হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু, দাফন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন শাওন।

Filed under: সাক্ষাৎকার |

চ্যানেল আই-এ প্রচারিত তৃতীয় মাত্রায় মেহের আফরোজ শাওন এর  সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু, দাফন এবং অন্যান্য পারিবারিক বিতর্ক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন শাওন। এক পর্যায়ে আবেগেআপ্লুত শাওন কান্নায়ও ভেঙ্গে পড়েন। বলেন, বাকি জীবনটা হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী পরিচয়েই বেঁচে থাকতে চাই।

মেহের আফরোজ শাওন একাধারে একজন অভিনেত্রী, সংগীতশিল্পী ও পরিচালক। তবে তার সব পরিচয়কে ছাপিয়ে গেছে অন্য একটি পরিচয়। আর সেটি হচ্ছে, তিনি বাংলা কথাসাহিত্যের আধুনিক কলম জাদুকর প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী। অকাল প্রয়াত কথাসাহিত্যিকের মৃত্যুর পর তার মৃত্যু, দাফনের স্থান নির্ণয়সহ নানা বিষয়ে বহু আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম হয়। গত সোমবার (২৪/০৯/২০১২) দিবাগত রাতে প্রচারিত চ্যানেল আইয়ের তৃতীয় মাত্রায় অতিথি হয়ে এসেছিলেন হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী শাওন। জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় সেই অনুষ্ঠানটিতে উঠে এসেছে শাওনের অনেক না বলা কথা ও সাম্প্রতিক সময়ে হুমায়ূন স্যারকে ঘিরে নানা বিতর্কের খোলামেলা ব্যাখ্যা। পাঠকদের জন্য সেই কথোপকথনের উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হলোঃ

: আপনি কেমন আছেন এ প্রশ্নটা করা অবান্তর আপনাকে। তারপরও জানতে চাইছি যে আপনি কেমন আছেন। এখানে আপনার জীবনটাকে আমি দুটো ভাগে ভাগ করে যদি এ প্রশ্নটা করি, যখন আপনি বিয়ে করেছিলেন তার পরের সময়টা, আর হুমায়ূন আহমেদ মারা যাওয়ার পরের সময়টা। এ দুটো সময়ের মধ্যে তুলনা করলে আপনি এখন কেমন আছেন?

_এখন আমি ভালো নেই। ভালো থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। আর যদি সেই সময়টার সঙ্গে তুলনা করতে বলেন, তাহলে বলব_ সে সময়টাতেও খুব বেশি ভালো থাকার হয়তোবা কথা ছিল না। চারদিকে নানা ধরনের প্রশ্ন, এই প্রশ্ন যারা করছে তারাই উত্তর বানিয়ে নিচ্ছে, বানিয়ে নিতে চাইছে, তখনো সে রকম একটি ব্যাপার ছিল। কিন্তু তারপরও আমি তখন অনেক ভালো ছিলাম। কারণ ভালো থাকার জন্য আমার সঙ্গে চমৎকার মনের খুব শক্ত মানসিকতার একজন মানুষ ছিলেন। সে জন্য ওই সময়ের সঙ্গে যদি তুলনা করতে বলেন, তখন আমি অনেক ভালো ছিলাম। এখন কিছুটা ভালো থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

: আপনার দুই সন্তান নিনিদ নিশাত কেমন আছে?

_যতটুকু ভালো থাকা সম্ভব ততটুকু ভালো আছে। ছোটটির বয়স দুই হলো তার বাবা মারা যাওয়ার পর। সে আসলে এখন কিছুই বুঝতে পারে না, বুঝতে পারার কথাও নয়। সেলফোন হাতে নিয়ে সে এখন বাবার সঙ্গে কথা বলে। বাবার ছবি দেখে, বাবার ছবিকে আদর করে, বাবার ছবিতে চুমু খায়। আর বড় ছেলের বয়স সাড়ে পাঁচ বছর। ওর জগৎটা একটু ডিফারেন্ট, ও একটু ইনট্রুভার্ট, ওর বাবার মতোই সবার সঙ্গে ওর মনের কথা শেয়ার করে না। সব প্রকাশও করে না। ও নানির কাছে কিছু বলে। আমার বন্ধুদের কাছে কিছু বলে, খালা-কাজের বুয়াদের কাছে কিছু বলে। কে যেন ওকে বুঝিয়েছে ওর বাবা তারা হয়ে গেছে। একদিন আমাকে বলছে, মা আমাকে নুহাশ পল্লীতে নিয়ে আকাশের তারাগুলো দেখিয়ো তো, কোন তারাটা আমার বাবা, আমি একটু কথা বলব। নিউইয়র্কে থেকে আমরা চলে আসার পর ওদের বাবার সঙ্গে ওদের অনেক স্মৃতি। তখন ওর বাবাকে রেখে আমরা দেশে ফিরছিলাম। ওর প্রশ্ন ছিল আমরা দেশে যাচ্ছি, বাবা যাবে না? ওর ধারণা ছিল ওর বাবা ইংরেজি জানে না। ওর বাবাও বাচ্চাদের কাছে ওরকম বোকাসোকা সেজে থাকত। ইংরেজি জানি না, এরকম বলত। বাবা তো ইংরেজি জানে না, বাবার যদি পানি খেতে ইচ্ছা করে বাবা কার কাছে পানি চাইবে, বাবাকে কি আমরা হাসপাতালে রেখে যাচ্ছি। তাহলে বাবা বাসায় এসে আমাকে খুঁজবে না। আমি ওই মুহূর্তে এত প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ওর বাবার দাফনের সময় ও ছিল, দেখেছে বাবাকে। ও বলেছিল একটি গর্তের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল বাবাকে।

