মুক্তিযুদ্ধের গল্প: মুক্তির স্বাদ

বিষয়: : ছোটগল্প |

বাবা মজিদ মাস্টারের কড়া নির্দেশ, কথা বলা যাবে না। হাসি-কান্না যা করবে সব নিঃশব্দে। টু-শব্দটিও নয়।

গোলাঘরবন্দী জমিলা আর আয়েশা তাই মুখ খোলে না। বোবার মতো শুধু বসে থাকা। পরিস্থিতিটাকে ওরা দু’বোনই মেনে নিয়েছে, তবে মাঝে মাঝে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চায় আয়েশা। নাকের পাটা ফুলিয়ে ও ফিশফিশ করে প্রায়ই জমিলাকে বলে, বুবু, এভাবে ক’দিন আর বেঁচে থাকা যায়?

জমিলা উত্তর দেয়, থানা কোয়ার্টার আর হাই স্কুলের মাঠে মিলিটারীদের ক্যাম্প যতোদিন থাকবে,  আর বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে ওদের গাড়িগুলো যতোদিন যাতায়াত করবে ততোদিন।

-না রে বুবু, আমি আর পারছি না। এভাবে গোলাঘরবন্দী জীবন আর সহ্য হচ্ছে না।

-সহ্য যে আমাদের করতেই হবে।

-তুই তো জানিস রে বুবু, খোলা আকাশের নিচে, ঝলমলে রোদ গায়ে মেখে বাতাসের সঙ্গে বেড়ে উঠেছি আমি। দিনভর চড়ে বেরিয়েছি গোটা গ্রাম; সেই আমি এখন ঘরবন্দী! সেও আবার গোলাঘর! কী অন্ধকার, ভ্যাপসা গরম!

জমিলা বলে, আমারো কি এখানে থাকতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে হয় ছিটকে বেরিয়ে যাই।

আয়েশা ব্যাথাতুর কন্ঠে বলে, ‘আকাশ দেখতে পারি না। ঝলমলে রোদ গায়ে মাখতে পারি না। মুক্ত বাতাসের স্বাদ পাই না। বিশ্বাস কর বুবু, আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। দেখবি একদিন দমবদ্ধ হয়ে মারা গেছি।

-চুপ, অমন অলুক্ষণে কথা বলিস নে আয়েশা। ছোটবোনের মুখে হাতচাপা দেয় জমিলা।     জমিলার হাতটাকে আলতোভাবে সরিয়ে দিয়ে বিষণ্ণ কণ্ঠে আয়েশা বলে, জানিস বুবু, বাইরে রোদ আর বাতাসটাও সেই আগের মতো নেই। চুপি চুপি দিনের বেলা আমি বেড়া একটু ফাঁক করে যখন বাইরে তাকাই, রোদটাকে আমার কাছে মনে হয় পৃথিবীর বুকে বিছানো কাফনের কাপড়! বাতাসে ভয়ের স্পর্শ। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে, বাইরে বেরিয়ে গিয়ে চিৎকার করে সূর্যটাকে প্রশ্ন করি, তোমার রোদ্দুরকে আজ কাফনের কাপড় মনে হয় কেনো? বাতাসকে প্রশ্ন করি, তোমাতে কেনো এতো ভয়ের স্পর্শ?

জমিলা কোনো কথা বলে না। ও চিরদিন শান্ত স্বভাবের মেয়ে। বুক ফাটে, মুখ ফোটে না।     মনের ঝড়কে বুকের খাঁচায় আটকে রেখে স্থির হয়ে থাকতে পারে। থমথমে মুখের ওপর মায়াভরা চোখ দু’টোতে জল টলটল করে তবু মুখ খোলে না।

আয়েশা মাঝে মাঝেই চিৎকার করে উঠতে চায়; ষোড়শী দেহ-মন ক্ষুব্ধ সর্পিনীর মতো মোচড় খায়। আয়েশার ধমনীর ফুটন্ত রক্তের শব্দ শুনতে পায় জমিলা। ও তখন আয়েশাকে শান্ত করার জন্য বলে, তোর মনে নেই, ভাইয়া বার বার সাবধান করে দিয়ে গেছে, ওরা জানোয়ার, মেয়ে মানুষের শরীর পেলে ছিঁড়ে কুঁরে খায়। তোরা সাবধানে থাকিস।

-কেনো যে মেয়ে মানুষ হয়ে জন্মালাম! ফুঁশে ওঠে আয়েশা।

-চুপ!

