বাংলার কৌতুক বনাম পাক হানাদার

নয় মাসে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ। পৃথিবীর ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত মানুষ  আর কোথাও জীবন দেয় নি। আবার, আধুনিক বিশ্বের প্রথম উদাহারন যেখানে রক্তাক্ত, সশস্ত্র সংগ্রাম করে, একটা  জাতি স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে। একটা ভূখণ্ড আলাদা করে নিজের ভাষার নামে দেশের নাম করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধকে বিশ্লেষণ করলে এরকম অনেক অনন্য সাধারন ঘটনা উঠে আসে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ, শুধু পাক হানাদার বাহিনীর সাথে অস্ত্র আর গোলা বারুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পুরো বাংলাদেশ স্বাধীনতা চেয়েছে, যারা পেরেছে সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেছে। আর অন্যরা  তাদের যার যেই শক্তি আর উপায় ছিল, তাকে সম্বল করে যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছে। জাকারিয়া পিন্টু, সালাউদ্দিন প্রমুখ ফুটবল দল গড়ে তুলে সারা ভারত জুড়ে খেলে বাংলাদেশের জন্যে জনমত তৈরির কাজ করেছিলেন। যারা লিখতে পারতেন, তারা হলেন কলম সৈনিক, আবৃত্তিকার, গানের শিল্পীরা  হলেন শব্দ সৈনিক। শিল্পীরা ছবি, কার্টুন দিয়ে তাদের প্রতিবাদের কথা প্রকাশ করলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল যেন বাঙ্গালিদের নৈতিক মনোবলের শক্তিশালি কামান। একেবারে সম্মুখ যুদ্ধে যারা ছিলেন, তাদেরকে সাহস ও অনুপ্রেরনা  যোগাত “একটি  ফুলকে বাঁচাবো বলে”, “তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর” এ ধরনের আরও অনেক গান। এম আর আখতার মুকুলের “চরম পত্র” র ব্যাঙ্গাত্নক পরিবেশনাগুলো সবার মুখে মুখে ফিরত। প্রবাসী বাঙ্গালিরাও অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছিলেন। কেও fund raise করার কাজ করেছেন, কেও  বিশ্বের জনগনের সমর্থন গড়ার কাজ করেছেন। এমনকি কিছু প্রবাসী বিদেশ থেকে ফিরে এসে সরাসরি স্বাধীনতার যুদ্ধে পর্যন্ত অংশগ্রহন করেছেন। বাঙালি মায়েরা তাদের দ্বার খুলে দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে। যারা অন্য কোন ভাবে অংশগ্রহন করতে পারেন নি, তাদের দোয়া আর শুভেচ্ছা থাকত বাংলাদেশের বিজয়ের জন্যে।

স্বাধীনতার যুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে, সৃষ্টি হয়েছিল বেশ অনেক ব্যাঙ্গাত্নক কৌতুক। কোন কৌতুক,  কে সৃষ্টি করেছিলেন, তা এখন বের করা প্রায় অসম্ভব। কিছু হয়ত সত্য ঘটনা ছিল,

বাকী গুলো নিছক বানানো। কিন্তু এই সব কৌতুক প্রমান করেছিল বাঙ্গালিরা ভীষণ বিপদ থেকেও,  সৃষ্টি আর হাসি দুই কাজই সমান তালে চালিয়ে যেতে পারে। এই সব কৌতুক সেই সময়কার চরম উৎকন্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষদের শুধুই বিনোদনই দেয় নি, তাদের নৈতিক শক্তিকে অটুট রাখতে বিশাল একটা ভুমিকা রেখেছিল।

আজকের লেখা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ  চলাকালীন সময়কার কিছু কৌতুক গল্প আর পাক হানাদারদের  বুদ্ধির নমুনা নিয়ে। তবে বিষয়বস্তুতে যাবার আগে, একটা সত্যি ঘটনা বলি। পাক সরকার বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল, যখন তারা আবিষ্কার করলো, বাংলা ভাষা আর রবীন্দ্রনাথ  একেবারাই এক সাথে গাঁথা। অনেক ভেবে পূর্ব  পাকিস্তানের যিনি গভর্নর ছিলেন, তিনি ডেকে পাঠালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের একজন স্বনাম ধন্য শিক্ষককে। বললেন, আপনারা কি করেন, রবীন্দ্র সঙ্গীত লিখতে পারেন না।