: বুঝতে পারা বা উপলব্ধি করার জায়গাটিতে সে এখনো পেঁৗছতে পারেনি। বাস্তবতার কারণে এটি জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে যে, হুমায়ূন আহমেদের আরও চারটি সন্তান আছে। তারা বা তার মা কেমন আছে আপনি জানেন?

_ আসলে ভালো থাকার কথা না। ওদের বাবা নেই, নিশ্চয় মনে খুব কষ্ট থাকার কথা।

: এ প্রশ্নগুলো এ কারণে আসবে যে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হুমায়ূন আহমেদ দুটো জীবনযাপন করেছেন। এক পর্যায়ে তার এক স্ত্রী এবং তার সন্তান, পরে আপনি এবং অন্য দুই সন্তান। যে প্রশ্নটি এখন থাকবে হুমায়ূন আহমেদ এখন নেই এবং আপনার সামনে অনেকটা সময়, বাকিটা সৃষ্টিকর্তার ওপরে। এই লম্বা সময়টা আপনি কোন পরিচয়ে পরিচিত হবেন_ হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী, সংগীতশিল্পী, স্থপতি অথবা অভিনেত্রী।

_ আসলে একটি পরিচয়ে কী পরিচিত হতে হবে। হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী একজন স্থপতি। দুটি পরিচয় কিন্তু মানুষ একজনই। হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী একজন সংগীতশিল্পী। আমি জানি না ভবিষ্যতে আমি কতদিন পরে গান গাইতে পারব বা আদৌ পারব কিনা, অভিনয় করতে আদৌ ইচ্ছা হবে কিনা, এখনো জানি না। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী এ পরিচয়টা আমার সব সময় থাকবে। এ পরিচয়টা আমার হৃদয়ের খুব কাছের একটি পরিচয়, আমার খুব অহঙ্কারের একটি পরিচয়, আমি হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী। আমি হুমায়ূন আহমেদের পাশে যেভাবে ছিলাম, যেভাবে আছি, আমি সেভাবেই থাকব বাকিটা জীবন। বাকি জীবনটাতেও হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী হিসেবেই বাঁচতে চাই।

: হুমায়ূন আহমেদের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে, আমি সেদিকে যেতে চাচ্ছি না। অসুস্থ যখন হলেন, ক্যান্সার যখন ধরা পড়ল, সেটা কখন, কোথায় এবং কিভাবে?

