব্যর্থ! এসব পড়েছি। কাজেই এগুলোই আমার জীবনের প্রিয় জিনিস। আরও অনেক কিছুই আছে।

একটি গান, একটি চলচ্চিত্র, একটি নাটক, একটি বই অথবা তার অংশ বিশেষের উল্লেখ করুন- যা আপনি অন্যকে শুনতে, দেখতে বা পড়তে উৎসাহিত করবেন?
প্রিয় একটি গান? আজকে যে গানটা প্রিয় দুদিন বাদে সে গানটা একটু পুরনো হয়ে যায়। অন্য একটা গান এসে পড়ে। তবুও তুমি যখন বলছ আমি এই মুহূর্তেই বলছি রবীন্দ্রনাথের ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলে রেঃ’। গানটা আমার প্রিয় গান। অনেক নাটকের মধ্যে একটি ‘গ্যালিলিও’। এটি আমি বাংলায় দেখেছিলাম। সত্যজিৎ রায়ের (পথের পাঁচালির পরের পাঠ) ‘অপরাজিতা’। এটিকে আমার খুব উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র বলে মনে হয়। আর বই? অনেক আছে। একেক সময় একেকটা প্রিয় হয়।

জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আপনি নিজের মত ছাড়া অন্য কার মতামতকে গুরুত্ব দেন?
সব সময় আমি নিজের সিদ্ধান্তটা নিজেই নিয়েছি। আমি খুব একটা পারিবারিক প্রাণী ছিলাম না। অল্প বয়স থেকেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজে নিজেই ইচ্ছেমতো কাজ করেছি। এখন তো বিবাহিত জীবনে অনেক সময় আমার স্ত্রীর মতামত নিতে হয়। সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যেমন এখানে আসার ব্যাপারটা আমার স্ত্রীর মতামতটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এছাড়া আরও অনেক ব্যাপারে আমি নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি।

আপনার পছন্দের প্রিয় উদ্ধৃতি কোনটি?
হ্যামলেটের একটি লাইন আছে ‘‘ও থ্র“ অ্যাওয়ে দ্য ওয়ার্ডস আওয়ার পার্টস অব ইচ/ অ্যান্ড লিভ দ্য পিওরার দ্য আদার হাফ’’ মানে মানুষের জীবনে তো অনেক দোষ থাকে, ত্র“টি থাকে, অন্যায় থাকে! জীবনে আমরা এগুলোতো করি। কিন্তু এগুলোকে আমরা জীবনের একটা অর্ধেক অংশ যদি ধরে নেই তবে জীবনে আবার সুন্দর, পবিত্র ব্যাপারও থাকে। সেই অর্ধেক যেগুলো খারাপ সেগু লো ত্যাগ করে যে অর্ধেকে পবিত্রতা আছে সেই অর্ধেকটিকে গ্রহণ কর। হ্যামলেটের এই উক্তিটি আমার খুবই প্রিয়। আমার স্মৃতিকথা বা আত্নজীবনী ধরনের বই আছে আমি তার নাম দিয়েছি ‘অর্ধেক জীবন’। অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে অর্ধেক জীবন কেন? তার মানে কিন্তু আমার আয়ুর অর্ধেক না। কারণ আমার জীবনে ঐ যে অংশটা হ্যামলেট যেটা বলেছে পবিত্র বা প্রিয় অংশ সেটার কথাই বুঝিয়েছি। খারাপ দিকটা আমি দেখিনি।

আপনার মতে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মুক্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা কোনটি?
ব্যক্তিস্বাধীনতা বা মুক্তির পথে বাধা হচ্ছে ‘সংস্কার’! অনেক পারিবারিক সংস্কার থাকে। সেই সংস্কার থেকে মুক্ত হতে অনেক সময় লাগে। বুঝেছো সুজান? যেমন ধরো, মেয়ে পুরুষের যে তফাৎটা আমাদের বিভিন্ন ধর্মে করে রেখেছে, পরিবার থেকে যেগুলো আরোপ করা হয়েছে, স্বামীরা যেগুলো স্ত্রীদের ওপর আরোপ করে এসব থেকে যদি মুক্তি না পাওয়া যায়, মনের দিক থেকে যদি মুক্তি পাওয়া না যায় তাহলে উন্নতি হবে না। এই সংস্কার থেকে মুক্তি হচ্ছে আসল।

আপনি যদি একজন আইনপ্রণেতা হতেন তাহলে সবার আগে কোন আইনটি প্রণয়ন করতেন?
বলতাম যে ধর্মটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। যার যেমন ধর্ম ইচ্ছা সেটা বাড়ির মধ্যে পালন করো। ধর্মটাকে রাস্তায় নিয়ে এসো না। রাস্তায় নিয়ে এসে এক ধর্মের জিগির তুলে আরেক ধর্মের সঙ্গে শত্র“তা করো না। এটা করা নিষিদ্ধ করে দিতাম। প্রত্যেককেই বলতাম যে ধার্মিক হতে চাও ধার্মিক হও। নিজের ধর্মকে গুরুত্ব দিয়ে পালন করো বাড়ির মধ্যে। রাস্তায় না।

একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে দেশের জন্য কোন কাজগুলো জরুরি করণীয় বলে আপনি মনে করেন?
আমি ‘দেশপ্রেমিক নাগরিক’ তোমাকে কে বলল? আমি মানুষের মঙ্গলের জন্য চিন্তা করি। দেশ বলতে যা বোঝায় তার মধ্যে অনেক রকম সংস্কার থাকে। যেমন একটা দেশের নেতারা আরেকটা দেশের সঙ্গে উস্কানি দিয়ে যুদ্ধ বাধিয়ে দিল। সারা দেশকে অন্য দেশের সঙ্গে শত্র“তা করিয়ে দেয়। এই আমি ‘দেশ’ পছন্দ করি না। বুঝেছ? সুতরাং আমি ওইভাবে ‘দেশপ্রেমিক’ নই। আমি দেশের মানুষের যেন উন্নতি হয়, সব মানুষের যেন উন্নতি হয় সেটাই চাই।

আপনার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় বছর কোনটি? কেন সেটা স্মরণীয়?
যে বছরটিতে আমি বিয়ে করি। বিয়ে করাটা জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। তার কারণ হচ্ছে, আমি স্বাভাবিকভাবে বিয়ে করিনি! ভেবেছিলাম আমি ‘বিয়ে’ করবই না। বিয়ে না করেও বেশ ভালোভাবেই জীবন কাটানো যায়। কিন্তু একটি মেয়ের সঙ্গে গভীর আলাপ হল। তারপর তাকে বিয়ে করলাম। তখন তার অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যাচ্ছিল। কাজেই বিয়েটা না করলে তাকে তখন আটকানো যেত না। বিয়েতে ছিল অনেক বাধা!

আপনার জীবনদর্শন কি? সংক্ষেপে বলুন।
আমার জীবনদর্শন হচ্ছে মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে। সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভালোবাসাকে রেখে যাবে।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


5 Responses to সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর সাক্ষাৎকার

  1. imrul.kaes@ovi.com'
    শৈবাল নভেম্বর 26, 2011 at 7:15 অপরাহ্ন

    কৃতজ্ঞতা সুমাইয়া হানি , আরো একটি ভালোলাগা পোস্টের জন্য । তবে এক জায়গায় আঁচ লাগলো আমার , সূত্রটুকো ভারতী এক সাময়িকী শুধু এইটুকু না সাথে কোন সাময়িকী নামটা জানিয়ে তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা চাওয়টা বোধ হয় সুশীল ছিল , এই ধরণের প্রকাশে তাদেরও শর্ত থাকতে পারে ।

  2. rabeyarobbani@yahoo.com'
    রাবেয়া রব্বানি নভেম্বর 28, 2011 at 2:58 পূর্বাহ্ন

    সুমাইয়া আপনি কি ঠিক করছেন যে শুধু পোষ্ট করবেন কথা বলবেন না।:D
    ব্লগ পোষ্টে উত্তর দিলে পোষ্ট সজীব লাগে আর অসস্তি তৈরি হয় না।
    তবে যাই হোক পোষ্টটা বেশ পছন্দ হয়েছে।সুনীল ভক্ত হয়ত তাই।

    দেশ বলতে যা বোঝায় তার মধ্যে অনেক রকম সংস্কার থাকে। যেমন একটা দেশের নেতারা আরেকটা দেশের সঙ্গে উস্কানি দিয়ে যুদ্ধ বাধিয়ে দিল। সারা দেশকে অন্য দেশের সঙ্গে শত্র“তা করিয়ে দেয়।

    সুনীল বাবুর এই কথাটি খুব মনে ধরেছে।এভবেই ভাবি।ভাষা বা দেশ প্রেম যেন অন্য ভাষা বা অন্য দেশের মানুষকে ছোট করতে না শেখায়।অন্যকে সম্মান দিয়েই নিজে সম্মান পাওয়া যায়।মানবতার উর্ধে কিছু হওয়া উচিত নয়।যারা আমাদের দেশকে ছোট করল বা ভাষাকে তারা নিজেরাই ছোট আমরা যেন তেমন না হই।

  3. mannan200125@hotmail.com'
    চারুমান্নান নভেম্বর 28, 2011 at 9:39 পূর্বাহ্ন

    :rose: :rose: :clover: :clover: :clover: :clover: :clover: :clover:

  4. touhidullah82@gmail.com'
    তৌহিদ উল্লাহ শাকিল নভেম্বর 29, 2011 at 3:24 পূর্বাহ্ন

    আমার জীবনদর্শন হচ্ছে মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে। সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভালোবাসাকে রেখে যাবে।
    কঠিন কথা

  5. roy.sokal@yahoo.com'
    অরুদ্ধ সকাল নভেম্বর 29, 2011 at 11:46 পূর্বাহ্ন

    গভীর গোপনে

You must be logged in to post a comment Login