বুঝতেই পারছেন, প্রতিপক্ষ যদি রবীন্দ্র সঙ্গীত কি, তাই যদি না জানে, তা হলে ব্যাপারটা কি ধরনের হতে পারে। একটা ছোট শিশুও বলে দিতে পারবে, রবীন্দ্র সঙ্গীত একমাত্র রবীন্দ্রনাথই লিখে গিয়েছেন। একটা শিশুর জ্ঞান পর্যন্ত  যদি শাসক মহলের না থাকে,তার পরিণতি কি মারাত্মক হতে পারে তা আমরা আজকে সবাই জানি। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ রাতে তারা লেলিয়ে দিয়েছিল সেই সময়কার পৃথিবীর সবচেয়ে  সুসজ্জিত সেনাবাহিনীকে ঘুমন্ত বাঙ্গালীদের উপরে। যদি কখনো বিশ্ব গাধা সিদ্ধান্তের তালিকা বানানো হয়, সম্ববত, আমাদের প্রতিপক্ষদের এই সিদ্ধান্ত, তালিকার শীর্ষ  কিংবা তার একেবারে কাছাকাছি থাকবে। তারা গুলি আর কামান দিয়ে একটা সভ্যতা ধ্বংস করতে চেয়েছিল। তাদের এক দোসর হিটলার চেয়েছিল  ইহুদি নামক জাতিকে  পৃথিবীকে মুছে  ফেলতে। অনেক অত্যাচার করেও তারা সেটা  করতে পারে নি।   পাকিস্তানিরাও পারেনি হামলা করে বাঙ্গালীদের অস্তিত্ব শেষ করতে। ইতিহাস থেকে সামান্য শিক্ষা নেয় নি তারা। এই ক্ষুদ্র  বিষয়টা তাদের মাথায় ছিল না যে, মানুষ হত্যা করে কখন একটা জাতিকে বিলীন করা যায় না। ত্রিশ লক্ষ মানুষ খুন করার ব্যাখ্যা তারা আজ কোন ভাবেই দিতে পারবে না। সিদ্ধান্ত গ্রহনের দিক থেকে নিজেকে তারা বিশ্ব সমাজের কাছে, একটা হাসির পাত্রে পরিনত করেছে। হাসিটা অবশ্যই নিন্দা আর বিদ্রুপের।

যাই হোক, এতক্ষণ তো হল শাসকদের কথা। এখন শাসকগোষ্টি যাদের বাঙ্গালীদের নিধন করতে পাঠিয়েছিল, তাদের কিছু কর্মকাণ্ডের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। আরম্ভ করি একটা পাঠান হানাদারের সৈনিকের গল্প দিয়ে। সে ঘটনাক্রমে একটা বাঙ্গালিকে গ্রেফতার করলো। স্যালুট দিয়ে তার তার ঊর্ধ্বতন  অফিসারকে নিয়ে আসলো তার বীরত্ব দেখাতে। কিন্তু যে গাছ তলায় তার বন্দী  থাকার কথা, সেখানে কেও নাই। সৈনিক খুব চিন্তিত হয়ে পরল, বিষয়টা কি। অফিসার বলল, হাত, পা দুই কি বেঁধেছিলে। সৈনিক অবাক হয়ে জানতে চাইল, হাত কেন? শুধু পা বেঁধেছিল।  পেশাওয়ারে তো তাই করা হয়। খোলা হাত যে পায়ের বাঁধন খুলে ফেলতে পারে, তা তার মাথায়  আসে নি।

আরেক দাড়ি ওয়ালা হানাদার সৈনিক, এক বসাতে এক কাঁঠাল খেয়ে ফেলল। হাতের কাঁঠালের আঠা কোন ভাবেই উঠাতে পারছিল না। জিজ্ঞাসা করলো দশ বছরের এক বালককে, কি করলে আঠা  পরিস্কার হয়। ছেলেটা নির্বিকার  ভাবে বলল, চুল আর দাড়িতে ঘষতে। তার পরে ভেবে  দেখুন অবস্থাটা। শেষে বাধ্য হয়ে, সৈনিক সাহেবকে দাড়ি কামিয়ে, চুল ফেলে ন্যাড়া হতে হল।