_ হুমায়ূন আহমেদ ডাক্তারের কাছে যেতে ভয় পেতেন। সেটা নিজের অসুস্থতার ক্ষেত্রে যেমন, অন্যদের ক্ষেত্রেও তেমনি। আমার শাশুড়ি যতবার অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ভর্তি ছিলেন ততবার তাকে জোর করে সেখানে নিয়ে যেতে হতো। বিকালে যেতেন আবার চলে আসতেন। হসপিটালের ওষুধের যে গন্ধ, এটা একেবারে সহ্য করতে পারতেন না। এমনকি সুখকর মুহূর্ত_ মানে আমার যখন বেবি হলো তখনো তিনি মাত্র ১০ মিনিট থেকে সেখান থেকে চলে এসেছেন। ওনাকে আসলে চেকআপ করাতে হতো। ২০১১ সালে মায়ের পায়ের নি রিপ্লেসমেন্ট করানোর কথা। তো এটা করার কথা ছিল রোজার মাঝামাঝি সময়ে। হুমায়ূন আহমেদ যখন শুনলেন তখন বললেন, তোমার মায়ের নি রিপ্লেসমেন্ট হবে সিঙ্গাপুরে, কে যাচ্ছে সঙ্গে? তখন আমি যথারীতি বললাম বাবা যাচ্ছে। কারণ আমার ভাই দেশে থাকে না। তখন হুমায়ূন আহমেদ বললেন না, আমিও যাব সঙ্গে। তখন তিনি আমার মাকে বললেন, আপনার নি রিপ্লেসমেন্ট হবে আপনি একা যাবেন কেন? আমিও যাব আপনার সঙ্গে। তার কারণেই মার অপারেশনের তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হলো। তারপর আমরা সিঙ্গাপুরে ঈদের পরের দিন গেলাম আমার মায়ের নি রিপ্লেসমেন্ট করাতে। তো মা চেকআপ করছে, হঠাৎ এরকম দুই-তিন দিন পরে আমি যাওয়ার আগে ভাবলাম ওর চেকআপ করানো দরকার। ২০০২-তে ওর বাইপাস সার্জারি করা হয়েছে, সেখানে নয়টা ব্লক ছিল আগে। মাঝখানে নয় বছর কেটে গেছে। চেকআপ প্রতি বছর টুকটাক হয়। দুই বছর আগেও একবার হার্টের চেকআপ হয়েছে। আমি ওকে বারবার বলতে থাকলাম, এসেছি যখন একটি চেকআপ করে যাই। ওটা ছিল একটি রুটিন চেকআপ। কোনো উপসর্গ ছিল না হুমায়ূন আহমেদের। হঠাৎ করে রক্ত পরীক্ষায় সিইএলএল লেভেলটা অনেক বাড়তি পাওয়া গেল। ওই বাড়তি পাওয়ার পরেই আমরা ডাক্তারদের চেহারায় একটা ভয় দেখতে পেলাম। হুমায়ূন আহমেদের চেহরায় আসলে ভয় ছিল না। আমরাও আসলে ব্যাপারটার ভয়াবহতা বুঝতে পারিনি। উনি তাড়াতাড়ি আমাদের সিটিস্ক্যান করতে বললেন। সিটিস্ক্যান করা হলো। সিটিস্ক্যানের রিপোর্টে দেখা গেল টিউমার আছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হলো কোলোনস্কোপির। কারণ টিউমারটা দেখা গেছে ক্লোনে। এই টিউমারটায় ক্যান্সার আছে কিনা দেখা দরকার। এটা দেখার জন্য ওখান থেকে স্পেসিস আনতে হবে। কোলোনস্কোপি করতে যাওয়ার সময় হুমায়ূন আহমেদ খুব হাসিমুখে গিয়েছিলেন। এবং বলছিলেন যে, কী এক টিউমার হয়েছে, এটার জন্য এতকিছু করতে হচ্ছে, টাকা নেওয়ার ফন্দি। কোলোনস্কোপির পর আসলে আমরা নিশ্চিত হলাম যে, হুমায়ূন আহমেদের কোলোন ক্যান্সার, যেটি কোলোন ছাড়িয়ে ব্লাডস্ট্রিমে চলে গেছে এবং লিভারে ছড়িয়ে পড়েছে। যেটাকে বলা হয় স্টেজ ফোর ক্যান্সার। এভাবেই ধরা পড়ল। এর পরের সংগ্রামের অধ্যায়টা অনেক কষ্টকর।

: সেটা যদি একটু বলেন

_ ক্যান্সার এমন একটা রোগ, যেটা কেমো দিয়ে পুরোপুরি সেরে তোলা সম্ভব নয়। ডাক্তার বললেন, কেমোগুলো খুবই পেইনফুল। এগুলো দিলে হাতের রগগুলো কালো হয়ে যায়। বারটা কেমো দেওয়ার পর ডাক্তার বললেন, এই কেমোটা দিলে কোনো রকমে বেঁচে থাকতে পারবে ছয় মাস। এটার জন্য আমরা আসলে অপেক্ষা করছিলাম না। হুমায়ূন আহমেদের মানসিক অবস্থা এমন ছিল যে, তিনি ভালো কিছুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। যখন আটটা কেমো দেওয়া হয়ে গেল তখনও তিনি সার্জারির জন্য পুরোপুরি ফিট না। হুমায়ূন আহমেদের কবর, দাফন সম্পর্কে তখন অনেক আলোচনা হয়েছে। এখন কিছুটা কমে গেলেও অনেকের মধ্যেই বিভ্রান্তি আছে। হুমায়ূন আহমেদ এমন একজন মানুষ ছিলেন যে, সে নিজেই নিজের মৃত্যু নিয়ে খুব বেশি রসিকতা করতেন। অসুস্থ হওয়ার পরেও করেছেন এবং অসুস্থ হওয়ার আগে তো অনেক করেছেন। কবর নিয়েও অনেক রসিকতা করেছেন। আমি গত আট বছরে কমপক্ষে ২০ বার তার মুখে কবর নিয়ে গল্প শুনেছি। ২০-২৫ বারের সব গল্পই ছিল নুহাশ পল্লীকে ঘিরে। তার ‘আমি’ বইটার ১৮৪ পৃষ্ঠায় তিনি নিজেই মৃত্যু নিয়ে লিখেছেন। ‘…স্বপ্নে দেখছি নুহাশ পল্লীর সবুজের মাঝে কবর। তার গায়ে লিখা …। শ্বেতপাথর দিয়ে যে হবে এটাও লিখেছেন এবং কি লিখা থাকবে তাও লিখেছেন। নুহাশ পল্লীতে তার যে শোবার ঘরটি ছিল, সেখানে তিনি সকালে বসতেন এবং সন্ধ্যায় বসে চা খেতেন। সেখান থেকে বসে লিচু গাছটা দেখা যায়। তিনি প্রায়ই সেখানে বসে বলতেন ওই যে লিচু গাছ ওখানেই আমার কবর হবে। উনি আমাকে বলতেন নুহাশ পল্লীর প্রতিটা গাছই আমাকে চেনে।
অপারেশন হওয়ার আগে কারও কাছে ক্ষমা চাওয়া, অসম্পন্ন কাজগুলো সম্পন্ন করে যাওয়ার কথা যখন বলতেন তখন আমি তার সঙ্গে ছিলাম। সে রকমই এক মুহূর্তে তিনি কবরের কথা বলেছেন। বলেছেন, ‘আমি মারা গেলে আমাকে নিয়ে অনেক টানাটানি হবে। প্লিজ আমাকে নিয়ে টানাটানি করতে দিও না। নুহাশ পল্লীতে নিয়ে শুইয়ে রেখ। আমাকে উনি যে কথাটি বলে গেছেন আমার দায়িত্ব উনার সেই কথাটা রাখা। উনি নুহাশ পল্লীকে কত ভালোবাসতেন এটা আমি জানি, আমি উনার সঙ্গে মিশছি, তার পরিবারের প্রত্যেকটি লোক জানেন। আমি নিশ্চিত আমার চেয়ে একটু বেশি হলেও জানেন ওনার মা। হুমায়ূন নুহাশ পল্লীকে কতটা ভালোবাসতেন। ওনি শেষেরবার যখন বাংলাদেশে এলেন, তখন এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় যাননি। ২২ ঘণ্টা প্লেনে চড়ে কেমো দেওয়া শরীর নিয়ে একটু কাহিল হননি। সব সাংবাদিক এবং টিভি চ্যানেল দেখেছে, প্লেন থেকে নেমে গাড়িতে উঠে সরাসরি চলে গেলেন নুহাশ পল্লীতে এবং নুহাশ পল্লীতে যাওয়ার পর ওনি বিশ্রাম নিতে ঘরে ঢোকেননি। সরাসরি চলে গেলেন গাছগুলোর কাছে। ওনার সন্তানদের একজনের নামে এই নুহাশ পল্লী। আমি একটা কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে বলব, উনি আমাকে যা যা বলেছেন আমি প্রাণপণ চেষ্টা করব এই কথাগুলো রাখার জন্য, চেষ্টা করেছি রাখার। ওনার শেষ কথাটি যদি আমি রাখতে না পারতাম আমি সারা জীবন ওনার কাছে ছোট হয়ে থাকতাম। আমি এই কথাটিই বলতে চেয়েছিলাম সবার কাছে।