-নারে বুবু, আর চুপ থাকতে পারছি নে। আয়েশার কণ্ঠটা একটু চড়া হলো।

গোলাঘরের দরোজাটা একটু ফাঁক করে ওদের বাবা মজিদ মাস্টার সাবধানী কণ্ঠে বললেন, আস্তে মা; আস্তে! আরো তিন গাড়ি মিলিটারী এসেছে হাইস্কুলের মাঠে।

একটা ভয়াল থাবা যেনো টুটি চেপে ধরে পরিবেশটার ওপর।

 

আয়েশা চঞ্চল, প্রজাপতি স্বভাবের হলেও, জমিলা ছোটবেলা থেকেই একটু ঘরকুনো; তবে বড় ভাই হেলালের সঙ্গে ওদের দু’জনেরই ছিলো হৃদয়ের নিবিড় সম্পর্ক। প্রচণ্ডরকম ভালোবাসে ওরা হেলালকে। হেলালও মন প্রাণ উজাড় করে স্নেহ করে বোন দু’টিকে। হেলাল এখন মুক্তিযোদ্ধা। দেশকে স্বাধীন করার দৃপ্ত শপথ নিয়ে সম্মুখযুদ্ধে লড়ছে রণাঙ্গনে। হেলালের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার পূর্ব কোনো প্রস্তুতি ছিলো না।

এপ্রিলের ষোলো তারিখের মধ্যরাতে হেলাল ঘুম থেকে ডেকে তুললো দু’বোন জমিলা ও আয়েশাকে। আয়েশা ঘুম জড়ানো ঝাঁঝালো কণ্ঠে প্রশ্ন করে হেলালকে, এতোরাতে এভাবে ঘুম থেকে ডেকে তুললে কেনো ভাইয়া?

হেলাল দু’বোনের দু’টি মাথা বুকে চেপে ধরে বললো, আমি চলে যাচ্ছি রে।

-কোথায়! জমিলার কণ্ঠে বিস্ময় ঝরে পড়ে।

-মুক্তিযুদ্ধে। দৃঢ় কণ্ঠস্বর হেলালের।

কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ওরা দু’টি বোন। হাতের পিঠে চোখ মোছে মজিদ মাস্টার।     অন্ধকার উঠোন থেকে তরুণ কণ্ঠ ভেসে আসে, আর দেরী করা ঠিক নয়। চলে আয় হেলাল।

চোখের জল সামলে নিয়ে দ্রুত উঠোনের অন্ধকারে মিশে গেলো হেলাল। যাবার কালে বার বার বোন দুটোকে বলে গেলো, ওরা জানোয়ার। মেয়ে মানুষের শরীর পেলে ছিঁড়ে-কুঁরে খায়। তোরা সাবধানে থাকিস।

 

এপ্রিল গড়িয়ে মে পড়লো। এরপর জুন পেরুলো। জুনের ছাব্বিশ তারিখের মধ্যরাতে একবার হেলাল এসেছিলো। মাথায় গামছা বাঁধা, হাতে স্টেনগান। ভাইকে কাছে পেয়ে জমিলা আর আয়েশার সে কী আনন্দ।!

-বেশ সুন্দর লাগছে তোমাকে ভাইয়া, যোদ্ধা যোদ্ধা।

জমিলার মাথাটা বুকে টেনে নিয়ে হেলাল বলেছিলো, আমি তো যোদ্ধা রে। মুক্তিযোদ্ধা।     -আমিও যুদ্ধে যাবো ভাইয়া। বায়না ধরেছিলো আয়েশা।

হেলাল বলেছে, সময় সুযোগ বুঝে তোদেরও নিয়ে যাবো। এখন তোরা চলে গেলে বাবা একা হয়ে যাবেন। আর তাছাড়া এখনো আমাদের এলাকায় সেভাবে মিলিটারীদের উৎপাত শুরু হয় নি।

কিন্তু উৎপাত শুরু হতে খুব বেশী সময় লাগলো না। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে পীরগাছা থানা কোয়ার্টারে এবং হাইস্কুলের মাঠে ক্যাম্প ফেললো পাঁচ গাড়ি মিলিটারী। মজিদ মাস্টার শুনলেন-এক তরুণ মেজর রয়েছে এদের নেতৃত্বে। দেখতে শুয়োরের মতো। প্রতিরাতেই নাকি একটি করে নতুন মেয়ে মানুষ তার চাই।