এক বার এক রাজাকার চিনিয়ে দিল এক হিন্দু পরিবারের বাসা। পাক বাহিনী ঘরে ঢুকেই দেখল ফ্রেমে বাঁধানো রবীন্দ্রনাথের ছবি। সাথে সাথেই বলল, য়ে তো সাচ্ছা মুসলমানকা হায়। খুবই বিরক্ত হয়ে ভুল খবর দেবার জন্যে রাজাকারকে তারা বেঁধে নিয়ে গেল।

পাক হানাদার বাহিনী এক বার ঠিক করলো, পুরুষ মানুষরা মুসলমান কিনা, তা তারা পরীক্ষা করা আরম্ভ করবে। কথাটা ছড়িয়ে পড়ল বাতাসের গতিতে। হিন্দু, মুসলমান সবাই কলেমা মুখস্থ করে ফেলল। কি মুশকিল, তাদের প্রথম আইডিয়া কাজ করলো না। এর পর, তারা পুরুষদের যৌন অঙ্গ দেখা আরম্ভ করলো, মুসলমানি  হয়েছে কিনা সেটা নির্ধারণ করার জন্যে। যদিও ব্যাপারটা বাঙ্গালীদের জন্যে একটা অপমানজনক ছিল, তবুও পাক বাহিনীর বুদ্ধির এই মান আমাদেরকে এখন একটা প্রচণ্ড ধিক্কারের হাসি দেয়।

পাক বাহিনী আসবে, এই কথা শুনলে গ্রামের সব মানুষ উর্ধ্বশ্বাসে পালাতে থাকত। শুধু থাকত, বয়স্ক মহিলারা। তার পরেও ওরা সুযোগ খুঁজত কিভাবে অত্যাচার আরম্ভ করা যায়। একবার

হানাদাররা এক গ্রামের এক বাড়ির উঠানে এসে দেখল, কিছু মুরগী হেটে বেড়াচ্ছে। পাক বাহিনী জানতে চাইলো, মুরগীদের কি খাওয়ানো হয়। বাঙালি বৃদ্ধারা ভাবলেন, যদি গম বলা হয়, তা হলে  হয়ত রেহাই পাওয়া যেতে পারে। কারণ পাক বাহিনী গমের আটার রুটি খায়। পাক বাহিনী মুরগী গম খায় শুনে বলল, “হাম লগ রুটি খাতা, আর তুমহারা মুরগীভি গম খাতা, এয়া তো বেয়াদবি হ্যায়”। সাথে সাথে আরম্ভ হয়েত গেল মার-পিট। কয়েকদিন পরে আবার পাক বাহিনী হাজির। এই বার মহিলারা বললেন, মুরগীরা চাল খায়। সাথে সাথেই  আবার মারপিট, “ সারা দেশমে চাষাবাদ নেই হ্যায়, আর তুমলোগ উসলোককো চাউল খিলাতা”।

বেশ কিছুদিন পর আবার পাক সেনারা ফিরল। ওদের দেখা মাত্র এক বৃদ্ধা মহিলা চিৎকার করে বললেন, “মুরগীর মুখে এক পয়সা ডুকায় দেতা হ্যায়, মুরগীলোক দোকানসে যা ইচ্ছা তাই কিনে  খাতা হ্যায়”। এই বার সেনারা আর কোন উত্তর খুঁজে পেল না। প্রথম বারের মত, মারপিট না করে চলে গেলো।