: কিন্তু আপনি কোর্টে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন বলে শোনা গেছে_

_ এই কথাটি কে বা কারা বলেছেন আমি জানি না। আমি একটিবারও বলিনি। কোর্টে যাওয়া তো অনেক দূরের কথা। আমাকে না দিয়ে যদি জনগণের কাছেও কেউ প্রমাণ দিতে পারত যে আমি এরকম কিছু বলেছি তাহলে কথা ছিল। একটি মানুষও বলতে পারবে না আমি এই কথাটি কারও সামনে বলেছি। আমি মনের ভুলেও কখনো বলিনি এবং ইমোশনাল হয়েও কখনো বলিনি। কারণ হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে কোর্টে যাওয়ার ইচ্ছা আমার কখনোই হতে পারে না। এটা আমি ভুলেও বলিনি। আসলে মিডিয়াতে তো অনেক সময় অনেক রকম রিপোর্টই হয়, এটাও হয়তো তেমনই একটি রিপোর্ট। তাকে হিমঘরে রাখার কথাও আমি কখনোই বলিনি। আমি সবার কাছে হাত জোড় করেছিলাম, যে হাত জোড় করে সে কখনোই কোর্টে যাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারে না। আমার শাশুড়ির কাছে আমি অনুরোধ করেছি। গত দশ মাস আমি যখন নিউইয়র্কে ছিলাম, তখন প্রতিদিন আমার শাশুড়ির সঙ্গে দুই বেলা কথা হতো। হুমায়ূন আহমেদের শরীরের খোঁজখবর নিতেন তিনি। ওনার প্রতিদিনের আপডেট দিতাম আমি তাকে। আমি ওনার পায়ে ধরে অনুরোধ করেছি, আমি জানি না এখানে আমার বুঝানোর ভুল ছিল কিনা। হয়তো বিশ্বাস করাতে পারিনি।

: এর বাইরে হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ ঢাকায় আনা, বিমানের বিজনেস ক্লাসে না চড়াসহ নানা বিষয় নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। সেগুলো যদি একটু বলতেন_