মেয়েদেরকে আরো সাবধান করে দিলেন তিনি। আরো সতর্ক হলো মেয়ে দু’টোর ব্যাপারে।

 

গোটা বাড়িতে ওরা তিনটি প্রাণী মাত্র। বাপ আর দু’মেয়ে। মজিদ মাস্টারের স্ত্রী গত হয়েছেন বছর তিনেক। স্ত্রী মারা যাবার পর মায়ের আদর আর বাপের স্নেহ দিয়ে সন্তান তিনটিকে তিনি মানুষ করার কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করেন। বেশ সাফল্যের সাথেই এগুচ্ছেন তিনি। পড়াশোনায় তিনটে সন্তানই ভালো। লোকে বলে, ছেলেমেয়ে তিনটে বাপের নাম রাখবে।

মজিদ মাস্টার চরিত্রগুণে এলাকায় খুব সম্মানী লোক। সকলেই মান্যগণ্য করে তাকে। তবে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আলফাজ মিয়া আর তার চেলাচামুন্ডারা তাকে খুব অপছন্দ করে। স্কুলে তিনি পাকিস্তানী পতাকা নামিয়ে জয় বাংলার পতাকা তুলেছিলেন বলে আলফাজ মিয়া প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছিলো। কিন্তু মজিদ মাস্টারের প্রখর ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে সুবিধে করতে পারেনি। এলাকায় মিলিটারী আসার পর আলফাজ মিয়ার বড় বাড় বাড়লো। রাস্তায় পেয়ে কুটিল হাসি দিয়ে মজিদ মাস্টারকে সে বার কয়েক বলেছে, দিন এখন আমার। মাস্টার, পাকিস্তানী পতাকাটাকে অপমান করে তুমি ভালো কাজ করোনি।

মজিদ মাস্টার কোনো কথা বলেননি। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। মেয়ে দু’টিকে নিয়েই তার যতো ভয়। যদিও এলাকায় মিলিটারী ঢোকার পর থেকেই তিনি বলে বেড়াচ্ছেন, ছেলে আর মেয়ে দুটোকে দিনাজপুরে ওদের খালার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি।

স্কুলের মাঠে মিলিটারীরা ক্যাম্প করার কারণে স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। মজিদ মাস্টারের হাতে কোনো কাজ নেই। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাদিন তিনি বসে থাকেন বাড়ির সামনে কামরাঙ্গাতলার টঙ্গে। বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে মিলিটারীর গাড়িগুলো হুশহাশ করে যাতায়াত করে। সেদিকে তাকিয়ে দেখেন আর মনে মনে গাল দেন,’জানোয়ারের দল।’ অবশ্য তার কামরাঙ্গাতলায় বসে দিন কাটানোর বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে মেয়ে দুটোকে পাহারা দেয়া। দিনাজপুরের এক পাড়াগাঁয়ে তার শ্যালিকা বিলকিস থাকে বটে। তিনি মেয়েদের প্রস্তাবও দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, দিন যতোই গড়াচ্ছে পরিস্থিতি ততোই খারাপ হচ্ছে, তোরা দু’বোন তোদের বিলকিস খালার বাড়িতে গিয়ে থাক।

এক সঙ্গে দু’বোন স্পষ্ট জবাব দিয়েছে, বাবা, তোমাকে ছাড়া একটা দিনও আমরা কোথাও গিয়ে থাকবো না। মরলে তোমার সাথে থেকেই মরবো।

অনেক বুঝিয়েছেন তিনি মেয়েদের কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। অগত্যা বুদ্ধি খাটিয়ে মেয়ে দু’টোকে ঘরবন্দী করে প্রচার করছেন, ছেলেমেয়েদের সকলকে খালার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে বাড়িটাতে তিনি এখন একাই থাকেন।

মজিদ মাস্টার হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। ব্যক্তিত্বপ্রখর মানুষ বলে সকলেই তার কথা বিশ্বাস করে। কিন্তু আলফাজ মিয়া আর তার প্রধান সহযোগী কাদের মোল্লা দেখা হলেই তাকে প্রশ্ন করে বসে, সত্যি করে কওতো মাস্টার, তোমার ছেলেটা কি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে?    বিপদমুক্ত থাকতে মিথ্যে বলেন মজিদ মাস্টার, বলেছি তো ছেলেমেয়ে তিনটিকেই আমি ওর খালার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি।