এম আর আখতার মুকুল রসালো সুরে তার চরম পত্র অনুষ্ঠানে বলতেন, ১৯৭১ সালে বঙ্গ দেশে  মোছওয়ালাদের রাজত্ব শেষ করে সমাধি বানানো হবে। আসলে তাই হয়েছিল। কিন্তু তাদের সমাধি বানাতে বাঙালির যে মুল্য দিতে দিয়েছে তার কোন নজির নাই। কিন্তু সবচেয়ে অবাক হবার মত ব্যাপার হল, কোন আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই ছিল বাঙ্গালীদের মুক্তি যুদ্ধ। এ যুদ্ধ শুধু ছিল সার্বিক যুদ্ধ।  পাক বাহিনীকে নিয়ে ব্যাঙ্গাত্নক কৌতুক গল্প তৈরি করে মানুষের মুখে মুখে ছরিয়ে দেয়াও ছিল অনেক অস্ত্রের মধ্যে একটা অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র। এ গুলোকে সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব। না হলে হয়ত আমাদেরও কৌতুকের পাত্রে পরিণত হবার সম্ভবনা আছে।

মার্চ ১০, ২০১১

টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র

www.lekhalekhi.net

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

19 Responses to বাংলার কৌতুক বনাম পাক হানাদার

  1. আপনাদের কারো যদি, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়কার আর কোন কৌতুক জানা থাকে, তা হলে প্লিজ শেয়ার করুন। আমি এ লেখাটার ভবিষ্যত সংস্করনে তা যোগ করবো। সে জন্য অগ্রিম ধন্যবাদ জানিয়ে রাখলাম।

    quazih@yahoo.com'

    কাজী হাসান
    ডিসেম্বর 6, 2011 at 2:46 পূর্বাহ্ন

  2. অসাধারণ লেখা। কৌতুক আর মুক্তিযুদ্ধের সুন্দর সম্মিলন ঘটিয়েছেন। কৌতুক মনে করতে পারলে এখানে এসে জানিয়ে যাব।

    khalid2008@gmail.com'

    শাহেন শাহ
    ডিসেম্বর 6, 2011 at 2:52 পূর্বাহ্ন

  3. পড়া কৌতুক, কোথাও পড়েছিলাম। আপনার জন্য আবারও বলছি:

    ১. যুদ্ধ চলাকালীন পাঠানদের নিয়ে একটা কৌতুক খুবই প্রচলিত ছিল পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে। পাকিস্তানি সেনাদের হর্তাকর্তারা একত্রিত হলে প্রায়ই নাকি এ কৌতুকটি নিয়ে হাসাহাসি করতেন। কৌতুকটি ছিল এ রকম—ভেতরে মিটিং চলছে, বাইরে পাহারায় রয়েছেন দুই পাঠান। তো পাঠানদের প্রতি নির্দেশ ছিল, কেউ যদি ঢুকতে চায়, তাহলে ঢুকতে দিয়ো না। কিন্তু হঠাৎই কোথা থেকে দুজন এসে সরাসরি ভেতরে ঢুকে পড়ল। প্রথম দুজনকে দেখে এরপর অন্য আরেকজন এসে পাঠানদের বলল, ‘আমরা ভেতরে যাব।’
    পাঠান: না, ভেতরে ঢোকা নিষেধ।
    ‘তাহলে সামনের দুজনকে ঢুকতে দেখলাম যে?’
    পাঠান: ওরা তো আর আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। তুমি জিজ্ঞেস করেছ, তাই মানা করলাম।

    ২. এক ইন্ডিয়ান আর্মির (মিত্র বাহিনী) বাসায় পার্টি হচ্ছে। সে সময় একজন কর্নেল তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ড্যান্স পার্টি দেখছেন। এমন সময় অবিবাহিত এক অফিসার এসে মহিলাকে বলছেন—
    ‘ইউ আর সো মাচ বিউটিফুল!’
    এরপর তিনি কর্নেলকে বলছেন—
    ‘এসো, আমরা ড্রিংক করি আর তোমার বউকে ছেড়ে দাও, সবার সঙ্গে নাচুক। সঙ্গে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছ কেন?’
    কর্নেল: তুমি আগে বিয়ে করো, তারপর তোমার বউকে সবার সঙ্গে নাচতে দিয়ো। দেখব তখন কেমন পার তুমি। আমি গেলাম।