_ ১৯ জুলাই ওনি যখন মারা গেছেন আমার বাঁ হাতটা তার মাথার নিচে ছিল। ওনার ডান হাতটা আমার ডান হাত দিয়ে ধরা ছিল। যারা ওখানে ছিলেন তারাই দেখেছেন এবং তারাই জানেন। তেমন একটা ভয়ঙ্কর মুহূর্ত দেখে আসা, আমার বড় ছেলের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। এগুলো আসলে বলার মতো নয়। তার উপর আবার আসার জন্য প্লেনের টিকিট পাচ্ছি না। তখন শুধু শুনেছি আমাদের টিকিট দেওয়া হবে। কোন ক্লাসের টিকিট দেবে এমন প্রশ্ন করার মতো মানসিকতা ছিল না তখন। আমাদের টিকিট পাওয়া গেছে ২০ জুলাই আর হুমায়ূন আহমেদের টিকিট পাওয়া গেছে ২১ জুলাই। তখন আমি বললাম হুমায়ূন আহমেদকে রেখে আমি কোথাও যাব না। এটা আমি বলেছি। আমি তার সঙ্গে একই প্লেনে এসেছি। একই প্লেনে ফিরব। ওখানে যারা ছিলেন তারা শুনেছেন। নিউইয়র্কের বাইরের একটি ট্রাভেল এজেন্সির কারণে অনেক কষ্টে হলেও আমরা টিকিট পেয়েছিলাম। আমি তখন খুব অসুস্থ ছিলাম, আমাকে হুইল চেয়ারে করে প্লেনে উঠতে হয়েছে, নামতে হয়েছে। এরপর দেশে এসে আমি শহীদ মিনারে গেলাম, দাফন নিয়ে কত ঝামেলা হলো। সব মিলিয়ে এতটা ঝামেলা গেল যে, আমি নিজেও টের পাইনি যে, সারা দিন আমার পেটে কিছুই পড়েনি। আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা, আমার মা আমাকে শুধু স্যালাইন খেতে দিয়েছিলেন।

: তখন আপনার একটা কথা মিডিয়ায় বেশ ঝড় তুলেছিল। আগের পরিবারকে ইঙ্গিত করে আপনি বলেছিলেন … তখন সবাই কোথায় ছিল?

_ আমি বলেছি। কারণ হুমায়ূন আহমেদের কষ্টটা আমি দেখেছি। এটার একটা কারণও ছিল। বাচ্চারা তার বাবার ওপর অভিমান করবেই। করাটা স্বাভাবিক। বাবারও অনেক কষ্ট ছিল। বাবার কষ্টটা আমি দেখেছি। সেই কারণেই তখন বলেছিলাম এতদিন কোথায় ছিল। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৯১ সালে। এরপর থেকেই আমি তাকে লড়াই করতে দেখেছি।

: হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আপনার বয়সের পার্থক্য অনেক। আমাদের সামাজিক অবস্থান ও মূল্যবোধের হিসেবে তার সঙ্গে সম্পর্ক করাটাকে আপনি কতটা অভিপ্রেত মনে করেন_

_আসলে কতটা অভিপ্রেত আর কতটা অনভিপ্রেত_ এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করার মতো বয়স- ঠিক বয়স বলব না চিন্তা করিনি আমি। আমি হুমায়ূন আহমেদকে ঠিক যেভাবে দেখেছি, আমার সঙ্গে যখন তার বিয়ে হয়েছে আমি তাকে একা দেখেছি। আমি হুমায়ূন আহমেদকে একজন লেখক বা নাট্যকার-পরিচালক হুমায়ূন আহমেদের মজাদার কথা ও ডায়ালগের বাইরের একজন হিসেবে দেখেছি। দেখেছি এর পেছনের মানুষটাকে। আমি একজন অভিমানী হুমায়ূন আহমেদকে দেখেছি আমার বিয়ের আগে। আমি একজন দুঃখী হুমায়ূন আহমেদকে দেখেছি। আমি একজন রাগী হুমায়ূন আহমেদকেও দেখেছি যিনি রাগ করে অনেক কিছু করে ফেলতে পারেন। রাগ করে নিজের লেখা সবচেয়ে ভালো স্ক্রিপটা ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ফেলতে পারেন। আবার সেটাই নিজে বসে জোড়া লাগাতে পারেন রাগ পড়ে গেলে। এ হুমায়ূন আহমেদকে দেখে এবং তার কথা শুনে এটুকুন বুঝেছি যে তার পাশে দাঁড়ানোর একজন মানুষ খুব দরকার। আর হুমায়ূন আহমেদের পাশে দাঁড়ানোর মানুষ_ মানে আমি ভাবলাম আর গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম এটা কিন্তু সম্ভব নয়_ এটা আপনারা সবাই বুঝবেন। হুমায়ূন আহমেদ যখন চান যে আমার পাশে একজন মানুষ দাঁড়ানো দরকার এবং এ মেয়েটিকেই আমার পাশে চাই তখন…

: কিন্তু এই প্রশ্ন তো আসতে পারে যে, আপনি যখন বিয়ে করেন তখন হুমায়ূন আহমেদ একা ছিলেন। আগে তো ছিলেন না। হুমায়ূন আহমেদ এই যে একা হয়ে গেলেন, এই একা হওয়ার পেছনে আপনার দায় কতটুকু?
_ হুমায়ূন আহমেদ একা হওয়ার পেছনে আমার কোনো দায় নেই।

: কার দায় আছে বলে আপনি মনে করেন। কেননা হুমায়ূন আহমেদ তার এক জীবনে বহুবার বলেছেন তার জীবনে শ্রেষ্ঠ নারী হচ্ছেন গুলতেকিন। আর হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন হুমায়ূন রাজকীয় জীবনযাপন করেন। টাকা তার পেছনে ছুটছে। আর এই সাফল্য বাঙালি সাহিত্যিকদের মধ্যে তুলনাহীন। এ যে রাজকীয় জীবনযাপন বা বদলে দেওয়া জীবন এক্ষেত্রে আপনার অবদান কতটুকু? বা হুমায়ূন আহমেদের একা হওয়ার পেছনে আপনার দায়, আপনি বলছেন নেই। এর মাঝখানে আর কেউ কি আছে?