আলফাজ মিয়া মুখটাকে বিকৃত করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, জয় বাংলার পতাকা তোলার মতো এ কাজটাও তুমি ভালো করলা না মাস্টার।

 

জুলাইয়ের চৌদ্দ তারিখ। খাঁ খাঁ দুপুর। রোদটার আজ বড় তেজ। যেনো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে দুনিয়াটা। মজিদ মাস্টার টঙ্গের ওপর বসে নেয়ামুল কোরআন পড়ছেন। এ সময় বাড়ির সামনে রাস্তার ওপর এসে থামলো পাক মিলিটারীদের তিনটে জলপাই রংয়ের জীপ। পেছনের জীপ দুটো খোলা। অস্ত্র উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সৈন্যরা। সামনের জীপ থেকে নামলো সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী পরা, জিন্নাহ টুপি আঁটা আলফাজ মিয়া। তেল চকচক করছে চেহারা। চোখ-মুখ ভরা অহঙ্কারের হাসি। সঙ্গে দেখতে শুয়োরের মতোন মেজরটা। ওদের দেখে মজিদ মাস্টারের কলজেটা গলা পর্যন্ত লাফিয়ে উঠলো। কিন্তু তিনি যথাসম্ভব চেষ্টা করলেন স্বাভাবিক থাকার। মনটা ভয় আর বিতৃষ্ণায় ভরা থাকলেও মুখভাবে পরিবর্তন আনলেন। টঙ্গ থেকে নেমে দাঁড়ালেন। মেজরকে সালাম  দিলেন। একেবারে মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো মেজর আর আলফাজ মিয়া।

আলফাজ মিয়া মেজরের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করলো, স্যার ইয়ের নাম মজিদ মাস্টার হ্যায়। স্কুল মে লেখাপড়া করায়। ইয়ের বহুত খুবসুরুত দু’টা লেড়কি ছিলো। লেকিন মাস্টার বহুত বেরসিক, ওদেরকে পাঠিয়ে দিয়েছে দিনাজপুরে খালাকা ঘরমে।

-বাট হোয়াই, গর্জে উঠলো মেজর।

হাত কচলে আলফাজ মিয়া বলে, মালুম হ্যায়, যাতে তাহারা আপনাদের খেদমতে না লাগে। এই শালাদের একটা কথাই তো বোঝাতে পারছি না যে, আপনাদের মতো মহান পুরুষদের খেদমত কে লিয়েই বাঙালিদের বউ-বেটির জন্ম হোতা হ্যায়।

আলফাজ মিয়ার কথা শুনে মেজর তীক্ষ দৃষ্টি রাখলো মজিদ মাস্টারের ওপর। সে দৃষ্টি শকুনের দৃষ্টিকেও হার মানায়। মেজরের সে চাহনীর মুখে মজিদ মাস্টার ভয়ে জমে যান।     আলফাজ মিয়া কণ্ঠে দরদ ফুটিয়ে বলে, মাস্টার, মেজর সাহেব পাক্কা ইমানদার মানুষ। ছেলেমেয়ে তিনটিকে খুব শিগগিরই দিনাজপুর থেকে নিয়ে আসো। মেয়ে দু’টিকে সাহেবের খেদমতে লাগিয়ে দাও। আরে মিয়া ছোয়াব পাবে। একালও বাঁচবে, পরকালও বাঁচবে।

‘হারামীর বাচ্চা, তোর মেয়েটাকে তো মেরেছিস, এবার বৌকে লাগিয়ে দে সাহেবের খেদমতে। একাল-পরকাল তুই রক্ষা কর’, কথাগুলো গলা পর্যন্ত উঠে এলেও মজিদ মাস্টারের মুখ ফুটে বেরুলো না। তিনি কোনো কথা বললেন না।

মেজর আধা বাংলা আধা উর্দুতে আলফাজ মিয়াকে প্রশ্ন করলো, ইসকা লাড়কি কি তোমার লাড়কি ছে খোবসুরুৎ?

