তৌহিদ উল্লাহ শাকিল

বর্ণমালা

Decrease Font Size Increase Font Size Text Size Print This Page

//তৌহিদ উল্লাহ শাকিল//

‘হাই, গ্র্যান্ড পা  । হাউ আর ইউ’( বলে আজাদ সাহেবের একমাত্র নাতী  ভেতরে চলে গেল )

আজাদ সাহেব স্থির হয়ে বসে রইলেন আরামদায়ক সোফায়। সময় কত দ্রুত গড়িয়ে যায়। এক সময় তিনি ও যুবক ছিলেন । সেই উম্মাতাল দিনে তিনি ও মুক্তির মিছিলে ছিলেন । যদিও আজ কেউ তাকে চিনে না । কেউ তার খবর রাখে না । নাতির  রুম থেকে হিন্দি গানের সুর শুনা যাচ্ছে উচ্চ স্বরে ।“মুন্নি বদনাম…।“

পরিবারের সকলকে  তিনি অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছেন । সেই স্বাধীনতার  সুযোগে ছেলে , নাতি আজ যা ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছে দেশের রাজনীতি বিদদের মত ।একসময় পাকিস্তানের হায়নাদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন তিনি , বাঙ্গালী জাতি কে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছিলেন তিনি এবং সকল যুদ্ধারা । সেই স্বাধীনতার মানে যদি এমন হত তাহলে কি দেশ স্বাধীন হত ? প্রশ্নটা মাঝে মাঝে মনের গভীরে খোঁচা দেয় আজাদ সাহেবের ।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তিনি তখন তরুন । গরম রক্তে শরীর টগবগ করে । ভার্সিটির ক্যাম্পাসে একদিন শুনলেন রাষ্ট্র ভাষা বাংলা থাকবে না । সেই থেকে আন্দোলনে নেমে পড়লেন । ভাষা আন্দোলন। সালাম , বরকত , রফিক , জব্বারের নাম সবাই জানলে ও আজাদ সাহেব এবং সেই মিছিলে থাকা অগনিত ছাত্র জনতার সকলের নাম কি সবাই জানে । সেই নেপথ্য নায়কের তিনি ও একজন । আজ একাশি বছর বয়সে মনে হয় , এগুলো তো সেদিনের ঘটনা । রাতের পর রাত জেগে পোস্টার ব্যানার পেস্টুন লেখা ছিল উত্তাল সেই সময়ের নিত্য দিনের কাজ । অভুক্ত থাকলে ও ক্ষুধার কথা মনে জাগেনি তখন ভাষার জন্য অপরিসীম ভালবাসায় ।

সেই আজাদ সাহেবের আজ কষ্ট লাগে যখন ভাষার বিকৃত উপস্থাপন হয় । যখন বাংলা ভুলে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছেলে মেয়ে বাবা মাকে আর বাবা কিংবা মা বলে না ডেকে ডেড কিংবা মাম্মি বলে ডাকে । আধা বাংলা আধা হিন্দি এবং ইংলিশ মিলিয়ে বক্তৃতা দেয় যখন কোন রাজনীতিবিদ , তখন আজাদ সাহেবের কষ্ট লাগে । কিন্তু কাকে বলবেন সে কথা । নিজের ছেলেই তার কথা শুনেনা । অন্য কারো শুনতে দায় পড়েছে।

একসময় চাকুরীর খাতিরে আজাদ সাহেবকে জার্মান , ইটালী এবং বেলজিয়াম যেতে হয়েছিল । সেখানে তিনি দেখেছেন সকলে নিজের ভাষাকে কত সন্মান করে । এরা সকলেই কম বেশী ইংরেজি জানে তাই বলে প্রথম সাক্ষাতে ইংরেজি বলে না । নিজেদের ভাষা ব্যাবহার করে । সকল প্রতিষ্ঠানে নিজ ভাষায় লেখা সাইনবোর্ড সেই সাথে ছোট করে ইংরেজিতে লেখা । আর তার নিজের দেশে সব বিদেশি সংস্কৃতি দেখে তার খুব খারাপ লাগে । বেশীর ভাগ হোটেল, দোকান , ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি নামের ছড়াছড়ি । তখন বুকের গভীর থেকে আবারো দীর্ঘ শ্বাস আসে , আজাদ সাহেবের । কোথায় সেই সব বর্ণমালা যার জন্য ঝরেছে অজস্র রক্ত ?