    ৩. জেনারেল ওসমানীর কড়া নির্দেশ ছিল, রাত ১০টার পর ক্যাম্পে ঢুকতে পাসওয়ার্ড লাগবে (ভয়েস পাসওয়ার্ড)। সে সময় একদিন ওসমানীর বেশ কয়েকজন অধীনস্ত সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট লুকিয়ে গিয়েছিলেন সিনেমা দেখতে। স্বভাবতই ফিরতে রাত হয়েছিল। এত রাতে গার্ড তাঁদের ক্যাম্পে ঢুকতে দিচ্ছিল না। গার্ড তাঁদের যা-ই জিজ্ঞেস করে, তাঁরা কোনো উত্তর দিতে পারছিলেন না। কারণ এরই মধ্যে সিনেমার আনন্দে সবাই পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন। শেষমেশ পাসওয়ার্ড মনে করে তাঁদের ক্যাম্পে ঢুকতে ঢুকতে রাত তখন আড়াইটা।

    ৪. মিত্র বাহিনীর যৌথ ট্রেনিং চলছে। ট্রেনিংয়ের সময় বাঙালিরা পাথরওয়ালা ভাত খেতে পারত না। এটা দেখে এক ইন্ডিয়ান সেনা বলছিলেন—
    —‘তোমরা তাহলে কী খাও?’
    মুক্তিযোদ্ধা : আমরা আমাদের দেশে বাসমতি চালের ভাত খাই।
    ‘আয় হায়! তাহলে তোমরা যুদ্ধ করছ কেন? আমরা তো এই পাথরওয়ালা ভাত খেয়েও চুপচাপ আছি।’

    ৫. এবার শোনাব এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার কথা। ছেলেটার বয়স ছিল ১৩ কি ১৪ বছর। তো সেই ছেলেটা যুদ্ধের ময়দানে একদিন এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটিয়ে ফেলল। তুমুল যুদ্ধ চলছে। পাকিস্তানি বাহিনী পরাস্ত। বেঁচে আছে মাত্র দুজন মিলিটারি। তাদের মধ্যে একজন ভয়াবহ গুলিবিদ্ধ, বড়জোড় আর আধঘণ্টা বাঁচতে পারে। অন্যজনের এক পা গুলিতে ঝাঁজরা। এমন সময় হঠাৎ দাঁড়িয়ে রাইফেল তাক করে দাঁড়ানো সেই ১৩-১৪ বছরের ছেলেটি। কী অদ্ভুত, সে গুলি করছে না। ট্রিগারে তার আঙুল শক্ত করে চেপে ধরা, কিন্তু সে গুলি করছে না। সবাই বিস্মিত, কোথায় গেল ছেলেটার রাগ। এটা সেই ছেলে তো, যে কি না তার পুরো পরিবারের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি। যে কিনা সব পাকিস্তানিকে একাই মেরে ফেলবে বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যে কিনা আজকেও সবার সামনে থেকেই ফাইট করছিল। নাহ, কিছুই মিলছে না। এদিকে পায়ে গুলি লাগা আর্মিটি ধীরে ধীরে ক্রল করে এগিয়ে যায় মুমূর্ষু আর্মিটির কাছে। রীতিমতো আরেকটা যুদ্ধ করে বহু কষ্ট করে কাঁধে তুলে নেয় তাকে। তার মনেও ঝড় চলছে। যেকোনো মুহূর্তে গুলি করে দিতে পারে এ বাচ্চা ছেলেটা। কিন্তু কিছুই করার নেই। যদি বাচ্চাটার মনে একটু দয়া হয়, যদি সে গুলি না করে, তাহলে হয়তো এ যাত্রায় সে বেঁচে যাবে। সবাইকে হতবাক করে, যতক্ষণ না পাকিস্তানি আর্মিটি তার সহযোদ্ধাকে কাঁধে করে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে চোখের আড়াল হলো, ততক্ষণ ছেলেটা রাইফেল তাক করে রাখল, কিন্তু কোনো নড়াচড়া বা গুলি করল না। স্বভাবতই এমন ঘটনার পর সবাই তাকে গুলি না ছোড়ার কারণ জানতে চাইল।
    উত্তর এল, ‘কইতারি না কেন গুলি করি নাই।’
    যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর বিপক্ষে লড়াই করা এক অকুতোভয় যোদ্ধার মুখ থেকে কথাটা শুনতে সবার সেদিন কষ্টই হয়েছিল।
    <:-P
    আপনার কাজে লাগলেই আমার ভাল লাগবে।

    khalid2008@gmail.com'