_ একটি মানুষ যখন ছোট থেকে বড় হয় তখন তার অনেকগুলো বয়স পার হয়। সে যখন শিশু থাকে তখন তার মনে হয় এই খেলনাটা না পেলে আমার বেঁচে থাকার কোনো মানে নেই। একটা সময় মনে হয়, যে পুতুলটা বা গাড়িটা আমি পেয়েছি সেটাই বোধহয় আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। এরপর যখন সেই শিশুটি তরুণ-তরুণী বা কাউকে ভালো লাগার বয়সে পেঁৗছায় তখন মনে হয় ওই মেয়েটিকে না পেলে বোধহয় আমি মরেই যাব। আবার সেই মেয়েটিকে পাওয়ার পর মনে হয় এ মেয়েটিই বোধহয় আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ রমণী। আবার এই মেয়েটির যখন বেবি হয় তখন মনে হয় এই বেবিটাই সবচেয়ে আদরের। আমি এটা কেন বলছি? হুমায়ূন আহমেদের জীবনের অনেকগুলো পর্যায় আছে। আমি কেবল একটি পর্যায় দেখেছি। আমি আগের পর্যায়টুকু দেখিনি। আবার আপনি আগের পর্যায়টুকু দেখেছেন। হুমায়ূন আহমেদ বলতেন এ ম্যান হ্যাজ মেনি ফেইসেস এবং হুমায়ূন আহমেদ বলতেন আমার আসল চেহারাটা খুব অল্প মানুষই দেখে। কারণ সবার সামনে আমি একটা মুখোশ পরে থাকি। সেটা সত্যিকারের মুখোশ না। তবে আমি একটা মুখোশ পরে থাকি। হ্যাঁ অবশ্যই একটা মানুষ যখন জীবন শুরু করে তখন তার অনুভূতি এক রকম থাকে। এরপর জীবন কাটাতে গিয়ে অনেক ধরনের অবস্থার মধ্য দিয়ে যায় সে। আমি এখনো বলছি আমি সত্যি জানি না ঠিক কি কারণে হুমায়ূন আহমেদের অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। খুব সুখী যে অবস্থান যেটা আমিও হুমায়ূন আহমেদের বহু আগের যে বইগুলো পড়েছি সেখানে দেখেছি।

: সেটি তো আপনি জানতেন। এরপরও তার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক এবং বয়সের একটা বড় ব্যবধান। এরপরও সম্পর্কের যে পরিণতি সে কারণেই আসলে প্রশ্নটি আসছে।

_ আমি সেটাই বলছি। কেন খুব সুখী বা জীবনের সবচেয়ে ভালো সময়টা খারাপ সময়ে গেল, আমি সেটা আসলেই জানি না। কি কারণ ছিল। আপনি যদি বলেন কেন একা হয়ে গেলেন? আমি বলব একা হওয়ার কারণ কি শুধুই প্রেম? আর না পাওয়ার মানে কি কেবলই প্রেমের না পাওয়া? আমি সেটা মনে করি না। আমি জানি না_ না পাওয়া হুমায়ূন আহমেদের ভেতরে ছিল। সেটা জানার চেষ্টা যে করিনি তা নয়। হুমায়ূন আহমেদ কিছু জিনিস একেবারে নিজের ভেতরে গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে রাখতেন। একা হয়ে যাওয়া মানে সম্পূর্ণ একা একটি বাসায় থাকা সেটা একটা পিরিয়ড গেছে। হয়তোবা গণমাধ্যমে বলা ঠিক হবে না। তবুও বলতেই হচ্ছে এর আগেও তিনি বহুবার একা হয়েছেন। এর আগেও তিনি বহুবার গৃহত্যাগী হয়েছেন। আমার সঙ্গে বিয়ের আগে বা আপনারা যেটাকে সম্পর্ক বলছেন সেটার আগেও তাকে আমি বহুবার গৃহত্যাগী হতে দেখেছি। হয়তো একাধারে চার বছর একটি বাসায় একা থাকেননি। কিন্তু তিনি গৃহত্যাগী হয়েছেন। সেটার পেছনে কারণ আমি ছিলাম না। আমি বলব কেন? একজন নারীই হতে হবে তার গৃহত্যাগী হওয়ার জন্য? হুমায়ূন আহমেদের মতো একজন সৃষ্টিশীল মানুষের কি থাকতে পারে ভেতরে?

: এই যে হুমায়ূন আহমেদকে সাপোর্ট দেওয়ার অভিপ্রায়ে আপনি তার পাশে দাঁড়ালেন। এই কনফিডেন্সের জায়গাটা কোথায় ছিল?