অনেক জোড়াতালি দেওয়া প্যান্ট এবং হাত কাটা শার্ট পড়ে নিজের ছেলেকে বেরুতে দেখে ঘেন্না লাগে আজাদ সাহেবের । তার পর ও বলে “ কিরে দাদু , এগুলো কি পড়েছিস”

“ওহ!গ্র্যান্ড পা । ইউ নো দিস ইজ ফ্যাশান”

“কথায় কথায় ইংরেজি বলবে না , আমি তোমার চেয়ে ও ভালো ইংরেজি জানি , প্রথমে নিজের দেশকে ভালবাস । তারপর অন্য দেশের সংস্কৃতি লালন কর”

নাতি  এই কথার কোন উত্তর না দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল গান গাইতে গাইতে ।

অনেক দিন ধরে একটি বর্ণমালার বই খুজছেন আজাদ সাহেব । সেই বর্ণমালা গুলো দেখতে তার খুব ইচ্ছে হচ্ছে । নাতীর  বইয়ের তাকে তন্ন তন্ন করে খুজে ও তিনি বর্ণমালার একটি বই পেলেন না । অ , আ ,ই, এই শব্দগুলো দেখতে কেন জানি ভীষণ ইচ্ছে করছে । বয়সের ভারে ঠিকমত হাটা চলা করতে ও তার কষ্ট হয় । ছেলেকে বেশ কিছুদিন ধরে বলেছেন কিন্তু তার নাকি খেয়াল থাকে না । ছেলের বউকে ও বলেছেন তার ও  নাকি সময় নেই । আজ ভাবছেন নিজেই একবার যাবেন কষ্ট করে লাইব্রেরীতে ।

রাস্তায় কিসের যেন মিছিল হচ্ছে , সেদিকে তাকাবার সময় নেই আজাদ সাহেবের । তিনি তখন বর্ণমালার বইয়ের জন্য উদগ্রীব । বহু কষ্টে লাইব্রেরীর সামনে এসে দাঁড়ালেন । সেখান থেকে বর্ণমালার বই নিয়ে রাস্তা চলতে লাগলেন ধীর গতিতে। মাঝে মাঝে উল্টিয়ে দেখছেন , চিরচেনা অ,আ,ই,ঈ ।মনে হচ্ছে তিনি ফিরে যাচ্ছেন বায়ান্নতে । রাস্তায় তখন পুলিশ আর মিছিলকারীদের গোলাগুলি। সেই ভীড় ঠেলে বৃদ্ধ আজাদ সাহেবের পক্ষে বেরিয়ে আসা দুঃসাধ্য ।

রাস্তার একপাশে পড়ে আছে আজাদ সাহেব । সম্ভবত গুলি লেগেছে , মুখ দিয়ে রক্তের একটি ক্ষীণ ধারা বয়ে যাচ্ছে । বর্ণমালার বইটি পাশে পড়ে আছে । বাতাসে একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছে , সে দিকে পরম তৃপ্তিতে চেয়ে আছেন আজাদ সাহেব। সেই সময় রাস্তা দিয়ে ছোট একটি ছেলে যাচ্ছে । আজাদ সাহেব ইশারায় তাকে ডাকলেন । ছেলেটির হাতে বর্ণমালার বইটি দিলেন । বইটি পেয়ে ছেলেটির মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল । সে একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পড়তে লাগল । অ তে অজগর আসছে তেড়ে । আ তে ………।

আজাদ সাহেবের মুখে তখন রক্তে মেশানো একটি তৃপ্তির হাসি। শেষ পর্যন্ত তিনি বর্ণমালা নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে পেরেছেন।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।


13 Responses to বর্ণমালা

  1. quazih@yahoo.com'
    কাজী হাসান ডিসেম্বর 20, 2011 at 1:18 অপরাহ্ন

    শেষটা বেশ নাটকীয় আর আবেগ ঘন। কিন্তু শেষের দৃশ্যটা নিয়ে বাস্তবতার দৃষ্টি কোন থেকে প্রশ্ন আসতে পারে। অনেক ধন্যবাদ।

    • imrul.kaes@ovi.com'
      শৈবাল ডিসেম্বর 20, 2011 at 7:41 অপরাহ্ন

      সহমত ।

    • touhidullah82@gmail.com'
      তৌহিদ উল্লাহ শাকিল ডিসেম্বর 21, 2011 at 1:26 অপরাহ্ন