    শাহেন শাহ
    ডিসেম্বর 6, 2011 at 3:04 পূর্বাহ্ন

  4. যুদ্ধে কত কাহিনী, কত ঘটনা, কত ছবি, কত দু:খ, কত হাহাকার, কত রক্ত, কত মৃত্যু, কত রটনা, কিন্তু সব কিছু ছাড়িয়ে শেষ অবধি শুধু তিনটিই কথা, “স্বাধীনতা”, “স্বাধীনতা”, “স্বাধীনতা”!

    চমৎকার লেখনি।

    রিপন কুমার দে
    ডিসেম্বর 6, 2011 at 3:33 পূর্বাহ্ন

    • “এক হাতে মোর বিষের বাঁশরী, আরেক হাতে রণ তূর্য” বাঙ্গালী হাসতে হাসতে যুদ্ধ করতে পারে। এদের ক্ষমতাকে ছোট করে দেখাটা বোকামি। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ রিপন।

  5. ভীষণ ভালো লাগলো পোস্টটা

    imrul.kaes@ovi.com'

    শৈবাল
    ডিসেম্বর 6, 2011 at 3:51 পূর্বাহ্ন

  6. সব মিলিয়ে সুন্দর । ভাল লেগেছে

    touhidullah82@gmail.com'

    তৌহিদ উল্লাহ শাকিল
    ডিসেম্বর 6, 2011 at 11:55 পূর্বাহ্ন

  7. আপনার চিন্তার ভিন্নতা আপনার লেখনীতে প্রকাশ পায়।ভালো থাকুন নিরন্তর।আপনার কথার খেই ধরে বলতে চাই,
    “এক হাতে মোর বিষের বাঁশরী, আরেক হাতে রণ তূর্য” বাঙ্গালী হাসতে হাসতে যুদ্ধ করতে পারে। এদের ক্ষমতাকে ছোট করে দেখাটা বোকামি।
    এখন সেই ক্ষমতা দেখানোর ভীষণ প্রয়োজন।কেন বলুনতো আমরা ঘুমিয়ে পড়ছি?

    rabeyarobbani@yahoo.com'

    রাবেয়া রব্বানি
    ডিসেম্বর 7, 2011 at 3:09 পূর্বাহ্ন

  8. নয় মাসে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ। পৃথিবীর ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত মানুষ আর কোথাও জীবন দেয় নি। আবার, আধুনিক বিশ্বের প্রথম উদাহারন যেখানে রক্তাক্ত, সশস্ত্র সংগ্রাম করে, একটা জাতি স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে। একটা ভূখণ্ড আলাদা করে নিজের ভাষার নামে দেশের নাম করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধকে বিশ্লেষণ করলে এরকম অনেক অনন্য সাধারন ঘটনা উঠে আসে।

    আমার কথাও তাই।
    ভালো থাকুন।

    রাজন্য রুহানি
    ডিসেম্বর 7, 2011 at 10:33 পূর্বাহ্ন

    • ঠিক বলেছেন। আমি মনে করি, আমরা যারা লিখি, তাদের একটা দায়িত্ব আছে মুক্তিযুদ্ধকে বিভিন্ন ভাবে নিয়ে আসা। এর আবেদন যাতে চির সবুজ থাকে। অনেক ধন্যবাদ।

      quazih@yahoo.com'

      কাজী হাসান
      ডিসেম্বর 8, 2011 at 2:46 পূর্বাহ্ন

  9. লেখাটি পড়ে মনের উজ্জিবিত শক্তি আরো দৃঢ় হল। আন্তরিক ধন্যবাদ রইল হাসান ভাইয়া। :rose: :rose:

  10. স্বাগতম।

    quazih@yahoo.com'

    কাজী হাসান
    ডিসেম্বর 13, 2011 at 2:15 পূর্বাহ্ন

You must be logged in to post a comment Login