– জ্বী, জ্বী অনেক বেশি খুবসুরুৎ হ্যায় স্যার। পরীর মতো।

মেজর এবার দাঁত কেলিয়ে হেসে বললো, তোমার লাড়কি ভি বহুত আচ্ছি হ্যাঁয়, উ হামার বহুত খেদমত করিয়াছে।

আলফাজ মিয়া দাঁত কেলিয়ে বললো, করিবে না কেন স্যার, উহাকে তো জন্মই দিয়াছি আপনাদের খেদমতের জন্য।

-কিন্তু উ লাড়কি গলামে দড়ি কিউ দিয়া?

মেজরের প্রশ্নে থমকে গেলো আলফাজ মিয়া। সে প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে তাড়াতাড়ি বলে উঠলো-চলেন স্যার, দুপুরের খানা কা সময় হোতা হ্যায়।

মেজর আবার তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো মজিদ মাস্টারের দিকে। সে চাহনী যেনো মজিদ মাস্টারের অন্তরটাকে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলছে।

মজিদ মাস্টার আর পারছে না এ দৃষ্টির সামনে স্বাভাবিক থাকতে। তিনি ঢোক গিললেন। আলফাজ মিয়া আবার বলে ওঠে-স্যার চলেন দুপুরের খানা কা সময় হোতা হ্যায়।

মেজর কানে তোলে না সে কথা। বরং বরফের মতো ঠান্ডা আর ভারী কণ্ঠে মজিদ মাস্টারকে প্রশ্ন করে, তোমহার লাড়কি দুনোকো ভেঁজ কিউ দিয়া?

মজিদ মাস্টার সারাজীবন ছাত্রদেরই প্রশ্ন করেছেন। নিজে কখনো পড়েননি এমন কঠিন প্রশ্নের মুখে। ছাত্রদের হাজারো প্রশ্ন করলেও তিনি কোনোদিনই ভাবেননি যে একটা প্রশ্ন কত কঠিন আর নির্মম হতে পারে। প্রশ্ন কর্তার কন্ঠ কতো ভারী আর ঠান্ডা হতে পারে। থতমত খেয়ে যান তিনি। বুকের ভেতোরটা বড় বেশি ধড়ফড় শুরু করে। আমতা আমতা করে বলেন, ওরা ওদের খালার বাড়িতে বেড়াতে গিয়াছে স্যার।

-ঝুট কিউ বলতা হ্যায়, গর্জে ওঠে মেজর।

চোখ-মুখ ফ্যাকাশে হয়ে যায় মজিদ মাস্টারের। জিবে ঠোঁট চাটেন তিনি।

মেজরের চোখ দু’টো রক্তবর্ণ ধারণ করে। সে ইশারায় ডাকে জীপে অপেক্ষমাণ সৈন্যদের। অস্ত্র উচিয়ে মুহূর্তের মধ্যে মেজরের সামনে এসে হাজির হয় জনা সাতেক সৈন্য।

-এ শালা বহুত হারামী আছে,  ইসকা ঘর তাল্লাশি করো, বাঁজখাই গলায় নির্দেশ দিলো মেজর। হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠলেন মজিদ মাস্টার। কোথা থেকে বিশাল একখণ্ড কালো মেঘ উড়ে এসে সূর্যের আলো ঢেকে দিলো। মজিদ মাস্টারের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেলো। তিনি মেজরের পা দুটো জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করতে লাগলেন, স্যার, আমি একজন স্কুল শিক্ষক। এলাকার মানী লোক। লোকে আমাকে খুব সম্মান করে, তাছাড়া আমি আপনার বাবার বয়সী-আমার মেয়ে দু’টোর কোনো ক্ষতি করবেন না।

আলফাজ মিয়া অবাক কণ্ঠে বলে-তুমি তো দেখছি মাস্টার আমাকেও ঘোল খাওয়ালে! এখন বুঝতে পারছি, তোমার কথা বিশ্বাস করা ঠিক হয় নি।

মেজর আলফাজ মিয়াকে ধমক দিলো-চোপ্,  যাদা বলনেকা কোই জরুরত নেহি।

-জ্বী স্যার। হাতে হাত কচলায় আলফাজ মিয়া।

মেজরের নির্দেশ পেয়ে গোটা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খোঁজ চালায় সৈন্যরা। কিন্তু কোথাও জনমানবের চিহ্নটি পর্যন্ত তারা পেলো না। পুরো বিশ মিনিটের সার্চ শেষে সৈন্যরা ফিরে এসে জানালো-নো স্যার, ঘরমে কোই নেহি হ্যায়।

মেজর ভ্রু কোঁচকালো- কোই ব্যাংকার মিলা নেহি?

একজন সৈন্য উত্তর দিলো-নো স্যার।

আলফাজ মিয়া হাত কচলাতে কচলাতে মিন মিন করে বললো-বাড়ির আশেপাশে জঙ্গল মে ঠিকমতো তল্লাশি চালিয়েছেন তো স্যারেরা?

– হু, বাট কোই নেহি মিলা-আর এক সৈন্যের উত্তর।

মেজরের মাথায় রক্ত চড়লো। ধাঁই করে সে ঘুষি চালালো মজিদ মাস্টারের চোয়ালে, সাচ সাচ বল শালা, লাড়কি দোনো কাঁহা ছুপায়া??

ঘুষি খেয়েই টঙ্গয়ের পাশে ছিটকে পড়লেন মজিদ মাস্টার। চোখের সামনে দুনিয়াটা অন্ধকার দেখলেন। কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো রক্ত।

মেজর এবার পতিত মজিদ মাস্টারের মাথাটা বুটের তলায় পিষতে পিষতে জানতে চাইলো-আগার বাঁচনা হ্যাঁয় তো বোল, লাড়কি দোনো কাঁহা?

-আমি জানি না। গোঙ্গানীর মতো শোনালো মজিদ মাস্টারের কণ্ঠস্বর।

মেজর এবার আরো ক্ষীপ্ত হলো, সে কষে একটা লাথি হাঁকালো মজিদ মাস্টারের মাথায়।    আলফাজ মিয়া বলে উঠলো-স্যার, শালাকে শুট করে দেন। শালা বহুত হারামি হ্যায়!

মেজর গম্ভীর গলায় বললো, বুলেটকা কোই জরুরত নেহি হ্যাঁয়, ও শালা এয়ছেয়ি খতম হো গিয়া।

গদগদ কন্ঠে আলফাজ মিয়া বলে উঠলো, আলহামদুলিল্লাহ।

মেজর বললো, চলো আলফাজ মিয়া, লাঞ্চ টাইম খতম হো রাঁহা হ্যায়।

-হ্যাঁ, চলুন স্যার। কিন্তু মনে বহুত দুঃখ হ্যায় স্যার, মাস্টার শালার মেয়ে দু’টোকে আপনার খিদমত কি লিয়ে হাজির করিতে পারলাম না।

মেজর কোনো কথা বলে না। সোজা গিয়ে গাড়িতে উঠলো। তাকে অনুসরণ করলো আলফাজ মিয়া।

 

অনেক পথ হাঁটার ক্লান্তি জমিলার চোখে মুখে। আয়েশা অবশ্য তেমন ক্লান্তিবোধ করছে না। ওর চোখে-মুখে মুক্তির আনন্দ। ও আনন্দভরা কন্ঠে বললো, বুবু অনেকদিন পর খোলা আকাশের নিচে হাঁটছি।

জমিলা থমথমে কন্ঠে বলে, সময়মতো পালাতে পেরেছি বলে হাঁটতে পারছিস।

-আচ্ছা বুবু, ভাইয়াতো বলেছিলো ভাইয়াদের ক্যাম্প শিবদেবচরে তাই না?

-হ্যাঁ।

-এখান থেকে শিবদেবচর কতদূর বুবু?

-‘খুব বেশি দূর নয় মা, আর মাত্র এক মাইল।’ দু’বোনই স্পষ্ট শুনতে পেলো বাবা মজিদ মাস্টারের কণ্ঠ। চমকে উঠলো ওরা।

বুবু, বাবার কণ্ঠ না? উল্লসিত হয়ে ওঠে আয়েশা।

জমিলা বললো-হ্যাঁ, বাবার কণ্ঠই তো শুনলাম!

দু’বোনের চোখ চষে ফেরে চারিদিক কিন্তু কোথাও ওরা ওদের বাবাকে দেখতে পায় না। এক সময় একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে জমিলা বলে- না জানি বাবা কেমন আছে।

…………………….

mhniru@gmail.com'
লেখক, সাংবাদিক, পাক্ষিক ক্রীড়ালোক এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং সাপ্তাহিক রোববারের প্রাক্তন নিবার্হী সম্পাদক।
শৈলী.কম- মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফর্ম এবং ম্যাগাজিন। এখানে ব্লগারদের প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করার জন্য আপনাকে অবশ্যই লগইন করতে হবে। Login