      কি প্রশ্ন আসবে কাজী হাসান ভাই ? বাস্তবতা কি অস্বীকার করা যায় । এগুলো জীবন থেকে নেওয়া গল্প । সেখেত্রে আমি আমার মতামত উপস্থাপন করতেই পারি । একজন লেখকের সেই স্বাধীনতা আছে বলেই আমি মনে করি । গল্প ভাল লেগেছে জেনে খুশি হলাম । আপনাকে অনেক ধন্যবাদ

      • imrul.kaes@ovi.com'
        শৈবাল ডিসেম্বর 21, 2011 at 1:50 অপরাহ্ন

        নাটকীয় মনে হলো শেষ দৃশ্যটা যেখানে মৃত্যুর সময়ে ছোট্ট ছেলেটির হাতে বই তুলে দিলো আর ছেলেটি খুশী হয়ে পড়ে যাচ্ছে ।
        এই ব্যাপারটা বাস্তব হলে ছেলেটা ভয় পেতো , আপনি যদি বুঝাতে চান ওটা শেষ মুহূর্তের ঘোর ছিলো , মৃত্যুর আগে যেমন হ্যালোসিনেশ অথবা ফ্লাস ব্যাক হয় তাতে হয়তো তিনি তার অতীত দেখতে পাচ্ছিলেন তার নিজের ছেলেকে ,
        এটাই যদি বুঝাতে চান তবে দৃশ্যটাতে আরেকটু আবেশ ঘোর আনা দরকার ছিলো আমার মনে হয়

  2. রাজন্য রুহানি ডিসেম্বর 21, 2011 at 6:27 পূর্বাহ্ন

    সেই আজাদ সাহেবের আজ কষ্ট লাগে যখন ভাষার বিকৃত উপস্থাপন হয় । যখন বাংলা ভুলে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছেলে মেয়ে বাবা মাকে আর বাবা কিংবা মা বলে না ডেকে ডেড কিংবা মাম্মি বলে ডাকে। আধা বাংলা আধা হিন্দি এবং ইংলিশ মিলিয়ে বক্তৃতা দেয় যখন কোন রাজনীতিবিদ, তখন আজাদ সাহেবের কষ্ট লাগে।

    এই কষ্টটা বাংলাভাষাপ্রেমীদের জন্য খুবই হতাশার। রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত ভাষার এই বিকৃতিসহ অন্য ভাষার আগ্রাসন বাংলাকে শ্বাসরোধ করতেই যেন ব্যস্ত। সামনে ভাষার মাস। লোক দেখানো ভাষাপ্রীতি ও আস্ফালন হবে আশাতীত। মাস ফুরালেই সব কর্ম যেন শেষ হয়ে যায় সবার। ভাষার মর্ম অন্তরে ধারণ করে পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ-নগর-রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সব কাজেই বাংলাকে প্রধান মাদ্যৗম এবং অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মপদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে হবে, পাশাপাশি অন্য ভাষা ব্যবহারে তখন আপত্তি থাকার কথা নয়।
    ……….
    গল্পটি ভালো লেগেছে আমার। :rose:

  3. meghmoyee@ymail.com'
    ফাতেমা প্রমি ডিসেম্বর 23, 2011 at 5:42 পূর্বাহ্ন

    ভাষা নিয়ে সুন্দর একটি লেখা! গল্প হিসেবে শেষটা ভালো লাগেনি।
    ভয় হয়, আমাদের এই সময়ে যদি সামনে ভাষা সমস্যা বা মুক্তিযুদ্ধ আসতো- আমাদের ইয়ো প্রজন্ম কি করতো আল্লাহ্‌ জানেন!!!!
    চমৎকার ভাবে ভাষা নিয়ে বৃদ্ধ ভাষা সৈনিকের চিন্তা তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ শাকিল ভাই! :clover: :clover:

  4. obibachok@hotmail.com'
    অবিবেচক দেবনাথ ডিসেম্বর 23, 2011 at 8:18 পূর্বাহ্ন

    গল্পটি আমার কাছে ভালো লেগেছে।

  5. sokal.roy@gmail.com'
    সকাল রয় ডিসেম্বর 24, 2011 at 8:48 পূর্বাহ্ন

    ভালো লাগলো

You must be logged in to post a comment Login