_ এই কনফিডেন্সের উৎস একজনই। একজন হুমায়ূন আহমেদ। যিনি চাইলে অনেক কিছু করতে পারেন। কিন্তু করতে পারতেন না। আমি এরকম ফিল করেছি। তিনি আমাকে এ রকমটা ফিল করিয়েছেন। যে তার একজন সাপোর্ট বলব না_ পথচলার একজন সঙ্গী দরকার। আরেকটা প্রশ্ন ছিল তার রাজকীয় জীবন। সত্যিকার অর্থেই তিনি রাজকীয় ছিলেন। তিনি যত গরিবই থাকুন না কেন পকেটে অল্প কিছু টাকা এলেই বন্ধুবান্ধব নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। কখনো একা বেড়াতেন না। দলবল নিয়ে এ টাকাটা খরচ করতেন। বিদেশ চলে যেতেন। বিদেশ যাওয়ার যখন সামর্থ্য হয়নি তখন কঙ্বাজার চলে যেতেন। এমনকি স্কলারশিপের টাকা পেয়েও তিনি একা কঙ্বাজার ঘুরতে গেছেন। এটা তার বইতেই আছে। হুমায়ূন আহমেদের পকেটে কিছু টাকা জমলেই নাকি তার পকেট কচকচ করত। তিনি ভাবতেন কি করি কি করি। টাকাগুলো খরচ করা দরকার। একটু বেড়িয়ে আসি। হুমায়ূন আহমেদ রাজকীয় সব সময়ই চাইতেন। ইচ্ছাগুলো কখনোই অপূর্ণ রাখতেন না। আমিও সমর্থন করতাম। হুমায়ূন আহমেদের এই যে রাজকীয় চাওয়া ব্যক্তিগত খরচে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে বিদেশ যাওয়া এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে আমার অবদান বলব না তবে আমার সায় ছিল। তার আনন্দে আমার সব সময় সায় ছিল। সেটা যদি আমার জন্য কিঞ্চিৎ নিরানন্দও হয়, তবুও আমার সায় ছিল।

: আপনার এই বিয়ের প্রসঙ্গে কেউ যদি প্রশ্ন করে যে হুমায়ূন আহমেদের খ্যাতির অংশীদার আপনি হতে চেয়েছিলেন বা হুমায়ূন আহমেদের তখনকার যে বিত্ত-বৈভব ছিল এতে আপনি আকৃষ্ট ছিলেন, এই প্রশ্নের জবাবে আপনি কী বলবেন?

_ প্রথমত বলব আমি এটার জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না। এটার জবাব দিতে হলে নিজেকে খুব ছোট করে ফেলতে হয়_ এই প্রশ্নটারও জবাব দিতে হবে! কিন্তু না। তবু আমি জবাব দিচ্ছি। না, হুমায়ূন আহমেদকে আমি লেখক হিসেবে খুব কম দেখেছি। আমি দেখেছি মানুষ হুমায়ূন আহমেদকে। আমি দেখেছি তার মানবিক গুণাবলীকে। তার একাকিত্বটা দেখেছি। তার খ্যাতিটা দেখেনি। আর খ্যাতির প্রসঙ্গ এলে বলব আমি খুব বড় কিছু হয়তোবা হতে পারতাম না। তবে কিছু একটা হয়েছিলাম_ হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগেই। জাতীয় পুরস্কার পাওয়া একজন শিশুশিল্পী হিসেবে একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে অভিনয় করলে আমিও অনেক নাটকে অভিনয় করতাম, হয়তো সিনেমায় কাজ করতাম। একদিকে আমিও হয়তো খ্যাতি পেতে পারতাম। আর আমি তো বলব সেদিকে গেলে আমার সম্পূর্ণ নিজের একটা পরিচয় হতো। তখন আমাকে হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে হতো না। আর বিত্তের প্রসঙ্গ এলে বলব আমার মা একজন সংসদ সদস্য। আমার বাবা একজন ইঞ্জিনিয়ার, শিল্পপতি। হুমায়ূন আহমেদ ওর বন্ধুদের একটা কথা বলতেন। কথাটা সামান্য। কিন্তু এ মুহূর্তে বলতেই হচ্ছে। উনি বলতেন শাওনের বাবা চাইলে দশটা হুমায়ূন আহমেদ কিনতে পারেন। এ প্রশ্নটার জবাব এ জন্য দিতে চাইনি। দিতে গেলে নিজেকে খুব বেশি ছোট হতে হয়।

: আপনি নিজেও বলেছেন হুমায়ূন আহমেদ এক ধরনের ডিপ্রেশনে ভুগতেন। তার ছেলেমেয়েদের খুব মিস করতেন। শীলাকে নিয়ে তার একটা লেখা ছিল যার শেষ দিকে বলা ছিল এখন শীলা জানল পৃথিবীতে খারাপ বাবাও আছে। আবার বাবার মৃত্যুর পর পত্রিকায় নুহাশের একটা চিঠিও ছাপা হয়েছে। এই যে সন্তানদের তার দূরত্ব, সেটা ছিল কি না। বা সেই দূরত্ব নিরসনে আপনার কোনো চেষ্টা ছিল কি না।

_ নুহাশের সঙ্গে ওর বাবার কোনো দূরত্ব ছিল না। মানসিক ছিল কি না আমি ঠিক জানি না। ওই রকমটা দেখিনি। আর দেখা হওয়ার দূরত্ব কখনোই ছিল না। আমরা যে বাসায় থাকতাম দখিন হাওয়া_ নুহাশ সেখানে সব সময়ই আসত। তার যখন বাবাকে দেখতে ইচ্ছে করত তখন সে আসত। আবার ওর বাবার যখন নুহাশকে দেখতে ইচ্ছে হতো বলত, বাবা তুমি চলে আস। তখন গাড়ি পাঠিয়ে নুহাশকে আনিয়ে নিত। নুহাশ শুধু যে বছর বিদেশে ছিল সে বছর ছাড়া বাকি সব ঈদ, ঈদের নামাজ ওর বাবার সঙ্গেই পড়েছে। আমার বিয়ের পর থেকেই আমি এটা দেখে আসছি। সুতরাং নুহাশের সঙ্গে ওর বাবার কোনো দূরত্ব কখনোই ছিল না। আমরা যখন ইউরোপ ট্যুরে গিয়েছি আমি নিশাত এবং হুমায়ূনের সঙ্গে আমার স্নেহের বলি আর প্রিয় বলি নুহাশও সেই ট্যুরে আমাদের সঙ্গে ছিল। একটা ফ্যামিলি ট্যুর_ যেখানে আমি হুমায়ূন আহমেদ আর নুহাশ…এটা শুনলে কী আর কোনো দূরত্ব মনে হয়?

: আর মেয়েদের সঙ্গে? কমিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ ছিল কি না।

_আসলে এই উদ্যোগটা আমার চেয়ে বেশি ছিল হুমায়ূন আহমেদের। আর হুমায়ূন আহমেদের উদ্যোগের পেছনে আমার চেষ্টা ছিল। আসলে অভিমানী একটা কন্যাকে আমি যদি ফোন করে অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা করি তাহলে হিতেবিপরীতও হতে পারে। হুমায়ূন আহমেদের উদ্যোগের পেছনে আমি উদ্যোগ নিয়েছিলাম।

: হুমায়ূন আহমেদের পরিবার তার মা-ভাই বোনদের সঙ্গে সাবেক স্ত্রী গুলতেকিন আমেরিকা থেকে ফেরার পর তাদের একসঙ্গে দেখা গেছে সব সময়। সাবেক হওয়া সত্ত্বেও গুলতেকিনের যে গ্রহণযোগ্যতা_ আপনার কী মনে হয় না যে আপনি তাদের কাছে ততটা গ্রহণযোগ্য হতে পারেননি?

_আপনি যে প্রশ্নটা করলেন, এই প্রশ্নটা আসলে আমারও। আমিও আমার শাশুড়ির কাছে এই প্রশ্নটা রাখতে চাই। একই প্রশ্ন হুমায়ূন আহমেদের বোনদের কাছে, ভাইদের কাছে। এই প্রশ্নটা আমি হুমায়ূন আহমেদের মেজো ভাইয়ের কাছে করব না, কারণ উনার কাছে আমি অনেক আগে থেকেই অনভিপ্রেত ছিলাম। আমার বিয়ে হয়েছে ৮ বছর। উনাকে আমি আমার বাসায় আসতে কখনোই দেখিনি। তাই উনাকে আমি এই প্রশ্ন করব না। কিন্তু আমার শাশুড়ি তো আমার সঙ্গে অনেক দিন ছিলেন। আমাদের বাসায় দখিন হাওয়ায় থেকেছেন। আমার সুখে আমার দুখে, উনার সুখে উনার দুখে, ঈদে আমরা একসঙ্গে দখিন হাওয়ায় থেকেছি। আমার বাচ্চা হওয়ার সময়, হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে, বাচ্চাদের জন্মদিনে, বাচ্চাদের আকিকায়, আমার জন্মদিনে শাশুড়ির জন্মদিনে এগুলো সব আমার বাসায় হয়েছে। আমার শাশুড়ির জন্মদিনে রাত ১২টা ১ মিনিটে আমরা আমার বাসায় কেক কেটেছি। আমার শাশুড়ির সঙ্গে কাটানো আমার চমৎকার কিছু মুহূর্তের ছবি আছে। এগুলো তো আসলে প্রমাণ দেওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। কী আর বলব। এই প্রশ্নটা আমার আসলে। ১৯ জুলাইয়ের আগের রাতেও যার সঙ্গে প্রতিদিন দুই বেলা কথা হতো এর মধ্যে কী এমন ঘটল যে আমি তার পাশে অনুপস্থিত? তারপরও আমি তার স্ত্রী হিসেবেই বাঁচতে চাই।

শীলা ও শাওন ক্লাশমেট প্রসঙ্গঃ
শীলার সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৯৬ সালে। একটি নাটকে কাজ করার সুবাদে। আমি ভিকারুননিসা আর শীলা হলিক্রসের ছাত্রী ছিল। শীলা আমার দুই বছরের জুনিয়র। ও আর আমি একসঙ্গে অভিনয় করেছি। একসঙ্গে কাজ করতে করতে ওর সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু বান্ধবী বলতে যা বোঝায়, তা আমরা ছিলাম না।

শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন